📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 ডারউইনবাদ কমিউনিজম বর্বরতার উৎস ও ভিত্তি

📄 ডারউইনবাদ কমিউনিজম বর্বরতার উৎস ও ভিত্তি


বিংশ শতাব্দীতে যে মতাদর্শ মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বর্বরোচিত ও ক্ষতিকারক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেই মতাদর্শের নাম সমাজতন্ত্র। উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র যে দুজন জার্মান দার্শনিকের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে, তারা হচ্ছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। এই মতাদর্শ পৃথিবীতে এত রক্তপাত ঘটায় যে নাজি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের অত্যাচারকেও তা ম্লান করেছে। এই মতাদর্শ অগণিত নিরীহ লোককে হত্যা করেছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংঘাত, ভয়, হতাশা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে গ্রাস করেছে। এমনকি এখনও যদি কেহ "লৌহ যবনিকা" ও রাশিয়ার কথা উল্লেখ করে তখন জনমনে এমন এক ত্রাসের সমাজের কথা মনে হয়, সেখানে অন্ধকার, কুয়াশা এবং হতাশা জনপ্রাণহীন রাস্তাঘাট, দুঃখ-কষ্ট ও এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও ১৯৯১ সালে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে তবুও এর ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। অনুমোদনহীন সমাজবাদী-মার্কসবাদীদের কিছু ব্যক্তি যতই মুক্ত বুদ্ধি সম্পন্ন জড়বাদী দর্শন এবং সমাজবাদের অন্ধকার দিক এখনও পর্যন্ত জনগণকে প্রভাবিত করছে। প্রকৃতপক্ষে এই চিন্তাধারা ও মতাদর্শ মানব সমাজকে ধর্মহীন এবং নীতিহীন হিসাবে প্রতিপালন করে চলেছে।

এই মতাদর্শ যা পৃথিবীর সকল ভৌগোলিক এলাকায় সন্ত্রাস ও সংঘাতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে আদিকালের একটি মতবাদের প্রতিনিধিত্বকারী মতাদর্শ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এটি এমন একটি বিশ্বাস যা বিবেচনা করে যে, পৃথিবীতে সকল ধরনের উন্নতি বা বিকাশ হলো দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের ফসল। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে মার্কস এবং এঙ্গেলস পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেন। মার্কস দাবি করেন, মানব জাতির ইতিহাস হলো দ্বন্দ্ব সংঘাত ও সংগ্রামের ইতিহাস। মানব জাতির বর্তমান সমস্যা হচ্ছে শ্রমিকদের সাথে পুঁজিপতিদের সংগ্রাম বা যুদ্ধ। শ্রমিক সম্প্রদায় অচিরেই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি সাম্যবাদী সমাজ গঠন করবে।

অন্যান্য জড়বাদী দার্শনিকদের ন্যায় সমাজতন্ত্রের এই দুই প্রতিষ্ঠাতা, ধর্ম সম্পর্কে একটি সুগভীর ঘৃণা পোষণ করতেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস দুজনে নাস্তিক্যবাদের অনুসারী ছিলেন এবং সমাজতন্ত্র প্রচারের জন্য ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশাসনকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা একটি অপরিহার্য কার্যক্রম হিসাবে তারা বিবেচনা করতেন। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস এর এ মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল তা হলোঃ ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের মতাদর্শকে একটি বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়া। ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ বইতে বিবর্তনবাদের যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, মার্কস ও এঙ্গেলস প্রকৃতপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশের জন্য এ ধরনের তত্ত্বের অনুসন্ধানেই ছিলেন। চার্লস ডারউইন দাবি করেন যে, প্রত্যেকটি প্রাণী টিকে থাকার সংগ্রাম অথবা দ্বান্দ্বিক সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকে। মার্কস ও এঙ্গেলস এই ভাবধারা তথা মতাদর্শকে সানন্দে গ্রহণ করেন।

সমাজতন্ত্রের প্রচার ও প্রসারের জন্য ডারউইনবাদের অপরিহার্যতা জানা যায় এ ব্যাপারে মার্কস ও এঙ্গেলসের পত্রালাপ থেকে। ডারউইনের পুস্তক প্রকাশিত (১৮৫৯) হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এঙ্গেলস মার্কসের কাছে এক পত্রে লিখেন: “ডারউইন যার পুস্তক (The Origin of Species) আমি এখন পড়ছি তা এক কথায় অপূর্ব ও চমৎকার।” এর উত্তরে মার্কস ১৯ ডিসেম্বর ১৮৬০ সালে এঙ্গেলসকে লিখলেন; “এই বইতে আমাদের মতাদর্শের প্রাকৃতিক ইতিহাসের মূল সূত্র বর্ণনা করা হয়েছে।” ১৮৬১ সালের ১৬ জানুয়ারি মার্কস তার সমাজবাদী বন্ধু LASSALLE কে লিখেন: “ডারউইনের পুস্তকটি আমার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানব ইতিহাসের শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তি তত্ত্ব সম্বলিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব এ বইতে বর্ণনা করা হয়েছে।”

মার্কস তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক ‘ডাস ক্যাপিটাল’ (DAS CAPITAL) ডারউইনের নামে উৎসর্গ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে মার্কস নিজেকে বৃটিশ প্রকৃতিবিদ ডারউইনের একজন একান্ত ভক্ত (Sincere admirer) হিসাবে উল্লেখ করেন। অনুরূপভাবে এঙ্গেলসও ডারউইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে উল্লেখ করেন যে, প্রকৃতি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কার্যক্ষেত্র; তাই এটা অবশ্যই সঠিক যে, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি দ্বান্দ্বিকভাবেই কাজ করে থাকে কোনো আধিভৌতিক সত্তার মাধ্যমে নয়। এ ব্যাপারে ডারউইনের নামই অন্য সবার আগে উল্লেখযোগ্য।

সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ মার্কস ও এঙ্গেলসের নীতি বাস্তবায়িত করেছিলেন যাদের সাথে বিবর্তনবাদীদের আদর্শগত মিল ছিল। লেনিন, ট্রটস্কি এবং স্ট্যালিন—প্রত্যেকেই ডারউইনবাদকে তাদের বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। স্ট্যালিন তার ৩০ বছরের শাসনামলে প্রায় ২০ মিলিয়ন লোককে হত্যা করেন। স্ট্যালিনের নিজের ভাষায় এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ডারউইনের বিবর্তনবাদ। স্ট্যালিনের জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন যে, শৈশবে স্ট্যালিন যখন গির্জার স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তখন তিনি ডারউইনের পুস্তক পাঠ করে একজন নাস্তিকে পরিণত হন। মাওসেতুং-এর নেতৃত্বে চীনেও ডারউইনবাদ ও মার্কসবাদের ভিত্তিতে এক ভয়াবহ নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলা হয়। সেখানেও কয়েক মিলিয়ন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

কমিউনিস্টরা যেখানেই ক্ষমতায় আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানেই নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশসমূহের জনগণ অনুরূপ ঘটনার শিকার হয়েছে। ‘দ্য ব্ল্যাক বুক অব কমিউনিজম’ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রায় ১০০ মিলিয়ন লোক মৃত্যুবরণ করেছে। ডারউইনবাদের প্রভাবেই কমিউনিস্টরা মানুষকে পশু হিসাবে মনে করে এবং পশুর সাথে যেমন আচরণ করা উচিত তাই করে থাকে। নাস্তিক্যবাদী ডারউইনবাদ সব রকমের নির্যাতন, নিপীড়ন, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, নিষ্ঠুরতা ও হত্যা সমর্থন করে, যদিও ধর্ম এসব কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 পুঁজিবাদ ও অর্থনীতিতে যোগ্যতামদের টিকে থাকার সংগ্রাম

📄 পুঁজিবাদ ও অর্থনীতিতে যোগ্যতামদের টিকে থাকার সংগ্রাম


পুঁজিবাদ অর্থ হচ্ছে পুঁজির সার্বভৌমত্ব, যা একটি উন্মুক্ত ও অবাধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার ভিত্তি শুধুমাত্র লাভ বা মুনাফা। এই অর্থ ব্যবস্থায় সমাজ প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়ে থাকে। পুঁজিবাদে তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে- ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, প্রতিযোগিতা ও মুনাফা বা লাভ। পুঁজিবাদে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে সমাজের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না, বরং তাকে একজন ব্যক্তি হিসাবে একাকী স্বীয় প্রচেষ্টায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। পুঁজিবাদী সমাজ এমন একটি রঙ্গমঞ্চ যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিকে অন্যের সাথে কঠোর ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এটা এমন একটি স্থান যেমন নাকি ডারউইন বর্ণনা করেছেন—যেখানে বলশালী সমাজে টিকে থাকবে, দুর্বল ও ক্ষমতাহীন ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

পুঁজিবাদী মতবাদের যুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ব্যক্তি, কোম্পানি অথবা জাতি শুধুমাত্র নিজের সুবিধা ও উন্নতির জন্য জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় উপাদান হলো উৎপাদন। সবচেয়ে ভালো উৎপাদনকারী টিকে থাকবে, দুর্বল ও অযোগ্যরা ধ্বংস হয়ে সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় যারা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে দরিদ্রের কাতারে স্থান করে নিচ্ছে, তারাও যে মানুষ সে কথা বিবেচনায়ই আনা হচ্ছে না। এ কারণেই একজন পুঁজিপতি যাকে তিনি অর্থনৈতিক সংগ্রামে পদদলিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তিনি কখনও সেই হতদরিদ্র ব্যক্তির জন্য কোনো নৈতিকতা বা সহানুভূতি অনুভব করেন না। এটাই সমাজে অর্থনৈতিক ডারউইনবাদের বাস্তব প্রয়োগ।

সামাজিক ডারউইনবাদের অন্যতম প্রবক্তা হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer), যিনি জনজীবনে সামাজিক ডারউইনবাদের নীতি প্রয়োগের প্রথা চালু করেন। তিনি বলেন, যদি কেহ গরিব হয়ে থাকে এটা তারই দোষ, তাই তাকে ধনী করার ব্যাপারে অবশ্যই কেহ কোনো রকম সাহায্য সহযোগিতা করবে না। যত অনৈতিক পদ্ধতিতেই হোক না কেন, ধনী হওয়াটাই তার যোগ্যতা। এ কারণেই ধনী ব্যক্তি টিকে থাকবে, পক্ষান্তরে গরিব মানুষ সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। স্পেন্সার সকল প্রকার সমাজ কল্যাণমূলক কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিরোধিতা করেন। এমনকি স্বাস্থ্য সেবা বা স্কুলে সরকারি সহায়তা প্রদানেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। কারণ সামাজিক ডারউইনবাদের মতে, সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস শক্তিধরদের টিকে থাকার নীতির ভিত্তিতে প্রণীত।

আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গ্রাহাম সামনার (Graham Sumner) ছিলেন আমেরিকায় সামাজিক ডারউইনবাদের মুখপাত্র। তার মতে, সমাজের কোটিপতিরাই হচ্ছে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি এবং সকল প্রকার সুবিধা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত। তারা কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব। এই মতাদর্শ প্রচারের ফলে মানুষের মনে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাহায্য, সহযোগিতা ও মানবতাবাদ ইত্যাদি চিন্তা-চেতনা সম্পূর্ণরূপে অপসৃত হয় এবং এর বদলে স্বার্থপরতা, চতুরতা ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে প্রশংসনীয় হিসাবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ববিখ্যাত ধনী পুঁজিপতি রকফেলার (Rockefeller) দাবি করেন: “বৃহৎ ব্যবসার বিকাশ হলো যোগ্যতমদের টিকে থাকার বাস্তব প্রতিফলন। এটা প্রাকৃতিক আইনের সামাজিক বাস্তবায়ন।” পুঁজিবাদ জনসাধারণকে শুধুমাত্র টাকা ও ক্ষমতাকে পূজা করতে বাধ্য করে এবং পৃথিবীর সকল ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে গুরুত্বহীন হিসাবে বিবেচনা করে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজ ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী নৈতিকতার প্রভাব বিদ্যমান। এ কারণে গরিব, অসহায় ও পঙ্গুদের কোনো প্রকার দয়া দাক্ষিণ্য বা সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া হয় না। দারিদ্র্য পীড়িত দেশগুলোর অনাহারে মৃত্যুর কারণও এই পুঁজিবাদী নৈতিকতা। ডারউইনবাদ গত ১৫০ বছরে সকল চিন্তাধারা ও মূল্যবোধকে পিছনে ফেলে বিশ্ব মানবতার জন্য শুধু দুঃখ, বেদনা ও হতাশা বয়ে নিয়ে এসেছে।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসে ডারউইনবাদ

📄 নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসে ডারউইনবাদ


বিশ্বমানবতা তথা মানব জাতির জন্য ডারউইনবাদ সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি সাধন করেছে তা হলো জনগণের ধর্ম বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করা। ধর্মীয় সকল প্রকার নীতি ও মূল্যবোধ অপসৃত হলো, ফলে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করে ফেলল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ডারউইনবাদী জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মেয়ার (Ernst Mayr) লিখেছেন: “ডারউইনের সময়কাল থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীকার করে আসছেন যে, মানুষ ও বানর একই বংশধারা থেকে উদ্ভূত। বিবর্তনবাদ মানুষের চিন্তাধারার সকল ক্ষেত্র অর্থাৎ দর্শন, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে।”

ডারউইনবাদের মতাদর্শের আধিপত্য সমাজ জীবনে একটি অতি শক্তিশালী সম্মোহনী হিসাবে কাজ করেছে। যুব সম্প্রদায়ের এক বিশাল অংশ যাদের জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম, তারাই বিশেষ করে সহজে ডারউইনবাদের শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সিনেমা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে গত ১৫০ বছর যাবৎ ডারউইনবাদকে সত্য হিসাবে বিশ্বাস করানো হচ্ছে, যদিও তা প্রতারণামূলক ও অবৈজ্ঞানিক হিসাবে প্রমাণিত। সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ধর্ম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের হেয় করার মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ভাগ্যকে অস্বীকার করা হয়।

ডারউইনবাদের প্রভাবে এমন একটি সমাজ গঠিত হয়েছে, যেখানে মানুষ তার কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহিতা বা নৈতিক দায়-দায়িত্ব অনুভব করে না। ফলে সমাজে হত্যা, পতিতাবৃত্তি, প্রতারণা, জুয়াচুরি ও দুর্নীতির মতো অনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবর্তনবাদের সমর্থক কেন হ্যাম (Ken Ham) লিখেছেন: “যদি আপনি আল্লাহকে অস্বীকার করেন, তবে ন্যায় ও অন্যায়ের কোনো ভিত্তি থাকে না। জনগণ নিজেরাই নিজেদের আইন প্রণয়ন করবে।” বিখ্যাত বিবর্তনবাদী থিওডোসিয়াস ডবঝানস্কি স্বীকার করেন যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অহমিকাবাদ, কাপুরুষতা, প্রতারণা ও শোষণকে লালন করে থাকে।

ডারউইনবাদ মানুষকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। অনেক ডারউইনবাদী বিজ্ঞানী যুক্তি দেন যে, মানুষের অপরাধ প্রবণতা আসলে তাদের পশু পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। এই বিকৃত চিন্তাধারার প্রভাবে অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। ডারউইনবাদ মানুষের বিবেক, ইচ্ছাশক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং মানুষকে পশু প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত প্রাণী হিসাবে মনে করে।

কোনো ব্যক্তির জীবনের যদি কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তার চরিত্রোন্নয়নের কোনো প্রচেষ্টাই থাকে না। ডারউইনবাদী দর্শনের ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বহীন ও লক্ষ্যহীন মনে করে। আত্মহত্যা, মানসিক সমস্যা ও হতাশা হলো ডারউইনবাদের প্রত্যক্ষ ফল। রিচার্ড ডকিন্স-এর মতো বিবর্তনবাদীরা মনে করেন মানুষ একটি প্রজনন যন্ত্র মাত্র। যারা এই বিভ্রান্তিকর চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন থাকে, তারা সহজেই হতাশায় ডুবে যায়। কারণ তাদের কাছে প্রেম, ভালোবাসা, সত্য ও সততা—সবই নিরর্থক। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তারা জীবনের মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন এবং কখনো হতাশাগ্রস্ত হয় না।

📘 ডারউইনবাদঃ বিশ্বমানবতার অভিশাপ 📄 উপসংহার : ডারউইনবাদী বিষবাষ্প অবশ্যই নিষ্কাশন করতে হবে

📄 উপসংহার : ডারউইনবাদী বিষবাষ্প অবশ্যই নিষ্কাশন করতে হবে


মানব ইতিহাসের সকল যুগেই যুদ্ধ, সংঘাত, অত্যাচার ও খুন বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ডারউইনবাদ মিথ্যা ও তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মুখোশের আবরণ ব্যবহার করেছে। বিংশ শতকে তার ফলে যে সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত অত্যাচার ও যুদ্ধের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এর ব্যাপ্তি ও বিস্তার পৃথিবীর ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। জীবনের সৃষ্টি ও বিকাশ সম্বন্ধে ডারউইনবাদের সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর দাবি ও ধারণা এ সব মতাদর্শ তথা দর্শন গুপ্তঘাতক, স্বৈরশাসক, বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন পীড়নকারী সকলের কর্মকাণ্ডকেই এক ধরনের নৈতিক সমর্থন দান করে বলেছে এটা হলো “প্রাকৃতিক আইন” যা প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের মতো মনুষ্য সমাজে সমভাবে প্রযোজ্য।

আমাদের সময়ে বিবর্তনবাদকে দার্শনিক ও আদর্শিক কারণে যৌক্তিক হিসাবে সমর্থন প্রদান করা হয়। বিংশ শতকে উপনিবেশবাদ তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। জার্মানীতে নাজীবাদ, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র অতীতের ঘটনা হিসাবে পরিগণিত। কিন্তু ডারউইনবাদী বস্তুবাদী দর্শন যা এ সমস্ত মতাদর্শের ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত তা বর্তমানেও অত্যন্ত জোরেশোরে কোনো কোনো মহল কর্তৃক সমর্থন ও সুরক্ষা করা হয়। তাই এ দর্শনের নীরব উপস্থিতি তথা প্রভাব পৃথিবীর সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অনুভব করা যায়। মানব সমাজে বিপর্যয়ে ডারউইনবাদের ভূমিকা সম্পর্কে Kenneth J. Hsu ব্যক্তিগতভাবে একজন ডারউইনবাদী হওয়া সত্ত্বেও লিখেছেন যেঃ “আমরা একটি নিষ্ঠুর সামাজিক মতাদর্শের অসহায় শিকার, যা এমন শিক্ষাই দেয় যে, ব্যক্তি, শ্রেণি ও জাতি সমূহ এক কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ, আর এটাই জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা। এটাও অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ স্বভাবতই তাদের থেকে ক্ষুদ্র বা নীচুদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের আইন কোনো বিজ্ঞান নয় বরং এটা একটি শয়তানী বা ভ্রষ্ট সামাজিক মতবাদ।”

এ কারণেই বিচারিক বা বাহ্যিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে এই সামাজিক ডারউইনবাদের দুষ্টক্ষতকে আবরণ দেওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। এর স্থায়ী সমাধান রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক চিকিৎসায়। অর্থাৎ সমাজের বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যপট থেকে ডারউইনবাদের অপসারণ বা ধ্বংসের সাথে সাথেই যে সমস্ত মতাদর্শ এর থেকে শক্তি বা রস আহরণ করত তা অদৃশ্য বা শেষ হয়ে যাবে। আর এর অর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছায় সমাজ তথা পৃথিবীর সকল অত্যাচার ও নিপীড়নের চিরস্থায়ী অবসান।

এ কারণে ঈমানদার, বিবেকবান ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সম্পন্ন লোকদের উপর একটি গুরু দায়িত্ব রয়েছে। ডারউইনবাদ বিগত শতকের পৃথিবীতে যে বিপর্যয় সৃষ্টি ও জন দুর্ভোগের কারণ ছিল তা ভুলে যাওয়া বা একে অবমূল্যায়ন করা একটি বড় ধরনের ভুল হবে। যিনি এ বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে অনুধাবন করেছেন, তিনি এই মতবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক আক্রমণ তথা আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন, যাতে করে বিগত ১৫০ বৎসরের এই মহা প্রবঞ্চনা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়। এই প্রবঞ্চনামূলক মতাদর্শ সমাজ থেকে অপসারণ করার একটি মাত্র পদ্ধতি রয়েছে। তা হলো, মানব জাতির সম্মুখে যত প্রশ্ন বা সমস্যা রয়েছে তার যথাযথ সমাধান। পবিত্র কোরআনের নৈতিক চরিত্রের সার্বিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এটা হওয়া সম্ভব। এ সমস্ত বিপর্যয়, দুঃখ-দুর্দশার তখনই অবসান হবে, যখন জনগণ ধর্মে প্রকৃত বিশ্বাসী হবে। পবিত্র কোরআন অনুযায়ী যখন সুন্দর, স্নেহ, মমতা, প্রেম, দয়া, সুবিচার, সহযোগিতা ও ধৈর্য সমাজে বিরাজ করবে। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে - “সত্য আসবে মিথ্যা দূর হয়ে যাবে” বলুন সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে মিথ্যা তো বিলুপ্ত হইবারই (সুরা বানি ইসরাইল-৮১)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px