📄 ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হারব’-এর শরয়ি ভিত্তি
বর্তমানে কিছু লোক দেখা যায়, যারা 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' পরিভাষা দুটিকে একেবারেই গুরুত্বহীন ও হালকা মনে করে থাকে। তাদের ধারণা, এসব যেহেতু ইজতিহাদি বিষয়, তাই 'দার'-কে দু'ভাগে সীমাবদ্ধ রাখা আবশ্যকীয় কিছু নয়; বরং এতে প্রকার আরও কমবেশ বা পরিবর্তন হতে পারে। অথচ এ পরিভাষা ও তার প্রকারভেদ সুদীর্ঘ বারো শতাব্দীকাল ধরে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে নিরবচ্ছিন্নধারায় চলে আসছে। আর তাই এটাকে একপ্রকার ইজমা দাবি করলেও অত্যুক্তি হবে না বোধহয়।
বস্তুত 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর শরয়ি উৎসমূল জানা থাকলে এসব পরিভাষা পরিবর্তন করে নতুন ইজতিহাদের দাবি করার দুঃসাহস কেউ দেখাত না। কেননা, হাদিস ও আসারের একাধিক বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, 'দার' সাধারণত দু'প্রকারেরই হয়ে থাকে। বিভিন্ন বর্ণনায় স্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতে এ প্রকারভেদের দলিল পাওয়া যায়। আমরা সেসব বর্ণনা থেকে এখানে কতিপয় বর্ণনা তুলে ধরছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাভিযানকালে একজন সেনাপতিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন :
وَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ، فَادْعُهُمْ إِلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ - أَوْ خِلَالٍ - فَأَيَّتُهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، فَإِنْ أَجَابُوكَ، فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى التَّحَوُّلِ مِنْ دَارِهِمْ إِلَى دَارِ الْمُهَاجِرِينَ
'আর যখন তোমার শত্রু মুশরিকদের সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে আহবান করবে। তারা এগুলো থেকে যেটাই গ্রহন করুক, তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকবে। (প্রথমে) তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। যদি তারা তোমার এ আহবানে সাড়া দেয়, তবে তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে। এরপর তুমি তাদেরকে তাদের 'দার' (এলাকা বা দেশ) থেকে মুহাজিরদের 'দার'-এর দিকে চলে যাওয়ার আহবান জানাবে।' (সহিহু মুসলিম : ৩/১৩৫৭, হা. নং ১৭৩১, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
এ হাদিসে 'মুশরিকদের দার' আর 'মুহাজিরদের দার' বলে স্পষ্টত 'দার' দুটি হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মুশরিকদের 'দার'-কে বলা হয় 'দারুশ শিরক' বা 'দারুল হারব'। আর মুহাজিরদের 'দার'-কে বলা হয় 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল ইসলাম'।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
لَا يَقْبَلُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ مُشْرِكٍ بَعْدَمَا أَسْلَمَ عَمَلًا، أَوْ يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ
'কোনো মুশরিক ইসলাম গ্রহণের পরও আল্লাহ তার কোনো আমল কবুল করেন না, যতক্ষণ না সে মুশরিকদের (এলাকা) ত্যাগ করে মুসলিমদের কাছে (এলাকাতে) চলে আসে।' (সুনানুন নাসায়ি : ৫/৮২, হা. নং ২৫৬৮, প্রকাশনী : মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়া, হালব)
এ হাদিসে 'মুশরিকদের (এলাকা) ত্যাগ করে মুসলিমদের কাছে (এলাকাতে) চলে আসে' উক্তিটির মাঝে 'দার' দুটি হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি হলো মুশরিকদের ভূমি, যাকে 'দারুল হারব' বলা হয়, আর অপরটি হলো মুসলিমদের ভূমি, যাকে দারুল ইসলাম' বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
عَقْرُ دَارِ الْإِسْلَامِ بِالشَّامِ
'দারুল ইসলামের মূলভূমি হলো শামে।' (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : ৭/৫৩, হা. নং ৬৩৫৯, প্রকাশনী : মাকতাবাতু ইবনি তাইমিয়া, কায়রো)
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন :
وَكَانَ مِنَ الْأَنْصَارِ مُهَاجِرُونَ لِأَنَّ الْمَدِينَةَ كَانَتْ دَارَ شِرْكِ، فَجَاءُوا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةَ الْعَقَبَةِ
'আর আনসারিদের মাঝেও কতিপয় মুহাজির ছিলেন। কেননা, (হিজরতের পূর্বে) মদিনা ছিল “দারুশ শিরক”। অতঃপর তথা হতে কতিপয় সাহাবি আকাবার রাতে (হিজরত করে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে চলে আসেন।' (সুনানুন নাসায়ি: ৭/১৪৪, হা. নং ৪১৬৬, প্রকাশনী: মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়া, হালব)
খালিদ বিন অলিদ রা. খলিফাতুল মুসলিমিনের পক্ষ থেকে হিরায় পাঠানো চিঠিতে লিখেন :
وَجَعَلْتُ لَهُمْ أَيُّمَا شَيْءٍ ضَعُفَ عَنِ الْعَمَلِ أَوْ أَصَابَتْهُ آفَةٌ مِنَ الْآفَاتِ أَوْ كَانَ غَنِيا فَافْتَقَرَ وَصَارَ أَهْلُ دِينِهِ يَتَصَدَّقُونَ عَلَيْهِ طَرَحْتُ جِزْيَتَهُ وَعِيلَ مِنْ بَيْتِ مَالِ الْمُسْلِمِينَ. وَعِيَالُهُ مَا أَقَامَ بِدَارِ الْهِجْرَةِ وَدَارِ الإِسْلامِ فَإِنْ خَرَجُوا إِلَى غَيْرِ دَارِ الْهِجْرَةِ وَدَارِ الإِسْلامِ؛ فَلَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ النَّفَقَةَ عَلَى عِيَالِهِمْ.
'আর আমি তাদের (জিম্মিদের) জন্য এটা নির্ধারণ করেছি যে, কোনো বৃদ্ধ যদি কাজকর্ম করতে অক্ষম হয়ে যায় অথবা কোনো বিপদে আক্রান্ত হয় অথবা সে ধনী ছিল, কিন্তু পরে দরিদ্র হয়ে গেছে এবং তার ধর্মের লোকেরা তাকে দান-সদকা করতে শুরু করে, তাহলে আমি তার জিজিয়া স্থগিত করে দেবো এবং বাইতুল মাল থেকে তার ও তার পরিবারের ভরণপোষণ দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত সে “দারুল হিজরাহ” ও “দারুল ইসলাম”-এ অবস্থান করবে। যদি তারা “দারুল হিজরাহ” ও “দারুল ইসলাম” থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে মুসলমানদের ওপর তাদের পরিবারের ভরণপোষণ বহন করার কোনো দায়িত্ব নেই।' (আল-খারাজ, আবু ইউসুফ : পৃ. নং ১৫৭-১৫৮, প্রকাশনী: আল-মাকতাবাতুল আজহারিয়্যা লিতুরাস)
এসব বর্ণনা থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব’ পরিভাষা দুটি পুরোপুরি ইজতিহাদি নয়; বরং এ ব্যাপারে আলাদাভাবে নস পাওয়া যায়। এ নসগুলোতে যেমন 'দারুল ইসলাম' পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনই এটার পাশপাশি 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল মুহাজিরিন' পরিভাষাও ব্যবহৃত হয়েছে। বস্তুত এগুলো সব একই 'দার'-এর নানারকম নাম। অনুরূপ এসব বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, 'দারুল হারব'-কে 'দারুশ শিরক' ও 'দারুল মুশরিকিন'-ও বলা হয়।
মোটকথা হাদিস ও আসারে আমরা দুটি 'দার'-এর অস্তিত্ব পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাই। এক : এমন দার, যেখানে মুসলিমরা হিজরত করে। এটাকে 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল ইসলাম' বলে। দুই: এমন দার, যেখান থেকে অন্য ভূমিতে হিজরত করে চলে আসতে হয়। এটাকে 'দারুল হারব' বা 'দারুশ শিরক' বলে।
এছাড়াও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাঝে এটা সর্বজনস্বীকৃত আকিদা যে, ইসলাম ও কুফরের মাঝে তৃতীয় কোনো স্তর নেই। ব্যক্তি হয়তো মুমিন হবে, নয়তো কাফির হবে। গোমরাহ মু'তাজিলারাই একমাত্র ফিরকা, যারা ইসলাম ও কুফরের মাঝে তৃতীয় একটি স্তর নির্ধারণ করেছিল। তাদের ধারণা, এমন কিছু মানুষও আছে, যারা মুমিনও নয় আবার কাফিরও নয়। কিন্তু এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, মুমিন যতই গুনাহগার হোক না কেন, সে ইমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় না। হ্যাঁ, যার থেকে স্পষ্ট কুফর বা শিরক প্রকাশ পাবে এবং তার মধ্যে তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধকতাও পাওয়া যাবে না, তাহলে সে পরিষ্কার কাফির। দারের বিষয়টিও ঠিক এরূপই। হয়তো দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিংবা কুফর-শিরক প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকে; চাই সেটা পূর্ণাঙ্গ হোক বা অপূর্ণাঙ্গ, সেটাকে 'দারুল ইসলাম' বলা হবে। আর যদি কুফর-শিরক প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেটাকে 'দারুল হারব' বলা হবে। এ মাসআলাটি যার কাছে যতটা স্পষ্ট, তার কাছে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর মাসআলাটিও ততটা স্পষ্ট হবে।
সুতরাং যারা মনে করে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' নতুন দুটি পরিভাষা, কুরআন-হাদিসে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের এসব নস ভালো করে দেখা উচিত। আর যারা মনে করেন, এসব পরিভাষা পরিবর্তনশীল, তাদের কাছে মূলত ইসলাম ও কুফরের বৈপরীত্য এবং ব্যক্তি ও ভূমির ওপর এর প্রায়োগিক দিকটি স্পষ্ট নয়। নতুবা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন মুমিন ও কাফির হওয়ার বাইরে তৃতীয় কোনো অবস্থার কথা কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনই ভূমির ব্যাপারেও ইসলামি ও কুফরি ভিন্ন অন্য কোনো গুণে গুণান্বিত করার কথা ভাবা যায় না। ব্যক্তি যেমন হয়তো মুমিন, নয়তো কাফির; ভূমিও তেমনি হয়তো ইসলামি, নয়তো কুফরি হবে।
📄 ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হারব’-এর পরিচিতি
যেকোনো বিষয়ে ভালোভাবে জানতে বা বুঝতে হলে প্রথমে তার পরিচিতি ভালোভাবে জানতে হয়। তাই এ অধ্যায়ে আমরা 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর পরিচয় বা সংজ্ঞা তুলে ধরব। সংজ্ঞা বর্ণনার ক্ষেত্রে আমরা চার মাজহাবের ফুকাহায়ে কিরামের মত তুলে ধরব, যাতে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর ব্যাপারে সামগ্রিকভাবে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। প্রথমে আমরা এর আভিধানিক অর্থ নিয়ে আলোকপাত করব, এরপর তার পারিভাষিক বা শরয়ি অর্থ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের ভাষ্য তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ।
**আভিধানিক অর্থ :**
এখানে আমরা এর শাব্দিক অর্থ ও সমর্থক কিছু শব্দ উল্লেখ করব, যেন শব্দের ভিন্নতায় বা ভুল শাব্দিক অর্থের কারণে কাউকে বিভ্রান্ত হতে না হয়। 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' পরিভাষা দু'টিতে তিনটি শব্দ আছে। যথা : 'দার', 'ইসলাম' ও 'হারব'। আমরা শব্দ তিনটির আলাদা আলাদা অর্থ বর্ণনা করে পরে সমষ্টিগত অর্থও বর্ননা করব ইনশাআল্লাহ।
এক : 'দার'। 'দার' অর্থ আঙিনা, ঘর ও মহল্লা। বসবাসের স্থানকে 'দার' বলা হয়। সাধারণত 'দার' বলতে শহর বুঝানো হয়ে থাকে। 'দার'-এর বহুবচন হলো 'দিয়ার'। একাধিক শহর মিলে গঠিত দেশকে 'দিয়ার' বলা হয়।
যেমন আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা-তে বলা হয়েছে :
الدَّارُ لُغَةً اسْمُ جَامِعُ لِلْعَرْصَةِ وَالْبِنَاءِ وَالْمَحَلَّةِ. وَفِي كُلِّيَّاتِ أَبِي الْبَقَاءِ: الدَّارُ اسْمُ لِمَا يَشْتَمِل عَلَى بُيُوتٍ وَمَنَازِل وَصَحْنٍ غَيْرِ مَسْقُوفٍ. وَهِيَ مِنْ دَارَ يَدُورُ، وَسُمِّيَتْ بِذَلِكَ لِكَثْرَةِ حَرَكَاتِ النَّاسِ فِيهَا وَاعْتِبَارًا بِدَوَرَانِهَا الَّذِي لَهَا بِالْحَائِطِ، وَجَمْعُهَا أَدْوُرُ، وَدُورُ ، وَالْكَثِيرُ دِيَارُ، وَهِيَ الْمَنَازِلِ الْمَسْكُونَةُ وَالْمَحَال. وَكُل مَوْضِعٍ حَل بِهِ قَوْمٌ فَهُوَ دَارُهُمْ، وَمِنْ هُنَا سُمِّيَتِ الْبَلْدَةُ دَارًا، وَالصَّقْعُ دَارًا. وَقَدْ تُطْلَقُ الدَّارُ عَلَى الْقَبَائِلِ مَجَازًا.
'আরবিতে 'দার'-এর আভিধানিক অর্থ আঙিনা, ঘর ও মহল্লা। 'দার' বলতে সাধারণত কয়েকটি ঘর, বাড়ি ও ছাদবিহীন আঙিনা মিলে গঠিত এরিয়াকে বুঝানো হয়ে থাকে; যেমনটি আবুল বাকা রহ.-এর কুল্লিয়াতে বলা হয়েছে। শব্দটি دَارَ يَدُورُ دَوْرًا ক্রিয়ামূল থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ আবর্তিত হওয়া, চক্কর দেওয়া। ঘরকে 'দার' এজন্যই বলা হয় যে, মানুষ ঘরে বারবার নড়াচড়া (আসা-যাওয়া) করে এবং ঘর দেয়ালের চতুর্দিক থেকে বৃত্তাকারে আবর্তিত হয়ে থাকে। এর বহুবচন হলো : أَدْوُرُ، وَدُوْرٌ وَدِيَارٌ। যে স্থান বা ভূখণ্ডে কোনো জাতি বসবাস করে, সেটাকে তাদের 'দার' বলা হয়। এজন্যই শহর ও ভূখণ্ডকে 'দার' বলা হয়। রূপক অর্থে 'দার' শব্দটি কখনো গোত্রের জন্যও ব্যবহার হয়ে থাকে।' (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : ২০/১৯৮, প্রকাশনী : অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, কুয়েত)
দুই : 'ইসলাম'। 'ইসলাম' অর্থ আনুগত্য করা, আত্মসমর্পণ করা। এটা سلم থেকে নির্গত হয়েছে। সিন, লাম ও মিমযোগে গঠিত শব্দ অধিকাংশ সময় সুস্থতা ও নিরাপত্তার অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইসলাম ধর্ম যেহেতু অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণভাবে আনুগত্য করে চলার নাম, তাই অর্থের মূল ধারণ করায় 'ইসলাম' নামটি আভিধানিকভাবে যথার্থ।
ইমাম ইবনে ফারিস রাজি রহ. বলেন :
(سَلِمَ السِّينُ وَاللَّامُ وَالْمِيمُ مُعْظَمُ بَابِهِ مِنَ الصِّحَّةِ وَالْعَافِيَةِ ; وَيَكُونُ فِيهِ مَا يَشِدُّ، وَالشَّاذُ عَنْهُ قَلِيلٌ ، فَالسَّلَامَةُ: أَنْ يَسْلَمَ الْإِنْسَانُ مِنَ الْعَاهَةِ وَالْأَذَى. قَالَ أَهْلُ الْعِلْمِ : اللهُ جَلَّ ثَنَاؤُهُ هُوَ السَّلَامُ : لِسَلَامَتِهِ مِمَّا يَلْحَقُ الْمَخْلُوقِينَ مِنَ الْعَيْبِ وَالنَّقْصِ وَالْفَنَاءِ. قَالَ اللهُ جَلَّ جَلَالُهُ: {وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ} [يونس : ٢٥] ، فَالسَّلَامُ اللهُ جَلَّ ثَنَاؤُهُ، وَدَارُهُ الْجَنَّةُ. وَمِنَ الْبَابِ أَيْضًا الْإِسْلَامُ، وَهُوَ الاِنْقِيَادُ : لِأَنَّهُ يَسْلَمُ مِنَ الْإِبَاءِ وَالامْتِنَاعِ
'(সালিমা)। সিন, লাম ও মিমযোগে গঠিত অধিকাংশ শব্দে সুস্থতা ও মুক্তির অর্থ রয়েছে। কখনো ব্যতিক্রমও হয়; যদিও এর সংখ্যা নিতান্তই কম। অতএব, سلامة )সালামাহ) অর্থ বিপদ ও কষ্ট থেকে মানুষের নিরাপদ থাকা। উলামায়ে কিরাম বলেন, আল্লাহ তাআলা হলেন سلام )সালাম)। যেহেতু তিনি দোষ, ত্রুটি ও বিনাশ হওয়া থেকে মুক্ত, যা মাখলুকের গুণাগুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আল্লাহ আহবান করেন শান্তি-নিরাপত্তার আবাসের দিকে।” [সুরা ইউনুস : ২৫] আল্লাহ হলেন শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা এবং জান্নাত হলো তার (শান্তির) আবাস। এ শব্দ থেকেই এসেছে, الإسلام )আল-ইসলাম)। এর অর্থ মান্য করা, আনুগত্য প্রদর্শন করা। (সুস্থতা ও নিরাপত্তার অর্থের সাথে ইসলামের অর্থের পুরাই মিল রয়েছে।) কেননা, এটা অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতা থেকে (মুসলিমকে) নিরাপদ করে।' (মাকায়িসুল লুগাহ : ৩/৯০, প্রকাশনী : 'দারুল ফিকর, বৈরুত)
শরয়ি পরিভাষায় 'ইসলাম' বলা হয়, আল্লাহর পক্ষ হতে শেষ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনিত দ্বীন ও জীবনব্যবস্থাকে। অর্থাৎ আল্লাহকে মাবুদ মেনে তাঁর দেওয়া সকল বিধান অবনত মস্তকে গ্রহণ করা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুলের নির্দেশনা ও পদ্ধতি অনুসারে তা বাস্তবায়ন করার নামই হলো ইসলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'ইসলাম'-এর এ পারিভাষিক সংজ্ঞা ও পরিচিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন :
الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
'ইসলামের সারমর্ম হলো, তুমি এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, রমজান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হজ করবে।' (সহিহু মুসলিম : ১/৩৬, হা. নং ৮, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
সুতরাং যেকোনো আনুগত্যের নামই ইসলাম নয়; বরং আনুগত্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর দেওয়া বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে। আবার শুধু বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে আনুগত্য করাই যথেষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তা শেষ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পদ্ধতির অনুকূলে হবে। অতএব, প্রকৃত ইসলাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনিত আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার নাম। এতে যে কমবেশ করবে সে প্রকৃত ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।
তিন : 'হারব'। 'হারব' শব্দের সাধারণ অর্থ যুদ্ধ। তবে এর আরও একাধিক অর্থ আছে। যেমন একটি অর্থ হলো বিদ্বেষ ও দূরত্ব। 'দারুল হারব' কথাটিতে এ দ্বিতীয় অর্থই উদ্দেশ্য, প্রথম অর্থ নয়। কেননা, 'দারুল হারব' হওয়ার জন্য যুদ্ধ-কবলিত দেশ হওয়া জরুরি নয়; বরং তথায় কুফরি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলেই তা 'দারুল হারব' বলে গণ্য হয়। তাই সাধারণভাবে 'দারুল হারব' বলতে যুদ্ধ-কবলিত রাষ্ট্র হওয়ার যে ধারণা প্রচলিত আছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়।
ইমাম আবুল ফজল শামসুদ্দিন বা'লি রহ. বলেন :
قوله: "الحربي" مَنْسُوبٌ إِلَى الْحَرْبِ، وَهُوَ القِتَالُ، وَدَارُ الْحَرْبِ، أَيْ: دَارُ التَّبَاعُدِ وَالْبَغْضَاءِ، فَالْحَرْبِيُّ بِالْاِعْتِبَارِ الثَّانِي.
“হারবি” কথাটি “হারব”-এর দিকে সম্বন্ধিত। “হারব” অর্থ যুদ্ধ, আর “দারুল হারব” অর্থ পরস্পরে দূরত্ব ও বিদ্বেষের দেশ। সুতরাং “হারবি” বলা হয় দ্বিতীয় অর্থের দিকে লক্ষ করে।' (আল-মুতলি' আলা আলফাজিল মুকনি' : পৃ. নং ২৬৯, প্রকাশনী : মাকতাবাতুস সাওয়াদি)
বুঝা গেল, 'দারুল হারব' হওয়ার জন্য তথায় যুদ্ধ চলমান থাকা জরুরি নয়। 'হারব'-এর প্রসিদ্ধ অর্থ 'যুদ্ধ' হলেও এখানে তার প্রসিদ্ধ অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া হয়নি; বরং এখানে 'দূরত' ও 'বিদ্বেষ' অর্থ উদ্দিষ্ট। কাফির-শাসিত রাষ্ট্রের সাথে যেহেতু মুসলমানদের কোনো সম্পর্ক ও হৃদ্যতা নেই; বরং তাদের সাথে রয়েছে বিদ্বেষ ও শত্রুতার সম্পর্ক, তাই তাদের রাষ্ট্রকে ইসলামি পরিভাষায় 'দারুল হারব' বলা হয়।
অবশ্য 'হারব'-এর প্রসিদ্ধ অর্থ ধরেও এর একটি ব্যাখ্যা করা যায়। সেটি হলো, 'দারুল হারব' অর্থ আমরা যুদ্ধের দেশ বা যুদ্ধ-কবলিত দেশও বলতে পারি। কেননা, এখানে বর্তমানে যুদ্ধ না থাকলেও এর উপযুক্ত হওয়াই তার এ নাম হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কাফির-শাসিত রাষ্ট্র পদানত করে তথায় আল্লাহর কালিমা প্রতিষ্ঠা করা যেহেতু ইসলামের নির্দেশ, বিধায় সেটাকে রূপক অর্থে যুদ্ধের দেশ বলতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। অর্থাৎ বর্তমানে যুদ্ধ না থাকলেও সেটা যুদ্ধের উপযুক্ত একটি রাষ্ট্র। যেমন আমরা বলে থাকি, 'ভাত রান্না হচ্ছে'। মূলত রান্না করা হয় চাল, কিন্তু সেটা যেহেতু শীঘ্রই ভাতে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে, বিধায় অগ্রীম তাকে 'ভাত' নামেও ডাকা হয়। কাফিরদের রাষ্ট্রের বিষয়টিও ঠিক এমনই। তথায় যুদ্ধ না থাকলেও ইসলামের দাবি অনুসারে শীঘ্রই তাদের সাথে যুদ্ধে জড়াতে হবে, সে হিসেবে অগ্রীম সে দেশকে 'দারুল হারব' বা যুদ্ধের রাষ্ট্র বলা এ দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরিই যৌক্তিক।
উল্লেখ্য যে, 'দারুল হারব'-কে ফুকাহায়ে কিরাম 'দারুশ শিরক বা 'দারুল কুফর' অভিধায়ও অভিহিত করে থাকেন। এ থেকেও প্রমাণ হয় যে, 'দারুল হারব' বলতে বাস্তবিক যুদ্ধ-কবলিত দেশ হওয়া জরুরি নয়। কেননা, পারিভাষিকভাবে 'দারুশ শিরক' বা 'দারুল কুফর' হলো তার সমর্থক শব্দ। আর এ দুটি শব্দের মধ্যে যুদ্ধের কোনো অর্থ বা ইঙ্গিত নেই। অতএব, শুধু 'দারুল হারব' শব্দ দেখেই এ ধারণা করা ভুল হবে যে, 'দারুল হারব' হওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে প্রকৃতই যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হবে। এছাড়াও এ দু'টি অতিরিক্ত শব্দ থেকে এর পারিভাষিক অর্থের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। কেননা, যেরকমভাবে 'দারুল ইসলাম' পরিভাষাটিতে 'দার' শব্দটিকে ইসলামের দিকে ইজাফত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে বিধায় তার সংজ্ঞায় বলা হয়, যে রাষ্ট্রে ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকবে, সেটাই 'দারুল ইসলাম'। অনুরূপ 'দারুল কুফর বা 'দারুশ শিরক' পরিভাষাদ্বয়েও 'দার' শব্দটিকে কুফর বা শিরকের দিকে ইজাফত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে বিধায় তার সংজ্ঞায় বলা হবে যে, যে রাষ্ট্রে কুফরি বা শিরকি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকবে, সেটাই 'দারুল কুফর' বা 'দারুশ শিরক'। বস্তুত 'দারুল কুফর', 'দারুশ শিরক ও 'দারুল হারব' এ তিনটির মাঝে শাব্দিক ব্যবধান ছাড়া পরিভাষাগত কোনো পার্থক্য নেই।
**পারিভাষিক অর্থ :**
কোনো সন্দেহ নেই যে, 'দার'-এর পরিচয়ের ক্ষেত্রে মূল দেখার বিষয় হলো, কর্তৃত্ব, শক্তি ও রাজত্ব কার। যার রাজত্ব ও শাসনব্যবস্থা জারি থাকবে, তার ভিত্তিইে 'দার'-কে 'দারুল ইসলাম বা 'দারুল হারব' বলা হবে। এখানে অন্য কোনো বিষয়, যেমন : নিজ ধর্মের জনসংখ্যা বেশি হওয়া, ধর্মের কিছু বিধান পালন করার সুযোগ থাকা ইত্যাদি বিবেচ্য হবে না। এগুলোর কারণে 'দার'-এর বিধানে কোনোরূপ পরিবর্তন আসবে না। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমরা এখানে 'দার'-এর সংজ্ঞা নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মতামত তুলে ধরছি।
১. ইমাম মালিক রহ. মক্কা বিজয়ের পূর্বের মক্কার ব্যাপারে বলেন :
وَكَانَتْ الدَّارُ يَوْمَئِذٍ دَارَ الْحَرْبِ لِأَنَّ أَحْكَامَ الْجَاهِلِيَّةِ كَانَتْ ظَاهِرَةً يَوْمَئِذٍ.
'আর সেসময় মক্কা ছিল 'দারুল হারব'। কেননা, তখন (মক্কায়) জাহিলি যুগের (কুফরি) আইন ও সংবিধান প্রতিষ্ঠিত ছিল।' (আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা : ১/৫১১, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
২. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন :
الدَّار إِذا ظهر فِيهَا القَوْل بخلق الْقُرْآن وَالقدر وَمَا يُجْرِي مُجْرى ذَلِكَ فَهِيَ دار كفر
'কোনো ভূখণ্ডে যখন কুরআন মাখলুক হওয়ার মতবাদ, তাকদির অস্বীকার করার মতাদর্শ এবং এ জাতীয় অন্য কোনো কুফরি, শিরকি আকিদা বিজয়ী হবে, তখন সেটাকে “দারুল কুফর” বলা হবে।' (আল-আকিদা, আবু বকর আল-খাল্লাল : পৃ. নং ১২৪, প্রকাশনী : দারু কুতাইবা, দামেশক)
৩. ইমাম জাসসাস হানাফি রহ. বলেন :
حُكْمُ الدَّارِ إِنَّمَا يَتَعَلَّقُ بِالظُّهُوْرِ وَالْغَلَبَةِ، وَإِجْرَاءِ حُكْمِ الدِّيْنِ بِهَا، وَالدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ ذَلِكَ : أَنَّا مَتَى غَلَبْنَا عَلَى دَارِ الْحَرْبِ، وَأَجْرَيْنَا أَحْكَامَنَا فِيهَا: صَارَتْ دَارَ الْإِسْلَامِ، سَوَاءٌ كَانَتْ مُتَاخِمَةً لِدَارِ الْإِسْلَامِ أَوْ لَمْ تَكُنْ، فَكَذَلِكَ الْبَلَدُ مِنْ دَارُ الْإِسْلَامْ، إِذَا غَلَبَ عَلَيْهِ أَهْلُ الْكُفْرِ، وَجَرَى فِيْهِ حُكْمُهُمْ: وَوَجَبَ أَنْ يَكُوْنَ مِنْ دَارِ الْحَرْبِ. وَلَا مَعْنَى لِاعْتِبَارِ بَقَاءِ ذِيَّ أَوْ مُسْلِمٍ آمِنًا عَلَى نَفْسِهِ؛ لِأَنَّ الْمُسْلِمَ قَدْ يَأْمَنُ فِي دَارِ الْحَرْبِ، وَلَا يَسْلِبُهُ ذَلِكَ حُكْمَ دَارِ الْحَرْبِ، وَلَا يُوْجِبُ أَنْ يَكُوْنَ مِنْ دَارِ الْإِسْلَامِ.
“দার”-এর হুকুম বিজয়, কর্তৃত্ব ও কোনো ধর্মের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সাথে সম্পর্কিত। এ দাবির পক্ষে দলিল হলো, আমরা যখন “দারুল হারব”-এর ওপর বিজয়ী হই এবং তথায় আমাদের শাসনব্যবস্থা চালু করি, তখন সেটা “দারুল ইসলাম” হয়ে যায়; চাই সে রাষ্ট্রটি কোনো “দারুল ইসলাম”-সংলগ্ন হোক বা না হোক। তাহলে অনুরূপ “দারুল ইসলাম”-এর কোনো শহরের ওপর যখন কাফিররা বিজয়ী হবে এবং তথায় তাদের কুফরি শাসনব্যবস্থা চালু হবে, তাহলে সেটা অবশ্যই “দারুল হারব”-এ পরিণত হয়ে যাবে। মুসলিম ও জিম্মিদের পূর্বের নিরাপত্তাচুক্তিতে তাদের নিরাপদ থাকাকে বিবেচনা করার কোনোই যৌক্তিকতা নেই। কেননা, মুসলমানও তো কখনও কখনও “দারুল হারব”-এ নিরাপদ থাকে; অথচ এর কারণে এটা রাষ্ট্রকে “দারুল হারব” হওয়া থেকে বের করে দেয় না এবং “দারুল ইসলাম”-এ রূপান্তরিত হয়ে যাওয়াকে আবশ্যক করে না।' (শারহু মুখতাসারিত তাহাবি : ৭/২১৬-২১৭, প্রকাশনী : দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যা, বৈরুত)
৪. ইমাম সারাখসি হানাফি রহ. স্বীয় 'মাবসুত'-এ সাহিবাইনের-এর পক্ষ থেকে দলিল দিয়ে বলেন :
الْبُقْعَة إِنَّمَا تُنْسَبُ إِلَيْنَا أَوْ إِلَيْهِمْ بِاعْتِبَارِ الْقُوَّةِ وَالْغَلَبَةِ، فَكُلُّ مَوْضِعِ ظَهَرَ فِيهِ حُكْمُ الشَّرْكِ فَالْقُوَّةُ فِي ذَلِكَ الْمَوْضِعِ لِلْمُشْرِكِينَ فَكَانَتْ دَارَ حَرْبٍ، وَكُلُّ مَوْضِعِ كَانَ الظَّاهِرُ فِيهِ حُكْمُ الْإِسْلَامِ فَالْقُوَّةُ فِيهِ لِلْمُسْلِمِينَ.
'স্থান আমাদের (মুসলমানদের) সাথে বা তাদের (কাফিরদের) সাথে সম্পৃক্ত হয় শক্তি ও বিজয়ের ভিত্তিতে। অতএব, যে জায়গায় শিরকের সংবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকবে, বুঝতে হবে সেখানে মুশরিকদের শক্তি বিজয়ী; বিধায় সেটা হবে “দারুল হারব”। আর যে জায়গায় ইসলামের সংবিধান বিজয়ী থাকবে, বুঝতে হবে সেখানে মুসলমানদের শক্তি বিজয়ী।' (আল-মাবসুত, সারাখসি : ১০/১১৪, প্রকাশনী : 'দারুল মারিফা, বৈরুত)
তিনি শারহুস সিয়ারে আরও বলেন :
الْمَوْضِعِ الَّذِي لَا يَأْمَنُ فِيهِ الْمُسْلِمُونَ مِنْ جُمْلَةِ دَارِ الْحَرْبِ، فَإِنَّ دَارَ الْإِسْلَامِ اسْمُ لِلْمَوْضِعِ الَّذِي يَكُونُ تَحْتَ يَدِ الْمُسْلِمِينَ، وَعَلَامَةُ ذَلِكَ أَنْ يَأْمَنَ فِيهِ الْمُسْلِمُونَ.
'যে স্থানে মুসলমানরা নিরাপদ নয়, সেটাও “দারুল হারব”-এর অন্তর্গত। কেননা, “দারুল ইসলাম” বলা হয় ওই জায়গাকে, যা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আছে। আর এর নিদর্শন হলো, তথায় মুসলমানরা নিরাপদে থাকবে।' (শারহুস সিয়ারিল কাবির : পৃ. নং ১২৫৩, প্রকাশনী : আশ-শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
তিনি আরও বলেন :
الْمُعْتَبَرَ فِي حُكْمِ الدَّارِ هُوَ السُّلْطَانُ فِي ظُهُورِ الْحُكْمِ
“দার” নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে (ইসলাম বা কুফরের) কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা।' (শারহুস সিয়ারিল কাবির : পৃ. নং ১৭০৩, প্রকাশনী : আশ-শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
৫. ইমাম ইবনে হাজাম জাহিরি রহ. বলেন :
الدَّارَ إِنَّمَا تُنْسَبُ لِلْغَالِبِ عَلَيْهَا، وَالْحَاكِمُ فِيهَا، وَالْمَالِكُ لَهَا.
'দেশকে (ইসলাম বা কুফরের দিকে) সম্বন্ধিত করা হয় দেশটির বিজয়ী শক্তি, শাসক ও অধিকারীর ভিত্তিতে।' (আল-মুহাল্লা : ১২/১২৬, প্রকাশনী : 'দারুল ফিকর, বৈরুত)
:
৬. ইমাম কাসানি হানাফি রহ. সাহিবাইনের পক্ষে দলিল পেশ করতে গিয়ে বলেন
أَنَّ قَوْلَنَا دَارُ الْإِسْلَامِ وَدَارُ الْكُفْرِ إِضَافَةُ دَارٍ إِلَى الْإِسْلَامِ وَإِلَى الْكُفْرِ، وَإِنَّمَا تُضَافُ الدَّارُ إِلَى الْإِسْلَامِ أَوْ إِلَى الْكُفْرِ لِظُهُورِ الْإِسْلَامِ أَوْ الْكُفْرِ فِيهَا، كَمَا تُسَمَّى الْجَنَّةُ دَارَ السَّلَامِ، وَالنَّارُ دَارَ الْبَوَارِ؛ لِوُجُودِ السَّلَامَةِ فِي الْجَنَّةِ، وَالْبَوَارِ فِي النَّارِ وَظُهُورُ الْإِسْلَامِ وَالْكُفْرِ بِظُهُورِ أَحْكَامِهِمَا، فَإِذَا ظَهَرَ أَحْكَامُ الْكُفْرِ فِي دَارٍ فَقَدْ صَارَتْ دَارَ كُفْرٍ فَصَحَّتْ الْإِضَافَةُ، وَلِهَذَا صَارَتْ الدَّارُ دَارَ الْإِسْلَامِ بِظُهُورِ أَحْكَامِ الْإِسْلَامِ فِيهَا مِنْ غَيْرِ شَرِيطَةٍ أُخْرَى، فَكَذَا تَصِيرُ دَارَ الْكُفْرِ بِظُهُورِ أَحْكَامِ الْكُفْرِ فِيهَا.
'আমাদের “দারুল ইসলাম” ও “দারুল কুফর” কথা দু'টিতে “দার”-কে ইসলাম ও কুফরের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। আর “দার”-কে ইসলাম ও কুফরের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয় তাতে ইসলাম কিংবা কুফর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে। যেমন : জান্নাতকে “দারুস সালাম” ও জাহান্নামকে “দারুল বাওয়ার” নামে ডাকা হয়; যেহেতু জান্নাতে সালাম বা শান্তি রয়েছে আর জাহান্নামে বাওয়ার বা ধ্বংস রয়েছে। আর ইসলাম ও কুফর প্রতিষ্ঠিত হয় তার আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারা। অতএব, যখন কোনো ভূখণ্ডে কুফরি আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তা “দারুল কুফর” হয়ে যাবে। তাই “দার”-কে এভাবে ইসলাম কিংবা কুফরের সাথে সম্পৃক্ত করাটা সঠিক। এজন্য ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা লাভের দ্বারাই কোনো ভূখণ্ড “দারুল ইসলাম” হিসেবে গণ্য হয়। এই একটি মাত্র শর্ত ছাড়া এখানে আর কোনো শর্ত নেই। অনুরূপ “দারুল ইসলাম”-এ কুফরি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বারাই সেটা “দারুল কুফর”-এ রূপান্তরিত হয়।' (বাদায়িউস সানায়ি : ৭/১৩০-১৩১, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
৭. কাজি আবু ইয়ালা রহ. বলেন :
كُلُّ دَارٍ كَانَتِ الْغَلَبَةُ فِيْهَا لِأَحْكَامِ الْإِسْلَامِ دُوْنَ الْكُفْرِ فَهِيَ دَارُ الْإِسْلَامِ. وَكُلُّ دَارٍ كَانَتِ الْغَلَبَةُ فِيْهَا لِأَحْكَامِ الْكُفْرِ دُوْنَ أَحْكَامِ الْإِسْلَامِ فَهِيَ دَارُ الْكُفْرِ.
'প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে ইসলামি বিধিবিধান বিজয়ী, কুফরি সংবিধান নয়, তা “দারুল ইসলাম”। আর প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে কুফরি বিধিবিধান বিজয়ী, ইসলামি সংবিধান নয়, তা “দারুল কুফর”।' (আল-মু'তামাদ ফি উসুলিদ্দিন : পৃ. নং ২৭৬, প্রকাশনী : দারুল মাশরিক, বৈরুত)
৮. ইমাম ইবনে মুফলিহ মাকদিসি রহ. বলেন :
فَكُلِّ دَارٍ غَلَبَ عَلَيْهَا أَحْكَامِ الْمُسْلِمِينَ فَدَارُ الْإِسْلَامِ وَإِنْ غَلَبَ عَلَيْهَا أَحْكَامُ الْكُفَّارِ فَدَارُ الْكُفْرِ وَلَا دَارَ لِغَيْرِهِمَا
'প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত, তা “দারুল ইসলাম”। আর যদি কোনো ভূখণ্ডে কুফরি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে তা “দারুল কুফর”। এ দু'প্রকারের বাইরে আর কোনো “দার” নেই।' (আল-আদাবুশ শারইয়্যা ওয়াল মিনহুল মারইয়্যা : ১/১৯০, প্রকাশনী: আলামুল কুতুব, বৈরুত)
৯. হাফিজ ইবনে কাইয়িম জাওজিয়া রহ. বলেন :
قَالَ الْجُمْهُورُ : دَارُ الْإِسْلَامِ هِيَ الَّتِي نَزَلَهَا الْمُسْلِمُونَ، وَجَرَتْ عَلَيْهَا أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ، وَمَا لَمْ تَجْرِ عَلَيْهِ أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ لَمْ يَكُنْ دَارَ إِسْلَامٍ، وَإِنْ لَا صَقَهَا، فَهَذِهِ الطَّائِفُ قَرِيبَةً إِلَى مَكَّةَ جِدًّا وَلَمْ تَصِرْ دَارَ إِسْلَامٍ بِفَتْحِ مَكَّةَ.
'অধিকাংশ ফুকাহা বলেন, “দারুল ইসলাম” ওই ভূখণ্ডকে বলে, যেখানে মুসলমানরা বসবাস করে এবং তথায় ইসলামি বিধিবিধান চালু থাকে। আর যেখানে ইসলামি বিধিবিধান চালু থাকবে না, সেটা “দারুল ইসলাম” হবে না; যদিও তা 'দারুল ইসলামের সাথে লাগোয়া অঞ্চল হোক। দেখো এই যে মক্কার অদূরেই অবস্থিত তায়িফ, মক্কা বিজয় সত্ত্বেও সেটা “দারুল ইসলাম” হয়ে যায়নি।' (আহকামু আহলিজ জিম্মাহ : ২/৭২৮, প্রকাশনী : রামাদি, দাম্মাম)
১০. আল্লামা মানসুর বিন ইউনুস রহ. বলেন :
وَتَجِبُ الْهِجْرَةُ عَلَى مَنْ يَعْجِزُ عَنْ إِظْهَارِ دِينِهِ بِدَارِ الْحَرْبِ، وَهِيَ مَا يَغْلِبُ فِيهَا حُكْمُ الْكُفْرِ
“দারুল হারব”-এ অবস্থান করে যে ব্যক্তি দ্বীন প্রকাশ্যে পালন করতে অক্ষম হবে, তার জন্য হিজরত করা আবশ্যক। আর “দারুল হারব” হলো এমন ভূখণ্ড, যেখানে কুফরের সংবিধান বিজয়ী।' (কাশশাফুল কিনা' আনিল ইকনা' : ৩/৪৩, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
১১. ইমাম আবুল হাসান আলাউদ্দিন মুরাদাবি রহ. বলেন :
وَدَارُ الْحَرْبِ : مَا يَغْلِبُ فِيهَا حُكْمُ الْكُفْرِ.
“আর “দারুল হারব” ওই ভূখণ্ডকে বলে, যেখানে কুফরি সংবিধান বিজয়ী থাকে।' (আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজিহি মিনাল খিলাফ : ৪/১২১, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১২. ইমাম ইবনে কুদামা রহ. বলেন :
وَمَتَى ارْتَدَّ أَهْلُ بَلَدٍ، وَجَرَتْ فِيهِ أَحْكَامُهُمْ، صَارُوا دَارَ حَرْبٍ فِي اغْتِنَامِ أَمْوَالِهِمْ، وَسَبْيِ ذَرَارِيهِمْ الْحَادِثِينَ بَعْدَ الرَّدَّةِ، وَعَلَى الْإِمَامِ قِتَالُهُمْ،
'যখন কোনো শহরবাসী মুরতাদ হয়ে যাবে এবং তাদের মাঝে তাদের (কুফরি) সংবিধান চালু করবে তখন তাদের সম্পদ গনিমত হওয়া এবং মুরতাদ হওয়ার পর জন্মগ্রহণ করা সন্তান-সন্তুতিকে দাস-দাসী বানানোর ক্ষেত্রে তারা সবাই “দারুল হারব”-এর অধিবাসী বলে বিবেচিত হবে। আর মুসলিম খলিফার ওপর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আবশ্যক হয়ে যাবে।' (আল-মুগনি : ৯/১৭, প্রকাশনী : মাকতাবাতুল কাহিরা, মিশর)
১৩. ইমাম শাওকানি রহ. বলেন :
الْاعْتِبَارُ بِظُهُورِ الكَلِمَةِ فَإِنْ كَانَتِ الْأَوَامِرُ وَالنَّوَاهِي فِي الدَّارِ لِأَهْلِ الْإِسْلامِ بِحَيْثُ لَا يَسْتَطِيعُ مَنْ فِيْهَا مِنَ الْكُفَّارِ أَنْ يَتَظَاهَرَ بِكُفْرِهِ إِلَّا لِكَوْنِهِ مَأْذُوْنًا لَهُ بِذَلِكَ مِنْ أَهْلِ الْإِسْلَامِ فَهَذِهِ دَارُ إِسْلَامٍ وَلَا يَضُرُّ ظُهُورُ الْخِصَالِ الْكُفْرِيَّةِ فِيْهَا لِأَنَّهَا لَمْ تَظْهَرْ بِقُوَّةِ الْكُفَّارِ وَلَا بِصَوْلَتِهِمْ كَمَا هُوَ مُشَاهَدٌ فِي أَهْلِ الذِّمَّةِ مِنَ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى وَالْمُعَاهِدِينَ السَّاكِنِينَ فِي الْمَدَائِنِ الْإِسْلَامِيَّةِ وَإِذَا كَانَ الْأَمْرُ الْعَكْسَ فَالدَّارُ بِالْعَكْسِ.
'ধর্মের বিজয়ের ভিত্তিতে “দার” বিবেচ্য হবে। অতএব, যদি কোনো ভূখণ্ডে আদেশ-নিষেধ জাতীয় সকল আইন-কানুন মুসলিমদের হয়, তথায় অবস্থানকারী কাফিররা মুসলিমদের পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়া ছাড়া কুফরি কোনো কাজ করার ক্ষমতা রাখে না, তাহলে এটা হলো “দারুল ইসলাম”। এ ভূখণ্ডে কিছু কুফরি কাজকর্মের অস্তিত্ব থাকায় “দারুল ইসলাম” হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। কেননা, এসব কুফরি কাজ কাফিরদের শক্তি ও দাপটের ভিত্তিতে প্রকাশ হয়নি; যেমনটি ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত ইহুদি, খ্রিষ্টান ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম জিম্মিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর বিষয়টি যদি এর (তথা “দারুল ইসলাম”-এর সংজ্ঞার) উল্টো হয়, তাহলে "দার” ও উল্টোটা (অর্থাৎ “দারুল হারব”) হবে।' (আস-সাইলুল জাররার : পৃ. নং ৯৭৬, প্রকাশনী : দারু ইবনি হাজাম)
১৪. আল্লামা আব্দুল্লাহ আবু বাতিন রহ. বলেন :
فدار الإسلام هي التي تجري أحكام الإسلام فيها وإن لم يكن أهلها مسلمين، وغيرها دار كفر،
“দারুল ইসলাম” বলা হয়, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান চলমান ও প্রতিষ্ঠিত আছে; যদিও তার অধিবাসীরা মুসলিম না হোক। আর এর বিপরীতটা (অর্থাৎ যেখানে কুফরি বিধিবিধান চলমান ও প্রতিষ্ঠিত, সেটা) হলো “দারুল কুফর”।' (মাজমুআতুর রাসায়িলি ওয়াল মাসায়িলিন নাজদিয়্যা : ১/৬৫৫, প্রকাশনী : মাতবাআতুল মানার, মিশর)
১৫. সাইয়িদ কুতুব শহিদ রহ. বলেন :
الْأَوَّلُ : دَارَ الْإِسْلَامِ. وَتَشْمِلُ كُلَّ بَلَدٍ تُطَبَّقُ فِيْهِ أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ، وَتَحْكُمُهُ شَرِيعَةُ الْإِسْلَامِ... فَالْمَدَارُ كُلُّهُ فِي اعْتِبَارِ بَلَدٍ مَّا دَارَ إِسْلَامٍ هُوَ تَطْبِيقُهُ لأَحْكَامِ الْإِسْلَامِ وَحُكْمُهُ بِشَرِيعَةِ الْإِسْلَامِ. اَلثَّانِي : دَارُ الْحَرْبِ. وَتَشْمِلُ كُلَّ بَلَدٍ لَا تُطَبَّقُ فَيْهِ أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ، وَلَا يُحْكَمُ بَشَرِيعَةِ الْإِسْلَامِ... فَالْمَدَارُ كُلُّهُ فِي اعْتِبَارِ بَلَدٍ مَّا دَارَ حَرْبٍ هُوَ عَدَمُ تَطْبِيقِهِ لِأَحْكَامِ الْإِسْلَامِ وَعَدَمُ حُكْمِهِ بِشَرِيعَةِ الْإِسْلَامِ.
'প্রথম হলো “দারুল ইসলাম”। এটা প্রত্যেক এমন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা হয় এবং ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা হয়। ...সুতরাং কোনো দেশ “দারুল ইসলাম” হওয়ার মূলভিত্তি হলো ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা এবং শরিয়া অনুসারে বিচার-ফয়সালা করা। দ্বিতীয় হলো “দারুল হারব”। এটা প্রত্যেক এমন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা হয় না এবং ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা হয় না। ...সুতরাং কোনো দেশ “দারুল হারব” হওয়ার মূলভিত্তি হলো ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন না করা এবং শরিয়া অনুসারে বিচার-ফয়সালা না করা।' (ফি জিলালিল কুরআন : ২/৩৪৮, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুশ শামিলা)
১৬. শাইখ মুহাম্মাদ সাদকি বিন আহমাদ গাজ্জি রহ. বলেন :
دَارُ الْحَرْبِ هِيَ الدَّارُ الَّتِي لَا يَأْمَنُ فِيْهَا الْمُسْلِمُوْنَ، وَلَا يُحْكَمُ فِيْهَا بِشَرْعِ اللهِ، فَكُلُّ مَكَانٍ لَا يَأْمَنُ فَيْهِ الْمُsْلِمُوْنَ، وَلَا يُحْكَمُ فَيْهِ بِشَرْعِ اللَّهِ فَهُوَ مِنْ جُمْلَةِ دَارِ الْحَرْبِ.
“দারুল হারব” হলো ওই ভূখণ্ড, যেখানে মুসলমানরা নিরাপদ নয় এবং যেখানে আল্লাহর শরিয়ত অনুসারে বিচার-ফয়সালা করা হয় না। অতএব, যে জায়গায় মুসলিমরা নিরাপদ নয় এবং যেথায় আল্লাহর শরিয়ত অনুযায়ী বিচার করা হয় না, তা “দারুল হারব”-এর অন্তর্ভক্ত।' (মাওসুআতুল কাওয়ায়িদিল ফিকহিয়্যা : ৯/১৭৬, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
তিনি আরও বলেন :
فَالْمَكَانُ وَالْمَوْضِعُ وَالْبِلَادُ الَّتِي لَا يَأْمَنُ فِيْهَا الْمُسْلِمُوْنَ عَلَى إِقَامَةِ شَعَائِرِ دِينِهِمْ وَعَلَى أَنْفُسِهِمْ وَأَعْرَاضِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ ، وَلَا يُقَامُ فِيْهَا شَرْعُ اللَّهِ هُوَ دَارُ الْحَرْبِ، وَالْمَكَانُ الَّذِي يَكُوْنُ تَحْتَ يَدِ الْمُسْلِمِينَ، وَفِيْهِ يَأْمَنُوْنَ، وَيُحْكَمُ فَيْهِ بِشَرْعِ اللهِ هُوَ دَارُ الْإِسْلَامِ.
'অতএব যে স্থান, এলাকা ও দেশে মুসলমানরা নিজেদের দ্বীন পালন এবং জান, ইজ্জত ও সম্পদের ক্ষেত্রে নিরাপদ নয় এবং যেখানে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা হয় না, সেটাই হলো “দারুল হারব”। আর যে স্থান মুসলমানদের হাতে থাকবে, মুসলিমরা তথায় নিরাপদ থাকবে এবং সেখানে আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার-ফয়সালা করা হবে, সেটা হলো “দারুল ইসলাম”।' (মাওসুআতুল কাওয়ায়িদিল ফিকহিয়্যা : ১১/১১৪৪, প্রকাশনী: মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
এসব ফকিহ ও উসুলবিদের ভাষ্য থেকে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব’-এর অর্থ স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জনগণের আধিক্য কিংবা কিছু ধর্মীয় বিধিবিধান বা রীতিনীতি পালনের সুযোগ থাকার কারণেই কোনো দেশকে 'দারুল ইসলাম' বা ‘দারুল হারব' বলা হবে না; বরং মূলে দেখতে হবে যে, সে দেশের সংবিধান ও শাসনক্ষমতা কাদের হাতে। যদি শাসনক্ষমতা মুসলিমদের হাতে থাকে এবং দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবব্যবস্থা শরিয়ামতে চলে তাহলে সে দেশকে 'দারুল ইসলাম' বলা হবে। এক্ষেত্রে এটা বিবেচ্য নয় যে, দেশের অধিকাংশ জনগণের ধর্ম কী। চাই সবাই জিম্মি কাফির হোক বা সবাই মুসলিম হোক কিংবা কমবেশ করে উভয় শ্রেণির জনগণ থাকুক। এসবের কারণে 'দারুল ইসলাম' হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এর বিপরীতে যদি দেশের শাসনক্ষমতা কাফিরদের হাতে থাকে কিংবা মুরতাদ ও নামধারী মুসলমানের হাতে থাকলেও কুফরি ও মানবরচিত আইনে দেশ পরিচালনা করা হয় এবং এসব মানবরচিত আইনকেই শরিয়ার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে এটাকে 'দারুল হারব' বলা হবে; যদিও দেশের সিংহভাগ নাগরিক মুসলমান হোক এবং দেশে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ইবাদত পালনের সুযোগ বহাল থাকুক।
📄 ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হারব’-এর প্রকারভেদ ও প্রেক্ষিত ‘দারুল আমান’
আমাদের জানা থাকা দরকার যে, সব 'দারুল হারব' ও 'দারুল ইসলাম' এক ক্যাটাগরির নয়। শ্রেণিগতভাবে এগুলোর রয়েছে নানা ভাগ। নিম্নে আমরা এসংক্রান্ত সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করছি। প্রথমে 'দারুল ইসলাম'-এর প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করব, এরপর 'দারুল হারব'-এর প্রকারভেদ ও বিশেষভাবে 'দারুল আমান' নিয়ে কথা বলব, ইনশাআল্লাহ।
প্রথমত আমাদের আলোচনা হলো 'দারুল ইসলাম'-এর প্রকারভেদ নিয়ে। 'দারুল ইসলাম'-এর প্রসিদ্ধ ও পরিচিত সংজ্ঞা আমরা ইতিপূর্বে জেনে এসেছি। এছাড়াও 'দারুল ইসলাম'-এর আরও তিনটি প্রকার রয়েছে। যথা, এক : দারুল বাগয়ি। দুই : দারুল ফিসক। তিন : দারু আহলিজ জিম্মাহ।
'দারুল বাগয়ি' বলা হয় এমন ভূখণ্ডকে, যা শক্তিশালী কোনো মুসলিম দল খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আলাদা করে নিয়েছে এবং তথায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। যেমন 'আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা-তে বলা হয়েছে :
دَارُ الْبَغْيِ هِيَ : نَاحِيَةٌ مِنْ دَارِ الإِسْلَامِ تَحَيَّرَ إِلَيْهَا مَجْمُوعَةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ لَهُمْ شَوْكَةُ خَرَجَتْ عَلَى طَاعَةِ الإِمَامِ بِتَأْوِيلِ.
“দারুল বাগয়ি” হলো “দারুল ইসলাম”-এর একটি অঞ্চল, যা মুসলমানদের মধ্য হতে শক্তিশালী একটি দল দখল করে নিয়েছ, যারা তাবিল (বিদ্রোহকে বৈধ করার ব্যাপারে কোনো অজুহাত ও ব্যাখ্যা পেশ) করে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।' (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : ২০/২০১, প্রকাশনী : অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, কুয়েত)
আর 'দারুল ফিসক' বলা হয় এমন ভূখণ্ডকে, যেখানে গুনাহ, অশ্লীলতা ও পাপাচার এমনভাবে বেড়ে যায় যে, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাটা বেশ দুস্কর হয়ে পড়ে। যেমন 'আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলমি'-তে বলা হয়েছে :
دار الفسق وهى ما إذا شاع الفسق ببلد في دار الإسلام،
“দারল ফিসক” হলো “দারুল ইসলাম”-এর অন্তর্গত এমন অঞ্চল, যেখানে নাফরমানি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।' (আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলমি : ২/৬৪৬, প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ)
আর 'দারু আহলিজ জিম্মাহ' বলা হয় এমন ভূখণ্ডকে, যার অধিবাসীরা হবে জিম্মি ('দারুল ইসলাম'-এ জিজিয়া দিয়ে বসবাস করা অমুসলিম নাগরিক) এবং তাদের দেশে ও বিচার-আদালতে ইসলামি আইন-কানুন প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন :
وَإِنْ حَاصَرَ أَمِيرُ الْعَسْكَرِ أَهْلَ مَدِينَةٍ مِنْ مَدَائِنِ الْعَدُوِّ فَقَالَ بَعْضُهُمْ نُسْلِمُ وَقَالَ بَعْضُهُمْ نَصِيرُ ذِمَّةً وَلَا نَبْرَحُ مَنَازِلَنَا، فَإِنْ كَانَ الْمُسْلِمُونَ يَقْوُونَ عَلَى أَنْ يَجْعَلُوا مَعَهُمْ مِنْ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَقْوَى عَلَى قِتَالِ مَنْ يَحْضُرُ بِهِمْ مِنْ أَهْلِ الْحَرْبِ، وَيَحْكُمُ فِيهِمْ بِحُكْمِ الْإِسْلَامِ، فَعَلَ ذَلِكَ الْأَمِيرُ.
'মুসলিমদের সেনাপতি শত্রুদের কোনো শহর অবরোধ করার পর যদি কিছু শহরবাসী বলে, আমরা ইসলাম গ্রহণ করব, আর অন্যরা বলে, আমরা জিম্মি হয়ে থাকব এবং আমাদের বাসস্থানেই অবস্থান করব, তখন দেখতে হবে, যদি মুসলমানরা সেখানে এমন কোনো মুসলমানকে (শাসক হিসেবে) নিয়োগ দিতে পারে, যে তাদের সাথে যোগদান করা হারবি কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সক্ষম এবং তাদের মাঝে ইসলামি বিধিবিধান চালু করতে পারে তাহলে সেনাপতি তা করতে পারবে।' (শারহুস സিয়ারিল কাবির : পৃ. নং ২১৯৬, প্রকাশনী : আশ-শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
ইমাম সারাখসি রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন :
لِأَنَّ إِجْرَاءَ أَحْكَامِ الْمُسْلِمِينَ فِي دَارِهِمْ مُمْكِنُ، وَالدَّارُ تَصِيرُ دَارَ الْمُسْلِمِينَ بِإِجْرَاءِ أَحْكَامِ الْمُسْلِمِينَ، فَيَجْعَلُهَا الْإِمَامُ دَارَ إِسْلَامٍ وَيَجْعَلُ الْقَوْمَ أَهْلَ ذِمَّةٍ.
'কেননা, তাদের দেশে মুসলমানদের আইন-কানুন চালু করা সম্ভব এবং সেখানে মুসলমানদের আইন-কানুন চালু করার দ্বারা সেটা মুসলমানদের দেশ হয়ে যাবে। অতএব, খলিফা সে দেশকে “দারুল ইসলাম” বলে সাব্যস্ত করবেন এবং জনগণকে গণ্য করবেন জিম্মি হিসেবে।' (শারহুস সিয়ারিল কাবির : পৃ. নং ২১৯৭, প্রকাশনী : আশ-শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
দ্বিতীয়ত আমাদের আলোচনা ছিল 'দারুল হারব'-এর প্রকারভেদ ও বিশেষভাবে 'দারুল আমান'-এর আলোচনা নিয়ে। ইতিপূর্বে আমরা 'দারুল ইসলাম'-এর অতিরিক্ত তিনটি প্রকার ও তার পরিচয় জেনে এসেছি। এখানে আমরা 'দারুল হারব'-এর প্রকারগুলো একসাথে আলোচনা না করে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা আলাদা করে করব, যেন সবগুলো প্রকার ও প্রকারভেদের কারণ বুঝতে সহজ হয়।
প্রথমত 'দারুল হারব'-এ কুফরি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিক থেকে 'দারুল হারব'-কে মোট তিন ভাগ করা যায়। যথা : এক. 'দারুল হারবিল আসলি'। দুই. 'দারুল হারবিত তারি'। তিন : 'দারুর রিদ্দা'। 'দারুল হারবিল আসলি' বলা হয় এমন কুফরি রাষ্ট্রকে, যেখানে পূর্ব থেকেই কুফরি শাসনব্যবস্থা চলে আসছে। আগে বা পরে কখনো তথায় ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যেমন : আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান ইত্যাদি। আর 'দারুল হারবিত তারি' বলা হয় এমন কুফরি রাষ্ট্রকে, যেখানে কখনো ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে মুসলমানদের গাফলতি বা অন্য কোনো কারণে ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে সেখানে আসলি কাফিরদের কুফরি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন : স্পেন, ফ্রান্স, ইটালি, উত্তর আফ্রিকা, ভারত ইত্যাদি। আর 'দারুর রিদ্দা' বলা হয়, এমন কুফরি রাষ্টকে, যেখানে কখনো ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরে সেখানে মুসলিম নামের মুরতাদরা শাসনক্ষমতায় এসে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানবরচিত কুফরি সংবিধান চালু করেছে। বর্তমানের অধিকাংশ মুসলিম দেশ এ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে ইসলামের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কুফরি আইনকানুন চালু রয়েছে।
আল্লামা আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন :
من جهة كون الكفر فيها قديما أو طارئا، تنقسم إلى:
أ ـــ دار الكفر الأصلي: وهى التي لم تكن دار إسلام في وقت من الأوقات مثل اليابان وشرق الصين وانجلترا وقارات أمريكا الشمالية وأمريكا الجنوبية واستراليا.
ب ــ دار الكفر الطاريء: وهى التي كانت دار إسلام في وقــــت من الأوقات ثم استولى عليها الكفار الأصليون مثل الأندلس (إسبانيا والبرتغال) وفلسطين ودول شرق أوربا التي كانت تحت حكم الدولة العثمانية مثل رومانيا وبلغاريا ويوغوسلافيا واليونان وألبانيا.
جـــــدار الــــردة: وهي فرع من دار الكفر الطاريء، وهى التي كانت دار إسلام في وقت ما ثم تغلب عليها المرتدون وأجروا فيها أحكام الكفار، مثل الدول المسماة اليوم بالإسلامية
'কুফরিটা আদি ও অনাদি হওয়া নিয়ে “দারুল হারব” কয়েকভাগে বিভক্ত। এক. আসলি (প্রকৃত) দারুল কুফর। এটা ওই দেশ, যা কোনো সময়েই দারুল ইসলাম ছিল না। যেমন : জাপান, পূর্ব চীন, ইংল্যান্ড, উত্তর আমেরিকা মহাদেশ, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ ও অস্ট্রোলিয়া। দুই. তারি (পরে আগত ও পরিবর্তিত) দারুল কুফর। এটা ওই দেশ, যা কোনো এক সময় “দারুল ইসলাম” ছিল। এরপর আসলি কাফিররা (যারা বংশসূত্রে কাফির) তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। যেমন : স্পেন, পর্তুগাল, ফিলিস্তিন, পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো, যা উসমানি খিলাফতের অধীন ছিল, যেমন রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, গ্রীস ও আলবেনিয়া। তিন. দারুর রিদ্দা। এটা বস্তুত তারি দারুল কুফরেরই একটি প্রকার ও শাখা। এটা ওই দেশ, যা কোনো এক সময় “দারুল ইসলাম” ছিল। অতঃপর মুরতাদরা (যারা বংশসূত্রে মুসলিম হলেও পরে নানা কুফরি কর্মকাণ্ড করায় প্রকৃত অর্থে কাফির) তা জবরদখল করে সেখানে কাফিরদের আইনকানুন চালু করেছে। যেমন : বর্তমানের নামসর্বস্ব ইসলামি রাষ্ট্রগুলো।' (আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলম : ২/৬৪৫, প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ)
'দারুল হারব'-এ কাফির বা মুরতাদদের কুফরি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি আবার দু'প্রকারের হতে পারে। এক. ইসতিলায়ে তাম। দুই. ইসতিলায়ে নাকিস। 'ইসতিলায়ে তাম' বলা হয় এমন কর্তত্বকে, যা নিজেদের কুফরি আইন ও শাসনব্যবস্থার বিপরীতে ভিন্ন কোনো আইন বা বিধানের স্বীকৃতি দেয় না। বরং ভিন্ন কোনো আইন ও নিয়মকানুন অনুসরণ করলে তাকে হত্যা, বা বন্দী করা হয় এবং তাকে চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়। যেমন : চীন, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি। আর ইসতিলায়ে নাকিস বলা হয় এমন কর্তত্বকে, যা নিজেদের কুফরি আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভিন্নধর্মীদের জন্য সীমিত পরিসরে ধর্ম পালন করার সুযোগও দিয়ে থাকে। তবে শর্ত হলো, সেটা তাদের কুফরি আইন-কানুন ও মানবরচিত দর্শনের সাথে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। যেমন : তাতারিদের যুগে শাম ও পাশ্ববর্তী কিছু অঞ্চলের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গিয়েছিল এবং যেরকমভাবে বর্তমানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক কুফরি রাষ্টসমূহে দেখা যায়। এসব অঞ্চলে যদিওবা ইসলামি কিছু বিধিবিধান পালনের সুযোগ থাকে, কিন্তু সেটা মুসলমানদের কর্তত্বের বলে নয়; বরং কাফির ও তাগুত শাসকেরা এর অনুমোদন দেওয়াতেই সেটা সম্ভব হয়। তাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন সাপেক্ষে কিছু ইবাদত পালনের সুযোগ পাওয়াতে কোনো দেশকে 'দারুল ইসলাম' বলা যাবে না। কেননা, সেখানে সবকিছুই হয় তাগুত সরকারের মর্জি মোতাবেক। তাদের পরিষ্কার নীতি হলো, সবকিছু তাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। অনুমোদন দিলে তবেই করতে পারবে, তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু নিজেদের কোনো স্বার্থে বা রাজনৈতিক কোনো কারণে বা ভিন্ন যেকোনো কারণে অনুমোদন না দিলে তা আর পালন করার সুযোগ থাকে না। এটা মূলত স্পষ্টই পরাধীনতা, যা অনেক বোকা মানুষ না বুঝে ভাবে যে, দেশে তো মোটামুটি ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত আছে এবং ইসলামও পালন করা যাচ্ছে! আর এরই ভিত্তিতে অনেকে তো এ ধরনের দেশকে 'দারুল ইসলাম'ও ঘোষণা দিয়ে দেয়!!
আল্লামা আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন :
استيلاء الكفار على دار الإسلام وهو نوعان:
أ ـ الاستيلاء التام: وهو ما إذا تغلّب الكفار على دار إسلام وأجروا فيها أحكام الكفر. فهذه تصير دار كفر لتحقق المناط فيها...
ب ــ الاستيلاء الناقص وهو ما إذا تغلب الكفار على دار إسلام ولكن بقيت أحكام الإسلام هي الجارية في الدار.
“দারুল ইসলাম”-এর ওপর কাফিরদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা দু'প্রকারের। এক : ইসতিলায়ে তাম। এটা বলা হয় এমন কর্তৃত্বকে, যার ভিত্তিতে কাফিররা “দারুল ইসলাম”-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে কুফরি বিধিবিধান চালু করে। এক্ষেত্রে “দারুল হারব”-এর ভিত্তি ও কারণ বিদ্যমান থাকায় এটা “দারুল হারব”-এ পরিণত হয়ে যাবে। দুই : ইসতিলায়ে নাকিস। এটা বলা হয় এমন কর্তৃত্বকে, যার ভিত্তিতে কাফিররা “দারুল ইসলাম”-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু সেখানে (পূর্বে চালু করা) ইসলামি বিধিবিধান যথারীতি বহাল থাকে।' (আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলম : ২/৬৪৭-৬৪৮, প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ)
আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান রহ. বলেন :
فمتى علمنا يقينًا ضروريًا بالمشاهدة أو السّماع المتواتر أن الكفار استولوا على بلدٍ من بلاد الإسلام التي تليهم، وغلبوا عليها وقهروا أهلها، بحيث لا يتم لهم إبراز كلمة الإسلام إلا بجوارٍ من الكفار: صارت دار حرب وإن أقيمت فيها الصلاة.
'অতএব, যখন আমরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ বা পারম্পরিক ধারায় শ্রবণের মাধ্যমে সুনিশ্চিতভাবে জানতে পারব যে, কাফিররা তাদের পাশ্ববর্তী কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের ওপর কতৃত্ব অর্জন করে বিজয় অর্জন করেছে এবং এর নাগরিকদের এমনভাবে পরাজিত করেছে যে, কাফিরদের নিরাপত্তাপ্রাপ্তি ছাড়া তাদের প্রকাশ্যে ইসলামের কালিমা বলারও সুযোগ নেই, তখন সেটা “দারুল হারব” বলেই বিবেচিত হবে; যদিও তথায় সালাত প্রতিষ্ঠা করা হোক।' (আল-ইবরাতু মিম্মা জাআ বিল-গাজবি ওয়াশ-শাহাদাতি ওয়াল-হিজরাহ : পৃ. নং ২৩৬-২৩৭, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
সুতরাং 'দারুল হারব' চাই আসলি হোক বা তারি, অনুরূপ তাতে ইসতিলায়ে তাম থাকুক বা নাকিস সর্বাবস্থায়ই এ দেশগুলোর সাথে 'দারুল হারব'-এর মতোই আচরণই করা হবে। যদিও এসব দেশে বসবাস করা বা হিজরতের আবশ্যকীয়তার মাঝে এ প্রকারগুলো বিধানগত কিছুটা পার্থক্য সৃষ্টি করবে। অতএব, যারা কোনো দেশে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নাগরিক কিংবা দেশে কিছু ইসলামি বিধিবিধান পালনের সুযোগ থাকায় দেশকে 'দারুল ইসলাম' বলে মনে করে, তাদের এ মাসআলায় বড় ধরনের ভ্রম ঘটেছে।
এরপর নিরাপত্তার দিক থেকে 'দারুল হারব'-কে আবার দু'ভাগে বিভক্ত করা যায়। এক. 'দারুল খাওফ'। দুই. 'দারুল আমান'। 'দারুল খাওফ'-কে 'দারুল ফিতনা' আর 'দারুল আমান'-কে কখনো 'দারুল আহদ'ও বলা হয়ে থাকে। 'দারুল খাওফ' বা 'দারুল ফিতনা' এমন কুফরি রাষ্ট্রকে বলা হয়, যেখানে মুসলমানদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা থাকে না এবং তথায় সে পরিপূর্ণ ইসলাম পালন করতে পারে না। আর এজন্যই এটাকে 'দারুল খাওফ' বা ভয়-কবলিত রাষ্ট্র ও 'দারুল ফিতনা' বা বিপদ-সংকুল রাষ্ট্র বলা হয়। যেমন চীন, উত্তর কোরিয়া, আমেরিকা, রাশিয়া ইত্যাদি। এ ধরনের দেশগুলোতে হাকিকি ও প্রকৃত মুসলিম তো দূরে থাকে, তাদের চিন্তা-চেতনা লালনকারী মডারেট মুসলিমরাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আর 'দারুল আমান' এমন কুফরি রাষ্ট্রকে বলা হয়, যেখানে মুসলমানরা নিরাপদে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে এবং নিজেদের দ্বীন পুরোপুরিভাবে মেনে চলতে পারে। আর এ কারণেই এটাকে ‘দারুল আমান' বা নিরাপদ রাষ্ট্র বলা হয়। যেমন: ইসলামের শুরু যুগে হাবশা। 'দারুল আহদ' যদিও 'দারুল আমান'-এর অন্তর্গত, কিন্তু উভয়ের মাঝে পার্থক্য হলো, 'দারুল আমান' হলো আম বা ব্যাপক, আর 'দারুল আহদ' খাস বা বিশেষিত। কোনো 'দারুল হারব'-এ মুসলমানদের পূর্ণ নিরাপত্তা থাকলেই সেটা 'দারুল আমান'; চাই সে দেশের সাথে মুসলমানদের খলিফার কোনো চুক্তি থাকুক বা না থাকুক। শর্ত কেবল একটাই, পুর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা থাকেদ হবে, আংশিক হলে হবে না। কিন্তু 'দারুল আহদ' হওয়ার জন্য সে দেশের সাথে মুসলমানদের খলিফার নিরাপত্তাচুক্তি থাকা আবশ্যক। যেমন: হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কা বিজয়ের আগ পর্যন্ত মক্কা নগরী। এটা একইসাথে যেমন 'দারুল আমান', অনুরূপ এটা 'দারুল আহদ'ও ছিল। পক্ষান্তরে হাবশা 'দারুল আমান' হলেও সেটা কিন্তু 'দারুল আহদ' ছিল না। সুতরাং সব 'দারুল আহদ'-ই 'দারুল আমান' হয়, কিন্তু সব 'দারুল আমান'-ই 'দারুল আহদ' হওয়া জরুরি নয়।
আল্লামা আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন :
ومن جهة أمن المسلم على نفسه فيها، تنقسم دار الكفر إلى:
أدار الأمن وهى التي يأمن المسلم فيها على نفسه، مثل الحبشــــة في صدر الإسلام لما هاجر إليها الصحابة فراراً من بطش كفار مكة.
ب ــــ دار الفتنة: وهى التي لا يأمن المسلم فيها على نفسه، مثل مكة في صدر الإسلام، ومثل معظم ديار الردة اليوم.
'দারুল কুফরে মুসলমানের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা আবার দু'প্রকার। এক. দারুল আমান। এটা ওই রাষ্ট্র, যেখানে মুসলমান নিজের জানের নিরাপত্তা পায়। যেমন ইসলামের শুরুযুগে হাবশা; যখন মক্কার কাফিরদের অত্যাচার থেকে পলায়ন করে কিছু সাহাবি তথায় হিজরত করেছিলেন। দুই. দারুল ফিতনা। এটা ওই রাষ্ট্র, যেখানে মুসলমান নিজের জানের নিরাপত্তা পায় না। যেমন ইসলামের শুরুযুগে মক্কা ও বর্তমান সময়ের অধিকাংশ দারুর রিদ্দা (অর্থাৎ নামসর্বস্ব ইসলামি দেশ, যেগুলোকে মূলত ইসলামি না বলে মুসলিম দেশ বলা উচিত।)।' (আল-জামিউ ফি তালাবিল ইলম : ২/৬৪৬, প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ)
উল্লেখ্য যে, ফিকহের কিতাবগুলোতে 'দারুল আমান' বলতে 'দারুল হারব'-এরই একটি প্রকার বুঝানো হলেও বর্তমানে কিছু মানুষ এটাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি 'দার' হিসেবে দাবি করে থাকে। অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল একটি দাবি, যা ফিকহের এসব অধ্যায়ের সাথে সামান্য সম্পর্ক রাখে, এমন যেকোনো তালিবুল ইলমের জানা থাকার কথা। বিষয়টি যেহেতু বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তাই এখানে সংক্ষেপে এটা নিয়ে সামান্য আলোচনা তুলে ধরছি।
📄 দারুল আমান ও তার হাকিকত
অধুনা সময়ের কিছু কিছু আলিমের মুখে শুনতে পাওয়া যায়, 'দার' তিন প্রকারের। এক. দারুল ইসলাম, দুই. দারুল হারব, তিন. দারুল আমান। এ প্রসঙ্গে আমরা দু'টি বিষয় নিয়ে কথা বলব। প্রথমত, ফুকাহায়ে কিরামের পরিভাষায় 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' এ দু'টির বাইরে 'দারুল আমান' বলে তৃতীয় কোনো 'দার'-এর অস্তিত্ব আছে কিনা। দ্বিতীয়ত, 'দারুল আমান' বলতে কী বুঝায় এবং এটার প্রকৃত অর্থ কী।
প্রথম কথা হলো, শরিয়তের পরিভাষায় 'দার'-এর প্রকারভেদ দু'টিই। যথা : 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'। এখানে এ দু'টির বিপরীতে 'দারুল আমান' বলে তৃতীয় কোনো 'দার' নেই। মানুষ যেমন হয় মুমিন, নয় কাফির হবে, এখানে তৃতীয় কোনো প্রকার নেই; অনুরূপ দেশ হয় 'দারুল ইসলাম' হবে নয় 'দারুল হারব' হবে, এর তৃতীয় কোনো প্রকার নেই। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদামতে ইসলাম ও কুফরের মাঝে যেমন তৃতীয় কোনো স্তর নেই, ঠিক তেমনই 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর মাঝেও এমন তৃতীয় কোনো স্তর নেই, যা 'দারুল ইসলাম'ও হবে না, আবার 'দারুল হারব'ও হবে না। এ ব্যাপারে আমরা ফুকাহায়ে কিরামের উক্তিসমূহ তুলে ধরছি।
কাজি আবু ইয়ালা রহ. বলেন :
وَدَلِيلُنَا مَا تَقَدَّمَ فِي مَسَائِلِ الْإِيْمَانٍ وَأَنَّ سَائِرَ الْمُكَلَّفِينَ لَا يَخْلُوْ مِنْ أَنْ يَكُوْنُوْا كُفَّارًا أَوْ مُؤْمِنِينَ كَامِلِي الْإِيْمَانِ أَوْ نَاقِصِي الْإِيْمَانِ أَوْ بَعْضُهُمْ كُفَّارًا وَبَعْضُهُمْ مُؤْمِنِيْنَ. وَلَا يَجُوزُ كَوْنُ مُكَلِّفٍ لَيْسَ بِمُؤْمِنٍ وَلَا كَافِرٍ كَذَلِكَ الدَّارُ أَيْضًا لَا يَخْلُوْ مِنْ أَنْ تَكُوْنَ دَارَ كُفْرٍ أَوْ دَارَ إِسْلَامٍ.
'আর আমাদের দলিল হলো যা ইমানের মাসায়িলের আলোচনায় বিগত হয়েছে। আরেকটি দলিল হলো, সকল মুকাল্লাফ (শরিয়তের বিধান মানতে আদিষ্ট ব্যক্তি) দুই অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারবে না। হয় সবাই কাফির হবে, নয়তো সবাই মুমিন হবে; চাই পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী হোক বা অপরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী হোক। অথবা কিছু লোক কাফির আর কিছু লোক মুমিন হবে। কিন্তু এমনটা হওয়ার কোনোই অবকাশ নেই যে, কোনো মুকাল্লাফ (শরিয়ত পালনে আদিষ্ট ব্যক্তি) মুমিনও হবে না আবার কাফিরও হবে না। ঠিক অনুরূপ “দার”ও দুই অবস্থা থেকে মুক্ত নয়। হয় তা “দারুল কুফর” হবে নয়তো “দারুল ইসলাম” হবে।' (আল-মু'তামাদ ফি উসুলিদ্দিন : পৃ. নং ২৭৬, প্রকাশনী : দারুল মাশরিক, বৈরুত)
ইমাম ইবনে মুফলিহ মাকদিসি রহ. বলেন :
فَكُلِّ دَارٍ غَلَبَ عَلَيْهَا أَحْكَامُ الْمُسْلِمِينَ فَدَارُ الْإِسْلَامِ وَإِنْ غَلَبَ عَلَيْهَا أَحْكَامُ الْكُفَّارِ فَدَارُ الْكُفْرِ وَلَا دَارَ لِغَيْرِهِمَا
'প্রত্যেক এমন ভূখণ্ড, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত, তা “দারুল ইসলাম”। আর যদি কোনো ভূখণ্ডে কুফরি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে তা “দারুল কুফর”। এ দু'প্রকারের বাইরে আর কোনো “দার” নেই।' (আল-আদাবুশ শারইয়্যা ওয়াল মিনহুল মারইয়্যা : ১/১৯০, প্রকাশনী: আলামুল কুতুব, বৈরুত)
আল্লামা আব্দুল্লাহ আবু বাতিন রহ. বলেন :
قال الأصحاب: الدار داران: دار إسلام ودار كفر، فدار الإسلام هي التي تجري أحكام الإسلام فيها وإن لم يكن أهلها مسلمين، وغيرها دار كفر،
'আমাদের উলামায়ে কিরাম বলেন, দার হলো দুটি 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল কুফর'। 'দারুল ইসলাম' বলা হয়, যেখানে ইসলামের বিধিবিধান চলমান ও প্রতিষ্ঠিত আছে; যদিও তার অধিবাসীরা মুসলিম না হোক। আর এর বিপরীতটা (অর্থাৎ যেখানে কুফরি বিধিবিধান চলমান ও প্রতিষ্ঠিত, সেটা) হলো 'দারুল কুফর'।' (মাজমুআতুর রাসায়িলি ওয়াল মাসায়িলিন নাজদিয়্যা : ১/৬৫৫, প্রকাশনী : মাতবাআতুল মানার, মিশর)
সাইয়িদ কুতুব শহিদ রহ. বলেন :
يَنْقَسِمُ العَالَمُ فِي نَظَرَ الْإِسْلَامِ وَفِي اعْتِبَارِ الْمُسْلِمِ إِلَى قِسْمَيْنِ اثْنَيْنِ لَا ثَالِثَ لَهُمَا الْأَوَّلُ : دَارَ الْإِسْلَامِ وَتَشْمِلُ كُلَّ بَلَدٍ تُطَبَّقُ فِيْهِ أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ، وَتَحْكُمُهُ شَرِيعَةُ الْإِسْلَامِ... الثَّانِي : دَارُ الْحَرْبِ. وَتَشْمِلُ كُلَّ بَلَدٍ لَا تُطَبَّقُ فَيْهِ أَحْكَامُ الْإِسْلَامِ، وَلَا يُحْكَمُ بَشَرِيعَةِ الْإِسْلَامِ.
'ইসলাম ও মুসলিমদের বিবেচনায় পুরো বিশ্ব দু'ভাগে বিভক্ত, যার তৃতীয় কোনো প্রকার নেই। প্রথম হলো “দারুল ইসলাম”। এটা প্রত্যেক এমন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা হয় এবং ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা হয়। ...দ্বিতীয় হলো “দারুল হারব”। এটা প্রত্যেক এমন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা হয় না এবং ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা হয় না।' (ফি জিলালিল কুরআন : ২/৩৪৮, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুশ শামিলা)
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, শরিয়তে 'দারুল আমান' বা 'দারুল আহদ' নামে একটি পরিভাষা আছে, কিন্তু সেটা 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর বিপরীতে তৃতীয় কোনো প্রকার নয়; বরং তা 'দারুল হারব'-এরই একটি প্রকার মাত্র। কেননা, ফুকাহায়ে কিরাম 'দারুল হারব'-কে দু'ভাগে ভাগ করেছেন। একটি হলো, ওই 'দারুল হারব', যার রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে মুসলমানদের কোনো চুক্তি নেই এবং সেখানে মুসলমানরা নিরাপদও নয়। এটাকে বলা হয় 'দারুল খাওফ’ বা ভীতির দেশ। দ্বিতীয় প্রকার হলো, ওই দারুল হারব, যার রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে মুসলমানদের খলিফার নিরাপত্তা-চুক্তি আছে, কিংবা যেখানে মুসলমানেরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করতে পারে। এটাকে 'দারুল আমান' বা 'দারুল আহদ' বা 'দারুল মুওয়াদাআ' তথা নিরাপত্তার দেশ বলা হয়।
এ ব্যাপারে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিকহি বোর্ড 'মাজমাউল ফিকহিল ইসলামি' তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এভাবে তুলে ধরেছে :
وَلَا فَرْقَ بَيْنَ دَارِ الْعَهْدِ وَدَارِ الْحَرْبِ إِلَّا مِنْ حَيْثُ إِنَّ الْأُوْلَى بَيْنَهَا وَبَيْنَ الْمُسْلِمِينَ مُعَاهَدَةُ سَلَامٍ، عَلَى حِينٍ لَا يُوْجَدُ هَذَا بِالنِّسْبَةِ لِلثَّانِيَةِ فَكَانَتْ دَارَ الْحَرْبِ يَتَوَقَّعُ مِنْهَا الْاِعْتِدَاءُ فِي أَيَّ وَقْتٍ، وَهُمَا عَدَا هَذَا دَارُ وَاحِدَةً تُقَابِلُ دَارَ الْإِسْلَامِ، فَهُمَا لَا يَعْتَرِفَانِ بِهَذَا الدِّيْنِ، وَلَا عِبْرَةَ بِمَا يَكُوْنُ مِنْ تَفَاوُتٍ فِي الْعَقَائِدِ بَيْنَ أَهْلِ دَارِ الْعَهْدِ وَدَارِ الْحَرْبِ، فَهَذَا لَا يُؤَكِّرُ فِي أَنَّهُمَا دَارُ وَاحِدَةً غَيْرُ إِسْلَامِيَّةٍ.
'বস্তুত “দারুল আমান” ও “দারুল হারব”-এর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। শুধু এতটুকু যে, “দারুল আমান”-এর ক্ষেত্রে তাদের ও মুসলমানদের মাঝে শান্তিচুক্তি থাকে। কিন্তু “দারুল হারব”-এর ক্ষেত্রে এমন কোনো চুক্তি থাকে না। এর কারণে তাদের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সীমালঙ্ঘনের আশঙ্কার ভিত্তিতে সেটাকে (“দারুল আমান” না বলে) “দারুল হারব” বলা হয়। এ পার্থক্য ছাড়া মূলত এ দু'টি (“দারুল হারব” ও “দারুল আমান”) একই, যা “দারুল ইসলাম”-এর বিপরীতে আসে। এ উভয় প্রকার রাষ্ট্রই দ্বীন ইসলামকে স্বীকার করে না। আর “দারুল আমান” ও “দারুল হারব”-এর অধিবাসীদের মাঝে আকিদা ও বিশ্বাসগত যে ব্যবধান আছে, তা তেমন বিবেচ্য নয়। উভয় প্রকারই অনৈসলামিক রাষ্ট্র হওয়ার ব্যাপারে এটা কোনো প্রভাব ফেলবে না।' (মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামি : ৭/১৭১১, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুশ শামিলা)
ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান রহ. বলেন :
وَلَوْ أَنَّ الْمُوَادَعِينَ لَمْ يَخْرُجُوا إِلَيْنَا حَتَّى أَغَارَ عَلَيْهِمْ أَهْلُ دَارِ حَرْبٍ أُخْرَى فِي دَارِهِمْ فَأَسَرُوا مَعَهُمْ أَسِيرًا ثُمَّ ظَهَرَ الْمُسْلِمُونَ عَلَيْهِمْ فَاسْتَنْقَذُوهُمْ مِنْ أَيْدِيهِمْ، كَانُوا عَبِيدًا لِلْمُسْلِمِينَ؛ لِأَنَّهُمْ مَا كَانُوا أَصَابُوهُمْ مِنْ دَارِ الْإِسْلَامِ، فَإِنَّ دَارَ الْمُوَادَعِينَ دَارُ الْحَرْبِ، لَا يَجْرِي فِيهَا حُكْمُ الْمُسْلِمِينَ.
'যদি চুক্তিবদ্ধ কাফিররা আমাদের নিকট না এসে থাকে (বরং তাদের দেশেই অবস্থান করে); ইতিমধ্যে অন্য কোনো “দারুল হারব”-এর কাফিররা তাদের দেশে আকস্মিক আক্রমন করে তাদের লোকদেরকে বন্দী করে নিয়ে যায়, অতঃপর মুসলিমরা ওই আক্রমণকারী কাফিরদের (সাথে যুদ্ধ করে তাদের) ওপর বিজয় অর্জন করে এবং ওই সব বন্দীদের মুক্ত করে আনে, তাহলে এসব বন্দী মুসলমানদের দাস হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, মুসলমানেরা তো “দারুল ইসলাম” থেকে তাদের বন্দী করে আনেনি। যেহেতু চুক্তিবদ্ধ কাফিরদের দেশ তো (প্রকৃত অর্থে) “দারুল হারব”, যেখানে মুসলমানদের শাসন কার্যকর নয়।' (আস-সিয়ারুল কাবির মাআ শারহিস সারাখসি : ৫/১৮৯৩, প্রকাশনী : আশ-শিরকাতুশ শারকিয়্যা)
এ বর্ণনা থেকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয় যে, 'দারুল আমান' বা চুক্তিবদ্ধ কাফির রাষ্ট্র আলাদা কোনো প্রকার নয়; বরং সেটাও 'দারুল হারব'-এরই অন্তর্ভুক্ত। আমরা পূর্বে বলে এসেছি যে, 'দারুল হারব' মূলত দু'প্রকারের। এক. 'দারুল খাওফ' বা ভীতির দেশ। অর্থাৎ কাফির-শাসিত যে রাষ্ট্রের সাথে মুসলমানদের নিরাপত্তাচুক্তি নেই, পাশাপাশি মুসলমানরা সেখানে নিরাপদও নয়। এটা হলো 'দারুল হারব'-এর প্রথম প্রকার 'দারুল খাওফ'। দুই. 'দারুল আমান' বা নিরাপত্তার দেশ। অর্থাৎ কাফির-শাসিত যে রাষ্ট্রের সাথে মুসলমানদের নিরাপত্তাচুক্তি আছে, বা যেখানে মুসলমানরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে পারে। এটা হলো 'দারুল হারব'-এর দ্বিতীয় প্রকার 'দারুল আমান'। অতএব, যারা 'দারুল আমান'-কে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর বিপরীতে তৃতীয় একটি প্রকার বলে প্রচার করে, তারা অজ্ঞতাবশত বা ভুল বুঝে এমনটা বলে থাকে, যার সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।