📄 বিগত চল্লিশ বছরের দাওয়াতী কার্যক্রম
দাওয়াত ও দা'য়ীর ওপর ক্রমাগত নির্যাতনের ষ্টীমরোলার চলছে। ইসলামী কার্যক্রমের সাথে জড়িতদেরকে এক কঠিন বিপদজনক পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে। যার কারণে আমাদের অভিজ্ঞতার বিষয়টিকে নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে এবং দেখতে হবে বিগত চল্লিশ বছরে আমরা চিন্তা-চেতনা ও আন্দোলন এবং বাস্তব ক্ষেত্রে ভাল মন্দ কতটুকু কি করতে পেরেছি।
১. কর্মসূচী ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি
বিগত বছরগুলোতে যেসব পদ্ধতির উপর নির্ভর করা হয়েছে সেগুলো মূলত নতুন পদ্ধতি। এতে ইসলামের সমস্যাবলীর সমাধান খোঁজা হয়েছে আধুনিক অবস্থা ও পরিবেশ থেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে। বিভিন্ন অবস্থায় এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। আর এ কথা স্বতসিদ্ধ যে, একেক অঞ্চলের পরিবেশ পরিস্থিতি একেক রকম হবে। এ ক্ষেত্রে স্থান-কাল পাত্র ভেদে ই দাওয়াতের পদ্ধতি ও কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে।
২. পরিকল্পনা ও সংগঠন
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি যেহেতু এর কর্মসূচী ও পদ্ধতির উন্নয়নের মুখাপেক্ষী, তাই অবশ্যই এর পরিকল্পনা ও সাংঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও উন্নয়ন আনতে হবে। যেন ইসলামী আন্দোলন তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে পারে। কারণ পরিকল্পনা যদি বাস্তবমুখী না হয় তাহলে কাঙ্খিত ফল লাভ করা সম্ভব হবে না। কাঙ্খিত লক্ষ্যে ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকে পৌছাতে হলে অবশ্যই দুর্বলতার দিকগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় এসব বিষয়কে উপেক্ষা করা চলবে না।
যদি আমরা স্পষ্ট ভাবে আমাদের বিগত বছরগুলোর ব্যর্থতা ভুল-ভ্রান্তি শুধরাতে চাই এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাই, তাহলে স্বীকার করতে হবে আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কর্মনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা ও সমস্যা ছিল। চলমান আধুনিক সভ্যতার যুগে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এবং আন্দোলনরত দলগুলো তাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ব্যাপক স্টাডি ও গবেষণা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায় ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে এর চেয়েও অধিক গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কেননা আমরা তো হক, হেদায়াত ও নূরের পথে দাওয়াত দিচ্ছি।
এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, পরিকল্পণা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছেঃ (১) ইসলামী দাওয়াত কি একটি আংশিক আন্দোলন? নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন যা জাহেলিয়াতের সব কিছুকে ভেঙ্গে-চুরে মিসমার করে দিয়ে সবকিছুকে ইসলামী দৃষ্টি-ভঙ্গিতে ইসলামী ধাঁচে এক নতুন সমাজ বিনির্মাণ করবে। যদি দ্বিতীয়টি হয় তাহলে কে এই বিরাট দায়িত্ব কিভাবে পালন করবে?
(২) যদি আমাদের দাওয়াতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হয় সঠিক ইসলামী জীবনব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে নতুন করে শুরু করা, তাহলে আমরা এর কি ব্যাখ্যা করতে পারি? আমরা বিভিন্ন সরকার বা প্রশাসনের কাছে আমরা কতিপয় দাবী দাওয়া পেশ করি, যে দাবী-দাওয়ার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে।
বিশ্বের যে কোন আন্দোলন নিজেই নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সফলতা লাভ করেছে। ইসলামী আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়। আন্দোলন কে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সংগ্রাম, সংঘাত ও শত প্রতিকূলতা এড়িয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। বিশ্বইতিহাস এ সাক্ষ্যই বহন করে। উদাহরণ স্বরূপ: ফরাসী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন যারা তারা এর জন্য কাজও করেছেন একনিষ্ঠভাবে (রুশো, ভলটিয়ার এবং মনতিষ্ক) আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কার্লমার্কস ও লেলিনের পরিকল্পনারই ফল, হেগেল, গোতে এবং নিটশে যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল, জার্মানদের উত্থান তারই ফল।
৩. চিন্তা ও ধারণার ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি একটি মৌলিক চিন্তা। যার ওপরে এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বিস্ত ার লাভ করবে। (আকীদাগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শাখা- প্রশাখা) আমি এখানে জরুরী কিছু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, আমাদেরকে অবশ্যই পার্থক্য বিধান করতে হবে, চিন্তার উপস্থাপন- দাওয়াত ও আন্দোলনকে লেখা-লেখি করে চিন্তার খোরাক দান এবং বাস্তব প্রয়োগ- ময়দানে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো ইসলামী সংগঠনের এক মৌলিক নীতি।
আমি আরেকটি কথা এখানে সংযোজন করতে চাই, তাহলো আমি কিন্তু ইজতিহাদ বা গবেষণার পথ রুদ্ধ করতে বলিনি। বর্তমান যুগ জিজ্ঞাসার জবাব দানের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা অবশ্যই চালাতে হবে। কিন্তু ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক ছোট-খাট বিষয়ে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য চিন্তার জগতে অবশ্যই ঐকমত্য থাকতে হবে। যেন দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের মাঝে কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব না থাকে।
৪. মূল্যায়ন ইসলামী দৃষ্টি-ভঙ্গির লোকদের সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশী ক্ষতি করে তা হলো, চিন্তা-চেতনা ও সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা যে এক অসম লড়াই-এ লিপ্ত তা সঠিকভাবে মূল্যয়ন করতে পারেন না।
এক: তারা ইসলামী দর্শনকে এমন শক্তিশালী মনে করেন যার সামনে শত্রুরা কখনও টিকতে পারেনি এবং পারবে না।
এই ধারণা মুসলমানদেরকে হুনাইনের যুদ্ধের মত পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর হুনাইনের দিন তোমরা সংখ্যাধিক্যের ওপর ভরসা করেছিলে, কিন্তু আল্লাহর কাছে এর কোন মূল্য নেই। তিনি তোমাদের জন্য যমীনকে সংকুচিত করে দিলেন। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করলে। (সুরা তাওবা: ২৫)
দুই: গতানুগতিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গ্রহণ, কুরআন মজিদ এ বিষয়টিকে এ ভাবে চিত্রায়িত করেছে- "আর তোমরা তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে যথাসম্ভব শক্তি সঞ্চয় কর ঘোড়া দিয়ে, যদ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলবে।” (সূরা আনফালঃ ৬০)
আরও একটি ভুল কথা হলো, ইসলামী আন্দোলন ও দাওয়াতের রসদপত্র অত্যন্ত কম অন্যান্য আন্দোলনের তুলনায়। ইসলামী আন্দোলনের জনসমর্থন এবং কর্মক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক ও প্রশস্ত এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু সমস্যা রয়েছে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গ্রহণ এবং কাজের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে। দিন বদলের সাথে পাল্লা দিয়ে সামনে এগিয়ে চলছে ইসলামী দাওয়াতের চিন্তাচেতনা। আগের চেয়ে কাজের ঐক্যও সৃদৃঢ় হচ্ছে। একদিন একক কর্মনীতি প্রণীত হবে, এমন আশাই আমরা করছি।
📄 দাওয়াত ও দায়ীর জীবনে পরীক্ষা
কিভাবে পরীক্ষা মোকাবিলা করব?
পরীক্ষা ও নির্যাতন ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বযুগে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও অবধারিত বিষয়। ইসলাম জীবনকে ভেঙ্গে-চুরে জাহিলিয়াতের চিন্তা ধারাকে উৎখাত করে। জাহিলিয়াতের প্রচলিত বিধি-বিধানকে উল্টিয়ে দিয়ে এক নতুন জীবন ধারা প্রতিষ্ঠার আহবান জানায়। যার ফলে এ পথে পরীক্ষা, নির্যাতন, সংঘাত কখনও এককভাবে দলগত ও রাজনৈতিকভাবে এসেছে এবং আসবে।
পরীক্ষা প্রশিক্ষণেরই অংশ
ইসলামে পরীক্ষা একটি চিরন্তন বাছাই পদ্ধতি। ইসলামের পথে খাঁটি দা'য়ীর ভূমিকা পালন কারীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জুলুম-নির্যাতন এবং বিপদ-মুসীবতের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আসতে হবে। দা'য়ীর মজবুত ঈমান তাকে এ পথে অটল- অবিচল রাখবে। কিন্তু দুর্বল ঈমান মাঝপথেই ছিটকে পড়বে, বাধাগ্রস্ত হবে। মহান আল্লাহ এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ "মানুষের মাঝে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, কিন্তু যখন তাদেরকে আল্লাহ পরীক্ষায় ফেলেন তখন তারা এটাকে আল্লাহর আযাবের মতই মনে করে। কিন্তু যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে তখন তারা বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই মানুষের অন্তকরণে কি আছে তা অধিক জানেন। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা ঈমানদার আর কারা মুনাফিক।” (সূরা আনকাবুত : ১০-১১)
যে কোন দাবীর ক্ষেত্রে প্রমাণ একটি অপরিহার্য বিষয়, ঈমানের দাবীর ক্ষেত্রেও প্রমাণ দিতে হবে, বিপদ-মুসীবতের কঠিন মুহুর্তে ঈমানের দৃঢ়তা দিয়ে। মহান আল্লাহ বলেন, "মানুষ কি মনে করেছে যে, ঈমান এনেছি বললেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে? আর তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হবে না। নিশ্চয় আমরা তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা নিয়েছি। আল্লাহ জেনে নিতে চান কারা সত্যবাদী, আর কারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আনকাবুত: ২-৩)
পূর্ববর্তীদের কতিপয় পরীক্ষা
মহান আল্লাহর এটা চিরন্তন পদ্ধতি যে, হকের সাথে বাতিলের লড়াই বাঁধবেই। যখনই হকের আলো ফুটবে, তখনই বাতিলের আঁধার এগিয়ে আসবে সত্যের আলোকে মিটিয়ে দিতে। মহান আল্লাহ বলেন, যখন আল্লাহর বান্দা দাঁড়ালেন তাদেরকে আহবান করতে তখন তারা তার উপরে যেন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বলুন, আমি আমার রবের দিকে আহবান করছি। আমি তার সাথে কাউকে শরীক করি না।
"তারা চায় তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলোকে মিটিয়ে দিতে আল্লাহর তার নূরকে পূর্ণতা দান করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করেন।"
সৃষ্টির প্রথম থেকে নবুয়্যতের সূচনা লগ্ন থেকেই যখনই কল্যাণের সৃষ্টি হয়েছে এর পাশেই পাওয়া গেছে অকল্যাণ। কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে চরম ও ভয়ংকর দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই লড়াইয়ে সর্বদা হকের বিজয় হয়েছে আর বাতিল সর্বদা পর্যুদস্ত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন- আমাদের প্রেরিত বান্দারা (রসূলগণ) অবশ্যই সাহায্যপ্রাপ্ত হবে এবং আমার সৈন্যরা বিজয় হবে।
ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনে পরীক্ষা
হযরত ইবরাহীম খলিলুল্লাহ হকের পথে বিভিন্ন পরীক্ষায় পড়েছেন, তার সংঘাত ও পরীক্ষাময় ইতিহাসের কথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এসব প্রমাণ করে যে, হক পন্থীরা যুগে যুগে বিজয়ী হয়েছে আর বাতিল পরাজিত ও পর্যুদস্ত হয়েছে। ইবরাহীম (আ.) জন্ম লাভ করেছিলেন এক জাহেলি কুফেরী সমাজে। তাঁর স্বভাব প্রকৃতি দেশ ও সমাজের চলমান ব্যবস্থার সাথে একমত হতে পারেননি। ইবরাহীম সিদ্ধান্ত নিলেন জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন এর প্রতিরোধ করবেন তাতে তার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন। .... তিনি জন সমক্ষে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণা দিলেন তাদের প্রতিমার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন, তাদের প্রতিমার বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হলেন, এ বিষয়টিকে চিত্রিত করে আল্লাহ বলেন, তিনি বললেন- তোমরা যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করছ, তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকজন আমার শত্রু। একমাত্র বিশ্ব জাহানের প্রতিপালকই আমার প্রভু ও বন্ধু।
প্রত্যেক দায়ীকে এখানে একটু চিন্তা করতে হবে। তাকে অনুভব করতে হবে, ঈমানের মহত্বকে ইবরাহীম কিভাবে নিজের অন্তরে স্থান দিয়েছিলেন। ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে তিনি গোটা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, তার কোন সমর্থক ছিল না। এমনকি আত্মীয় স্বজন পিতা-মাতাও না। তিনি শত বাধা-বিপত্তি ও ধমকানির মুখেও পিছ পা হননি। ইবরাহীমকে আগুনে ফেলা হলো। তিনি আল্লাহর ফায়সালায়ই সন্তুষ্ট, তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য লালায়িত...। আরশে আযীম থেকে মহান প্রভু লেলিহান আগুনকে নির্দেশ দিলেন "হে আগুন তুমি ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা আরামদায়ক হয়ে যাও। তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, অতঃপর আমরা তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করলাম এবং তাকে পরিত্রাণ দিলাম এবং নূতকে এমন এক জমিনে প্রেরণ করেছিলাম, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকত নাযিল করেছি..।"
নবীদের পিতা ইবরাহীমের ঘটনা এক বলিষ্ট যোদ্ধার চিত্রই আমাদের সামনে তুলে ধরে। তার পথ ধরেই আমাদেরকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হবে। ধৈর্য ও সবরের সাথে বিপদের মোকাবেলা করতে হবে। "যে ব্যক্তি নির্বোধ সেই কেবল ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে বিমুখ হতে পারে। আমরা তাকে এই দুনিয়াতেই নির্বাচিত করেছিলাম আর পরকালে সে অবশ্যই নেককারদের মধ্যে পরিগনিত হবে।"
মূসা (আ.)-এর জীবনে পরীক্ষা
মূসা (আ.) এর জীবন দুঃখ কষ্ট থেকে কখনও নিরাপদ ছিল না। বরং জন্ম থেকেই দুঃখ মুসীবত পরীক্ষা মূসার সঙ্গী হয়। শিশুকালেই তাকে পানির ঢেউ ও অন্ধকারের মুখোমুখী হতে হয়। ফেরাউনের হাত থেকে তাকে বাঁচার জন্য তাঁর, মা তাকে সিন্দুকে ভরে নীল নদে নিক্ষেপ করেন, অন্যদিকে তার জাতিকে ভোগ করতে হয় চরম নির্যাতন, যাদের রক্ত প্রবাহিত করতে ফেরাউনেরা সামান্যতম দয়া দেখাত না। কবি বলেন, নিকটাত্মীয়দের প্রতি জুলুম বড়ই কষ্টকর মানুষের জন্য, সুতীক্ষ্ম তরবারির আঘাতের চেয়েও।
হযরত মূসা (আ.) একদিকে ফেরাউনের ভয়ে ছিলেন ভীত, তার ষড়যন্ত্র কিভাবে মুকাবিলা করবেন তার জন্য থাকতেন চিন্তিত। আবার অন্যদিকে তাকে সর্বদা চিন্ত 1 করতে হত স্বগোত্রীয় লোকদের অবাধ্যতা কূটচাল ইত্যাদি। এটা সত্যিই খুবই এক বিপদজনক পরীক্ষা।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে যদি দা'য়ীরা একই মনমানসিকতার হয় তাহলে বাইরের আঘাত প্রতিহত করা সহজ হয়। কিন্তু নিজেদের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব থাকে তাহলে? মূসা (আ.)-কে আল্লাহ ফেরাউনকে দাওয়াত দিতে নির্দেশ দিলেন। যে ফেরাউন ছিল দাম্ভিক ও স্বৈরাচারী। যার দাম্ভিক ও স্বৈরাচারী চরিত্রের কথা মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন- "নিশ্চয় ফেরাউন পৃথিবীর বুকে ঔদ্ধত্ত প্রকাশ করেছিল, এর অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত করেছিল। এদের একদলকে দুর্বল করেছিল, তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং মেয়ে সন্তানদেরকে জীবিত রাখত। নিশ্চয়ই সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।"
মূসা (আ.) তার পথে সব দুঃখ যাতনা সহ্য করে এগিয়ে চলেছিলেন... একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করেই। আল্লাহর সাহায্যের উপর আস্থা রেখেই। মূসা (আ.) কখনও কখনও একজন মানুষ হিসেবে ভীত শিহরিত ও আতংকিত হয়ে উঠলে সাথে সাথে মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য, সহযোগিতা এবং মনের নিশ্চিন্ততা দান করতেন। কুরআনে বিষয়টিকে এভাবেই চিত্রায়িত করা হয়েছে। "মূসার অন্ত ঃকরণে ভয় ঢুকে পড়ল, আমরা তাকে বললাম-তুমি ভয় পেয়োনা, তুমি বিজয়ী হবে, তোমার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ কর। তারা যা করেছে তা সব ইহা (লাঠিতে) খেয়ে ফেলবে। এরাতো যাদু দিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল, আর যাদুকর যেভাবে আসুক কখনও সফলতা পাবে না।
মূসার উপরে বিপদের যত ঘনঘটা এসেছে তার পথকে রুদ্ধ করতে কিন্তু ঈমানের দৃঢ়তার সামনে সেসবই ভন্ডুল হয়ে গেছে, তার পথ হয়ে গেছে পরিস্কার নিস্কন্টক....।
কারুন কতবারই না তার সম্পদের দ্বারা মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলেছে মূসার দাওয়াত থেকে লোকজনকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। টাকা-পয়সা দিযে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছে, মূসাকে বিভিন্ন অপবাদ অভিযোগে অভিযুক্ত করতে চেয়েছে..... কিন্তু আল্লাহ তা'আলা দ্রুতই এসব ষড়যন্ত্রকে উন্মোচন করে দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাই দাওয়াতের পথে অটল মনোভাবের সৃষ্টি করে।
কুরআন মজীদে মূসা ও ফেরাউনের ঘটনার এভাবে পরিসমাপ্তি টানা হয়েছে... ফেরাউন সম্প্রদায়ের কাছেও সতর্ককারীগণ এসেছিলেন। তারা আমার নিদর্শনের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল, অতঃপর আমি পরাভূতকারী পরাক্রমশালীর ন্যায় তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তোমাদের মধ্যকার কাফেররা কি তাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ? না, তোমাদের মুক্তির সনদপত্র রয়েছে কিতাবসমূহে? না, তারা বলে যে, আমরা এক অপরাজেয় দল? এদলতো খুব শিগগিরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে। বরং কিয়ামত তাদের প্রতিশ্রুত সময় এবং কিয়ামত ঘোরতর বিপদ ও তিক্ততর। (সূরা আল কামার: ৪১-৪৬)
ঈসা (আ.)-এর জীবনে পরীক্ষা
নিঃসন্দেহে ঈসা (আ.) বলিষ্ঠ, ধৈর্য এবং বিভিন্ন পরীক্ষা ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে অটল ও অবিচল ছিলেন, ক্রমাগত তার উপর পরীক্ষা আসলেও তিনি ছিলেন অটল অবিচল যা প্রমাণ করে তার বলিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথাই...। তাঁর জন্ম লগ্নেই তাকে ও তার মাতাকে সন্দেহ ও কলঙ্কিত করার ব্যাপারটি ঘটে। কিন্তু তিনি দোলনা থেকেই এ অপবাদের জবাব দান করেন। তিনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে হাসিমুখে বরণ করে নিতেন, তাকে কেউ গাল-মন্দ দিলে তিনি তার জবাবে সামান্যতম কটু কথাও মুখ দিয়ে বের করতেন না। তার শত্রুরা তার বিরুদ্ধে যতই কঠোরতা অবলম্বন করত তিনি তা নম্রতা ও বিনয়ী আচরণ দ্বারা মোকাবিলা করতেন। একবার তিনি তার অনুসারীদেরকে নিয়ে এক গ্রামে গেলেন তিনি তাদেরকে আল্লাহ এবং পরকালের দিকে আহবান জানালেন, কিন্তু গ্রামবাসীরা তাকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করল, তার সাথে চরম বেয়াদবী করল, তাকে বিভিন্ন দোষে চিত্রিত করল। কিন্তু তিনি সেখান থেকে নিশ্চুপ হয়ে ফিরে আসলেন, তাদেরকে ভাল ছাড়া খারাপ কিছুই বলেন নি। আপনি যদি তার বলিষ্ঠ ঈমান ও প্রশস্ত মনের কথা চিন্তা করেন তাহলে দেখতে পাবেন, তিনি কত সুন্দর ভাষায় তার সঙ্গী-সাথীদেরকে বলেছেন আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রসঙ্গে। তিনি তার অনুসারীদের বলতেন, তোমাদের জন্য সু-সংবাদ যখন তোমাদেরকে কটাক্ষ করে দোষ দেয়, তাড়িয়ে দেয় এবং আমার ব্যাপারে জঘন্য কথা-বার্তা বলে মিথ্যা ভাবে তখন তোমরা মন খারাপ না করে খুশী হয়ো কেননা আসমানে তোমাদের জন্য বিরাট প্রতিদান অপেক্ষা করছে, আসলে এরাতো তোমাদের পূর্বের নবীদেরকে এভাবেই তাড়িয়ে দিত।
তারা অচিরেই তোমাদেরকে তোমাদের সমাজ থেকে বের করে দেবে, বরং এমন একটা সময় আসবে যখন তারা তোমাদেরকে হত্যা করে মনে করবে, আল্লাহর বিরাট খেদমত করেছে।
ইহুদীরা চেষ্টা করেছিল, ঈসার দাওয়াতের চিহ্নকে চিরতরে মিটিয়ে দিবে। কিন্তু সত্য হল প্রস্ফুটিত, ধৈর্য হল আলো।
আর নিশ্চয় আল্লাহ হকের দ্বারা বাতিলকে আঘাত করবেন অতঃপর তাকে মিসমার করে দিবেন যার ফলে বাতিল দূরীভূত হয়ে যাবে।
যখন তাদের কূটচাল ব্যর্থ হল ঈসাকে হত্যা করার তখন তারা একজন লোক নিয়ে আসল, ইয়াহুজা ইসক্ষিয়টিয় নামক এক ব্যক্তিকে সে ঈসার গোপন আশ্রয় স্থান দেখিয়ে দিল, তিনি জানতে পারলেন ইহুদীরা তাকে চোখে চোখে রাখছে এবং হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তখন তিনি কতিপয় সাথীকে নিয়ে পাশের এক বাগানে আশ্রয় নিলেন। ইহুদীরা তার আশ্রয়স্থলকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলল, আর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ স্বয়ং রক্ষা করছেন, তিনি তাকে চোখে চোখে রাখছেন, তিনিই তাদের চক্রান্ত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন...।
তাদের হাতে ঈসা (আ.)-এর মতই একজন লোক পড়ে গেল, তাকে তারা ধরে শুলি কাষ্টে চড়াল। আসলে তারা গুলিতে চড়াল ইয়াহুজা ইক্ষিয়টিয়কে। যে ছিল ষড়যন্ত্রের হোতা। তারা ঈসার পরিবর্তে ওকেই হত্যা করল....। "তারা তাকে হত্যা করেনি এবং শুলে চড়ায়নি কিন্তু তাদেরকে সন্দেহে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই যারা তার ব্যাপারে মতপার্থক্য করে তারা অবশ্যই সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। তারা কোন জ্ঞান ছাড়াই নিজস্ব ধারণার অনুসরণ করে। তারা নিশ্চিত ভাবে তাকে হত্যা করতে পারেনি, বরং আল্লাহ তাকে তার নিকটে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ পরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।”
নবুয়তী যুগে ইসলামের পরীক্ষা
নবুয়তের যুগে ইসলাম যে বিপদ, মুসীবত, পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে তা পূর্বের নবী রসুলদের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না।
ইসলাম প্রথম দিন থেকেই ছিল জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে এক বিপ্লব। বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল জাহেলী সমাজের অবকাঠামোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া...। ইসলামের বৈশিষ্ট্য এটা নয় যে, সে সংস্কার কার্যক্রমে কারো সাথে আপোষ করবে, কোন রকমের ছাড় দিবে। ইসলাম নির্ভর করেছে ভাঙ্গা গড়ার রাজনীতির উপর। জাহেলিয়াতের সব অবকাঠামোকে ভেঙ্গে নতুন ভাবে পরিপূর্ণ ইসলামী অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা তার লক্ষ্য।
দাওয়াতের প্রকৃতি যদি এটাই হয়, যেই পদ্ধতি মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ (সা.) গ্রহণ করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে জাহেলী শক্তি নড়ে উঠে। তারা এর প্রতিরোধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একে সমূলে ধ্বংস করার জন্য তারা প্রচন্ড লড়াই ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
স্নায়ুবিক যুদ্ধ
জাহেলিয়াতের ধারক-বাহকরা মুহাম্মদ (সা.) ও তার দাওয়াতকে বাধা দেওয়ার জন্য তাদের সব রকমের শক্তি নিয়োজিত করে। নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করে কুরআনের পথকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। প্রথমে তারা মানসিক ভাবে রাসূলের উপর চাপ সৃষ্টি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাকে তারা বিভিন্ন ভাবে ঠাট্টা বিদ্রুপ শুরু করে। কুরআনের বিরুদ্ধে অবান্তর প্রশ্ন এনে অহেতুক দাবী জানিয়ে রাসূলের উপরে মানসিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালায়। কুরআন মাজিদের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে। “তারা বলল আপনার প্রতি আমরা ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আপনি জমিনের বুকে কোন ঝরনা প্রবাহিত করবেন, অথবা আপনার থাকবে খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান। যার নিম্ন দেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে। কিংবা আকাশকে ফেলে দেবেন যেমন আপনি দাবি করেছেন। কিংবা আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা স্বয়ং উপস্থিত হবেন। বা আপনার মনি-মুক্তার বালাখানা থাকবে। অথবা আপনি আকাশ পানে উঠে যাবেন। আমরা আপনার প্রতি ততক্ষণ ঈমান আনব না, যতক্ষণ না, আপনি নিয়ে আসবেন কিতাব যা আমরা পড়তে পারব। (সূরা বনী ইসরাঈল: ৯)
এই পদ্ধতিতে যখন মুশরিকরা ব্যর্থ হল তখন তারা রাসূলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপবাদ ছড়িয়ে দিতে লাগল যেন, মানুষ তার কথা না শুনে। তাকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তার আনিত জীবন বিধানকে ঘৃণা করে। মহান আল্লাহ বলেন, তারা তাদের চক্রান্ত শুরু করল, আর আল্লাহর হাতেই রয়েছে তাদের চক্রান্তের জোর। যদিও তারা মনে করেছিল তাদের চক্রান্তে পাহাড় টলে যাবে। (সূরা ইবরাহীমঃ ৪৬)
এই কঠিন বিপদের মধ্যেও মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অটল, অবিচল। তিনি তার দাওয়াতের পথ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেন নি।
জাহেলিয়াতের এক দুর্ধর্ষ নেতা ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা একদিন বলল, হে কুরাইশ সম্প্রদায়- এখনতো হজ্জের মৌসুম এসে গেল, আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করবে, তারা মুহাম্মদের ব্যাপারে ইতিমধ্যে শুনে গেছে। অতএব আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেন আমাদেরকে কেউ মিথ্যাবাদী বলতে না পারে। কেউ বলল, আমরা বলব সে গনক বা ভবিষ্যৎ বক্তা। সে বলল, আল্লাহর কসম সে তো গনক নয়, আমরা তো অনেক গনক দেখেছি সে তো তাদের মত ছন্দময় কথা বলে না। তারা বলল আমরা বলব সে পাগল, সে বলল সে পাগল নয়। আমরা তো পাগলের প্রলাপ শুনি। তাকে তো আমরা ভালো করেই জানি। তারা বলল, সে একজন কবি, তিনি বললেন সে কবি নয়, আমরা কবিতা ভালো করেই জানি, এর ছন্দ ও পংক্তি ভালো-মন্দ সবই বুঝি। সুতরাং সে কবি নয়। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা বলল, আমরা তাকে বলতে পারি সে যাদুকর....। সে যাদুর মাধ্যমে ভাইয়ে ভাইয়ে স্বামী-স্ত্রীতে এবং আত্মীয়- স্বজনদের মাঝে বিভেদ লাগিয়ে দিচ্ছে। ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা এবং তার দোসরদের লক্ষ্য করে কুরআন মজীদে সতর্কবাণী নাযিল করা হয়েছে যেন তার ও তার যুগে যুগে অনুসারীদের জন্য এক শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন- কখনই নয়, সে আমার নিদর্শন সমূহের বিরুদ্ধাচরণকারী। আমি খুব শিগগিরই তাকে শাস্তির পাহাড়ে আরোহন করাব। সে চিন্তা করেছে এবং মনস্থির করেছে, আবার ধ্বংস হোক সে, কিরূপে সে মনস্থির করছে। সে আবার দৃষ্টিপাত করেছে। অতঃপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে ও অহংকার করেছে এরপর বলেছে, এতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু বই নয়। এতো মানুষের উক্তি বৈ নয়, আমি দাখিল করব অগ্নিতে। আপনি কি জানেন? অগ্নি কি? এটা অক্ষত রাখবে না এবং ছাড়বেও না, মানুষকে দগ্ধ করবে। এর উপর নিয়োজিত আছে উনিশ জন ফেরেশতা। (সূরা মুদ্দাসসিরঃ ১৬-৩০)
এরপর কুরআনে কারীম নবুয়্যতের যুগে ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে জাহিলিয়াতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকে উল্লেখ করেছে, "তারা কি বলতে চায়, সে একজন কবি আমরা তার মৃত্যু দুর্ঘটনার প্রতিক্ষা করছি। বলুন তোমরা প্রতীক্ষা কর আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষারত আছি, তাদের বুদ্ধি কি এ বিষয়ের তাদেরকে আদেশ করে, না, তারা সীমা লংঘনকারী সম্প্রদায়। না তারা বলে এ কুরআন সে নিজে রচনা করেছে। বরং তারা ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যেন এ ধরনের বাক্য রচনা করে আনে যদি তারা নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হয়।"
নির্যাতন, নিপীড়ন চালানো এবং হত্যার প্রচেষ্টা
ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মক্কার কাফিরেরা মৌখিক কটুক্তি ঠাট্টা বিদ্রূপ করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং তারা মুসলমানদেরকে শারীরীকভাবে নির্যাতনের পথও বেছে নেয়। তাদের হিংসা বিদ্বেষ ও জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য এবং তাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম রক্ষার নিমিত্তে আর লাত, হোবল ও উজ্জা প্রমুখ প্রতিমার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারা মুসলমানদেরকে শারীরীকভাবে লাঞ্ছিত করতে শুরু করে...। কুরাইশের সর্দাররা একদিন কাবা চত্বরে জমায়েত হয়ে মুহাম্মদের ব্যাপারে ও তার কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করে, তারা বলে- এই লোকটি আমাদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, আমাদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে। ভাইয়ে ভাইয়ে গোত্রে গোত্রে মারামারি লাগাচ্ছে। আমাদের দেবতাদেরকে ও আমাদের বাপ-দাদাদেরকে গাল মন্দ করছে..., আমাদের ধর্মকে কটাক্ষ করছে। এমন সময় রাসূল (সা.) সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তার চারিদিকে ঘিরে দাঁড়াল। আর চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল তুমি আমাদেরকে এ এ কথা বল? তিনি দৃঢ় চিত্তে জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আমিই এসব কথা বলি..। এ কথা শুনে তাদের নেতারা 'থ' বনে গেল। তারা মারমুখী হয়ে উঠল। এ সময় হযরত আবু বকর (রা.) সেখানে এসে পড়েন এবং নবী (স.)-কে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে বলেন, তোমরা কি এ লোকটাকে এজন্যই হত্যা করতে যাচ্ছ যে, সে বলে আমার প্রভু আল্লাহ?
কাফিররা বার বার ব্যর্থ হবার পর দারুন নদওয়াতে বসে এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। ইতিমধ্যে মুসলমানেরা মদিনার দিকে হিজরত করতে শুরু করে দিয়েছে। তারা এ সুযোগে মুহাম্মদ (সা.) থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা উন্মোচন করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, যখন তারা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল যেন আপনাকে বন্দী করে বা হত্যা করে অথবা আপনাকে দেশান্তরিত করে। তারা ষড়যন্ত্র করছিল আর আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
হিজরতের পরে এবং বদরে মুসলমানদের বিজয় লাভের পর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া উমায়ের ইবনে ওহাবকে গোপনে মদীনায় প্রেরণ করে যেন সে মুহাম্মদকে হত্যা করতে পারে। এতে যদি সে নিহতও হয় তাহলে তার পরিবারের ভরণ পোষণ এবং উমায়েরের যেসব ঋণ ছিল সেসব পরিশোধের দায়িত্ব সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া গ্রহণ করে। তাদের মাঝে এই চুক্তিনামা কা'বা চত্বরে সংঘটিত হয়। উমায়ের অতি সংগোপনে মদীনার মসজিদে এসে হাজির হয়। তার হাতে ছিল উন্মুক্ত তরবারী। তাকে দেখে রাসূল (সা.) বললেন, উমায়ের তুমি কাছে আস। উমায়ের কাছে এসে বলল, শুভ সকাল। এটি ছিল জাহেলিয়াতের অভ্যর্থনা। রাসূল (সা.) বললেন হে উমায়ের আমাদের সম্ভাষণ তোমাদের সম্ভাষণের চেয়েও অনেক উত্তম। সালাম বা শান্তি। যেটি জান্নাতবাসীদের সম্ভাষণ। সে বলল, এটা তো তোমার নতুন মতবাদ। রাসূল (সা.) বললেন- তুমি কেন এসেছ? সে বলল আমি আমাদের বন্দীদেরকে মুক্ত করার জন্য আলোচনা করতে এসেছি। তখন রাসূল (সা.) বললেন, তাহলে তোমার ঘাড়ে তরবারী কেন? সে বলল, তরবারী জাহান্নামে যাক, আমরা কি তোমার কিছু করতে পেরেছি? রাসূল (সা.) বললেন, তুমি সত্যি করে বল কি জন্য এসেছ? সে বলল, আমি ঐ কাজের জন্য এসেছি। রাসূল (সা.) বললেন, বরং তুমি আর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তো কাবা চত্বরে বসে কুরাইশদের বদরে মৃত নেতাদের কথা আলোচনা করেছ, তারপর তুমি বলেছ, আমার ঘাড়ে যদি ঋণের বোঝা না থাকত, আর পরিবারের ভরণ পোষণের ঝামেলা না থাকত তাহলে আমি গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করতাম। এরপর সাফওয়ান তোমার ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। শর্ত হল, তুমি আমাকে হত্যা করতে মদীনায় আসবে। মহান আল্লাহ তোমার ও আমার মাঝে পর্দা টেনে দিয়েছেন। তুমি আমার কিছুই করতে পারবে না। অতঃপর উমায়ের বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল, আমরা তো আপনাকে মিথ্যা মনে করতাম। আকাশ থেকে আপনার প্রতি যে ওহী নাযিল হয়, তা অবিশ্বাস করতাম। আর আমি তো সত্যিই আপনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এসেছি। এ কথা আমি এবং সাফওয়ান ছাড়া দ্বিতীয় কেউ জানে না। আল্লাহর কসম! এ খবর আপনাকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানাতে পারে না। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে ইসলামের পথে হেদায়েত দান করেছেন এবং এই পথে পরিচালনা করেছেন। এরপর তিনি কালেমা শাহাদাৎ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
সাহাবীদের জীবনে পরীক্ষা
নবুয়্যতের যুগে ইসলামের দা'য়ীরা সব ধরনের জুলুম, নির্যাতন এবং শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন তাদের একটি মাত্র অপরাধ ছিল যে, তারা ঈমান এনেছেন আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহদ্রোহী শক্তিকে অস্বীকার করেছেন। তাদের অপরাধ ছিল তারা সত্যের ডাকে সাড়া দিয়েছেন এবং বাতিলকে পরিত্যাগ করেছেন, একারণেই তাদের উপরে কাফের মুশরিকরা আক্রোশে ফেটে পড়ে। তারা ইসলাম গ্রহণ করার অপরাধে সে যেই হোক না কেন আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সবার উপরে নির্যাতনের স্টীম রোলার চালায়। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেন- মুশরিকরা যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে এবং রাসূল (সা.) এর অনুসরণ করলে তাকে শত্রু হিসাবে গণ্য করত এবং তাদের উপর জুলুম নির্যাতন চালাত। কখনও লাঠির আঘাত দিয়ে, কখনও খানা-পিনা বন্ধ করে আবার কখনও মক্কার উত্তপ্ত বালুতে বুকে পাথর চাপা দিয়ে শুইয়ে রেখে।
বেলালের উপর নির্যাতন
উমাইয়া ইবনে খালফ্ হাবশী বেলালকে দুপুরের প্রচন্ড রোদে মক্কার বাতহা নামক উপকন্ঠে রেখে দিত। এরপর তার বুকের উপর একটা বড় পাথর চাপা দিত। তারপর তাকে হুমকি দিত যে, তুমি হয় এভাবেই মরবে, অথবা মুহাম্মদের দ্বীনকে অস্বীকার করবে। আর লাত উজ্জার ইবাদত করবে বেলাল (রা.) বলিষ্ঠতার সাথে শুধু চিৎকার করে বলতেন আহাদ, আহাদ, আহাদ। (আল্লাহ এক, আল্লাহ একক), (আল্লাহ এক, আল্লাহ একক), (আল্লাহ এক, আল্লাহ একক)
ইয়াসির পরিবারের উপর নির্যাতন
বনু মাখযুম ইয়াসির পরিবারের মা-বাবা, সন্তান-সন্তুতি সকলকে বের করে নিয়ে এসে তপ্ত বালুর উপর ফেলে তাদের শরীরে উত্তপ্ত লোহার ছেকা দিত। ইয়াসির (বাবা) বয়োঃবৃদ্ধ হওয়ার কারণে সহ্য করতে না পেরে মারা যান। ইয়াসিরের মা সুমাইয়া (রা.) এতে সহ্য করতে না পেরে আবু জেহেলকে গালি-গালাজ শুরু করে। ফলে আবু জেহেল সুমাইয়ার গুপ্তাংগে বর্শা বিদ্ধ করে তাকে শহীদ করে দেয়। এজন্য সুমাইয়া হলেন ইসলামের প্রথম মহিলা শহীদ।
উসমান ইবনে মাজউনের উপর নির্যাতন
যখন উসমান ইবনে মাজউন দেখলেন যে, তার অন্যান্য দা'য়ী ভাইয়েরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে আর তিনি ওয়ালিদ ইবনে মুগীরার ছত্রছায়ায় নিরাপদে কাটাচ্ছেন, তখন তিনি বললেন, না আল্লাহর কসম! সকাল বিকাল আমি একজন মুশরিক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় বাঁচব? এটা অবশ্যই আমার এক বিরাট দুর্বলতা। এরপর তিনি ওয়ালিদ ইবনে মুগীরার কাছে গিয়ে তার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিলেন। তিনি তাকে বললেন, আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাহায্য বা ছত্রছায়া গ্রহণ করবো না। এরপর তিনি মুশরিকদের লক্ষ্য করে এমন সব কথা বললেন, যাতে তারা ক্রোধান্বিত হল এবং লবিদ ইবনে রবী'আ এগিয়ে গিয়ে তার চোখে এক ঘুষি মেরে চোখ গুলিয়ে দিল আর ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল। সে বলল আরে ভাই, তুমি আমার জিম্মাতে নিরাপদেই ছিলে, আর এখন তোমার চোখের অবস্থা কি? তখন ওসমান তাকে বললেন, হ্যাঁ, খোদার কসম আমার ভালো চোখটি চাচ্ছে, যেন সে ঐ আঘাত প্রাপ্ত চোখটির মত হয়ে যায়। আর আমি তো সেই সত্তার জিম্মায় রয়েছি। যিনি সর্বশক্তিমান। এরপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা পাঠ করেন-
আমার চোখ যদি খোদার সন্তুষ্টিতে কিছু পেয়ে থাকে এক খোদাদ্রোহীর হাতে যে সঠিক পথপ্রাপ্ত নয়।
তবে দয়ালু দাতা অবশ্যই এর জন্য প্রতিদান দিবেন।
দয়াল প্রভুর সন্তুষ্টিই তো আমাদের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। তোমরা যদি বল আমি পথভ্রষ্ট, নির্বোধ রাসূল
মুহাম্মদের দ্বীন গ্রহণ করে, তাহলে বলব, আমরাতো আল্লাহর পথেই রয়েছি, এটিই সত্য পথ
যদিও তোমরা আমাদের উপর বর্বরতা চালাও।
এভাবে ঈমানদাররা নবুয়্যতের যুগে কন্টকাকীর্ণ পথকে মাড়িয়ে নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। (শাহাদাতের পর) শাহাদাতের পথ ধরে এগিয়ে গেছে।
এভাবেই দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল অন্ধকার রাতের মত..। বিপদ ও নির্যাতনের মাত্রাও বেড়ে চলছিল। ঘাড়ের উপর যেন বোঝার পর বোঝা চেপে যাচ্ছে..। দুনিয়ার সুখ শান্তিকে ছুঁড়ে ফেলে আল্লাহর সান্নিধ্যে তারা সুখ লাভ করার চেষ্টা করতেন। তাঁর পথে জিহাদের কামনা করতেন। শাহাদাতের তামান্না রেখে যেন তারা জান্নাত লাভ করে ধন্য হন...। (যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে নিহত মনে করো না বরং তারা জীবিত তারা তাদের রবের নিকট রিযিক প্রাপ্ত হচ্ছে)। তারা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতে আনন্দিত। যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছে নাই তাদেরকে তাঁরা সুসংবাদ দেয় যে, তোমাদের কোন ভয় নেই, আর তোমরা চিন্তিতও হবে না। তারা শুভ সংবাদ দেয় আল্লাহর নেয়ামত ও করুণার। নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করবেন না।
নবুয়্যতের যুগে ইসলামের কতিপয় শহীদের উদাহরণ নবুয়্যতের যুগে প্রত্যক্ষ করা গেছে বেশ কিছু বীর যোদ্ধা ইসলামের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে কুরবানী করেছে। এদের মধ্য থেকে খুবাইব ইবনে আদির শাহাদাৎ সম্পর্কে আলোচনা করব। যেন আমরা দেখতে পাই এদের জীবনে ইসলামী আকীদা বিশ্বাস কিভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
খুবাইব (রা.) কে বন্দী করা হয় মদীনা থেকে আযাল ও কারা নামক গোত্রদ্বয়ের পল্লীর দিকে দাওয়াতের কাজে যাওয়ার সময়। নবী করীম (সা.) তাকে সেখানে দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। বদমায়েশরা মক্কায় নিয়ে গিয়ে হাজার ইবনে আবি হারেব তামিমীর নিকট তাকে বিক্রি করে দেয়। যেন সে বদরে নিহত তার পিতার হত্যার বদলা নিতে পারে।
নির্দিষ্ট দিনে মুশরিকরা তাকে তানিম স্থানে নিয়ে যায় শুলে চড়াবার জন্য। তিনি তাদের বললেন, আমাকে যদি দুই রাকাত নামায পড়ার সুযোগ দিতে। তারা সম্মত হয়ে বলে পড়..। তিনি উত্তমরূপে দুই রাকাত নামায পড়ে লোকদের দিকে চেয়ে বললেন, যদি তোমরা মনে করতে যে, আমি মৃত্যু ভয়ে নামায লম্বা করছি তাহলে আরও লম্বা নামায পড়তাম। যখন তারা খোবায়েবকে ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড় করাল, তখন মুশরিকরা বলল, তুমি ইসলাম ত্যাগ কর, তাহলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দিব। তিনি বললেন আল্লাহর কসম! আমি ইসলাম ত্যাগ করব না। যদিও আমাকে দুনিয়ায় যা কিছু রয়েছে সবই দিয়ে দেওয়া হয়।
- খোবায়েব তুমি ফিরে আস।
- না আমি কখনও ফিরব না।
- লাতের কসম যদি না ফিরিস তোকে হত্যা করব।
- আরে আল্লাহর পথে মৃত্যুতো অতি সামান্য ব্যাপার।
- তারা তার মুখ মন্ডলকে কিবলার দিক থেকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়।
- তখন তিনি বলেন তোমরা আমার মুখ কিবলা থেকে অন্য দিকে ফিরাচ্ছ, অথচ আল্লাহ বলেছেন কি জান? তোমরা যে দিকেই তোমাদের মুখ ফিরাবে সে দিকেই মহান আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান রয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমিতো শত্রু ছাড়া অন্য কারো চেহারা দেখছি না, এখানে এমন কোন মুসলমান নেই যে আপনার রসূলের কাছে আমার সালাম পৌঁছিয়ে দেয়, সুতরাং আপনিই আমার সালাম পৌঁছিয়ে দিন..।
- রাসূল (সা.) সে সময় তার সাহাবীদের মাঝে মদীনায় বса ছিলেন, তিনি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর বললেন এ মাত্র জিবরাইল আমাকে খুবাইব-এর সালাম পৌঁছিয়ে দিল। খুবাইবের চারিদিকে ৪০ জন মুশরিক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে বর্শা। তারা বলল, এই সেই ব্যক্তি যে তোমার বাবাকে বদরে হত্যা করেছে। খুবাইব বললেন, হে আল্লাহ! আমরা তোমার রাসূলের পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছি। এরা আমার সাথে কি আচরণ করছে। হে আল্লাহ! এদেরকে তুমি গণনা করে রাখ, এদের প্রত্যেককেই তুমি হত্যা করিও। এদের যেন এক জনও বাঁচতে না পারে। মুয়াবিয়া ইবনে সুফিয়ান যিনি মুশরিকদের মাঝে তখন ছিলেন সেখান থেকে দূরে সরে যান। হাকিম ইবনে হিযام জুবাইর ইবনে মুতইম এরাও সেখান থেকে দ্রুত পলায়ন করে খুবাইব-এর দু'আ তাদের উপর লেগে যেতে পারে এ আশংকায়..।
যখন বর্শার আঘাতে তার শরীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি কাবার দিকে মুখ করে বলছিলেন, সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি কাবার দিকে আমার মুখ ফিরাবার সুযোগ দিয়েছেন, যেই কাবার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট তার নবীও সন্তুষ্ট এবং মুমিনরাও। এরপর তিনি লোকদের দিকে ফিরে এই ঐতিহাসিক কবিতা পাঠ করতে লাগলেন-
সমস্ত গোত্র আমার পাশে একত্রিত হয়েছে, সমস্ত কবিলার লোকজন জমায়েত হয়েছে, জমায়েত হয়েছে তাদের স্ত্রী, পুত্র, সন্তান, সন্ততিগণ।
খেজুর গাছের লম্বা কান্ডের নিকট আমাকে দাঁড় করিয়েছে, আমি আল্লাহর নিকটে আমার এই বিপদ বিচ্ছিন্নতার ফরিয়াদ জানাচ্ছি, আর ফরিয়াদ জানাচ্ছি তাদের বিরুদ্ধে যারা আমার মৃত্যু যজ্ঞ দেখার জন্য দলবদ্ধ হয়েছে। ঐ আরশের অধিপতি, আমাকে ধৈর্য দাও যা আমার উপরে চলছে তার উপর। তারা আমার মাংসকে টুকরা টুকরা করছে। নাড়ী-ভুড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করছে। তারা আমাকে কুফরী অথবা মৃত্যুর এখতিয়ার দিয়েছিল, আমি নির্ভয়ে চোখের পানি ফেলেছি। আমি তো মৃত্যুর ভয় করি না। কিন্তু জাহান্নামের আযাবের ভয় করছি। এই সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মেনে নিচ্ছি। তিনি ইচ্ছা করলে আমার প্রতিটি কর্তিত অংগে রহম ও বরকত দিতে পারেন। আমি মোটেই পরওয়া করি না। যেহেতু আমি মুসলমান হিসাবে নিহত হচ্ছি। আমাকে যেখানে যেভাবে হত্যা করা হোক না কেন। আল্লাহর দুশমনরা খুবাইব-এর শরীরকে খোচা দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করছিল আর তিনি মুখ দিয়ে আওড়াচ্ছিল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। এভাবে তার পবিত্র আত্মা মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেল। যালেমদের জুলুমের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ জানাতে জানাতে।
তাবেঈদের যুগে যুলুম নির্যাতন
সাহাবীদের যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাবেঈদের যুগেও ইতিহাসের পাতায় ইসলামের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হতে দেখা যায়। এসময় কিছু অহংকারী দাম্ভিক শাসক ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয়ে নিরপরাধ মুমিনদের উপর জঘন্য অত্যাচার চালায়।
হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ ও ইবনে যুবাইর
হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ ৭৫ হিজরীতে ইরাকের শাসনভার গ্রহণ করে। এই মুসলিম নগরী তার যুগে চরম বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে। হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসকে তার নির্যাতনের কারণে কলংকিত করে। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সে তরবারি দিয়ে প্রতিবাদকারীর মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিত। তার হুকুমের সামান্য নড়বড় করলে তরবারী দিয়ে গর্দান উড়িয়ে দিত।
মহান আল্লাহর এটাই নিয়ম যে, তিনি এমন কিছু বীর পুরুষ জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেন, যারা অত্যাচারীর রক্ত চক্ষুকে মোটেই ভয় পায় না। সাঈদ ইবনে যুবাইর ছিলেন তাদেরই অন্যতম। যিনি দ্বীনের জন্য আল্লাহর ওয়াস্তে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। হাজ্জাজ যখন তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। তখন একদল সৈন্য পাঠিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে বলল। সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে তার সামনে হাজির করল।
- হাজ্জাজ তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করল। - তিনি জবাব দিলেন সাঈদ ইবনে যুবাইর। (নেককারের সৌভাগ্যশীল সন্তান) - হাজ্জাজ বলল, বরং তুমি সাকি ইবনে কুসাইর (হতভাগ্যের বেটা দুর্ভাগা)। - সাঈদ বললেন, আমার মা আমার নাম সম্পর্কে তোমার চেয়ে বেশী জানেন। - হাজ্জাজ বলল, তুই দুর্ভাগা তোর মাও দুর্ভাগা। - সাঈদ বললেন, গায়েবের কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ জানেন। (আল্লাহ) - হাজ্জাজ বলল, তোমার এই দুনিয়াকে আমি প্রজ্বলিত আগুন দিয়ে ভরে দিব। - সাঈদ বললেন, আমি যদি জানতাম তোমার হাতেই এই ক্ষমতা তাহলে তোমাকে মা'বুদ বলে গ্রহণ করতাম। - হাজ্জাজ বললেন, মুহাম্মাদের ব্যাপারে তুমি কি বল, তিনি বললেন, রহমতের নবী, হেদায়াতের নেতা (স.)। - হাজ্জাজ বলল, তুমি হাস না কেন? সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন মাটির তৈরী জীব কিভাবে হাসতে পারে। যে মাটিকে আগুনে খেয়ে ফেলে। - হাজ্জাজ বলল, তাহলে আমরা কেন হাসি? - সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, অন্তঃকরণ সব সমান নয়। - হাজ্জাজ তাকে অন্যভাবে কাছে টানার চেষ্টা করল, তার সামনে সোনা-দানা, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান ধন-সম্পদ হাজির করল। কিন্তু তিনি এগুলোর দিকে ফিরেও তাকালেন না।
- অতপর সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, তুমি যদি এগুলো এই ভেবে জমা করে থাক যে, কিয়ামতের বিভীষিকা থেকে এগুলো দ্বারা মুক্তি পাবে, তাহলে তুমি ভুল করেছ। কারণ সেদিন মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে, সেদিন একমাত্র কাজে আসবে, যা বৈধ ও পরিচ্ছন্ন পন্থায় জমা করা হয়েছে সেই সম্পদ। এরপর হাজ্জাজ বাদক দলকে বাজনা বাজাতে ও গান গাইতে নির্দেশ দিল। যখন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগল এবং বাঁশি বাজাতে শুরু করল, তখন সাঈদ ইবনে যুবাইর কাঁদতে লাগলেন। হাজ্জাজ তাকে বলল, তুমি এ গান বাজনা শুনে কাঁদছ, সাঈদ বললেন, বরং আমি দুশ্চিন্তায় কাঁদছি এই জন্য যে, এই বাঁশি আমাকে ইস্রাফিলের শিংগার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আর এই কাঠের বাদ্যযন্ত্র আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, গাছের ডাল কেটে বেহুদা জিনিস তৈরি করা হয়েছে। আর ঐ বিনার তার তৈরী করা হয়েছে, ছাগলের নাড়িভুড়ি দিয়ে, এসব সহই কিয়ামতের দিন তোমার হাশর হবে।
- তখন হাজ্জাজ বলল, হে সাঈদ ইবনে যুবাইর তোমার ধ্বংস হোক।
- তখন সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, ধ্বংসতো তারই জন্য যে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
- হাজ্জাজ বলল, হে সাঈদ ইবনে যুবাইর তুমি ঠিক কর কিভাবে মরতে চাও?
- সাঈদ বললেন, বরং তুমি তোমার জন্য ঠিক কর যে, তুমি কিভাবে মরবে, আল্লাহর কসম! তুমি যেভাবে আমাকে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে সেভাবেই হত্যা করবেন।
- হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ বলল, তুমি কি চাও আমি তোমাকে মাফ করে দির?
- সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, মাফ তো আল্লাহ করবেন, মাফ করার তুমি কে? আর তোমার তো কোন ক্ষমতাই নেই।
- হাজ্জাজ বলল, যাও একে নিয়ে গিয়ে হত্যা কর।
যখন তাকে দরজা দিয়ে বের করে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি হাসছিলেন, হাজ্জাজকে এই খবর দেওয়া হলে তাকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। সাঈদ ইবনে যুবাইরকে নিয়ে আসা হলে জিজ্ঞেস করলেন, কেন হাসছ?
- সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, আল্লাহর উপর তোমার ধৃষ্টতা দেখে এবং তোমার উপর আল্লাহর সহিষ্ণুতা দেখে।
- হাজ্জাজ বললেন, একে এখনই হত্যা কর, সাঈদ বললেন, আমি সেই সত্তার দিকে আমার মুখ ফিরিয়েছি যিনি আকাশ ও জমিন গড়েছেন। আমি তারই অনুগত এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্গত নই।
- হাজ্জাজ বলল, ওর মুখ কেবলার দিক থেকে ফিরিয়ে দাও।
- সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, তোমরা যেই দিকেই মুখ ফিরাবে সেই দিকেই আল্লাহর চেহারা বিদ্যমান।
- হাজ্জাজ বলল, ওকে অধোমুখে করে ফেলে দাও।
- সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, এ থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে এবং এথেকেই আবার তোমাদেরকে বের করা হবে। হাজ্জাজ বললেন, ওকে জবাই কর।
- সাঈদ ইবনে যুবাইর বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নাই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল। এর পর সাঈদ ইবনে যুবাইর এই বলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমার মৃত্যুর পর সে যেন আর কাউকে হত্যা করতে না পারে। অতঃপর তাকে গলার পিছন থেকে জবাই করা হয়। এরপর হাজ্জাজ মাত্র ১৫ দিন বেঁচে ছিল। তারপর সে মারা যায়..।
কালকের ও আজকের পরীক্ষা
ইতিহাস সাক্ষী যুগ যুগ ধরে হক ও বাতিলের লড়াই অব্যাহতভাবে চলছে। যুগের পরিবর্তনে স্থান, কাল, পাত্র ভেদে পরীক্ষা ও নির্যাতনের চিত্রে ভিন্নতা থাকলেও মূলত: একই। তাহলো,
সর্বযুগে ঈমান বলিষ্ঠতা নিয়েই মাথা উঁচু করে থাকে। আর এর জন্য রয়েছে দৃঢ়চেতা পুরুষ যারা ইসলামের জন্য বাতিলের বিরুদ্ধে নিজেদেরকে কোরবানী দিয়েছে। এসব বীর পুরুষদের নাম আধুনিক যুগের ইসলামের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
শহীদ ইমাম হাসানুল বান্না
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইসলামী উম্মাহ একজন ইসলামী যোদ্ধাকে খুবই ভালভাবে প্রত্যক্ষ করেছে আর তিনি হলেন, শহীদ ইমাম হাসানুল বান্না...। ইমাম হাসানুল বান্না জন্ম গ্রহণ করেন এমন এক সমাজে যে সমাজ বিদ'আত ও কুসংস্কারে ছিল আচ্ছন্ন। এমন এক দেশে জন্ম গ্রহণ করেন, যেখানে জাহেলী যুগের সব ধরণের চাল-চলন ও রসম রেওয়াজ চালু ছিল। যে সমাজকে সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন পদানত করে তার আর্থিক ও নৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ইমাম হাসানুল বান্না এমন এক ডাক দিলেন যার ফলে ঘুমন্তরা জেগে উঠল, গাফেলরা সতর্ক হল, মুমিনদের চেতনা জেগে উঠল। তার এই আহবানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ল। শত শত হাজার হাজার লোক তাঁর ডাকে ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের পথে জমায়েত হল। দুনিয়াবাসী সকলেই তা প্রত্যক্ষ করল।
ইমাম হাসানুল বান্না সর্বদা সচেতন ছিলেন যুগের বিপদ-আপদ' ও জুলুম-নির্যাতন সম্পর্কে। এজন্য তিনি এ পথের দা'য়ীদেরকে সদা সর্বদা সতর্ক করতেন, তিনি বলতেন, দুনিয়া তোমাদের মাথায় ভেঙ্গে পড়বে, তোমাদের রিযিক তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, জেলখানা তোমাদেরকে মেহমানদারি করার জন্য দরজা খুলে রাখবে। তিনি একদিন এক বক্তৃতায় বলেন, তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষায় পড়বে। তোমরাতো শুনে থাকবে তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারা মুশরিকদের নিকট থেকে অনেক দুঃখ দুর্দশা ভোগ করেছিল, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং খোদা ভীতি অবলম্বন কর, তাহলে সেটিই হবে দৃঢ়তার পরিচায়ক। এটিই হচ্ছে মহান আল্লাহর দা'য়ীদের ক্ষেত্রে সুন্নাত বা পদ্ধতি। ঈমানদার ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে কর্মরত লোকদেরকে তাদের জীবন, রিযিক, সন্তানসন্ততি বিভিন্নভাবে পরীক্ষায় ফেলে। তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়, মিথ্যাচার করা হয়, চক্রান্ত করা হয়, আর আল্লাহর এই সুন্নাতে কোন পরিবর্তন পাওয়া যাবে না। আল্লাহ সব নবীকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াতের বাণী সরল-সঠিক পথের দিশা দিয়ে যেন মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। এজন্যই এসেছিলেন নুহ.... একাজের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন- ইবরাহীম (আ.)। এ কাজেরই দাওয়াত দিয়েছিলেন মূসা (আ.) আর এ পথেই চলেছেন ঈসা (আ.)। আর এ বাস্তবতার পথ ধরেই মুহাম্মদ (সা.) রে দ্বীনের দাওয়াত পৌছিয়েছেন।
এই হচ্ছে আল্লাহর তরীকা যাতে কোন বিভক্তি নেই, "আর আমরা এভাবেই প্রত্যেক নবীর জন্য বদমায়েশদেরকে শত্রু করে দিয়েছিলাম এবং তোমার রবই হেদায়াত দানে সাহায্য করতে যপেষ্ট"।
একদিন ইমাম হাসানুল বান্না এক সাধারণ কুশল বিনিময়ের সময় তার ভাইদেরকে বলেন- আমি স্বপ্নে দেখলাম হযরত ওমর (রা.)-কে, তিনি চিৎকার করে বলছেন- হে হাসান, তুমি অবশ্যই নিহত হবে..। আমি জেগে উঠলাম। অতঃপর আল্লাহর হামদ ও তারিফ করলাম। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার আমি ডাক শুনলাম কে যেন বলছে, হে হাসান! তুমি অবশ্যই নিহত হবে। আমি জেগে গেলাম। এরপর ফজর পর্যন্ত তাহাজ্জুদ পড়ে কাটিয়ে দিলাম। বাস্তবে ইসলামের শত্রুরা ইসলামী দাওয়াতের শক্তি ও প্রভাবের কথা আঁচ করতে পেরে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৪৯ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারী বাদশাহ ফারুকের দোসররা ইংরেজদের নির্দেশে ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধ সংগঠিত করে। তারা দিনে দুপুরে কায়রোর প্রশস্ত রাজপথে গুলি ছুঁড়ে ইমাম হাসানুল বান্নাকে শহীদ করে দেয়। ইমাম হাসানুল বান্না এমন এক সময়ে শহীদ হন যখন ইসলামী দুনিয়া তার মত একজন নেতার জন্য কাঙ্গাল ছিল।
আকীদায় বিশ্বাসীরা চড়া মূল্য প্রদান করছে
দাওয়াতের জীবনে আজ জুলুম ও নির্যাতন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অত্যাচারী শাসকরা সঠিক আকিদায় বিশ্বাসী মুমিনদের উপর চরম জুলুম ও নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করছে। তাদের ছেলে-মেয়েদের এতিম বানাচ্ছে। স্ত্রীদেরকে বিধবা বানাচ্ছে, তাদের ভিটেমাটি ধবংস করছে। তাদেরকে জেলের অন্ধকার প্রকষ্টে বিভিন্ন প্রকার আযাব ও নির্যাতন চালিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিচ্ছে।
স্বৈরাচারী শাসকদের পক্ষে বিভিন্ন মিডিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে। তাদের গুণকীর্তন প্রচার ও প্রসারের জন্য অগনিত টাকা পয়সা, সৈন্য সামন্ত, কলম, বই-পুস্তক ও রেডিও টিভি ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাহেলিয়াতের নেতারা একমাত্র ইসলামকেই ভয় পায়। ইসলামী নেতৃত্বকে ভীতির চোখে দেখে। এজন্য তারা ইসলাম নেতৃত্বশূন্য করার জন্য শহীদ হাসানুল বান্নার পরে তারই পথে চলমান নেতৃত্বকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে যেমন রয়েছেন, বিশিষ্ট ইসলামী আইনজ্ঞ ইসলামী ফৌজদারী আইন গ্রন্থের সংকলক বিচারপতি আব্দুল কাদের আওদা, ইসলামী চিন্তাবিদ তাফসির ফী যিলালুল কোরআনের লেখক শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব। এ ধরনের আরো ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইসলামী ব্যক্তিত্বকে একের পর এক জুলুম নির্যাতন চালিয়ে তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে। অথবা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে পরকালের পথে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কীভাবে জুলুম নির্যাতনের মুকাবিলা করব
বর্তমান ইসলামী দাওয়াত ও ইসলামী আন্দোলন এক চরম জুলুম নির্যাতন চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা করছে। ইসলাম বিদ্বেষীরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যেন ইসলাম তার সঠিকরূপে বর্তমানে আত্মপ্রকাশ করতে না পারে।
ইসলামী দাওয়াত আজ চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। এজন্য চাই সম্মিলিত প্রয়াস। চাই ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা এবং দাওয়াতের বিষয়ে যুব সমাজ থেকে শুরু করে সকলকে ইসলামী জ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া, তাদের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করা এবং তাদেরকে ইসলামের জন্য উজ্জীবিত হওয়ার এবং জিহাদের জন্য তাদেরকে সচেতন করে তোলা।
বর্তমান অবস্থায় ইসলামী দাওয়াত ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে এর অনুসারীদেরকে নির্ভীক ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। সচেতনতার সাথে দায়িত্ব পালনে অগ্রনী ভূমিকা রাখতে হবে। এ দায়িত্ব পালনের সংগ্রামে রাসূল (সা.)-এর এ বাণীকে মনে রাখতে হবে। তিনি বলেন- আল্লাহ সে ব্যক্তির উপর রহম করুন, যে তার প্রান্তসীমা চিনেছে এবং সেখানে গিয়ে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছে।
📄 দা'য়ীর জীবনে বড় বড় বাঁক বা মোড়
জীবন যুদ্ধে ঘাত-প্রতিঘাত রয়েছে, রয়েছে বড় বড় বাঁক বা মোড়। আল্লাহর পথে দায়ীদেরকেও এসব বাঁধা বা বাঁক মাড়িয়ে এগুতে হবে। ইসলামের পথে কর্মরত ভাইয়েরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের জীবনেও সুখ-স্বাচ্ছন্দ, লাভ-লোকসান হিসাব মিলাতে গিয়ে আসে নানা বাঁক বা বাঁধা।
বাস্তবে অনেক দা'য়ী ব্যক্তিগত লোভ লালসার জন্য জীবন সঙ্গিনী চয়নে এমন একজন সাথী বাছাই করে, যে দাওয়াতের ক্ষেত্রে সহায়ক হয় না। এটা সুখের চেয়ে দুঃখই বেশি বয়ে আনে। কর্ম জীবনে প্রবেশ করে সে বিরাট হোঁচট খায়। তারা শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে দূরে সরে যায়। জীবন প্রবাহের গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেয়।
দা'য়ীর সমাজ যেহেতু জাহেলিয়াতের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়, এজন্য অনেক সময় দা'য়ী সমাজের প্রচলিত ভাবধারার সাথে তার প্রভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে না। সে কলুষিত হয়ে পড়ে। এ বিষয়টিকে একটু ব্যাখ্যা করে বলতে চাই-
১ম বাঁক-স্ত্রী
স্ত্রী দা'য়ীর জীবনে, সমস্ত মানুষের জীবনে এক বিরাট ভূমিকা রাখে। সে যেমন নেয়ামতের উৎস হতে পারে, তেমনি আবার হতে পারে দুর্ভাগ্যের উৎস। দা'য়ীর • দাওয়াতের ক্ষেত্রেও এই দুই ধরণেরই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। অনেক দা'য়ীর বিবাহত্তোর জীবনে আরো সুন্দরভাবে ইসলাম প্রভাব ফেলেছে। তারা ইসলামের সঠিক পথে অগ্রসর হয়েছে। তাদের ইসলামের খেদমত আরো বেগবান হয়েছে। আবার অনেকেরই বিবাহত্তোর জীবনে চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে। ইসলামের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা কমেছে। এমনকি অনেকে দাওয়াতের পথ থেকে সরে গেছেন।
নিঃসন্দেহে বলা যায় এই ফলাফলের পিছনেও কার্যকারণ রয়েছে, যারা দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থ হয়েছেন, তারা বিবাহের ক্ষেত্রে ইসলামী শর্ত শরায়েত এবং বিধি- বিধানের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন নাই। যার ফলে যা হবার তাই হয়েছে..। তারা পরবর্তীতে আফসোস করেছেন কিন্তু যা হওয়ার তা তো ঘটেই গেছে।
ইসলাম 'দাম্পত্য জীবনকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার কতিপয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। আমরা সেগুলো এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
সঠিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ
ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনি বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং বিবাহকে দ্বীনের পূর্ণতা হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূল (স.) বলেছেন- যে ব্যক্তিকে আল্লাহ সৎ স্ত্রী দান করলেন, তাকে অবশ্যই দ্বীনের অর্ধেক রক্ষা করায় সহায়তা করলেন। সুতরাং সে যেনো বাকী অর্ধেককে রক্ষা করার জন্য আল্লাহকে ভয় করে চলে।
বায়হাকীর অপর বর্ণনায় রাসূল (স.) বলেছেন, যখন বান্দা বিবাহ করে তখন তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণতা পায়, সুতরাং সে যেন বাকী অর্ধেক পূরণ করার জন্য আল্লাহকে ভয় করে চলে।
ইসলাম বিবাহ ব্যবস্থাকে নফসকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য এবং একে আল্লাহর আনুগত্যের পথে চরিত্র নিস্কলুষ রাখার জন্য এক বিশেষ কার্যকারণ হিসেবে গণ্য করেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন- হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যাদের সামর্থ রয়েছে, তারা যেন বিয়ে করে। আর বিয়ে করার সামর্থ না থাকলে রোযা রাখে। কেননা এটাই তার জন্য ঢাল স্বরূপ.।
বিশিষ্ট দার্শনিক প্লেটো বলেন- মানুষ সর্বদা ভীতি, অতৃপ্তিতে ভুগে থাকে, যেনো তার মাঝে একটি অংশ নেই। যখন তার বিবাহ দেওয়া হয় তখন সে তার হারানো অংশটিকে ফিরে পায় এবং তার মধ্যে পূর্ণতা, তৃপ্তি এবং স্থিরতা ফিরে আসে।
রাসূল (স.) বলেছেন- তিন প্রকার লোককে সাহায্য করা আল্লাহর উপর আবশ্যকীয় হয়ে যায়। আল্লাহর পথে যুদ্ধরত যোদ্ধা, চুক্তিবদ্ধ গোলাম, যে স্বাধীন হতে চায় এবং যে ব্যক্তি চরিত্র নিস্কলুষ রাখার জন্য বিবাহ করতে চায়।
ইসলামে বিবাহের একটি বিশেষ লক্ষ্য হল- নিরাপদ পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলা, আর এ ক্ষেত্রে প্রথম ভিত্তি হচ্ছে, বিবাহ। এই ভিত্তি যদি সঠিক হয় তাহলে এর ভবনও সঠিক হবে বলে আশা করা যায়। এ বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য করে মুমিনদের মনের আকুতি মিনতিকে কুরআন মাজীদে এভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যারা বলে হে আমাদের প্রভু, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন- যারা আমাদের চক্ষু জুড়াবে আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। (সূরা আল ফুরকান : ৭৪)
কিন্তু বিবাহের উদ্দেশ্য যদি শুধু মাত্র যৌন চাহিদা মিটানোই হয় তাহলে তাদের কাছে যৌনতা ছাড়া দয়া, মায়া, মহব্বত, ভালবাসা ও স্নেহের কিছুই আশা করা যায় না।
সঠিক সাথী নির্বাচন
ইসলাম সঠিক সাথী নির্বাচনের জন্য বিশেষভাবে তাগাদা দিয়েছে। যদি মহিলার মধ্যে পাওয়া যায়- ভালো মন ও মানসিকতা, তাহলে সেতো সবচেয়ে ভালো মহিলা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী মোতাবেক "মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে সেই মহিলা, যার দিকে তার স্বামী দৃষ্টি দিলে সে আনন্দিত হবে আর যদি তাকে কোন কাজের আদেশ দেয়, তাহলে সে তার আনুগত্য করবে এবং যখন সে তার থেকে অনুপস্থিত থাকবে তখন সে তার ধন-সম্পদ, নিজের নফস এবং টাকা-পয়সার হেফাযত করবে।
সুতরাং আমার ভাইদেরকে লক্ষ্য রাখতে হবে, ইসলাম কিভাবে শয়তান থেকে বাঁচার ব্যাপারে আমাদেরকে পথের নির্দেশনা দিয়েছে। টাকার-পয়সার পূর্বে স্বভাব-চরিত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং মহান আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের অবিবাহিতদেরকে এবং তোমাদের সৎ দাস-দাসীদেরকে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। যদি তারা দরিদ্রও হয়, আল্লাহ তাদেরকে তার করুণা দিয়ে সম্পদশালী করে দিবেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ বাণীকেও সামনে রাখতে হবে, তিনি বলেছেন- কেউ যদি কোন মহিলাকে সম্মান প্রতিপত্তি লাভের জন্য বিয়ে করে, তাহলে আল্লাহ তার অপমান বাড়িয়ে দিবেন আর কোন মহিলাকে যদি টাকা পয়সার লোভে বিয়ে কওে, তাহলে আল্লাহ তাকে অধিকতর দরিদ্র করে দিবেন এবং কেউ যদি আভিজাত্য লাভের জন্য বিয়ে করে কোন মহিলাকে তাহলে সে আরো বেশি লাঞ্ছিত হবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি নিজের চক্ষুকে সংযত করতে, লজ্জাস্থান হেফাযত করতে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে তাহলে আল্লাহ তাদের উভয়ের মধ্যে কল্যাণ ও বরকত দান করবেন।
বাড়াবাড়ি বা শৈথল্য কোনটাই নয়
ইসলাম মানুষকে তার যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য বিভিন্ন ভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছে। সে যেন তার যৌন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিবেক-বুদ্ধি না হারিয়ে ফেলে। সে যেন প্রবৃত্তির দাসে পরিণত না হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- মহিলারা হলো শয়তানের ফাঁদ। যদি কামনা-বাসনা মহিলাদের প্রতি না থাকতো তাহলে তারা পুরুষদের উপর ছড়ি-ঘুরাতে পারতো না।
ইব্রাহীম ইবনে আদহাম (র.) সত্যি বলেছেন, যারা নারীদের দুই রানের মধ্যে নিজেদেরকে সপে দিয়েছেন, সেতো আর 'বেঁচে নাই। অর্থাৎ তার দ্বারাতে ভালো কিছু আশা করা যায় না। স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অবশ্যই সময় ও স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোন ভাবেই যেন মধ্যম পন্থার অতিক্রম না হয়। ড. জি মাইলাং বলেন, যৌন মিলনের সময় কখনও কখনও হৃদকম্পন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। রক্তের চাপও সে সময় বেড়ে যায়। এজন্য অবশ্যই নিজেকে নিজের উপর কন্ট্রোল রাখতে হবে। একজন মানুষের জীবনে কোন ক্রমেই যেন যৌনতা প্রাধান্য না পায়। আর ইসলাম এই কারণেই সর্বক্ষেত্রে এমনকি হালাল কাজেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে
স্বামীর ব্যক্তিত্বই হলো মূল ভিত্তি
ইসলাম পুরুষকে নারীর সাথে আচরণ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখার জন্য দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ইমাম গাজ্জালী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইয়াহিয়া উলুমে' বলেন, মেয়েদের মন তোমার মনের মতই, যদি তাকে লাগাম ছাড়া করে দাও তাহলে সে মুক্ত বিহঙ্গের মত ছুটে বেড়াবে। আর যদি তাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে দাও তাহলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর যদি তাকে তুমি কোন কোন ক্ষেত্রে সুযোগ দাও, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তার উপরে কঠোর হও তাহলে সত্যিকার অর্থে তার উপরে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে। পুরুষের ব্যক্তিত্ব দাম্পত্য জীবনে অবশ্যই বিরাট ভূমিকা রাখে। সে যদি আদর্শবান হয়, সুখ-দুখে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়, নিজেদের সমস্যা-সমাধানে অগ্রনী ভূমিকা রাখে তাহলে সুখের সংসার গড়তে পারবে। পক্ষান্তরে যদি ভয় ভীতি, জবর-দস্তি কিংবা লাগামহীন হয় তাহলে সংসারে অশান্তি নেমে আসে। পুরুষকে খেয়াল রাখতে হবে সে যেন স্ত্রীর আজ্ঞাবহ না হয়ে যায়। সে যদি এরকম হয়ে যায় তাহলে সে তার দাম্পত্য জীবনকেই প্রকারান্তরে স্ত্রীর খেয়াল-খুশীর উপর ছেড়ে দিলো। হাসান ইবনে আলী বলেন, যে ব্যক্তি ভালোমন্দ বাছবিচার না করে স্ত্রীর কথামতো সর্বদা চলবে আল্লাহ তার মুখ মন্ডলকে আগুন দিয়ে ঝলসে দিবেন। হযরত ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মহিলাদের মতের বিরোধীতা করিও, কারণ তাদের বিরোধীতাতেই কল্যাণ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্ত্রীর গোলাম ধ্বংস হউক।
মোদ্দাকথা হলো, স্বামীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাঁধা হলো বিশেষ করে একজন দা'য়ীর জীবনে স্ত্রী। এই স্ত্রী তাকে যেমন দাওয়াতের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে আবার স্ত্রী তাকে দ্বীনের দাওয়াত থেকে ইসলামের পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রকৃত কথা হলো, দায়ীর দাম্পত্য জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান সমস্যাবলীকে চিহ্নিত করে তার সমাধান না করার কারণে। অনেকেই যৌবনের তাড়নায় বা দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকে এ বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেন না, চিন্তাও করেন না, যার ফলে পরবর্তীতে তিনি আর সঠিক পথে ফিরে যেতে পারেন না। এজন্য বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।
২য় বাঁক- দুনিয়া
পূর্বেই আমি আলোচনা করেছি যে, একজন দা'য়ীর জীবনে বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা আসবেই যদি না তিনি এ ব্যাপারে প্রতিষেধক বা বাঁচার পথ গ্রহণ না করেন। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে তিনি কি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজেকে গণ্য করবেন নাকি সমস্যা সমাধান করে দা'য়ীর ভূমিকা পালন করবেন?
দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গি
ইসলাম দুনিয়াকে পরীক্ষাগার এবং অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মনে করে। এজন্যই একে আবাদ করা এ থেকে কল্যাণ পাওয়া এবং এর ফল চয়ন করতে ইসলাম আহ্বান করেছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। দুনিয়াকেই জীবনের একেবারে মূল লক্ষ্য যেমন করা যাবে না। তেমনি দুনিয়া বিমুখও হওয়া যাবে না। এজন্য কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে এভাবে, এ দুনিয়া'তো ভোগের বস্তু আর পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাসস্থল। অন্যত্র বলা হয়েছে, এ দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকা ও প্রতারণায় না ফেলে।
বিপর্যয়ের কারণসমূহ
একজন দা'য়ীর জীবনে মূলত দুটি প্রধান কারণে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় (১) সঠিক ইসলামী পরিবেশের অভাব যা তাকে সমাজের বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা ও কলুষতা থেকে রক্ষা করবে। (২) দায়ীদের বাস্তবমুখী চিন্তাধারা বা সমাজ গবেষণাকে গুরুত্ব না দেয়া। এজন্য অনেক দা'য়ীকে দেখা যায়, নিজের জীবনে লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই গতানুগতিক ভাবেই দুনিয়ার জীবনে নিজেকে চালিয়ে নিচ্ছে। এজন্য কবিতায় বলা হয়েছে-
হে মানুষকে উপদেশ দানকারী, তুমিতো তাদেরকে অভিযোগ করো এমন বিষয়ে যে কাজে তুমি নিজেই লিপ্ত আছো। তুমিতো উপদেশ দাও অনেক বিপদ সম্পর্কে অথচ তুমি সেসব বিপদেই পতিত।
তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করছো, অথচ তুমিই দুনিয়া নিয়ে মাতোয়ারা।
আমরা অনেক একনিষ্ঠ মুখলেস দায়ীকে দেখেছি যারা দুনিয়ার জীবনকে পরিত্যাগ করে খাঁটি ইসলামী দাওয়াত দিতে গিয়ে অনেক বড় দায়ীর ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দুনিয়া নিয়ে এমন ভাবে মেতেছেন যে, একেবারেই দাওয়াত থেকে ছিটকে পড়েছেন। দুনিয়ার জীবন নিয়ে মত্ত হয়ে পরকালকে ভুলে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন- যে বিরুদ্ধাচরণ করলো এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিল তার শেষ ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে, তাঁর রবের অবস্থান কে ভয় করলো এবং নিজের জীবনকে কু-প্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখলো তার ঠিকানা হবে জান্নাতে।
ইসলামে গঠনপ্রক্রিয়া
মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য দুটি পথ খোলা রয়েছে, যেন সে মানবতার পূর্ণতায় পৌঁছতে পারে। তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুধাবন করে নিজেকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
প্রথমতঃ তার সামনে আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থানকে বর্ণনা করা হয়েছে, তুলে ধরা হয়েছে আল্লাহর কাছে পরকালের তুলনায় দুনিয়ার অবস্থান এবং এর মাঝে যোজন যোজন পার্থক্যের কথা এবং দুনিয়ার ফিৎনার কথা। “বলুন, দুনিয়ার উপকরণ পরকালের তুলনায় অত্যন্ত স্বল্প আর পরকাল হচ্ছে উত্তম মুত্তাকীদের জন্য।” এব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ার বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য যেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাহলো, তিনি একদিন তার সাহাবীদেরকে নিয়ে পথ চলছিলেন, দেখলেন একটা মরা ছাগল পড়ে আছে। তিনি বললেন, তোমরা কি লক্ষ্য করেছো এটি তার মালিকের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তারা বললেন, আর এজন্যই তাকে রাস্তার ধারে ফেলে দিয়েছে। তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে এই দুনিয়া এই মরা ছাগলের চাইতেও মূল্যহীন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) একদিন তাকে বলেন, আবু হুরায়রা তোমাকে কি আমি এই দুনিয়ার আল্লাহর নিকট কত মর্যাদা তাকি দেখিয়ে দিবনা? আমি বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল (সা.) তার হাত ধরে তাকে মদিনার উপকণ্ঠে এক ময়লা ফেলার আবর্জনার কাছে নিয়ে গেলেন, সেখানে দেখা গেল বিভিন্ন হাড়-গোড়, ছেড়া কাপড়-চোপড়, ময়লা আবর্জনা পড়ে আছে। অতপর তিনি বললেন, এই হাড়-গোড় আজকে এখানে পড়ে আছে এর কোন মূল্য নাই। যারা দুনিয়ার পিছনে ছুটেছে সেই দুনিয়ার মূল্য এই সব নোংরা আবর্জনার মতই। কেউ যদি দুনিয়া নিয়ে কাঁদতে চাও, তাহলে কাঁদো। এ কথা শুনে জোরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম।
দ্বিতীয়তঃ ইসলাম দুনিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে নিষেধ করেছে। দুনিয়া যেন মানুষের কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত না হয় তার জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রকে ভয় পাইনা, কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে তোমাদের জন্য দুনিয়াকে খুলে দেয়া হবে, তোমরা দুনিয়া নিয়ে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির মতো দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। তাদেরকে যেমন দুনিয়া প্রীতি ধ্বংস করেছিল তেমনি তোমাদেরকেও ধ্বংস করে দিবে। কারণ দুনিয়া প্রীতি লোভ-লালসা ও আত্ম-প্রীতি সৃষ্টি করে। তিনি বলেছেন, দুনিয়া পাওয়াই যার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে, আল্লাহ তাঁর অন্তরে চারটি বিষয় অপরিহার্য করে দিবেন। এ থেকে সে মুক্ত হতে পারবে না। তার আশা- আকাংখার কোন শেষ হবে না। সে সব সময় কাজে লেগে থাকবে সামান্যতম ফুরসত পাবে না। আর তার মনে সব সময় চাওয়া-পাওয়ার আকাংখা থাকবে সে কখনও পরিতৃপ্ত হবে না। আর তাঁর টাকা-পয়সার অভাব অনটন মনে হয় কোন সময় দূর হবে না।
তৃতীয়তঃ ইসলাম সতর্ক করেছে দুনিয়া প্রীতি আমাদের অন্তরে চেপে না বসে যা তাকে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে বাধাগ্রস্ত করবে। এ জন্য দুনিয়া থেকে পরহেজ করে চলতে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং নফসকে এর কাছে বন্দী না করতে বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলন, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবাসবে এবং তাকে নিয়ে খুশী থাকবে তার অন্তঃকরণ থেকে পরকালের ভয় বিদূরিত হয়ে যাবে।”।
দুনিয়ার পরহেজগারীর ব্যাপারে ইসলামের দর্শন হল- তা যেন মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় এবং দুনিয়ার প্রতিষ্ঠা পরিত্যাগ না করায় যেমনটি কিছু কিছু মানুষ মনে করে থাকে। বরং উদ্দেশ্য হল নফসকে দুনিয়া পূজা থেকে হেফাজত করা। নবী করীম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল প্রকৃত পরহেজগারী সম্পর্কে। তিনি বলেন, সেটি হালালকে হারাম করা নয় এবং ধন-সম্পদকে বিনষ্ট করাও নয়। বরং দুনিয়ার পরহেজগারী হল তোমার নিকট আল্লাহর দেয়া জিনিস নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট থাকবে।" ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করা হয়, একজন মানুষ পরহজেগার হবে আর তার নিকট এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাও থাকবে এটি কি হতে পারে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল- পরহেজগারীর নিদর্শন কি? তিনি বললেন, এর আলামত হল- যদি সম্পদ প্রয়োজনের চেয়ে বেশী হয়, তাহলেও প্রফুল্য হবে না। আর এ চেয়ে কমে গেলে সে চিন্তিত হবে না....। আজকে দা'য়ীরা এক বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। তাদেরকে দুনিয়া আস্তে আস্তে নীচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কামনা-বাসনার পিছনে ছুটতে গিয়ে প্রথমে সগীরায় লিপ্ত হচ্ছে এরপর কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়ছে। এই দুনিয়া তার চাকচিক্য দিয়ে সবাইকে বিভান্ত করছে এজন্য এব্যাপারে কোনরকম শৈথিল্য দেখানো যাবে না। যে ব্যক্তি শৈথল্য দেখাবে তার ঈমান বিনষ্ট হয়ে যাবে, ঈমান কলুষিত হয়ে যাবে। নবী মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (সা.) অতিসত্যকথা এভাবে বলেছেন- "আমার পরে তোমাদের নিকট দুনিয়া এমনভাবে আসবে যে তোমাদের ঈমানকে খেয়ে ফেলবে যেমন আগুন লাকড়িকে খেয়ে ফেলে।"
সুতরাং দা'য়ীকে আকাশের আযাবের চাবুক থেকে বাঁচতে হলে, তাকে জীবনের বাঁকগুলো সতর্কতার সাথে পেরুতে হবে। "যারা দুনিয়ার জীবনকে পরকালের বিনিময়ে ক্রয় করে নেয় তাদের জন্য পরকালের আযাব সামান্যতম হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে কোনরকম সাহায্যও করা হবে না।" (সূরা বাকারা: ৮৭)
চতুর্থতঃ ইসলাম উৎসাহিত করেছে যেন দুনিয়া আবাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয় এতে কাজ করা, এর গুপ্তধন আবিস্কার করা, এর সম্পদ আহরণ করা, এর কল্যাণ থেকে উপকৃত হওয়া, এতে ইনসাফ কায়েম করা, সত্যের অনুসরণ করা। ইসলামের দৃষ্টিতে তার কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই যে এই মাপকাঠির বাইরে চলেছে সে যত জ্ঞানীই হোক না কেন। কারণ, তা অবশ্য এই দুনিয়া ধ্বংস করার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কুরআন মজীদে এ বিষয়টিকে অতি চমৎকার ভাবে বিবৃত করা হয়েছে-
"যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনের চাকচিক্যকে ভালবাসবে তাকে তার কাজ পুরাপুরিই দেয়া হবে, এতে সামান্যতম ঘাটতি করা হবে না। এরা হল সেসব লোক যাদের পরকালে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নাই। তারা যা করেছে তা সবই বাতিল এবং তাদের সব কর্মই বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (সূরা হুদ: ১৫)
ইসলামে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ
ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তি গঠনের থিউরী দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং বাস্তবে এর রূপরেখা প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক কর্মনীতি ও বাস্তব প্রয়োগ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। যদি কেউ রাসূলের যুগে ব্যক্তি গঠনের বাস্তব নমুনার দিকে নজর দেয় তাহলে সে দেখতে পাবে এব্যাপারে তারবিয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি। রাসূল (সা.) মক্কায় দারুল আরকামে শুধুমাত্র তাঁর অনুসারীদেরকে ইসলামী দীন ও দাওয়াতের শিক্ষাই দেননি বরং তাদেরকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিলেন যেন জাহেলী সমাজের সাথে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের কৃষ্টিকালচার থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার বিভিন্ন অঙ্গনে প্রচলিত জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আর এর আগাগোড়া উদ্দেশ্যই হল আল্লাহর জীনের তাঁর ইবাদত কায়েম করা এবং তাঁর বিধানের নিকট মাথা নত করা, তাঁর নির্দেশের বাস্তবায়ন করা। তাঁদের চোখে দুনিয়া একেবারেই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। দুনিয়ার কোন কিছুই তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি এর ফিতনা-ফাসাদ। তাঁদের শত্রুরা পর্যন্ত তাদেরকে এভাবে চিত্রিত করে, "এরা মৃত্যুপাগল জাতি, এদের নিকট দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে মৃত্যু শ্রেয়। এরা দুনিয়াবিমুখ। এরা মাটির উপরে বসে আর সওয়ারীর ওপর বসেই খাওয়া-দাওয়া সারে।"
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন ধনীর দুলাল, মায়ের একমাত্র সন্তান। মক্কার প্রত্যেকটি মেয়েই তাকে জীবন সাথী হিসেবে কামনা করত। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তার মা তাকে হুমকি দেন যে তাকে তিনি ধন-সম্পদ থেকে বঞ্চিত করবেন। তিনি এতে কোন ভ্রুক্ষেপই করেন নি। এরপর তার মা কসম করেন যে, সে ইসলাম ত্যাগ না করলে কোন খানাপিনা স্পর্শ করবেন না। এতে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, "আল্লাহর শপথ, হে আমার 'সাম্মা'! যদি আপনার শরীরে একশটি প্রাণ থাকত আর একটি করে তা বের হয়ে যায় তবুও আমি মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করব না।” যারা তাকে চিনত তারা দেখল যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি মক্কার অলি-গলিতে যখন হাঁটতেন তখন তার গায়ে থাকত পুরাতন জরাজীর্ণ কাপড়।
হিজরত ছিল মুসলমানদের ব্যক্তি গঠনে বাস্তবিক এক কর্মপন্থা। এতে তাদের সহায়-সম্পত্তি সবকিছু ত্যাগ করে, নিজ দেশ ছেড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে, আত্মীয়-স্বজন পরিত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান বিদেশ- বিভুয়ে। তারা হিজরতে সাড়া দিয়ে আল্লাহর পথে সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে, সবস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন।
বর্ণিত আছে- যখন সুহাইব আর-রুমী (রা.) হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন তখন মক্কার কুরাইশরা তার পথ রোধ করে দাঁড়ায় এবং বলে, তুমিতো এখানে এসেছিলে খালি হাতে, আজ তুমি আমাদের বদৌলতে অনেক টাকাপয়সার মালিক হয়েছ, এখন তুমি টাকাপয়সা নিয়ে ও তোমার প্রাণ নিয়ে আমাদের এখান থেকে যাবে তা হতে দিব না। তখন সুহাইব আর-রুমী বলেন, যদি আমি আমার টাকা পয়সা তোমাদের হাতে তুলে দেই তাহলে কি তোমরা আমার পথ ছেড়ে দিবে? তারা বলল, হ্যা। তিনি বলেন, আমি আমার টাকা পয়সা সব তোমাদের হাতে ছেড়ে দিলাম। একথা যখন রাসূল (সা.) জানতে পারলেন তখন তিনি বললেন, "সুহাইব লাভবান হয়েছে, সুহাইব লাভবান হয়েছে।"
এভাবেই দা'য়ীদের জীবনে ইসলাম গেড়ে বসেছে, তাদের দৈনিন্দন জীবনে, তাদের উঠাবসা ও চলাফেরায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। আর এসবই তাদেরকে তাদের জীবনের বাঁকগুলো অতিক্রম করতে সহায়তা করেছে, বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গাতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
আজকে ইসলামী দাওয়াত ও অন্দোলনের দা'য়ীদের বাস্তব কর্মনীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। তারা যেন তাদের জীবনের দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলেন, তারা নিজেদেরকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মুকাবিলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখেন প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগান..... "যারা আমাদের জন্য প্রাণপন সংগ্রাম করবে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের দিশা দিব এবং নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সাথে রয়েছেন।" (সূরা আনকাবুত : ৬৯)
📄 দাওয়াতী কার্যক্রম বুঝা ও বাস্তবায়ন করা
... আমার মতে নিজের উপর একজন দা'য়ীর দায়িত্ব অনেক বেশী, সমাজের ওপর তার যে দায়িত্ব রয়েছে তার চেয়েও অনেক অনেক বেশী ....। দা'য়ীর নিজের ব্যাপারে শৈথিল্য দেখানো খুবই বিপজ্জনক, এই বিপজ্জনকতা তার জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখানোর চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশী। দা'য়ীকে অবশ্যই সমাজে কুদওয়া বা অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে যেখানে সে বসবাস করছে ... সে নিজের জীবনেই বাস্তবায়ন করবে রেসালাতের বৈশিষ্ট্য যার দিকে সে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছে।.. তার প্রতিটি পদক্ষেপে সে তার আদর্শের প্রতিফলন ঘটাবে... এরফলে তার আশে-পাশে ববাসরত লোকজন তার চালচলনের মাঝে দেখতে পাবে দীনকে, তার প্রতিটি অঙ্গ পরিচালনায় ফুটে উঠবে দীনের বৈশিষ্ট, তার মাঝে যেন কোন বৈপরিত্য পরিলক্ষিত না হয়। কুরআনুল কারীম সেসব লোককে তিরস্কৃত করেছে যারা মানুষকে উপদেশ দেয় অথচ সে নিজে তা গ্রহণ করে না, লোকজনকে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলে অথচ সে নিজে বিরত থাকে না। "তোমরা কি মানুষকে নেক কাজের আদেশ দাও আর নিজেদেরকে এব্যাপারে ভুলে যাও? তোমরাতো কিতাব পাঠ কর, তোমরা কি বিষয়টি বুঝ না?” (সূরা বাকারা : ৪৪)
"হে ঈমানদারগণ! কেন তোমরা বল সেসব কথা যা তোমরা কর না। আল্লাহর নিকট জঘন্যতম গুনাহের কাজ হল যা তোমরা বল, অথচ তা কর না।" (সূরা সফ : ২) এজন্য দা'য়ীর প্রথম কাজ হল প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করা....। সঠিক ধারণা ... ইসলামকে সঠিকভাবে, গভীরভাবে জানতে হবে তার মূল উৎস থেকে... কুরআনে কারীম, সহীহ হাদীস এবং নবীর পবিত্র সীরাত থেকে ... এরপর বর্তমান ইসলামী সাহিত্যের বই-পুস্তকের ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে যেন তার নিকট ইসলামের সঠিক চিত্র ফুটে উঠে, এর বিধি-বিধান, বৈশিষ্ট্য, আকিদা-ইবাদত সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করে, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সক্ষম হয়। .... দা'য়ীকে নবী-রাসূলদের জীবনী সম্পর্কে, তাদের জীবনের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে অবহিত হতে হবে, তাদের ধৈর্য এবং বলিষ্ঠতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা লাভ করতে হবে। তাদের জিহাদ, মুয়ামালাত, চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।
কুরআনের প্রতি তার বিশেষ গুরুত্ব থাকবে এভাবেঃ সেটি হবে তার অন্তরের বসন্ত কাল, তার দৃষ্টিশক্তির জন্য নূর এবং জীবনচলার কর্মসূচি... কুরআনের আয়াত পাঠকালে তার মনে হবে যেন এখনই তার ওপর ওহী নাযিল হচ্ছে এবং তাকে উদ্দেশ্য করেই ... তাকেই সম্বোধন করা হচ্ছে.... এভাবেই এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে এর গভীরে পৌঁছা সম্ভব হবে, এর দ্বারা প্রকৃত ফায়েদা হাসিল হবে।
একজন দা'য়ীর অন্তঃকরণ ততটুকুই সঠিক হবে এবং তারমধ্যে দৃঢ়তা আসবে, তার জীবনচলা সঠিক হবে যে পরিমাণ সে কুরআন অধ্যয়ন করবে এর গভীরতায় পৌছবে, দীনের প্রজ্ঞা তার মাঝে আসবে। নবী করীম (সা.) একথাটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর বাণীতেঃ "আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের সঠিক সমঝ দান করেন।" তিনি আরো বলেন, "মানুষ হল খনির মত, জাহেলিয়াতে যারা উত্তম, ইসলামেও তারা উত্তম যদি সঠিকভাবে (ইসলাম) বুঝে থাকে।" ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ হল বৃষ্টি ভেজা মাটির মত .... এরমধ্যে কিছু এমন আছে যা না কোন উপকারে আসে আর না কোন উপকারে লাগে।
রাসূল (সা.) এর একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন এভাবে- "আমাকে আল্লাহ যে হেদায়েত ও জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হল- মুষলধারে বৃষ্টির মত যা জমিনে বর্ষিত হয়। এরমধ্যে আছে সরস জমি যা পানি গ্রহণ করে, যা থেকে প্রচুর ঘাস-পালা ও ফসল উৎপন্ন হয়।... আর কিছু হল ডোবা যা পানি ধারণ করে, আল্লাহ তা থেকে মানুষকে উপকৃত করেন, এর পানি পান করে, পানি দিয়ে ফসল ফলায়, আর কিছু আছে শুষ্কভূমি যা পানিও ধারণ করে না আর তাতে কোন কিছু উৎপন্নও হয় না। এ হল তার উদাহরণ যে আল্লাহর দীনের সমঝ পেল, আমি যা নিয়ে এসেছি তা থেকে নিজে উপকৃত হল, নিজে শিখল অন্যকে শিখালো ... আর কতক এমনও আছে যে, মাথা তুলে চাইল না, আল্লাহর হেদায়েত যা আমি নিয়ে এসেছি গ্রহণ করল না।"
দা'য়ীকে সচেষ্ট হতে হবে যেন সে অল্প বয়স থেকেই ইসলাম শিক্ষার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করে, বিভিন্ন ব্যস্ততার সাথে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই জ্ঞান আহরনে লিপ্ত হয়। মুলাহ্হাব এর প্রতি আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হোন, যিনি তার সন্তানদেরকে উপদেশ দেন এই বলে, "তোমরা সমাজের নেতৃত্ব দেয়ার পূর্বেই জ্ঞানার্জন করে নাও। নেতৃত্ব যেন তোমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।”
জ্ঞানার্জন ও তার বাস্তব প্রয়োগ
একজন দা'য়ীর যেমন সঠিক জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, তাকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে হবে, তেমনিভাবে তাকে এর বাস্তব প্রয়োগ ও প্র্যাকটিস করতে হবে, নিজের কাজকর্মে, চরিত্রে-চিন্তায়, সে যেন বাস্তবে ইসলামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলে...।
দা'য়ী যেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে ইসলামকে ফুটিয়ে তুলে... জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে, কথায়, কাজে, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সর্বত্র। বাড়ীতে স্বামী বা পিতা বা ভাই হিসেবে, সমাজে কর্মচারী বা মালিক কিংবা অফিসার হিসেবে। এ বিষয়টির প্রতি জোর দিয়ে আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বলেন, "যে ব্যক্তি নিজেকে নেতার আসনে বসিয়েছে সে যেন অন্যকে শিক্ষা দেয়ার পূর্বে নিজে শিক্ষা নেয়, নিজের চাল-চলনকে পরিশুদ্ধ করে নিজের জিহ্বাকে পরিশুদ্ধ করার পূর্বেই। অন্যকে পরিশুদ্ধ করা ও শিক্ষাদানের বেলায় অবশ্যই নিজেকে সার্বগ্রে পরিশুদ্ধ করতে হবে।"
যারা নিজেরা উপদেশ গ্রহণ করে না অথচ অন্যকে উপদেশ দেয়, নিজেরা সঠিক পথে চলেনা কিন্তু অন্যকে ওয়াজ করে, এরাতো মানুষের নিকট হাসি-ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত হয় আর মহান আল্লাহর ক্রোধ ও গযবে নিপতিত হয়। আর এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ও মহা ক্ষতি। শা'আবী থেকে বর্ণিতঃ "কিয়ামতের দিন একদল জান্নাতী :কদল জাহান্নামীর দিকে চেয়ে বলবে, তোমাদেরকে কি জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে? আমরাতো তোমাদের দেয়া শিক্ষা ও আদব- কায়দার সুবাদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পেরেছি! তখন তারা বলবে, আমরা তোমাদেরকে ভালর নির্দেশ দিতাম কিন্তু আমরা নিজেরা তা করতাম না। আর তোমাদেরকে মন্দ কাজের নিষেধ করতাম আর আমরা সেটা নিজেরা করতাম।”
এজন্য একজন দা'য়ীকে নিজের ব্যাপারে কঠিন হিসাব-নিকাশ করতে হবে। নিজেদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন মহান আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে পারে। বর্ণিত আছে যে, মহান আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে বলেন, "হে মরিয়ম তনয়! তুমি নিজের নফসকে উপদেশ দাও, তুমি সর্বাগ্রে নিজে উপদেশ গ্রহণ কর, এরপর তুমি মানুষকে উপদেশ দিও, নতুবা তুমি আমার নিকট লজ্জিত হবে।"
প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার মাঝে
দা'য়ীকে অবশ্যই সদা তৎপর থাকতে হবে নিজের গোপনীয় বিষয়গুলিকে সঠিক রাখার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিষয়কে সঠিক রাখার চেয়েও। তার অবিরত চেষ্টা থাকবে গোপনীয় বিষয়কে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য। আর সবচেয়ে ভাল হয় যদি এ দু'টি বিষয়ই পরিচ্ছন্ন থাকে। দা'য়ী নিজের ব্যাপারে সদা তৎপর থাকে। সে যেন নিজেকে ধোকা না দেয়, মানুষকে ধোঁকা না দেয়। সে যেন তাদের সাথে মুনাফেকীর আচরণ না করে, রিয়া না করে। প্রত্যেক দা'য়ী যেন এব্যাপারে শুনে নেয় প্রখ্যাত দা'য়ী ইবনে সাম্মাকের বাণী। তিনি বলেন, "অনেক লোক রয়েছে যারা মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় অথচ নিজেরা আল্লাহকে ভুলে থাকে, আল্লাহর নিকট থেকে দূরে রয়েছে। আর এমন অনেক লোক রয়েছে যে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকে অথচ সে আল্লাহ থেকে পলায়নপর, আর এমন অনেক লোক রয়েছে যে, কুরআন তিলাওয়াত করে অথচ কুরআনের আয়াত থেকে, তার নির্দেশাবলী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।"
অতএব দা'য়ীকে একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করতে হবে, মানুষকে নয়, তাঁরই উদ্দেশ্যে নিজের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়কে সঠিক ও সুন্দর করতে হবে। তার বাহিরটা যেন ফেরেশতা আর ভিতর বা অপ্রকাশ্যটা যেন শয়তান না হয়। সে যেন সতর্ক থাকে সেসব লোক থেকে যাদেরকে আল্লাহ তিরস্কৃত করেছেন তাঁর এ বাণীতেঃ "তারা মানুষের কাছ থেকে নিজেদেরকে গোপন করতে চায়, আর আল্লাহর কাছে নিজেদেরকে লুকাতে চায়না, অথচ তিনি তাদের সাথেই রয়েছেন।” (সূরা নিসা : ১০৮) তাকে স্মরণ রাখতে হবে, আল্লাহ তার অতি নিকটে, তিনি তার সবকিছুই দেখছেন এবং তার শলাপরামর্শ, কানাকানিও জানেন। "তারা তিনজনে কানাকানি করলে আল্লাহ রয়েছেন চতুর্থ হিসাবে, আর চারজন হলে আল্লাহ হচ্ছেন পঞ্চম এবং পাঁচজন হলে আল্লাহ হচ্ছেন ষষ্ঠ, এর চেয়েও কম বা বেশী হলেও তিনি তাদের সাথেই আছেন। অতপর তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন সংবাদ দিবেন যা তারা করেছিল। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবহিত।” (সূরা মুজাদালাহঃ ৭)
রাবেয়া বসরীর প্রতি আল্লাহ রহম করুন, তিনি বার বার একথা আওড়াতেন- যদি আমাকে আমার রব বলেন- তোমার লজ্জা করেনি আমার অবাধ্য হতে তুমি আমার বান্দাদের থেকে গুনাহকে লুকাতে চেষ্টা করতে অথচ করতে আমার বিরুদ্ধাচরণ তখন আমি কি জবাব দিব যখন আমার হিসাব নেওয়া হবে, আমার বিচার করা হবে?
মোদ্দাকথা হল, দা'য়ীর প্রতি তার সামাজিক দায়-দায়িত্ব যেন তাকে তার নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন না করে দেয়, লোকজনকে সঠিক ও ভাল করতে গিয়ে নিজের এবং যাদের সঠিক করা নিজের ওপর ওয়াজিব সেগুলো যেন ভুলে না যায়, সে ব্যাপারে যেন উদাসীন না হয়ে পড়ে।