📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 পরিশিষ্ট : বিবর্তনবাদের বিভ্রান্ত/ভূল ধারনা

📄 পরিশিষ্ট : বিবর্তনবাদের বিভ্রান্ত/ভূল ধারনা


ডারউইনবাদ অথবা বিবর্তনবাদ তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে একটি ভ্রমাত্মক ও অবৈজ্ঞানিক মতবাদ, যা স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছিল কিন্তু সে উদ্দেশ্যে সাধনে এটি ব্যর্থ হয়েছে। এ মতবাদ অনুযায়ী পৃথিবীতে জীবনের সূচনা হয়েছে অজৈব পদার্থ থেকে পর্যায়ক্রমিক দৈবাৎ সংঘটিত ঘটনাবলীর সংমিশ্রণে। এই মতবাদ নানাভাবে নিন্দিত হয় যখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় যে, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা যিনি এ বিশ্ব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়াদিও এ শৃঙ্খলার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পক্ষান্তরে এ মতবাদের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রাণীকুল আল্লাহ সৃষ্টি করেন নাই বরং দৈবাৎ সেগুলো সৃষ্টি হয়েছে—এটি সত্য বলে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আমরা ডারউইনবাদ পর্যালোচনা করে সত্যিই দেখতে পাই যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এ তত্ত্বের কোনো ভিত্তি নেই। অজৈব পদার্থের তুলনায় জৈব প্রাণের সৃষ্টি কাঠামো অনেক বেশি জটিল ও অভিনব। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, অজৈব পদার্থের অণুগুলো কিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, উপরন্তু এ অণুগুলো আবার কিভাবে জটিল কাঠামোর আওতায় প্রাণী জগতে সুবিন্যস্তভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পাই কি অসাধারণ কৌশল ও প্রক্রিয়ায় এগুলোকে বিন্যাস করা হয়েছে যেমন—প্রোটিন, ক্রোমোজোম ও এনজাইম প্রভৃতি। জীব জগতের এ অসাধারণ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের পর বিংশ শতকে বিবর্তনবাদ বাতিল বা মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ডারউইনবাদের পতনের কারণ:
ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে বিবর্তনবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে, এ মতবাদের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে প্রাচীন গ্রিস দেশে এর উৎস পাওয়া যায়। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের ‘দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ প্রকাশিত হওয়ার পর এ মতবাদ বিশ্বের বিজ্ঞান জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রজাতি আলাদাভাবে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, এ পুস্তকে ডারউইন এ ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। ডারউইন দাবি করেন সকল প্রজাতি একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ (Common Ancestor) থেকে সময়ের বিবর্তনে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। ডারউইন নিজেই বলেছেন যে, তার এ মতবাদ কোনো মজবুত বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় বরং এ তত্ত্ব “স্বাভাবিক যুক্তির ক্রমবৃদ্ধির” একটি পর্যায়ক্রম ব্যাখ্যা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে ডারউইন তার পুস্তকের একটি অধ্যায়ে ‘The Difficulties on Theory’ শিরোনামে নিজেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যার কোনো উত্তর তার নিজেরই জানা ছিল না।

প্রাণের উৎস:
ডারউইনের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি মাত্র কোষ থেকে সকল প্রজাতির সৃষ্টির উন্মেষ হয়। কেমন করে একটি মাত্র কোষ থেকে লক্ষ লক্ষ জটিল প্রজাতি সমূহ সৃষ্টি হতে পারে, আর যদি হয়েই থাকে তার কোনো জীবাশ্ম প্রমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্যানুসন্ধানে না পাওয়ার কারণই বা কি? এর সদুত্তর এ মতবাদের ভিতর পাওয়া যায় না। বিবর্তনবাদ যেহেতু সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় কোনো আধিভৌতিক সত্তার বা শক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তাই এ মতবাদ দাবি করে যে, প্রথম কোষটি কোনো প্রকার পরিকল্পনা বা শৃঙ্খলার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নাই বরং তা হঠাৎ করে প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্তিত্বে এসে যায়। এ ধারণা জীববিজ্ঞানের মৌলিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বিধায় তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

জীবন থেকে জীবন আসে:
লুই পাস্তর (Louis Pasteur) দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বলেন, অজৈব পদার্থ থেকে প্রাণের সঞ্চার হয় এ ধারণা চিরদিনের জন্য কবরে প্রোথিত করা হলো। ডারউইনবাদীরা পাস্তরের এ মতবাদ প্রচারে দীর্ঘদিন যাবত বাধা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এটি বিজ্ঞান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জীব জগতের কোষের জটিল কাঠামো অবধারিতভাবে প্রমাণিত হয় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণের উন্মেষ ঘটে—এই তত্ত্ব বাতিল হিসাবে গণ্য হয়।

জৈব কাঠামোর জটিলতা:
সাধারণভাবে সবচেয়ে সরল প্রকৃতির প্রাণী হিসাবে বিবেচনা করা হয় যে সব প্রাণীকে, তাদের জৈব কাঠামো অবিশ্বাস্যভাবে জটিল। মানব জাতি যত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছে তার চেয়ে একটি জীবন্ত কোষ অনেক বেশি জটিল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ডিএনএ (DNA) অণু যা নিউক্লিয়াসের মধ্যে অবস্থান করে, এই ডিএনএ-র মধ্যে মানুষের জন্ম বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত থাকে। মানুষের জেনেটিক কোড (genetic code) যদি কাগজের উপর লিখা হয় তাহলে ৫০০ পৃষ্ঠার ৯০০টি বই হবে। প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিড উভয়েরই কাঠামোগত প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির, তাই এ দুটি একই সমতালে বিক্রিয়া করে নতুন সৃষ্টির বিষয়টি কার্যত অসম্ভব।

জীবাশ্ম প্রমাণ:
ডারউইনের বিবর্তনবাদের ঘটনা যে কখনো ঘটেনি তার সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণ হলো জীবাশ্মের আস্তিত্বের অনুপস্থিতি। ডারউইন দাবি করেছিলেন যে বিবর্তনের ধারায় অসংখ্য অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির অস্তিত্ব থাকা উচিত। কিন্তু ঊনবিংশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সকল স্থানে জীবাশ্ম গবেষণা পরিচালনা করা সত্ত্বেও এ ধরনের কোনো অন্তবর্তী আকৃতির প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। জীবাশ্ম পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রজাতি সমূহ পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণরূপে হঠাৎ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছে।

মানব সৃষ্টির কল্পকাহিনী:
ডারউইনবাদীরা দাবি করে থাকেন যে, আধুনিক মানুষ কিছু সংখ্যক বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনবাদী প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত হয়েছে। তারা অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus) থেকে হোমো সেপিয়েন্স (Homo Sapiens) পর্যন্ত একটি কাল্পনিক বংশলতিকা তৈরি করেছেন। কিন্তু বিখ্যাত অ্যানাটমিস্টগণ গবেষণার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, অস্ট্রালোপিথেকাস হলো একটি বিলুপ্ত প্রজাতির বানর যার সাথে মানুষের শারীরিক কাঠামোর কোনো মিল নেই। ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী লর্ড সলি জুকারম্যান (Lord Solly Zuckerman) দীর্ঘ ১৫ বছর গবেষণার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, মনুষ্য প্রজাতির বংশলতিকায় বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষের কোনো সম্পর্ক নেই।

মস্তিষ্কের অভ্যন্তর থেকে দেখে ও শুনে: কোন্ সে জন?
মানুষের চোখ ও কানের কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত বিস্ময়কর। আলোক রশ্মি বৈদ্যুতিক সিগন্যালে পরিণত হয়ে মস্তিষ্কের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পৌঁছায় এবং সেখানে আমরা রঙিন ও ত্রিমাত্রিক ছবি দেখতে পাই। একইভাবে শব্দ তরঙ্গ বৈদ্যুতিক সংকেত হিসাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। এই যে মস্তিষ্কের অন্ধকার ঘরে বসে কে ছবি দেখছে বা গান শুনছে? ডারউইনবাদীরা এর সদুত্তর দিতে অক্ষম। প্রকৃতপক্ষে এই মহা চেতনা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক সৃষ্ট আত্মা।

একজন বস্তুবাদীর বিশ্বাস:
বিবর্তনবাদ বর্তমানে একটি গোঁড়া মতবাদ ও অন্ধ দর্শনে পরিণত হয়েছে। এটি বস্তু ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না। কিন্তু যদি কেউ বস্তুবাদী একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে পৃথিবীর প্রাণ জগতের দিকে খোলা মনে লক্ষ্য করেন, তিনি অতি অবশ্যই প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, জগতের সমস্ত প্রাণী সেই মহাশক্তিশালী, মহাজ্ঞানী ও পরম প্রজ্ঞাময়ের সৃষ্টি। তিনিই সেই স্রষ্টা যিনি শূন্য থেকে এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি প্রত্যেক প্রাণীর নকশা, আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px