📄 রথসচাইল্ড পরিবারের ক্ষমতা দখলের সূচনা
সং হংবিং-এর মতে, মূলত কারেন্সি ওয়ার বা মুদ্রাযুদ্ধের সূচনা ঘটে রথসচাইল্ড ইহুদি পরিবারের হাত ধরে ১৮১৫ সালের ১৮ জুনে, ঠিক 'ওয়াটারলু' যুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে। যে যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভ করে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রথসচাইল্ড পরিবারের তৃতীয় পুত্র নাথান রথসচাইল্ড ব্রিটিশদের আসন্ন জয়ের খবর আগেভাগেই জানতে পেরে এক চতুর পরিকল্পনা করে। সে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেয়, নেপোলিয়নের বাহিনী জয়লাভ করেছে! এই সংবাদ ব্রিটিশ সরকার নিজে জয়ের খবর পাওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগেই বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়!
ফলাফল? লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে এবং শেয়ারের দাম নামতে নামতে তলানিতে পৌঁছে যায়। এই সুযোগে রথসচাইল্ড পরিবার অতি সস্তায় বাজারের প্রায় সব শেয়ার কিনে ফেলে। পরে আসল জয়ের খবর প্রকাশিত হলে শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। আর সেই সময়টাতেই রথসচাইল্ড পরিবারের হাতে জমে যায় অগাধ সম্পদ ও আর্থিক ক্ষমতার লাগাম।
সং হংবিং নাথান রথসচাইল্ডের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করেছেন। ব্রিটেনের সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর রথসচাইল্ড পরিবারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর নাথান বলেছিল, ব্রিটেনের সিংহাসনে কে বসে আছে এ নিয়ে আমার আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কারণ আমরা যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থ ও সম্পদের উৎসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছি, তখন কার্যত রাজকীয় ক্ষমতাকেও আমরা বশীভূত করে ফেলেছি। কারণ অর্থের ক্ষমতা এখন আমাদের হাতে।
এই বিপুল লাভ রথসচাইল্ড পরিবারকে লন্ডনের কেবল একটি সমৃদ্ধ ব্যাংকের মালিকানা থেকে তুলে নিয়ে এমন এক সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করল, যার আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলো প্যারিস থেকে শুরু করে ভিয়েনা, নাপোলি এবং শেষ পর্যন্ত বার্লিন ও ব্রাসেলস পর্যন্ত।
লেখক উল্লেখ করেছেন, কীভাবে ১৮১৮ সালে পরিবারের বড় ছেলে জেমস রথসচাইল্ড পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধি করে ফরাসি জাতীয় কোষাগারের সমান প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। ওয়াটারলু যুদ্ধের পর ফ্রান্সের নতুন রাজা লুই অষ্টাদশ তার দেশে রথসচাইল্ড পরিবারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জেমস পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফরাসি কোষাগারের বিরুদ্ধে স্পেকুলেটিভ এটাক বা অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র চালায়, যা ফরাসি অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
পরিস্থিতি যখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন রাজা লুইয়ের সামনে একমাত্র পথ ছিল জেমস রথসচাইল্ডের সাহায্য প্রার্থনা করা। জেমস সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বটে, কিন্তু এর বিনিময়ে সে ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ বন্ড এবং রিজার্ভের একটি বড় অংশের ওপর দখল নিয়ে নেয়। অর্থাৎ অমূল্য দাম দিয়ে কেনা এক 'সহায়তা'।
এভাবে ১৮১৫ থেকে ১৮১৮ সালের মধ্যে রথসচাইল্ড পরিবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ আহরণে সক্ষম হয়। লেখকের মতে, এর ফলে তারা বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রায় অগণিত বিলিয়নের পাহাড় গড়ে তোলে। তখন তাদের সামনে বাকি ছিল কেবল আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছানো, যে দেশটি বিশ শতকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পরাশক্তি হওয়ার যাবতীয় উপাদান ধারণ করে রেখেছিল।
টিকাঃ
৭. এখান থেকেই আমরা তথ্যের প্রকৃত মূল্য অনুমান করতে পারি। তবে তথ্যের মূল্য তখনই কাজে আসে যখন আপনি সেটি ব্যবহার করে বিনিয়োগ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমেরিকানরা আজও গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ করে ঠিক এই ধরনের কৌশলগত তথ্য ব্যবহারের উপায় খুঁজছে। যেমন: কীভাবে ইংল্যান্ডের নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে বিজয়ের ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে রথসচাইল্ড পরিবার তাদের চতুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল? তৎকালীন ব্যাংক শাখার মালিক নাথান রথসচাইল্ড একটি বিরাট ট্রাঙ্কে তার বন্ড এবং রিয়েল এস্টেট নিয়ে লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। এক্সচেঞ্জ খোলার সাথে সাথে সে ঢুকে নিজের সব বন্ড ও সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়। সবার জানা ছিল, নাথানের তথ্য-নেটওয়ার্ক বেশ শক্তিশালী। তাই তারা ভেবেছিল, ইংল্যান্ড সত্যিই হেরে গেছে। ফলে তার দেখাদেখি সবাই তৎক্ষণাৎ তাদের বন্ড ও সম্পত্তি বিক্রি করতে শুরু করে। নাথান তখন তার গোপন ক্লায়েন্টদের মাধ্যমে এসব বন্ড ও রিয়েল এস্টেট খুব সস্তায় কিনে নেয়। দুপুরের মধ্যে যখন ইংল্যান্ডের বিজয়ের খবর এল, দাম আবার বাড়তে শুরু করল। তখন নাথান যা কিনেছিল, তা বিক্রি করে সীমাহীন লাভ অর্জন করে নেয়। তাহলে আমাদের আসল ঘাটতি কি তথ্য খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে, না-কি সমস্যা লুকিয়ে আছে সেই তথ্য কাজে লাগানোর অক্ষমতায়? মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়, আরবদের মধ্যে একে অপরের প্রতি সম্মানের অভাব গভীরভাবে প্রোথিত আছে। ফলে অন্যের কাছ থেকে আসা যেকোনো তথ্য বা উপকারিতা প্রায়ই অবহেলায় উপেক্ষিত হয়। বস্তুত আমরা এমন জাতি, যারা বিনামূল্যে ভোগ করতে ভালোবাসি। একটি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি তাদের ব্যবসায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল বহু বছর আগে একটি ছোট, কিন্তু মূল্যবান 'তথ্য' কিনে। ধারণাটি ছিল, তাদের গ্যাসযুক্ত পানীয় ব্যারেলে ভরে নিজস্ব দোকান থেকে বিক্রি না করে কাচের বোতলে ভরে বাজারের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া। আজ আপনি শুধু জেনে নিন, পেপসি বা কোকাকোলার মতো কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য কত, তাহলেই বুঝবেন, একটি সঠিক ধারণা কীভাবে বিশ্বব্যাপী সম্পদের সিঁড়ি তৈরি করতে পারে।