📄 ডারউইনের বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদ ডারউইনবাদের সাথে ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ মিত্রতা
ডারউইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রফেসর ADAM SEDGWICK ছিলেন তাদেরই একজন যারা বিবর্তনবাদের ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে পূর্বেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই পুস্তকটি পাঠ করে এর বিষয়বস্তু অনুধাবন করার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “এই মতাদর্শ সর্বজনগ্রাহ্য হলে মানব জাতির জন্য এমন বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে আসবে যা অতীতে মানুষ কখনও প্রত্যক্ষ করে নাই।” ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে ADAM SEDGWICK এর ধারণা অমূলক ছিল না বরং ডারউইনবাদের যুক্তি ও তথাকথিত প্রাকৃতিক আইনের আওতায় যা করেছেন তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। শুধুমাত্র জাতিগত ও জন্ম তথা বর্ণগত কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। ফলে উনবিংশ শতাব্দী হয়েছে অন্ধকার যুগ। ডারউইনের পূর্বে যদিও জাতিগত বৈষম্য ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু ডারউইনবাদ এ ধরনের বৈষম্যকে একটি মিথ্যা বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব ও অলীক যৌক্তিকতা দান করেছে যা বিশ্বের ইতিহাসে কখনও নৈতিক সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয় নাই।
বর্তমানে অধিকাংশ ডারউইনবাদী দাবি করে থাকেন যে, ডারউইন কখনও বর্ণবাদী ছিলেন না বরং বর্ণবাদীরা তাদের মতবাদকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে ডারউইনের মতবাদকে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা আরো দাবি করেন, ডারউইনের পুস্তকে The Origin of Species উপ-শিরোনাম By the preservation of Favoured Races শুধুমাত্র প্রাণী জগতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। এ সব দাবীর প্রবক্তারা প্রকৃতপক্ষে এ পুস্তকে ডারউইন মানব প্রজাতি সম্পর্কে কি মতামত উপস্থাপন করেছেন তা অস্বীকার করছেন বা তা বিবেচনা করেননি।
ডারউইন তার পুস্তকে উল্লেখ করেছেন যে, মানব জাতি বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে। কোনো কোনো মানব প্রজাতি অন্যদের তুলনায় অধিকতর বিকশিত ও অগ্রসর হয়েছে। কোনো কোনো প্রজাতি বা তাদের পূর্ব পুরুষ মানবদের তুলনায় কিছুটা উন্নত বা অগ্রসর বা অধিকতর বিকশিত। এ প্রজাতির কোনো কোনটি আবার বানরের পর্যায় থেকে একটু সামান্য বেশি উন্নত। ডারউইন আরো দাবি করেন যে, (বিভিন্ন মানুষ) প্রজাতির মধ্যে “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম” পশুদের ন্যায় সমভাবে প্রযোজ্য। “অনুকূল পরিবেশ প্রাপ্ত প্রজাতি” এ সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকে। ডারউইনের মতে এ সকল ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ প্রজাতি হলো ইউরোপীয় শ্বেতকায় জাতি সমূহ। এশিয়া ও আফ্রিকায় মনুষ্য প্রজাতি “অস্তিত্বের এ সংগ্রামে পিছিয়ে রয়েছে বা তারা হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। তিনি আরো দাবি করেন যে, এ প্রজাতি সমূহ বিশ্বব্যাপী “অস্তিত্বের সংগ্রামে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে”।
“শতাব্দীর গণনায় অদূর ভবিষ্যতে সভ্য প্রজাতির মানুষ অবশ্যই অসভ্য ও বর্বর প্রজাতির জনগোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করবে এবং তাদের স্থান অধিকার করবে। মানুষ তার নিকটতম প্রজাতি এর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিকতর উন্মুক্ত ও সুশীল হবে। অর্থাৎ বর্তমানে (১৮৫৯ সালে) আফ্রিকার নিগ্রো বা অস্ট্রেলিয়ান (আদিবাসী) এবং গরিলাদের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয় তা ককেশীয়-ইউরোপীয় এবং অন্য বেবুন প্রভৃতি নিম্ন প্রজাতির থেকে উন্নত হিসাবে বিবেচনা করা যায়।” দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ-এর অন্যত্র তিনি দাবি করেছেন যে, অনুন্নত প্রজাতির জনগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত। উন্নত প্রজাতির মানুষদের তাদের জীবিত ও রক্ষা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তিনি পশু প্রজনন ও প্রতিপালনের পদ্ধতির সাথে বিষয়টি তুলনা করে উল্লেখ করেন যেঃ “অনুন্নত জনগোষ্ঠীর সাথে সাথে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল তাদের অচিরেই নির্মূল করা হবে এবং যারা সাধারণতঃ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তারাই টিকে থাকবে। আমরা সভ্য মানুষরা এই নির্মূল প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়ে থাকি, আমরা পাগল ও দুর্বলদের, মানসিক রোগগ্রস্তদের জন্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য নিবাস নির্মাণ করি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গরিবী আইন প্রণয়ন করি। আমাদের চিকিৎসকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ সব লোকের জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এটা বিশ্বাস করার যুক্তি সংগত কারণ রয়েছে যে, টিকা হাজার হাজার মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। অতীতে যারা শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল তারা গুটি বসন্তে মৃত্যুমুখে পতিত হতো। সুশীল সমাজের দুর্বল ব্যক্তিবর্গ, এ সকল কর্মকাণ্ডকে তাদের দয়া হিসাবে প্রচারণা চালান। যারা পশু প্রজনন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা অবশ্যই সন্দেহ করবেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানব প্রজাতির স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।”
আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ডারউইন তার পুস্তকে অস্ট্রেলিয়ার আদিম প্রজাতি ও আফ্রিকার নিগ্রো গেরিলাদের এক সমতালে নিয়ে এসে দাবি করেছেন যে, এ সকল জনগোষ্ঠী নির্মূল হয়ে যাওয়া উচিত। তার বিবেচনায় অন্যান্য “হীন” প্রজাতির জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা বাড়তে দেওয়া উচিত নয় যাতে এগুলি দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অতএব দেখা যাচ্ছে যে বর্ণবাদী তত্ত্বে ডারউইন উল্লেখিতভাবে তা সমর্থন ও অনুমোদন দিয়েছেন। ডারউইনের বর্ণবাদী চিন্তাধারা অনুযায়ী সুসভ্য মানুষের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো বিবর্তনবাদের প্রক্রিয়া (অর্থাৎ হীন জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কাজ) ত্বরান্বিত করা। এ পরিস্থিতিতে “বৈজ্ঞানিক” দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে বর্তমানে এ সব নিম্ন প্রজাতির কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ এ হীন জনগোষ্ঠীকে কোনো না কোনোভাবে নির্মূল হতেই হবে।
ডারউইনের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার বিভিন্ন লেখায় পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, Tierra Del Fuego জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তার বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় এ এলাকার স্থানীয় অধিবাসী সম্পর্কে তার বর্ণনায়। তিনি লিখেছেন “এরা সম্পূর্ণ নগ্ন থাকে, রং মেখে থাকে, পশুর মতো যাচ্ছে তাই আহার করে, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন, তাদের গোত্রের বাইরের লোকের প্রতি নিষ্ঠুর, তারা তাদের শত্রুকে নিপীড়ন করে আনন্দ পায়, স্ত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রাণীকে বলি দেয়, শিশুদের হত্যা করে সম্পূর্ণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি জনগোষ্ঠী।” অথচ ডারউইনের পূর্বে গবেষক WP Snow একই এলাকায় ভ্রমণ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এরা খুব শক্তিশালী যোদ্ধা। তারা তাদের শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, তাদের অনেক শিল্পকলা অতি সমৃদ্ধ, তারা সম্পদের উপর অধিকারের স্বীকৃতি দেয়, তারা তাদের বৃদ্ধা মহিলাদের কর্তৃত্ব মেনে চলে।”
এ সকল উদাহরণ থেকে দেখা যায় যে, ডারউইন একজন পুরোপুরি বর্ণবাদী লোক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ডারউইন তার পুস্তক Descent of Man এ সুসভ্য মনুষ্য প্রজাতির সাথে অনগ্রসর প্রজাতির তুলনা প্রসঙ্গে বহু ধরনের মন্তব্য করেছিলেন যা Benjamin Farrington তার বই What Darwin Really Said বইয়ে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। তাছাড়া, ডারউইনের মতবাদে সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতির কারণে সব মানুষকে আল্লাহ সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন এ বাস্তব সত্য তা জনগণ বুঝতেই পারল না। বর্ণবাদের উত্থান ও তার বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ হলো এই ডারউইনবাদ। আমেরিকান বিজ্ঞানী James Ferguson সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতির সাথে বর্ণবাদের উত্থানের গভীর সম্পর্কের বিষয় এভাবে বর্ণনা করেছেন: নতুন নৃতত্ত্ব অল্পদিনের মধ্যেই মানব সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে দুই বিবাদমান তত্ত্বের প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করল। মানব সমাজে প্রচলিত বিদ্যমান ধারণা/মতবাদ ছিল যে মানুষের গায়ের রং বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যাই হোক না কেন সকল মানুষ আদম (আঃ) থেকে আগত এবং আল্লাহ আদম সৃষ্টি করেছেন। সবাই এক বংশজাত (MONOGENISM)। যা একটি ধর্মীয় বিশ্বাস যা গির্জা কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা। এটা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু যখন এই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করে নতুন মতবাদ অর্থাৎ মানুষের (POLYGENISM) একাধিক বংশলতিকা রয়েছে, অর্থাৎ কোনো একক ব্যক্তি মানুষের আদি পিতা নয়, বিভিন্ন জাতিসত্তার পিতাও বিভিন্ন—ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বিদ্যমান ছিল তা ছিন্ন হয়ে গেল। অর্থাৎ বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা হলো।
ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ LALITA VIDYARTHI ডারউইনের বিবর্তনবাদের মাধ্যমে বর্ণবাদ কিভাবে সমাজ বিজ্ঞানে গৃহীত হয় তার বিবরণ উল্লেখ করে লিখেছেনঃ “ডারউইনের যোগ্যতম টিকে থাকে মতবাদ সমাজ বিজ্ঞানীগণ স্বাগত জানালেন। তারা বিশ্বাস করলেন মানব প্রজাতি বিভিন্ন বিবর্তন প্রক্রিয়া অতিক্রম করে তার চূড়ান্ত অবস্থা অর্থাৎ শ্বেতকায়দের সভ্যতায় উন্নীত হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ বিজ্ঞানী বর্ণবাদকে বাস্তব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন বা মেনে নিলেন।” ডারউইন পরবর্তী বিবর্তনবাদীরা তার বর্ণবাদী মতাদর্শ থাকার বিষয়টি জোরেশোরে প্রচার-প্রকাশ করতে থাকলেন। এ কাজ করতে তারা সকল নীতি আদর্শ বর্জন করে অনেক বৈজ্ঞানিক অসংগতি ও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরা ভাবতে থাকেন, এ তত্ত্ব প্রমাণের মাধ্যমে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে ভিন্ন প্রজাতির মানব সন্তানকে নির্যাতন, শাসন, শোষণ ও প্রয়োজনবোধে নিশ্চিহ্ন করার “প্রকৃতি প্রদত্ত অধিকার” অর্জন করেছেন।
Stephen Jay Gould তার পুস্তক The Mismeasure of Man এর তৃতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কিছু সংখ্যক নৃতত্ত্ববিদ শ্বেতাঙ্গদের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা তত্ত্ব ও উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। Gould এর মতে এ প্রক্রিয়ায় তারা প্রাপ্ত জীবাশ্ম, মাথার খুলি ও মস্তিষ্কের আকার সম্পর্কে মিথ্যাচার করেছেন। তাদের ধারণা ছিল মানব বুদ্ধিবৃত্তির সাথে মস্তিষ্কের আকারের একটি সম্পর্ক আছে। অনেক নৃতত্ত্ববিদ ককেশীয়দের খুলির আকার ইচ্ছাকৃতভাবে বড় দেখিয়ে ভারতীয় ও কালো জনগোষ্ঠীর বুদ্ধি কম হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। যা ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার নামে জালিয়াতি। Gould তার পুস্তক Ever Since Darwin এ উল্লেখ করেছেন যে, কিছু বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে তাদের মিথ্যা দাবি অর্থাৎ কিছু কিছু মানুষ প্রজাতি ‘‘হীন’’ প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন : Haeckel ও তার সঙ্গীরাও উত্তরের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য জোর দাবি উত্থাপন করেন। মানব শরীর ও তার ব্যবহার সম্পর্কিত বিভিন্ন জীবাশ্ম ও অন্যান্য প্রমাণাদি ঘষা-মাজা করে তাদের দাবীর সমর্থনে বিভিন্ন তথ্য/তত্ত্ব উপস্থাপন করতে থাকেন। Herbert Spencer লিখেছেন: “অসভ্যদের বুদ্ধিবৃত্তিও তাদের সন্তানদের মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটে।” ১৮৬৪ সালে Carl Vogt খুব জোরেশোরে বলতে শুরু করেন যে, “একজন পূর্ণ বয়স্ক নিগ্রোর বুদ্ধিবৃত্তির মাত্রা একটি শিশুর ন্যায়। আমরা অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি যে যদিও কোনো কোনো গোত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, অদ্ভুত সংঘ, প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে, কিন্তু অবশিষ্টরা বা সমগ্র কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতি সামগ্রিকভাবে না অতীতে না বর্তমানে মানব জাতির উন্নয়নে এমন কোনো ভূমিকা রাখে নাই যে কারণে তাদের বাঁচিয়ে রাখা যায়।” ফরাসী অ্যানাটমিস্ট ETIENNE SERRES কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা আদিম (অনুন্নত প্রজাতি) কারণ তাদের নাভি (Belly Button) একটু নীচের দিকে অবস্থিত।
ডারউইনের সমসাময়িক বিবর্তনবাদী Havelock Ellis শ্রেষ্ঠ ও "হীন” প্রজাতির পার্থক্যের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ আফ্রিকান প্রজাতির শিশু কদাচিৎ কোনো ইউরোপীয় শিশু থেকে কম বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। কিন্তু আফ্রিকান শিশু বয়স বৃদ্ধির সাথে নির্বোধ ও স্থূল বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে যায় এবং তার সমগ্র জীবন একটি সংকীর্ণ/গোঁড়া রীতি-নীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে একজন ইউরোপীয় তার শিশু সুলভ উৎফুল্লতা বজায় রাখে। ফরাসী নৃতত্ত্ববিদ Vacher de Lapouge দাবি করেন যে, "অশ্বেতাঙ্গ শ্রেণিভুক্ত মানব সন্তানগণ অসভ্য মানব প্রজাতির বংশধর অথবা মিশ্ররক্তের অধঃপতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তিনি ফ্রান্সের বিভিন্ন গোরস্থান থেকে প্যারিসের অভিজাত ও নীচু শ্রেণির মানুষের খুলি গবেষণা করেন। তার গবেষণার যে ফলাফল প্রকাশ করেন তা হলো: একটি নির্দিষ্ট আকৃতির খুলির অধিকারী ব্যক্তি স্বভাবতই ধনী, আত্মবিশ্বাসী, মুক্ত, স্বাধীন, রক্ষণশীল, অল্পে তুষ্ট, একজন আদর্শ সেবক/দাস হওয়ার যোগ্য। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রেণি বিন্যাস হয়ে থাকে। শ্রেষ্ঠ মনুষ্য প্রজাতির সদস্যরারাই উচ্চতর শ্রেণিভুক্ত হয়ে থাকে। মানুষের খুলির আকারের সাথে আনুপাতিক হারে মানুষ ধন ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে থাকে। Lapouge আরো বলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ আকৃতি গোল অথবা চোখা হওয়ার জন্য হত্যা করবে। তার এ ভবিষদ্বাণী সত্য হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে নৃশংসভাবে শুধুমাত্র বর্ণবাদের কারণে হত্যা করা হয়।
শুধুমাত্র নৃবিজ্ঞানী নয় বরং কীটতত্ত্ববিদ (Entomologist) ও ডারউইনের বিকৃত বিবর্তনবাদে গভীর বিশ্বাসী হয়ে বর্ণবাদের মতাদর্শের অনুসারী হয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ১৮৬১ সালে একজন বৃটিশ কীটতত্ত্ববিদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের দেহে বসবাসকারী উকুনের উপর গবেষণা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এক নির্দিষ্ট প্রজাতির উকুন ভিন্ন মনুষ্য প্রজাতির দেহে বাস করতে পারে না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে এটা হাস্যস্পদ ছাড়া অন্য কিছু বিবেচনা করা যায় না। ডারউইন তত্ত্বের বর্ণবাদী দিক উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কারণ ওই সময় একজন শ্বেতাঙ্গ তাদের অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা খুঁজছিলেন।
ডারউইন যখন এ মতবাদ উপস্থাপন করেন তখন গ্রেট বৃটেন পৃথিবীর উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্য হিসাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। ভারত থেকে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বৃটিশ সাম্রাজ্যের করতলগত। শ্বেতাঙ্গ মানুষ তাদের স্বার্থে পৃথিবী লুণ্ঠন করছে। তবে ইতিহাস তাদের লুটেরা হিসাবে চিহ্নিত করুক তা কোনো রাষ্ট্র পছন্দ করছিল না। এ কারণে তারা তাদের শাসন ও শোষণ যে সঠিক তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করছিল। যে সমস্ত দেশ উপনিবেশ হিসাবে তাদের অধীন ছিল সে সমস্ত দেশের জনগণ “আদিবাসী পশু সুলভ জীবন্ত প্রাণী” হিসাবে চিহ্নিত করা। যে সকল জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে হত্যা করা, বা যাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে তারা প্রকৃত পক্ষে স্বাভাবিক মানব সন্তান নয় বরং তারা "অর্ধ মানব-অর্ধ পশু"। তাই তাদের সাথে যে নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে তা অপরাধ নয় এটা প্রমাণ করার জন্য তাত্ত্বিক অনুসন্ধান অব্যাহত ছিল। Christopher Columbus তার আমেরিকা যাত্রার সময় দাবি করেন যে, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী অর্ধ-পশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এই দাবি অনুযায়ী আমেরিকার আদিবাসীগণ মনুষ্য সন্তান নয় বরং তারা এক ধরনের উন্নত পশু প্রজাতির। এ কারণে তাদেরকে স্থানীয় উপনিবেশবাদীদের সেবায় নিয়োজিত করা যায়।
Christopher Columbus মেক্সিকো ও আমেরিকায় ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত করেন। ঐতিহাসিকগণের হিসাব অনুযায়ী Columbus এ মহাদেশে পদার্পণ করার পর ১০০ বছরের কম সময়ের মধ্যে ৯৫ মিলিয়ন লোককে উপনিবেশবাদীরা হত্যা করে। সাম্রাজ্যবাদীদের এ দাবি বা যুক্তি অধিকাংশ লোকই গ্রহণ করেনি কারণ ইউরোপে তখন ধর্মীয় দাবি/মতামত সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। ডারউইনের বস্তুবাদী দর্শন এতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে এবং ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। প্রফেসর James Joll তার EUROPE SINCE 1870 গ্রন্থে ডারউইনবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন। উনবিংশ শতকের ডারউইনবাদকে একটি তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ হিসাবে বিবেচনা করে উপনিবেশবাদ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে গ্রেট বৃটেন। চীনের বিরুদ্ধে "আফিম যুদ্ধ" এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতন ডারউইনবাদের “যোগ্যতমের টিকে থাকা” তত্ত্বের নামে চালানো হয়। ডারউইন তুর্কী জাতির বিরুদ্ধেও বৈরিতা পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন তুর্কীরা এক ধরনের “অনুন্নত প্রজাতি” যারা সভ্য ইউরোপীয়দের কাছে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হবে। তার এই অভিমত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানী সাম্রাজ্য ধ্বংসের পেছনে প্রোপাগান্ডা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছিল।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট Theodore Roosevelt-ও সামাজিক ডারউইনবাদের একজন বড় সমর্থক ছিলেন। রেড ইন্ডিয়ানদের (Native Americans) সংরক্ষিত এলাকায় বাধ্যতামূলক আবাসন ও নিধন কর্মকাণ্ডকে তিনি ডারউইনবাদের আলোকে তাত্ত্বিক রূপ দেন। আমেরিকান সমাজে জিম ক্রো আইন (Jim Crow Laws) প্রবর্তনের মাধ্যমে সাদা ও কালোদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়, যেখানে কালো মানুষদের অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হতো। অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের (Aborigines) ওপর যে অমানবিক নির্যাতন ও গণহত্যা চালানো হয়, তার মূলেও ছিল ডারউইনবাদ। তাদের ‘অর্ধ-বানর অর্ধ-মানব’ মনে করে গবেষণাগারের গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। পিগমি ওটা বেঙ্গাকে (Ota Benga) ১৯০৪ সালে খাঁচায় বন্দি করে শিম্পাঞ্জি ও গরিলার সাথে প্রদর্শন করা ডারউইনবাদী বর্ণবাদের এক চূড়ান্ত বর্বরোচিত উদাহরণ।
ডারউইনবাদের সাথে হিটলারের অশুভ ঐক্যের বিষয়টিও অত্যন্ত প্রকট। হিটলারের নাৎসি মতাদর্শ ডারউইনের “টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম” তত্ত্ব দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। হিটলার আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ডারউইনবাদকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেন। তিনি ইউজেনিক (Eugenics) বা “উন্নত মানব প্রজাতি প্রজনন মতবাদ” গ্রহণ করে অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও ‘অনুন্নত’ জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করেন। নাৎসি জার্মানিতে নারীদের হীন গণ্য করা, মানসিক রোগীদের হত্যা করা এবং আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে নিষ্ঠুরতা চালানো ডারউইনবাদেরই সামাজিক প্রয়োগ। মুসোলিনী এবং ফ্রাংকোও ডারউইনবাদের একই তাত্ত্বিক ভিত্তিকে ব্যবহার করে ইতালি ও স্পেনে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন এবং অগনিত হত্যাকাণ্ড ঘটান। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির পেছনেও ডারউইনবাদের এই নিষ্ঠুর দর্শনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। আধুনিক যুগেও নব্য নাজিরা (Neo-Nazis) ডারউইনবাদের এই বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে ঘৃণা ও সহিংসতার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। ডারউইনবাদ যতদিন পর্যন্ত অবৈজ্ঞানিক এবং ভিত্তিহীন হিসাবে তাদের কাছে প্রতীয়মান হবে ততদিন এসব কর্মকাণ্ড চলতেই থাকবে।
📄 ডারউইনবাদ কমিউনিজম বর্বরতার উৎস ও ভিত্তি
বিংশ শতাব্দীতে যে মতাদর্শ মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বর্বরোচিত ও ক্ষতিকারক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেই মতাদর্শের নাম সমাজতন্ত্র। উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র যে দুজন জার্মান দার্শনিকের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে, তারা হচ্ছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। এই মতাদর্শ পৃথিবীতে এত রক্তপাত ঘটায় যে নাজি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের অত্যাচারকেও তা ম্লান করেছে। এই মতাদর্শ অগণিত নিরীহ লোককে হত্যা করেছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংঘাত, ভয়, হতাশা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে গ্রাস করেছে। এমনকি এখনও যদি কেহ "লৌহ যবনিকা" ও রাশিয়ার কথা উল্লেখ করে তখন জনমনে এমন এক ত্রাসের সমাজের কথা মনে হয়, সেখানে অন্ধকার, কুয়াশা এবং হতাশা জনপ্রাণহীন রাস্তাঘাট, দুঃখ-কষ্ট ও এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও ১৯৯১ সালে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে তবুও এর ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। অনুমোদনহীন সমাজবাদী-মার্কসবাদীদের কিছু ব্যক্তি যতই মুক্ত বুদ্ধি সম্পন্ন জড়বাদী দর্শন এবং সমাজবাদের অন্ধকার দিক এখনও পর্যন্ত জনগণকে প্রভাবিত করছে। প্রকৃতপক্ষে এই চিন্তাধারা ও মতাদর্শ মানব সমাজকে ধর্মহীন এবং নীতিহীন হিসাবে প্রতিপালন করে চলেছে।
এই মতাদর্শ যা পৃথিবীর সকল ভৌগোলিক এলাকায় সন্ত্রাস ও সংঘাতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে আদিকালের একটি মতবাদের প্রতিনিধিত্বকারী মতাদর্শ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এটি এমন একটি বিশ্বাস যা বিবেচনা করে যে, পৃথিবীতে সকল ধরনের উন্নতি বা বিকাশ হলো দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের ফসল। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে মার্কস এবং এঙ্গেলস পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেন। মার্কস দাবি করেন, মানব জাতির ইতিহাস হলো দ্বন্দ্ব সংঘাত ও সংগ্রামের ইতিহাস। মানব জাতির বর্তমান সমস্যা হচ্ছে শ্রমিকদের সাথে পুঁজিপতিদের সংগ্রাম বা যুদ্ধ। শ্রমিক সম্প্রদায় অচিরেই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি সাম্যবাদী সমাজ গঠন করবে।
অন্যান্য জড়বাদী দার্শনিকদের ন্যায় সমাজতন্ত্রের এই দুই প্রতিষ্ঠাতা, ধর্ম সম্পর্কে একটি সুগভীর ঘৃণা পোষণ করতেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস দুজনে নাস্তিক্যবাদের অনুসারী ছিলেন এবং সমাজতন্ত্র প্রচারের জন্য ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশাসনকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা একটি অপরিহার্য কার্যক্রম হিসাবে তারা বিবেচনা করতেন। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস এর এ মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল তা হলোঃ ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের মতাদর্শকে একটি বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়া। ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ বইতে বিবর্তনবাদের যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, মার্কস ও এঙ্গেলস প্রকৃতপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশের জন্য এ ধরনের তত্ত্বের অনুসন্ধানেই ছিলেন। চার্লস ডারউইন দাবি করেন যে, প্রত্যেকটি প্রাণী টিকে থাকার সংগ্রাম অথবা দ্বান্দ্বিক সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকে। মার্কস ও এঙ্গেলস এই ভাবধারা তথা মতাদর্শকে সানন্দে গ্রহণ করেন।
সমাজতন্ত্রের প্রচার ও প্রসারের জন্য ডারউইনবাদের অপরিহার্যতা জানা যায় এ ব্যাপারে মার্কস ও এঙ্গেলসের পত্রালাপ থেকে। ডারউইনের পুস্তক প্রকাশিত (১৮৫৯) হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এঙ্গেলস মার্কসের কাছে এক পত্রে লিখেন: “ডারউইন যার পুস্তক (The Origin of Species) আমি এখন পড়ছি তা এক কথায় অপূর্ব ও চমৎকার।” এর উত্তরে মার্কস ১৯ ডিসেম্বর ১৮৬০ সালে এঙ্গেলসকে লিখলেন; “এই বইতে আমাদের মতাদর্শের প্রাকৃতিক ইতিহাসের মূল সূত্র বর্ণনা করা হয়েছে।” ১৮৬১ সালের ১৬ জানুয়ারি মার্কস তার সমাজবাদী বন্ধু LASSALLE কে লিখেন: “ডারউইনের পুস্তকটি আমার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানব ইতিহাসের শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তি তত্ত্ব সম্বলিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব এ বইতে বর্ণনা করা হয়েছে।”
মার্কস তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক ‘ডাস ক্যাপিটাল’ (DAS CAPITAL) ডারউইনের নামে উৎসর্গ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে মার্কস নিজেকে বৃটিশ প্রকৃতিবিদ ডারউইনের একজন একান্ত ভক্ত (Sincere admirer) হিসাবে উল্লেখ করেন। অনুরূপভাবে এঙ্গেলসও ডারউইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে উল্লেখ করেন যে, প্রকৃতি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কার্যক্ষেত্র; তাই এটা অবশ্যই সঠিক যে, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি দ্বান্দ্বিকভাবেই কাজ করে থাকে কোনো আধিভৌতিক সত্তার মাধ্যমে নয়। এ ব্যাপারে ডারউইনের নামই অন্য সবার আগে উল্লেখযোগ্য।
সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ মার্কস ও এঙ্গেলসের নীতি বাস্তবায়িত করেছিলেন যাদের সাথে বিবর্তনবাদীদের আদর্শগত মিল ছিল। লেনিন, ট্রটস্কি এবং স্ট্যালিন—প্রত্যেকেই ডারউইনবাদকে তাদের বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। স্ট্যালিন তার ৩০ বছরের শাসনামলে প্রায় ২০ মিলিয়ন লোককে হত্যা করেন। স্ট্যালিনের নিজের ভাষায় এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ডারউইনের বিবর্তনবাদ। স্ট্যালিনের জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন যে, শৈশবে স্ট্যালিন যখন গির্জার স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তখন তিনি ডারউইনের পুস্তক পাঠ করে একজন নাস্তিকে পরিণত হন। মাওসেতুং-এর নেতৃত্বে চীনেও ডারউইনবাদ ও মার্কসবাদের ভিত্তিতে এক ভয়াবহ নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলা হয়। সেখানেও কয়েক মিলিয়ন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
কমিউনিস্টরা যেখানেই ক্ষমতায় আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানেই নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশসমূহের জনগণ অনুরূপ ঘটনার শিকার হয়েছে। ‘দ্য ব্ল্যাক বুক অব কমিউনিজম’ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রায় ১০০ মিলিয়ন লোক মৃত্যুবরণ করেছে। ডারউইনবাদের প্রভাবেই কমিউনিস্টরা মানুষকে পশু হিসাবে মনে করে এবং পশুর সাথে যেমন আচরণ করা উচিত তাই করে থাকে। নাস্তিক্যবাদী ডারউইনবাদ সব রকমের নির্যাতন, নিপীড়ন, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, নিষ্ঠুরতা ও হত্যা সমর্থন করে, যদিও ধর্ম এসব কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
📄 পুঁজিবাদ ও অর্থনীতিতে যোগ্যতামদের টিকে থাকার সংগ্রাম
পুঁজিবাদ অর্থ হচ্ছে পুঁজির সার্বভৌমত্ব, যা একটি উন্মুক্ত ও অবাধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার ভিত্তি শুধুমাত্র লাভ বা মুনাফা। এই অর্থ ব্যবস্থায় সমাজ প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়ে থাকে। পুঁজিবাদে তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে- ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, প্রতিযোগিতা ও মুনাফা বা লাভ। পুঁজিবাদে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে সমাজের অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না, বরং তাকে একজন ব্যক্তি হিসাবে একাকী স্বীয় প্রচেষ্টায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। পুঁজিবাদী সমাজ এমন একটি রঙ্গমঞ্চ যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিকে অন্যের সাথে কঠোর ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এটা এমন একটি স্থান যেমন নাকি ডারউইন বর্ণনা করেছেন—যেখানে বলশালী সমাজে টিকে থাকবে, দুর্বল ও ক্ষমতাহীন ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
পুঁজিবাদী মতবাদের যুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ব্যক্তি, কোম্পানি অথবা জাতি শুধুমাত্র নিজের সুবিধা ও উন্নতির জন্য জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় উপাদান হলো উৎপাদন। সবচেয়ে ভালো উৎপাদনকারী টিকে থাকবে, দুর্বল ও অযোগ্যরা ধ্বংস হয়ে সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় যারা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে দরিদ্রের কাতারে স্থান করে নিচ্ছে, তারাও যে মানুষ সে কথা বিবেচনায়ই আনা হচ্ছে না। এ কারণেই একজন পুঁজিপতি যাকে তিনি অর্থনৈতিক সংগ্রামে পদদলিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তিনি কখনও সেই হতদরিদ্র ব্যক্তির জন্য কোনো নৈতিকতা বা সহানুভূতি অনুভব করেন না। এটাই সমাজে অর্থনৈতিক ডারউইনবাদের বাস্তব প্রয়োগ।
সামাজিক ডারউইনবাদের অন্যতম প্রবক্তা হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer), যিনি জনজীবনে সামাজিক ডারউইনবাদের নীতি প্রয়োগের প্রথা চালু করেন। তিনি বলেন, যদি কেহ গরিব হয়ে থাকে এটা তারই দোষ, তাই তাকে ধনী করার ব্যাপারে অবশ্যই কেহ কোনো রকম সাহায্য সহযোগিতা করবে না। যত অনৈতিক পদ্ধতিতেই হোক না কেন, ধনী হওয়াটাই তার যোগ্যতা। এ কারণেই ধনী ব্যক্তি টিকে থাকবে, পক্ষান্তরে গরিব মানুষ সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। স্পেন্সার সকল প্রকার সমাজ কল্যাণমূলক কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিরোধিতা করেন। এমনকি স্বাস্থ্য সেবা বা স্কুলে সরকারি সহায়তা প্রদানেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। কারণ সামাজিক ডারউইনবাদের মতে, সামাজিক শ্রেণি বিন্যাস শক্তিধরদের টিকে থাকার নীতির ভিত্তিতে প্রণীত।
আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গ্রাহাম সামনার (Graham Sumner) ছিলেন আমেরিকায় সামাজিক ডারউইনবাদের মুখপাত্র। তার মতে, সমাজের কোটিপতিরাই হচ্ছে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি এবং সকল প্রকার সুবিধা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত। তারা কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব। এই মতাদর্শ প্রচারের ফলে মানুষের মনে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাহায্য, সহযোগিতা ও মানবতাবাদ ইত্যাদি চিন্তা-চেতনা সম্পূর্ণরূপে অপসৃত হয় এবং এর বদলে স্বার্থপরতা, চতুরতা ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে প্রশংসনীয় হিসাবে বিবেচিত হয়।
বিশ্ববিখ্যাত ধনী পুঁজিপতি রকফেলার (Rockefeller) দাবি করেন: “বৃহৎ ব্যবসার বিকাশ হলো যোগ্যতমদের টিকে থাকার বাস্তব প্রতিফলন। এটা প্রাকৃতিক আইনের সামাজিক বাস্তবায়ন।” পুঁজিবাদ জনসাধারণকে শুধুমাত্র টাকা ও ক্ষমতাকে পূজা করতে বাধ্য করে এবং পৃথিবীর সকল ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে গুরুত্বহীন হিসাবে বিবেচনা করে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজ ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী নৈতিকতার প্রভাব বিদ্যমান। এ কারণে গরিব, অসহায় ও পঙ্গুদের কোনো প্রকার দয়া দাক্ষিণ্য বা সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া হয় না। দারিদ্র্য পীড়িত দেশগুলোর অনাহারে মৃত্যুর কারণও এই পুঁজিবাদী নৈতিকতা। ডারউইনবাদ গত ১৫০ বছরে সকল চিন্তাধারা ও মূল্যবোধকে পিছনে ফেলে বিশ্ব মানবতার জন্য শুধু দুঃখ, বেদনা ও হতাশা বয়ে নিয়ে এসেছে।
📄 নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংসে ডারউইনবাদ
বিশ্বমানবতা তথা মানব জাতির জন্য ডারউইনবাদ সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি সাধন করেছে তা হলো জনগণের ধর্ম বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করা। ধর্মীয় সকল প্রকার নীতি ও মূল্যবোধ অপসৃত হলো, ফলে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করে ফেলল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ডারউইনবাদী জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মেয়ার (Ernst Mayr) লিখেছেন: “ডারউইনের সময়কাল থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীকার করে আসছেন যে, মানুষ ও বানর একই বংশধারা থেকে উদ্ভূত। বিবর্তনবাদ মানুষের চিন্তাধারার সকল ক্ষেত্র অর্থাৎ দর্শন, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে।”
ডারউইনবাদের মতাদর্শের আধিপত্য সমাজ জীবনে একটি অতি শক্তিশালী সম্মোহনী হিসাবে কাজ করেছে। যুব সম্প্রদায়ের এক বিশাল অংশ যাদের জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম, তারাই বিশেষ করে সহজে ডারউইনবাদের শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সিনেমা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে গত ১৫০ বছর যাবৎ ডারউইনবাদকে সত্য হিসাবে বিশ্বাস করানো হচ্ছে, যদিও তা প্রতারণামূলক ও অবৈজ্ঞানিক হিসাবে প্রমাণিত। সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ধর্ম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের হেয় করার মাধ্যমে আল্লাহর অস্তিত্ব ও ভাগ্যকে অস্বীকার করা হয়।
ডারউইনবাদের প্রভাবে এমন একটি সমাজ গঠিত হয়েছে, যেখানে মানুষ তার কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো জবাবদিহিতা বা নৈতিক দায়-দায়িত্ব অনুভব করে না। ফলে সমাজে হত্যা, পতিতাবৃত্তি, প্রতারণা, জুয়াচুরি ও দুর্নীতির মতো অনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবর্তনবাদের সমর্থক কেন হ্যাম (Ken Ham) লিখেছেন: “যদি আপনি আল্লাহকে অস্বীকার করেন, তবে ন্যায় ও অন্যায়ের কোনো ভিত্তি থাকে না। জনগণ নিজেরাই নিজেদের আইন প্রণয়ন করবে।” বিখ্যাত বিবর্তনবাদী থিওডোসিয়াস ডবঝানস্কি স্বীকার করেন যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন অহমিকাবাদ, কাপুরুষতা, প্রতারণা ও শোষণকে লালন করে থাকে।
ডারউইনবাদ মানুষকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। অনেক ডারউইনবাদী বিজ্ঞানী যুক্তি দেন যে, মানুষের অপরাধ প্রবণতা আসলে তাদের পশু পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার। এই বিকৃত চিন্তাধারার প্রভাবে অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। ডারউইনবাদ মানুষের বিবেক, ইচ্ছাশক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং মানুষকে পশু প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত প্রাণী হিসাবে মনে করে।
কোনো ব্যক্তির জীবনের যদি কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তার চরিত্রোন্নয়নের কোনো প্রচেষ্টাই থাকে না। ডারউইনবাদী দর্শনের ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বহীন ও লক্ষ্যহীন মনে করে। আত্মহত্যা, মানসিক সমস্যা ও হতাশা হলো ডারউইনবাদের প্রত্যক্ষ ফল। রিচার্ড ডকিন্স-এর মতো বিবর্তনবাদীরা মনে করেন মানুষ একটি প্রজনন যন্ত্র মাত্র। যারা এই বিভ্রান্তিকর চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন থাকে, তারা সহজেই হতাশায় ডুবে যায়। কারণ তাদের কাছে প্রেম, ভালোবাসা, সত্য ও সততা—সবই নিরর্থক। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তারা জীবনের মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন এবং কখনো হতাশাগ্রস্ত হয় না।