📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 পুঁজিবাদ ও অর্থনীতিতে যোগ্যতামদের টিকে থাকার সংগ্রাম

📄 পুঁজিবাদ ও অর্থনীতিতে যোগ্যতামদের টিকে থাকার সংগ্রাম


পুঁজিবাদ অর্থ হচ্ছে পুঁজির সার্বভৌমত্ব, যা একটি উন্মুক্ত ও অবাধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার ভিত্তি শুধুমাত্র লাভ বা মুনাফা। এই অর্থ ব্যবস্থায় সমাজ প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়ে থাকে। পুঁজিবাদে তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে- ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, প্রতিযোগিতা ও মুনাফা বা লাভ। পুঁজিবাদে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে সমাজের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না, বরং তাকে একজন ব্যক্তি হিসাবে একাকী স্বীয় প্রচেষ্টায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। পুঁজিবাদী সমাজ এমন একটি রঙ্গমঞ্চ যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিকে অন্যের সাথে কঠোর ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এটা এমন একটি স্থান যেমন নাকি ডারউইন বর্ণনা করেছেন—যেখানে বলশালী সমাজে টিকে থাকবে, দুর্বল ও ক্ষমতাহীন ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

পুঁজিবাদী মতবাদের যুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ব্যক্তি, কোম্পানি অথবা জাতি শুধুমাত্র নিজের সুবিধা ও উন্নতির জন্য জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় উপাদান হলো উৎপাদন। সবচেয়ে ভালো উৎপাদনকারী টিকে থাকবে, দুর্বল ও অযোগ্যরা ধ্বংস হয়ে সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় যারা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে দরিদ্রের কাতারে স্থান করে নিচ্ছে, তারাও যে মানুষ সে কথা বিবেচনায়ই আনা হচ্ছে না। এ কারণেই একজন পুঁজিপতি যাকে তিনি অর্থনৈতিক সংগ্রামে পদদলিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তিনি কখনও সেই হতদরিদ্র ব্যক্তির জন্য কোনো নৈতিকতা বা সহানুভূতি অনুভব করেন না। এটাই সমাজে অর্থনৈতিক ডারউইনবাদের বাস্তব প্রয়োগ।

সামাজিক ডারউইনবাদের অন্যতম প্রবক্তা হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer), যিনি জনজীবনে সামাজিক ডারউইনবাদের নীতি প্রয়োগের প্রথা চালু করেন। তিনি বলেন, যদি কেহ গরিব হয়ে থাকে এটা তারই দোষ, তাই তাকে ধনী করার ব্যাপারে অবশ্যই কেহ কোনো রকম সাহায্য সহযোগিতা করবে না। যত অনৈতিক পদ্ধতিতেই হোক না কেন, ধনী হওয়াটাই তার যোগ্যতা। এ কারণেই ধনী ব্যক্তি টিকে থাকবে, পক্ষান্তরে গরিব মানুষ সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। স্পেন্সার সকল প্রকার সমাজ কল্যাণমূলক কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিরোধিতা করেন। এমনকি স্বাস্থ্য সেবা বা স্কুলে সরকারি সহায়তা প্রদানেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। কারণ সামাজিক ডারউইনবাদের মতে, সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস শক্তিধরদের টিকে থাকার নীতির ভিত্তিতে প্রণীত।

আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গ্রাহাম সামনার (Graham Sumner) ছিলেন আমেরিকায় সামাজিক ডারউইনবাদের মুখপাত্র। তার মতে, সমাজের কোটিপতিরাই হচ্ছে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি এবং সকল প্রকার সুবিধা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত। তারা কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব। এই মতাদর্শ প্রচারের ফলে মানুষের মনে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাহায্য, সহযোগিতা ও মানবতাবাদ ইত্যাদি চিন্তা-চেতনা সম্পূর্ণরূপে অপসৃত হয় এবং এর বদলে স্বার্থপরতা, চতুরতা ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে প্রশংসনীয় হিসাবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ববিখ্যাত ধনী পুঁজিপতি রকফেলার (Rockefeller) দাবি করেন: “বৃহৎ ব্যবসার বিকাশ হলো যোগ্যতমদের টিকে থাকার বাস্তব প্রতিফলন। এটা প্রাকৃতিক আইনের সামাজিক বাস্তবায়ন।” পুঁজিবাদ জনসাধারণকে শুধুমাত্র টাকা ও ক্ষমতাকে পূজা করতে বাধ্য করে এবং পৃথিবীর সকল ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে গুরুত্বহীন হিসাবে বিবেচনা করে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজ ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী নৈতিকতার প্রভাব বিদ্যমান। এ কারণে গরিব, অসহায় ও পঙ্গুদের কোনো প্রকার দয়া দাক্ষিণ্য বা সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া হয় না। দারিদ্র্য পীড়িত দেশগুলোর অনাহারে মৃত্যুর কারণও এই পুঁজিবাদী নৈতিকতা। ডারউইনবাদ গত ১৫০ বছরে সকল চিন্তাধারা ও মূল্যবোধকে পিছনে ফেলে বিশ্ব মানবতার জন্য শুধু দুঃখ, বেদনা ও হতাশা বয়ে নিয়ে এসেছে।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসে ডারউইনবাদ

📄 নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসে ডারউইনবাদ


বিশ্বমানবতা তথা মানব জাতির জন্য ডারউইনবাদ সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি সাধন করেছে তা হলো জনগণের ধর্ম বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করা। ধর্মীয় সকল প্রকার নীতি ও মূল্যবোধ অপসৃত হলো, ফলে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করে ফেলল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ডারউইনবাদী জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মেয়ার (Ernst Mayr) লিখেছেন: “ডারউইনের সময়কাল থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীকার করে আসছেন যে, মানুষ ও বানর একই বংশধারা থেকে উদ্ভূত। বিবর্তনবাদ মানুষের চিন্তাধারার সকল ক্ষেত্র অর্থাৎ দর্শন, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে।”

ডারউইনবাদের মতাদর্শের আধিপত্য সমাজ জীবনে একটি অতি শক্তিশালী সম্মোহনী হিসাবে কাজ করেছে। যুব সম্প্রদায়ের এক বিশাল অংশ যাদের জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম, তারাই বিশেষ করে সহজে ডারউইনবাদের শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সিনেমা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে গত ১৫০ বছর যাবৎ ডারউইনবাদকে সত্য হিসাবে বিশ্বাস করানো হচ্ছে, যদিও তা প্রতারণামূলক ও অবৈজ্ঞানিক হিসাবে প্রমাণিত। সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ধর্ম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের হেয় করার মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ভাগ্যকে অস্বীকার করা হয়।

ডারউইনবাদের প্রভাবে এমন একটি সমাজ গঠিত হয়েছে, যেখানে মানুষ তার কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহিতা বা নৈতিক দায়-দায়িত্ব অনুভব করে না। ফলে সমাজে হত্যা, পতিতাবৃত্তি, প্রতারণা, জুয়াচুরি ও দুর্নীতির মতো অনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবর্তনবাদের সমর্থক কেন হ্যাম (Ken Ham) লিখেছেন: “যদি আপনি আল্লাহকে অস্বীকার করেন, তবে ন্যায় ও অন্যায়ের কোনো ভিত্তি থাকে না। জনগণ নিজেরাই নিজেদের আইন প্রণয়ন করবে।” বিখ্যাত বিবর্তনবাদী থিওডোসিয়াস ডবঝানস্কি স্বীকার করেন যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অহমিকাবাদ, কাপুরুষতা, প্রতারণা ও শোষণকে লালন করে থাকে।

ডারউইনবাদ মানুষকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। অনেক ডারউইনবাদী বিজ্ঞানী যুক্তি দেন যে, মানুষের অপরাধ প্রবণতা আসলে তাদের পশু পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। এই বিকৃত চিন্তাধারার প্রভাবে অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। ডারউইনবাদ মানুষের বিবেক, ইচ্ছাশক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং মানুষকে পশু প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত প্রাণী হিসাবে মনে করে।

কোনো ব্যক্তির জীবনের যদি কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তার চরিত্রোন্নয়নের কোনো প্রচেষ্টাই থাকে না। ডারউইনবাদী দর্শনের ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বহীন ও লক্ষ্যহীন মনে করে। আত্মহত্যা, মানসিক সমস্যা ও হতাশা হলো ডারউইনবাদের প্রত্যক্ষ ফল। রিচার্ড ডকিন্স-এর মতো বিবর্তনবাদীরা মনে করেন মানুষ একটি প্রজনন যন্ত্র মাত্র। যারা এই বিভ্রান্তিকর চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন থাকে, তারা সহজেই হতাশায় ডুবে যায়। কারণ তাদের কাছে প্রেম, ভালোবাসা, সত্য ও সততা—সবই নিরর্থক। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তারা জীবনের মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন এবং কখনো হতাশাগ্রস্ত হয় না।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 উপসংহার : ডারউইনবাদী বিষবাষ্প অবশ্যই নিষ্কাশন করতে হবে

📄 উপসংহার : ডারউইনবাদী বিষবাষ্প অবশ্যই নিষ্কাশন করতে হবে


মানব ইতিহাসের সকল যুগেই যুদ্ধ, সংঘাত, অত্যাচার ও খুন বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ডারউইনবাদ মিথ্যা ও তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মুখোশের আবরণ ব্যবহার করেছে। বিংশ শতকে তার ফলে যে সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত অত্যাচার ও যুদ্ধের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এর ব্যাপ্তি ও বিস্তার পৃথিবীর ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। জীবনের সৃষ্টি ও বিকাশ সম্বন্ধে ডারউইনবাদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর দাবি ও ধারণা এ সব মতাদর্শ তথা দর্শন গুপ্তঘাতক, স্বৈরশাসক, বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন পীড়নকারী সকলের কর্মকাণ্ডকেই এক ধরনের নৈতিক সমর্থন দান করে বলেছে এটা হলো “প্রাকৃতিক আইন” যা প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের মতো মনুষ্য সমাজে সমভাবে প্রযোজ্য।

আমাদের সময়ে বিবর্তনবাদকে দার্শনিক ও আদর্শিক কারণে যৌক্তিক হিসাবে সমর্থন প্রদান করা হয়। বিংশ শতকে উপনিবেশবাদ তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। জার্মানীতে নাজীবাদ, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র অতীতের ঘটনা হিসাবে পরিগণিত। কিন্তু ডারউইনবাদী বস্তুবাদী দর্শন যা এ সমস্ত মতাদর্শের ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত তা বর্তমানেও অত্যন্ত জোরেশোরে কোনো কোনো মহল কর্তৃক সমর্থন ও সুরক্ষা করা হয়। তাই এ দর্শনের নীরব উপস্থিতি তথা প্রভাব পৃথিবীর সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অনুভব করা যায়। মানব সমাজে বিপর্যয়ে ডারউইনবাদের ভূমিকা সম্পর্কে Kenneth J. Hsu ব্যক্তিগতভাবে একজন ডারউইনবাদী হওয়া সত্ত্বেও লিখেছেন যেঃ “আমরা একটি নিষ্ঠুর সামাজিক মতাদর্শের অসহায় শিকার, যা এমন শিক্ষাই দেয় যে, ব্যক্তি, শ্রেণি ও জাতি সমূহ এক কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ, আর এটাই জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা। এটাও অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ স্বভাবতই তাদের থেকে ক্ষুদ্র বা নীচুদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের আইন কোনো বিজ্ঞান নয় বরং এটা একটি শয়তানী বা ভ্রষ্ট সামাজিক মতবাদ।”

এ কারণেই বিচারিক বা বাহ্যিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে এই সামাজিক ডারউইনবাদের দুষ্টক্ষতকে আবরণ দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। এর স্থায়ী সমাধান রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক চিকিৎসায়। অর্থাৎ সমাজের বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যপট থেকে ডারউইনবাদের অপসারণ বা ধ্বংসের সাথে সাথেই যে সমস্ত মতাদর্শ এর থেকে শক্তি বা রস আহরণ করত তা অদৃশ্য বা শেষ হয়ে যাবে। আর এর অর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছায় সমাজ তথা পৃথিবীর সকল অত্যাচার ও নিপীড়নের চিরস্থায়ী অবসান।

এ কারণে ঈমানদার, বিবেকবান ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সম্পন্ন লোকদের উপর একটি গুরু দায়িত্ব রয়েছে। ডারউইনবাদ বিগত শতকের পৃথিবীতে যে বিপর্যয় সৃষ্টি ও জন দুর্ভোগের কারণ ছিল তা ভুলে যাওয়া বা একে অবমূল্যায়ন করা একটি বড় ধরনের ভুল হবে। যিনি এ বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে অনুধাবন করেছেন, তিনি এই মতবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক আক্রমণ তথা আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন, যাতে করে বিগত ১৫০ বৎসরের এই মহা প্রবঞ্চনা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়। এই প্রবঞ্চনামূলক মতাদর্শ সমাজ থেকে অপসারণ করার একটি মাত্র পদ্ধতি রয়েছে। তা হলো, মানব জাতির সম্মুখে যত প্রশ্ন বা সমস্যা রয়েছে তার যথাযথ সমাধান। পবিত্র কোরআনের নৈতিক চরিত্রের সার্বিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এটা হওয়া সম্ভব। এ সমস্ত বিপর্যয়, দুঃখ-দুর্দশার তখনই অবসান হবে, যখন জনগণ ধর্মে প্রকৃত বিশ্বাসী হবে। পবিত্র কোরআন অনুযায়ী যখন সুন্দর, স্নেহ, মমতা, প্রেম, দয়া, সুবিচার, সহযোগিতা ও ধৈর্য সমাজে বিরাজ করবে। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে - “সত্য আসবে মিথ্যা দূর হয়ে যাবে” বলুন সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে মিথ্যা তো বিলুপ্ত হইবারই (সুরা বানি ইসরাইল-৮১)।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 পরিশিষ্ট : বিবর্তনবাদের বিভ্রান্ত/ভূল ধারনা

📄 পরিশিষ্ট : বিবর্তনবাদের বিভ্রান্ত/ভূল ধারনা


ডারউইনবাদ অথবা বিবর্তনবাদ তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে একটি ভ্রমাত্মক ও অবৈজ্ঞানিক মতবাদ, যা স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছিল কিন্তু সে উদ্দেশ্যে সাধনে এটি ব্যর্থ হয়েছে। এ মতবাদ অনুযায়ী পৃথিবীতে জীবনের সূচনা হয়েছে অজৈব পদার্থ থেকে পর্যায়ক্রমিক দৈবাৎ সংঘটিত ঘটনাবলীর সংমিশ্রণে। এই মতবাদ নানাভাবে নিন্দিত হয় যখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় যে, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা যিনি এ বিশ্ব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়াদিও এ শৃঙ্খলার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পক্ষান্তরে এ মতবাদের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রাণীকুল আল্লাহ সৃষ্টি করেন নাই বরং দৈবাৎ সেগুলো সৃষ্টি হয়েছে—এটি সত্য বলে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আমরা ডারউইনবাদ পর্যালোচনা করে সত্যিই দেখতে পাই যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এ তত্ত্বের কোনো ভিত্তি নেই। অজৈব পদার্থের তুলনায় জৈব প্রাণের সৃষ্টি কাঠামো অনেক বেশি জটিল ও অভিনব। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, অজৈব পদার্থের অণুগুলো কিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, উপরন্তু এ অণুগুলো আবার কিভাবে জটিল কাঠামোর আওতায় প্রাণী জগতে সুবিন্যস্তভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পাই কি অসাধারণ কৌশল ও প্রক্রিয়ায় এগুলোকে বিন্যাস করা হয়েছে যেমন—প্রোটিন, ক্রোমোজোম ও এনজাইম প্রভৃতি। জীব জগতের এ অসাধারণ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের পর বিংশ শতকে বিবর্তনবাদ বাতিল বা মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ডারউইনবাদের পতনের কারণ:
ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে বিবর্তনবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে, এ মতবাদের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে প্রাচীন গ্রিস দেশে এর উৎস পাওয়া যায়। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের ‘দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ প্রকাশিত হওয়ার পর এ মতবাদ বিশ্বের বিজ্ঞান জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রজাতি আলাদাভাবে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, এ পুস্তকে ডারউইন এ ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। ডারউইন দাবি করেন সকল প্রজাতি একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ (Common Ancestor) থেকে সময়ের বিবর্তনে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। ডারউইন নিজেই বলেছেন যে, তার এ মতবাদ কোনো মজবুত বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় বরং এ তত্ত্ব “স্বাভাবিক যুক্তির ক্রমবৃদ্ধির” একটি পর্যায়ক্রম ব্যাখ্যা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে ডারউইন তার পুস্তকের একটি অধ্যায়ে ‘The Difficulties on Theory’ শিরোনামে নিজেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যার কোনো উত্তর তার নিজেরই জানা ছিল না।

প্রাণের উৎস:
ডারউইনের দাবি অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি মাত্র কোষ থেকে সকল প্রজাতির সৃষ্টির উন্মেষ হয়। কেমন করে একটি মাত্র কোষ থেকে লক্ষ লক্ষ জটিল প্রজাতি সমূহ সৃষ্টি হতে পারে, আর যদি হয়েই থাকে তার কোনো জীবাশ্ম প্রমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্যানুসন্ধানে না পাওয়ার কারণই বা কি? এর সদুত্তর এ মতবাদের ভিতর পাওয়া যায় না। বিবর্তনবাদ যেহেতু সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় কোনো আধিভৌতিক সত্তার বা শক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তাই এ মতবাদ দাবি করে যে, প্রথম কোষটি কোনো প্রকার পরিকল্পনা বা শৃঙ্খলার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নাই বরং তা হঠাৎ করে প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অস্তিত্বে এসে যায়। এ ধারণা জীববিজ্ঞানের মৌলিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বিধায় তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

জীবন থেকে জীবন আসে:
লুই পাস্তর (Louis Pasteur) দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বলেন, অজৈব পদার্থ থেকে প্রাণের সঞ্চার হয় এ ধারণা চিরদিনের জন্য কবরে প্রোথিত করা হলো। ডারউইনবাদীরা পাস্তরের এ মতবাদ প্রচারে দীর্ঘদিন যাবত বাধা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এটি বিজ্ঞান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জীব জগতের কোষের জটিল কাঠামো অবধারিতভাবে প্রমাণিত হয় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণের উন্মেষ ঘটে—এই তত্ত্ব বাতিল হিসাবে গণ্য হয়।

জৈব কাঠামোর জটিলতা:
সাধারণভাবে সবচেয়ে সরল প্রকৃতির প্রাণী হিসাবে বিবেচনা করা হয় যে সব প্রাণীকে, তাদের জৈব কাঠামো অবিশ্বাস্যভাবে জটিল। মানব জাতি যত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছে তার চেয়ে একটি জীবন্ত কোষ অনেক বেশি জটিল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ডিএনএ (DNA) অণু যা নিউক্লিয়াসের মধ্যে অবস্থান করে, এই ডিএনএ-র মধ্যে মানুষের জন্ম বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত থাকে। মানুষের জেনেটিক কোড (genetic code) যদি কাগজের উপর লিখা হয় তাহলে ৫০০ পৃষ্ঠার ৯০০টি বই হবে। প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিড উভয়েরই কাঠামোগত প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির, তাই এ দুটি একই সমতালে বিক্রিয়া করে নতুন সৃষ্টির বিষয়টি কার্যত অসম্ভব।

জীবাশ্ম প্রমাণ:
ডারউইনের বিবর্তনবাদের ঘটনা যে কখনো ঘটেনি তার সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণ হলো জীবাশ্মের আস্তিত্বের অনুপস্থিতি। ডারউইন দাবি করেছিলেন যে বিবর্তনের ধারায় অসংখ্য অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির অস্তিত্ব থাকা উচিত। কিন্তু ঊনবিংশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সকল স্থানে জীবাশ্ম গবেষণা পরিচালনা করা সত্ত্বেও এ ধরনের কোনো অন্তবর্তী আকৃতির প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। জীবাশ্ম পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রজাতি সমূহ পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণরূপে হঠাৎ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছে।

মানব সৃষ্টির কল্পকাহিনী:
ডারউইনবাদীরা দাবি করে থাকেন যে, আধুনিক মানুষ কিছু সংখ্যক বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনবাদী প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত হয়েছে। তারা অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus) থেকে হোমো সেপিয়েন্স (Homo Sapiens) পর্যন্ত একটি কাল্পনিক বংশলতিকা তৈরি করেছেন। কিন্তু বিখ্যাত অ্যানাটমিস্টগণ গবেষণার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, অস্ট্রালোপিথেকাস হলো একটি বিলুপ্ত প্রজাতির বানর যার সাথে মানুষের শারীরিক কাঠামোর কোনো মিল নেই। ব্রিটিশ বিবর্তনবাদী লর্ড সলি জুকারম্যান (Lord Solly Zuckerman) দীর্ঘ ১৫ বছর গবেষণার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, মনুষ্য প্রজাতির বংশলতিকায় বানর প্রজাতির পূর্বপুরুষের কোনো সম্পর্ক নেই।

মস্তিষ্কের অভ্যন্তর থেকে দেখে ও শুনে: কোন্ সে জন?
মানুষের চোখ ও কানের কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত বিস্ময়কর। আলোক রশ্মি বৈদ্যুতিক সিগন্যালে পরিণত হয়ে মস্তিষ্কের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পৌঁছায় এবং সেখানে আমরা রঙিন ও ত্রিমাত্রিক ছবি দেখতে পাই। একইভাবে শব্দ তরঙ্গ বৈদ্যুতিক সংকেত হিসাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। এই যে মস্তিষ্কের অন্ধকার ঘরে বসে কে ছবি দেখছে বা গান শুনছে? ডারউইনবাদীরা এর সদুত্তর দিতে অক্ষম। প্রকৃতপক্ষে এই মহা চেতনা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক সৃষ্ট আত্মা।

একজন বস্তুবাদীর বিশ্বাস:
বিবর্তনবাদ বর্তমানে একটি গোঁড়া মতবাদ ও অন্ধ দর্শনে পরিণত হয়েছে। এটি বস্তু ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না। কিন্তু যদি কেউ বস্তুবাদী একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে পৃথিবীর প্রাণ জগতের দিকে খোলা মনে লক্ষ্য করেন, তিনি অতি অবশ্যই প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, জগতের সমস্ত প্রাণী সেই মহাশক্তিশালী, মহাজ্ঞানী ও পরম প্রজ্ঞাময়ের সৃষ্টি। তিনিই সেই স্রষ্টা যিনি শূন্য থেকে এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি প্রত্যেক প্রাণীর নকশা, আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px