📄 ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ
ক্রুসেডারদের এই চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের পর সুলতান সালাহুদ্দিন দ্রুত যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি ৫৮৩ হিজরি সনের ১৭ রবিউল আউয়াল দামেশক থেকে বেরিয়ে আসেন। বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে অবশেষে তিনি তাবারিয়ায় পৌঁছান।
সুলতান সালাহুদ্দিনের বিস্তৃত পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৈন্যসমাবেশ শুরু করে। এরপর তারাও তাবারিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। উভয় বাহিনী হিত্তিন নামক স্থানে পরস্পর মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী পূর্বেই যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশের পানির উৎসগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় প্রচণ্ড পানিস্বল্পতার সম্মুখীন হয়।
৫৮৩ হিজরি সনের ২৫ রবিউস সানি (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই) উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন এ যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। চরমভাবে পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত বা বন্দি হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম সৈন্যরা পলায়নপর ক্রুসেডারদের পিছু নিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতে থাকে এবং তাদের তরবারির আঘাতে খ্রিষ্টান সৈন্যরা লুটিয়ে পড়তে থাকে। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় (Guy of Lusignan)-এর পাশে থাকে মাত্র দেড়শ সৈন্য। ক্লান্তি ও ক্ষুৎপিপাসায় একসময় তারা পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় ও কারকের প্রশাসক রেনাল্ড মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রেই সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির জন্য একটি তাঁবু প্রস্তুত করা হয়। তাঁবুতে সুলতানের বিজ্ঞ উপদেষ্টা ও সেনাপতিগণ সমবেত হয়। সকলে কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হয়ে পড়ে। এরপর সুলতানের নির্দেশে বন্দি রাজা ও প্রশাসককে উপস্থিত করা হয় এবং তাঁবুর ভেতরে বসানো হয়। প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় পানি পান করতে চাইলে তার জন্য ঠান্ডা পানি পরিবেশন করা হয়। সামান্য পানি পান করার পর তিনি অবশিষ্ট পানি রেনাল্ডকে দিতে উদ্যত হলে সালাহুদ্দিন বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আমরা এ পানি তাকে পান করার জন্য দিইনি। কাজেই তার নিজেকে নিরাপদ ভাবার কোনো কারণ নেই।' এরপর ক্রুদ্ধ সুলতান দাঁড়িয়ে যান এবং রেনাল্ডকে তার গর্হিত আচরণ ও নবীজির শানে ধৃষ্টতার জন্য ভর্ৎসনা করেন। এরপর তিনি আপন প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে নিজ হাতে তাকে হত্যা করেন। রেনাল্ডের পরিণতি স্বচক্ষে অবলোকন করে রাজা গায় ভীত হয়ে পড়লে সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে বলেন, 'রাজাদের হত্যা করা রাজন্যবর্গের নীতি নয়; কিন্তু এই লোক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।'
এরপর বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ও তার জীবিত অনুচরদের সসম্মানে দামেশকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
📄 আল-কুদস পুনরুদ্ধার
৫৮৩ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে সুলতান সালাহুদ্দিন আক্কায় প্রবেশ করেন। মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে সেখানকার ক্রুসেডাররা পালিয়ে সুর নগরীতে চলে যায়। এরপর সালাহুদ্দিন তিবনিন (Tebnine), সিডন, ব্যাবলস ও বৈরুতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি উপকূলীয় পথ ধরে আসকালানে পৌঁছে আসকালান অবরোধ করেন। চৌদ্দ দিনের অবরোধের পর আসকালানবাসী আত্মসমর্পণ করে।
এর পাশাপাশি রামলা, দারুম, গাজা, বেথেলহাম, নাতরুন ইত্যাদি অঞ্চল বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে একদিকে আল-কুদস অবরোধ করার পথ সুগম হয়, অপরদিকে উপকূলীয় পথে আল-কুদসে সাহায্য প্রেরণের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
সার্বিক প্রস্তুতি শেষে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অগ্রসর হন আল-কুদস অভিমুখে। তিনি সেখানে কোনো রক্তপাত ঘটাতে চাননি। কিন্তু ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বাধ্য হয়ে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে আল-কুদসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ক্রুসেডাররা সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয় এবং এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হয় যে, আগামী চল্লিশ দিন তাদেরকে আল-কুদস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিনিময়ে পুরুষগণ জনপ্রতি দশ দিনার, নারীগণ জনপ্রতি পাঁচ দিনার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিনিময়ে জনপ্রতি দুই দিনার প্রদান করতে হবে। কেউ নির্ধারিত দিনার প্রদান করতে না পারলে সে বন্দি বিবেচিত হবে। যারা শর্ত মেনে প্রস্থান করবে, তাদেরকে নিরাপদে সুর নগরীতে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কুদসে প্রবেশ করেন।
কত ব্যবধান ৪৯২ হিজরি ও ৫৮৩ হিজরি সনের মাঝে!
৪৯২ হিজরি সনের ২২ শাবান (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই) ক্রুসেডাররা আল-কুদস দখল করার পর নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিল, এক দিনে হত্যা করেছিল সত্তর হাজার মুসলিম নাগরিককে। এ সম্পর্কে দুজন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকের ভাষ্য দেখুন।
• তৎকালীন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম সুরি (William of Tyre) বলেন, ক্রুসেডারদের প্রবেশকালে আল-কুদস নগরী এক ভয়ানক হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। মুসলমানদের রক্তে নগরীটি রক্তপ্রান্তরে পরিণত হয়। নগরীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভীতি ও আতঙ্ক। (৫৮৫)
• সমসাময়িক আরেক খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক উল্লেখ করেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে ক্রুসেডাররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরের দিন সকালে তিনি যখন দর্শনার্থী হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেন, তখন অনেক কষ্টে মুসলমানদের লাশের মধ্য দিয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে সক্ষম হন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিহতদের রক্ত তার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল!(৫৮৬)
বিপরীতে ৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কুদস পুনরুদ্ধার করার পর সেখানকার খ্রিষ্টান নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে কয়েকজন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকের ভাষ্য লক্ষ করুন।
• স্টিফেনসন বলেন, 'সুলতান সালাহুদ্দিন প্রচুর সংখ্যক লোককে মুক্তিপণ ছাড়াই বাইতুল মুকাদ্দাস ত্যাগের সুযোগ দিয়েছেন।'
• বৃটিশ প্রাচ্যবিদ স্ট্যানলি লেন পোল (Stanley Edward Lane-Poole) বলেন, সুলতান একদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময় নগরদ্বার খুলে রেখে অসহায় ও দরিদ্রদেরকে মুক্তিপণ ব্যতিরেকেই যেতে দিয়েছেন।'
• ভারতীয় প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমির আলি ইংরেজ ঐতিহাসিক মিলস-এর বরাতে উল্লেখ করেন-'আল-কুদস ত্যাগ করে প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান নাগরিক খ্রিষ্টরাজ্য এন্টিয়কের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু এন্টিয়কের শাসক তাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাড়িয়ে দেন। বাধ্য হয়ে তারা ফিরতি পথ ধরে এবং বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য অভিমুখে রওনা হয়। মুসলিম রাজ্যগুলোতে তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করা হয়।'
• আমির আলি আরও উল্লেখ করেন, স্ট্যানলি লেন পোলের বর্ণনামতে বাইতুল মুকাদ্দাসের তৎকালীন গির্জাধ্যক্ষ ছিলেন মায়া-মমতাহীন চরম নিষ্ঠুর একজন ব্যক্তি। দরিদ্র ও অসহায় নাগরিকদের মুক্তিপণ আদায়ে সাহায্য করার পরিবর্তে তিনি নিজের প্রচুর সম্পদ নিয়ে আল-কুদস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সালাহুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনি কেন মুসলমানদের উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করছেন না?' উত্তরে সুলতান বলেন, 'আমি তার কাছ থেকে দশ দিনারের চেয়ে সামান্য বেশিও গ্রহণ করব না এবং তার সঙ্গে প্রতারণা করব না।' এ ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্ট্যানলি লেন পোল বলেন, 'বিষয়টি এমন দাঁড়াল যে, একজন মুসলিম সুলতান এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে দয়া ও অনুগ্রহের পাঠদান করছেন।'
• প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি (Philip Khuri Hitti) শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'খ্রিষ্টান নাগরিকদের সঙ্গে সুলতান সালাহুদ্দিনের আচরণ ও ইতিপূর্বে আটাশি বছর ধরে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানদের আচরণের মাঝে পার্থক্য ছিল পুরোপুরি দৃশ্যমান ও সুস্পষ্ট।'
আল-কুদস জয়ের পর ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের প্রতিপত্তি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকে এন্টিয়ক ও সুর নগরীর মতো গোটাকয়েক নগরী। এ সময় মুসলমানদের হাতে বিজিত প্রতিটি নগরী হতে ক্রুসেডাররা ধীরে ধীরে সুর নগরীতে আশ্রয় নিতে থাকে। একত্রিত হয়েই তারা সালাহুদ্দিনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি এবার আক্কা অভিমুখে রওনা হয় এবং জল-স্থল উভয় দিক থেকে আক্কা অবরোধ করে। ৫৮৫ হিজরি সনের ৮ রজব (১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়া এ অবরোধ দুই বছর অব্যাহত থাকে।
সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীও আক্কায় পৌঁছে ক্রুসেডারদের স্থল ভাগে অবরুদ্ধ করে রাখে। সুলতান সালাহুদ্দিন নিজে তিল-কায়সানে (Tell Keisan) শিবির স্থাপন করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে অনেকবার যুদ্ধ সংঘটিত হলেও কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করতে পারেনি। এরই মধ্যে বেজে ওঠে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা।
টিকাঃ
৫৮৫. Guillaume de Tyr, 1, p. 354.
৫৮৬. Raymond d'Aigles, p. 300.
📄 তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ
[৫৮৫-৫৮৭ হিজরি/১১৮৯-১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ]
হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয় এবং এরপর আল-কুদস নগরীর পতনের ফলে ইউরোপে নতুন করে ক্রুসেড অভিযানের আওয়াজ ওঠে। তৎকালীন পোপ ৮ম গ্রেগরি (Gregory VIII) ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র নগরী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের শক্তিশালী কয়েকজন শাসক এবারের অভিযানে যোগদান করেন। তারা হলেন—
* জার্মানির রাজা ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের (The Holy Roman Emperor) সম্রাট ১ম ফ্রেডেরিক (Frederick Barbarossa)।
* ফ্রান্সের রাজা ২য় ফিলিপ (Philip Augustus) |
* ইংল্যান্ডের রাজা 'সিংহহৃদয়' খ্যাত প্রথম রিচার্ড (Richard the Lionheart) ।
ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রুসেডার বাহিনী আক্কা অভিমুখে রওনা হয়। জার্মানি থেকে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রওনা হওয়ার পর রাজা ১ম ফ্রেডেরিক ৫৮৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১১৯০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) পথিমধ্যে ডুবে মারা গেলে তার নেতৃত্বাধীন জার্মান বাহিনীর সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অধিকাংশই দেশে ফিরে যায়। অল্প কিছু সৈন্য আক্কায় পৌঁছতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে ২য় ফিলিপের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী প্রথমে সিসিলিতে একত্র হয়। এরপর তারা নিজেরা পরস্পরে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় সিসিলিতেই অবস্থান করে। কিছুদিন পর ফরাসিরা সিসিলি ত্যাগ করে আক্কা অভিমুখে রওনা হয়।
ইংরেজরাও আক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে ইংরেজ নৌবহর সাইপ্রাস দ্বীপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সাইপ্রাস তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সাইপ্রাসে অবতরণ করার পর রাজা রিচার্ড বাইজান্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং সাইপ্রাস দখল করে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এরই মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় রিচার্ডের কাছে দ্রুত ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার আবেদনবার্তা পাঠালে রিচার্ড সমুদ্রপথে আক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই গায়কেই সুলতান সালাহুদ্দিন বন্দি করার পরও ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফরাসি ও ইংরেজ বাহিনী আক্কায় পৌঁছে যাওয়ায় অবরোধকারী ক্রুসেডারদের মনোবল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আক্কার পতন ঘটানোর জন্য পূর্ণ উদ্যমে অবরোধ অব্যাহত রাখে।
৫৮৭ হিজরি সনের ১৭ জুমাদাল উখরা (১১৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই) শুক্রবার হঠাৎ করেই আক্কা নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে ক্রুশচিহ্নিত পতাকা উড়তে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলমানরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং ক্রুসেডারদের হিংস্র হামলার শিকার হয়। ষাট হাজার মুসলিম নাগরিকের প্রাণ-বিয়োগের পর আক্কার কর্তৃত্ব চলে যায় ক্রুসেডারদের হাতে।
আক্কা দখল করার পর ক্রুসেডার বাহিনীর সদস্যরা সেখানেই আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘ দিন সেখানেই কাটিয়ে দেয়। অথচ তারা বের হয়েছে 'পবিত্র ভূমি' আল-কুদস পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে!
এদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজার মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বিরোধ ও সংঘাত। এর পরিণতিতে ফরাসি রাজা ফিলিপ দেশে ফিরে যান। এরপর সালাহুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে একের পর এক রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতে থাকে। জয়-পরাজয়ের পাল্লা ছিল উভয়দিকেই দোদুল্যমান।
এসব যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আরসুফের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা জয়ী হয়। ক্রুসেডারদের দৃষ্টিতে এ বিজয় ছিল হিত্তিনের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ।
ক্রুসেডাররা এ সময় আসকালান ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দিক থেকে আল-কুদস দখলের চেষ্টা করলেও মুসলিম প্রহরীদের তীব্র প্রতিরোধের কারণে কাছে ভিড়তে ব্যর্থ হয়। প্রহরীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তাদের লড়াই হচ্ছিল এবং লড়াইতে কখনো মুসলিম প্রহরীরা, আবার কখনো ক্রুসেডাররা জয়ী হচ্ছিল। অবশ্য এ সময় তারা উপকূলীয় বিভিন্ন নগরী দখল করতে সক্ষম হয়। একদিকে প্রচুর জনবল ক্ষয়, অপরদিকে দীর্ঘ দিনের মাতৃভূমির বিচ্ছেদের কারণে রাজা রিচার্ড এ সময় অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সন্ধিচুক্তির চেষ্টা চালান। তিনি একের পর এক কয়েকজন দূতকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন। তার সন্ধিপ্রস্তাবে উল্লেখ ছিল— উভয়পক্ষ তিন বছর যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, আসকালানের অধিকার ক্রুসেডারদের ফিরিয়ে দিতে হবে, বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা তাদেরকে দান করতে হবে এবং খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদেরকে বিনা মাশুলে আল-কিয়ামা গির্জা পরিদর্শন ও তীর্থযাত্রার সুযোগ দিতে হবে।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কিয়ামা গির্জা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হলেও আসকালান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তীর্থযাত্রীদের উপর যৎসামান্য অর্থ আরোপের কথা বলেন। কিন্তু ইংরেজরা দাবি জানায়, মুসলমানরা যদি আসকালানের নিরাপত্তাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ইংরেজদের বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে তারা সন্ধি করবে না। ফলে সুলতানও তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিন জাফা পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করেন এবং জাফা জয় করেন। ক্রুসেডারদের আবেদনের কারণে তাদের ছোট-বড় সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে সমুদ্রপথে সামরিক সহায়তা চলে আসায় ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাজা রিচার্ড আক্রমণ চালিয়ে জাফা পুনরুদ্ধার করেন। যেসব মুসলমান পেছনে পড়ে গিয়েছিল, তাদেরকে বন্দি করে ইংরেজ রাজার সামনে হত্যা করা হয়।
এভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। এরই মাঝে ইংল্যান্ডের রাজা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অসুস্থ ইংরেজ রাজা মুসলিম সুলতানের কাছে ফলমূল ও বরফ চেয়ে বার্তা পাঠালে সুলতান উদার চিত্তে তার চাওয়া পূরণ করেন। অল্প কদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হওয়ার পরই পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমির বিরহে অস্থির ইংরেজ রাজা বারবার দূত পাঠিয়ে সুলতানকে সমঝোতাচুক্তি করার অনুরোধ জানান এবং আসকালানের দাবি ছেড়ে দিয়ে সুলতানের দাবিমতো চুক্তি করতেই সম্মতি জানান। ১৭ শাবান উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ হয়। 'রামলা চুক্তি' নামে খ্যাত চুক্তিটির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো—
• ক্রুসেডাররা সুর থেকে হাইফা পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করতে পারবে।
• কোনো প্রকার 'দর্শনার্থী মাশুল' প্রদান ছাড়াই খ্রিষ্টানরা আল-কুদসে ভ্রমণ করতে পারবে।
• আগামী তিন বছর আট মাস উভয় পক্ষের মাঝে শান্তি অবস্থা বিরাজমান থাকবে।
এই চুক্তি সম্পাদনের কারণে ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। চুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পর ৫৮৮ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১৯২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) তিনি নিজ দেশে ফিরে যান। অপরদিকে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, আরসুফ ও জাফার যুদ্ধে প্রচুর সৈন্যক্ষয় এবং শাম অঞ্চলের প্রশাসকদের অসহযোগিতার কারণে তিনি কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং যেকোনো মূল্যে আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এভাবেই দীর্ঘ কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি ও বিভিন্ন নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে জার্মানি হারায় তাদের রাজাকে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড হারায় তাদের নির্বাচিত ও সুদক্ষ অনেক সৈনিক ও সেনাপতিকে। যদিও সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে অভিযানে বের হয়েছিল; কিন্তু তাদের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এ অভিযানে তারা কেবল আক্কা দখল করতে সক্ষম হয়।
📄 তৃতীয় ক্রুসেড-পরবর্তী সময়
ক্রুসেডার বাহিনীর প্রস্থানের পর সুলতান সালাহুদ্দিনের সুশাসনে জনসাধারণ নিরাপদে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। তার উদার আচরণের কারণে আল-কুদসে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের আগমনও প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এমনকি ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড অধিক হারে তীর্থযাত্রীদের আগমনে সুলতান সালাহুদ্দিনের ক্রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করে সুলতানের কাছে বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন আল-কুদসে তীর্থযাত্রীদের অবাধ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং রাজা রিচার্ডের লিখিত অনুমতিপত্র বা নিদর্শন ছাড়া কাউকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি না দেন। কিন্তু সুলতান এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে প্রত্যুত্তরে লেখেন, তারা এত দূর থেকে এই পবিত্র স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে এসে পৌঁছেছে। আমি তাদের বাধাদান মোটেও বৈধ মনে করি না।
এর কিছুদিন পরই মহান সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বারো দিন অসুস্থ থাকার পর ৫৮৯ হিজরি সনের ২৭ সফর (১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ) বুধবার তার বিদেহী আত্মা পরম প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করে। আল-কুদস মুক্তকারী এই মহান মুসলিম বীর যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে ছিল মাত্র সাতচল্লিশটি দিরহাম ও একটি দিনার! এ ছাড়া অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তার ছিল না।
সুলতান সালাহুদ্দিনের ইন্তেকালের পর তার পুত্র আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন আইয়ুবি রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি তার ভাই ও দামেশকের প্রশাসক আফজালের সঙ্গে বিরোধ ও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। দু-ভাইয়ের সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে আফজালকে দামেশক থেকে নির্বাসিত করার মাধ্যমে। দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সালাহুদ্দিনের ভাই ও জাযিরার প্রশাসক আল-আদিল সাইফুদ্দিন মুহাম্মাদ। সাইফুদ্দিন অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ শাসক ছিলেন। দামেশকের অভ্যন্তরীণ সমস্যাদি দমন করার পর শামের সকল অঞ্চল তার বশীভূত হয়ে যায়।
৫৯৫ হিজরি সনে (১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) আল-আজিজ ইমাদুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। তখন তার চাচা সাইফুদ্দিন মিশরে এসে সালাহুদ্দিনের অপর দুই পুত্রকে পরাভূত করেন এবং নতুন প্রশাসক (আল-আজিজ ইমাদুদ্দিনের পুত্র) মাত্র নয় বছর বয়সী মানসুর বিন আল-আজিজকে বরখাস্ত করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। ৫৯৬ হিজরি সনের মধ্যেই সালাহুদ্দিনের সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চল আল-আদিল সাইফুদ্দিনের আয়ত্তে চলে আসে। তার শাসনাধীন আইয়ুবি রাষ্ট্র পরিণত হয় সমকালীন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রে।
৫৯৩ হিজরি সনে সুলতান সাইফুদ্দিন যখন শাম অঞ্চলে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুতকরণে ব্যস্ত ছিলেন, তখন স্থানীয় ক্রুসেডাররা জার্মানির সামরিক সহায়তা লাভ করে। মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদের সুযোগ নিয়ে তারা এ সময় আবারও আল-কুদস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধে সাইফুদ্দিনকে পরাজিত করে তার কাছ থেকে বৈরুতের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু এরপরই তারা নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আল-আদিল সাইফুদ্দিন জাফা ও রামলা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন।