📄 অষ্টম ক্রুসেড যুদ্ধ
[৬৬৮-৬৬৯ হিজরি/১২৬৯-১২৭০ খ্রিষ্টাব্দ]
এন্টিয়কের পতন যেন ছিল ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত পতনধ্বনি। এডেসা রাজ্যের তো আগেই পতন ঘটেছে, মামলুক ঝড়ে এন্টিয়ক ক্রুসেড রাজ্যও হারিয়ে গেছে বিশ্ব মানচিত্র থেকে। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য সীমিত হয়ে পড়েছে আক্কা নগরীতে। তুলনামূলক ক্ষুদ্র ত্রিপোলি ক্রুসেড রাজ্য লেবানন অঞ্চলের সামান্য অংশ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। স্বভাবতই এতে ইউরোপ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পোপ ৪র্থ ক্লেমন্ত (Pope Clement IV) তাই নতুন করে ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে ইউরোপজুড়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। অভিযানে অংশ নিতে সম্মতি জানান ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ড, সাইপ্রাসের রাজা ৩য় হিউ (Hugh III of Cyprus) এবং সপ্তম ক্রুসেডের সর্বাধিনায়ক ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই। তাদের সঙ্গে আরও যোগ দেন তাতারি রাজ্য ইলখানাতের শাসক ও হালাকু খানের পুত্র আবাগা খান। সিদ্ধান্ত হয়, রাজা ৯ম লুই মামলুক সাম্রাজ্যের পশ্চিম কোণ তিউনিসিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে একে একে (লিবিয়ার) ত্রিপোলি ও কায়রো দখল করে নেবেন, এরপর সরাসরি আল-কুদস অভিমুখে অগ্রসর হবেন; অ্যাডওয়ার্ড ও হিউ নৌপথে আক্কায় পৌঁছে আল-কুদসে হামলা চালাবেন আর আবাগা খান মামলুক সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে একে একে আলেপ্পো ও দামেশক দখল করে নেবেন, এরপর ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-সাইপ্রাস বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে আল-কুদস দখল করবেন।
এদিকে এন্টিয়ক রাজ্যের দফারফা করার পর রুকনুদ্দিন বাইবার্স কায়রোতে ফিরে যান। কিছুদিন পর তিনি আবারও শাম অঞ্চলে অভিযান চালান। এবার তিনি আক্রমণ করেন শামের নাসিরিয়া পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থিত শিয়া বাতিনি রাজ্য মাসইয়াফে। ৬৫৪ হিজরি সনে (১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) পারস্যের বাতিনি হাশাশিন রাজ্যের পতন ঘটলেও শামের বাতিনি রাজ্যটি তখনও টিকে ছিল। পূর্বে নাসিরিয়া পর্বতমালা হতে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে এন্টিয়ক রাজ্যসীমা হতে দক্ষিণে ত্রিপোলি রাজ্যসীমা পর্যন্ত ছিল বাতিনি হাশাশিন গোষ্ঠীর রাজ্যবিস্তৃতি। রাজ্যজুড়ে ছিল দুর্ভেদ্য উনিশটি দুর্গ। বাইবার্স তার বাহিনীকে অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি দুর্গকে তিনদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। খোলা থাকে কেবল পশ্চিমে সাগরের দিক। সুকঠিন অবরোধ ও অনবরত গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স এক বছরের মধ্যে একে একে সবগুলো দুর্গের পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এর ফলে পৃথিবী শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর বর্বরতা থেকে চিরতরে নিষ্কৃতি লাভ করে।
রাজা ৯ম লুই ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে ইতালির নেপলস ও আন্দালুসের খ্রিষ্টরাজ্য নাফারের সহায়ক বাহিনী নিয়ে ৬৬৮ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) তিউনিসিয়ার কার্থেজ (Carthage) নগরীর উপকূলে পৌঁছান। তিউনিসিয়ার তৎকালীন শাসকপরিবার বনু হাফস মুসলমান হলেও ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখে চলত। কিন্তু তিউনিসিয়ায় পৌঁছেই ক্রুসেডার বাহিনী মহামারির শিকার হয় এবং অনেক সৈন্য আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে ইহধাম ত্যাগ করে। খোদ রাজা লুই-ও ২৫ আগস্ট মারা যান। তখন বাকিরা সামনে অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। এ সংবাদ জানতে পেরে অ্যাডওয়ার্ড ও হিউয়ের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড ও সাইপ্রাসের বাহিনী এবং আবাগা খানের নেতৃত্বাধীন তাতারি বাহিনীও অভিযানের চিন্তা বাদ দেয়। এভাবে অষ্টম ক্রুসেডও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
শাম অঞ্চলে বাতিনি রাজ্যের অবরোধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় বাইবার্স ক্রুসেডারদের সংগঠিত হওয়ার সংবাদ জানতে পেরে দ্রুত কায়রোতে ফিরে এসেছিলেন। ক্রুসেডারদের প্রস্থানের পর তিনি পুনরায় শাম অঞ্চলে ফিরে যান। ১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে তিনি জয় করেন ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ বুর্জ সাফিতা (Chastel Blanc)। এরপর তিনি অবরোধ করেন ত্রিপোলি নগরী।
📄 নবম ক্রুসেড যুদ্ধ
[৬৭০ হিজরি/১২৭১-১২৭২ খ্রিষ্টাব্দ]
ত্রিপোলি অবরোধের সংবাদ জানতে পেরে ইউরোপের টনক নড়ে ওঠে। আল-কুদস, এডেসা, এন্টিয়ক সবই হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন যদি ত্রিপোলি ও আক্কারও পতন ঘটে, তাহলে ইসলামি প্রাচ্য থেকে ক্রুসেডারদের পাততাড়ি গুটাতে হবে। তাতারিদের সহায়তায় এবার ঘোষিত হয় নবম ক্রুসেড।
অষ্টম ক্রুসেডের মতো এবারও অভিযানে যোগ দেয় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সাইপ্রাস ও তাতারি রাজ্য ইলখানাত। আবাগা খান অবশ্য এবার নিজে না এসে তার বিশেষ সেনাপতি সামাগার (Samagar)-কে প্রেরণ করেন। পরিকল্পনা করা হয়, ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখবে, এ ফাঁকে তাতারি বাহিনী শামের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেবে।
৬৭০ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) সামাগারের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী উত্তর দিক থেকে মামলুক সাম্রাজ্যে পা রাখে। প্রথমে তারা আলেপ্পোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, এরপর একে একে হামলা চালায় মা'আররাতুন-নোমান ও আফামিয়া নগরীতে। সংবাদ পেয়ে সুলতান বাইবার্স অল্প কিছু সৈন্যকে ত্রিপোলিতে রেখে বাকিদেরকে নিয়ে দ্রুত আফামিয়া অভিমুখে রওনা হন। বাইবার্সের রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়েই তাতারি বাহিনী ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে শুরু করে। বাইবার্স দ্রুত গতিতে তাদের ধাওয়া করে তার রাজ্যের সীমান্ত খাবুর নদী পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু তার আগেই তারা পালিয়ে ইলখানাত রাজ্যে চলে যায়!
বাইবার্স যখন তাতারীদের তাড়া করে রাজ্যের উত্তর সীমান্তে পৌঁছে গেছেন, ওদিক থেকে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা তখন ফিলিস্তিন অঞ্চলে হামলা চালায়। মামলুক বাহিনী অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ডের নেতৃত্বে ক্রুসেডার বাহিনী অনেকটা বিনা যুদ্ধে একে একে মন্টফোর্ট দুর্গ (Montfort Castle), নাজারেথ নগরী ও কাকুন দুর্গ দখল করে নেয়।
সংবাদ পেয়ে কালবিলম্ব না করে সুলতান বাইবার্স আবার ছোটেন শামের দক্ষিণ প্রান্তে। মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি আক্কায় পৌঁছান বত্রিশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করতে। বাইবার্সের আগমনে অ্যাডওয়ার্ডের যুদ্ধস্পৃহা মুহূর্তেই উবে যায়। তিনি বাইবার্সের কাছে দূত প্রেরণ করে সন্ধির আবেদন জানান! ৬৭০ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১২৭২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘কায়সারিয়া চুক্তি’ নামে খ্যাত দশ বছর দশ মাস দশ দিন মেয়াদি চুক্তিটির ধারাগুলো হলো—
• মন্টফোর্ট, নাজারেথ ও কাকুন দুর্গের অধিকার মুসলমানরা ফেরত পাবে।
• এসব এলাকার যেসব মুসলিম নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের পরিবারকে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির বিপরীতে প্রতিবছর তিনশ ষাট দিরহাম প্রদান করতে হবে। এই ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলি রাজ্য।
• খ্রিষ্টানরা তীর্থযাত্রার জন্য আল-কুদসে আগমন করলে নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে হবে।
• তীর্থযাত্রীরা ইসলামি ভূখণ্ডে ধর্মপ্রচার করতে পারবে না, ভূমি ক্রয় করতে পারবে না, ইসলামি ভূখণ্ডের কোনো খ্রিষ্টান নাগরিকের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না এবং তীর্থযাত্রার আগে-পরে মিলিয়ে অতিরিক্ত দুদিনের বেশি অবস্থান করতে পারবে না।
এভাবে নবম ক্রুসেডও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যুদ্ধ না করে অবমাননাকর সন্ধিচুক্তি মেনে নিয়েই ক্রুসেডাররা ফিরে যায় নিজ নিজ দেশে।
📄 নবম ক্রুসেড-পরবর্তী সময়
৬৭৬ হিজরি সনের ২৭ মুহাররম (১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই) সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ইন্তেকাল করেন। এরপর মামলুক সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত শুরু হয় এবং বাইবার্সের দুই পুত্র আস-সাইদ নাসিরুদ্দিন ও আল-আদিল বদরুদ্দিন একের পর এক শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের কারও শাসনামলই দীর্ঘায়িত হয়নি। অবশেষে ৬৭৮ হিজরি সনে (১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) মামলুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন আল-মালিকুল মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন। তিনি ৬৮৮ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে ত্রিপোলি অবরোধ করেন। মাসখানেক পর ৪ রবিউস সানি (১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল) মামলুক বাহিনী চূড়ান্ত হামলা চালিয়ে ত্রিপোলিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৫০৩ হিজরি সনের ১১ জিলহজ ক্রুসেডাররা ত্রিপোলি দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ একশ পঁচাশি বছর পর পুনরায় তা মুসলমানদের হাতে আসে।
ত্রিপোলির পতনের পর ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের দখলে অবশিষ্ট থাকে সুর, আক্কা ও বৈরুত নগরী। ৬৮৯ হিজরি সনে সুলতান কালাউন আক্কায় অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু অভিযানে রওনা হওয়ার পূর্বেই ৬৮৯ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৯০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) তিনি ইন্তেকাল করেন।
সুলতান কালাউনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আশরাফ সালাহুদ্দিন খলিল তার স্থলাভিষিক্ত হন। দুঃসাহসী বীরযোদ্ধা সুলতান খলিল ৬৯০ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর আক্কা নগরী জয় করেন। আক্কার পতনের পর সুর, সিডন ও বৈরুতসহ একে একে শাম অঞ্চলের অবশিষ্ট খ্রিষ্টান নগরীগুলোরও পতন ঘটে এবং শামে ক্রুসেড রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। জীবিত ক্রুসেডাররা শাম থেকে পালিয়ে আর্মেনিয়া ও সাইপ্রাসে আশ্রয় নেয়।
আল-কুদস ও শামের বিভিন্ন অঞ্চল জয়ের পর ক্রুসেডাররা দামেশকসহ অবশিষ্ট শাম এবং তারপর মিশর জয়েরও স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. এক অব্যাহত জিহাদের ধারা শুরু করেছিলেন। তার সুযোগ্য উত্তরসূরি নুরুদ্দিন জিনকি সে ধারাকে আরও বেগবান করেন আর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. পবিত্র নগরী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তাকে চূড়ান্ত লক্ষ্যপানে এগিয়ে নেন। অবশেষে ক্রুসেডার বিতাড়নের এই মহান পদক্ষেপের পরিসমাপ্তি ঘটে মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স, সাইফুদ্দিন কালাউন ও আল-আশরাফ খলিলের হাত ধরে।
নবম ক্রুসেডই ছিল সর্বশেষ ক্রুসেড। এরপর আর কখনো ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা ঘোষণা দিয়ে আল-কুদস জয়ের চেষ্টা করেনি। অবশ্য (৯ম ক্রুসেড যুদ্ধের পরাজিত সেনাপতি) ইংল্যান্ডের রাজা ১ম অ্যাডওয়ার্ডের অনুরোধে ১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পোপ ১০ম গ্রেগরি (Pope Gregory X) দশম ক্রুসেডের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু মহান মুসলিম বীর রুকনুদ্দিন বাইবার্সের আতঙ্কে ভীত-সন্ত্রস্ত ইউরোপের রাজন্যবর্গ কেউ এই আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় তার প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে ৪৮৮ হিজরি সনে (১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) 'ক্রুসেড যুদ্ধ' নামে ইউরোপীয় ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও শাসকগোষ্ঠীর যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু হয়, প্রায় দুই শতাব্দী পর ৬৭০ হিজরি সনে (১২৭২ খ্রিষ্টাব্দে) তার অবসান ঘটে।
কিন্তু ক্রুসেড ঘোষিত না হলেও ক্রুসেড আগ্রাসন কি শেষ হয়ে গেছে?! হিজরি দশম শতকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্টদশ শতাব্দীতে) স্পেন ও পর্তুগালের উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে উপর্যুপরি আক্রমণ, পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী অভিযান, নিকট অতীতে ১৪১২ হিজরি সনে (১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে) বসনিয়ায় সার্বদের নির্মম গণহত্যা, ১৪২১ হিজরি সনে (২০০১ খ্রিষ্টাব্দে) আফগানিস্তানে ও ১৪২২ হিজরি সনে (২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকে আমেরিকার আক্রমণ-এ সবই তো একেকটি অঘোষিত ক্রুসেডের উদাহরণ! আর সমরাঙ্গনের বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন অঙ্গনে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে পরাভূত করতে পশ্চিমাদের যে অব্যাহত প্রচেষ্টা, তাও কী যুগচাহিদার প্রেক্ষিতে ভিন্নধর্মী ক্রুসেডের উদাহরণ নয়?! ইরাকে হামলা চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশ স্বেচ্ছায় বা মুখ ফসকে যা কিছু বলেছেন, তার চেয়ে পরিষ্কার করে আর কিছু কি বলা যায়!
প্রশ্ন হলো, সমকালীন মুসলিম উম্মাহ তার কথার মর্ম বুঝতে পেরেছে, নাকি দিবানিদ্রায় মগ্ন থেকে স্বপ্ন দেখছে আরেকজন ইমাদুদ্দিন, নুরুদ্দিন, সালাহুদ্দিন বা রুকনুদ্দিনের আগমনের?!
এ প্রশ্নের উত্তরও ইতিহাসের কাছেই তোলা থাক! ইতিহাসেই তো লুকিয়ে আছে আগামীর পদচিত্র।
📄 নির্ঘণ্ট (Index)
নির্ঘণ্ট-১ অঞ্চল-পরিচিতি
| স্থান | খণ্ড | পৃষ্ঠা নম্বর | টীকা নম্বর |
| :--- | :--- | :--- | :--- |
| এশিয়া মাইনর অঞ্চল | ১ | ২৩ | ৫ |
| শাম অঞ্চল | ১ | ২৩ | ৫ |
| ফিলিস্তিন অঞ্চল | ১ | ২৪ | ৫ |
| আ'মাক | ১ | ২৮ | ৭ |
| দAbিক | ১ | ২৮ | ৭ |
| সিসিলি | ১ | ৩৫ | ৯ |
| মাগরিব | ১ | ৩৭ | ১০ |
| আল-মাগরিবুল আদনা | ১ | ৩৭ | ১০ |
| (নিকট-মাগরিব অঞ্চল) | | | |
| আল-মাগরিবুল আওসাত | ১ | ৩৭ | ১০ |
| (মধ্য-মাগরিব অঞ্চল) | | | |
| আল-মাগরিবুল আকছা | ১ | ৩৭ | ১০ |
| (দূর-মাগরিব অঞ্চল) | | | |
| রোমান সাম্রাজ্য | ১ | ৩৯-৪১ | ১১ |
| হাবশা (আবিসিনিয়া) | ১ | ৪১ | ১২ |
| বুছরা ও বসরা | ১ | ৪৩ | ১৭ |
| ইসলামি প্রাচ্য | ১ | ৪৭ | ৩১ |
| ইসলামি প্রতীচ্য | ১ | ৪৭ | ৩১ |
| যিবাত্রা | ১ | ৪৮-৪৯ | ৩৫ |
| জাযিরা অঞ্চল | ১ | ৫০ | ৩৮ |
| (আপার-মেসোপটেমিয়া) | | | |
| স্থান | খণ্ড | পৃষ্ঠা নম্বর | টীকা নম্বর |
| --- | --- | --- | --- |
| এন্টিয়ক | ১ | ৫০ | ৩৯ |
| আলেপ্পো | ১ | ৫২ | ৪৪ |
| মাওয়ারাউন নাহার | ১ | ৬৫ | ৬৩ |
| (ট্রান্স অক্সিয়ানা) | | | |
| আরবি ইরাক | ১ | ৬৭ | ৬৮ |
| আজমি ইরাক | ১ | ৬৭ | ৬৮ |
| তারাবলুস (ত্রিপোলি) | ১ | ৭০ | ৭২ |
| এডেসা | ১ | ৭২ | ৭৯ |
| জেনোভা ও জেনেভা | ১ | ৯১ | ১০৮ |
| ক্লেরমন্ট | ১ | ১০৫ | ১৩৮ |
| নিকিয়া | ১ | ১৪৯ | ২৩৬ |
| কোনিয়া | ১ | ১৫৯ | ২৫৬ |
| তারসুস ও তারতুস | ১ | ১৬৬ | ২৬৮ |
| প্রাচীন বিশ্ব ও আধুনিক বিশ্ব | ১ | ১৭৭ | ২৯৪ |
| বারা | ১ | ১৮৭ | ৩১৯ |
| আরসুফ | ১ | ২৩৩ | ৪২৬ |
| জাযিরা ইবনে উমর | ২ | ১৬৬ | ২৫৮ |
নির্ঘণ্ট-২ সংক্ষিপ্ত ব্যক্তি-পরিচিতি মুসলিম শিবির
সুলায়মান বিন কুতুলমিশ: এশিয়া মাইনর অঞ্চলে রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ক্রুসেড-যুগ পাননি। ৪৭৮ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি তুতুশ বিন আলপ আরসালানের হাতে নিহত হন।
১ম কিলিজ আরসালান: সুলায়মান বিন কুতুলমিশের পুত্র ও পরবর্তী রোমান সেলজুক শাসক। ক্রুসেড আগ্রাসনের প্রথম ঝড় তার ওপর দিয়েই যায় এবং ক্রুসেডারদের হাতে তিনি তার রাজধানী নিকিয়া নগরীসহ রাজ্যের বৃহৎ অংশ হারান। অবশ্য পরবর্তীকালে ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ইউরোপ থেকে আগত সহায়ক ক্রুসেডার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে স্মরণীয় বিজয় অর্জন করেন। ৫০০ হিজরি সনে (১১০৬ খ্রিষ্টাব্দে) মসুলকে নিজ রাজ্যভুক্ত করতে গিয়ে তিনি নিহত হন।
গাজি কুমুশতেগিন বিন দানিশমান্দ: এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দানিশমান্দ রাজ্যের শাসক। ক্রুসেড অভিযানের পুরোটা সময় কিলিজ আরসালানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে থেকে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার পথ সুগম করেন। পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী ক্রুসেডার নেতা বোহেমন্ডকে বন্দি করতে সমর্থ হলেও অর্থের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেন। অবশ্য ৪৯৪ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) কিলিজ আরসালানের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করেন। মারা যান ১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে।
তুতুশ বিন আলপ আরসালান: বিখ্যাত সেলজুক শাসক আলপ আরসালানের পুত্র ও শামকেন্দ্রিক সেলজুক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। চরিত্রের দিক থেকে ছিলেন পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্রুসেড আগ্রাসন শুরুর পূর্বেই ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে নিহত হন।
রিজওয়ান বিন তুতুশ: তুতুশের পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর শামের সেলজুক রাষ্ট্রের আলেপ্পো অংশের শাসনভার লাভ করেন। প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। ক্রুসেডারদের তিনি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেন এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেন। ৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
দাক্কাক বিন তুতুশ: তুতুশের আরেক পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর শামের সেলজুক রাষ্ট্রের দামেশক অংশের শাসনভার লাভ করেন। ক্রুসেড অভিযান চলাকালে অধিকাংশ সময় সংগ্রামী ভূমিকা পালনের পরিবর্তে ভাই রিজওয়ানের মতোই নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেন। মৃত্যুবরণ করেন ৪৯৬ হিজরি সনে (১১০৩ খ্রিষ্টাব্দে)। শাসনকালের পুরো সময় তিনি ভাইয়ের সঙ্গেও সংঘাতে জড়িয়ে ছিলেন।
তুগতেকিন : তুতুশের মুক্ত ক্রীতদাস এবং তুতুশ-পুত্র দাক্কাকের রাজশিক্ষক। দাক্কাকের মৃত্যুর পর তিনি দামেশকের শাসনভার গ্রহণ করেন। শাসনকালে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একাধিকবার লড়াই করেন, আবার ক্ষেত্রবিশেষে তাদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেন। পঁচিশ বছর দামেশক শাসন করার পর ৫২২ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আবু আলি বিন আম্মার : ত্রিপোলির নগরীর শিয়া প্রশাসক। ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের মুখেও দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখে নিজ রাজ্য টিকিয়ে রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৫০৩ হিজরি সনে (১১০৯ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেডারদের কাছে রাজ্য হারান।
১ম মালিকশাহ : আলপ আরসালানের পুত্র। বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের মহান শাসক। ক্রুসেড আগ্রাসন শুরু হওয়ার কয়েক বছর পূর্বে ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বারকিয়ারুক : ১ম মালিকশাহর পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। তার শাসনমালেই ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের আগ্রাসন শুরু হয়। তিনি এ সময় ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় তার অধীনস্থ মসুলের প্রশাসক কারবুগার নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করলেও বাহিনীটি পরাজিত হয়। ভাই ও চাচাতো ভাইদের সঙ্গে অব্যাহত সংঘাতের কারণে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হননি। মৃত্যুবরণ করেন মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ৪৯৮ হিজরি সনে (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে)।
সুলতান মুহাম্মাদ : মালিকশাহর আরেক পুত্র। ভাইদের মৃত্যুর পর পুরো বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব লাভ করেন। আপন শাসনমালে তিনি একাধিকবার ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রেরণ করলেও সামগ্রিক বিচারে এ বিষয়ে পূর্ণ আন্তরিক ছিলেন না। ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে সাইত্রিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
সুলতান মাহমুদ : সুলতান মুহাম্মাদের পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। দুই ভাই মাসউদ ও তুগরল এবং চাচা সানজারের বিরোধের কারণে নির্ঝঞ্ঝাট রাজ্যশাসন করতে পারেননি। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন। তিনিই ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মসুলের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ৫২৫ হিজরি সনে (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে) মাত্র সাতাশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
মাসউদ, তুগরল ও সেলজুকশাহ: সুলতান মাহমুদের তিন ভাই। মাহমুদের মৃত্যুর পর তারা বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মাসউদ এই সংঘাতে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেন এবং দীর্ঘ সময় বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্র শাসন করেন।
সুকমান বিন উরতুক: উরতুক রাজপরিবারের প্রধান পুরুষ উরতুক তুর্কমানির পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর প্রথমে তুতুশ ও দাক্কাকের অধীনে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দিরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিলে তিনি উত্তর ইরাকের দিয়ারে বকর অঞ্চলে পৌঁছে সেখানে হাসানকেইফকেন্দ্রিক একটি ইসলামি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বালিখের যুদ্ধসহ একাধিক রণক্ষেত্রে তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ভূমিকা রাখেন। ৪৯৮ হিজরি সনে (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক অভিযানে রওনা হয়ে পথিমধ্যে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইলগাজি বিন উরতুক : সুকমান বিন উরতুকের ভাই ও মারদিনের আমির। বালাতের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে স্মরণীয় বিজয় লাভ করেন। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেন এবং জয়-পরাজয় উভয় ধরনের ফলাফল লাভ করেন। ৫১৬ হিজরি সনে (১১২৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন।
বাল্ক বিন বাহরাম বিন উরতুক : সুকমান ও ইলগাজির ভ্রাতুষ্পুত্র। খারতাবিত নগরীর প্রশাসক ছিলেন। ৫১৬ হিজরি সনে (১১২২ খ্রিষ্টাব্দে) মাত্র চারশ সৈন্য নিয়ে এডেসার ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং এডেসার শাসক জোসেলিনকে বন্দি করেন। এর সাত মাস পর আরেক যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে তিনি বন্দি করেন বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইনকে। মহান এই মুজাহিদ এর বছরখানেক পর ৫১৮ হিজরি সনে (১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক অভিযান চলাকালে অজ্ঞাত উৎস হতে নিক্ষিপ্ত লক্ষ্যহীন তিরের আঘাতে শহিদ হন।
হুসামুদ্দিন তামারতাশ : ইলগাজির পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর মারদিন ও দিয়ারে বকরের দক্ষিণ অংশের শাসনভার লাভ করেন। বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। ক্রুসেডারদের বিষয়ে অনেকটা নমনীয় ছিলেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে জোটবদ্ধ যেমন হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছেন।
রুকনুদ্দৌলা দাউদ : সুকমানের পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর হাসানকেইফের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চরিত্রের দিক থেকে অনেকটা চাচাতো ভাই হুসামুদ্দিন তামারতাশের মতোই।
কারবুগা : মসুলের প্রশাসক। সুলতান বারকিয়ারুকের নির্দেশে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এন্টিয়ক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দে)। ইমাদুদ্দিন জিনকি শৈশবে তার তত্ত্বাবধান লাভ করেছেন।
জাকারমিশ : কারবুগা-পরবর্তী মসুলের প্রশাসক। বালিখের যুদ্ধসহ ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ৫০০ হিজরি সনে (১১০৬ খ্রিষ্টাব্দে) বরখাস্ত হন। ইমাদুদ্দিন জিনকি শৈশবে তার তত্ত্বাবধানও লাভ করেছেন।
মওদুদ বিন তুনতেকিন : জাকারমিশ বরখাস্ত হওয়ার কিছুদিন পর মসুলের প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করেন। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী লড়াইয়ে প্রথম পরিপূর্ণ নেতা। ইন্তেকাল করেন ৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে)।
আক সুনকুর আল-বুরসুকি: মওদুদ-পরবর্তী মসুলের প্রশাসক। আরেক মহান মুজাহিদ নেতা। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেন। ৫২০ হিজরি সনে (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে) শিয়া গুপ্তঘাতকদের হাতে নিহত হন।
কাসিমুদ্দৌলা হাজিব আক সুনকুর : ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা। আলেপ্পোর প্রশাসক ছিলেন। ক্রুসেড-যুগ পাননি। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুতুশের হাতে নিহত হন।
দুবাইস বিন সাদাকা : আরব গোত্র বনু মাজিদের নেতা। বিভিন্ন সময় ক্রুসেডারদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। শেষ জীবনে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সুলতান মাসউদের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অবহিত করে হত্যাপ্রচেষ্টা হতে রক্ষা করেন। এ কারণেই সুলতান মাসউদ তাকে হত্যা করেন।
নাসিরুদ্দিন জাকার : মসুলে ইমাদুদ্দিন জিনকি কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক।
সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানি : ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রধান সেনাপতি।
কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি: ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যের প্রধান কাজি।
সিওয়ার বিন আবতেকিন: প্রথমে দামেশকের একজন সাধারণ সেনাপতি ছিলেন। সেখান থেকে পালিয়ে এলে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে কাছে টেনে নেন এবং আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযানে তিনি অনন্যসাধারণ অবদান রেখেছেন।
ক্রুসেড শিবির
২য় আরবান (Pope Urban II): রোমান ক্যাথলিক পোপ। কয়েক শতাব্দী ব্যাপ্ত ক্রুসেড আগ্রাসনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রথম ক্রুসেড অভিযানের মূল সমন্বয়ক। প্রথম ক্রুসেডের শেষ সময়ে ৪৯২ হিজরি সনে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) রোমে মারা যান।
২য় পাসকাল (Pope Paschal II): ২য় আরবানের পরবর্তী ক্যাথলিক পোপ। ইউরোপ থেকে দিক-নির্দেশনা প্রদান ও সামরিক সাহায্য প্রেরণের মাধ্যমে তিনি ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেড আগ্রাসন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেন। ৫১১ হিজরি সনে (১১৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইহধام ত্যাগ করেন।
১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস (Alexios I Komnenos) : বাইজান্টাইন সম্রাট। প্রথম ক্রুসেড আগ্রাসনের অন্যতম নেপথ্য নায়ক। ক্রুসেডারদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। অবশ্য, তার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি প্রাচ্য ভূখণ্ডে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থ বাস্তবায়ন। মৃত্যু ৫১২ হিজরি সনে (১১৮ খ্রিষ্টাব্দে)।
২য় জন কমনিনোস (John II Komnenos): ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর তিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের হাল ধরেন এবং পিতার মতোই ইসলামি প্রাচ্যে সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষায় কাজ করেন। অবশ্য ৫৩১ হিজরি ও ৫৩২ হিজরি সনে (১১৩৭ ও ১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি দু-বার ইসলামি ভূখণ্ডে সশরীরে অভিযান পরিচালনা করলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। মৃত্যু ৫৩৮ হিজরি সনে (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে)।
ধর্মযাজক পিটার (Peter the Hermit): প্রথম ক্রুসেড অভিযানের অন্যতম প্রচারক। সাধারণ জনগণ ও সন্ত্রাসী-অপরাধীদের নিয়ে তিনি একটি বাহিনী গঠন করে ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেন।
ওয়ালটার (Walter the Penniless) : আরেক ধর্মযাজক ও ক্রুসেড অভিযানের প্রচারক। 'কাঙাল ওয়ালটার' নামে পরিচিত এই ধর্মযাজকও পিটারের ন্যায় সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে একটি অনিয়মিত বাহিনী প্রস্তুত করে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। অভিযানের শুরুতেই তিনি নিহত হন।
গডফ্রে ডি বোলোন (Godfrey de bouillon) : প্রথম ক্রুসেড অভিযানের অন্যতম সেনাপতি। ফরাসি নাগরিক গডফ্রে ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেড রাজ্যের প্রথম শাসক নির্বাচিত হন। মারা যান এর পরের বছরই ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে (৫০৩ হিজরি সনে)।
১ম বল্ডউইন (Baldwin I) : গডফ্রের ভাই এবং প্রথম ক্রুসেডের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি। ৪৯১ হিজরি সনে (১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ক্রুসেড রাজ্য এডেসা। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে ভাই গডফ্রের মৃত্যুর পর তিনি এডেসা রাজ্যের দায়িত্ব ছেড়ে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার হাত ধরে রাজ্যটি তার বিস্তৃতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। ৫১১ হিজরি সনে (১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর অভিযান থেকে ফেরার পথে তিনি ইহধام ত্যাগ করেন। তিনি এডেসা শাসন করেন দু বছর আর বাইতুল মুকাদ্দাস শাসন করেন আঠারো বছর।
বল্ডউইন ডি বুর্গ (Baldwin of Bourg) বা ২য় বল্ডউইন : ১ম বল্ডউইনের চাচাতো ভাই এবং প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সক্রিয় সেনাপতি। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে ১ম বল্ডউইন এডেসা ছেড়ে বাইতুল মুকাদ্দাস চলে যাওয়ার সময় তাকে এডেসা রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে যান। ১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দি হলেও ৫০২ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) মুক্তিলাভ করেন এবং এডেসা রাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন শাসক টেনক্রেডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এডেসায় নিজের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে ১ম বল্ডউইন মারা গেলে তিনি নির্বাচিত হন বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের তৃতীয় শাসক। দীর্ঘ সময় তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন। মারা যান ৫২৫ হিজরি সনে (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে)। অর্থাৎ তিনি আঠারো বছর ছিলেন এডেসা রাজ্যের শাসক আর তেরো বছর বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক।
ফাল্ক অ্যাঞ্জো (Fulk the Younger) : ২য় বল্ডউইনের জামাতা এবং বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের চতুর্থ শাসক। তিনি ক্রুসেড অভিযানে শরিক ছিলেন না। ফ্রান্সের অ্যাঞ্জো অঞ্চলের কাউন্ট ফাল্ক ২য় বল্ডউইনের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসনভার এবং এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধান-দায়িত্ব লাভ করেন। মারা যান ৫৩৮ হিজরি সনে (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে)।
৩য় বল্ডউইন (Baldwin III) : ফাল্ক অ্যাঞ্জোর পুত্র। পিতার মৃত্যুর পর তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের পঞ্চম শাসক নির্বাচিত হন।
জোসেলিন ডি কার্টেনি (Joscelin de Courtenay) : ২য় বল্ডউইনের ফুফাতো ভাই। প্রথমে ২য় বল্ডউইনের অধীনে এডেসা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তিল-বাশির নগরীর প্রশাসক ছিলেন। ৫০৫ হিজরি সনে (১১২ খ্রিষ্টাব্দে) ২য় বল্ডউইন তাকে বরখাস্ত করলে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক ১ম বল্ডউইনের কাছে চলে যান এবং তাবারিয়া ও জালিল অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীকালে ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। ২য় বল্ডউইন ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে এডেসা ছেড়ে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় তাকে এডেসা রাজ্যের শাসনভার প্রদান করে যান। এডেসা রাজ্যের তৃতীয় শাসক জোসেলিন তার ভাই ২য় বল্ডউইনের মতোই ৫২৫ হিজরি সনে (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে) মারা যান।
২য় জোসেলিন (Joscelin II of Edessa) : জোসেলিন ডি কার্টেনির পুত্র এবং এডেসা রাজ্যের চতুর্থ ও শেষ শাসক। পিতার মৃত্যুর পর এডেসা রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তার শাসনামলেই ৫৩৯ হিজরি সনে (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. এডেসা রাজ্যের পতন ঘটান।
১ম বোহেমন্ড (Bohemond I) : বিখ্যাত নরম্যান সেনাপতি রবার্ট গোয়েসকার্ডের পুত্র। প্রথম ক্রুসেড অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি বোহেমন্ড ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের প্রথম শাসক নির্বাচিত হন। ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে দানিশমান্দ রাজ্যের শাসক গাজি বিন দানিশমান্দের হাতে বন্দি হলেও পরবর্তীকালে ১১০৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের শুরুতে (৪৯৬ হিজরি সনে) মুক্তিলাভ করেন। বিভিন্ন দিক থেকে চাপের শিকার হয়ে ১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এন্টিয়ক ছেড়ে ইউরোপে ফিরে যান এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু ৫০০ হিজরি সনে (১১০৭ খ্রিষ্টাব্দে) বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কয়েক বছর পর ৫০৪ হিজরি সনে (১১১১ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি সিসিলি দ্বীপে ইহধام ত্যাগ করেন।
টেনক্রেড (Tancred) : ১ম বোহেমন্ডের ভাগ্নে টেনক্রেড প্রথম ক্রুসেডের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি। প্রথমে তিনি গডফ্রের শাসনাধীন বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের জালিল অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। মামা বোহেমন্ডের বন্দিকালে (১১০১-১১০৩ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন শাসকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১১০৪ খ্রিষ্টাব্দে এডেসার শাসক ২য় বল্ডউইন বন্দি হলে তিনি পালন করেন এডেসা রাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন শাসকের দায়িত্ব। ১১০৪ খ্রিষ্টাব্দেই মামা বোহেমন্ড ইউরোপে চলে গেলে তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের পূর্ণ শাসনভার লাভ করেন। ৫০২ হিজরি সনে (১১০৮ খ্রিষ্টাব্দে) ২য় বল্ডউইন মুক্তিলাভের পর তিনি তার কাছে এডেসার শাসনভার ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানালে বল্ডউইন যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের অধিকার বুঝে নেন। দীর্ঘদিন এন্টিয়ক শাসনকারী টেনক্রেড রাজ্যটিকে একটি মজবুত স্থায়ী অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হন। ৫০৬ হিজরি সনে (১১১২ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ইহধام ত্যাগ করেন।
রজার সালের্নো (Roger of Salerno) : ২য় বল্ডউইনের ভগ্নিপতি, টেনক্রেডের চাচাতো ভাই রিচার্ড সালের্নোর পুত্র এবং এন্টিয়ক রাজ্যের তৃতীয় শাসক। টেনক্রেডের মৃত্যুর পর এন্টিয়ক রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি 'রজার অফ এন্টিয়ক' ও 'রজার অফ সিসিলি' নামেও পরিচিত। সাত বছর পর ৫১৩ হিজরি সনে (১১১৯ খ্রিষ্টাব্দে) বালাতের যুদ্ধে তিনি নিহত হন।
২য় বোহেমন্ড (Bohemond II) : ১ম বোহেমন্ডের পুত্র ও ২য় বল্ডউইনের জামাতা। প্রথম জীবনে ইতালিতে ছিলেন। পরিণত বয়সে উপনীত হওয়ার পর ৫২১ হিজরি সনে (১১২৭ খ্রিষ্টাব্দে) এন্টিয়কে এসে রাজ্যটির শাসনভার গ্রহণ করেন। রজারের মৃত্যুর পর থেকে ২য় বোহেমন্ডের আগমনের আগ পর্যন্ত (৫১৩-৫২১ হি./ ১১১৯-১১২৭ খ্রিষ্টাব্দ) বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক ২য় বল্ডউইনই এন্টিয়ক রাজ্যের দেখাশোনা করছিলেন। তিনি ১১৩০ খ্রিষ্টাব্দে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন।
রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স (Raymond of Poitiers) : ফরাসি যুবরাজ। ১১৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ২য় বোহেমন্ডের কন্যা কন্সটেন্সকে বিয়ে করে এন্টিয়কের শাসনভার গ্রহণ করেন। মাঝের ছয় বছর এন্টিয়ক কখনো বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজার তত্ত্বাবধানে ছিল, কখনো ছিল কন্সটেন্সের মা এলিসের শাসনাধীন। ১১৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি রহ.-এর বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে তিনি নিহত হন।
৪র্থ রেমন্ড (Raymond IV) : প্রথম ক্রুসেড অভিযানের অন্যতম বর্ষীয়ান সেনাপতি। ফ্রান্সের তুলুজ ও প্রভিন্স অঞ্চলের কাউন্ট প্রচণ্ড মুসলিমবিদ্বেষী রেমন্ড ক্রুসেডের পূর্বে আন্দালুসেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। প্রথম ক্রুসেড অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এবং পরবর্তী সময়েও নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠায় তিনি হন্যে হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যান। স্বপ্নপূরণের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে ৪৯৮ হিজরি সনে (১১০৫ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি ত্রিপোলি অবরোধ চলাকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
উইলিয়াম জর্ডান (William Jordan) : ৪র্থ রেমন্ডের খালাতো ভাই ও তার প্রধান সহকারী। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি ত্রিপোলি অবরোধ অব্যাহত রাখেন। অবশ্য ৫০৩ হিজরি সনে (১১০৯ খ্রিষ্টাব্দে) যখন ত্রিপোলিতে ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার পরিবর্তে রেমন্ড-পুত্র বারট্রাম রাজ্যটির শাসনভার গ্রহণ করেন আর তিনি লাভ করেন রাজ্যটির অন্তর্গত ইরকা ও তারতুস নগরীর শাসনভার। অবশ্য কিছুদিন পরই তিনি রহস্যজনকভাবে নিহত হন।
বারট্রাম (Bertram) : ৪র্থ রেমন্ডের পুত্র এবং ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলির প্রথম শাসক। প্রথম জীবনে ফ্রান্সেই ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ইসলামি প্রাচ্যে আগমন করে ত্রিপোলি অবরোধে শরিক হন এবং নগরীটির পতন ঘটিয়ে সেখানে ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুবরণ করেন ৫০৬ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে)।
পন্স (Pons): বারট্রামের পুত্র ও ত্রিপোলি রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক। পিতার মৃত্যুর পর ৫০৬ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৫৩১ হিজরি সনে (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) দামেশকের একটি বিচ্ছিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন।
২য় রেমন্ড (Raymond II) : পন্সের পুত্র ও ত্রিপোলি রাজ্যের তৃতীয় শাসক। ১১৫২ খ্রিষ্টাব্দে শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর হাতে নিহত হন।
অ্যাডমার ডি মনটেইল (Adhemar de Monteil) : ফ্রান্সের লি-পিউ অঞ্চলের গির্জাধ্যক্ষ এবং প্রথম ক্রুসেড অভিযানে পোপ ২য় আরবান কর্তৃক প্রেরিত প্রতিনিধি। অভিযান চলাকালে এন্টিয়ক বিজয়ের কিছুদিন পর ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে মারা যান।
আরনাল্ফ মালকোরন (Arnulf Malcorone) : বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের প্রথম গির্জাধ্যক্ষ। দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পরই বরখাস্ত হন। পরে অবশ্য নিজ দায়িত্ব ফিরে পান এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ১ম বল্ডউইনের সহায়তায় বিভিন্ন অন্যায়কর্ম সম্পাদন করেন। মারা যান ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে।
ডেমবার্ট : ইতালির পিসা অঞ্চলের গির্জাধ্যক্ষ। অ্যাডমারের মৃত্যুর পর পোপের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামি ভূখণ্ডে আগমন করেন। এর পূর্বে তিনি আন্দালুসেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গডফ্রের সহযোগিতায় আরনাদের পরিবর্তে রাজ্যটির গির্জাধ্যক্ষের দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে রাজ্যটির নতুন শাসক ১ম বল্ডউইনের ষড়যন্ত্রে তিনি বরখাস্ত হন।
অ্যাবরামার (Abramar) : পোপের পক্ষ থেকে ডেমবার্টের বিষয়ে তদন্ত করতে এসে তিনি ডেমবার্টকে বরখাস্ত করেন এবং নিজেই বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের গির্জাধ্যক্ষে পরিণত হন।