📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড যুদ্ধ
[৬২৫-৬২৬ হিজরি/১২২৮-১২২৯ খ্রিষ্টাব্দ]
৬২৫ হিজরি সনে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দে) জার্মানির রাজা ২য় ফ্রেডেরিক (Frederick II) আল-কুদসের শাসনক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ক্রুসেড অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। পুরো ইউরোপীয় বাহিনীই তার সঙ্গে এ অভিযানে যোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ফ্রেডেরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পোপ ও বিভিন্ন অঞ্চলের খ্রিষ্টান শাসকবর্গ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয় এবং তার সঙ্গে অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে ফ্রেডেরিক একাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
আইয়ুবি সাম্রাজ্য তখন ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকেই হুমকির সম্মুখীন ছিল। একদিকে সুলতান আল-কামিলের সঙ্গে তার ভাই মুয়াযযাম ও আশরাফের প্রচণ্ড বিরোধ চলছিল এবং একে কেন্দ্র করে পারস্পরিক লড়াইয়ের উপক্রম হয়েছিল, অপরদিকে বাইরে থেকে খোয়ারিজমিরাও আইয়ুবি সাম্রাজ্যের কাঁধে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। চেঙ্গিস খানের আগ্রাসনে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া খোয়ারিজমিরা তখন ইস্পাহানে সমবেত হয়ে শক্তি সঞ্চয়ে সচেষ্ট ছিল এবং ধীরে ধীরে শাম ও ইরাকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। দ্বিমুখী চাপে অস্থিরপ্রায় আইয়ুবি সুলতান আল-কামিল যখন জানতে পারেন যে, নতুন বিপদরূপে জার্মানির সম্রাট ফ্রেডেরিক আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন, তখন তিনি ফ্রেডেরিকের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। ৬২৬ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২২৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) সম্পাদিত চুক্তিটির শর্তের মধ্যে ছিল—আল-কামিল আল-কুদস, আক্কা ও জাফার নিয়ন্ত্রণ ফ্রেডেরিকের হাতে ছেড়ে দেবেন এবং বন্দি ক্রুসেডারদের মুক্তি দেবেন। অপরদিকে আল-কামিল যখন যার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন—হোক সে খ্রিষ্টান—ফ্রেডেরিক তখন আল-কামিলকে সহায়তা করবেন এবং আগামী সাড়ে দশ বছর তিনি শামের ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের কাছে যেকোনো ধরনের সামরিক সাহায্য পৌঁছতে বাধা প্রদান করবেন।
এভাবে জার্মানির রাজা ফ্রেডেরিক বিনা যুদ্ধেই আল-কুদসের কর্তৃত্ব লাভ করেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আইয়ুবি সুলতান আল-কামিলের জীবনের অন্যতম গর্হিত অন্যায়। তার এই নির্বুদ্ধিতার কারণে মহাবীর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক পুনরুদ্ধারের মাত্র বিয়াল্লিশ বছর পর আল-কুদস আবারও চলে যায় ক্রুসেডারদের দখলে।
📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড-পরবর্তী সময়
ফ্রেডেরিকের সঙ্গে সমঝোতা করার পর সুলতান আল-কামিল তার পূর্ণ শক্তি ব্যয় করেন নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে তাদের শাসনাধীন অঞ্চল কেড়ে নেওয়ার কাজে। আইয়ুবি রাজপরিবারের সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাভূত করে তিনি পুরো অঞ্চল নিজের কর্তৃত্বে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ সময় প্রায় নয় বছর তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে কোনো লড়াই করেননি।
আল-কামিল মুহাম্মাদ তার শাসনামলের শেষ দিকে ৬৩৫ হিজরি সনে (১২৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) দামেশক দখলের উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন এবং দামেশক জয় করেন। এ বিজয়ের কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর আইয়ুবি সাম্রাজ্যের প্রশাসকদের পারস্পরিক সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
আল-কামিলের মৃত্যুর পর তার পুত্র (২য় আদিল) সাইফুদ্দিন আবু বকর তার স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু তিনি শাসনকার্যে মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে ভোগবিলাসে মত্ত ছিলেন। ফলে প্রশাসকগণ মিলে দু-বছর পর ৬৩৭ হিজরি সনে (১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে) তাকে অপসারণ করে।
এরপর আইয়ুবি সাম্রাজ্যের হাল ধরেন আল-কামিলের আরেক পুত্র আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব। তিনি ছিলেন আইয়ুবি সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি সব ধরনের ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নির্মূল করে যথাযথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবিধান এবং আইয়ুবি সেনাবাহিনীর জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৬৩৮ হিজরি সনে কায়রোর অদূরে নীল নদের রওজা দ্বীপে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং প্রচুর সংখ্যক তুর্কি মামলুক (ক্রীতদাস) ক্রয় করে সেখানে জড়ো করেন। সুলতান তাদের সঙ্গে দাসের মতো আচরণ করতেন না; বরং সন্তানের ন্যায় স্নেহ করতেন। সুলতানের তত্ত্বাবধানে প্রথমেই তাদের কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করা হতো। এরপর তাদেরকে অশ্বারোহণ, তিরন্দাজি ও তরবারি চালনাসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিদ্যার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। পাশাপাশি তাদেরকে প্রদান করা হতো নেতৃত্ব, যুদ্ধ পরিচালনা, যুদ্ধের পরিকল্পনা প্রণয়ন, সামরিক সমস্যাবলির সমাধান ইত্যাদি বিষয়ের বাস্তব জ্ঞান। সুলতান নিজে যাবতীয় কর্মকাণ্ড তদারকি করতেন। মামলুকদের কেউ সামরিক বা ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষ প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটালে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হতো; ক্ষেত্রবিশেষে রাজ্যের কিছু এলাকার জায়গির প্রদান করা হতো। যোগ্যতা ও প্রতিভাবলে মামলুকদের অনেকেই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের সেনাপতি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসকের দায়িত্বও লাভ করে। পরবর্তীকালে তারাই মামলুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং রওজা দ্বীপের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে ‘বাহরি মামলুক’ নামে পরিচিতি লাভ করে। সুলতান সালিহ আইয়ুবের প্রতি সম্বন্ধ করে তাদেরকে ‘সালিহি মামলুক’ও বলা হয়।
📄 দ্বিতীয়বার আল-কুদস পুনরুদ্ধার
সুলতান সালিহ আইয়ুব ৬৪২ হিজরি সনে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। তেরো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে তিনি রওনা হন আল-কুদসের উদ্দেশে। সংবাদ পেয়ে শামের বিভিন্ন এলাকার ক্রুসেডাররা সমবেত হয়ে ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটায়। পরিতাপের বিষয়, হিমস ও আলেপ্পোসহ শামের বিভিন্ন এলাকার আইয়ুবি প্রশাসকগণও তাদের সমর্থন জানায় এবং আল-মালিকুস সালিহের বাহিনীর প্রতিরোধের লক্ষ্যে ক্রুসেডারদের সঙ্গে নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে জড়ো হয়! সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বিশ হাজার। আল-কুদসের পথে গাজার নিকটে আল-মালিকুস সালিহের বাহিনী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় এবং তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এরপর তারা সামনে অগ্রসর হয়ে আল-কুদস অবরোধ করে। মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণে এগারো হাজার সৈন্যবিশিষ্ট আল-কুদসের স্থানীয় ক্রুসেডার বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে; পনেরো বছর পর আবারও আল-কুদসে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে একটানা ছয়শ তিরানব্বই বছর পবিত্র আল-কুদস নগরী ইসলামি শাসনাধীন ছিল। ১৩৩৫ হিজরি সনে (১৩১৭ খ্রিষ্টাব্দে) ব্রিটিশ বাহিনী আল-কুদস দখল করে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকে আল-কুদস আজও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে আরেকজন আইয়ুবি বা আইয়ুবের প্রতীক্ষায়; যিনি হবেন আল-কুদসের তৃতীয় পুনরুদ্ধারকারী।
📄 সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধ
[৬৪৭-৬৪৮ হিজরি/১২৪৯-১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ]
৬৪২ হিজরি সনে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুবের হাতে আল-কুদসের কর্তৃত্ব হারানোর পর ইউরোপে নতুন করে ক্রুসেড যুদ্ধের আওয়াজ ওঠে। ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই (Louis IX of France) এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং ইউরোপজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তৎকালীন পোপ ৪র্থ ইনোসেন্ট (Pope Innocent IV) ১২৪৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা লুইকে সমর্থন জানান এবং অভিযানের সফলতার বিষয়ে ধর্মীয় নিশ্চয়তা প্রদান করেন। রাজা ৯ম লুই পরবর্তী তিন বছর অভিযানের প্রস্তুতিতে ব্যয় করেন। এ সময় তিনি তৎকালীন পরাশক্তি তাতারিদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনেরও চেষ্টা চালান। কিন্তু তাতারিরা নিজেদের মতো করে সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী থাকায় তার এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সুলতান সালিহ আইয়ুবের শাসনামলের শেষ দিকে ৬৪৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) এক লক্ষের অধিক সৈন্যের সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ফ্রান্সের রাজা ৯ম লুই-এর নেতৃত্বে আঠারোশ জাহাজে করে মিশর অভিমুখে রওনা হয়। যদিও ক্রুসেডার বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল আল-কুদস পুনরুদ্ধার; কিন্তু তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল-কুদস ও শাম অঞ্চলে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে মিশর অধিকার করতে হবে। মিশর দখল না করে আল-কুদস পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও পূর্বের দু-বারের ন্যায় হয়তো তা আবারও হাতছাড়া হয়ে যাবে।
৬৪৭ হিজরি সনের ২২ সফর (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুন) ক্রুসেডার বাহিনী দিমইয়াতে অবতরণ করে এবং কয়েকদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দিমইয়াতের দুর্গ দখল করে নেয়। দুর্গের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল ক্ষুদ্র একটি বাহিনী। তারা দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখলেও কায়রো থেকে সামরিক সহায়তা না আসায় একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে দুর্গ ত্যাগ করে।
আইয়ুবি সুলতান আল-মালিকুস সালিহ আইয়ুব তখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। সুলতানের স্ত্রী শাজারাতুদ-দুর তৎক্ষণাৎ জাযিরা অঞ্চলে অবস্থানরত সুলতানের পুত্র তুরানশাহর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে দ্রুত মিশরে চলে আসতে বলেন। ১৫ শাবান (২৩ নভেম্বর) সুলতান আইয়ুব মৃত্যুবরণ করলে শাজারাতুদ-দুর তার মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখেন এবং সুলতানের নকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি রেখে সকলকে বোঝান যে, সুলতানই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি সেনাপতি ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সমবেত করে জানান যে, সুলতান তাদেরকে সুলতান-পুত্র তুরানশাহর নামে বায়আত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে সকলে তুরানশাহর নামে বায়আত গ্রহণ করে।
দিমইয়াত দখলের প্রায় ছয় মাস পর ৬৪৭ হিজরি সনের শাবান মাসে (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) ক্রুসেডার বাহিনী মানসুরা নগরী অভিমুখে রওনা হয়। কিন্তু তারা ইতিপূর্বে আল-কামিলের যুগে যে ভুল করেছিল, এবারও সেই একই ভুল করে। তারা পূর্বের ন্যায় এবারও দিমইয়াত ও মানসুরা হয়ে কায়রো দখলের চেষ্টা করে। এ পথে তাদের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর খাল, নদী ও শাখা নদী প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল।
৬৪৭ হিজরি সনের ১৪ রমজান (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর) ক্রুসেডার বাহিনী এসে পৌঁছায় আল-বাহরুস সগিরের তীরে। নদীর অপর তীরেই মানসুরা নগরী। এ সময় ক্রুসেডার বাহিনী নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলে অপর পারে অবস্থানরত আইয়ুবি বাহিনীর তীব্র তিরবৃষ্টির শিকার হয়। টানা কয়েক সপ্তাহ নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ক্রুসেডার বাহিনী যখন দিমইয়াতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই স্থানীয় জনৈক খ্রিষ্টান নাগরিকের মাধ্যমে তারা জানতে পারে, কয়েক মাইল দূরেই নদীর তুলনামূলক অপ্রশস্ত একটি জায়গায় পাড়ি দেওয়ার জন্য সাঁকোর ব্যবস্থা আছে। তৎক্ষণাৎ ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশ রাজা ৯ম লুইয়ের ভাই রবার্টের নেতৃত্বে অত্যন্ত গোপনে মূল বাহিনী থেকে সরে পড়ে এবং নদী পাড়ি দিয়ে পেছন থেকে নদীর তীরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। সেদিন ছিল ৬৪৭ হিজরি সনের ৪ জিলকদ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি)।
তুরানশাহ তখনও মিশরে এসে পৌঁছাননি। শাজারাতুদ-দুর তাই ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় বিশেষ বাহরি মামলুক বাহিনীকে প্রেরণ করেন। বাহিনীটির প্রধান ছিলেন আয-যাহির বাইবার্স। মহান মুসলিম বীর বাইবার্সই পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসের মহানায়ক। ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে যে চারজন সংগ্রামী মুসলিম বীরযোদ্ধা বিশেষ কর্ম-অবদানে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন, তিনি তাদের চতুর্থজন। প্রথম তিনজন—ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন জিনকি ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির কথা তো আগেই বলা হয়েছে। স্বভাবতই আমাদের পরবর্তী আলোচনা রুকনুদ্দিন বাইবার্সকে ঘিরেই আবর্তিত হবে।
বাইবার্স পথিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গায় তার সৈন্যদের মোতায়েন করে মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে রবার্টের বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মামলুক বাহিনীর প্রবল আক্রমণে ক্রুসেডার বাহিনীটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জীবিত দু-চারজন তাড়া খেয়ে নদীতে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারায়।
এরই মধ্যে তুরানশাহ উপস্থিত হন এবং তার সৈন্যদের নিয়ে দিমইয়াত থেকে মানসুরা আসার পথের মাঝে অবস্থান নেন। ৬৪৭ হিজরি সনের ৯ জিলহজ (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ) এ পথে ক্রুসেডার বাহিনীর জন্য রসদপত্র নিয়ে একটি নৌবহর এগিয়ে আসলে মিশরীয় নৌবাহিনী তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা প্রতিপক্ষের আশিটির অধিক জাহাজ আটক করতে সক্ষম হয়। ফলে ক্রুসেড শিবিরে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ৬৪৮ হিজরি সনের ২ মুহাররম (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল) তুরানশাহ তার বাহিনী নিয়ে ফারিসকুর নামক স্থানে ক্রুসেডারদের নৌবাহিনীর মোকাবিলা করেন এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদেরকে পরাজিত করেন। প্রায় পাঁচ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়।
এদিকে রাজা ৯ম লুইয়ের নেতৃত্বে মূল ক্রুসেডার বাহিনী নদী পাড়ি দিয়ে বাইবার্সের বাহিনীর মুখোমুখি হয়। বাইবার্স তার ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়েই সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করেন এবং বীরত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেন। মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে প্রায় ত্রিশ হাজার ক্রুসেডার সৈন্য নিহত হয়, নদীতে ডুবে মারা যায় প্রচুর সৈন্য। পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনী পলায়ন করার সময় ৬৪৮ হিজরি সনের ২ মুহাররম (১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল) রাজা ৯ম লুইকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয়। এভাবে ক্রুসেডারদের সপ্তম অভিযানও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
মুসলিম শক্তির দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, সপ্তম ক্রুসেড অভিযানের পরই আইয়ুবি সালতানাতের পতন ঘটে এবং ইসলামি বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয় মামলুক সাম্রাজ্য। পরবর্তী সময়ে কেবল ক্রুসেডারদের দমন নয়; সময়ের মূর্তিমান আতঙ্ক তাতারিদের দমনেও মামলুক সাম্রাজ্যের অসামান্য অবদান ছিল।