📘 দাওয়াত সম্পর্কিত চল্লিশ হাদীস 📄 দাওয়াতী কাজ পরিত্যাগ করলে আজাব আসবে

📄 দাওয়াতী কাজ পরিত্যাগ করলে আজাব আসবে


عن حذيفة بن اليمان عن النَّبيِّ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وسلَّم قال والذي نفسي بيده لتأمُرُنَّ بالمعروف ولتنهون عن المنكر أو ليوشكن الله أن يبعث عليكم عقابًا منه ثمَّ تَدعونَهُ فلا يستجিব لكم .

অর্থ: হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে, অন্যথায় অচিরেই তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের উপর শাস্তি প্রেরণ করবেন। এমতাবস্থায় যে, তোমরা দোআ করবে কিন্তু দোয়া কবুল করা হবে না।

হাদিস থেকে শিক্ষা: উক্ত হাদীস থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি কসম খেয়ে এই কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তার অন্তরে ছিলো উম্মতের দরদ। ছিলো- মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে চিরস্থায়ী আগুন থেকে কেন বাঁচছে না-এই জ্বালা। সাধারণত কোনো বিষয়কে গুরুত্ব ও সত্য প্রমাণ করার জন্য কসম খাওয়া হয়, এখানেও আল্লাহ বলেছেন- এটাই সত্যের উপর কসম।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, এই কাজ না করলে আমাদের কী পরিণতি হতে পারে, তার আগাম বার্তাও তিনি আমাদের দিয়েছেন। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ না করলে (দাওয়াতী কাজ না করলে) অচিরেই আমাদের উপর আসবে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। তাই তো হচ্ছে। আমরা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধের কাজ ছেড়ে দিয়েছি। ফলে আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে শাস্তি ও আজাব। এ প্রসংগে পাঠকদের খেদমতে কিছু আলোচনা পেশ করতে যাচ্ছি।

আল্লাহর শাস্তি: মুসলিম জাতির দায়িত্ব ও ফরিযা হলো 'দাওয়াত'। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর বান্দাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছানো। মুসলমানরা যদি এই গুরুদায়িত্ব আদায় না করে, তাহলে তার অবস্থা কী হতে পারে, এ বিষয়ে পাঠকদের খেদমতে কিছু আলোচনা পেশ করছি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে হাকীমে মানুষের দুটি অবস্থার আলোচনা করেছেন। (১) সম্মানের অবস্থা। (২) লাঞ্ছনার অবস্থা। প্রথম অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَاللَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِرَسُولِهِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ অর্থ: ইজ্জত সম্মান তো শুধু আল্লাহর ও তাঁর রাসুল এবং মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকরা জানে না। দ্বিতীয় অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে হাকীমে বলেন- وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ . অর্থ: আর তাদের ওপর আরোপ করা হলো লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। কুরআনে কারীমে দুই প্রকার জাতির ওপর শাস্তির আলোচনা করেছেন। প্রথম প্রকার হলো- অস্বীকারকারী কাফের। অর্থাৎ যারা আল্লাহর পয়গামকে মিথ্যা বলেছে, অস্বীকার করেছে। দ্বিতীয় প্রকার হলো- আহলে কিতাবিদের মধ্যে যারা পয়গম্বরদের দাওয়াত গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে একসময় তারা নাফরমান হয়ে যায়। এই আয়াতে যাদের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে, তারা হলো ওই সব মুসলমান যাদেরকে আমরা বনী ইসরায়েল বলে চিনি। এখানে ভাববার বিষয় হলো তাদের এমন কোন্ অপরাধ ছিল, যার কারণে তাদের ওপর শাস্তি নেমে এসেছে? আমাদের পক্ষ থেকেও যদি একই অপরাধ প্রকাশ পায়, তাহলে কি আমাদেরকে এই শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়া হবে? না, কখনও না। আল্লাহর আদালতের মূলনীতি হলো একটি অপরাধের জন্য একটি শাস্তি নির্দিষ্ট। ওই অপরাধ যেই করুক তাকে ওই শান্তিই দেওয়া হবে। যেমন নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি আমার মেয়ে ফাতেমাও চুরি করে, তাহলে তারও হাত কেটে দেওয়া হবে। এখন আমরা আলোচনা করবো, কী কারণে পূর্ববর্তী লোকদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

শান্তির কারণ: আমরা দেখতে পাই, দুনিয়াতে মানুষ যখন তার উপরস্থ কর্মকর্তার অবাধ্য হয়, তখন তাকে তার অপরাধের জন্য শান্তির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। ঠিক বান্দা যখন আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো উপাসনা করে, অথবা তার অবাধ্য হয়, তখন তিনি শাস্তি দেন। আমরা কোরআনকে নিয়ে গবেষণা করলে জানতে পারব যে, আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী জাতিকে তিন কারণে শাস্তি দিয়েছেন। ১। অন্যায় কাজ থেকে বাধা না দেয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন: كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ * অর্থ: তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত। তারা যা করত তা অবশ্যই মন্দ ছিল। এই আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম, পূর্ববর্তী উম্মতেরা মানুষকে মন্দ কাজ হতে বাধা দিতো না। এবার আমরা দেখি আমরাও একই অপরাধে অপরাধী কিনা। সবচেয়ে বড় مُنْکَر মন্দ কাজ হচ্ছে শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন- لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ অর্থ: তুমি আল্লাহর সাথে শিরক করো না, নিশ্চয় শিরক মহা অন্যায়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাতকে হারাম করে দেন। তার আবাসস্থল জাহান্নাম আর যালেমদের কোনো সাহায্যকারী নাই। আমার সামনে যারা শিরক করছে, মূর্তির পূজা করছে, তাদেরকে শিরক নামের মন্দ কাজ থেকে বাধা দিই কি না? ইত্যাদি। মোটকথা পূর্ববর্তী যেসব কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছিল, সেই কারণগুলোর মধ্যে প্রথম কারণটি আমাদের মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমরা নিজেরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবো না এবং অন্যদেরকে শিরক করতে দেবো না। আর তাদেরকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবো। পূর্ববর্তী উম্মতকে শান্তি দেয়ার দ্বিতীয় যেই কারণ ছিল, তা হলো সত্যকে গোপন করা।

২। সত্য গোপন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ * অর্থ: নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাজিল করেছি মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণেরও। উক্ত আয়াতে আল্লাহর বিধানগুলো গোপন করতে নিষেধ করেন। যারা তা করবে, তাদের ওপর আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। আমরা এই আয়াত থেকে জানতে পারলাম যে, পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর যেই কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তার দ্বিতীয় কারণ হলো সত্যকে গোপন করা। এখন দেখার বিষয় হলো আমরা এই অপরাধে অপরাধী কি-না? আমরাও এই অপরাধে অপরাধী। আমরাও সত্যকে গোপন করছি। যেমন মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন, হিন্দু-মুসলিম সকল মানুষের নবী। এই সত্য কথাটি কি আমরা হিন্দু, খ্রিস্টান অমুসলিম ভাইদের কাছে বলেছি? তাদের কাছে কি এই দাওয়াত পৌঁছি‍য়েছি? যদি উত্তর হয় না; তাহলে আমরা সত্যকে গোপন করলাম কি- না? এমনিভাবে কুরআন হলো সকল মানুষের জন্য। এই সত্য কথাটি কি অমুসলিমদের মাঝে পেশ করেছি? কোনো দিন কি কোনো অমুসলিমদেরকে বলেছি? ভাই! কুরআন হলো আপনারোও কিতাব। আপনাদের জন্য মুক্তির পথনির্দেশিকা। যদি না বলে থাকি, তাহলে আমরা এই সত্য বিষয়টি গোপন করলাম কি না? হ্যাঁ অবশ্যই এই সত্য বিষয়টি গোপন করেছি। ইসলাম হলো মুসলিম অমুসলিম সকল মানুষের জন্য। আমরা কি অমুসলিমদের কাছে এই সত্য পয়গামটি পৌঁছি‍য়েছি? যদি না পৌঁছাই, তাহলে এই সত্য বিষয়টি গোপন করলাম কি না? আমরা যদি ভালোভাবে আল্লাহর বিধানগুলোর প্রতি খেয়াল করি, তাহলে দেখব, এমন অনেক সত্য বিষয় আছে, যা আমরা গোপন করছি। অন্য মানুষের কাছে প্রকাশ করছি না। আর পূর্ববর্তী উম্মতদেরকে শাস্তির দ্বিতীয় কারণ হলো সত্যকে গোপন করা। আসুন আমরা সত্যকে মানুষের কাছে প্রকাশ করি যা আমরা গোপন করছি। আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন আমিন। পূর্ববর্তী উম্মতকে যে কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছিল তার তৃতীয় কারন হলো আল্লাহর বিধি বিধান থেকে উদাসীন হওয়া।

৩। আল্লাহ তাআলার বিধিবিধান থেকে উদাসীন হওয়া। فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ أَنْجَيْنَا الَّذِينَ يَنْهَوْنَ عَنِ السُّوءِ وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ * অর্থ: অতঃপর যখন তারা সেসব বিষয় ভুলে গেল, যা তাদেরকে বোঝানো হয়েছিল, তখন আমি সেসব লোককে মুক্তি দান করলাম যারা মন্দ কাজ থেকে বারণ করত। আর পাকড়াও করলাম, গোনাহগারদেরকে নিকৃষ্ট আযাবের মাধ্যমে তাদের নাফরমানির দরুণ। প্রিয় পাঠক! আমরা এই আয়াত থেকে জানতে পারলাম যে, পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর আযাব আসার তৃতীয় কারণ হলো আল্লাহর আহকামকে অবজ্ঞা করা। উদাসীন হওয়া। এখন দেখার বিষয় আমরাও ওই রোগে রোগী কি না? আমরা নামাজ থেকে উদাসীন। রোজা থেকে উদাসীন। হজ্জ থেকে উদাসীন, আল্লাহর আহকাম থেকে উদাসীন। এসব কারণেই আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর শাস্তি দিয়েছিলেন। তখনই মানুষ উদাসীন হয় যখন মানুষ কোনো কিছু ভুলে যায়।

শান্তির ধরণ: আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সতর্ক করেছেন বিভিন্নভাবে, কখনো আযাবের ভয় দেখিয়ে, আবার কখনো পূর্বের সম্প্রদায়ের শাস্তির ঘটনা বর্ণনা করে আমাদেরকে হুশিয়ারি বার্তা জানিয়েছেন। তার কিছু বিবরণ নিম্নে দেয়া হলো। আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী জাতীকে ধ্বংস করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ وَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا كَذَلِكَ نَجْزِي الْقَوْمَ الْمُجْرِمِينَ আমি অবশ্যই তোমাদের পূর্বে বহু অধিবাসীকে ধ্বংস করে দিয়েছি, এ কারণে যে তারা যুলুম করেছিল। অথচ রাসূল তাদের কাছেও এসব বিষয়ের প্রকৃষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই তারা ঈমান আনল না। এমনিভাবে আমি শাস্তি দিয়ে থাকি পাপী সম্প্রদায়কে।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী জাতিদের শান্তির কারণ বলেছেন, তাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের আনীত বিধানসমূহ অমান্য ও অস্বীকার করার দরুণ তাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। আমরা জানি আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ কাজ হলো, তাঁর সাথে শিরিক করা। এই দাওয়াত নিয়েই সমস্ত নবী রসূলগণ এসেছেন। যারা তাদের দাওয়াত অমান্য করেছে, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা আযাবে নিপতিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা পরের আয়াতে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, তোমাদেরকে এ ধরাতে প্রতিনিধি রূপে প্রেরণ করা হয়েছে। তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমরা কীরূপ আমল কর। অর্থাৎ আমরা শিরিক থেকে নিজে বাঁচবো এবং অন্যকে বাঁচাবো। ইনশাআল্লাহ। পূর্ববর্তী উম্মতকে তিন ধরনের শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- قُلْ هُوَ الْقَادِرُ عَلَى أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِنْ فَوْقِكُمْ أَوْ مِنْ تَحْتِ أَرْجُلِكُمْ أَوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعًا وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ بَعْضٍ انْظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الْآيَاتِ لَعَلَّهُمْ يَفْقَهُونَ অর্থ: আপনি বলুন, তিনি সক্ষম তোমাদের ওপর কোন শাস্তি প্রেরণ করতে, ওপর দিক থেকে অথবা তোমাদের পদতল থেকে, অথবা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে সবাইকে মুখোমুখী করে দিতে এবং একে অন্যের ওপর আক্রমণের স্বাদ আস্বাদন করাতে। দেখ, আমি কেমন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিদর্শনাবলী বর্ণনা করি, যাতে তারা বুঝে নেয়।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ও বান্দার অক্ষমতা প্রকাশ করেন, তিনি আমাদের চতুর্দিক থেকে আযাব দিতে সক্ষম। আমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগিয়ে দিয়ে আমাদেরকে অন্যান্য জাতির ন্যায় সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারেন। যার উদাহরণ কুরআনে বিদ্যমান। মোট কথা এই আয়াতে তিন ধরনের শাস্তির কথা আলোচনা করা হয়েছে। ১. আসমানি শাস্তি। ২. জমিনি শাস্তি। ৩. পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ। কিন্তু প্রথম দুই ধরনের শাস্তি রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর বরকতে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। বাকি একটি শান্তি রয়ে গেছে। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে:

عَنْ سَعْدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليهِ وَسَلَّمَ أَقْبَلَ ذَاتَ يَومٍ مِنَ العَالِيَةِ، حَتَّى إِذَا مَرَّ بِمَسْجِدِ بَنِي مُعَاوِيَةَ دَخَلَ فَرَكَعَ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ، وَصَلَّيْنَا مِعهُ، وَدَعَا رَبَّهُ طَوِيلًا ، ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَيْنَا، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عليهِ وَسَلَّمَ : سَأَلْتُ رَبِّي ثَلَاثًا، فَأَعْطَانِي ثِنْتَيْنِ وَمَنَعَنِي وَاحِدَةً، سَأَلْتُ رَبِّي : أَنْ لا يُهْلِكَ أُمَّتِي بِالسَّنَةِ فَأَعْطَانِيهَا، وَسَأَلْتُهُ أَنْ لا يُهْلِكَ أُمَّتِي بِالْغَرَقِ فَأَعْطَانِيهَا، وَسَأَلْتُهُ أَنْ لَا يَجْعَلَ بَأْسَهُمْ بَيْنَهُمْ فَمَنَعَنِيهَا.

আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (অন্য সনদে) ইবনু নুমায়র রহ... সা'দ রা. থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদা) আলিয়া (মদীনার উঁচু অঞ্চল) হতে এসে বনূ মুআবিয়ায় অবস্থিত মসজিদের নিকট গেলেন। অতঃপর তিনি উক্ত মসজিদে প্রবেশ করে দু রাকআত সালাত আদায় করলেন। আমরাও তার সাথে সালাত আদায় করলাম। এ সময় তিনি তার প্রতিপালকের নিকট দীর্ঘ দুআ করলেন। এবং দুআ শেষে আমাদের নিকট ফিরে বললেনঃ আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তিনটি জিনিস কামনা করেছি। তন্মধ্যে তিনি আমাকে দুটি প্রদান করেছেন এবং একটি প্রদান করেননি। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট কামনা করেছিলাম, যেন তিনি আমার উম্মাতকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। তিনি আমার এ দুআ কবুল করেছেন। তাঁর নিকট এও প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি যেন আমার উম্মাতকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস না করেন। তিনি আমার এ দুআও কবুল করেছেন। আমি তাঁর নিকট এ মর্মেও দুআ করেছিলাম যে, যেন মুসলিম পরস্পর একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়। তিনি আমার এ দুআ কবুল করেননি।

উল্লিখিত হাদিস থেকে আমরা জানতে পারলাম, শেষ প্রকারের শান্তি এই উম্মতের মধ্যে থেকে যাবে। অর্থাৎ নিজেদের মধ্যে বিরোধ, এখতেলাফ, মতানৈক্য, বিভক্তি ইত্যাদি। আপনি যদি ইসলামের ইতিহাস অধ্যায়ন করে থাকেন। তাহলে দেখবেন, মুসলমানদের ওপর তাতারীদের নির্যাতনের উত্থান পতনের যে কারণ ছিল তা হলো, সে সময় মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর দ্বন্দ্ব এবং নিজেদের মধ্যে কঠিন এখতেলাফ যা ছিল শাস্তির চুড়ান্ত অবস্থা। ফলে ওখানকার এক গ্রুপ খ্রিস্টানদের সাথে মিলে তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করে দেয়। পরবর্তীতে যারা খ্রিস্টানদের সঙ্গ দিয়েছিল তাদেরকেও শেষ করে দেয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিতে স্পেন থেকে মুসলমানদের পতন ঘটে। আমরাও যদি নিজেদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া করি, দ্বন্দে লিপ্ত থাকি। আর আমাদের দায়িত্ব আদায় না করি তাহলে আমরাও সেই শাস্তির স্বীকার হবো।

একবার রাসুলুল্লাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- والذي نفسي بيده لتأمرن بالمعروف و لتنهون عن المنكر أوليسلطন الله عليكم شراركم ثم يدعو خياركم فلا يستجاب لهم ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার জান, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অবশ্যই অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করবে। যদি এমন না করতে থাক, তাহলে তোমাদের ওপর জালিম শাসক চাপিয়ে দেয়া হবে। তখন তোমাদের মধ্যে ভাল লোকেরা দুআ করবেন কিন্তু তা কবুল করা হবে না।

একটু ভাবলেই দেখতে পারবো, আজ আমাদের ওপর কোন ধরণের ব্যক্তির শাসন চলছে। আল্লাহ তাআলা খারাপ লোকদেরকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেন নি? এটা আল্লাহ তাআলার অটল ও অনড় বিধান যে, যদি আমরা আমাদের দায়িত্বের অবহেলা করি, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিধান আমাদের ওপর প্রয়োগ করবেন। আমরা দাওয়াতের অনিবার্য দায়িত্বটি ছেড়ে দিয়েছি। ফলে দুনিয়ার সবচাইতে খারাপ জাতিকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ভারতে ১৯৯২ সনে ৬ ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ শাহাদাতের এবং ২০০২ সালে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা হয়তো আপনাদের স্মরণ আছে। ঐ সময় বিশ্বের সকল মুসলমানের মাঝে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় এমন কোন্ ব্যক্তি ছিল, যিনি দুআ করতে গিয়ে চোখের অশ্রু ঝরায়নি? দুনিয়ার এমন কোন্ স্থান ছিল, যেখানে দুআ না করা হয়েছে। হেরেমে মক্কা ও হেরেমে মদিনায় দুআ করা হয়েছিল। পবিত্র রমযান মাসে স্থানে স্থানে দুআ করা হয়েছে কুনুতে নাযেলা পড়া হয়েছে। কিন্তু কোন দুআ আল্লাহর রহমত ও দয়াকে মুতাওয়াজ্জুহ করতে পারেনি। সম্ভবত এর কারণ এটাই ছিল যে, আমাদের অপরাধের কারণে আল্লাহর অটল বিধান ও নিয়ামের বাস্তবাতা দেখিয়েছেন। কুরআনে হাকীমে এই জন্যই বনী ইসরাইলের ওপর লানত করা হয়েছে। কুরআনে হাকীমে আল্লাহ তাআলা বলেন- لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ বনী-ইসরাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর মুখে অভিশম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করতো এবং সীমালংঘন করতো।

অন্য হাদিসে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ مَا مِنْ رَجُلٍ يَكُونُ فِي قَوْمٍ يَعْمَلُ بَيْنَهُمْ بِالْمَعَاصِي يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا عَلَيْهِ فَلَا يُغَيِّرُوا إِلَّا أَصَابَهُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَمُوتُوا . যারির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: কোনো ব্যক্তি যখন তার স্বজাতির মধ্যে গোনাহর কাজে লিপ্ত থাকে, আর ওই জাতি তাকে গুনাহর কাজ থেকে ফিরাতে সক্ষম, কিন্তু তারা তাকে ফিরালো না, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে আজাব দ্বারা গ্রেপ্তার করবেন। আমরা যদি এ কাজ না করি তাহলে আল্লাহ তাআলা অন্য জাতি নিয়ে আসবেন। وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ (38) যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না। এই আয়াত আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছে, আমরা আল্লাহর দাসত্ব করি বা না করি, তাতে আল্লাহর কিছুই আসে যায় না। কারণ তিনি আমাদের মোটেও মুখাপেক্ষি না। আর আমরা যদি তার হুকুম মেনে না চলি, তাহলে তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করে এমন এক জাতি পাঠাবেন যারা আমাদের মত হবে না। বরং, আমাদের চেয়ে ভালো হবে। তারা শিরক করবে না এবং আল্লাহকে মেনে চলবে। এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটিয়ে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, সে সব ঘটনা থেকে একটি ঘটনা নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

শাস্তি থেকে বাঁচার উপায়: এখন আমাদের ভাবার বিষয় হলো এই শাস্তি থেকে বাঁচার উপায় কী? কোন আমল করলে আমরা এই আজাব থেকে বাঁচতে পারবো, এর সমাধান আল্লাহ তাআলা নিজেই তার কালামে পাকে দিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ অর্থ: তারা কি লক্ষ করে না, প্রতি বছর তারা দুই একবার বিপর্যন্ত হচ্ছে, অথচ, তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না। উক্ত আয়াতে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার জন্য পথ দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর আযাব থেকে বাঁচার উপায় দুটি: ক. তওবা করা। খ. উপদেশ বা শিক্ষা গ্রহণ করা। নিচের আয়াতটিও তার বর্ণনা দিচ্ছে। وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ () গুরু শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (160) অর্থ: তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবুলকারী পরম দয়ালু।

উপরিউক্ত আয়াত দুটিতে বনী ইসরাইলের ওপর এই জন্য লানত দেয়া হয়েছে, তারা আল্লাহর আহকামকে গোপন করেছে এবং আমল বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার ছেড়ে দিয়েছিল। আজ আমাদের অবস্থাও তাই। কুরআনকে শুধু ঘরের অলংকার- সোকেসের সৌন্দর্য বানিয়ে রেখেছি। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাকে গোপন করছি। এমন কতো অমুসলিম আছে যাদের সাথে প্রতিদিন একত্রে উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য মোটকথা সব কিছুই হয়। কিন্তু হয় না শুধু দাওয়াতের ব্যবসা-বাণিজ্য।

এখনোও যদি আমরা আল্লাহর শান্তি হতে বাঁচতে চাই, তাহলে আমাদেরকেও ওই পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে যা ইউনুস আ.-এর কওম গ্রহণ করেছিল। তারা তো সেই জাতিই যারা নিজ নবীকে মানতে অস্বীকার করেছিল। তবে আল্লাহর শান্তি আসতে দেখে তাওবা করল এবং তাদের নবীর ওপর ঈমান আনলো। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং শাস্তিকে ফিরিয়ে নিলেন। আল্লাহ বলেন, فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ অর্থ: সুতরাং কোন জনপদ কেন এমন হলো না যা ঈমান এনেছে অতঃপর তার সে ঈমান গ্রহণ হয়েছে কল্যাণকর? অবশ্য ইউনুসের সম্প্রদায়ের কথা ভিন্ন। তারা যখন ঈমান আনে, তখন আমি তুলে নেই তাদের ওপর থেকে অপমানজনক আযাব- পার্থিব জীবনে এবং তাদেরকে কল্যাণ পৌঁছাই এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত।

কুরআনে হাকীমে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাইলের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শনিবারে মাছ ধরতে নিষেধ করেছিলেন। ওই সম্প্রদায়ের মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। ১. মাছ শিকারকারী (জালিম)। ২. মুত্তাকী অর্থাৎ যারা বিরত ছিল। ৩. বাধা প্রদানকারী। আল্লাহ তাআলা শিকারকারী (জালিম) এবং মুত্তাকী অর্থাৎ যারা বিরত ছিল তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, বরং তাদের আকৃতিকে বিকৃত করে দিয়েছেন এবং বাধা প্রদানকারীদের পরিত্রাণ দিয়েছেন। একই অর্থে একটি হাদিস আছে যা বুখারী ও তিরমিজীতে বর্ণিত হয়েছে। যার সার সংক্ষেপ হলো এই, তিন তলা বিশিষ্ট এক জাহাজে মানুষ আরোহন করেছে। পানির ব্যবস্থা ছিল তৃতীয় তলায়। নিচের তলার লোকেরা পানি আনার জন্য উপরে যেত, আর সেখানকার লোকদের কষ্ট হতো এ কথা চিন্তা করে তারা এ সিদ্ধান্ত নিল যে, আমরা যদি আমাদের তলার নিচ থেকে একটি ছিদ্র করে দিই, তাহলে আমাদের জন্য সহজ হবে এবং ওপর ওয়ালাদেরও কষ্ট হবে না। এবার যদি ওপর ওয়ালারা এ কথা বলে বসে যে, তারা তাদের তলা ছিদ্র করবে তাতে আমাদের কি যায়-আসে, তাহলে সকলেই ডুবে মরবে। এই মুসিবত থেকে বাঁচতে হলে নিচের তলার লোকদেরকে বাধা দিতে হবে। আজ আমাদের অবস্থাও এর থেকে ভিন্ন নয়। আমরা শিরক করতে দেখেও মুখ খুলি না, কিছু বলি না। এমন অবস্থায় আমাদের ওপরও কি আল্লাহর শাস্তি আসতে পারে না? এই জাতিকে খুবই সুক্ষ্ম ভাবে ভাবা উচিত।

মোটকথা, কুরআনে হাকীমে এই শাস্তি থেকে বাঁচার একটিই উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّাবُ الرَّحِيمُ অর্থাৎ লানত ও শাস্তি হতে ওই লোকেরাই বাঁচবে যারা তিনটি কাজ আঞ্জাম দেবে। ১. তওবা করবে। ২. এসলাহ করবে। ৩. যেই সমস্ত আহকাম গোপন করেছে তা মানুষের মাঝে বর্ণনা করবে। স্পষ্ট থাকে যে, প্রথমে তওবা ওই অপরাধের কারণে বলা হয়েছে, যা উপরে আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ সত্যকে গোপন করা। উদ্দেশ্য হলো যে, সামনে থেকে আমাদের ইলমকে গোপন করবো না এবং অন্যকে হক কথা বলবো। দ্বিতীয়ত, নিজের এবং অন্যের এসলাহ করবো এবং আমাদের কাছে যা কিছু আছে তা অন্যের কাছে বর্ণনা করবো।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এর তৌফিক দান করেন। আমিন!

টিকাঃ
১৩. তিরমিজী-২১৬৯, মুসনাদে আহমদ-২৩৩৪৯।
১৪. সুরা মুনাফিকুন-৮
১৫. সুরা বাকারা-৬১
১৬. সুরা মায়েদা-৭৯
১৭. সুরা লোকমান-১৩
১৮. সুরা মায়েদা- ৭২
১৯. সূরা বাকারা: আয়াত: ১৫৯
২০. আরাফ: আয়াত: ১৬৫
২১. ইউনূস-১৩
২২. আনআম: আয়াত: ৬৫
২৩. মুসলিম
২৪. মুসনাদে আহমাদ-২৩৩২৭
২৫. সুরা মায়েদা: ৭৮
২৬. সুনানে আবুদাউদ
২৭. মুহাম্মদ: ৩৮
২৮. সুরা তওবা-১২৬
২৯. সেজদা : আয়াত: ২১
৩০. বাকারা: আয়াত: ১৬০
৩১. ইউনুস-৯৮
৩২. এই ঘটনাটি (সুরা আরাফের ১৬৩-১৬৬) আয়াতে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px