📄 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান
'দারুল হারব'-এ বসবাস ও ভ্রমণ :
'দারুল হারব'-এ যদি পরিপূর্ণভাবে ইসলামি বিধিবিধান পালনের সুযোগ না থাকে, ইসলামের সব শিআর (নিদর্শন বা প্রতীক) প্রকাশের অনুমোদন না থাকে, তাহলে স্বেচ্ছায় সে দেশে মুসলমানদের জন্য বসবাস করা হারাম। সামর্থ্য থাকার শর্তে এক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই এমন জায়গায় হিজরত করা আবশ্যক, যেখানে ইসলামের সকল বিধান প্রকাশ্যে মেনে চলা সম্ভব। আর যদি পুরোপুরিভাবে ইসলাম পালন ও শিআর প্রকাশের সুযোগ থাকে, তাহলে দেশের কুফরি ব্যবস্থার প্রতি অন্তরে পরিপূর্ণ ঘৃণা ও বিদ্বেষ রেখে বসবাস করা জায়িজ হলেও তা নিরাপদ ও উত্তম নয়। তবে শরয়ি কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্য থাকলে সেক্ষেত্রে থাকাটাই বরং উত্তম। যেমন : অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া, দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য প্রচেষ্টা ও তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি।
আর ওই সব দেশে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে নীতি হলো, প্রয়োজন ছাড়া বিনোদন ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের দেশে যাওয়াও নাজায়িজ। কেননা, এতে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই নিজের দ্বীন ও চরিত্রকে আশঙ্কার মুখে ফেলা হয়। তবে দ্বীনি বা পার্থিব বৈধ প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে। যেমন : চিকিৎসা, ব্যবসা, বৈধ শিক্ষা, দ্বীনের দাওয়াত ইত্যাদি। তবে এর বৈধতার জন্য তিনটি শর্ত আছে। এক. তার দ্বীনের ব্যাপারে এতটুকু জ্ঞান থাকতে হবে, যদ্দরুন সে দ্বীনের ব্যাপারে সংশয়ে পড়া থেকে বাঁচতে পারে। দুই. তার এতটুকু চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকতে হবে, যার ভিত্তিতে সে সকল অশ্লীলতা ও নোংরামি থেকে নিবৃত্ত থাকতে পারে। তিন. সে দেশে পূর্ণভাবে দ্বীন পালন করার স্বাধীনতা থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا . إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا. فَأُولَئِكَ عَسَى اللهُ أَنْ يَعْفُو عَنْهُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَفُوًا غَفُورًا.
'যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তাদের প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, আমরা দুনিয়াতে অসহায় ছিলাম। তাঁরা প্রত্যুত্তরে বলেন, আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাস! তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও খুঁজে পায় না, আল্লাহ অচিরেই তাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।' (সুরা আন-নিসা : ৯৭-৯৯)
জারির বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ
'আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে।' (সুনানু আবি দাউদ : ৩/৪৫, হা. নং ২৬৪৫, প্রকাশনী: আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত)
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
إِذَا أَنْزَلَ اللهُ بِقَوْمٍ عَذَابًا ، أَصَابَ العَذَابُ مَنْ كَانَ فِيهِمْ، ثُمَّ بُعِثُوا عَلَى أَعْمَالِهِمْ
'আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতির ওপর আজাব অবতীর্ণ করেন, তখন তাদের মধ্যে যারা থাকে, সবাইকে সেই আজাব গ্রাস করে। অতঃপর তাদের (ভালোমন্দ) আমলের ভিত্তিতে তাদের পুনরুত্থান করা হবে।' (সহিহুল বুখারি : ৯/৫৬, হা. নং ৭১০৮, প্রকাশনী : দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)
ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন :
وَيُسْتَفَادُ مِنْ هَذَا مَشْرُوعِيَّةُ الْهَرَبِ مِنَ الْكُفَّارِ وَمِنَ الظَّلَمَةِ لِأَنَّ الْإِقَامَةَ مَعَهُمْ مِنْ إِلْقَاءِ النَّفْسِ إِلَى التَّهْلُكَةِ هَذَا إِذَا لَمْ يُعِنْهُمْ وَلَمْ يَرْضَ بِأَفْعَالِهِمْ فَإِنْ أَعَانَ أَوْ رَضِيَ فَهُوَ مِنْهُمْ وَيُؤَيِّدُهُ أَمْرُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْإِسْرَاعِ فِي الْخُرُوجِ مِنْ دِيَارِ ثَمُودَ
'এ হাদিস থেকে কাফির ও জালিমদের থেকে পালানোর শরয়ি অনুমোদন বুঝা যায়। কারণ, তাদের সাথে বসবাস করা নিজেকে ধ্বংসের মাঝে নিক্ষেপ করার নামান্তর। এ বিধান তখন প্রযোজ্য হবে, যখন সে তাদের সাহায্য করবে না এবং তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হবে না। কিন্তু যদি সে তাদের সাহায্য করে অথবা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তবে সে তাদেরই একজন (অর্থাৎ কাফিরদের অন্তর্গত) বলে গণ্য হবে। সামুদের জনপদ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান এ কথারই সমর্থন করে।' (ফাতহুল বারি : ১৩/৬১, প্রকাশনী : দারুল মারিফা, বৈরুত)
ইমাম আবু মুহাম্মাদ বিন হাজাম রহ. এ ব্যাপারে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন :
وَقَدْ عَلِمْنَا أَنَّ مَنْ خَرَجَ عَنْ دَارِ الْإِسْلَامِ إِلَى دَارِ الْحَرْبِ فَقَدْ أَبَقَ عَنْ اللهِ تَعَالَى، وَعَنْ إمَامِ الْمُسْلِمِينَ وَجَمَاعَتِهِمْ ، وَيُبَيِّنُ هَذَا حَدِيثُهُ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - أَنَّهُ بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ وَهُوَ . عَلَيْهِ السَّلَامُ - لَا يَبْرَأُ إِلَّا مِنْ كَافِرٍ ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى {وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ} [التوبة: ٧١] . فَصَحَ بِهَذَا أَنَّ مَنْ لَحِقَ بِدَارِ الْكُفْرِ وَالْحَرْبِ مُخْتَارًا مُحَارِبًا لِمَنْ يَلِيهِ مِنْ الْمُسْلِمِينَ، فَهُوَ بِهَذَا الْفِعْلِ مُرْتَدُّ لَهُ أَحْكَامُ الْمُرْتَدَّ كُلُّهَا مِنْ وُجُوبِ الْقَتْلِ عَلَيْهِ، مَتَى قُدِرَ عَلَيْهِ، وَمِنْ إِبَاحَةِ مَالِهِ، وَانْفِسَاخِ نِكَاحِهِ، وَغَيْرِ ذَلِكَ، لِأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - لَمْ يَبْرَأُ مِنْ مُسْلِمٍ، وَأَمَّا مَنْ فَرَّ إِلَى أَرْضِ الْحَرْبِ لِظُلْمٍ خَافَهُ، وَلَمْ يُحَارِبْ الْمُسْلِمِينَ، وَلَا أَعَانَهُمْ عَلَيْهِمْ، وَلَمْ يَجِدْ فِي الْمُسْلِمِينَ مَنْ يُجِيرُهُ، فَهَذَا لَا شَيْءَ عَلَيْهِ، لِأَنَّهُ مُضْطَرٌ مُكْرَهُ. وَقَدْ ذَكَرْنَا أَنَّ الزُّهْرِيَّ مُحَمَّدَ بْنَ مُسْلِمٍ بْنِ شَهَابٍ: كَانَ عَازِمًا عَلَى أَنَّهُ إِنْ مَاتَ هِشَامُ بْنُ عَبْدِ الْمَلِكِ لَحِقَ بِأَرْضِ الرُّومِ، لِأَنَّ الْوَلِيدَ بْنَ يَزِيدَ كَانَ نَذَرَ دَمَهُ إِنْ قَدَرَ عَلَيْهِ، وَهُوَ كَانَ الْوَالِي بَعْدَ هِشَامٍ فَمَنْ كَانَ هَكَذَا فَهُوَ مَعْذُورُ. وَكَذَلِكَ: مَنْ سَكَنَ بِأَرْضِ الْهِنْدِ، وَالسِّنْدِ، وَالصَّينِ، وَالتُّرْكِ، وَالسُّودَانِ وَالرُّومِ، مِنْ الْمُسْلِمِينَ، فَإِنْ كَانَ لَا يَقْدِرُ عَلَى الْخُرُوجِ مِنْ هُنَالِكَ لِثِقَلِ ظَهْرٍ، أَوْ لِقِلَّةِ مَالٍ، أَوْ لِضَعْفِ جِسْمٍ، أَوْ لِامْتِنَاعِ طَرِيقٍ، فَهُوَ مَعْذُورُ. فَإِنْ كَانَ هُنَاكَ مُحَارِبًا لِلْمُسْلِمِينَ مُعِينًا لِلْكُفَّارِ بِخِدْمَةٍ، أَوْ كِتَابَةٍ : فَهُوَ كَافِرُ - وَإِنْ كَانَ إِنَّمَا يُقِيمُ هُنَالِكَ لِدُنْيَا يُصِيبُهَا، وَهُوَ كَالذَّمِّي لَهُمْ، وَهُوَ قَادِرُ عَلَى اللّحَاقِ بِجَمْهَرَةِ الْمُsْلِمِينَ وَأَرْضِهِمْ، فَمَا يَبْعُدُ عَنْ الْكُفْرِ، وَمَا نَرَى لَهُ عُدْرًا - وَنَسْأَلُ اللهَ الْعَافِيَةَ. وَلَيْسَ كَذَلِكَ: مَنْ سَكَنَ فِي طَاعَةِ أَهْلِ الْكُفْرِ مِنْ الْغَالِيَةِ، وَمَنْ جَرَى مَجْرَاهُمْ، لِأَنَّ أَرْضَ مِصْرَ وَالْقَيْرَوَانِ، وَغَيْرَهُمَا ، فَالْإِسْلَامُ هُوَ الظَّاهِرُ، وَوُلَاتُهُمْ عَلَى كُلِّ ذَلِكَ لَا يُجَاهِرُونَ بِالْبَرَاءَةِ مِنْ الْإِسْلَامِ، بَلْ إِلَى الْإِسْلَامِ يَنْتَمُونَ، وَإِنْ كَانُوا فِي حَقِيقَةِ أَمْرِهِمْ كُفَّارًا. وَأَمَّا مَنْ سَكَنَ فِي أَرْضِ الْقَرَامِطَةِ مُخْتَارًا فَكَافِرُ بِلَا شَكٍّ، لِأَنَّهُمْ مُعْلِنُونَ بِالْكُفْرِ وَتَرْكِ الْإِسْلَامِ - وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ ذَلِكَ. وَأَمَّا مَنْ سَكَنَ فِي بَلَدٍ تَظْهَرُ فِيهِ بَعْضُ الْأَهْوَاءِ الْمُخْرِجَةِ إِلَى الْكُفْرِ، فَهُوَ لَيْسَ بِكَافِرٍ، لِأَنَّ اسْمَ الْإِسْلَامِ هُوَ الظَّاهِرُ هُنَالِكَ عَلَى كُلِّ حَالٍ، مِنْ التَّوْحِيدِ، وَالْإِقْرَارِ بِرِسَالَةِ مُحَمَّدٍ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - وَالْبَرَاءَةِ مِنْ كُلِّ دِينٍ غَيْرِ الْإِسْلَامِ وَإِقَامَةِ الصَّلَاةِ، وَصِيَامِ رَمَضَانَ، وَسَائِرِ الشَّرَائِعِ الَّتِي هِيَ الْإِسْلَامُ وَالْإِيمَانُ - وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. وَقَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ أَقَامَ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ يُبَيِّنُ مَا قُلْنَاهُ، وَأَنَّهُ - عَلَيْهِ السَّلَامُ - إِنَّمَا عَلَى بِذَلِكَ دَارَ الْحَرْبِ، وَإِلَّا فَقَدْ اسْتَعْمَلَ - عَلَيْهِ السَّلَامُ - عُمَّالَهُ عَلَى خَيْبَرَ، وَهُمْ كُلُّهُمْ يَهُودُ. وَإِذَا كَانَ أَهْلُ الذِّمَّةِ فِي مَدَائِنِهِمْ لَا يُمَازِجُهُمْ غَيْرُهُمْ فَلَا يُسَمَّى السَّاكِنُ فِيهِمْ - لِإِمَارَةٍ عَلَيْهِمْ، أَوْ لِحِجَارَةِ - بَيْنَهُمْ كَافِرًا ، وَلَا مُسِيئًا، بَلْ هُوَ مُسْلِمُ حَسَنٌ، وَدَارُهُمْ دَارُ إِسْلَامٍ، لَا دَارُ شِرْكٍ، لِأَنَّ الدَّارَ إِنَّمَا تُنْسَبُ لِلْغَالِبِ عَلَيْهَا، وَالْحَاكِمُ فِيهَا، وَالْمَالِكُ لَهَا. وَلَوْ أَنَّ كَافِرًا مُجَاهِرًا غَلَبَ عَلَى دَارٍ مِنْ دُورِ الْإِسْلَامِ، وَأَقَرَّ الْمُسْلِمِينَ بِهَا عَلَى حَالِهِمْ ، إِلَّا أَنَّهُ هُوَ الْمَالِكُ لَهَا الْمُنْفَرِدُ بِنَفْسِهِ فِي ضَبْطِهَا، وَهُوَ مُعْلِنٌ بِدِينٍ غَيْرِ الْإِسْلَامِ لَكَفَرَ بِالْبَقَاءِ مَعَهُ كُلُّ مَنْ عَاوَنَهُ، وَأَقَامَ مَعَهُ - وَإِنْ ادَّعَى أَنَّهُ مُسْلِمٌ - لِمَا ذَكَرْنَا.
'আর আমরা জেনেছি যে, যে ব্যক্তি “দারুল ইসলাম” থেকে বের হয়ে “দারুল কুফর”-এ চলে যাবে, সে আল্লাহ থেকে, খলিফা থেকে ও মুসলমানদের দল থেকে পলায়ন করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ হাদিস “তিনি মুশরিকদের মাঝে বসবাসরত মুসলিমের ব্যাপারে দায়মুক্ত।” বিষয়টিকে স্পষ্ট করে দেয়। আর তিনি কেবল কাফির থেকেই দায়মুক্ত ও সম্পর্কহীন হতে পারেন (কোনো মুসলমান থেকে নয়)। আল্লাহ তাআলা বলেন, “ইমানদার পুরুষরা ও ইমানদার নারীরা একে অপরের সুহৃদ।” [সুরা আত-তাওবা : ৭১] সুতরাং এ থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নিকটবর্তী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্বেচ্ছায় “দারুল কুফর”-এ যোদ্ধা হিসেবে চলে যায়, সে তার এই অপরাধের কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। তার ওপর মুরতাদের সব হুকুম প্রযোজ্য হবে। যেমন : গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে তাকে হত্যা করা, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মুসলমান থেকে দায়িত্বমুক্তির ঘোষণা করেননি। (অথচ পূর্বের হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, মুশরিকদের মাঝে বসবাসকারী ব্যক্তি থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায়মুক্ত ও সম্পর্কহীন। অতএব, প্রমাণ হলো যে, “দারুল হারব”-এ চলে যাওয়া ব্যক্তি পূর্বে মুসলিম থাকলেও ওখানে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সম্পর্কহীন হওয়ায় মুরতাদ হয়ে গিয়েছে।) আর যে ব্যক্তি নিজের ওপর জুলুমের আশঙ্কায় কোনো “দারুল হারব”-এ পলায়ন করে, আর সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করে না, তাদের বিপরীতে কাফিরদের সাহায্যও করে না এবং মুসলমানদের মধ্যে এমন কাউকে পায় না, যে তাকে আশ্রয় দেবে, তাহলে এতে তার কোনো অসুবিধা নেই। কেননা, সে অপারগ ও বাধ্য। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইমাম জুহরি রহ. এ সংকল্প করেছিলেন যে, খলিফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক মারা গেলে তিনি রোমে চলে যাবেন। কেননা, অলিদ বিন ইয়াজিদ ক্ষমতা পেলে তাঁকে হত্যা করার মান্নত করেছিল। আর হিশামের পর সেই ছিল (নির্ধারিত) খলিফা। অতএব যার অবস্থা এমন হবে, তাকে মাজুর ও ক্ষমাযোগ্য ধরা হবে। তেমনই যেসব মুসলমান ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, তুরস্ক, সুদান, ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রে বসবাস করে, সে যদি বার্ধক্য, দারিদ্র্য, অসুস্থতা বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির কারণে চলে আসতে সক্ষম না হয়, তাকে মাজুর হিসাবে গণ্য করা হবে। সে যদি সেখানে কাফিরদের খিদমত, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে মদদ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাহলে সেও কাফির বলে গণ্য হবে। আর যদি সে “দারুল হারব”-এ দুনিয়া উপার্জনের উদ্দেশ্যে আসে এবং তাদের কাছে জিম্মির মতো হয়ে থাকে; অথচ সে মুসলিম সমাজ বা দেশে চলে আসতে সক্ষম, তাহলে সে কুফর থেকে দূরে নয় এবং আমরা তার কোনো ওজর আছে বলে মনে করি না। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করছি। তবে কুফরকারী শাসক তথা সীমালঙ্ঘনকারী ও এ জাতীয় শাসকদের আনুগত্যে যারা বসবাস করবে, তারা তাদের (কাফিরদের কুফরি রাষ্ট্রে বসবাসকারীদের) মতো নয়। কেননা, মিশর, কাইরাওয়ান প্রমুখ অঞ্চলে ইসলামই বিজয়ী এবং সবকিছুর পরও এসব দেশের শাসকরা প্রকাশ্যে ইসলাম থেকে বারাআতের (দায়মুক্তির) ঘোষণা দেয়নি; বরং ইসলামের সাথেই সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে; যদিও তাদের কর্মের বাস্তবতায় তারা কাফির। তবে যারা স্বেচ্ছায় কারামতিদের (শিয়াদের মধ্যে অত্যন্ত উগ্র ও নিকৃষ্ট একটি দলের নাম কারামতি। এদের নেতা আবু তাহির কারামতি সে-ই নরাধম, যে ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় আক্রমণ করে এবং অসংখ্য হাজিদের হত্যা করে হাজরে আসওয়াদ পাথর চুরি করে নিয়ে যায়। প্রায় বাইশ বছর পর তা পুনরায় যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়।) দেশে বসবাস করবে, তারা নিঃসন্দেহে কাফির। কেননা, তারা প্রকাশ্যে কুফর ও ইসলাম পরিত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহর কাছে আমরা এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আর যে ব্যক্তি এমন দেশে বসবাস করবে, যেখানে কুফরি পর্যায়ের কিছু প্রবৃত্তিপূজা প্রকাশ পায়, তাহলে সে (বসবাসকারী) কাফির হবে না। কেননা, সর্বাবস্থায় সেখানে তাওহিদের অস্তিত্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালাতের স্বীকৃতি, ইসলাম ভিন্ন অন্য সব ধর্ম থেকে মুক্ত ঘোষণা, সালাত প্রতিষ্ঠা, রমজানের সিয়াম পালন এবং ইসলাম ও শরিয়তের সকল বিষয় থাকার ভিত্তিতে ইসলামই বিজয়ী। আর সকল প্রশংসা সারা জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী “আমি প্রত্যেক ওই মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যে মুশরিকদের মাঝে বসবাস করে” আমাদের কথাকে স্পষ্ট করে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদ্বারা এখানে “দারুল হারব” উদ্দেশ্য নিয়েছেন। নইলে তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাইবারে তাঁর দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন; অথচ ওখানকার সব অধিবাসীই ইহুদি ছিল। যখন জিম্মিগণ তাদের শহরে থাকবে এবং তাদের সাথে অন্যরা মেলামেশা করবে না, তাহলে মুসলামানদের কর্তৃত্ব ও পারস্পরিক ব্যবসায়িক লেনদেনের কারণে তথায় বসবাসকারী (মুসলিম) ব্যক্তিকে কাফিরও বলা যাবে না, গুনাহগারও বলা যাবে না; বরং সে একজন উত্তম মুসলমান। তাদের বসবাসের স্থানকে “দারুল ইসলাম” বলা হবে, “দারুশ শিরক” নয়। কেননা, কোনো দেশের বিজয়ী, শাসক ও মালিকের ভিত্তিতেই (“দারুল ইসলাম” বা “দারুল হারব” বলে) দেশের নাম নির্ধারিত হয়। কোনো প্রকাশ্য কাফির যদি “দারুল ইসলাম”-এর কোনো এলাকা দখল করে নেয় এবং মুসলমানদেরকে তাদের আপন অবস্থায় বহাল রাখে, সে উক্ত এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি বনে বসে এবং নিজেকে অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করে, তাহলে তাতে অবস্থানকারী যে-ই তাকে সাহায্য করবে এবং তার সাথে থাকবে, সে কাফির হিসেবে গণ্য হবে; যদিও সে (অবস্থানকারী নাগরিক) নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করুক।' (আল-মুহাল্লা, ইবনু হাজাম : ১২/১২৫-১২৬, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)
📄 জিম্মি মুআহিদ ও মুসতা'মিন গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পরিভাষা
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের তিনটি শব্দের অর্থ বুঝে রাখা উচিত। এক : জিম্মি। জিম্মি বলা হয় এমন কাফিরকে, যে 'দারুল ইসলাম'-এ জিজিয়া দিয়ে মুসলমানদের মতোই নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করে। দুই : মুআহিদ বা চুক্তিবদ্ধ। চুক্তিবদ্ধ বলা হয় এমন কাফিরকে, যে তার নিজ দেশ 'দারুল হারব'-এ বসবাস করে, কিন্তু তার দেশের সাথে খলিফার চুক্তি হয়েছে যে, তারাও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না, আর মুসলিমরাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। তিন : মুসতা'মিন বা নিরাপত্তাপ্রার্থী। মুসতা'মিন বলা হয় এমন কাফিরকে, যার দেশের সাথে মুসলমানদের কোনো চুক্তি নেই। কিন্তু সে খলিফা বা তার কোনো প্রতিনিধির কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিরাপত্তা নিয়ে 'দারুল ইসলাম'-এ প্রবেশ করেছে; ব্যবসা করা কিংবা দ্বীন শেখা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে।
মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা-তে বলা হয়েছে :
أَهْل الذِّمَّةِ هُمُ الْكُفَّارُ الَّذِينَ أقِرُّوا فِي دَارِ الإِسْلَامِ عَلَى كُفْرِهِمْ بِالْتِزَامِ الْجِزْيَةِ وَنُفُوذِ أَحْكَامِ الإِسْلاَمِ فِيهِمْ... أَهْل الْعَهْدِ: هُمُ الَّذِينَ صَالَحَهُمْ إِمَامُ الْمُسْلِمِينَ عَلَى إِنْهَاءِ الْحَرْبِ مُدَّةً مَعْلُومَةً لِمَصْلَحَةٍ يَرَاهَا، وَالْمُعَاهَدُ: مِنَ الْعَهْدِ: وَهُوَ الصُّلْحُ الْمُؤَقَّتُ، وَيُسَمَّى الْهُدْنَةَ وَالْمُهَادَنَةَ وَالْمُعَاهَدَةَ وَالْمُسَالَمَةَ وَالْمُوَادَعَةَ... الْمُسْتَأْمَنُ فِي الأصْل : الطَّالِبُ لِلأَمَانِ، وَهُوَ الْكَافِرُ يَدْخُل دَارَ الإسْلامِ بِأَمَانٍ، أَوِ الْمُسْلِمُ إِذَا دَخَل دَارَ الْكُفَّارِ بِأَمَانٍ.
'জিম্মি বলা হয় ওই সব কাফিরকে, যাদেরকে জিজিয়া দেওয়া ও তাদের মাঝে ইসলামি বিধিবিধান প্রয়োগ করার শর্তে কাফির অবস্থায় “দারুল ইসলাম”-এ বসবাস করতে দেওয়া হয়। ... মুআহিদ বা চুক্তিবদ্ধ বলা হয় ওই সব কাফিরকে, যাদের সাথে মুসলমানদের খলিফা কোনো কল্যাণকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছে। “মুআহিদ” শব্দটি “আহদ” শব্দ থেকে নির্গত। এর অর্থ সাময়িক চুক্তি। এটাকে হুদনা, মুহাদানা, মুআহাদা, মুসালামা ও মুওয়াদাআও বলা হয়। ... মুসতা'মিন প্রকৃত অর্থে নিরাপত্তাপ্রার্থী। এটা হলো ওই কাফির, যে নিরাপত্তা নিয়ে দারুল ইসলামে প্রবেশ করেছে কিংবা মুসলিম যখন নিরাপত্তা নিয়ে দারুল হারবে প্রবেশ করবে।' (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : ৭/১০৪-১০৫, প্রকাশনী : অজারাতুল আওকাফ, কুয়েত)
এ তিন ধরনের কাফিরই মুসলিমদের হাতে নিরাপদ। চুক্তি ও সবকিছু ঠিক থাকা পর্যন্ত তাদেরকে হত্যা করা যাবে না, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা যাবে না এবং তাদের ইজ্জতের ওপর কোনোরূপ আঘাত হানা যাবে না। এ তিন প্রকারের বাইরে যত কাফির আছে, সব অনিরাপদ। তাদের দুনিয়াতেও কোনো নিরাপত্তা নেই, আর আখিরাতে তো নেই-ই। দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জগতে তারা লাঞ্ছিত।
বুঝা গেল, পুরো পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কেবল তিন শ্রেণির লোকই মুসলমানদের হাতে নিরাপদ। এক : জিম্মি। দুই : সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ। তিন : নিরাপত্তাপ্রার্থী। পৃথিবীতে এ তিনটি শ্রেণি ছাড়া আর কোনো কাফিরই মুসলমানদের হাতে নিরাপদ নয়। তবে এ মাসআলার ভিত্তিতে যেখানে-সেখানে মারামারি বা যুদ্ধ শুরু করে দেওয়াও কিন্তু জায়িজ হবে না; যেমনটি অনেক বোকা লোক ভেবে থাকে। বরং তাদের সাথে যুদ্ধ করা, বন্দী করা ও সম্পদ লুণ্ঠন করা এগুলো আলাদা মাসআলা, যার জন্য বিস্তারিত বিধান ও নীতিমালা রয়েছে। দুটোকে এক মনে করে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। আমাদের আলোচনা কেবল পৃথিবীতে কোন কোন কাফির নিরাপদ, তাদের লিস্ট দেওয়া। এর বাইরে যারা অনিরাপদ কাফির, তাদের জন্য ভিন্নভাবে বিধান জেনে সে অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। মনে চাইলেই যেখানে-সেখানে ইচ্ছেমতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।
📄 বর্তমান বিশ্বে হারবি ও অ-হারবি কাফিরদের অস্তিত্ব
কোনো সন্দেহ নেই যে, কাফিরদের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে ছাড় ও শিথিলতা রয়েছে, তবে তা সব কাফিরের জন্য প্রযোজ্য নয়। কুরআন-হাদিসে কাফিরদের সাথে যত নম্রতার কথা পাওয়া যায় কিংবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিদের জীবনীতে যে উদারতা, নমনীয়তা ও আদর্শের দেখা মেলে, তার প্রায় সবই অ-হারবি তথা জিম্মি বা চুক্তিবদ্ধ বা নিরাপত্তাপ্রার্থী কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। আর বলার অবকাশ রাখে না যে, হারবি ও অ-হারবি উভয় শ্রেণির কাফিরদের বিধান এক নয়। পার্থিব বিষয়াদিতে উভয়ের বিধানের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ের কাফিররা হারবি নাকি অ-হারবি? বর্তমান সময়ে জাতিসংঘ বা অন্যান্য কুফফার গোষ্ঠীর সাথে কৃত চুক্তি কি শরয়ি চুক্তি বলে বিবেচিত হবে?
প্রথমত, আমাদের জানা থাকা দরকার যে, হারবি কাদেরকে বলা হয়। অনেকের ধারণা, হারবি তাকেই বলে, যে মুসলমানদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। 'হারব' শব্দের একটি অর্থ হলো যুদ্ধ। এ থেকেই মূলত অনেকের এ সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এর যে আরও অর্থ আছে এবং সে অর্থ অনুসারেই হারবিকে হারবি বলা হয়, তা অনেকেরই জানা নেই। 'হারব' শব্দের অর্থ যেমন 'যুদ্ধ', তেমনই এর আরেকটি অর্থ হলো, 'দূরত্ব ও বিদ্বেষ'। এজন্য ফুকাহায়ে কিরাম কেবল যুদ্ধরত কাফিরকেই হারবি বলেন না; বরং আরও ব্যাপক অর্থে তাঁরা 'হারবি' শব্দটাকে ব্যবহার করে থাকেন।
ইমাম আবুল ফজল বা'লি রহ. বলেন :
الحَرْبي منسُوبٌ إلى الحرب، وهو القِتَالُ، ودار الحرب، أي: دار التباعد والبغضاء، فالحربي بالاعتبار الثاني.
“হারবি” শব্দটা “হারব”-এর দিকে সম্বন্ধীয়। “হারব” অর্থ যুদ্ধ। আর “দারুল হারব” অর্থ পারস্পরিক দূরত্ব ও বিদ্বেষের রাষ্ট্র। “হারবি”-কে এই দ্বিতীয় অর্থ তথা দূরত্ব ও বিদ্বেষের বিচারেই “হারবি” বলা হয়।' (আল-মুতলি' আলা আলফাজিল মুকনি' : পৃ. নং ২৬৯, প্রকাশনী : মাকতাবাতুস সাওয়াদি)
আর শরয়ি পরিভাষায় যে সকল কাফির-মুশরিক মুসলমানদের খলিফার সাথে জিম্মাচুক্তি, সন্ধিচুক্তি বা নিরাপত্তাচুক্তিতে আবদ্ধ নয়, তাদেরকে হারবি বলা হয়। যেমন 'আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা'-তে এদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে :
أَهْل الْحَرْبِ أَوِ الْحَرْبِيُّونَ: هُمْ غَيْرُ الْمُسْلِمِينَ الَّذِينَ لَمْ يَدْخُلُوا فِي عَقْدِ الذُّمَّةِ، وَلاَ يَتَمَتَّعُونَ بِأَمَانِ الْمُسْلِمِينَ وَلَا عَهْدِهِمْ
'হারবিগণ হলো ওই সব অমুসলিম, যারা কোনো জিম্মাচুক্তিতে প্রবেশ করেনি আর না মুসলমানদের কোনো সন্ধি বা নিরাপত্তাচুক্তির মাধ্যমে সুযোগ লাভ করেছে।' (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : ৭/১০৪, প্রকাশনী : অজারাতুল আওকাফ, কুয়েত)
বর্তমান বিশ্বে যেহেতু মুসলিমদের না আছে কোনো খিলাফাব্যবস্থা আর না আছে খলিফা, তাই মুসলমানদের খলিফার সাথে কোনো রাষ্ট্রের জিম্মাচুক্তি, সন্ধিচুক্তি বা নিরাপত্তাচুক্তিও পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই বর্তমান বিশ্বের কাফিররা সবাই হারবি। শরয়ি দৃষ্টিতে এরা সবাই হারবি কাফির বলেই বিবেচিত হবে এবং হারবি কাফিরদের জন্য যে বিধিবিধান আছে, তা তাদের ওপর প্রযোজ্য হবে। মুসলিম বিশ্বে খিলাফাহব্যবস্থা না থাকা ও তা পুনরুদ্ধার করতে না পারাটা যদিও বর্তমান মুসলমানদের একটি ব্যর্থতা, কিন্তু এর কারণে কাফিরদেরকে আমরা অ-হারবিও ঘোষণা করতে পারি না। তাছাড়াও মুসলমানদের খিলাফাহব্যবস্থা ধ্বংস ও তা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়ার পেছনে বর্তমান বিশ্বের তাগুতগোষ্ঠীর সরাসরি হাত রয়েছে, যা সঠিক ইতিহাস পড়ুয়া কারও অজানা নয়। মোটকথা যাই হোক, বর্তমান বিশ্বের কাফিররা যে শরয়ি দৃষ্টিতে হারবি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কাফিরকে অ-হারবি ঘোষণা দিয়ে তাদের জন্য অ-হারবি কাফিরদের বিধান প্রযোজ্য করাটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি বা চরম অজ্ঞতা।
বাকি থেকে যায়, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক চুক্তির কী বিধান? তো এক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো, এসব চুক্তির নিয়ামবলি ও শর্তসমূহের মূল উদ্ভাবক কুফফার গোষ্ঠি। তাদের সুবিধা ও স্বার্থের অনুকূলেই সব তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলো, যথা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সবগুলো হলো বিশ্বতাগুতের মূল। প্রকৃত অর্থে এরা যা চায়, সেটাই জাতিসংঘের নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। সচেতনদের অজানা নয় যে, বিশ্বে কাফিরদের একাধিক ব্লক থাকলেও ইসলাম বিরোধিতায় তারা এক মেরুতে চলে আসে। তাই তাদের এসব চুক্তি ও নীতিমালার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তৃতীয়ত, এসব চুক্তির সাথে মুসলিমদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটাকে যদি শরয়ি অর্থে চুক্তিও বলা হয়, তাহলে বস্তুত এসব চুক্তি কাফির ও মুরতাদদের মধ্যে হয়েছে, মুসলিম আমিরের সাথে নয়। স্মর্তব্য যে, কোনো দেশের অধিকাংশ নাগরিক মুসলিম হওয়ার সত্ত্বেও সে দেশে কুফরি সংবিধান চালু থাকলে এবং সরকার সেটাকে উৎখাত না করে যথারীতি বহাল ও শক্তিশালী করলে সে সরকার মুরতাদ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটাই ইসলামের শাশ্বত বিধান; কেউ মানুক চাই না মানুক। মুসলিম দেশ আর ইসলামি দেশ এক জিনিস নয়। অধিকাংশ মুসলিম নাগরিকের ভিত্তিতে কোনো দেশকে মুসলিম দেশ বলা গেলেও যতক্ষণ না সে দেশের সংবিধান ও আইন-কানুন ইসলামি হবে ততক্ষণ সে দেশকে ইসলামি দেশ বলা যাবে না। অনেকে এ পার্থক্য করতে না পেরে দুটিকে একসাথে গুলিয়ে ফেলে। চতুর্থত, যদি তারা ইসলামি নীতিমালার আলোকেও চুক্তি ও শর্তাবলি আরোপ করত এবং সবাই সে চুক্তিতে একমত হতো, তবুও বর্তমানে সে চুক্তি বহাল থাকত না। কেননা, অসংখ্যবার তারা নিজেরাই নিজেদের বানানো সেসব চুক্তি ও নিয়ম ভঙ্গ করেছে, যা আজ পুরো বিশ্ববাসীর সামনে সূর্যের আলোর ন্যায় সুস্পষ্ট। দেখুন, হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তি কাফিররা একবার ভঙ্গ করা মাত্রই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা আক্রমণ করতে কিন্তু আর কোনো কিছুর অপেক্ষা করেননি। বস্তুত শক্তিই আজ সবকিছুর মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শক্তিই আজ সকল নীতির মূল হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই জুলুম ও শক্তির দাপটে এসব নীতিমালা ও চুক্তির কথা সবই গৌণ।
মোটকথা, জাতিসংঘের এসব ঠুনকো নীতি ও ইসলাম-বিদ্বেষী শর্তাবলী যে ইসলামের দৃষ্টিতে একেবারেই মূল্যহীন, তা বুঝতে বড় ফকিহ বা মুজতাহিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই বর্তমানের যেসব অসচেতন আলিম কিংবা মডারেট মুসলিম জাতিসংঘের নাম দিয়ে আমাদেরকে চুক্তি, নিরাপত্তা ও শান্তির বাণী শোনায়, তাদের অনুরোধ করব, ভালো করে আগে জাতিসংঘকে জানুন, এর প্রেক্ষাপট ও সঠিক ইতিহাস পড়ুন, ইসলামের ক্ষতিসাধন ও মুসলিমদের খিলাফাব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় তার জঘন্য সব পদক্ষেপ ও কুকীর্তি দেখুন, তারপর এ ব্যাপারে ফয়সালা করুন। জাতিসংঘের ভয়ংকর নীতিমালা ও গোপন উদ্দেশ্য জানলে চুক্তির নাম নেওয়া তো দূরে থাক, এর নাম নিতেও কলিজা কেঁপে উঠত এবং অন্তরে সৃষ্টি হতো প্রচণ্ড ঘৃণা। তাই বলি কি, জাতিসংঘের নামে চুক্তির অজুহাত তুলে মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প শোনানোর কোনোই প্রয়োজন নেই! তার চাইতে সে সময়টুকু বিশ্বরাজনীতি, তাদের মোড়লগীরি ও ইসলামের বিরুদ্ধে তাগুতদের বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করুন। আশা করি, বিষয়টি নিজেই বুঝতে পারবেন।
📄 গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বিধান
বর্তমান মুসলমানদের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হলো, কোনো বিষয়ে ভালো ধারণা না রাখা সত্ত্বেও অনেকে চূড়ান্ত মত বা সিদ্ধান্ত বলে দেয়। দুয়েকটি হাদিস বা লোকমুখে শোনা ইসলামের ব্যাপক কোনো মূলনীতিকে সামনে রেখেই স্পর্শকাতর বিষয়েও হুটহাট মন্তব্য করে বসে! শুধু তাই-ই নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলামের ব্যাপারে সামান্য নলেজের ওপর ভিত্তি করে জেনারেল লেভেলের একজন লোক প্রাজ্ঞ ও ভালো আলিমের সাথে তর্কে করছে! অথচ তার না জানা আছে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান, আর না সে বুঝতে পারবে শরিয়তের মূলনীতি ও স্পর্শকাতর মাসআলাগুলোর সূক্ষ্মতা। তবুও সে নিজের অপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ঝগড়া করে যায়। যেমন, ইসলামের উদারতা নিয়ে একদল উদারমনা লোকের সে কী মানবতার বহিঃপ্রকাশ! দেখে মনে হয়, দরদে সে ফেটে পড়ছে! বিশেষত আমাদের মূর্খ সমাজে কাফিরদের ক্ষেত্রে এসব উদারমনাদের বেশ কদর রয়েছে! কথা ও ভাবে প্রকাশ করে যে, এরাই সত্যিকার ইসলাম বহন করছে, আর এর বিপরীতে যারা স্পষ্ট দলিলের আলোকে কোথাও কঠোর এবং কোথাও নরম হওয়ার কথা বলে, তারা হয়ে যায় উগ্র ও ইসলামের বদনামকারী।
এমনই আরেকটি স্পর্শকাতর মাসআলা হলো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বিধান। আফসোস যে, এ মাসআলায় শুধু সাধারণ লোকদেরই নয়, অনেক আলিমেরও প্রাথমিক ধারণাটুকু নেই। বেশিরভাগ মানুষের ধারণা, গণতন্ত্র ইসলাম-অনুমোদিত একটি পদ্ধতি। আর এজন্যই অধুনা কালে বিভিন্ন দেশে 'ইসলামি গণতন্ত্র' নামে নিকৃষ্ট একটি পরিভাষার কথা শোনা যায়। অনেক আলিমকেও অজ্ঞাতসারে এ পরিভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। অথচ এটা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত, বাজে ও পরিত্যাক্ত একটি পরিভাষা, যার সাথে ইসলামের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। বুঝবানদের কেউ কেউ অবশ্য এটাকে হারাম বলতে চান। যার অর্থ দাঁড়ায়, এটা গুনাহের কাজ হলেও এতে ইমান নষ্ট হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটা হালাল বা বৈধ তো দূরে থাক, হারামের স্তরেরও নয়। বরং এটা হলো স্পষ্ট কুফরি ও শিরকি একটি মতবাদ, যার রচয়িতা, সংস্কারক ও ব্যবহারকারী সামগ্রিকভাবে সবাই কাফির। অবশ্য মুসলিম দাবিদারদের মধ্য হতে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাফির বলতে হলে দেখতে হবে যে, তার মধ্যে 'মাওয়ানিউত তাকফির' (কাফির বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক কারণসমূহ) হতে কোনোটি পাওয়া যায় কিনা। যদি পাওয়া যায় তাহলে তো তাকে মাজুর ধরা হবে এবং কুফরি থাকা সত্ত্বেও তাকে কাফির বলা থেকে বিরত থাকতে হবে, অন্যথায় সে মুরতাদ বা ইসলামত্যাগী বলে বিবেচিত হবে। এ ব্যাপারে আমরা এখানে সামান্য আলোকপাত করছি, যাতে সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরি মতবাদ।
গণতন্ত্র সম্পর্কে শরয়ি হুকুম জানার পূর্বে প্রথমে এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় জানা জরুরি। গণতন্ত্রের ইংরেজি হলো, Democracy। শব্দটি মূলত গ্রীকভাষায় Demos এবং kratía শব্দ দু'টির সমন্বয়ে গঠিত। Demos অর্থ জনগণ আর kratía অর্থ শাসন। তাহলে Democracy এর আভিধানিক অর্থ দাঁড়াচ্ছে, জনগণের শাসন।
পারিভাষিক অর্থ :
ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকায় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে :
Democratic System of Government : A system of government based on the principle of majority dicision-making.
'সরকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি: সংখ্যাগরিষ্ঠ মত গ্রহণের নীতির উপর ভিত্তি করে সরকার ব্যবস্থা।' (এনকার্টা, ২০০৯, ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ২০১২)
আধুনিক গণতন্ত্রের রূপদাতা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন গণতান্ত্রিক সরকারকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন :
Government of the people, by the people, for the people.
'জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের সরকার।' (প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, দ্যা গেটিসবার্গ আড্রেস, নভেম্বর, ১৯, ১৮৬৩)
উইকিপিডিয়ায় গণতন্ত্রের বিবরণ এভাবে দেওয়া হয়েছে :
'গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ণ ও তৈরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে।' (https:// bn.wikipedia.org/wiki/গণতন্ত্র)
সুতরাং গনতন্ত্র বলতে জনগনের স্বার্থে জনগনের দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থাকে বুঝানো হয়। তারা নিজেরাই নিজেদের জীবনব্যবস্থা তৈরি করে এবং তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজেদের সার্বভৌমিক ক্ষমতার বলে আইন রচনা করে। এভাবে জনগণ নিজেদের ক্ষমতার অনুশীলন করে এবং নিজেরাই নিজেদের পরিচালনা করে। গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে আইন প্রনয়ণ এবং শাসক নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির সমান অধিকার রয়েছে।
জনগণই এ ব্যবস্থায় বিধান প্রণয়ন করে এবং তারা নিজেদের তৈরি কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কারও কাছে জবাবদিহি করে না। জনগণই সার্বভৌমত্ব ও সকল ক্ষমতা ধারণ করে এবং জনগণই তাদের সার্বভৌমত্ব চর্চা করতে পারে। তাই বলা যায়, জনগণই এ ব্যবস্থার প্রভু। আর জীবন থেকে ধর্মকে আলাদা করাই হচ্ছে গনতন্ত্রের মূল বিশ্বাস এবং এ বিশ্বাসই গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। এ বিশ্বাস থেকেই গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। ইসলাম এ বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামি আকিদার ভিত্তি হচ্ছে, জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল বিষয় আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে এবং আল্লাহ তাআলা যে ব্যবস্থা দিয়েছেন সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। পক্ষান্তরে গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি ব্যবস্থা, যার সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কোনো সম্পর্ক নেই। নিজেদের প্রবৃত্তি ও খায়েশ পূরণই এ তন্ত্রের মূলভিত্তি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিধি-বিধান নাজিল করেছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে আল্লাহর বিধি-বিধানকে অস্বীকার করা হয়। তাই এটি মূলত আল্লাহর বিধানকে অস্বীকারকারীদের ব্যবস্থা বা এককথায় কুফরি ব্যবস্থা। সুতরাং শরিয়ার বিপরীতে তাদের রচিত ও আবিষ্কৃত কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করা যাবে না; বরং সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা এ সকল কিছুকে বর্জন করার কঠোর নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন :
يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ
'তারা বিচার-ফয়সালার জন্য তাগুতের কাছে যেতে চায়; অথচ তাগুতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে।' (সুরা আন-নিসা : ৬০)
যে আকিদা থেকে এ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত এবং যে চিন্তা-ধারণার সে জন্ম দেয় তা সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের আকিদা বা বিশ্বাসের বিপরীত। গনতন্ত্রের আকিদা থেকে নিম্নোক্ত দু'টি ধারণার উদ্ভব হয়। এক. সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য। দুই. জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।
উপরিউক্ত দু'টি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপের দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ তাদের ব্যবস্থা প্রণয়ন করে থাকে। এর দ্বারা পাদরিদের কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে জনগণের হাতে তা সমর্পণ করা হয়। পাদরি ও পোপদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফসল হিসেবে ধর্মীয় আইন-কানুনের অবসান করা হয়। ফলে সার্বভৌমত্ব হলো জনগণের জন্য এবং জনগণই হলো সকল ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ দু'টি ধারণাই বাস্তবায়ন করা হলো। ফলে জনগণই হয়ে গেল সার্বভৌমত্বের প্রতীক ও সকল ক্ষমতার উৎস।
পক্ষান্তরে ইসলামে সার্বভৌমিক ক্ষমতা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য। গনতন্ত্রের সাথে ইসলামের কিছু শাখাগত বিষয় বাহ্যিকভাবে এক মনে হলেও বাস্তবে এই দু'টি দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটি মেনে নিলে অপরটি আপনাপনিই বাতিল হয়ে যেতে বাধ্য। কোনো অবস্থাতেই উভয়টির সংমিশ্রণ হতে পারে না। হয় ইসলাম থাকবে, নচেৎ গণতন্ত্র।
আল্লাহ তাআলা সকল মাখলুকের স্রষ্টা। তাই তাদের জন্য কল্যাণ ও উপযোগী বিধিবিধান তিনিই ভালো জানেন। মানবসত্ত্বা সাধারণত জ্ঞানগরিমা, স্বভাব-চরিত্র ও অভ্যাসের দিক দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির হয়ে থাকে। তারা অন্যদের কল্যাণকর বিষয়াদি সম্পর্কে জানা তো দূরে থাক; স্বয়ং নিজেদের কল্যাণকর বিষয় সম্বন্ধেই অজ্ঞ। এজন্য যে সমাজ ও দেশে জনগণই সংবিধান ও আইন-কানুন প্রণয়ন করে সে দেশে দুর্নীতি, চারিত্রিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় একের পর এক পরিদৃষ্ট হতেই থাকে।
সাথে এটাও লক্ষণীয় যে, অনেক দেশে এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাস্তবতাহীন এক বাহ্যিক অবয়ব ও শুধুই শ্লোগানে পরিণত হয়েছে, যার দ্বারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়। বাস্তবিক অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করে কেবল ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের সাংসদরা। জনগণ এদের আদেশের সামনে নত ও পরাজিত থাকে। এ ব্যাপারে এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে যে, গণতন্ত্রের কোনো আইন যখন রাষ্ট্রের কর্ণধারদের অভিলাষের বিপরীত হয় তখন তাকে তারা পদদলিত করে পিষ্ট করে। নির্বাচনী জালিয়াতি, মানুষের স্বাধীনতাহরণ, সত্য ও ন্যায় প্রকাশকারীদের মুখবন্ধকরণের ঘটনাগুলো এমন কিছু তিক্ত বাস্তবতা, যা বর্তমান সময়ের ছোট-বড় কমবেশি সবাই জানে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইবাদত ও আনুগত্য কিংবা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিরকের নতুন একটি প্রকার। যেহেতু এতে মহান সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্ব ও নিঃশর্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অধিকারকে বাতিল করে তা মানুষের অধিকার বলে সাব্যস্ত করা হয়।