📘 কারেন্সি ওয়ার > 📄 নিক্সন শকের নেপথ্যে

📄 নিক্সন শকের নেপথ্যে


এরপর বড় একটি সংকট তৈরি হয় ১৯৭১ সালে, যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট 'শার্ল দ্য গোল' (Charles de Gaulle) ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা আমেরিকান ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তর করার দাবি তোলেন। তিনি ১৯১ মিলিয়ন ডলারকে সমমূল্যের স্বর্ণে (তখন এক আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ৩৫ ডলার) রূপান্তরের দাবি করেন, যা Bretton Woods চুক্তি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অনুমোদিত ছিল।

এই দাবির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তর করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শেষমেশ ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একটি বিবৃতি জারি করে ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আর আমেরিকান ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা পালন করবে না। এই ঘোষণাই পরবর্তীকালে নিক্সন শক (Nixon Shock) নামে পরিচিত হয়।

টিকাঃ
৩. ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণসমূহ : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভিয়েতনাম ছিল জাপানি বাহিনীর দখলে। সে সময় এ অঞ্চলকে বলা হতো 'ইন্দোচীন'। যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এবং জাপানের সামরিক পরাজয়ের সাথে সাথে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি রাজধানী হ্যানয় দখল করে নেয় এবং ভিয়েতনামের সম্রাটকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এ সুযোগে ফ্রান্স তাদের পুরোনো দখলকৃত ইন্দোচীন অঞ্চল পুনরুদ্ধারের ইচ্ছা পোষণ করে, যেটি জাপান তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল। তাই ১৯৪৫ সালে ফ্রান্স দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে শুরু হয় ভিয়েতনামীদের (যাদের নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট নেতা 'হো চি মিন') ও ফরাসিদের মধ্যে যুদ্ধ। এই সংঘাত চলে টানা আট বছর, যার পর সুইজারল্যান্ডে এক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে বিভক্ত রাখা হবে এবং দুই বছর পর গণভোটের মাধ্যমে পুনরায় একীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংকটের উদ্ভব: উত্তর ভিয়েতনামের সরকার ১৯৫৪ সালের স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট প্রভাবের বিস্তারের আশঙ্কা করছিল, তাই তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সাইগনে মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সাহায্যের ধারা শুরু হয়, যাতে সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরিস্থিতি এমনভাবে গুছিয়ে নেওয়া যায় যে, উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের ঐক্য ঠেকানো যায়। অন্যদিকে হ্যানয়ের কমিউনিস্ট সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন থেকে সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সমর্থন পেতে থাকে। তারা দক্ষিণে কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের সহায়তা করত, যাতে তারা উত্তর সীমান্ত থেকে মার্কিন উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক অভিযান চালাতে পারে। এ কাজের মানে ছিল চুক্তি ও নির্ধারিত সীমারেখা ভঙ্গ করা। এই অবস্থা ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল (এই ধরনের চিত্রনাট্য সব সময়ই এবং এখনো পুনরাবৃত্ত হয়)।
সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি : দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা একটি বিপ্লবী সংগঠন তৈরি করে, যা 'ভিয়েত কং' নামে পরিচিত হয়। ১৯৬০ সালে এই সংগঠনটি জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে রূপ নেয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠনে পরিণত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনামের ভূমিতে মার্কিন উপস্থিতির বিরোধিতা করা এবং পশ্চিমাপন্থি সাইগন সরকারকে উৎখাত করা। এই পরিস্থিতি দক্ষিণের সরকারকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করে। বিশেষ করে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টকে সমর্থনের ঘোষণা দেয় এবং তাদের বিপ্লবী লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা সরবরাহ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাইগন সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৬১ সাল থেকে আমেরিকান সেনারা দক্ষিণ ভিয়েতনামে টহল দিতে শুরু করে। ১৯৬৩ সালের মধ্যে মার্কিন অফিসার ও সৈন্য মিলিয়ে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজারেরও বেশিতে। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে।
৪. দ্য গোল ছিলেন ইউরোপ ও ফ্রান্সের নায়ক এবং নাৎসিবাদ থেকে মুক্তিদাতা। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। আমেরিকার খেলা তিনি বুঝে ফেলেছিলেন। তাই তিনি আমেরিকাকে ফাঁসাতে এবং তার আসল চেহারা উন্মোচন করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এই কারণে তাকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার গলায় 'বিপ্লবের ফাঁস' পরিয়ে দেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

📘 কারেন্সি ওয়ার > 📄 মূল্যহীন কাগজ যেভাবে ‘স্বর্ণ’ হয়ে ওঠে

📄 মূল্যহীন কাগজ যেভাবে ‘স্বর্ণ’ হয়ে ওঠে


এরপর স্বর্ণ পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যায়। তার দাম-ভাগ্য নির্ধারণ করতে থাকে কেবল বাজারের চাহিদা ও জোগান। ডলারসহ পৃথিবীর সব মুদ্রা তখন একই অবস্থানে চলে আসে। সবই হয়ে যায় কাগুজে বাধ্যতামূলত মুদ্রা, প্রকৃতপক্ষে যার কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই, কেবল সরকারগুলোর ঘোষণার ওপরই তা দাঁড়িয়ে থাকে। ১৯৭৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ডলারের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে প্রায় ৪০ গুণ, আর সোনার দাম বেড়েছে ভয়াবহ মাত্রায়!

এটি ছিল গোটা বিশ্বের জন্য এক চরম ধাক্কা, এক বড় প্রতারণা! বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশ যে মার্কিন ডলার জমিয়ে রেখেছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে, ভেবে রেখেছিল প্রয়োজনে তা সোনায় বদলে নেবে, সেই সুযোগ হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এত কিছু জানার পরও তারা ডলারের ওপর নির্ভরশীলই থেকে গেল। কারণ রিজার্ভে জমা থাকা বিপুল পরিমাণ ডলার এক ঝটকায় ফেলে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তা করলে সবই পানিতে ভেসে যেত।

আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন : তাহলে এসব দেশ ডলারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে লেনদেন বন্ধ করে না কেন? এর উত্তর হলো, আমেরিকার নৌবাহিনী সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে শুধু বাতাস পাহারা দেওয়ার জন্য নয়! মূলত সামরিক শক্তিই অর্থনৈতিক শক্তিকে রক্ষা করে। এভাবেই ডলার হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, অন্য সকল দেশ যা ব্যবহার করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, অন্যান্য মুদ্রার মানও নির্ধারণ হয় ডলারের ভিত্তিতে। ফলে বিশ্ব-অর্থনীতির ওপর আমেরিকার আধিপত্য আরও মজবুত হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00