📘 দারুল হারব ও দারুল ইসলাম > 📄 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর শরয়ি ভিত্তি

📄 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর শরয়ি ভিত্তি


বর্তমানে কিছু লোক দেখা যায়, যারা 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' পরিভাষা দুটিকে একেবারেই গুরুত্বহীন ও হালকা মনে করে থাকে। তাদের ধারণা, এসব যেহেতু ইজতিহাদি বিষয়, তাই 'দার'-কে দু'ভাগে সীমাবদ্ধ রাখা আবশ্যকীয় কিছু নয়; বরং এতে প্রকার আরও কমবেশ বা পরিবর্তন হতে পারে। অথচ এ পরিভাষা ও তার প্রকারভেদ সুদীর্ঘ বারো শতাব্দীকাল ধরে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে নিরবচ্ছিন্নধারায় চলে আসছে। আর তাই এটাকে একপ্রকার ইজমা দাবি করলেও অত্যুক্তি হবে না বোধহয়।
বস্তুত 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর শরয়ি উৎসমূল জানা থাকলে এসব পরিভাষা পরিবর্তন করে নতুন ইজতিহাদের দাবি করার দুঃসাহস কেউ দেখাত না। কেননা, হাদিস ও আসারের একাধিক বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, 'দার' সাধারণত দু'প্রকারেরই হয়ে থাকে। বিভিন্ন বর্ণনায় স্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতে এ প্রকারভেদের দলিল পাওয়া যায়। আমরা সেসব বর্ণনা থেকে এখানে কতিপয় বর্ণনা তুলে ধরছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাভিযানকালে একজন সেনাপতিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন :
وَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ، فَادْعُهُمْ إِلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ - أَوْ خِلَالٍ - فَأَيَّتُهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، فَإِنْ أَجَابُوكَ، فَاقْبَلْ مِنْهُمْ، وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى التَّحَوُّلِ مِنْ دَارِهِمْ إِلَى دَارِ الْمُهَاجِرِينَ
'আর যখন তোমার শত্রু মুশরিকদের সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে আহবান করবে। তারা এগুলো থেকে যেটাই গ্রহন করুক, তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকবে। (প্রথমে) তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করবে। যদি তারা তোমার এ আহবানে সাড়া দেয়, তবে তুমি তাদের পক্ষ থেকে তা মেনে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে। এরপর তুমি তাদেরকে তাদের 'দার' (এলাকা বা দেশ) থেকে মুহাজিরদের 'দার'-এর দিকে চলে যাওয়ার আহবান জানাবে।' (সহিহু মুসলিম : ৩/১৩৫৭, হা. নং ১৭৩১, প্রকাশনী : দারু إহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
এ হাদিসে 'মুশরিকদের দার' আর 'মুহাজিরদের দার' বলে স্পষ্টত 'দার' দুটি হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মুশরিকদের 'দার'-কে বলা হয় 'দারুশ শিরক' বা 'দারুল হারব'। আর মুহাজিরদের 'দার'-কে বলা হয় 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল ইসলাম'।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
لَا يَقْبَلُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ مُشْرِكٍ بَعْدَمَا أَسْلَمَ عَمَلًا، أَوْ يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ
'কোনো মুশরিক ইসলাম গ্রহণের পরও আল্লাহ তার কোনো আমল কবুল করেন না, যতক্ষণ না সে মুশরিকদের (এলাকা) ত্যাগ করে মুসলিমদের কাছে (এলাকাতে) চলে আসে।' (সুনানুন নাসায়ি : ৫/৮২, হা. নং ২৫৬৮, প্রকাশনী : মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়া, হালব)
এ হাদিসে 'মুশরিকদের (এলাকা) ত্যাগ করে মুসলিমদের কাছে (এলাকাতে) চলে আসে' উক্তিটির মাঝে 'দার' দুটি হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি হলো মুশরিকদের ভূমি, যাকে 'দারুল হারব' বলা হয়, আর অপরটি হলো মুসলিমদের ভূমি, যাকে দারুল ইসলাম' বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন :
عَقْرُ دَارِ الْإِسْلَامِ بِالشَّامِ
'দারুল ইসলামের মূলভূমি হলো শামে।' (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : ৭/৫৩, হা. নং ৬৩৫৯, প্রকাশনী : মাকতাবাতু ইবনি তাইমিয়া, কায়রো)
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন :
وَكَانَ مِنَ الْأَنْصَارِ مُهَاجِرُونَ لِأَنَّ الْمَدِينَةَ كَانَتْ دَارَ شِرْكِ، فَجَاءُوا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةَ الْعَقَبَةِ
'আর আনসারিদের মাঝেও কতিপয় মুহাজির ছিলেন। কেননা, (হিজরতের পূর্বে) মদিনা ছিল “দারুশ শিরক”। অতঃপর তথা হতে কতিপয় সাহাবি আকাবার রাতে (হিজরত করে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে চলে আসেন।' (সুনানুন নাসায়ি: ৭/১৪৪, হা. নং ৪১৬৬, প্রকাশনী: মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়া, হালব)
খালিদ বিন অলিদ রা. খলিফাতুল মুসলিমিনের পক্ষ থেকে হিরায় পাঠানো চিঠিতে লিখেন :
وَجَعَلْتُ لَهُمْ أَيُّمَا شَيْءٍ ضَعُفَ عَنِ الْعَمَلِ أَوْ أَصَابَتْهُ آفَةٌ مِنَ الْآفَاتِ أَوْ كَانَ غَنِيا فَافْتَقَرَ وَصَارَ أَهْلُ دِينِهِ يَتَصَدَّقُونَ عَلَيْهِ طَرَحْتُ جِزْيَتَهُ وَعِيلَ مِنْ بَيْتِ مَالِ الْمُسْلِمِينَ. وَعِيَالُهُ مَا أَقَامَ بِدَارِ الْهِجْرَةِ وَدَارِ الإِسْلامِ فَإِنْ خَرَجُوا إِلَى غَيْرِ دَارِ الْهِجْرَةِ وَدَارِ الإِسْلامِ؛ فَلَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ النَّفَقَةَ عَلَى عِيَالِهِمْ.
'আর আমি তাদের (জিম্মিদের) জন্য এটা নির্ধারণ করেছি যে, কোনো বৃদ্ধ যদি কাজকর্ম করতে অক্ষম হয়ে যায় অথবা কোনো বিপদে আক্রান্ত হয় অথবা সে ধনী ছিল, কিন্তু পরে দরিদ্র হয়ে গেছে এবং তার ধর্মের লোকেরা তাকে দান-সদকা করতে শুরু করে, তাহলে আমি তার জিজিয়া স্থগিত করে দেবো এবং বাইতুল মাল থেকে তার ও তার পরিবারের ভরণপোষণ দেওয়া হবে; যতক্ষণ পর্যন্ত সে “দারুল হিজরাহ” ও “দারুল ইসলাম”-এ অবস্থান করবে। যদি তারা “দারুল হিজরাহ” ও “দারুল ইসলাম” থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে মুসলমানদের ওপর তাদের পরিবারের ভরণপোষণ বহন করার কোনো দায়িত্ব নেই।' (আল-খারাজ, আবু ইউসুফ : পৃ. নং ১৫৭-১৫৮, প্রকাশনী: আল-মাকতাবাতুল আজহারিয়্যা লিতুরাস)
এসব বর্ণনা থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব’ পরিভাষা দুটি পুরোপুরি ইজতিহাদি নয়; বরং এ ব্যাপারে আলাদাভাবে নস পাওয়া যায়। এ নসগুলোতে যেমন 'দারুল ইসলাম' পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনই এটার পাশপাশি 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল মুহাজিরিন' পরিভাষাও ব্যবহৃত হয়েছে। বস্তুত এগুলো সব একই 'দার'-এর নানারকম নাম। অনুরূপ এসব বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, 'দারুল হারব'-কে 'দারুশ শিরক' ও 'দারুল মুশরিকিন'-ও বলা হয়।
মোটকথা হাদিস ও আসারে আমরা দুটি 'দার'-এর অস্তিত্ব পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাই। এক : এমন দার, যেখানে মুসলিমরা হিজরত করে। এটাকে 'দারুল হিজরাহ' বা 'দারুল ইসলাম' বলে। দুই: এমন দার, যেখান থেকে অন্য ভূমিতে হিজরত করে চলে আসতে হয়। এটাকে 'দারুল হারব' বা 'দারুশ শিরক' বলে।
এছাড়াও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাঝে এটা সর্বজনস্বীকৃত আকিদা যে, ইসলাম ও কুফরের মাঝে তৃতীয় কোনো স্তর নেই। ব্যক্তি হয়তো মুমিন হবে, নয়তো কাফির হবে। গোমরাহ মু'তাজিলারাই একমাত্র ফিরকা, যারা ইসলাম ও কুফরের মাঝে তৃতীয় একটি স্তর নির্ধারণ করেছিল। তাদের ধারণা, এমন কিছু মানুষও আছে, যারা মুমিনও নয় আবার কাফিরও নয়। কিন্তু এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, মুমিন যতই গুনাহগার হোক না কেন, সে ইমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় না। হ্যাঁ, যার থেকে স্পষ্ট কুফর বা শিরক প্রকাশ পাবে এবং তার মধ্যে তাকফিরের কোনো প্রতিবন্ধকতাও পাওয়া যাবে না, তাহলে সে পরিষ্কার কাফির। দারের বিষয়টিও ঠিক এরূপই। হয়তো দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিংবা কুফর-শিরক প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকে; চাই সেটা পূর্ণাঙ্গ হোক বা অপূর্ণাঙ্গ, সেটাকে 'দারুল ইসলাম' বলা হবে। আর যদি কুফর-শিরক প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেটাকে 'দারুল হারব' বলা হবে। এ মাসআলাটি যার কাছে যতটা স্পষ্ট, তার কাছে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব'-এর মাসআলাটিও ততটা স্পষ্ট হবে।
সুতরাং যারা মনে করে 'দারুল ইসলাম' ও 'দারুল হারব' নতুন দুটি পরিভাষা, কুরআন-হাদিসে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের এসব নস ভালো করে দেখা উচিত। আর যারা মনে করেন, এসব পরিভাষা পরিবর্তনশীল, তাদের কাছে মূলত ইসলাম ও কুফরের বৈপরীত্য এবং ব্যক্তি ও ভূমির ওপর এর প্রায়োগিক দিকটি স্পষ্ট নয়। নতুবা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন মুমিন ও কাফির হওয়ার বাইরে তৃতীয় কোনো অবস্থার কথা কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনই ভূমির ব্যাপারেও ইসলামি ও কুফরি ভিন্ন অন্য কোনো গুণে গুণান্বিত করার কথা ভাবা যায় না। ব্যক্তি যেমন হয়তো মুমিন, নয়তো কাফির; ভূমিও তেমনি হয়তো ইসলামি, নয়তো কুফরি হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00