📄 সভা-সমাবেশে দাওয়াত
عَنِ আইবিএন عَبَّاسٍ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا ، قَالَ : صَعِدَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الصَّفَا ذَاتَ يَوْمٍ فَقَالَ يَا صَبَاحَاهُ فَاجْتَمَعَتْ إِلَيْهِ قُرَيْشٌ قَالُوا مَا لَكَ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ الْعَدُوَّ يُصَبِّحُكُمْ ، أَوْ يُمَسِيكُمْ أَمَا كُنْتُمْ تُصَدِّقُونِي قَالُوا بَلَى قَالَ فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ فَقَالَ أَبُو لَهَبٍ تَبَّا لَكَ أَلِهِذَا جَمَعْتَنَا فَأَنْزَلَ اللهُ : {تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ} .
অর্থ. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাফা পাহাড়ে উঠলেন এবং 'ইয়া সবাহা' বলে আওয়াজ দিলেন (এটি আরবের পরিভাষা, যার অর্থ ভোরে আক্রমণকারী শত্রু থেকে সতর্ক হও)। তখন কোরাইশ গোত্রের লোকজন তাঁর নিকটে একত্রিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে তোমার? তিনি বললেন, তোমরা কি মনে কর, আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই যে শত্রু তোমাদের উপর সকাল অথবা সন্ধ্যায় আক্রমণ করবে তাহলে তোমরা কি আমাকে সত্যবাদি বলে মনে করবে? তারা বলল- অবশ্যই, তিনি বললেন আমি তোমাদেরকে আসন্ন কঠিন আজাবের বিষয়ে সর্তক করছি। আবু লাহাব বলল- তোমার ধ্বংস হউক। এ কারণেই কি তুমি আমাদেরকে এখানে একত্রিত করেছো? তখন আল্লাহ তাআলা সূরা লাহাব নযিল করলেন।
হাদিস থেকে শিক্ষা:
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের শুরুর দিকে গোপনে দাওয়াত দিতেন। আল্লাহ পাকের হুকুম হলো وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ. আপনার নিকটতম লোকদেরকে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করুন। অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াত দিন। আল্লাহ্ তায়ালা প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের হুকুম দিলেন। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সময়ের মানুষকে একত্রিত করার নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের উপর উঠে বা সাবাহাহ বলে ডাক দিলেন। মক্কার লোকেরা পাহাড়ের সামনে একত্রিত হলো। তখন তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। উল্লিখিত হাদিসে যেমনটি পড়লাম।
এখান থেকে বিশেষ ভাবে তিনটি বিষয় শিখতে পারি। ১. লোকজনকে একত্রিত করে দাওয়াত দেওয়া। ২. দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি। ৩. দায়ীর পক্ষে আল্লাহ। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদেরকে একত্রিত করেছিলেন সকলেই ছিল অমুসলিম। কেউ মুসলমান ছিল না। তাদেরকে একত্রিত করে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আমাদেরও উচিত আমরা অমুসলিমদেরকে একত্রিত করে দাওয়াত দিব। এর জন্য এই পদ্ধতিও হতে পারে, আমাদের সাধারণ ওয়াজ মাহফিল গুলোতে অমুসলিমদেরকে একত্রিত করা যেতে পারে এবং তাদের সামনে ইসলামের পরিচয় পেশ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের উপর আস্থাশীল ছিলেন। এরপর সুন্দর পদ্ধতিতে যৌক্তিক উপস্থাপনায় ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছেন। নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছেন। আমাদের এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করা উচিত। তৃতীয় বিষয় হলো, এখানে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দা'য়ী। আর কাফেররা তার মোকাবেলা করেছে। সূরা লাহাব অবতীর্ণ হয়েছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে দা'য়ীর বিরূদ্ধে যারা আসবে তার দুই অবস্থা। ১. হেদায়েত পেয়ে যাবে। নতুবা, ২. ধ্বংস হয়ে যাবে। ইতিহাস সাক্ষী যখনই কেউ দা'য়ীর বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাকে একই অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাদের দুই অবস্থার কোনো একটির মুখোমুখি হতেই হয়েছে। সমস্ত নবী দা'য়ী ছিলেন। তাদের বিরূদ্ধে যারাই এসেছে তারা হয় হেদায়েত পেয়েছে, না হয় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। উমর রা. এসেছিলেন মোকাবেলায়। তিনি হেদায়েত পেয়ে গিয়েছেন। আমাদের দেশের একটি ঘটনা পাঠকদের খেদমতে পেশ করছি।
দা'য়ীর কোনো ভয় নেই:
দাওয়াত দিতে গিয়ে আমাদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করে- ওই অমুসলিম ভাইটিকে ইসলামের দাওয়াত দিব কিনা। দাওয়াত দিলে কি যেনো বলে, সম্পর্কে ভাটা পরে কিনা, কোনো বিরোধিতা করে কিনা ইত্যাদি। বিভিন্ন ভয় ও সংশয় কাজ করে। মূলত এসব কিছুই না। দা'য়ীর কোন ভয় নেই। দা'য়ীর বিরুদ্ধে যেই আসবে, তার দুই অবস্থা। হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে, নয়তো হেদায়াত পেয়ে যাবে। ইতিহাস সাক্ষী- দুনিয়াতে আগমনকারী নবীগণ সকলেই দা'য়ী ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে যারাই এসেছে হয়তো হেদায়াত পেয়েছে, নয়তো ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপরও যুগে যুগে যারা দাওয়াতী কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে যারা এসেছে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে বা হেদায়াত পেয়ে গেছে। যেমন আমাদের দেশে শাহ জালাল রহ. এসেছিলেন দা'য়ী হয়ে। তার বিরূদ্ধে এসেছিল রাজা গৌড়গবিন্দ। সে ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাবা আদম শহীদ রহ.-এর ঘটনা:
বাবা আদম শহীদ রহ. (এখনো তার মাজার বিদ্যমান)। তিনি দা'য়ী ছিলেন। এক পর্যায়ে তৎকালীন রাজা বল্ললের ভাগিনাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন। রাজার আর সহ্য হলো না। এবার রাজা বাবা আদম শহীদ রহ.-এর সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। যুদ্ধে যাবার আগে রাজা তার পরিবারের সদস্যদের উপদেশ দিলেন যে, দেখ যুদ্ধের মধ্যে জয় পরাজয় দুটোই হতে পারে, যদি আমরা বিজয়বেশে ফিরে আসি তাহলে তো ফিরেই আসলাম। আর যদি পরাজয় বরণ করি তাহলে কাঠের স্তুপে আগুন জ্বালিয়ে গেলাম। আর পাখিটি সাথে নিয়ে গেলাম। পাখিটি যদি ফিরে আসে তাহলে বুঝবে আমরা পরাজয় বরণ করেছি। তখন তোমরা এই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরবে কিন্তু শত্রুর হাতে ধরা দিবে না। এ বলে রাজা যুদ্ধের ময়দানে চলে গেল। এবার যুদ্ধ শুরু হলো দা'য়ী ও রাজার মাঝে। রাজার তরবারি যখন বাবা আদম শহীদ রহ.-এর শরীরে আঘাত করলো, সঙ্গে সঙ্গে সাথে নিয়ে আসা পাখিটি খাঁচা থেকে বের হয়ে পাখা হাঁকিয়ে রাজ দরবারের দিকে চলল। এবার রাজা দিশেহারা হয়ে পাখির পিছনে ছুটলো। কারণ পাখি দেখার সাথে সাথে রাজ পরিবারের সকলেই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরবে। কিন্তু রাজা ব্যর্থ হলো। রাজা দরবারে পৌঁছার আগে পাখি রাজপ্রসাদে হাজির হয়ে গেল। পাখি দেখার সাথে সাথে বাদশার ফরমান অনুযায়ী সকলে এক সাথে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এবার রাজা যখন গিয়ে দেখল তার পরিবার সকলেই ধংস। নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে নিজেও তাদের সাথে গিয়ে আত্মহত্যা করল। এ ছিল দা'য়ীর মোকাবেলা আগমনকারীর ধ্বংসের উজ্জ্বল প্রমাণ। ছাড়াও আরও বহু প্রমাণ আছে বইটির কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় এখানেই শেষ করলাম।
টিকাঃ
৫৪. বুখারী-৪৭৭০।
৫৫. সুরা শুআরা-২১৪