📄 গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বিধান
মোটকথা, জাতিসংঘের এসব ঠুনকো নীতি ও ইসলাম-বিদ্বেষী শর্তাবলী যে ইসলামের দৃষ্টিতে একেবারেই মূল্যহীন, তা বুঝতে বড় ফকিহ বা মুজতাহিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই বর্তমানের যেসব অসচেতন আলিম কিংবা মডারেট মুসলিম জাতিসংঘের নাম দিয়ে আমাদেরকে চুক্তি, নিরাপত্তা ও শান্তির বাণী শোনায়, তাদের অনুরোধ করব, ভালো করে আগে জাতিসংঘকে জানুন, এর প্রেক্ষাপট ও সঠিক ইতিহাস পড়ুন, ইসলামের ক্ষতিসাধন ও মুসলিমদের খিলাফাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় তার জঘন্য সব পদক্ষেপ ও কুকীর্তি দেখুন, তারপর এ ব্যাপারে ফয়সালা করুন। জাতিসংঘের ভয়ংকর নীতিমালা ও গোপন উদ্দেশ্য জানলে চুক্তির নাম নেওয়া তো দূরে থাক, এর নাম নিতেও কলিজা কেঁপে উঠত এবং অন্তরে সৃষ্টি হতো প্রচণ্ড ঘৃণা। তাই বলি কি, জাতিসংঘের নামে চুক্তির অজুহাত তুলে মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প শোনানোর কোনোই প্রয়োজন নেই! তার চাইতে সে সময়টুকু বিশ্বরাজনীতি, তাদের মোড়লগীরি ও ইসলামের বিরুদ্ধে তাগুতদের বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করুন। আশা করি, বিষয়টি নিজেই বুঝতে পারবেন।
বর্তমান মুসলমানদের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হলো, কোনো বিষয়ে ভালো ধারণা না রাখা সত্ত্বেও অনেকে চূড়ান্ত মত বা সিদ্ধান্ত বলে দেয়। দুয়েকটি হাদিস বা লোকমুখে শোনা ইসলামের ব্যাপক কোনো মূলনীতিকে সামনে রেখেই স্পর্শকাতর বিষয়েও হুটহাট মন্তব্য করে বসে! শুধু তাই-ই নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলামের ব্যাপারে সামান্য নলেজের ওপর ভিত্তি করে জেনারেল লেভেলের একজন লোক প্রাজ্ঞ ও ভালো আলিমের সাথে তর্কে করছে! অথচ তার না জানা আছে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান, আর না সে বুঝতে পারবে শরিয়তের মূলনীতি ও স্পর্শকাতর মাসআলাগুলোর সূক্ষ্মতা। তবুও সে নিজের অপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ঝগড়া করে যায়। যেমন, ইসলামের উদারতা নিয়ে একদল উদারমনা লোকের সে কী মানবতার বহিঃপ্রকাশ! দেখে মনে হয়, দরদে সে ফেটে পড়ছে! বিশেষত আমাদের মূর্খ সমাজে কাফিরদের ক্ষেত্রে এসব উদারমনাদের বেশ কদর রয়েছে! কথা ও ভাবে প্রকাশ করে যে, এরাই সত্যিকার ইসলাম বহন করছে, আর এর বিপরীতে যারা স্পষ্ট দলিলের আলোকে কোথাও কঠোর এবং কোথাও নরম হওয়ার কথা বলে, তারা হয়ে যায় উগ্র ও ইসলামের বদনামকারী।
এমনই আরেকটি স্পর্শকাতর মাসআলা হলো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বিধান। আফসোস যে, এ মাসআলায় শুধু সাধারণ লোকদেরই নয়, অনেক আলিমেরও প্রাথমিক ধারণাটুকু নেই। বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, গণতন্ত্র ইসলাম-অনুমোদিত একটি পদ্ধতি। আর এজন্যই অধুনা কালে বিভিন্ন দেশে 'ইসলামি গণতন্ত্র' নামে নিকৃষ্ট একটি পরিভাষার কথা শোনা যায়। অনেক আলিমকেও অজ্ঞাতসারে এ পরিভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। অথচ এটা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত, বাজে ও পরিত্যাক্ত একটি পরিভাষা, যার সাথে ইসলামের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। বুঝবানদের কেউ কেউ অবশ্য এটাকে হারাম বলতে চান। যার অর্থ দাঁড়ায়, এটা গুনাহের কাজ হলেও এতে ইমান নষ্ট হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটা হালাল বা বৈধ তো দূরে থাক, হারামের স্তরেরও নয়। বরং এটা হলো স্পষ্ট কুফরি ও শিরকি একটি মতবাদ, যার রচয়িতা, সংস্কারক ও ব্যবহারকারী সামগ্রিকভাবে সবাই কাফির। অবশ্য মুসলিম দাবিদারদের মধ্য হতে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাফির বলতে হলে দেখতে হবে যে, তার মধ্যে 'মাওয়ানিউত তাকফির' (কাফির বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক কারণসমূহ) হতে কোনোটি পাওয়া যায় কিনা। যদি পাওয়া যায় তাহলে তো তাকে মাজুর ধরা হবে এবং কুফরি থাকা সত্ত্বেও তাকে কাফির বলা থেকে বিরত থাকতে হবে, অন্যথায় সে মুরতাদ বা ইসলামত্যাগী বলে বিবেচিত হবে। এ ব্যাপারে আমরা এখানে সামান্য আলোকপাত করছি, যাতে সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরি মতবাদ।
গণতন্ত্র সম্পর্কে শরয়ি হুকুম জানার পূর্বে প্রথমে এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় জানা জরুরি। গণতন্ত্রের ইংরেজি হলো, Democracy। শব্দটি মূলত গ্রীকভাষায় Demos এবং kratía শব্দ দু'টির সমন্বয়ে গঠিত। Demos অর্থ জনগণ আর kratía অর্থ শাসন। তাহলে Democracy এর আভিধানিক অর্থ দাঁড়াচ্ছে, জনগণের শাসন।
**পারিভাষিক অর্থ :**
ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকায় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে :
Democratic System of Government : A system of government based on the principle of majority dicision-making.
'সরকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি: সংখ্যাগরিষ্ঠ মত গ্রহণের নীতির উপর ভিত্তি করে সরকার ব্যবস্থা।' (এনকার্টা, ২০০৯, ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ২০১২)
আধুনিক গণতন্ত্রের রূপদাতা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গণতান্ত্রিক সরকারকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন :
Government of the people, by the people, for the people.
'জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের সরকার।' (প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, দ্যা গেটিসবার্গ আড্রেস, নভেম্বর, ১৯, ১৮৬৩)
উইকিপিডিয়ায় গণতন্ত্রের বিবরণ এভাবে দেওয়া হয়েছে :
'গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ণ ও তৈরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে।' (https:// bn.wikipedia.org/wiki/গণতন্ত্র)
সুতরাং গনতন্ত্র বলতে জনগনের স্বার্থে জনগনের দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবব্যবস্থাকে বুঝানো হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের জীবনব্যবব্যবস্থা তৈরি করে এবং তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজেদের সার্বভৌমিক ক্ষমতার বলে আইন রচনা করে। এভাবে জনগণ নিজেদের ক্ষমতার অনুশীলন করে এবং নিজেরাই নিজেদের পরিচালনা করে। গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে আইন প্রনয়ণ এবং শাসক নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির সমান অধিকার রয়েছে।
জনগণই এ ব্যবস্থায় বিধান প্রণয়ন করে এবং তারা নিজেদের তৈরি কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কারও কাছে জবাবদিহি করে না। জনগণই সার্বভৌমত্ব ও সকল ক্ষমতা ধারণ করে এবং জনগণই তাদের সার্বভৌমত্ব চর্চা করতে পারে। তাই বলা যায়, জনগণই এ ব্যবস্থার প্রভু। আর জীবন থেকে ধর্মকে আলাদা করাই হচ্ছে গনতন্ত্রের মূল বিশ্বাস এবং এ বিশ্বাসই গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। এ বিশ্বাস থেকেই গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। ইসলাম এ বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামি আকিদার ভিত্তি হচ্ছে, জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে এবং আল্লাহ তাআলা যে ব্যবস্থা দিয়েছেন সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। পক্ষান্তরে গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি ব্যবস্থা, যার সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কোনো সম্পর্ক নেই। নিজেদের প্রবৃত্তি ও খায়েশ পূরণই এ তন্ত্রের মূলভিত্তি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিধি-বিধান নাজিল করেছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে আল্লাহর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করা হয়। তাই এটি মূলত আল্লাহর বিধানকে অস্বীকারকারীদের ব্যবস্থা বা এককথায় কুফরি ব্যবস্থা। সুতরাং শরিয়ার বিপরীতে তাদের রচিত ও আবিষ্কৃত কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে না; বরং সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা এ সকল কিছুকে বর্জন করার কঠোর নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন :
يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ
'তারা বিচার-ফয়সালার জন্য তাগুতের কাছে যেতে চায়; অথচ তাগুতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে।' (সুরা আন-নিসা : ৬০)
যে আকিদা থেকে এ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত এবং যে চিন্তা-ধারণার সে জন্ম দেয় তা সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের আকিদা বা বিশ্বাসের বিপরীত। গনতন্ত্রের আকিদা থেকে নিম্নোক্ত দু'টি ধারণার উদ্ভব হয়। এক. সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য। দুই. জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।
উপরিউক্ত দু'টি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপের দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ তাদের ব্যবস্থা প্রণয়ন করে থাকে। এর দ্বারা পাদরিদের কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে জনগণের হাতে তা সমর্পণ করা হয়। পাদরি ও পোপদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফসল হিসেবে ধর্মীয় আইন-কানুনের অবসান করা হয়। ফলে সার্বভৌমত্ব হলো জনগণের জন্য এবং জনগণই হলো সকল ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থায় এ দু'টি ধারণাই বাস্তবায়ন করা হলো। ফলে জনগণই হয়ে গেল সার্বভৌমত্বের প্রতীক ও সকল ক্ষমতার উৎস।
পক্ষান্তরে ইসলামে সার্বভৌমিক ক্ষমতা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। গনতন্ত্রের সাথে ইসলামের কিছু শাখাগত বিষয় বাহ্যিকভাবে এক মনে হলেও বাস্তবে এই দু'টি দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটি মেনে নিলে অপরটি আপনাপনিই বাতিল হয়ে যেতে বাধ্য। কোনো অবস্থাতেই উভয়টির সংমিশ্রণ হতে পারে না। হয় ইসলাম থাকবে, নচেৎ গণতন্ত্র।
আল্লাহ তাআলা সকল মাখলুকের স্রষ্টা। তাই তাদের জন্য কল্যাণ ও উপযোগী বিধিবিধান তিনিই ভালো জানেন। মানবসত্ত্বা সাধারণত জ্ঞানগরিমা, স্বভাব-চরিত্র ও অভ্যাসের দিক দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির হয়ে থাকে। তারা অন্যদের কল্যাণকর বিষয়াদি সম্পর্কে জানা তো দূরে থাক; স্বয়ং নিজেদের কল্যাণকর বিষয় সম্বন্ধেই অজ্ঞ। এজন্য যে সমাজ ও দেশে জনগণই সংবিধান ও আইন-কানুন প্রণয়ন করে সে দেশে দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় একের পর এক পরিদৃষ্ট হতেই থাকে।
সাথে এটাও লক্ষণীয় যে, অনেক দেশে এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবতাহীন এক বাহ্যিক অবয়ব ও শুধুই শ্লোগানে পরিণত হয়েছে, যার দ্বারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়। বাস্তবিক অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করে কেবল ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের সাংসদরা। জনগণ এদের আদেশের সামনে নত ও পরাজিত থাকে। এ ব্যাপারে এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে যে, গণতন্ত্রের কোনো আইন যখন রাষ্ট্রের কর্ণধারদের অভিলাষের বিপরীত হয় তখন তাকে তারা পদদলিত করে পিষ্ট করে। নির্বাচনী জালিয়াতি, মানুষের স্বাধীনতাহরণ, সত্য ও ন্যায় প্রকাশকারীদের মুখবন্ধকরণের ঘটনাগুলো এমন কিছু তিক্ত বাস্তবতা, যা বর্তমান সময়ের ছোট-বড় কমবেশি সবাই জানে।
📄 গণতন্ত্র কুফরি হওয়ার প্রমাণসমূহ
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইবাদত ও আনুগত্য কিংবা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিরকের নতুন একটি প্রকার। যেহেতু এতে মহান সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব ও নিঃশর্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অধিকারকে বাতিল করে তা মানুষের অধিকার বলে সাব্যস্ত করা হয়।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্বরূপ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মানবজাতির জন্য আল্লাহ-প্রণীত বিধানের পরিবর্তে মানবরচিত সংবিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনাকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবব্যবস্থা বলে। আর এটা যে সুস্পষ্ট কুফর, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। শরিয়তের সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলিলের আলোকে এর কুফরি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। নিম্নে আমরা এর কিছু দলিল উল্লেখ করছি।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذُلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
'আইন প্রনয়ণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর তাআলার-ই। তিনি আদেশ দিয়েছেন, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না। এটাই সরল পথ, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।' (সুরা ইউসুফ : ৪০)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَالْحُكْمُ لِلَّهِ الْعَلِيِّ الْكَبِيرِ
'অতএব বিধান দেওয়ার ক্ষমতা কেবল আল্লাহরই, যিনি সর্বোচ্চ ও মহান।' (সুরা আল-মুমিনুন : ১২)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ
'আল্লাহ তাআলা কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিচারক নন?' (সুরা আত-তিন : ৮)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
'আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেওয়ার ক্ষমতা নেই।' (সুরা আল-আনআম : ৫৭)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَداً
'আর তিনি কাউকে নিজ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে অংশীদার বানান না।' (সুরা আল-কাহফ : ২৬)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْماً لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
'তারা কি মূর্খতা-যুগের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসী জাতির জন্য উত্তম ফয়সালাকারী আর কে হতে পারে?' (সুরা আল-মায়িদা : ৫০)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
‘আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ করা বিধান অনুযায়ী বিচার করে না সেসব লোকেরাই কাফির।' (সুরা আল-মায়িদা : ৪৪)
আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'কিন্তু না! তোমার রবের কসম, তারা ইমানদার হবে না; যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, অতঃপর তোমার কৃত ফয়সালার ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা-সংকোচ অনুভব না করে এবং পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে।' (সুরা আন-নিসা : ৬৫)
ইমাম জাসসাস রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন :
وَفِي هَذِهِ الْآيَةِ دَلَالَةٌ عَلَى أَنَّ مَنْ رَدَّ شَيْئًا مِنْ أَوَامِرِ اللَّهِ تَعَالَى أَوْ أَوَامِرِ رَسُولِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَهُوَ خَارِجٌ مِنْ الْإِسْلَامِ سَوَاءٌ رَدَّهُ مِنْ جِهَةِ الشَّكٍّ فِيهِ أَوْ مِنْ جِهَةِ تَرْكِ الْقَبُولِ وَالامْتِنَاعِ مِنْ التَّسْلِيمِ, وَذَلِكَ يُوجِبُ صِحَّةَ مَا ذَهَبَ إِلَيْهِ الصَّحَابَةُ فِي حُكْمِهِمْ بِارْتِدَادِ مَنْ امْتَنَعَ مِنْ أَدَاءِ الزَّكَاةِ وَقَتْلِهِمْ وَسَبِّي ذَرَارِيهِمْ: لِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى حَكَمَ بِأَنَّ مَنْ لَمْ يُسَلِّمْ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَاءَهُ وَحُكْمَهُ فَلَيْسَ مِنْ أَهْلِ الْإِيمَانِ.
'এ আয়াতই প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি আল্লাহ বা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ-নিষেধসমূহ থেকে কোনো একটি বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। চাই সে সন্দেহবশত প্রত্যাখ্যান করুক কিংবা গ্রহণ না করে আত্মসমর্পণ করা থেকে বিরত থাকুক। আয়াতটি সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদেরকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে হত্যা করা এবং তাদের পরিবার পরিজনদেরকে বন্দী করার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে সাব্যস্ত করে। কেননা, আল্লাহ তাআলা ফয়সালা দিয়েছেন, যে ব্যক্তি রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচার ও বিধানকে মেনে নেবে না সে ইমানদার নয়।' (আহকামুল কুরআন, জাসসাস : ২/২৬৮, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
আবু বকর রা.-এর যুগে কিছু লোক আল্লাহ তাআলার বিধান জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ না করায় সাহাবায়ে কিরাম তাদেরকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সন্দেহ নেই যে, এটা ছিল কুফর উৎখাতের ঐতিহাসিক এক লড়াই, যা কিয়ামত পর্যন্ত আগত সবার জন্য সুস্পষ্ট দলিল যে, শরিয়তের অকাট্য কোনো বিধান মেনে নিতে গড়িমসি করলে কিংবা অস্বীকার করলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। অতএব যে শাসনব্যবব্যবস্থা পুরো রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে দিয়ে এ শ্লোগান প্রচার করছে, 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার' এবং আল্লাহপ্রদত্ত হালালগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবৈধ আর হারামগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ করছে, তা কি সুস্পষ্ট কুফর নয়? এটাও যদি কুফর না হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীতে কুফর আর কোনটাকে বলা হবে?
অনেকেরই ধারণা, 'গণতন্ত্র' শব্দটি ইসলামের 'শুরা' এর সমার্থক। কিন্তু অনেকগুলো কারণে এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। কতিপয় কারণ নিম্নরূপ :
১. শুরা বা পরামর্শ হয় শুধুমাত্র নিত্যনতুন সমসাময়িক বিষয়াদি এবং কুরআন-সুন্নাহয় যে বিষয়গুলোর বিশদ বিবরণ নেই, সেগুলো নিয়ে। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবব্যবস্থা দ্বীনের অকাট্য প্রমাণিত বিধিবিধানেরও বিরোধিতা করে। অতএব সে নিষিদ্ধ বিষয়ের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয় কিংবা আল্লাহ তাআলা যেটা অনুমোদন বা আবশ্যক করেছেন, তা নিষিদ্ধ করে দেয়। মদ বিক্রির লাইসেন্স এ সংবিধানের দ্বারাই দেওয়া হয়েছে। পতিতাবৃত্তি ও সুদি লেনদেনেরও একই অবস্থা। এ সংবিধানের দ্বারাই বিভিন্ন ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও আল্লাহর রাস্তার পথিকদের ওপর সঙ্কীর্ণতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের ওপর করা হচ্ছে কঠিন জুলুম। অতএব শরিয়তের সাথে এর সাংঘর্ষিকতা যখন সুস্পষ্ট, তাহলে এটা শুরা হয় কী করে?
২. শুরা মজলিস গঠিত হয় দ্বীনের পাণ্ডিত্য, ইলম, বিবেক, মেধা, চরিত্র ইত্যাদি বিবেচনায় উত্তীর্ণ একদল যোগ্য লোকের সমন্বয়ে। অতএব এখানে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও নির্বোধ শ্রেণির সাথে পরামর্শ করার কোনো সুযোগ নেই; কাফির বা নাস্তিকদের ব্যাপার তো দূরে থাক! কিন্তু গণতান্ত্রিক পার্লামেন্ট বোর্ডে এগুলোর কোনোই গুরুত্ব নেই। এজন্য এখানে একজন কাফির, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও নির্বোধও প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, মৌলিকভাবে ইসলামি শুরাব্যবস্থার সাথে এর কত ব্যবধান!
৩. শুরা মজলিস রাষ্ট্রপ্রধানকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে না। প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে এবং অন্য সদস্যদের তুলনায় কারও মতকে অধিক সঠিক মনে করায় তিনি কখনো একজনের মতকেও প্রাধান্য দিতে পারেন। এর বিপরীত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠদের ঐক্যমত-সমর্থিত সিদ্ধান্ত জাতির জন্য অবশ্যপালনীয় আইনে পরিণত হয়ে যায়, যা কেউই প্রত্যাখ্যান করতে পারে না; এমনকি সরকারপ্রধানও নয়।
এ ধরনের আরও বিভিন্ন পার্থক্য রয়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে, শুরাব্যবস্থা ও গণতন্ত্র কখনো এক জিনিস নয়। উভয়ের মাঝে বাহ্যত কিছু মিল দেখা গেলেও मौलिकভাবে উভয়ের মাঝে রয়েছে বৈপরীত্য ও সুস্পষ্ট ব্যবধান। মোটকথা, গণতন্ত্র হলো স্পষ্ট শিরকি ও কুফরি একটি ব্যবস্থা, আর বিপরীতে শুরা হলো শরিয়া-সমর্থিত ও ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। তাই উভয়টির মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করা এবং দুটিকে এক বলে সাব্যস্ত করা মূর্খতা ও গোয়ার্তুমি বৈ কিছু নয়।
আমাদের অসংখ্য আলিম ও বিজ্ঞ ফকিহ গণতন্ত্রকে ইসলাম পরিপন্থী ও কুফরি তন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। এদেরকে আমরা অনেকেই আকাবির মানি, কিন্তু দলীয় স্বার্থের এ জায়গায় এসে নিজের নেতার মতকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এসব আকাবিরকে আমরা ঠিকই ছুড়ে ফেলতে পারি! আমরা অসুবিধা দেখলে সত্যটাকেও লুকিয়ে রাখতে চাই, আর স্বার্থের বেলায় শত জোড়াতালি দিয়ে হলেও নিজেদের মত প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা করি! এই হলো আমাদের স্বভাব, যা আমাদের হক পথের দিশা পেতে অন্যতম এক অন্তরায়। যাই হোক, কেউ মানুক চাই না মানুক, আমরা এখানে গণতন্ত্রের অসারতা ও এর কুফরি নিয়ে কতিপয় বিজ্ঞ আলিমের উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। নিশ্চয়ই এতে হকপ্রত্যাশীদের জন্য রয়েছে উত্তম খোরাক।
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহ. বলেন :
غرض اسلام میں جمہوری سلطنت کوئی چیز نہیں ... یہ مخترعہ متعارفہ جمہوریت محض گھڑا ہوا ڈھکوسلہ ہے، بالخصوص ایسی جمہوری سلطنت جو مسلم و کافر ارکان سے مرکب ہو وہ تو غیر مسلم سلطنت ہی ہوگی.
'মোটকথা, ইসলামে গণতান্ত্রিক শাসন নামে কিছু নেই। ...এই নবআবিষ্কৃত প্রচলিত গণতন্ত্র শুধুই মনগড়া প্রতারণা। বিশেষত এমন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবব্যবস্থা, যা মুসলিম ও কাফের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, সেটাকে তো অমুসলিম শাসনব্যবস্থাই বলতে হবে।' (মালফুজাতে থানবি : ২৫২)
২. মাওলানা ইদরিস কান্ধলবি রহ. বলেন :
وہ لوگ یہ کہتے ہیں کہ یہ مزدور اور عوام کی حکومت ہے ،ایسی حکومت بلاشبہ حکومت کافرہ ہے۔
'ওই সব লোক একথা বলে যে, এটি জনসাধারণ ও শ্রমিক মজদুরদের রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে কুফুরি রাষ্ট্র।' (আকায়িদুল ইসলাম: ২৩০, প্রকাশনী : ইদারায়ে ইসলামিয়্যাত, করাচি)
৩. আল্লামা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ. বলেন:
ہمیں تو اسلام میں کہیں بھی مغربی جمہوریت نظر نہیں آئیاور اسلامی جمہوریت تو کوئی چیز ہی نہیں ، معلوم نہیں اقبال مرحوم کو اسلام کی روح میں یہ جمہوریت کہاں سے نظر آگئی ؟ جمہوریت ایک خاص تہذیب و تاریخ کا ثمرہ ہے، اسے اسلامی تاریخ میں ڈھونডنا معذرت خواہی ہے.
'পশ্চিমা গণতন্ত্রের নমুনা ইসলামের কোথাও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না আর ইসলামি গণতন্ত্র বলতে কোনো জিনিসই নেই। জানি না, মরহুম ইকবাল ইসলামি আদর্শের মধ্যে এই গণতন্ত্র কোথায় পেলেন? গণতন্ত্র একটি বিশেষ ইতিহাস ও সভ্যতার ফল। ইসলামি ইতিহাসে তার অনুসন্ধান করাই অনর্থক।' (মাসিক সানাবিল, করাচি : ৮/২৭-২৮, সংখ্যা : ১১-ই মে, ২০১৩ ইং)
৪. হাকিমুল ইসলাম কারি তাইয়িব রহ. বলেন :
(جمہوریت) رب تعالی کی صفت ملکیت میں بھی شرک ہے اور صفت علم میں تبھی شرک ہے۔
'এ গণতন্ত্র আল্লাহ তাআলার রাজত্বের গুণের মধ্যেও শিরক এবং তাঁর ইলম গুণের মধ্যেও শিরক।' (আদইয়ান কি জঙ্গ : পৃ. নং ৫৪, প্রকাশনী : ইদারায়ে হিত্তিন, পাকিস্তান)
৫. মুফতী রশিদ আহমদ লুধইয়ানবি রহ. বলেন :
یہ تمام برگ و بار مغربی جمہوریت کے شجرہ خبیثہ کی پیداوار ہے۔ اسلام میں اس کافرانہ نظام کی کوئی گنجائش نہیں، نہ ہی اس طریقے سے قیامت تک اسلامی نظام آسکتا ہیں.
'বিশ্বময় অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খলাময় এ পরিবেশ পশ্চিমা গণতন্ত্রের নিকৃষ্ট বৃক্ষের ফসল। ইসলামে এ ধরনের কুফুরি ব্যবস্থাপনার কোনোই অবকাশ নেই। আর না এ পদ্ধতিতে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।' (আহসানুল ফাতাওয়া : ৬/২৬, প্রকাশনী : এইচ. এম. সাইদ. কোম্পানি, করাচি)
৬. মাওলানা ইউসুফ লুধইয়ানবি রহ. বলেন :
بعض غلط نظریات قبولیت عامہ کی ایسی سند حاصل کر لیتے ہیں کہ بڑے بڑے عقلاء اور عالم کہلانے والے بھی اس قبولیت عامہ کے آگے سر ڈال دیتے ہیں ، وہ یا تو ان غلطیوں کا ادراک ہی نہیں کر پاتے یا اگر ان کو غلطی کا احساس ہو بھی جائے تو اس کے خلاف لب کشائی کی جرات نہیں کر سکتے۔ دنیا میں جو بڑی بڑی غلطیاں رائج ہیں، ان کے بارے میں اہل عقل اسی لئے المیے کا شکار ہیں ! اسی غلط قبولیت عامہ کا سکہ آج جمہوریت میں چل رہا ہے ۔ جمہوریت دورِ جدید کا وہ “ صنم اکبر ” ہے جس کی پرستش اول اول دانایانِ مغرب نے شروع کی۔ چونکہ وہ آسمانی ہدایت سے محروم تھے، اس لئے ان کی عقل نارسا نے دیگر نظام ہائے حکومت کے مقابلے میں جمہوریت کا بت تراش لیا اور پھر اس کو مثالی طرزِ حکومت قرار دے کر اس کا صور بلند آہنگی سے پھونکا کہ پوری دنیا میں اس کا غلغلہ بلند ہوا، یہاں تک کہ مسلمانوں نے بھی تقلید مغرب میں جمہوریت کی مالا جپنی شروع کر دی۔ کبھی یہ نعرہ بلند کیا گیا کہ “اسلام جمہوریت کا علم بردار ہے اور کبھی اسلامی جمہوریت ” جیسی خبیث اصطلاح) وضع کی گئی۔ حالانکہ مغرب جمہوریت ” کے جس بت کا پجاری ہے ،اس کا نہ صرف یہ کہ اسلام سے کوئی تعلق نہیں بلکہ وہ اسلام کے سیاسی نظریہ کی ضد ہے۔اس لئے اسلام کے ساتھ جمہوریت یا اس کی اصطلاحات ( کا پیوند لگانا اور جمہوریت کو مشرف بہ اسلام کرنا صریحاً غلط ہے۔
'কিছু কিছু ভুল দর্শন অনেক সময় এমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায় যে, বড় বড় বুদ্ধিজীবী (ও আলিম নামধারীরাও) তা অবনত মস্তকে মেনে নেয়। তারা হয়তো এ ভুল অনুধাবনই করতে পারে না কিংবা অনুধাবন করলেও তার বিরূদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। পৃথিবীতে যত বড় বড় ভুল প্রচলিত আছে সেগুলোর জন্যই জ্ঞানীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এ ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার ভুলের ধারা আজ গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে চলছে। গণতন্ত্র অধুনা সময়ের ওই বড় মূর্তি, প্রথম প্রথম যার পুজা পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিজীবীরা শুরু করেছিল। যেহেতু তারা আসমানি হিদায়াতের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, তাই তাদের অপরিপক্ক বিবেক অন্যান্য শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে গণতন্ত্রের মূর্তি বেছে নিল। এরপর এটাকে আদর্শ শাসনব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে পুরো বিশ্বে এর আওয়াজ উঁচু করল। এতে সারাবিশ্বে সাড়া পড়ে গেল; এমনকি মুসলামনরাও পশ্চিমাদের তালে তালে তাদের গুণগান গাওয়া শুরু করল। কখনো এ আওয়াজ তুলল যে, ইসলাম হলো গণতন্ত্রের পতাকা বাহক। আবার কখনো ইসলামি গণতন্ত্র জাতীয় জঘন্য পরিভাষা তৈরি করল। অথচ পশ্চিমাবিশ্ব যে গণতন্ত্রের পুজা করে, ইসলামের সাথে তা কেবল সম্পর্কহীনই নয়; বরং তা ইসলামি রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। এজন্য ইসলামের সাথে গণতন্ত্র বা তার পরিভাষাগুলো মিলানো এবং গণতন্ত্রকে ইসলামের সাথে মিশ্রিত করা স্পষ্ট ভুল।' (আপকে মাসায়িল আওর উনকা হল : ৭/৬৫৭, সিয়াসাত অধ্যায়, প্রকাশনী : মাকতাবা লুধিয়ানবি, করাচি)
৭. মুফতি মাহমুদ রহ. বলেন :
ہم جمہوریت پر لعنت بھیجتے ہیں۔ اس میں تو دو مردوں کی آپس میں شادی کی اجازت ہے۔ جیسا کہ برطانیہ نے اس کا بل کثرتِ رائے سے پاس کیا ہے۔
'আমরা গণতন্ত্রের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করি। এ তন্ত্রে তো পুরুষদের পরম্পরে সমকামী বিবাহের বৈধতা রয়েছে। যেমন ব্রিটেনে অধিকাংশের ভোটে এর পক্ষে বিল পাশ হয়েছে।' (ইসলামি খিলাফত : পৃ. নং ১৭৭)
৮. মাওলানা আশিকে ইলাহি বুলন্দশহরি রহ. বলেন :
ان کی لائی ہوئی جمہوریت بالکل جاہلانہ جمہوریت ہے جس کا اسلام سے کوئی تعلق نہیں۔
'এদের আনিত গণতন্ত্র সম্পূর্ণ জাহিলি একটি ব্যবস্থাপনা, ইসলামের সাথে যার কোনোই সম্পর্ক নেই।' (তাফসিরে আনওয়ারুল বয়ান : ১/৫১৮)
৯. মুফতি নিজামুদ্দিন শামজায়ি শহিদ রহ. বলেন :
جیسا کہ پیشاب کے ذریعے کبھی وضو نہیں ہو سکتا اور جیسا کہ نجاست کے ذریعے سے کبھی طہارت اور پاکی حاصل نہیں کی جاسکتی۔ اسی طرح سے لادینی اور مغربی جمہوریت کے ذریعے سے کبھی اسلام غالب نہیں آسکتا۔۔۔۔ دنیا میں جب بھی اسلام غالب ہوگا تو اس کا واحد راستہ وہی ہے۔۔۔ جو راستہ اللہ کے نبی حضرت محمد صلی اللہ علیہ وسلم نے اختیار کیا تھا۔۔۔۔ اور وہ جہاد کا رستہ ہے کہ جس کے ذریعے سے اس دنیا میں اللہ تبارک و تعالیٰ کا دین غالب ہوگا۔
'যেমন পেশাবের দ্বারা কখনো অজু হয় না এবং নাপাকের দ্বারা কখনো পবিত্রতা অর্জন হয় না, তেমন ধর্মহীনতা ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মাধ্যমে কখনো ইসলামের বিজয় আসতে পারে না। পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় অর্জনের একটিই উপায়, যে উপায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করেছেন। আর সেটা হলো জিহাদের রাস্তা, যার মাধ্যমে এ পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে।' (মাসিক সানাবিল, করাচি : ৮/৩৩, সংখ্যা: ১১-ই মে, ২০১৩ ইং)
১০. মুফতি তাকি উসমানি হাফি. বলেন :
مغربی جمہوریت جسکی بنیاد «عوام کی حکمرانی کے تصور پر ہے ، اسلام کے قطعی خلاف ہے ، کیونکہ اسلام کی بنیاد اللہ کی حاکمیت اعلی» کے عقیدے پر ہے جسے قرآن کریم نے ان الحکم الا اللہ کے مختصر جملے میں ارشاد فرمایا ہے ، لہذا مغربی جمہوریت کو اپنے تمام تصورات کے ساتھ بر حق سمجھنا عصر حاضر کی بدترین گمراہیوں میں سے ہے.
'পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তি জনগণের শাসনক্ষমতার চেতনার ওপর, তা সুনিশ্চিতভাবে ইসলাম পরিপন্থী। কেননা, ইসলামের ভিত্তি হলো “আল্লাহ সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক” এ বিশ্বাসের ওপর। কুরআন মাজিদে যা সংক্ষেপে إن الحكم إلا لله তথা “শাসনক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর-ই জন্য” বলে ইরশাদ হয়েছে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হক মনে করা বর্তমান যুগের জঘন্যতম ভ্রান্তিগুলোর অন্যতম।' (ফাতাওয়ায়ে উসমানি : ৩/৫০৭, প্রকাশনী : মাকতাবা মাআরিফুল কুরআন, করাচি)
এছাড়াও আর অসংখ্য আলিমের ফতোয়া আছে, যা পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত করে যে, গণতন্ত্র হলো সুস্পষ্ট ইসলামবিরোধী ও কুফরি একটি মতবাদ। অতএব এ ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত শাসন্যব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে কুফরি শাসনব্যবব্যবস্থা বলেই বিবেচিত হবে। আর ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করে এসেছি যে, কোনো রাষ্ট্রে যদি কুফরি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে অধিকাংশ ফকিহদের মতানুসারে সেটা 'দারুল হারব' হবে; যদিও তার অধিকাংশ নাগরিক মুসলিম হোক। সুতরাং এর ভিত্তিতে বর্তমানের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর বিধান বুঝাটাও আমাদের জন্য সহজ হয়ে গেল।
আল্লামা আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ রহ. 'দারুল হারব'-এর একটি প্রকার আলোচনা করতে গিয়ে বলেন :
دار الــــردة: وهى فرع من دار الكفر الطاريء، وهى التي كانت دار إسلام في وقت ما ثم تغلّب عليها المرتدون وأجروا فيها أحكام الكفار، مثل الدول المسماة اليوم بالإسلامية
“দারুর রিদ্দা”। এটা বস্তুত "তারি দারুল কুফর"-এরই একটি প্রকার ও শাখা। এটা ওই দেশ, যা কোনো এক সময় “দারুল ইসলাম” ছিল। অতঃপর মুরতাদরা (যারা বংশসূত্রে মুসলিম হলেও পরে নানা কুফরি কর্মকাণ্ড করায় প্রকৃত অর্থে কাফির) তা জবরদখল করে সেখানে কাফিরদের আইনকানুন চালু করেছে। যেমন : বর্তমানের নামসর্বস্ব ইসলামি রাষ্ট্রগুলো।' (আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলম : ২/৬৪৫, প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ)
এ থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে আমরা যেসব গণতান্ত্রিক দেশকে মুসলিম দেশ বলে থাকি, সেগুলো শরয়ি দৃষ্টিতে 'দারুর হারব'-এর অন্তর্ভুক্ত। এসব দেশকে শরয়ি পরিভাষায় 'দারুর রিদ্দা' বলা হবে, যা মূলত 'দারুর হারব'-এরই একটি প্রকার। মুসলিম দেশ বলা হয় তার নাগরিকদের দিকে লক্ষ করে। কেননা, এসব দেশের অধিকাংশ নাগরিক মুসলিম। তাই এ ধরনের দেশকে মুসলিম দেশ বলা যাবে, কিন্তু ইসলামি দেশ বলা যাবে না।
উল্লেখ্য যে, গণতন্ত্র কুফরি মতবাদ হলেও সাধারণ নাগরিক যারা এ ব্যাপারে ইসলামের বিধান না জানায় অজ্ঞাতসারে গণতান্ত্রিক সিস্টেমে ভোট দেয়, এ ব্যবস্থাকে সাপোর্ট করে, জীবনকে এ পথেই পরিচালিত করে, অন্যদিকে আবার সে ইসলামের বাহ্যিক কিছু ইবাদতও পালন করে, তাদের নির্দিষ্ট কাউকে শুধু গণতন্ত্র চর্চার কারণে কাফির বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা, কুফর ও তাকফির (কাফির বলা) এক জিনিস নয়। কারও মধ্যে নিশ্চিত কুফর থাকা সত্ত্বেও মাওয়ানিউত তাকফির (কাফির বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক কারণসমূহ) হতে কোনো একটি থাকলে তাকে আর কাফির অভিধায় অভিহিত করা যায় না। এ ব্যাপারে 'তাকফিরের মূলনীতি' নামে আমাদের একটি বই আছে, যাতে এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা রয়েছে। তবে যারা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, রক্ষাকর্তা ও ধারকবাহক, তাদের বিধান ভিন্ন। এ ব্যাপারে আমাদের অন্যান্য আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য এটা যে, আমরা যেন কুফর ও তাকফিরকে এক না ভেবে বসি। উভয়ের মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। মোটকথা, গণতান্ত্রিক দেশগুলো যে কুফরি ব্যবস্থায় পরিচালিত, যার ভিত্তিতে দেশগুলো 'দারুল হারব'-এর অন্তর্গত, তা বুঝানোই আমাদের উদ্দেশ্য। এর অতিরিক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে কারা কাফির, আর কারা কাফির নয়, তা আমাদের এ আলোচনার অন্তর্গত নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বিষয় সঠিকভাবে বুঝার তাওফিক দান করুন এবং সদাসর্বদা হক ও ন্যায়ের ওপর অটল রাখুন।