📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয়বার আল-কুদস পুনরুদ্ধার

📄 দ্বিতীয়বার আল-কুদস পুনরুদ্ধার


সুলতান সালিহ আইয়ুব ৬৪২ হিজরি সনে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। তেরো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে তিনি রওনা হন আল-কুদসের উদ্দেশে। সংবাদ পেয়ে শামের বিভিন্ন এলাকার ক্রুসেডাররা সমবেত হয়ে ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটায়। পরিতাপের বিষয়, হিমস ও আলেপ্পোসহ শামের বিভিন্ন এলাকার আইয়ুবি প্রশাসকগণও তাদের সমর্থন জানায় এবং আল-মালিকুস সালিহের বাহিনীর প্রতিরোধের লক্ষ্যে ক্রুসেডারদের সঙ্গে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে জড়ো হয়! সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বিশ হাজার। আল-কুদসের পথে গাজার নিকটে আল-মালিকুস সালিহের বাহিনী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় এবং তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এরপর তারা সামনে অগ্রসর হয়ে আল-কুদস অবরোধ করে। মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণে এগারো হাজার সৈন্যবিশিষ্ট আল-কুদসের স্থানীয় ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে; পনেরো বছর পর আবারও আল-কুদসে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে একটানা ছয়শ তিরানব্বই বছর পবিত্র আল-কুদস নগরী ইসলামি শাসনাধীন ছিল। ১৩৩৫ হিজরি সনে (১৩১৭ খ্রিষ্টাব্দে) ব্রিটিশ বাহিনী আল-কুদস দখল করে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকে আল-কুদস আজও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে আরেকজন আইয়ুবি বা আইয়ুবের প্রতীক্ষায়; যিনি হবেন আল-কুদসের তৃতীয় পুনরুদ্ধারকারী।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধ


[৬৪৭-৬৪৮ হিজরি/১২৪৯-১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ]
৬৪২ হিজরি সনে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুবের হাতে আল-কুদসের কর্তৃত্ব হারানোর পর ইউরোপে নতুন করে ক্রুসেড যুদ্ধের আওয়াজ ওঠে। ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই (Louis IX of France) এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং ইউরোপজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তৎকালীন পোপ ৪র্থ ইনোসেন্ট (Pope Innocent IV) ১২৪৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা লুইকে সমর্থন জানান এবং অভিযানের সফলতার বিষয়ে ধর্মীয় নিশ্চয়তা প্রদান করেন। রাজা ৯ম লুই পরবর্তী তিন বছর অভিযানের প্রস্তুতিতে ব্যয় করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন পরাশক্তি তাতারিদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনেরও চেষ্টা চালান। কিন্তু তাতারিরা নিজেদের মতো করে সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী থাকায় তার এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সুলতান সালিহ আইয়ুবের শাসনামলের শেষ দিকে ৬৪৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) এক লক্ষের অধিক সৈন্যের সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই-এর নেতৃত্বে আঠারোশ জাহাজে করে মিশর অভিমুখে রওনা হয়। যদিও ক্রুসেডার বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল আল-কুদস পুনরুদ্ধার; কিন্তু তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল-কুদস ও শাম অঞ্চলে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে মিশর অধিকার করতে হবে। মিশর দখল না করে আল-কুদস পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও পূর্বের দু-বারের ন্যায় হয়তো তা আবারও হাতছাড়া হয়ে যাবে।
৬৪৭ হিজরি সনের ২২ সফর (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুন) ক্রুসেডার বাহিনী দিমইয়াতে অবতরণ করে এবং কয়েকদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দিমইয়াতের দুর্গ দখল করে নেয়। দুর্গের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল ক্ষুদ্র একটি বাহিনী। তারা দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখলেও কায়রো থেকে সামরিক সহায়তা না আসায় একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে দুর্গ ত্যাগ করে।
আইয়ুবি সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব তখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। সুলতানের স্ত্রী শাজারাতুদ-দুর তৎক্ষণাৎ জাযিরা অঞ্চলে অবস্থানরত সুলতানের পুত্র তুরানশাহর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে দ্রুত মিশরে চলে আসতে বলেন। ১৫ শাবান (২৩ নভেম্বর) সুলতান আইয়ুব মৃত্যুবরণ করলে শাজারাতুদ-দুর তার মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখেন এবং সুলতানের নকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি রেখে সকলকে বোঝান যে, সুলতানই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি সেনাপতি ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সমবেত করে জানান যে, সুলতান তাদেরকে সুলতান-পুত্র তুরানশাহর নামে বায়আত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে সকলে তুরানশাহর নামে বায়আত গ্রহণ করে।
দিমইয়াত দখলের প্রায় ছয় মাস পর ৬৪৭ হিজরি সনের শাবান মাসে (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) ক্রুসেডার বাহিনী মানসুরা নগরী অভিমুখে রওনা হয়। কিন্তু তারা ইতিপূর্বে আল-কামিলের যুগে যে ভুল করেছিল, এবারও সেই একই ভুল করে। তারা পূর্বের ন্যায় এবারও দিমইয়াত ও মানসুরা হয়ে কায়রো দখলের চেষ্টা করে। এ পথে তাদের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর খাল, নদী ও শাখা নদী প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল।
৬৪৭ হিজরি সনের ১৪ রমজান (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর) ক্রুসেডার বাহিনী এসে পৌঁছায় আল-বাহরুস সগিরের তীরে। নদীর অপর তীরেই মানসুরা নগরী। এ সময় ক্রুসেডার বাহিনী নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলে অপর পারে অবস্থানরত আইয়ুবি বাহিনীর তীব্র তিরবৃষ্টির শিকার হয়। টানা কয়েক সপ্তাহ নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ক্রুসেডার বাহিনী যখন দিমইয়াতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই স্থানীয় জনৈক খ্রিষ্টান নাগরিকের মাধ্যমে তারা জানতে পারে, কয়েক মাইল দূরেই নদীর তুলনামূলক অপ্রশস্ত একটি জায়গায় পাড়ি দেওয়ার জন্য সাঁকোর ব্যবস্থা আছে। তৎক্ষণাৎ ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশ রাজা ৯ম লুইয়ের ভাই রবার্টের নেতৃত্বে অত্যন্ত গোপনে মূল বাহিনী থেকে সরে পড়ে এবং নদী পাড়ি দিয়ে পেছন থেকে নদীর তীরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। সেদিন ছিল ৬৪৭ হিজরি সনের ৪ জিলকদ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি)।
তুরানশাহ তখনও মিশরে এসে পৌঁছাননি। শাজারাতুদ-দুর তাই ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় বিশেষ বাহরি মামলুক বাহিনীকে প্রেরণ করেন। বাহিনীটির প্রধান ছিলেন আয-যাহির বাইবার্স। মহান মুসলিম বীর বাইবার্সই পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসের মহানায়ক। ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে যে চারজন সংগ্রামী মুসলিম বীরযোদ্ধা বিশেষ কর্ম-অবদানে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন, তিনি তাদের চতুর্থজন। প্রথম তিনজন—ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন জিনকি ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির কথা তো আগেই বলা হয়েছে। স্বভাবতই আমাদের পরবর্তী আলোচনা রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে ঘিরেই আবর্তিত হবে।
বাইবার্স পথিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গায় তার সৈন্যদের মোতায়েন করে মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে রবার্টের বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মামলুক বাহিনীর প্রবল আক্রমণে ক্রুসেডার বাহিনীটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জীবিত দু-চারজন তাড়া খেয়ে নদীতে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারায়।
এরই মধ্যে তুরানশাহ উপস্থিত হন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দিমইয়াত থেকে মানসুরা আসার পথের মাঝে অবস্থান নেন। ৬৪৭ হিজরি সনের ৯ জিলহজ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ) এ পথে ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য রসদপত্র নিয়ে একটি নৌবহর এগিয়ে আসলে মিশরীয় নৌবাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা প্রতিপক্ষের আশিটির অধিক জাহাজ আটক করতে সক্ষম হয়। ফলে ক্রুসেড শিবিরে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ৬৪৮ হিজরি সনের ২ মুহাররম (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল) তুরানশাহ তার বাহিনী নিয়ে ফারিসকুর নামক স্থানে ক্রুসেডারদের নৌবাহিনীর মোকাবিলা করেন এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদেরকে পরাজিত করেন। প্রায় পাঁচ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়।
এদিকে রাজা ৯ম লুইয়ের নেতৃত্বে মূল ক্রুসেডার বাহিনী নদী পাড়ি দিয়ে বাইবার্সের বাহিনীর মুখোমুখি হয়। বাইবার্স তার ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করেন এবং বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেন। মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে প্রায় ত্রিশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য নিহত হয়, নদীতে ডুবে মারা যায় প্রচুর সৈন্য। পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনী পলায়ন করার সময় ৬৪৮ হিজরি সনের ২ মুহাররম (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল) রাজা ৯ম লুইকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয়। এভাবে ক্রুসেডারদের সপ্তম অভিযানও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
মুসলিম শক্তির দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, সপ্তম ক্রুসেড অভিযানের পরই আইয়ুবি সালতানাতের পতন ঘটে এবং ইসলামি বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয় মামলুক সাম্রাজ্য। পরবর্তী সময়ে কেবল ক্রুসেডারদের দমন নয়; সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক তাতারিদের দমনেও মামলুক সাম্রাজ্যের অসামান্য অবদান ছিল।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সপ্তম ক্রুসেড-পরবর্তী সময়

📄 সপ্তম ক্রুসেড-পরবর্তী সময়


যুদ্ধ শেষে তুরানশাহ 'আল-মালিকুল মুয়াযযাম' উপাধি ধারণ করে আইয়ুবি সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি চার লক্ষ দিনারের সমপরিমাণ অর্থ মুক্তিপণ ও দিমইয়াতের নিয়ন্ত্রণ ফেরত লাভের বিনিময়ে রাজা লুইকে তার পরিজন ও অন্যান্য বন্দি সৈন্যসহ মুক্তি দিয়ে দেন।
এরপর সুলতান তুরানশাহ শাজারাতুদ-দুরের কাছে তার পিতার সম্পদ দাবি করেন এবং মামলুকদের বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করেন। অবশেষে মামলুকরা তুরানশাহকে দায়িত্ব গ্রহণের সত্তর দিনের মাথায় হত্যা করে এবং ৬৪৮ হিজরি সনের সফর মাসে ‘উম্মে খলিল শাজারাতুদ-দুর’কে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। ইতিপূর্বে কোনো নারী মুসলমানদের শাসনভার গ্রহণ করেনি। শাজারাতুদ-দুর অবশ্য কিছুদিন পরই নিজেকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেন।
এরপর মামলুকরা আইয়ুবি পরিবারের জনৈক রাজপুত্র আল-আশরাফ মুসা বিন ইউসুফ বিন মাসউদ বিন আল-কামিলকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে। মাত্র আট বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসার তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচন করা হয় সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুবের ক্রীতদাস ইযযুদ্দিন আইবেক তুর্কমানিকে। ইযযুদ্দিন শাজারাতুদ-দুরকে বিয়ে করেন এবং কিছুদিন না যেতেই মুসাকে অপসারণ করে নিজেই সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্জন করেন। এর মাধ্যমে মিশরে আইয়ুবি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। শামে অবশ্য এরপরও কিছুদিন আইয়ুবি সাম্রাজ্য টিকে ছিল। পরবর্তীকালে শামকেন্দ্রিক আইয়ুবি রাষ্ট্র সীমিত স্বাধীনতাসহ মামলুকদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।
৬৫৫ হিজরি সনে (১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইযযুদ্দিন আইবেক নিহত হন। কিছুদিন পর শাজারাতুদ-দুরকেও হত্যা করা হয়। এরপর ইযযুদ্দিন আইবেকের আগের স্ত্রীর পুত্র নুরুদ্দিন আলি ‘আল-মালিকুল মানসুর’ উপাধি ধারণ করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। নুরুদ্দিনের বয়স তখন মাত্র এগারো! তাই সেনাপতি সাইফুদ্দিন কুতুজ তার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকেন। তার শাসনামলেই ৬৫৬ হিজরি সনে সমকালীন মুসলিম উম্মাহর জীবনে এক বিরাট বিপর্যয় সংঘটিত হয়—তাতারিদের হাতে বাগদাদের পতন ঘটে এবং খিলাফতব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটে। পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাইফুদ্দিন কুতুজ মিশরের আলিম-উলামা ও কাজিদেরকে সমবেত করেন। সকলে কিশোর সুলতানকে অপসারণ করে তাকে দায়িত্বগ্রহণের ফতোয়া প্রদান করে। অবশেষে ৬৫৭ হিজরি সনে সাইফুদ্দিন কুতুজ ‘আল-মালিকুল মুযাফফার’ উপাধি ধারণ করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন।
৬৫৮ হিজরিতে তাতারি নেতা হালাকু খান সাতদিন অবরোধের পর আলেপ্পোতে প্রবেশ করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালান। আলেপ্পোতে বাগদাদের চেয়েও অধিক সংখ্যক মানুষ হালাকুবাহিনীর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। কেবল খ্রিষ্টান নাগরিকরাই গণহত্যা হতে রেহাই পায়। এ সময় তাতারিদের আগ্রাসনের সংবাদ পেয়ে পার্শ্ববর্তী হামা অঞ্চলের প্রশাসক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন এবং হালাকুবাহিনী সেদিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই নগরদ্বারের চাবি হালাকু খানের কাছে পাঠিয়ে দেন।
৬৫৮ হিজরি সনের সফর মাসের শেষ দিকে (১২৬০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) হালাকুবাহিনী কোনোরূপ বাধা-বিপত্তি ছাড়াই দামেশকে প্রবেশ করে। দামেশকের দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত দুর্গ জয় করার জন্য তাতারিরা উপর্যুপরি গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একসময় দুর্গের অধিবাসীরা নতি স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করে। হালাকু খান ইবিল সিয়ান নামক জনৈক তাতারিকে দামেশক নগরী ও দুর্গের শাসনভার প্রদান করেন।
তৎকালীন ইসলামি প্রাচ্যের তিন বৃহৎ নগরী বাগদাদ, আলেপ্পো ও দামেশকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর তাতারিরা একে একে বালাবাক্কু, আজালুন (Ajloun), সাল্‌ত (Al-Salt), হাওরান (The Hauran), নাবলুস, গাজা, জেবরিন ও হেবরন (Hebron)-সহ পুরো শাম অঞ্চল দখল করে নেয় এবং প্রতিটি অঞ্চলে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। শামে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তাতারিরা এবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মামলুক নিয়ন্ত্রিত মিশরের প্রতি।
মিশরের সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাতারিরা মিশরে আগমনের পূর্বে নিজেই অগ্রসর হয়ে তাদের উপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার বাহিনী প্রস্তুত করে শাম অভিমুখে রওনা হন। সংবাদ পেয়ে হালাকু খানের প্রধান সহকারী কিতবুগার নেতৃত্বে বিশাল তাতারি বাহিনী কুতুজের বাহিনীর দফারফা করতে অগ্রসর হয়।
৬৫৮ হিজরি সনের রমজান মাসে (১২৬০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) আইনে জালুতের প্রান্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে এক যুগান্তকারী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে তাতারি বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়, তাদের সেনাপতি কিতবুগা ও বহু সৈন্য নিহত হয়। সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজ তার সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে পরাজিত তাতারি বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিলে তিনি সুদূর আলেপ্পো পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করেন।
আইনে জালুতে তাতারি বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ দামেশকে পৌঁছলে সেখানে অবস্থানরত তাতারিরাও পালিয়ে যায়। দামেশকের মুসলিম অধিবাসীগণ তাদের পিছু নিয়ে তাদেরকে হত্যা করে এবং তাদের হাতে বন্দি মুসলমানদের মুক্ত করে।
সেনাপতি রুকনুদ্দিন বাইবার্স শামের অধিকাংশ এলাকা আইয়ুবি পরিবারের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মামলুক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। রুকনুদ্দিনের সাফল্যে খুশি হয়ে সুলতান কুতুজ তাকে আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সক্ষম হননি। মিশরে ফেরার পর বাইবার্স তাকে হত্যা করে মামলুক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (৫৮৭) রুকনুদ্দিন বাইবার্সের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়েই মূলত বাহরি মামলুক সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই রুকনুদ্দিন বাইবার্স মামলুক সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সুবিন্যস্তকরণ, সেনাবাহিনীর সংস্কার ও নৌবহর নির্মাণে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি শামের নিরাপত্তাব্যবস্থা দৃঢ়করণে মনোযোগ দেন এবং দামেশক ও কায়রোর মাঝে বার্তাবাহী কবুতরবিশিষ্ট দ্রুতগামী ডাকব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি তাতারিদের আগ্রাসনের পর বাগদাদ থেকে পালিয়ে বেড়ানো জনৈক আব্বাসি রাজপুত্রকে মিশরে নিয়ে আসেন এবং তার হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে ইসলামি খিলাফতব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন।
মামলুক সাম্রাজ্যকে তখন একই সঙ্গে তিন-তিনটি প্রবল শক্তিধর প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। এক দিকে ছিল ধেয়ে আসা তাতারিদের হুমকি, আরেক দিকে ছিল ক্রুসেডারদের অব্যাহত রাজ্যবিস্তৃতির প্রচেষ্টা। আর তৃতীয় শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল শিয়া বাতিনি হাশাশিন গোষ্ঠী।
সুলতান বাইবার্স ৬৬১ হিজরি সনে (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) শামের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই শুরু করেন। প্রথমেই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত খ্রিষ্টানদের তীর্থভূমি নাজারেথ (Nazareth) অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নগরীটি জয় করে নেন। এরপর তিনি রাজ্যটির রাজধানী আক্কা অভিমুখে অগ্রসর হন। আক্কার উপকণ্ঠে সংঘটিত এক প্রচণ্ড যুদ্ধে বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ৩য় কনরাড (Conrad III)-কে পরাজিত করেন। পরাজিত কনরাড পালিয়ে আক্কার দুর্গে আশ্রয় নেন। সুলতান বাইবার্স কিছু সৈন্যকে আক্কা অবরোধে নিয়োজিত করে নিজে আরসুফ অভিমুখে রওনা হন। টানা চল্লিশ দিন অবরোধ করে রাখার পর আরসুফের ক্রুসেডার সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে।
পরের বছর সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের আরেক দুর্ভেদ্য দুর্গ আতলিত (Athlith) অবরোধ করেন এবং যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করে নেন। আতলিত বিজয়ের পর সুলতান বাইবার্স হাইফা অভিমুখে রওনা হন। হাইফা অবরোধ করার পর সুলতানের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে বিরামহীন পাথর ও গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে নগরপ্রাচীর ভেঙে পড়লে মুসলিম বাহিনী হাইফায় প্রবেশ করে নগরীটি দখল করে নেয়।
৬৬৩ হিজরি সনে (১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) বাইবার্সের নেতৃত্বে মামলুক বাহিনী কায়সারিয়া অবরোধ করে। নাইট হসপিটালারদের সঙ্গে নিয়ে ক্রুসেডার বাহিনী চল্লিশ দিন পর্যন্ত অবিচল থাকলেও একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কায়সারিয়া জয়ের পর বাইবার্স তার অন্যতম সেনাপতি কালাউন ও আল-মানসুর আলিকে পাঠান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কিলিকিয়া অঞ্চল জয়ের জন্য আর নিজে রওনা হন সাফাদ (Safad) নগরী জয়ের লক্ষ্যে।
কালাউন ও আল-মানসুর আলির নেতৃত্বে মামলুক বাহিনীর একটি অংশ ৬৬৪ হিজরি সনের (১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যে আদানা ও তারসুসসহ পুরো কিলিকিয়া অঞ্চল জয় করতে সক্ষম হয়। এদিকে সুলতান বাইবার্স নিজে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যভুক্ত সাফাদ নগরী অবরোধ করেন। দুই হাজার নাইট টেম্পলারের উপস্থিতি সত্ত্বেও ভীত ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণ করে সাফাদ নগরীর নিয়ন্ত্রণ বাইবার্সের হাতে তুলে দেয়। এরপর বাইবার্স একে একে আসকালান ও জাফাও জয় করেন। এর ফলে শামের পুরো উপকূলীয় অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে চলে আসে আর বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেড রাজ্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে কেবল আক্কা নগরীতে।
বাইতুল মুকাদ্দাস ক্রুসেড রাজ্যের দফারফা করে সুলতান বাইবার্স এবার নজর দেন আরেক ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের প্রতি। ৬৬৬ হিজরি সনে (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি এন্টিয়ক অবরোধ করেন। দীর্ঘ অবরোধের পর ৬৬৬ হিজরি সনের ৪ রমজান (১২৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ মে) এন্টিয়কের সাধারণ জনগণ আত্মসমর্পণ করলে এন্টিয়কের পতন ঘটে। নগরীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত দশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিলে মামলুক বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে ২০ মে তাদেরকেও পরাভূত করে। ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুন প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধের শুরুর দিকে পতন ঘটেছিল ঐতিহ্যবাহী এন্টিয়ক নগরীর। দীর্ঘ একশ সত্তর বছর পর অবশেষে পুনরায় সেখানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকে নিয়ে এখনও পর্যন্ত এন্টিয়ক মুসলমানদের অধিকারে আছে।

টিকাঃ
৫৮৭. এর কারণ সম্পর্কে জানতে দেখুন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ইসলামি ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, ৩য় খণ্ড।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 অষ্টম ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 অষ্টম ক্রুসেড যুদ্ধ


[৬৬৮-৬৬৯ হিজরি/১২৬৯-১২৭০ খ্রিষ্টাব্দ]
এন্টিয়কের পতন যেন ছিল ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের চূড়ান্ত পতনধ্বনি। এডেসা রাজ্যের তো আগেই পতন ঘটেছে, মামলুক ঝড়ে এন্টিয়ক ক্রুসেড রাজ্যও হারিয়ে গেছে বিশ্ব মানচিত্র থেকে। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য সীমিত হয়ে পড়েছে আক্কা নগরীতে। তুলনামূলক ক্ষুদ্র ত্রিপোলি ক্রুসেড রাজ্য লেবানন অঞ্চলের সামান্য অংশ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। স্বভাবতই এতে ইউরোপ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পোপ ৪র্থ ক্লেমন্ত (Pope Clement IV) তাই নতুন করে ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে ইউরোপজুড়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। অভিযানে অংশ নিতে সম্মতি জানান ইংল্যান্ডের যুবরাজ অ্যাডওয়ার্ড, সাইপ্রাসের রাজা ৩য় হিউ (Hugh III of Cyprus) এবং সপ্তম ক্রুসেডের সর্বাধিনায়ক ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই। তাদের সঙ্গে আরও যোগ দেন তাতারি রাজ্য ইলখানাতের শাসক ও হালাকু খানের পুত্র আবাগা খান। সিদ্ধান্ত হয়, রাজা ৯ম লুই মামলুক সাম্রাজ্যের পশ্চিম কোণ তিউনিসিয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে একে একে (লিবিয়ার) ত্রিপোলি ও কায়রো দখল করে নেবেন, এরপর সরাসরি আল-কুদস অভিমুখে অগ্রসর হবেন; অ্যাডওয়ার্ড ও হিউ নৌপথে আক্কায় পৌঁছে আল-কুদসে হামলা চালাবেন আর আবাগা খান মামলুক সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে একে একে আলেপ্পো ও দামেশক দখল করে নেবেন, এরপর ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-সাইপ্রাস বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে আল-কুদস দখল করবেন।
এদিকে এন্টিয়ক রাজ্যের দফারফা করার পর রুকনুদ্দিন বাইবার্স কায়রোতে ফিরে যান। কিছুদিন পর তিনি আবারও শাম অঞ্চলে অভিযান চালান। এবার তিনি আক্রমণ করেন শামের নাসিরিয়া পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থিত শিয়া বাতিনি রাজ্য মাসইয়াফে। ৬৫৪ হিজরি সনে (১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) পারস্যের বাতিনি হাশাশিন রাজ্যের পতন ঘটলেও শামের বাতিনি রাজ্যটি তখনও টিকে ছিল। পূর্বে নাসিরিয়া পর্বতমালা হতে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে এন্টিয়ক রাজ্যসীমা হতে দক্ষিণে ত্রিপোলি রাজ্যসীমা পর্যন্ত ছিল বাতিনি হাশাশিন গোষ্ঠীর রাজ্যবিস্তৃতি। রাজ্যজুড়ে ছিল দুর্ভেদ্য উনিশটি দুর্গ। বাইবার্স তার বাহিনীকে অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি দুর্গকে তিনদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। খোলা থাকে কেবল পশ্চিমে সাগরের দিক। সুকঠিন অবরোধ ও অনবরত গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স এক বছরের মধ্যে একে একে সবগুলো দুর্গের পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এর ফলে পৃথিবী শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর বর্বরতা থেকে চিরতরে নিষ্কৃতি লাভ করে।
রাজা ৯ম লুই ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে ইতালির নেপলস ও আন্দালুসের খ্রিষ্টরাজ্য নাফারের সহায়ক বাহিনী নিয়ে ৬৬৮ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (১২৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) তিউনিসিয়ার কার্থেজ (Carthage) নগরীর উপকূলে পৌঁছান। তিউনিসিয়ার তৎকালীন শাসকপরিবার বনু হাফস মুসলমান হলেও ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখে চলত। কিন্তু তিউনিসিয়ায় পৌঁছেই ক্রুসেডার বাহিনী মহামারির শিকার হয় এবং অনেক সৈন্য আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে ইহধাম ত্যাগ করে। খোদ রাজা লুই-ও ২৫ আগস্ট মারা যান। তখন বাকিরা সামনে অগ্রসর না হয়ে সেখান থেকেই নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। এ সংবাদ জানতে পেরে অ্যাডওয়ার্ড ও হিউয়ের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড ও সাইপ্রাসের বাহিনী এবং আবাগা খানের নেতৃত্বাধীন তাতারি বাহিনীও অভিযানের চিন্তা বাদ দেয়। এভাবে অষ্টম ক্রুসেডও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
শাম অঞ্চলে বাতিনি রাজ্যের অবরোধে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় বাইবার্স ক্রুসেডারদের সংগঠিত হওয়ার সংবাদ জানতে পেরে দ্রুত কায়রোতে ফিরে এসেছিলেন। ক্রুসেডারদের প্রস্থানের পর তিনি পুনরায় শাম অঞ্চলে ফিরে যান। ১২৭১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে তিনি জয় করেন ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ বুর্জ সাফিতা (Chastel Blanc)। এরপর তিনি অবরোধ করেন ত্রিপোলি নগরী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00