📄 উম্মতের দরদ
عَنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيِّ ، قَالَ : سَأَلْتُ خَالِي هِنْدُ بْنُ أَبِي هَالَةَ ، وَكَانَ وَضَّافًا ، فَقُلْتُ : صِفْ لِي مَنْطِقَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : " كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُتَوَاصِلَ الْأَحْزَانِ, دَائِمَ الْفِكْرَةِ, لَيْسَتْ لَهُ رَاحَةٌ ، طَوِيلُ السَّكْتِ ، لا يَتَكَلَّمُ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ ، يَفْتَتِحُ الْكَلَامَ, وَيَخْتِمُهُ بِاسْمِ اللَّهِ تَعَالَى ، وَيَتَكَلَّمُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ ، كَلامُهُ فَصْلٌ ، لا فُضُولَ, وَلا تَقْصِيرَ ، لَيْسَ بِالْجَانِي, وَلَا الْمُهِينِ ، يُعَظِّمُ النِّعْمَةَ وَإِنْ دَقَّتْ لَا يَذْمُّ مِنْهَا شَيْئًا ، غَيْرَ أَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يَذُمُّ ذَوَّاقًا وَلا يَمْدَحُهُ ، وَلا تُغْضِبُهُ الدُّنْيَا ، وَلَا مَا كَانَ لَهَا ، فَإِذَا تُعُدِّيَ الْحَقُّ, لَمْ يَقُمْ لِغَضَبِهِ شَيْءٌ, حَتَّى يَنْتَصِرَ لَهُ ، وَلَا يَغْضَبُ لِنَفْسِهِ ، وَلَا يَنْتَصِرُ لَهَا ، إِذَا أَشَارَ بِكَفِّهِ كُلِّهَا ، وَإِذَا تَعَجَّبَ قَلَبَهَا ، وَإِذَا تَحَدَّثَ اتَّصَلَ بِهَا ، وَضَرَبَ بِرَاحَتِهِ الْيُمْنَى بَطْنَ إِبْهَامِهِ الْيُسْرَى ، وَإِذَا غَضِبَ أَعْرَضَ وَأَشَاحَ ، وَإِذَا فَرِحَ غَضَّ طَرْفَهُ ، جُلُّ ضَحِكِهِ التَّبَسُّمُ ، يَفْتَرُ عَنْ مثل حَبِّ الْغَمَامِ . "
হযরত হাসান ইবনে আলী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (আমার) মামা হিন্দ ইবনে আবু হালা রা.-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর অবয়ব ও আখলাক সম্পর্কে সুন্দররূপে বর্ণনা করতেন। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাচনভঙ্গি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা আখিরাতে উম্মতের মুক্তির চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এ কারণে তাঁর কোন স্বস্তি ছিল না। তিনি অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। তিনি ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যালাপ করতেন। তাঁর কথা ছিল একটি থেকে অপরটি পৃথক। তাঁর কথাবার্তা অধিক বিস্তারিত ছিল না কিংবা অতি সংক্ষিপ্তও ছিল না। অর্থাৎ তাঁর কথার মর্মার্থ অনুধাবনে কোন প্রকার অসুবিধা হতো না। তাঁর কথায় কঠোরতার ছাপ ছিল না, থাকতো না তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব।
আল্লাহর নিয়ামত যত সামান্যই হতো তাকে তিনি অনেক বড় মনে করতেন। এতে তিনি কোন দোষত্রুটি খুঁজতেন না। তিনি অপরিহার্য খাদ্য সামগ্রীর ত্রুটি খতিয়ে দেখতেন না এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করতেন না। পার্থিব কোন বিষয় বা কাজের উপর ক্রোধ প্রকাশ করতেন না এবং তাঁর জন্য আক্ষেপও করতেন না। অবশ্য যখন কেউ দ্বীনি কোন বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করত তখন তাঁর রাগের সীমা থাকতো না। এমনকি তখন কেউ তাঁকে বশে রাখতে পারত না। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কারণে ক্রোধান্বিত হতেন না এবং এজন্য কারো সাহায্য গ্রহণ করতেন না। কোন বিষয়ের প্রতি ইশারা করলে সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। তিনি কোন বিস্ময় প্রকাশ করলে হাত উল্টাতেন। যখন কথাবার্তা বলতেন তখন ডান হাতের তালুতে বাম হাতের আংগুলের অভ্যন্তরীণ অংশ দ্বারা আঘাত করতেন। কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তাঁর দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিতেন এবং অমনোযোগী হতেন। যখন তিনি আনন্দ- উৎফুল্ল হতেন তখন তাঁর চোখের কিনারা নিম্নমুখী করতেন। অধিকাংশ সময় তিনি মুচকি হাসতেন। তখন তাঁর দাঁতগুলো বরফের ন্যায় উজ্জ্বল সাদারূপে শোভা পেত।
হাদিস থেকে শিক্ষা: এই হাদিস থেকে আমরা নবীজীর মনে উম্মতের প্রতি দরদ সম্পর্কে জানতে পারলাম যা আমাদের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য খুবই জরুরী। পাঠকদের খেদমতে উম্মতের দরদ সম্পর্কে কিছু আলোচনা পেশ করছি। দা'য়ী সর্বদা উম্মতের ফিকির করবে। উম্মতের দরদ আল্লাহ পাকের কাছে খুবই প্রিয়। আমাদের প্রিয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বড় সিফাত ছিল- دَائِمَ الْفِكْرَةِ 'উম্মতের ফিকির'। তিনি সর্বদা উম্মতকে নিয়ে ভাবতেন। উম্মতের ফিকিরে তিনি থাকতেন অস্থির ও ব্যাকুল। উম্মতের ফিকির আল্লাহর কাছে এমন প্রিয়, যারা নবীজির পূর্বে উম্মতের ফিকির করেছেন, আল্লাহ তাআলা তাদের নাম কুরআন পাকে স্থান দিয়েছেন। যেমন হজরত নুহ আ., ইব্রাহিম আ., মূসা আ., দাউদ আ. প্রমুখ।
সূরা ইয়াসিনে হাবিবে নাজ্জারের দিকে লক্ষ্য করে আয়াত নাজিল করা হয়েছে। এক শহরে তিনজন নবী দাওয়াতি কাজে গেলেন। সেই জাতি নবীগণের ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। এমনকি তাদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনাও করছিল। এই খবর হাবিবে নাজ্জারের কাছে পৌঁছলে তার জাতিকে আজাব থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি অন্তরে দরদ ও ব্যাকুলতা নিয়ে শহরের একপ্রান্ত থেকে দৌড়ে এলেন। তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বললেন- {اتَّبِعُوا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ } তোমরা এমন লোকের অনুসরণ কর যারা কোনো প্রতিদান চায় না এবং তারা নিজেরা হেদায়াতপ্রাপ্ত। তার জাতি যেন নবীদের সাথে অসৎ আচরণের কারণে ধ্বংস না হয়ে যায়-এই ফিকির নিয়ে দৌড়ে এলেন। আল্লাহ তাআলার কাছে তার এই ফিকির ও দরদ এতো পছন্দ হলো যে, আল্লাহ তাআলা তার দিকে ইঙ্গিত করে আয়াত অবতীর্ণ করলেন।
আরও একটি ঘটনা: ক্ষুদ্র কোনো প্রাণীর নাম নিতে বললে আমরা পিপীলিকার নাম নিই। একদিন সুলায়মান আ. তার সৈন্যদল নিয়ে একদিকে যাচ্ছিলেন। পিপীলিকার সর্দার তাদের ডেকে বললো, তোমরা তোমাদের বাসস্থানে প্রবেশ করো। অন্যথায় তোমরা তাদের পদতলে পিষ্ট হবে, এমনকি তারা অনুভবও করতে পারবে না। আল্লাহর কাছে স্বজাতির প্রতি পিপীলিকার এই দরদ এতো প্রিয় হলো যে, আল্লাহ তাআলা তার কালামে পাকে এই পিপীলিকার নামে একটি সূরা অবতীর্ণ করলেন। নাম দিলেন 'সূরাতুন নামল।' আল্লাহ তা'আলা বলেন- قَالَتْ نَمْلَةٌ يَا أَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسَاكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ . পিপীলিকাটি বলল, হে পিঁপড়ার জাতি! তোমরা তোমাদের গর্তে প্রবেশ কর, অন্যথায় হযরত সুলাইমান আ. ও তাঁর বাহিনী তোমাদেরকে পিষে ফেলবে এমতাবস্থায় যে, তারা অনুভবও করতে পারবে না।
যেই কুরআনে তাদের নাম এসেছে, সেই কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- { لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرিবُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ } আমি যদি এই কুরআনকে কোনো পাহাড়ে অবতরণ করতাম তাহলে তা আল্লাহর ভয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে দেখতে। সুতরাং তা এমন দৃষ্টান্ত যা আমি মানুষের জন্য উপস্থাপন করি যাতে তারা চিন্তা-ফিকির করতে পারে।
শুধু স্বজাতির দরদ ও ফিকিরের কারণে আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ছোট্ট একটি প্রাণীর নামে সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে আমরা যদি এই যুগে উম্মতের জন্য দরদ ও ফিকির করি তাহলে আমাদের নাম কোথায় আসবে? এখন তো আর কুরআন নাজিল হবে না। উত্তর হলো, আমরা যদি এখলাসের সাথে উম্মতের ফিকির করি তাহলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা আগত উম্মতের অন্তরে আমাদের নাম লিখে দেবেন। এক্ষেত্রে পাঠকের সামনে কয়েকটি ঘটনা পেশ করছি।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী র.এর ঘটনা: খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহ. কে? এমন খুব কম লোকই আছে যারা তাঁকে চিনে না। এখনও অনেক মানুষ ঢাকাতে তার নাম বিক্রি করে রোজগার করে নিজেদের পকেট ভারি করে। দেখবেন রজব মাস এলেই ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে লালসালু দিয়ে আবৃত একটি ডেক দেখা যায় সেখানে লেখা থাকে 'খাজা বাবার ডেক'। মানুষের কাছে তাঁর নাম বলে টাকা সংগ্রহ করা হয়। মঈনুদ্দীন চিশতী রহ.-এর মাজারে গেলে দেখবেন হিন্দু-মুসলিম সকলেই সেখানে যাচ্ছে। মুসলিম-অমুসলিম সকলের অন্তরে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। সে সময়ের কোনো বাদশার কথা তো মানুষ স্মরণ করে না। স্মরণ করা হয় না ঐ যুগের কোনো আলেমের কথা। তাহলে এর কারণ কী? কেন তাকে এরূপ স্মরণ করা হয়? কী তার রহস্য? এসবের উত্তর হলো তাঁর অন্তরে ছিল উম্মতের দরদ।
একবার খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহ. এর শায়েখ খাজা উসমান হারুনী রহ. উনার কাছে এলেন। আগের যুগে মাশায়েখগণ মাঝে মাঝে মুরিদদের এসলাহের জন্য তাদের কাছে আসতেন। মুরিদের কাছে থাকা শুরু করলেন শায়েখ। এসলাহ করতে লাগলেন। একদিন শায়েখ খাজা উসমান হারুনী রহ. মঈনুদ্দীন চিশতী রহ.-কে বললেন। বলার সময়টা ছিল নীরব। কেউ ছিল না কাছে। শুধু মুঈনুদ্দীন চিশতি রহ.কে সম্ভবত পরীক্ষার জন্য বলেছেন। শায়েখ বললেন, আগামীকাল যারা আমার পেছনে ফজরের নামাজ আদায় করবে তারা জান্নাতী। আর যে ব্যক্তি এই খবর অন্য কারো কাছে বলবে সে জাহান্নামি। মঈনুদ্দীন চিশতী রহ. খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী করবেন? শেষে শায়েখকে শুইয়ে দিয়ে উনি বের হয়ে গেলেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। সারা রাত মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বললেন 'ভাই! তোমরা আগামীকাল সকালে ফজরের নামাজ আমার শায়েখের পেছনে পড়বে। তোমরা জান্নাতি হয়ে যাবে। এভাবে পুরো রাত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরলেন এবং তাহাজ্জুদের পূর্বে শায়খের কাছে এসে হাজির হলেন। ফজরের নামাজে মসজিদ কানায় কানায় ভরপুর, লোকে লোকারণ্য। নামাজ শেষে শায়খ বললেন, মঈনুদ্দীন এখানে আজ এতো লোক কেন? অন্য দিন তো এতো লোক নামাজে আসে না। মঈনুদ্দীন রহ. বললেন, হজরত! আপনি না বলেছেন যারা আপনার পিছনে ফজরের নামাজ পড়বে তারা জান্নাতি। এসকল লোক জান্নাতের আশায় নামাজ পড়তে এসেছে। শায়েখ বললেন এ খবর তাদেরকে কে দিয়েছে? তুমি ছাড়া তো এই খবর আর কেউ জানে না। অবশ্যই তুমি দিয়েছ? শায়েখ বললেন, তুমি কি জানো না, যে ব্যক্তি এখবর অন্যের কাছে পৌঁছে দেবে সে জাহান্নামি। মঈনুদ্দীন রহ. বললেন হুজুর বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার মতো এক মঈনুদ্দীন যদি জাহান্নামে গিয়ে হাজারো মানুষ জান্নাতি হয়ে যায়, তাহলে মনে হয় আমার অন্তর শান্তি পাবে। এই ছিল উম্মতের দরদ। শায়েখ খুব দুআ করলেন। বললেন যাও তুমি যেদিকে যাবে সেদিকে মানুষ জান্নাতী হবে। তোমার হাতে মানুষ দলে দলে মুসলমান হবে। এর পরেই তো উনার হাতে এক সফরে ৯০ হাজার মানুষ ইসলাম কবুল করেন। উম্মতের প্রতি দরদ ও ভালোবাসার ফিকির করার কারণে আজও আমাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা তাঁর নাম লিখে দিয়েছেন। আজও আমরা মঈনুদ্দীন চিশতিকে স্মরণ করি এবং তাঁকে নিয়ে আলোচনা করি।
শায়খ হযরতজি ইলিয়াস রহ.: আজ সারা বিশ্ব তাঁকে চিনে। বিশ্বের মানুষের অন্তরে স্থান করে নিয়েছেন। কেন? কী তার কারণ? তার একমাত্র কারণ হলো উম্মতের প্রতি তার দরদ। উম্মত নিয়ে তার ফিকির। তিনি অস্থির থাকতেন উম্মত নিয়ে। রাতে ঘুমাতে পারতেন না। রাতে বারান্দায় পায়চারি করতেন। আর বলতেন-কী হবে মানুষের ? আহ! কী হবে এই জাতির? তার এই ফিকিরের কারণে আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে তার নাম লিখে দিয়েছেন।
শাহজালাল ইয়ামানী রহ.-এর নাম আমরা স্মরণ করি। তাঁর বাড়ি তো বাংলাদেশে নয়। তিনি হলেন ইয়ামেনের মানুষ। কী কারণে বাংলায় এলেন? উম্মতের ফিকিরে, উম্মতের দরদে। তাই আজও আমাদের অন্তরে তিনি গেঁথে আছেন। আছেন আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়। এ ধরণের তালিকা যদি তৈরি করা যায় তাহলে সেই তালিকা দিয়েই একটি বই হয়ে যাবে। আজ এখানেই সমাপ্তি টানলাম।
কেমন ছিল নবীজির দরদ ও উম্মতের ফিকির। তিনি উম্মতের ফিকিরে এতো অস্থির থাকতেন, আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্তনা দিতে গিয়ে আয়াত অবতীর্ণ করলেন- { لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ } তারা কেন মুমিন হচ্ছে না এই জন্য আপনি মনে হয় আপনার জীবনকে ধ্বংস করে দেবেন। সে সময় কারা মুমিন হচ্ছিল না? মুসলিমরা না অমুসলিমরা? অবশ্যই অমুসলিমরা। অমুসলিমরা কেন মুসলিম হচ্ছে না এই জন্য নবীজি এতো অস্থির ছিলেন আল্লাহ তাআলা সান্তনা দিচ্ছেন। আমরা কেমন দা'য়ী? আমরা কেমন অনুসারী? আমাদের কি একটিবার এই ফিকির হয়েছে যে অমুসলিমরা চিরস্থায়ী জাহান্নামে ঝাঁপ দিচ্ছে। তাদেরকে কিভাবে এই আগুন থেকে বাঁচানো যায় আজ আমরা অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতের ফিকির করবো তো দূরের কথা, কেউ যদি মুসলমান হতে আসে তাহলে কালেমা পড়াতেও আমরা ভয় পাই। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহীহ্ বুঝ দান করুন। আমিন।
উম্মতের ফিকিরের একটি ঘটনা: একবার রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে বসে ছিলেন। এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে এক ইয়াহুদীর লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লাশ দেখে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখ মুবারক দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। তিনি কাঁদতে লাগলেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি কাঁদছেন কেন? এটা তো একজন ইয়াহুদীর লাশ। দরদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, দেখ সে তো আমার উম্মত। আমি তো তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারলাম না। এই ছিল উম্মত নিয়ে আমাদের প্রিয় নবীজির ফিকির। আমরা কয়দিন এই অমুসলিমদের হেদায়াতের ফিকির করেছি। কয়দিন তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেছি। কয় ফোঁটা চোখের অশ্রু তাদের জন্য ঝরিয়েছি?
কুতুব হতে চাও? হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ. একবার তার শিষ্যদের বললেন- তোমরা কি কুতুব হতে চাও? সকলে বললেন কে আবার কুতুব হতে চায় না। বললেন, আমি কি তোমাদেরকে কুতুব হওয়ার পদ্ধতি বলে দেব? সমস্বরে বললেন, জ্বি বলুন। হাজী সাহেব বললেন, যদি কোনো অমুসলিমকে মৃত্যুবরণ করতে দেখ তাহলে এক কোণে গিয়ে কিছু সময় কান্নাকাটি কর। আর আল্লাহকে বল। আমি তো তাকে দাওয়াত দিতে পারিনি। তাহলে তুমি কুতুব হয়ে যাবে।
কুকুর প্রতিপালন নিষেধ: হাদিস শরিফে আছে 'যেই ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে ওই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।' প্রশ্ন হলো ঘরে কুকুর রাখা নিষেধ কেন? কুকুরের মধ্যে অনেক ভালো গুন আছে, এসব গুণগুলোর ওপর আমল করলে একজন মানুষ আল্লাহর ওলী হয়ে যাবে। এর পরও কুকুর প্রতিপালন করা নিষেধ। এর কারণ হলো কুকুরের মধ্যে এমন একটি দোষ আছে যা মানুষের মধ্যে যেন না আসে। মানুষের সাথে থেকে যেন মানুষের মধ্যে তা প্রকাশ না পায়। আর সেই দোষটি হলো তার মধ্যে স্বজাতির প্রতি কল্যাণকামিতা না থাকা। উদাহরণস্বরূপ একটি মাঠে মরা একটি গরু রেখে দেওয়া হলো, একটি কুকুর সেই গরুটি খাচ্ছে, এমন সময় যদি অন্য একটি কুকুর আসে তাহলে সেই কুকুর আগত কুকুরকে আর খেতে দিবে না। অর্থাৎ তার জাতির প্রতি তার কোনো ভালোবাসা নেই। এই কারণেই তাকে মানুষের সাথে থাকা নিষেধ করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে একটি ছাগল তার উল্টো। অধিকাংশ নবী ছাগল চরিয়েছেন। ছাগলের মধ্যে অনেক উল্টাপাল্টা আছে, এদিকে যায় আবার ঐদিকে যায়, এরপরও তার মধ্যে এমন এক গুণ আছে তা হলো তার স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা। সে স্বজাতির কল্যাণকামী। ছাগলের সামনে একটি কাঁঠালের পাতার ডাল রেখে দেবেন, দেখবেন সকলে মিলেমিশে সেই পাতাগুলো ভাগ করে খেয়ে ফেলবে। উম্মতের দরদ আল্লাহর কাছে এত প্রিয়। ভাই! আমরা হলাম মানুষ। মানবতা থেকে মানুষ। উনুসুন থেকে ইনসান। যে অন্যের কল্যাণে এগিয়ে যাবে, তাকে মানুষ বলে। আমাদের প্রতিবেশী কোনো হিন্দু বাড়িতে যদি আগুন লাগে তাহলে মুসলমানরা দৌড়ে যাবে আগুন নেভাতে ঝাপিয়ে পড়বে। কোনো মুসলমান বাড়িতে আগুন লাগলে অমুসলিমরাও দৌড়ে আসবে আগুন নেভাতে। এই দুনিয়ার আগুনে যদি ঘর-বাড়ি পুড়ে যায়, তাহলে উত্তম ঘর-বাড়ি বানিয়ে দেয়া সম্ভব। চামড়া বা ত্বক পুড়ে গেলে ওষুধ দিয়ে ত্বক ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু এই অমুসলিম ভাইটি মারা গেলে চিরকাল আগুনে জ্বলবে। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। সেই আগুন থেকে বাঁচানো অসম্ভব। আমরা কি একটিবার ফিকির করেছি? ভেবেছি কি তাদেরকে আগুন থেকে বাঁচাতে হবে? কেমন মানুষ আমি? কেমন মানবতা আমার? আমার এক ভাই চিরকালের জন্য জাহান্নামে ঝাঁপ দিলো আমি একটি বারও ফিকির করলাম না। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সিফাত ছিল যে, তিনি সর্বদা উম্মত নিয়ে ফিকির করতেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই উম্মতের ফিকির করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৭. সহীহ শামায়েলে তিরমিযী | অধ্যায়ঃ ৩৪. রাসূলুল্লাহ )ﷺ( এর বাচনভঙ্গি )باب كيف كان كلام رسول الله ﷺ( | হাদিস নম্বরঃ ১৬৭- শু'আবুল ঈমান, হা/১৩৬২।
৮. ইয়াসিন-২১
৯. সুরা নামল-১৮
১০. হাশর-২১
১১. সুরা শুআরা-৩