📄 ভূমিকা : বিংশ শতকে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী
আমরা সম্প্রতি যুদ্ধ ও সংঘাতময় বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে এসেছি যা বিশ্ব মানবতাকে দিয়েছে দুঃখ বেদনা, গণহত্যা, দারিদ্র্য আর সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ। লক্ষ লক্ষ লোক নিহত ও বেপরোয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। অগণিত লোক ক্ষুধায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। বহু জনগোষ্ঠী গৃহ, আশ্রয় ও সহায়-সম্বলহীন হয়েছে। ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হয়ে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে লক্ষ লক্ষ আদম সন্তান। লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে যে, কোনো পশুকেও এমন ধরনের নির্যাতন করা হয় না। আর এ সব কিছুই করা হয়েছে একটি বিভ্রান্তিকর ও ভ্রষ্ট মতাদর্শ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে প্রতিটি নির্যাতন ও দুর্ভোগের জন্য কোনো না কোনো স্বৈরশাসক বা একনায়ক বা স্বেচ্ছাচারী শাসকদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। লেনিন, স্টালিন, ট্রটস্কি, মাওসেতুং, পলপট, হিটলার, মুসোলিনী, ফ্রাংকো, ইত্যাদি। এদের অনেকেই একই মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আবার কেহ কেহ প্রতিপক্ষের মৃত্যু না দেখা পর্যন্ত তাদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত হতেন না। এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলে রয়েছে পরস্পর বিরোধী মতাদর্শ। এ সমস্ত স্বৈরশাসক তাদের সমাজকে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পথে নিয়ে গেছেন এবং ভাইকে ভাই এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করে দেন। ফলে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ। আর ঘটে বোমাবাজি, অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে গাড়ি, যানবাহন, বাড়িঘর, দোকানপাট ধ্বংসের ঘটনা এবং আক্রমণাত্মক ও সহিংস মিছিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এ সকল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিষ্ঠুরভাবে-নির্বিচারে শিশু, কিশোর, যুবক মহিলা ও বৃদ্ধকে মারপিট করে এবং যারাই এদের বিরোধিতা করে তাদেরকেই হত্যা করে। তারা এমন হৃদয়হীন ও পাষণ্ড যে, এরা একজন নিরীহ লোকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিনা দ্বিধায় হত্যা করে। এ সব সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষের মগজ পদদলিত করতে দ্বিধা করে না। তারা নিরীহ জনসাধারণকে বাড়ি থেকে বহিষ্কার করে তা তিনি বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু যেই হোন না কেন। এ সব নির্যাতিত মানুষের একমাত্র অপরাধ ছিল অন্য মতাদর্শে বিশ্বাসী।
বিংশ শতাব্দীর দুঃস্বপ্নের বিভীষিকা থেকে আমরা উঠে এসেছি। মানব জাতিকে দুঃসহ বেদনা ও রক্তের বন্যায় বইয়ে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র বিভ্রান্তিকর একটি মতাদর্শে বিশ্বাস ও তা বাস্তবায়ন করার নামে। ফ্যাসিজম ও কমিউনিজম এ দুটি মতাদর্শকেই মানব জাতির বিপর্যয় ও দুঃখ কষ্টের কালো অধ্যায় সৃষ্টির জন্য শীর্ষ মতবাদ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। যদিও আপাত দৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী মতবাদ দুটি একটি অপরটির ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় অব্যাহত ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো দুটি আদর্শই একটি মাত্র উৎস থেকে তাদের পুষ্টি, শক্তি ও সহযোগিতা প্রাপ্ত হয়েছে। আর এই উৎস তথা মতাদর্শ মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে না বরং সবসময়ই একটি নিষ্পাপ/নিরীহ তত্ত্ব/মতাদর্শ/ধারণা/মতবাদ হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই উৎস তথা মতবাদ হলো: বস্তুবাদী দর্শন এবং ডারউইনবাদ তথা প্রকৃতিবাদ।
অপেশাদার জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন উনবিংশ শতাব্দীতে সুমেরীয় ও প্রাচীন গ্রীসের পৌরাণিক গল্প কথা পুনর্ব্যক্ত করার মাধ্যমে ডারউইনবাদ প্রকাশ ও প্রচার করেন। আর এর ভিত্তিতে যতগুলি মতবাদের ভিত্তি ভূমি রচিত হয়েছে সবগুলো মানবতার জন্য অভিশাপ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। ডারউইনবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মুখোশ ধারণ করে এসব ভ্রান্ত মতাদর্শ ও এদের অনুসারীদের তখন থেকে এক ধরনের মিথ্যা বৈধতা দান করেছে। এই মিথ্যা বৈধতার বদৌলতে বিবর্তনবাদ তথা ডারউইনবাদ অল্পদিনের মধ্যে জীববিজ্ঞান ও জীবাশ্ম বিজ্ঞানের অধিক্ষেত্র অতিক্রম করে মানব সম্পর্ক থেকে শুরু করে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিস্তার করে। উনবিংশ শতাব্দীতে যে সব মতবাদ বা চিন্তাধারা সমাজকে প্রভাবিত করেছিল এর কয়েকটি চিন্তার স্রোতধারা ডারউইনবাদের তত্ত্বের মধ্যে তাদের যৌক্তিকতা বা তথাকথিত প্রমাণ খুঁজে পেল। ফলে ডারউইনবাদে এ সকল চিন্তাধারা বা মতবাদের ব্যাপক সমর্থন পেতে সক্ষম হলো।
অস্তিত্বের সংগ্রাম “সবলই বেঁচে থাকে” অন্যরা ধ্বংসপ্রাপ্ত/পরাজিত হয়ে “সমাজ থেকে অদৃশ্য তথা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় প্রভৃতি মতবাদ মানবীয় চিন্তা চেতনায় অনুপ্রবেশ করে এবং তা লালনের মাধ্যমে মানব সমাজে প্রয়োগ করতে শুরু করে। ডারউইনবাদ যখন দাবি করতে থাকে যে, “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম ও দ্বন্দ্ব “একটি প্রাকৃতিক বিধান এবং যা শুধুমাত্র উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতে নয় বরং তা সার্বিকভাবে মানব সমাজের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। এই নীতিরই ধারাবাহিকতার আলোকে হিটলার এর বিকৃত চিন্তাধারায় জার্মান জাতিকে “প্রভুর জাতি”, কার্ল মার্কসের দাবি “মানব জাতির ইতিহাস শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস” এবং পুঁজিপতিদের নীতিতে ধনীরা গরিবদের “বঞ্চনা তথা শোষণের” মাধ্যমে “ধনী অধিকতর ধনী হবে” উপনিবেশবাদীদের তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র সমূহের জনগণকে শোষণ ও বঞ্চনার মাধ্যমে অধীনস্থ রাখার সাম্রাজ্যবাদী নীতি প্রবর্তনের দ্বারা বর্ণবাদী আক্রমণ, নিগ্রহ, প্রবঞ্চনা, বৈষম্য ও অপশাসনের তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা পাওয়া যায়।
রবার্ট রাইট (Robert Wright) একজন বিবর্তনবাদী হওয়া সত্ত্বেও তার বই The Moral Animal-এ মানব জাতিকে বিবর্তনবাদ কিভাবে এক মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে তা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেন: “বিবর্তনবাদ প্রকৃত পক্ষে মানবীয় কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও নীতিজ্ঞানহীন অপপ্রয়োগ। এই শতাব্দীর শেষের দিকে রাজনৈতিক মতবাদের সাথে মিলেমিশে একটি অবোধ্য রাজনৈতিক মতবাদ সৃষ্টি করে এটি “সামাজিক ডারউইনবাদ” হিসাবে পরিচিতি লাভ করে এবং তখন থেকেই এই জঘন্য মতবাদ বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী ও সবচেয়ে হৃদয়হীন পুঁজিপতিদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।”
এই পুস্তকে যে তত্ত্ব, তথ্য ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়েছে তার মাধ্যমে জানা যায় যে, ডারউইনবাদ শুধুমাত্র জীবের উৎপত্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মধ্যে এর বক্তব্য সীমিত রাখে না বরং ডারউইনবাদ একটি গোঁড়া মতবাদ যা ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো এর অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের অন্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদিও ডারউইনবাদ সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবুও বহু বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ ডারউইনবাদের অন্ধকার দিক অর্থাৎ এর বিভ্রান্তি জেনে বা না জেনেও এই গোঁড়া ও বিভ্রান্তিকর মতবাদকে এখন পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে আসছেন। যদি সমাজের আপামর জনগণ এই অবৈজ্ঞানিক মতবাদের ভুল ত্রুটি ও সামাজিক ক্ষতি তথা সার্বিক বিপর্যয় সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারেন তা হলে স্বৈরশাসক, নির্দয় ও অমানবিক স্বার্থপর ব্যক্তিদের এ মতবাদ কার্যকরী করার সুযোগ থাকবে না। ফলে এই বিভ্রান্তিকর মতবাদের অপপ্রয়োগ সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। ডারউইনবাদের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে যারা মানব সমাজে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, বঞ্চনা ও স্বার্থপর চিন্তাধারা ও মতাদর্শ প্রচার, প্রসার ও প্রয়োগ করে বলেন যে, এটাই “প্রাকৃতিক বিধান”; তখন এটা বলার আর কোনো সুযোগ থাকবে না বা সমাজে তা গৃহীত হবে না।
মানবতা বিরোধী সকল মতাদর্শের মূল ডারউইনবাদ যদি সম্পূর্ণরূপে সমাজ থেকে চূড়ান্তভাবে উৎপাটিত হয় সে ক্ষেত্রে একটি মাত্র সত্য বিদ্যমান থাকবে। সেই মহাসত্য হলোঃ “এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও মানব জাতিকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। যে সকল ব্যক্তিবর্গ এই সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন তারা এও বুঝতে পারবেন যে প্রকৃত বাস্তব সত্য হলো মানব জাতির সকল সমস্যা সমাধানের উপায় ও পন্থা ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত ঐশী গ্রন্থেই নিহিত আছে।” ব্যাপক জনগোষ্ঠী যদি এই ধারণা পোষণ করে তবে বিশ্ব সমাজ থেকে দুঃখ, বেদনা, অন্যায়, অবিচার, দুর্ভোগ দুর্দশা, গণহত্যা ও দারিদ্র্য অপসারিত হবে এবং এর পরিবর্তে প্রজ্ঞা, ধন সম্পদ, সুস্বাস্থ্য, প্রাচুর্য ও মুক্তি মানব সমাজে বিরাজ করবে। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন সকল মিথ্যা ও মানব জাতির জন্য ক্ষতিকারক মতবাদ সমাজ থেকে অপসৃত হবে এবং শুধু সেই পবিত্র ও ঐশী মতবাদ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে প্রকৃত জনকল্যাণ সাধন করা সম্ভব হবে। “ঢিল মারলে পাটকেল ছোড়া” বা “ঘুসির বদলে ঘুসি মারা” অথবা আক্রমণকারীকে অধিকতর বড় আঘাত দিয়ে কোনো সমস্যার বাস্তব সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং যারা এ ধরনের কাজ করে তাদের কাছে ধৈর্য, দয়া ও সহানুভূতির সাথে প্রকৃত সত্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনার মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারা বা ধ্যান ধারণা পরিবর্তন করানোর মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এই পুস্তক লেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো যারা ডারউইনবাদের অন্ধকারময় দিক জেনে অথবা না জেনে এতে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করে থাকেন, তাদেরকে এ মর্মে অবহিত করা যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কোনো মতবাদকে সমর্থন করছেন। আর যারা এই মতবাদকে বিশ্বাস করেন না ঠিকই, তবে তারা ডারউইনবাদকে বিশ্ব মানবতার জন্য হুমকি স্বরূপ বলেও মনে করেন না, তাদের ডারউইনবাদের অন্ধকার দিক সম্পর্কে সতর্ক করাও এ পুস্তকে লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।
📄 ডারউইনবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বিশ্বমানবতার দুঃখ দুর্দশা ও বিপর্যয়ে ডারউইনবাদের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা করা প্রয়োজন। অনেকের ধারণা যে, চার্লস ডারউইন সর্বপ্রথম বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এই মতবাদ প্রচার করেন। প্রকৃতপক্ষে এই মতবাদের মূল প্রবক্তা ডারউইন নয়। তাই এ মতবাদের উৎসে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
প্রাচীন মেসোপোটামিয়ায় যখন প্রতিমা পূজা ভিত্তিক ধর্মীয় বিশ্বাস চালু ছিল তখন পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব, বিশ্ব সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে বিভিন্ন কুসংস্কার ও পৌরাণিক কল্প কথা প্রচলিত ছিল। এ সকল ধারণার মধ্যে একটি বিশ্বাস বা মতবাদ ছিল বিবর্তনবাদ। এনুমো-ইলিশ (ENUMA - ELISH) কাব্যে বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয় যে, এক প্রলয়ংকরী বন্যার পর অকস্মাৎ দুই দেবতা লাহমা (LAHMA) ও লাহমু (LAHAMU) এর আবির্ভাব ঘটে। এই মতবাদের মূল ধারণা হচ্ছেঃ “এক দেব মূর্তি (দেবতা) সর্বপ্রথম নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন পদার্থ এবং অন্যান্য জীব সৃষ্টি করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।” অন্য কথায় সুমেরীয় পৌরাণিক কল্পকথা অনুযায়ী অজৈব জলজ আকারহীন অবস্থা হতে হঠাৎ পৃথিবীতে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়।
এই পর্যালোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সুমেরীয়দের এই ধর্মীয় বিশ্বাস অর্থাৎ পৃথিবীতে অজৈব পদার্থ থেকে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে যা চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে প্রমাণিত হয় যে, বিবর্তনবাদের প্রথম প্রবক্তা ডারউইন নন বরং তা সুমেরীয় প্রতিমা পূজারীদের ধর্মীয় বিশ্বাস। পরবর্তীতে অপর একটি প্রতিমা পূজারী সভ্যতা অর্থাৎ প্রাচীন গ্রীসে এই বিবর্তনবাদের প্রসার ও ব্যাপ্তি ঘটে। প্রাচীন গ্রীসের বস্তুবাদী দার্শনিকগণ তাদের বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় জড়বস্তু ছাড়া অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব বিশ্ব সৃষ্টিতে বিদ্যমান তা বিশ্বাস করতেন না। এই সকল গ্রীক দার্শনিক বিবর্তনবাদের পৌরাণিক কল্পকাহিনীকে সুমেরীয় সভ্যতার উত্তরাধিকার হিসাবে আত্মস্থ করে বিশ্বসৃষ্টি তত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে থাকেন। এভাবে বস্তুবাদী দর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনী প্রাচীন গ্রীসে আমদানি করা হয়। প্রাচীন গ্রীস থেকে এই মতবাদ পরবর্তীতে রোমান সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ করে। অষ্টাদশ শতকে এই উভয় মতবাদ পুনরায় নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে যা মূলতঃ প্রতিমা পূজারী সংস্কৃতির ক্রোড়ে প্রতিপালিত। কিছু সংখ্যক ইউরোপীয় চিন্তাবিদ, যারা গ্রীক দর্শন সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন, তারা জড়বাদী তথা বস্তুবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই সকল চিন্তাবিদদের মধ্যে এক গভীর মিল ছিল তা হলো- ধর্মের সঙ্গে বিরোধিতা তথা নাস্তিকতা বা নাস্তিক্যবাদ।
ফরাসী বিজ্ঞানী জাঁ ব্যাপটিস্ট ল্যামার্ক (Jean Baptiste Lamarck) প্রথম ব্যক্তি যিনি বিবর্তনবাদ নিয়ে বিস্তারিতভাবে গবেষণা করেন। ল্যামার্ক ধারণা করতেন যে, সকল প্রকার প্রাণী সামান্য পরিবর্তিতরূপে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। এই মতবাদ পরবর্তীতে মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হয়। তা সত্ত্বেও ল্যামার্কের এই মতবাদ কিছুটা পরিবর্তিতরূপে যে ব্যক্তি বিশ্ববাসীর নিকট উপস্থাপন করেন তিনি হলেন বৃটিশ শৌখিন জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন।
১৮৫৯ সালে ইংল্যান্ডে চার্লস ডারউইন তাঁর পুস্তক ‘দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ (The Origin of Species)-এর মাধ্যমে এই মতবাদ উপস্থাপন করেন। এই পুস্তকে বিবর্তনবাদের সুমেরীয় সভ্যতার পৌরাণিক কথা একটু বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন যে সকল প্রাণী দৈবাৎ পানি থেকে এবং এক পূর্বপুরুষ (Common Ancestor) থেকে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ এই সকল প্রাণী স্বতস্ফূর্তভাবে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে এক থেকে অন্য প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
চার্লস ডারউইনের এই দাবি তার সময়কার বিজ্ঞানীদের সাধারণ অনুমোদন বা গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে অসমর্থ হয়। বিশেষ করে ফসিল (জীবাশ্ম) বিশেষজ্ঞগণ অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছিলেন যে, ডারউইনের দাবি একটি কল্পনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এতদসত্ত্বেও সময়ের আবর্তনে ডারউইনের মতবাদ সমাজের বিভিন্ন গ্রুপের সমর্থন পেতে থাকে। এ সমর্থনের অন্যতম কারণ হলো উনবিংশ শতাব্দীর শাসকগোষ্ঠী ডারউইন ও তার এই মতবাদের ভিতর তাদের অবৈধ শাসন ও শোষণ পাকাপোক্ত করার সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন।
ডারউইনের পুস্তক দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ (১৮৫৯) যখন প্রকাশিত হয় তখন বিজ্ঞান অত্যন্ত পশ্চাদপদ অবস্থায় ছিল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, সেকেলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে জীব কোষ (cell) সম্বন্ধে জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ের ছিল। অর্থাৎ তা একটি বিন্দুর (Blot) মতো এবং এর অতিরিক্ত কিছু জানা সম্ভব ছিল না। বর্তমানে আমরা জানি যে, এই প্রাণ কোষ একটি অতি জটিল নিয়মবদ্ধ পদ্ধতি (System)। এ কারণে সেই সময়ে অজৈব পদার্থ থেকে দৈবাৎ প্রাণের সূচনা হয়েছে মর্মে ডারউইনের এ দাবি প্রচার করতে কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। অনুরূপভাবে জীবাশ্ম গবেষণাও অনুন্নত পর্যায়ে থাকায় সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাণী জগতের বিভিন্ন প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে মর্মে দাবি করাও সম্ভব হয়েছিল। অথচ বর্তমানে এমন একটিও জীবাশ্ম রেকর্ড নেই যার সাহায্যে প্রমাণ করা সম্ভব যে, প্রাণী স্বতস্ফূর্তভাবে একটি থেকে অন্যটিতে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছে তথা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি কিছুদিন পূর্বেও বিবর্তনবাদীরা এই বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ে বলতেন "আধা মানব আধা প্রাণী ভবিষ্যতে কোনো দিন দেখা যাবে"; বর্তমানে তারা এটা আর কোনো ক্রমেই গোপন করতে পারছে না যে, এ দাবিটি আদৌ সত্য নয়।
এ ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ডারউইনবাদীরা তাদের মতবাদ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন। ডারউইনবাদীরা বিগত ১৫০ বৎসর যাবৎ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের ন্যায় এই মতবাদ বিশ্বস্ততার সাথে অনুসরণ করে আসছেন। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ডারউইনবাদ ভ্রান্ত প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এ মতবাদের সমর্থনকারীগণ জোর প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। ডারউইনবাদের অস্তিত্ব এ কারণেই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে টিকে আছে। ডারউইনবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এ মতবাদে সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতি। বিবর্তনবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী পদার্থ থেকে দৈবাৎ জীবনের উদ্ভব হয়েছে। ডারউইনের এই মিথ্যা দাবি জড়বাদী বিজ্ঞানীদের থেকে শুরু করে সকল নাস্তিক্যবাদী দার্শনিক মতবাদের মিথ্যা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রচনা করে। এর কারণ হলো উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ বৈজ্ঞানিকই বিজ্ঞানকে আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে অনুসন্ধান, গবেষণা ও তার বিভিন্ন গুণাগুণ তথা বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করার পদ্ধতি হিসাবে বিবেচনা করতেন। এ ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির কারণে নাস্তিক ও জড়বাদী বৈজ্ঞানিকগণ তাদের মতবাদ প্রচার, প্রসার ও বিকাশের কোনো সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ডারউইনবাদে স্রষ্টার অস্তিত্বের অস্বীকৃতি তাদের চিন্তাধারা প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভ্রমাত্মক সমর্থন ও সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কারণেই জড়বাদী ও নাস্তিক্যবাদী দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানী ডারউইনবাদকে তাদের নিজস্ব মতাদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেন। ডারউইনবাদে স্রষ্টার অস্বীকৃতির সাথে সাথে প্রাণের বিকাশ ও প্রকৃতিতে জীবের অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামকে এক সূত্রে গাঁথা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। “এ সংগ্রামে সবচেয়ে শক্তিশালী বিজয়ী হয়” এবং “দুর্বল পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।” যে সকল জীবন দর্শন মানবজাতির জন্য মহা দুর্ভোগ ও বিপর্যয় নিয়ে এসেছে তাদের সাথে ডারউইনবাদীদের সমর্থন ও সহযোগিতা এ কারণেই প্রত্যক্ষ করা যায়।
“প্রকৃতিতে অস্তিত্বের সংগ্রাম” বিবর্তনবাদের একটি অন্যতম দিক যা এ মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভিত্তি। ডারউইনের মতে প্রকৃতিতে অস্তিত্বের জন্য নিষ্ঠুর সংগ্রাম সংঘটিত হয়ে থাকে। এ সংঘাত একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া। এ সংগ্রামে সব সময় শক্তিধর দুর্বলকে পরাজিত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজে সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হয়ে থাকে। দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ নামক পুস্তকটির উপ-শিরোনামে বিষয়টি সংক্ষিপ্তাকারে এই ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে: "The Origin of Species by means of Natural Selection or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life" (প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রজাতি সমূহের উৎপত্তি অথবা জীবন সংগ্রামে আনুকূল্য প্রাপ্ত প্রজাতি সমূহের সংরক্ষণ)।
বৃটিশ অর্থনীতিবিদ থমাস মালথাস (Thomas Malthus)-এর An Essay on the Principle of Population পুস্তকটি ছিল ডারউইনের এ মতবাদের প্রধান উৎসাহ দাতা। এই পুস্তকে মানব জাতির জন্য একটি ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ছিল। মালথাস হিসাব করে দেখালেন যে, জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায় এবং ২৫ বৎসরে তা দ্বিগুণ হয় কিন্তু খাদ্য সরবরাহ কোনোক্রমেই এই হারে বৃদ্ধি পায় না। ফলে মানবজাতিকে অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক উপাদান হলো যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী। অর্থাৎ কিছু লোককে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অন্যদের মরতে হবে। অস্তিত্ব বা টিকে থাকার অর্থই হচ্ছে চিরস্থায়ী যুদ্ধ। ডারউইন নিজেই বলেছেন যে, মালথাসের পুস্তকে “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম” সম্পর্কীয় মতবাদ তাকে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে চিন্তা করতে শিখায়। তিনি লিখেছেন, "১৮৩৮ সালের অক্টোবর মাসে অর্থাৎ আমার পদ্ধতিগত অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ১৫ মাস পর হঠাৎ আমি জনসংখ্যার উপর লেখা মালথাসের বইটি পড়ে জানতে পারি যে, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতে সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকে থাকার মতবাদ নির্ধারণ করা আছে। এরই সূত্র ধরে হঠাৎ আমার বোধোদয় হয় যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে (অস্তিত্বের সংগ্রাম) আনুকূল্য প্রাপ্ত প্রজাতি বিজয়ী হয় অর্থাৎ টিকে থাকে, প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রামরত প্রজাতি পরাজিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। অবশেষে এই পুস্তকেই আমি একটি বিবর্তনবাদী তত্ত্ব তথা কার্যকরী মতবাদের সন্ধান পাই।”
উনবিংশ শতাব্দীতে মালথাসের এ তত্ত্ব যথেষ্ট সমাদৃত হয়। ইউরোপের অভিজাত বুদ্ধিজীবীগণ বিশেষভাবে এ মতবাদের সমর্থন যোগান। উনবিংশ শতকে ইউরোপীয় চিন্তাবিদগণ মালথাসের জনসংখ্যা সমস্যা সংক্রান্ত মতবাদের যে গুরুত্ব প্রদান করেন তা ‘The Scientific Background of the Nazi Race Purification’ (নাজীদের প্রজাতি পরিশুদ্ধকরণ কর্মসূচীর বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট) নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে সমগ্র ইউরোপে শাসক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ সদ্য উদ্ভাবিত মালথাসের “জনসংখ্যা সমস্যা” সম্পর্কে আলোচনা করেন। অতঃপর শাসক শ্রেণী মালথাসের মতবাদ বাস্তবায়ন করার কর্মসূচী গ্রহণ করেন। এর আওতায় দরিদ্রের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিচ্ছন্নতা অর্থাৎ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির পরিবর্তে আমরা বরং বিপরীত পন্থাই গ্রহণ করব। আমাদের শহরগুলিতে অপ্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ, ছোট ছোট বাসগৃহে বহু লোক থাকার ব্যবস্থা করব। ফলে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে যাতে প্লেগের আক্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমাদের পল্লী এলাকাগুলো পানিবদ্ধ এলাকায় নির্মাণ করব এবং স্যাঁতসেঁতে ও ক্ষতিকর পরিবেশে জনবসতি স্থাপনে উৎসাহ প্রদান করব ইত্যাদি। ফলে দারিদ্র্য হঠানোর চেয়ে দরিদ্রদের মৃত্যুর মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত হয়। এই নিষ্ঠুর নীতি অনুসরণের মাধ্যমে অর্থাৎ অস্তিত্বের সংগ্রামে শক্তিধর বিজয়ী ও দুর্বল পরাস্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় দ্রুত ও বর্ধনশীল জনসংখ্যার সমতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
উনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে এই নিষ্ঠুর “গরীব নিধন” কর্মসূচী প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবায়ন করা হয়। এর আওতায় একটি শিল্পায়ন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে ৮/৯ বছরের শিশু শ্রমিকদের ১৬ ঘণ্টা কয়লার খনির অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হতো এবং এ প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার শিশু নিধন করা হয়। "অস্তিত্বের সংগ্রামের” তাত্ত্বিক ভিত্তি যা মালথাস দিয়েছিলেন এরই ধারাবাহিকতায় ইংল্যান্ডে লক্ষ লক্ষ গরীব জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন।
ডারউইন, মালথাসের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধারণা করলেন যে, সমগ্র প্রকৃতিতে এই ধারাই বিরাজমান। কাজেই মানব সমাজেও এ ধারা প্রয়োগ করা উচিত। এটা হলো- "শক্তিশালী যোগ্যতরের বিজয় ও দুর্বলের পরাজয় ও ধ্বংস”। তিনি বিশেষভাবে এর উপর গুরুত্বারোপ করেন। এটা অলঙ্ঘনীয় ও চিরস্থায়ী প্রাকৃতিক বিধান হিসাবে তিনি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকৃতির মাধ্যমে তিনি জনসাধারণের ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি ও আদর্শকে বিসর্জন দিতে উৎসাহিত করেন কারণ এগুলো হলো তার "অস্তিত্বের সংগ্রাম” মতবাদের নিষ্ঠুর প্রয়োগ পদ্ধতির পরিপন্থী। এ কারণেই ডারউইনের মতবাদ তখন থেকেই শাসক শ্রেণীর পূর্ণ সমর্থন লাভ করে। সর্বপ্রথম যা ইংল্যান্ডে ও পরবর্তীতে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিপতি ও অন্যান্য বস্তুবাদী বুদ্ধিজীবীগণ এই মতবাদকে স্বাগত জানান। কারণ ইতোমধ্যে তারা যে ভারসাম্য ও নীতিহীন শোষণ ভিত্তিক রাজনৈতিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন, এ মতবাদের মধ্যেই তার তথাকথিত বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা দেখতে পেয়েছিলেন। এই কারণে তারা এ মতাদর্শ অনতিবিলম্বে গ্রহণ করে এর বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
বিবর্তনবাদ অচিরেই সমাজের সকল স্তরে অনুপ্রবেশ করে। সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি অর্থাৎ সমাজে এমন কোনো বিষয় রইল না যা এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বা স্লোগান হলো “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম” ও "যোগ্যতমের টিকে থাকা।” রাজনৈতিক দল, জাতি, দেশ, প্রশাসন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সমাজের প্রায় প্রতিটি ব্যক্তি এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় কারণ ইতোমধ্যে সমাজে প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী মতাদর্শ হিসাবে ডারউইনবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে বা অন্য কথায়, সমাজের সকল চিন্তা, চেতনা, ভাবধারায় ডারউইনবাদ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এমনকি চিত্রকলা, রাজনীতি, ইতিহাস এ সকল ক্ষেত্রও ডারউইনীয় মতাদর্শের আওতা বহির্ভূত থাকল না।
ডারউইনবাদের সাথে প্রতিটি বিষয়ের সম্পর্ক স্থাপন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ডারউইনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করার রীতি/পদ্ধতি চালু করা হয়। এরই ফলশ্রুতিতে এমনকি ডারউইনবাদের নাম না জানা সত্ত্বেও ডারউইনীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে যে ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা তাই সমাজে গড়ে ওঠে। ডারউইন নিজেই সুপারিশ করেছিলেন যে, তার মতবাদ (বিবর্তনবাদ) যেন সামাজিক বিজ্ঞানে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োগ করা হয়। ১৮৬৯ সালে এইচ থিল (H. Thiel)-এর নিকট লিখিত এক পত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে: “প্রজাতিসমূহের বিবর্তনের ক্ষেত্রে আমি যে মতামত প্রকাশ করেছি তা সামাজিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যেন সমভাবে ব্যবহার না করা হয়। আপনি তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে পারেন। তিনি আরো বলেন যে, ইতোমধ্যে আমি কোনোক্রমেই মনে করি নাই যে, আমার মতামত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে (নৈতিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে) এত ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হবে।” “প্রকৃতির এই সংগ্রাম” মানবীয় চরিত্র ও কর্মকাণ্ডে আরোপ করা হয়। ফলে বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম, সাম্রাজ্যবাদ প্রভৃতি নামে এ সংগ্রাম আত্মপ্রকাশ করে এবং এর মাধ্যমে শক্তিধর ব্যক্তি, জাতি, গোষ্ঠী, তাদের বিবেচনায় যারা দুর্বল তাদের ধ্বংস করার নতুন হাতিয়ার পেল। এই ধ্বংস যজ্ঞের তথাকথিত বিজ্ঞান সম্মত তত্ত্ব পাওয়া গেল। এ কারণে বর্তমানে যারা জঘন্য গণহত্যা ও মানুষের সাথে পশুর ন্যায় আচরণ করে; মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় এবং মানুষের গাত্রবর্ণের কারণে হীন বিবেচনা করে; প্রতিযোগিতার নামে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়, ধনী হয়েও দরিদ্রদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় না, তাদের কার্যকলাপকে নিন্দা করা বা বাধা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাদের মতে তারা একটি তথাকথিত প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক আইনের আওতায় এ সব নির্বিচারে করছে। এ সকল কর্মকাণ্ডকে এক কথায় সামাজিক ডারউইনবাদ হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী, আমেরিকান জীবাশ্ম বিজ্ঞানী STEPHEN JAY GOULD এ সত্য স্বীকার করে উল্লেখ করেছেন: ১৮৫৯ সালে দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ প্রকাশিত হওয়ার পর দাস প্রথা, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, শ্রেণি সংগ্রাম, লিঙ্গ বৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচার “বিজ্ঞানের নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।” মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ, নিষ্ঠুরতা, জাত্যাভিমান, সংঘাত, বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সব সময় মানব জাতিকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তাদের এ সকল কর্মকাণ্ড অন্যায়, ভুল, এবং তা থেকে বিরত থেকে মানব জাতিকে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। মানব জাতি ঐশী ধর্মের মাধ্যমে অন্তত পক্ষে এটুকু বুঝতে ও জানতে পেরেছিল যে, তাদের এ সকল উৎপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া ভুল বা অন্যায় যা নৈতিকতাবিরোধী। উনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনবাদের প্রচার ও প্রসারের পর জনমনে এ ধারণা সৃষ্টি হলো লাভ, জুলুম ও অবিচারের জন্য দ্বন্দ্ব সংগ্রাম করার একটি তথাকথিত বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা রয়েছে। বলা হলো এটা মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের আক্রমণাত্মক ও বর্বরোচিত আচরণ সে তার পূর্ব পুরুষদের (পাশবিক চরিত্র) কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে তাই জঙ্গলে যেভাবে সবচেয়ে বলশালী ও আক্রমণাত্মক প্রাণী সংগ্রামের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে, সেই একই আইন মানব সমাজেও সমভাবে প্রযোজ্য। এ চিন্তাধারার প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ, বিপর্যয়, গণহত্যা ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। ডারউইনবাদ এ সকল কর্মকাণ্ডে সমর্থন ও উৎসাহ যোগায়। অর্থাৎ এ মতবাদ সকল প্রকার রক্তপাত, সংঘাত, নির্যাতন ও দুঃখ-কষ্টকে যৌক্তিক সমর্থন দিয়ে থাকে। এ কারণেই তথাকথিত বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও পৃষ্ঠপোষকতায় সকল মানবধ্বংসী মতবাদ সমূহ নৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে বিংশ শতাব্দীকে "এক দুর্ভোগের শতক” হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।
ইতিহাসের অধ্যাপক Jacques Barzun তাঁর বই DARWIN, MARX, WAGNER-এ বর্তমান বিশ্বের নৈতিকতার অধঃপতনের কারণ অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক, সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করেছেন। এ পুস্তকে সমাজে ডারউইনবাদের প্রভাব বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যেঃ ১৮৭০ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশের যুদ্ধবাজ রাজনৈতিক দল চাচ্ছিল অস্ত্র, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদী দল চাচ্ছিল নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা, রাজতন্ত্রবাদী দলের দাবি ছিল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উপর প্রাধান্য বিস্তার, সমাজতান্ত্রিক দলের ছিল দাবি-ক্ষমতা দখল, বর্ণবাদী দলের দাবি বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ বহিষ্কার/আবাসায়ন। এ সকল মতাদর্শীই কোনো না কোনোভাবে তাদের চিন্তাধারার স্বপক্ষে ডারউইনবাদকে ব্যবহার করেন। ডারউইন ও স্পেন্সার বিষয়টি পূর্বেই উপস্থাপন করেছিলেন, এতে বলা হলো যেহেতু কোনো বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব একটি জীব বিজ্ঞানের বিষয় যেহেতু তা মানব সমাজ সম্পর্কিত তাই এটা সমাজ বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু, এটাই ডারউইনবাদ।
উনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইন যখন তার বিবর্তনবাদ তত্ত্বের মাধ্যমে দাবি করলেন যে, সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক কোনো কিছু সৃষ্টি করা হয় নাই, বরং “দৈবাৎ স্বতস্ফূর্তভাবে এগুলি বিকাশ লাভ করেছে”; মানব জাতি ও পশুকুল এক অভিন্ন পূর্ব পুরুষ থেকে আবির্ভূত হয়ে পরবর্তীতে এক অতি উন্নত প্রজাতি/প্রাণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে; অধিকাংশ লোকই তখন এই দাবীর প্রকৃত কুফল সম্পর্কে ধারণা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এই কুফলের ভয়াবহতা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। যারা মানব জাতিকে “উন্নত পশু” হিসাবে বিবেচনা করেছে, তারা দুর্বল, অসুস্থ ও তাদের বিবেচনায় “নীচ” বলে মনে করেছে তাদের “হীন প্রাণী” হিসাবে গণ্য করে ঘৃণাভরে পদদলিত করেছে। এবং এই তাদের থেকে “নীচু প্রজাতিকে” নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে দ্বিধা করে নাই। কারণ তাদের তত্ত্বে একটি মুখোশ ব্যবহার করা হচ্ছে তা হলো “প্রাকৃতিক আইন।” এভাবেই ডারউইনবাদ বিশ্বে মহাবিপর্যয় নিয়ে এসেছে এবং দ্রুতগতিতে তা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকগণের চিন্তাধারা ডারউইনবাদের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ভাবধারায় উদ্ভাবিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করত যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি মানুষসহ সমগ্র প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করেছেন। তাছাড়া অন্যান্য প্রাণী থেকে মনুষ্য প্রজাতির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে কারণ মানুষের রয়েছে আত্মা যা সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য সৃষ্টি। মানুষ সে যে বর্ণের বা জাতির বা গোত্রেরই হোক না কেন, মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি ও তার বান্দা বা দাস। ধর্মহীনতা তথা নাস্তিক্যবাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ডারউইনবাদ বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি সৃষ্টি করে। এরা মানুষকে একটি উন্নত প্রজাতির পশু হিসাবে গণ্য করতে থাকে এবং একটি নিষ্ঠুর ও প্রতিযোগিতামূলক নিষ্ঠুর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে সকল কর্মকাণ্ডে মানবতাবাদী নীতি ও আদর্শ বর্জন করে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কোনো দায়-দায়িত্বের অস্বীকৃতির মাধ্যমে তারা এমন একটি সংস্কৃতি সৃষ্টি করে যেখানে সকল প্রকার স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুরতা যৌক্তিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বিভিন্ন মত, পথ ও আদর্শের জন্ম হয় এবং এদের প্রত্যেকটি "বাদ বা মতাদর্শ” মানবজাতি তথা পৃথিবীর জন্য এক একটি মহা বিপর্যয় হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ডারউইনবাদ যে সমস্ত "মতবাদকে” সমর্থন দান করেছে এবং এ ধরনের তাত্ত্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা কিভাবে বিশ্বমানবতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তীতে পর্যালোচনা করা হবে।
📄 ডারউইনের বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদ ডারউইনবাদের সাথে ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ মিত্রতা
ডারউইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রফেসর ADAM SEDGWICK ছিলেন তাদেরই একজন যারা বিবর্তনবাদের ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে পূর্বেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই পুস্তকটি পাঠ করে এর বিষয়বস্তু অনুধাবন করার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “এই মতাদর্শ সর্বজনগ্রাহ্য হলে মানব জাতির জন্য এমন বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে আসবে যা অতীতে মানুষ কখনও প্রত্যক্ষ করে নাই।” ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে ADAM SEDGWICK এর ধারণা অমূলক ছিল না বরং ডারউইনবাদের যুক্তি ও তথাকথিত প্রাকৃতিক আইনের আওতায় যা করেছেন তা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। শুধুমাত্র জাতিগত ও জন্ম তথা বর্ণগত কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। ফলে উনবিংশ শতাব্দী হয়েছে অন্ধকার যুগ। ডারউইনের পূর্বে যদিও জাতিগত বৈষম্য ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু ডারউইনবাদ এ ধরনের বৈষম্যকে একটি মিথ্যা বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব ও অলীক যৌক্তিকতা দান করেছে যা বিশ্বের ইতিহাসে কখনও নৈতিক সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয় নাই।
বর্তমানে অধিকাংশ ডারউইনবাদী দাবি করে থাকেন যে, ডারউইন কখনও বর্ণবাদী ছিলেন না বরং বর্ণবাদীরা তাদের মতবাদকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে ডারউইনের মতবাদকে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা আরো দাবি করেন, ডারউইনের পুস্তকে The Origin of Species উপ-শিরোনাম By the preservation of Favoured Races শুধুমাত্র প্রাণী জগতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। এ সব দাবীর প্রবক্তারা প্রকৃতপক্ষে এ পুস্তকে ডারউইন মানব প্রজাতি সম্পর্কে কি মতামত উপস্থাপন করেছেন তা অস্বীকার করছেন বা তা বিবেচনা করেননি।
ডারউইন তার পুস্তকে উল্লেখ করেছেন যে, মানব জাতি বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে। কোনো কোনো মানব প্রজাতি অন্যদের তুলনায় অধিকতর বিকশিত ও অগ্রসর হয়েছে। কোনো কোনো প্রজাতি বা তাদের পূর্ব পুরুষ মানবদের তুলনায় কিছুটা উন্নত বা অগ্রসর বা অধিকতর বিকশিত। এ প্রজাতির কোনো কোনটি আবার বানরের পর্যায় থেকে একটু সামান্য বেশি উন্নত। ডারউইন আরো দাবি করেন যে, (বিভিন্ন মানুষ) প্রজাতির মধ্যে “অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম” পশুদের ন্যায় সমভাবে প্রযোজ্য। “অনুকূল পরিবেশ প্রাপ্ত প্রজাতি” এ সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে থাকে। ডারউইনের মতে এ সকল ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ প্রজাতি হলো ইউরোপীয় শ্বেতকায় জাতি সমূহ। এশিয়া ও আফ্রিকায় মনুষ্য প্রজাতি “অস্তিত্বের এ সংগ্রামে পিছিয়ে রয়েছে বা তারা হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। তিনি আরো দাবি করেন যে, এ প্রজাতি সমূহ বিশ্বব্যাপী “অস্তিত্বের সংগ্রামে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে”।
“শতাব্দীর গণনায় অদূর ভবিষ্যতে সভ্য প্রজাতির মানুষ অবশ্যই অসভ্য ও বর্বর প্রজাতির জনগোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করবে এবং তাদের স্থান অধিকার করবে। মানুষ তার নিকটতম প্রজাতি এর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিকতর উন্মুক্ত ও সুশীল হবে। অর্থাৎ বর্তমানে (১৮৫৯ সালে) আফ্রিকার নিগ্রো বা অস্ট্রেলিয়ান (আদিবাসী) এবং গরিলাদের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয় তা ককেশীয়-ইউরোপীয় এবং অন্য বেবুন প্রভৃতি নিম্ন প্রজাতির থেকে উন্নত হিসাবে বিবেচনা করা যায়।” দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ-এর অন্যত্র তিনি দাবি করেছেন যে, অনুন্নত প্রজাতির জনগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত। উন্নত প্রজাতির মানুষদের তাদের জীবিত ও রক্ষা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তিনি পশু প্রজনন ও প্রতিপালনের পদ্ধতির সাথে বিষয়টি তুলনা করে উল্লেখ করেন যেঃ “অনুন্নত জনগোষ্ঠীর সাথে সাথে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল তাদের অচিরেই নির্মূল করা হবে এবং যারা সাধারণতঃ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তারাই টিকে থাকবে। আমরা সভ্য মানুষরা এই নির্মূল প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়ে থাকি, আমরা পাগল ও দুর্বলদের, মানসিক রোগগ্রস্তদের জন্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য নিবাস নির্মাণ করি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গরিবী আইন প্রণয়ন করি। আমাদের চিকিৎসকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ সব লোকের জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এটা বিশ্বাস করার যুক্তি সংগত কারণ রয়েছে যে, টিকা হাজার হাজার মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। অতীতে যারা শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল তারা গুটি বসন্তে মৃত্যুমুখে পতিত হতো। সুশীল সমাজের দুর্বল ব্যক্তিবর্গ, এ সকল কর্মকাণ্ডকে তাদের দয়া হিসাবে প্রচারণা চালান। যারা পশু প্রজনন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা অবশ্যই সন্দেহ করবেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানব প্রজাতির স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।”
আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ডারউইন তার পুস্তকে অস্ট্রেলিয়ার আদিম প্রজাতি ও আফ্রিকার নিগ্রো গেরিলাদের এক সমতালে নিয়ে এসে দাবি করেছেন যে, এ সকল জনগোষ্ঠী নির্মূল হয়ে যাওয়া উচিত। তার বিবেচনায় অন্যান্য “হীন” প্রজাতির জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা বাড়তে দেওয়া উচিত নয় যাতে এগুলি দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অতএব দেখা যাচ্ছে যে বর্ণবাদী তত্ত্বে ডারউইন উল্লেখিতভাবে তা সমর্থন ও অনুমোদন দিয়েছেন। ডারউইনের বর্ণবাদী চিন্তাধারা অনুযায়ী সুসভ্য মানুষের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো বিবর্তনবাদের প্রক্রিয়া (অর্থাৎ হীন জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কাজ) ত্বরান্বিত করা। এ পরিস্থিতিতে “বৈজ্ঞানিক” দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে বর্তমানে এ সব নিম্ন প্রজাতির কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ এ হীন জনগোষ্ঠীকে কোনো না কোনোভাবে নির্মূল হতেই হবে।
ডারউইনের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার বিভিন্ন লেখায় পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, Tierra Del Fuego জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তার বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় এ এলাকার স্থানীয় অধিবাসী সম্পর্কে তার বর্ণনায়। তিনি লিখেছেন “এরা সম্পূর্ণ নগ্ন থাকে, রং মেখে থাকে, পশুর মতো যাচ্ছে তাই আহার করে, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন, তাদের গোত্রের বাইরের লোকের প্রতি নিষ্ঠুর, তারা তাদের শত্রুকে নিপীড়ন করে আনন্দ পায়, স্ত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রাণীকে বলি দেয়, শিশুদের হত্যা করে সম্পূর্ণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি জনগোষ্ঠী।” অথচ ডারউইনের পূর্বে গবেষক WP Snow একই এলাকায় ভ্রমণ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এরা খুব শক্তিশালী যোদ্ধা। তারা তাদের শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, তাদের অনেক শিল্পকলা অতি সমৃদ্ধ, তারা সম্পদের উপর অধিকারের স্বীকৃতি দেয়, তারা তাদের বৃদ্ধা মহিলাদের কর্তৃত্ব মেনে চলে।”
এ সকল উদাহরণ থেকে দেখা যায় যে, ডারউইন একজন পুরোপুরি বর্ণবাদী লোক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ডারউইন তার পুস্তক Descent of Man এ সুসভ্য মনুষ্য প্রজাতির সাথে অনগ্রসর প্রজাতির তুলনা প্রসঙ্গে বহু ধরনের মন্তব্য করেছিলেন যা Benjamin Farrington তার বই What Darwin Really Said বইয়ে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। তাছাড়া, ডারউইনের মতবাদে সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতির কারণে সব মানুষকে আল্লাহ সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন এ বাস্তব সত্য তা জনগণ বুঝতেই পারল না। বর্ণবাদের উত্থান ও তার বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ হলো এই ডারউইনবাদ। আমেরিকান বিজ্ঞানী James Ferguson সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতির সাথে বর্ণবাদের উত্থানের গভীর সম্পর্কের বিষয় এভাবে বর্ণনা করেছেন: নতুন নৃতত্ত্ব অল্পদিনের মধ্যেই মানব সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে দুই বিবাদমান তত্ত্বের প্রেক্ষাপট হিসাবে কাজ করল। মানব সমাজে প্রচলিত বিদ্যমান ধারণা/মতবাদ ছিল যে মানুষের গায়ের রং বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যাই হোক না কেন সকল মানুষ আদম (আঃ) থেকে আগত এবং আল্লাহ আদম সৃষ্টি করেছেন। সবাই এক বংশজাত (MONOGENISM)। যা একটি ধর্মীয় বিশ্বাস যা গির্জা কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা। এটা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু যখন এই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করে নতুন মতবাদ অর্থাৎ মানুষের (POLYGENISM) একাধিক বংশলতিকা রয়েছে, অর্থাৎ কোনো একক ব্যক্তি মানুষের আদি পিতা নয়, বিভিন্ন জাতিসত্তার পিতাও বিভিন্ন—ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বিদ্যমান ছিল তা ছিন্ন হয়ে গেল। অর্থাৎ বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা হলো।
ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ LALITA VIDYARTHI ডারউইনের বিবর্তনবাদের মাধ্যমে বর্ণবাদ কিভাবে সমাজ বিজ্ঞানে গৃহীত হয় তার বিবরণ উল্লেখ করে লিখেছেনঃ “ডারউইনের যোগ্যতম টিকে থাকে মতবাদ সমাজ বিজ্ঞানীগণ স্বাগত জানালেন। তারা বিশ্বাস করলেন মানব প্রজাতি বিভিন্ন বিবর্তন প্রক্রিয়া অতিক্রম করে তার চূড়ান্ত অবস্থা অর্থাৎ শ্বেতকায়দের সভ্যতায় উন্নীত হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ বিজ্ঞানী বর্ণবাদকে বাস্তব সত্য হিসাবে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন বা মেনে নিলেন।” ডারউইন পরবর্তী বিবর্তনবাদীরা তার বর্ণবাদী মতাদর্শ থাকার বিষয়টি জোরেশোরে প্রচার-প্রকাশ করতে থাকলেন। এ কাজ করতে তারা সকল নীতি আদর্শ বর্জন করে অনেক বৈজ্ঞানিক অসংগতি ও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরা ভাবতে থাকেন, এ তত্ত্ব প্রমাণের মাধ্যমে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে ভিন্ন প্রজাতির মানব সন্তানকে নির্যাতন, শাসন, শোষণ ও প্রয়োজনবোধে নিশ্চিহ্ন করার “প্রকৃতি প্রদত্ত অধিকার” অর্জন করেছেন।
Stephen Jay Gould তার পুস্তক The Mismeasure of Man এর তৃতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কিছু সংখ্যক নৃতত্ত্ববিদ শ্বেতাঙ্গদের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা তত্ত্ব ও উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। Gould এর মতে এ প্রক্রিয়ায় তারা প্রাপ্ত জীবাশ্ম, মাথার খুলি ও মস্তিষ্কের আকার সম্পর্কে মিথ্যাচার করেছেন। তাদের ধারণা ছিল মানব বুদ্ধিবৃত্তির সাথে মস্তিষ্কের আকারের একটি সম্পর্ক আছে। অনেক নৃতত্ত্ববিদ ককেশীয়দের খুলির আকার ইচ্ছাকৃতভাবে বড় দেখিয়ে ভারতীয় ও কালো জনগোষ্ঠীর বুদ্ধি কম হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। যা ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার নামে জালিয়াতি। Gould তার পুস্তক Ever Since Darwin এ উল্লেখ করেছেন যে, কিছু বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে তাদের মিথ্যা দাবি অর্থাৎ কিছু কিছু মানুষ প্রজাতি ‘‘হীন’’ প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন : Haeckel ও তার সঙ্গীরাও উত্তরের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য জোর দাবি উত্থাপন করেন। মানব শরীর ও তার ব্যবহার সম্পর্কিত বিভিন্ন জীবাশ্ম ও অন্যান্য প্রমাণাদি ঘষা-মাজা করে তাদের দাবীর সমর্থনে বিভিন্ন তথ্য/তত্ত্ব উপস্থাপন করতে থাকেন। Herbert Spencer লিখেছেন: “অসভ্যদের বুদ্ধিবৃত্তিও তাদের সন্তানদের মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটে।” ১৮৬৪ সালে Carl Vogt খুব জোরেশোরে বলতে শুরু করেন যে, “একজন পূর্ণ বয়স্ক নিগ্রোর বুদ্ধিবৃত্তির মাত্রা একটি শিশুর ন্যায়। আমরা অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি যে যদিও কোনো কোনো গোত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, অদ্ভুত সংঘ, প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে, কিন্তু অবশিষ্টরা বা সমগ্র কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতি সামগ্রিকভাবে না অতীতে না বর্তমানে মানব জাতির উন্নয়নে এমন কোনো ভূমিকা রাখে নাই যে কারণে তাদের বাঁচিয়ে রাখা যায়।” ফরাসী অ্যানাটমিস্ট ETIENNE SERRES কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা আদিম (অনুন্নত প্রজাতি) কারণ তাদের নাভি (Belly Button) একটু নীচের দিকে অবস্থিত।
ডারউইনের সমসাময়িক বিবর্তনবাদী Havelock Ellis শ্রেষ্ঠ ও "হীন” প্রজাতির পার্থক্যের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ আফ্রিকান প্রজাতির শিশু কদাচিৎ কোনো ইউরোপীয় শিশু থেকে কম বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। কিন্তু আফ্রিকান শিশু বয়স বৃদ্ধির সাথে নির্বোধ ও স্থূল বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে যায় এবং তার সমগ্র জীবন একটি সংকীর্ণ/গোঁড়া রীতি-নীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে একজন ইউরোপীয় তার শিশু সুলভ উৎফুল্লতা বজায় রাখে। ফরাসী নৃতত্ত্ববিদ Vacher de Lapouge দাবি করেন যে, "অশ্বেতাঙ্গ শ্রেণিভুক্ত মানব সন্তানগণ অসভ্য মানব প্রজাতির বংশধর অথবা মিশ্ররক্তের অধঃপতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তিনি ফ্রান্সের বিভিন্ন গোরস্থান থেকে প্যারিসের অভিজাত ও নীচু শ্রেণির মানুষের খুলি গবেষণা করেন। তার গবেষণার যে ফলাফল প্রকাশ করেন তা হলো: একটি নির্দিষ্ট আকৃতির খুলির অধিকারী ব্যক্তি স্বভাবতই ধনী, আত্মবিশ্বাসী, মুক্ত, স্বাধীন, রক্ষণশীল, অল্পে তুষ্ট, একজন আদর্শ সেবক/দাস হওয়ার যোগ্য। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রেণি বিন্যাস হয়ে থাকে। শ্রেষ্ঠ মনুষ্য প্রজাতির সদস্যরারাই উচ্চতর শ্রেণিভুক্ত হয়ে থাকে। মানুষের খুলির আকারের সাথে আনুপাতিক হারে মানুষ ধন ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে থাকে। Lapouge আরো বলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ আকৃতি গোল অথবা চোখা হওয়ার জন্য হত্যা করবে। তার এ ভবিষদ্বাণী সত্য হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে নৃশংসভাবে শুধুমাত্র বর্ণবাদের কারণে হত্যা করা হয়।
শুধুমাত্র নৃবিজ্ঞানী নয় বরং কীটতত্ত্ববিদ (Entomologist) ও ডারউইনের বিকৃত বিবর্তনবাদে গভীর বিশ্বাসী হয়ে বর্ণবাদের মতাদর্শের অনুসারী হয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ১৮৬১ সালে একজন বৃটিশ কীটতত্ত্ববিদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের দেহে বসবাসকারী উকুনের উপর গবেষণা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এক নির্দিষ্ট প্রজাতির উকুন ভিন্ন মনুষ্য প্রজাতির দেহে বাস করতে পারে না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে এটা হাস্যস্পদ ছাড়া অন্য কিছু বিবেচনা করা যায় না। ডারউইন তত্ত্বের বর্ণবাদী দিক উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কারণ ওই সময় একজন শ্বেতাঙ্গ তাদের অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা খুঁজছিলেন।
ডারউইন যখন এ মতবাদ উপস্থাপন করেন তখন গ্রেট বৃটেন পৃথিবীর উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্য হিসাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। ভারত থেকে ল্যাটিন আমেরিকা পর্যন্ত সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বৃটিশ সাম্রাজ্যের করতলগত। শ্বেতাঙ্গ মানুষ তাদের স্বার্থে পৃথিবী লুণ্ঠন করছে। তবে ইতিহাস তাদের লুটেরা হিসাবে চিহ্নিত করুক তা কোনো রাষ্ট্র পছন্দ করছিল না। এ কারণে তারা তাদের শাসন ও শোষণ যে সঠিক তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করছিল। যে সমস্ত দেশ উপনিবেশ হিসাবে তাদের অধীন ছিল সে সমস্ত দেশের জনগণ “আদিবাসী পশু সুলভ জীবন্ত প্রাণী” হিসাবে চিহ্নিত করা। যে সকল জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে হত্যা করা, বা যাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে তারা প্রকৃত পক্ষে স্বাভাবিক মানব সন্তান নয় বরং তারা "অর্ধ মানব-অর্ধ পশু"। তাই তাদের সাথে যে নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে তা অপরাধ নয় এটা প্রমাণ করার জন্য তাত্ত্বিক অনুসন্ধান অব্যাহত ছিল। Christopher Columbus তার আমেরিকা যাত্রার সময় দাবি করেন যে, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী অর্ধ-পশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এই দাবি অনুযায়ী আমেরিকার আদিবাসীগণ মনুষ্য সন্তান নয় বরং তারা এক ধরনের উন্নত পশু প্রজাতির। এ কারণে তাদেরকে স্থানীয় উপনিবেশবাদীদের সেবায় নিয়োজিত করা যায়।
Christopher Columbus মেক্সিকো ও আমেরিকায় ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত করেন। ঐতিহাসিকগণের হিসাব অনুযায়ী Columbus এ মহাদেশে পদার্পণ করার পর ১০০ বছরের কম সময়ের মধ্যে ৯৫ মিলিয়ন লোককে উপনিবেশবাদীরা হত্যা করে। সাম্রাজ্যবাদীদের এ দাবি বা যুক্তি অধিকাংশ লোকই গ্রহণ করেনি কারণ ইউরোপে তখন ধর্মীয় দাবি/মতামত সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। ডারউইনের বস্তুবাদী দর্শন এতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে এবং ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। প্রফেসর James Joll তার EUROPE SINCE 1870 গ্রন্থে ডারউইনবাদ, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন। উনবিংশ শতকের ডারউইনবাদকে একটি তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ হিসাবে বিবেচনা করে উপনিবেশবাদ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে গ্রেট বৃটেন। চীনের বিরুদ্ধে "আফিম যুদ্ধ" এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতন ডারউইনবাদের “যোগ্যতমের টিকে থাকা” তত্ত্বের নামে চালানো হয়। ডারউইন তুর্কী জাতির বিরুদ্ধেও বৈরিতা পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন তুর্কীরা এক ধরনের “অনুন্নত প্রজাতি” যারা সভ্য ইউরোপীয়দের কাছে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হবে। তার এই অভিমত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানী সাম্রাজ্য ধ্বংসের পেছনে প্রোপাগান্ডা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছিল।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট Theodore Roosevelt-ও সামাজিক ডারউইনবাদের একজন বড় সমর্থক ছিলেন। রেড ইন্ডিয়ানদের (Native Americans) সংরক্ষিত এলাকায় বাধ্যতামূলক আবাসন ও নিধন কর্মকাণ্ডকে তিনি ডারউইনবাদের আলোকে তাত্ত্বিক রূপ দেন। আমেরিকান সমাজে জিম ক্রো আইন (Jim Crow Laws) প্রবর্তনের মাধ্যমে সাদা ও কালোদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়, যেখানে কালো মানুষদের অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হতো। অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের (Aborigines) ওপর যে অমানবিক নির্যাতন ও গণহত্যা চালানো হয়, তার মূলেও ছিল ডারউইনবাদ। তাদের ‘অর্ধ-বানর অর্ধ-মানব’ মনে করে গবেষণাগারের গিনিপিগ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। পিগমি ওটা বেঙ্গাকে (Ota Benga) ১৯০৪ সালে খাঁচায় বন্দি করে শিম্পাঞ্জি ও গরিলার সাথে প্রদর্শন করা ডারউইনবাদী বর্ণবাদের এক চূড়ান্ত বর্বরোচিত উদাহরণ।
ডারউইনবাদের সাথে হিটলারের অশুভ ঐক্যের বিষয়টিও অত্যন্ত প্রকট। হিটলারের নাৎসি মতাদর্শ ডারউইনের “টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম” তত্ত্ব দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। হিটলার আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ডারউইনবাদকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেন। তিনি ইউজেনিক (Eugenics) বা “উন্নত মানব প্রজাতি প্রজনন মতবাদ” গ্রহণ করে অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও ‘অনুন্নত’ জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করেন। নাৎসি জার্মানিতে নারীদের হীন গণ্য করা, মানসিক রোগীদের হত্যা করা এবং আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে নিষ্ঠুরতা চালানো ডারউইনবাদেরই সামাজিক প্রয়োগ। মুসোলিনী এবং ফ্রাংকোও ডারউইনবাদের একই তাত্ত্বিক ভিত্তিকে ব্যবহার করে ইতালি ও স্পেনে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন এবং অগনিত হত্যাকাণ্ড ঘটান। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির পেছনেও ডারউইনবাদের এই নিষ্ঠুর দর্শনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। আধুনিক যুগেও নব্য নাজিরা (Neo-Nazis) ডারউইনবাদের এই বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে ঘৃণা ও সহিংসতার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। ডারউইনবাদ যতদিন পর্যন্ত অবৈজ্ঞানিক এবং ভিত্তিহীন হিসাবে তাদের কাছে প্রতীয়মান হবে ততদিন এসব কর্মকাণ্ড চলতেই থাকবে।
📄 ডারউইনবাদ কমিউনিজম বর্বরতার উৎস ও ভিত্তি
বিংশ শতাব্দীতে যে মতাদর্শ মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বর্বরোচিত ও ক্ষতিকারক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে, সেই মতাদর্শের নাম সমাজতন্ত্র। উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র যে দুজন জার্মান দার্শনিকের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে, তারা হচ্ছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। এই মতাদর্শ পৃথিবীতে এত রক্তপাত ঘটায় যে নাজি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের অত্যাচারকেও তা ম্লান করেছে। এই মতাদর্শ অগণিত নিরীহ লোককে হত্যা করেছে এবং এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংঘাত, ভয়, হতাশা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে গ্রাস করেছে। এমনকি এখনও যদি কেহ "লৌহ যবনিকা" ও রাশিয়ার কথা উল্লেখ করে তখন জনমনে এমন এক ত্রাসের সমাজের কথা মনে হয়, সেখানে অন্ধকার, কুয়াশা এবং হতাশা জনপ্রাণহীন রাস্তাঘাট, দুঃখ-কষ্ট ও এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও ১৯৯১ সালে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে তবুও এর ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। অনুমোদনহীন সমাজবাদী-মার্কসবাদীদের কিছু ব্যক্তি যতই মুক্ত বুদ্ধি সম্পন্ন জড়বাদী দর্শন এবং সমাজবাদের অন্ধকার দিক এখনও পর্যন্ত জনগণকে প্রভাবিত করছে। প্রকৃতপক্ষে এই চিন্তাধারা ও মতাদর্শ মানব সমাজকে ধর্মহীন এবং নীতিহীন হিসাবে প্রতিপালন করে চলেছে।
এই মতাদর্শ যা পৃথিবীর সকল ভৌগোলিক এলাকায় সন্ত্রাস ও সংঘাতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে আদিকালের একটি মতবাদের প্রতিনিধিত্বকারী মতাদর্শ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এটি এমন একটি বিশ্বাস যা বিবেচনা করে যে, পৃথিবীতে সকল ধরনের উন্নতি বা বিকাশ হলো দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামের ফসল। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে মার্কস এবং এঙ্গেলস পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেন। মার্কস দাবি করেন, মানব জাতির ইতিহাস হলো দ্বন্দ্ব সংঘাত ও সংগ্রামের ইতিহাস। মানব জাতির বর্তমান সমস্যা হচ্ছে শ্রমিকদের সাথে পুঁজিপতিদের সংগ্রাম বা যুদ্ধ। শ্রমিক সম্প্রদায় অচিরেই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি সাম্যবাদী সমাজ গঠন করবে।
অন্যান্য জড়বাদী দার্শনিকদের ন্যায় সমাজতন্ত্রের এই দুই প্রতিষ্ঠাতা, ধর্ম সম্পর্কে একটি সুগভীর ঘৃণা পোষণ করতেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস দুজনে নাস্তিক্যবাদের অনুসারী ছিলেন এবং সমাজতন্ত্র প্রচারের জন্য ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনুশাসনকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা একটি অপরিহার্য কার্যক্রম হিসাবে তারা বিবেচনা করতেন। কিন্তু মার্কস ও এঙ্গেলস এর এ মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল তা হলোঃ ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের মতাদর্শকে একটি বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়া। ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ বইতে বিবর্তনবাদের যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, মার্কস ও এঙ্গেলস প্রকৃতপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশের জন্য এ ধরনের তত্ত্বের অনুসন্ধানেই ছিলেন। চার্লস ডারউইন দাবি করেন যে, প্রত্যেকটি প্রাণী টিকে থাকার সংগ্রাম অথবা দ্বান্দ্বিক সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকে। মার্কস ও এঙ্গেলস এই ভাবধারা তথা মতাদর্শকে সানন্দে গ্রহণ করেন।
সমাজতন্ত্রের প্রচার ও প্রসারের জন্য ডারউইনবাদের অপরিহার্যতা জানা যায় এ ব্যাপারে মার্কস ও এঙ্গেলসের পত্রালাপ থেকে। ডারউইনের পুস্তক প্রকাশিত (১৮৫৯) হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এঙ্গেলস মার্কসের কাছে এক পত্রে লিখেন: “ডারউইন যার পুস্তক (The Origin of Species) আমি এখন পড়ছি তা এক কথায় অপূর্ব ও চমৎকার।” এর উত্তরে মার্কস ১৯ ডিসেম্বর ১৮৬০ সালে এঙ্গেলসকে লিখলেন; “এই বইতে আমাদের মতাদর্শের প্রাকৃতিক ইতিহাসের মূল সূত্র বর্ণনা করা হয়েছে।” ১৮৬১ সালের ১৬ জানুয়ারি মার্কস তার সমাজবাদী বন্ধু LASSALLE কে লিখেন: “ডারউইনের পুস্তকটি আমার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানব ইতিহাসের শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তি তত্ত্ব সম্বলিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব এ বইতে বর্ণনা করা হয়েছে।”
মার্কস তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক ‘ডাস ক্যাপিটাল’ (DAS CAPITAL) ডারউইনের নামে উৎসর্গ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে মার্কস নিজেকে বৃটিশ প্রকৃতিবিদ ডারউইনের একজন একান্ত ভক্ত (Sincere admirer) হিসাবে উল্লেখ করেন। অনুরূপভাবে এঙ্গেলসও ডারউইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে উল্লেখ করেন যে, প্রকৃতি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কার্যক্ষেত্র; তাই এটা অবশ্যই সঠিক যে, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি দ্বান্দ্বিকভাবেই কাজ করে থাকে কোনো আধিভৌতিক সত্তার মাধ্যমে নয়। এ ব্যাপারে ডারউইনের নামই অন্য সবার আগে উল্লেখযোগ্য।
সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ মার্কস ও এঙ্গেলসের নীতি বাস্তবায়িত করেছিলেন যাদের সাথে বিবর্তনবাদীদের আদর্শগত মিল ছিল। লেনিন, ট্রটস্কি এবং স্ট্যালিন—প্রত্যেকেই ডারউইনবাদকে তাদের বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। স্ট্যালিন তার ৩০ বছরের শাসনামলে প্রায় ২০ মিলিয়ন লোককে হত্যা করেন। স্ট্যালিনের নিজের ভাষায় এই দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ডারউইনের বিবর্তনবাদ। স্ট্যালিনের জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন যে, শৈশবে স্ট্যালিন যখন গির্জার স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তখন তিনি ডারউইনের পুস্তক পাঠ করে একজন নাস্তিকে পরিণত হন। মাওসেতুং-এর নেতৃত্বে চীনেও ডারউইনবাদ ও মার্কসবাদের ভিত্তিতে এক ভয়াবহ নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তোলা হয়। সেখানেও কয়েক মিলিয়ন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
কমিউনিস্টরা যেখানেই ক্ষমতায় আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছে, সেখানেই নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশসমূহের জনগণ অনুরূপ ঘটনার শিকার হয়েছে। ‘দ্য ব্ল্যাক বুক অব কমিউনিজম’ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রায় ১০০ মিলিয়ন লোক মৃত্যুবরণ করেছে। ডারউইনবাদের প্রভাবেই কমিউনিস্টরা মানুষকে পশু হিসাবে মনে করে এবং পশুর সাথে যেমন আচরণ করা উচিত তাই করে থাকে। নাস্তিক্যবাদী ডারউইনবাদ সব রকমের নির্যাতন, নিপীড়ন, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, নিষ্ঠুরতা ও হত্যা সমর্থন করে, যদিও ধর্ম এসব কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।