📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 তৃতীয় ক্রুসেড-পরবর্তী সময়

📄 তৃতীয় ক্রুসেড-পরবর্তী সময়


ক্রুসেডার বাহিনীর প্রস্থানের পর সুলতান সালাহুদ্দিনের সুশাসনে জনসাধারণ নিরাপদে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। তার উদার আচরণের কারণে আল-কুদসে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমনও প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এমনকি ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড অধিক হারে তীর্থযাত্রীদের আগমনে সুলতান সালাহুদ্দিনের ক্রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করে সুলতানের কাছে বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন আল-কুদসে তীর্থযাত্রীদের অবাধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং রাজা রিচার্ডের লিখিত অনুমতিপত্র বা নিদর্শন ছাড়া কাউকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি না দেন। কিন্তু সুলতান এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে প্রত্যুত্তরে লেখেন, তারা এত দূর থেকে এই পবিত্র স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছেছে। আমি তাদের বাধাদান মোটেও বৈধ মনে করি না।
এর কিছুদিন পরই মহান সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারো দিন অসুস্থ থাকার পর ৫৮৯ হিজরি সনের ২৭ সফর (১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ) বুধবার তার বিদেহী আত্মা পরম প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করে। আল-কুদস মুক্তকারী এই মহান মুসলিম বীর যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে ছিল মাত্র সাতচল্লিশটি দিরহাম ও একটি দিনার! এ ছাড়া অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার ছিল না।
সুলতান সালাহুদ্দিনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন আইয়ুবি রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি তার ভাই ও দামেশকের প্রশাসক আফজালের সঙ্গে বিরোধ ও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। দু-ভাইয়ের সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে আফজালকে দামেশক থেকে নির্বাসিত করার মাধ্যমে। দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সালাহুদ্দিনের ভাই ও জাযিরার প্রশাসক আল-আদিল সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ। সাইফুদ্দিন অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ শাসক ছিলেন। দামেশকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাদি দমন করার পর শামের সকল অঞ্চল তার বশীভূত হয়ে যায়।
৫৯৫ হিজরি সনে (১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। তখন তার চাচা সাইফুদ্দিন মিশরে এসে সালাহুদ্দিনের অপর দুই পুত্রকে পরাভূত করেন এবং নতুন প্রশাসক (আল-আজিজ ইমাদুদ্দিনের পুত্র) মাত্র নয় বছর বয়সী মানসুর বিন আল-আজিজকে বরখাস্ত করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। ৫৯৬ হিজরি সনের মধ্যেই সালাহুদ্দিনের সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চল আল-আদিল সাইফুদ্দিনের আয়ত্তে চলে আসে। তার শাসনাধীন আইয়ুবি রাষ্ট্র পরিণত হয় সমকালীন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রে।
৫৯৩ হিজরি সনে সুলতান সাইফুদ্দিন যখন শাম অঞ্চলে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুতকরণে ব্যস্ত ছিলেন, তখন স্থানীয় ক্রুসেডাররা জার্মানির সামরিক সহায়তা লাভ করে। মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদের সুযোগ নিয়ে তারা এ সময় আবারও আল-কুদস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধে সাইফুদ্দিনকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে বৈরুতের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু এরপরই তারা নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আল-আদিল সাইফুদ্দিন জাফা ও রামলা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধ


[৫৯৯-৬০০ হিজরি/১২০২-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ]
খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মীয় গুরু পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট (Innocent III) ১২০২ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে ইউরোপে নতুন ক্রুসেডের ডাক দেন। এবারের অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে ফ্রান্সের আঞ্চলিক রাজন্যবর্গ। তারা ফ্রান্স থেকে প্রথমে মিশরে গমন করে তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের প্রধান শক্তি আইয়ুবি রাষ্ট্রকে পরাভূত করে তারপর আল-কুদস অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ক্রুসেডার বাহিনী যখন রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই হঠাৎ করে পট পরিবর্তন ঘটে। এ সময় কনস্টান্টিনোপলে বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় ইসহাক (Isaac II Angelos) তার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক বিদ্রোহে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তার পুত্র ৪র্থ অ্যালেক্সিয়াস (Alexius IV Angelus) পালিয়ে পশ্চিম ইউরোপে এসে পোপ ও ক্রুসেডারদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। বিনিময়ে তিনি পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স চার্চকে পোপের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়ার এবং ক্রুসেডারদের মিশর অভিযানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক সামরিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
ফলে সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি নিজেদের লক্ষ্যপথ পরিবর্তন করে এবার কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হয়! ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, অনেক বাইজান্টাইন নাগরিক তখন মনেপ্রাণে কামনা করছিল, হায়! এর পরিবর্তে যদি কনস্টান্টিনোপল মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে যেত! ক্রুসেডাররা বিভিন্ন গির্জা ও উমাইয়া শাসনামলে নির্মিত প্রাচীন মসজিদটি জ্বালিয়ে দেয় এবং নগরীজুড়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়।
এই অভিযানের ফলে (বিভক্ত হওয়ার পর) প্রথমবারের মতো প্রাচ্যকেন্দ্রিক অর্থোডক্স চার্চ পশ্চিমা ক্যাথলিক চার্চের বশীভূত হয়ে পড়ে। এরপর ক্রুসেড যোদ্ধাদের যুদ্ধস্পৃহায় ভাটা সৃষ্টি হয় এবং মিশর ও বাইতুল মুকাদ্দাস অভিযানের চিন্তা বাতিল হয়ে যায়।
ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের এই ক্ষয়িষ্ণু পরিস্থিতি পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মুসলমানদের সামনে বলকান ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বিজয়াভিযান পরিচালনার পথ সুগম করেছিল।
এ অভিযানের মাধ্যমে এ বিষয়টি আরও সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ মোটেও ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত ছিল না; তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদের লালসা চরিতার্থ করা।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 পঞ্চম ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 পঞ্চম ক্রুসেড যুদ্ধ


[৬১০-৬১৮ হিজরি/১২১৩-১২২১ খ্রিষ্টাব্দ]
৬১০ হিজরিতে (১২১৩ খ্রিষ্টাব্দে) পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানের ডাক দেন। চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধের মতো পঞ্চম ক্রুসেডেরও লক্ষ্য ছিল আইয়ুবি রাষ্ট্রকে পরাভূত করে আল-কুদস পুনর্দখল করা। পোপের নির্দেশে পরবর্তী দু-বছর ক্যাথলিক ইউরোপজুড়ে ক্রুসেড অভিযানের প্রচারণা চালানো হয়। ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে রোমে পোপের নেতৃত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পুরো অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অভিযানে রওনা হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয় ১২১৭ খ্রিষ্টাব্দ।
পঞ্চম ক্রুসেডে ইউরোপের যেসব শাসক অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-
• ডিউক অব অস্ট্রিয়া ৬ষ্ঠ লিওপোল্ড (Leopold VI) ।
• হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু (Andrew II) ।
• সাইপ্রাসের শাসক ১ম হিউ (Hugh I)।
• কাউন্ট অব ত্রিপোলি ৪র্থ বোহেমন্ড (Bohemond IV of Antioch) ।
কিন্তু অভিযান শুরু হওয়ার পূর্বেই ৬১৩ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২১৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) পোপ ৩য় ইনোসেন্ট ইহধام ত্যাগ করেন। এরপর অভিযান শুরু হতে না হতেই হাঙ্গেরির রাজা ২য় অ্যান্ড্রু নিজ দেশে ফিরে যান।
ক্রুসেডার বাহিনী মিশরে পৌঁছার পূর্বেই ৬১৫ হিজরি সনে (১২১৮ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান আল-আদিল সাইফুদ্দিন মাহমুদ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর আইয়ুবি সাম্রাজ্যের হাল ধরেন তার পুত্র আল-কামিল মুহাম্মাদ।
ক্রুসেডার বাহিনী মিশর অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং ১২১৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দিমইয়াতে পৌঁছে নৌবন্দরটি অবরোধ করে। ভূমধ্যসাগর হয়ে কায়রোতে পৌঁছতে আলেকজান্দ্রিয়া বা দিমইয়াত দুই নৌবন্দরের যেকোনো একটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হয়। তুলনামূলক কম সুরক্ষিত হওয়ায় ক্রুসেডাররা দিমইয়াতকেই বেছে নেয়। আল-কামিল দিনরাত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখলেও তাদেরকে দিমইয়াত থেকে সরাতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তিনি ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দকে দিমইয়াত ত্যাগের বিনিময়ে প্রলুব্ধকর সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু নিজেদের সামরিক শক্তি ও সংখ্যাধিক্যের গর্বে অন্ধ ক্রুসেড শিবির সরাসরি সন্ধিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। দীর্ঘ দেড় বছরের অবরোধের পর ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তারা দিমইয়াত দখল করে নেয় এবং নগরজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
এরপর ক্রুসেডাররা কায়রো অভিমুখে অগ্রসর হয়। সুলতান আল-কামিল এ সময় পুনরায় তাদেরকে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। ক্রুসেডার বাহিনী তিনদিক থেকে জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত একটি এলাকা দিয়ে কায়রোর দিকে অগ্রসর হয়। এলাকাটি পূর্ব দিক থেকে মানজালা হ্রদ (Lake Manzala), পশ্চিম দিক থেকে দিমইয়াত (শাখা) নদী এবং দক্ষিণ দিক থেকে আল-বাহরুস সগির নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ইসলামি নৌবহর তাদের প্রতিরোধের জন্য নীলনদে অবস্থান নিয়েছিল। নীলনদে তখন ভরা জোয়ার চলছিল। মুসলমানরা নদীর বিভিন্ন বাঁধ কেটে দিলে উক্ত এলাকা পানিতে ডুবে যায় এবং ক্রুসেডারদের সামনে গমনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা দিমইয়াতে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু দিমইয়াতে প্রত্যাবর্তনের একমাত্র সংকীর্ণ পথটিতে আল-কামিল তার সৈন্যদের মোতায়েন করে রেখেছিলেন। আল-কামিলের সৈন্যরা এবার ক্রুসেডারদের পথ আগলে দাঁড়ায়।
অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা ক্রুসেডাররা এবার নিজেরাই সন্ধিচুক্তির আবেদন জানায়। আল-কামিল এই শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে সম্মত হন যে, তারা দিমইয়াত অঞ্চল ফেরত দেবে এবং এর নিশ্চয়তাস্বরূপ আপাতত কয়েকজন খ্রিষ্টান রাজন্যকে জামানত হিসেবে আল-কামিলের হাতে তুলে দেবে। অবশেষে ৬১৮ হিজরি সনের রজব (১২২১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মাসে ক্রুসেডাররা দিমইয়াত ত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। এভাবে ইউরোপের খ্রিষ্টানশক্তির পঞ্চম ক্রুসেড অভিযানও পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড যুদ্ধ

📄 ষষ্ঠ ক্রুসেড যুদ্ধ


[৬২৫-৬২৬ হিজরি/১২২৮-১২২৯ খ্রিষ্টাব্দ]
৬২৫ হিজরি সনে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দে) জার্মানির রাজা ২য় ফ্রেডেরিক (Frederick II) আল-কুদসের শাসনক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে ক্রুসেড অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। পুরো ইউরোপীয় বাহিনীই তার সঙ্গে এ অভিযানে যোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ফ্রেডেরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পোপ ও বিভিন্ন অঞ্চলের খ্রিষ্টান শাসকবর্গ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয় এবং তার সঙ্গে অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে ফ্রেডেরিক একাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
আইয়ুবি সাম্রাজ্য তখন ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকেই হুমকির সম্মুখীন ছিল। একদিকে সুলতান আল-কামিলের সঙ্গে তার ভাই মুয়াযযাম ও আশরাফের প্রচণ্ড বিরোধ চলছিল এবং একে কেন্দ্র করে পারস্পরিক লড়াইয়ের উপক্রম হয়েছিল, অপরদিকে বাইরে থেকে খোয়ারিজমিরাও আইয়ুবি সাম্রাজ্যের কাঁধে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। চেঙ্গিস খানের আগ্রাসনে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া খোয়ারিজমিরা তখন ইস্পাহানে সমবেত হয়ে শক্তি সঞ্চয়ে সচেষ্ট ছিল এবং ধীরে ধীরে শাম ও ইরাকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। দ্বিমুখী চাপে অস্থিরপ্রায় আইয়ুবি সুলতান আল-কামিল যখন জানতে পারেন যে, নতুন বিপদরূপে জার্মানির সম্রাট ফ্রেডেরিক আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন, তখন তিনি ফ্রেডেরিকের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। ৬২৬ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১২২৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) সম্পাদিত চুক্তিটির শর্তের মধ্যে ছিল—আল-কামিল আল-কুদস, আক্কা ও জাফার নিয়ন্ত্রণ ফ্রেডেরিকের হাতে ছেড়ে দেবেন এবং বন্দি ক্রুসেডারদের মুক্তি দেবেন। অপরদিকে আল-কামিল যখন যার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন—হোক সে খ্রিষ্টান—ফ্রেডেরিক তখন আল-কামিলকে সহায়তা করবেন এবং আগামী সাড়ে দশ বছর তিনি শামের ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের কাছে যেকোনো ধরনের সামরিক সাহায্য পৌঁছতে বাধা প্রদান করবেন।
এভাবে জার্মানির রাজা ফ্রেডেরিক বিনা যুদ্ধেই আল-কুদসের কর্তৃত্ব লাভ করেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আইয়ুবি সুলতান আল-কামিলের জীবনের অন্যতম গর্হিত অন্যায়। তার এই নির্বুদ্ধিতার কারণে মহাবীর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক পুনরুদ্ধারের মাত্র বিয়াল্লিশ বছর পর আল-কুদস আবারও চলে যায় ক্রুসেডারদের দখলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00