📄 দ্বিতীয় ক্রুসেড-পরবর্তী সময়
ইউরোপ থেকে আগত ক্রুসেডার বাহিনীর প্রস্থানের পরও নুরুদ্দিন জিনকি রহ. তার ক্রুসেডবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখেন। তিনি একের পর এক প্রতিটি ক্রুসেড রাজ্যে হানা দিয়ে বিভিন্ন নগরী ও দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে শাম অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা নুরুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্বে চলে আসে।
নুরুদ্দিন জিনকির অব্যাহত বিজয়াভিযান এবং জিনকি পরিবারের ঐক্য ও সুদৃঢ় সামরিক শক্তি প্রত্যক্ষ করে এ অঞ্চলের ক্রুসেডাররা উপলব্ধি করে, জিনকি পরিবারকে পরাভূত করে শাম ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখা দিবাস্বপ্ন ব্যতীত অন্য কিছু নয়। তাই এদিকে অভিযানের চিন্তা বাদ দিয়ে এবার তারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে উবায়দি সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলের প্রতি।
৫৪৮ হিজরি সনে (১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক ৩য় বল্ডউইন উবায়দিদের কাছ থেকে আসকালান দখল করে নেন। এর ফলে ফিলিস্তিনের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রুসেডারদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিত হয়।
ক্রুসেডাররা আসকালান দখল করে নেওয়ায় নুরুদ্দিন জিনকি দামেশক নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, দামেশকের কারণেই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হতে পারছিলেন না। সবদিক বিবেচনা করে তিনি এবার দামেশকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।
৫৪৯ হিজরি সনের মুহাররম মাসে (১১৫৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) নুরুদ্দিন জিনকি দামেশক অবরোধ করেন। এ সময় তিনি দশদিন দামেশক অবরোধ করে রাখলেও সেখানে কোনো আক্রমণ করেননি। তিনি এ সময় বলেন, 'মুসলমানদের পরস্পর একে অপরকে হত্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই।' নুরুদ্দিন দামেশকের অধিপতি মুজিরুদ্দিনের কাছে বার্তা প্রেরণ করে তার দামেশকে আগমনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন-
আমি তোমাদের সঙ্গে লড়াই করতে এখানে আগমন করিনি। আমি মুসলমানদের এই অভিযোগের কারণে এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি যে, কৃষকদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাদের স্ত্রী- সন্তানদের খ্রিষ্টানদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ কেউ তাদের সাহায্য করছে না। আল্লাহর শোকর! তিনি আমাকে মুসলমানদের সাহায্য করার ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং প্রচুর সম্পদ ও সামরিক শক্তি দান করেছেন। এই নেয়ামতের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতিত এসব মুসলমানের আহ্বান উপেক্ষা করে তাদের সাহায্য না করা আমার জন্য বৈধ হতে পারে না। অধিকন্তু আমার জানা আছে যে, তোমরা নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তারক্ষায় অক্ষম। এই দুর্বলতার কারণেই তোমরা আমার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফিরিঙ্গিদের সাহায্যপ্রার্থনা করেছ। তোমরা অসহায়-দুর্বল নাগরিকদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে তা খ্রিষ্টানদের পেছনে ব্যয় করেছ। এমন গর্হিত আচরণ না আল্লাহ তাআলা পছন্দ করবেন, না কোনো মুসলমান বরদাশত করবে।
কিন্তু মুজিরুদ্দিন তার বার্তা উপেক্ষা করে ক্রুসেডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদেরকে নুরুদ্দিনের বাহিনীর উপর আক্রমণের প্রতি প্ররোচিত করেন। বিনিময়ে দেওয়া হয় প্রচুর অর্থসম্পদ প্রদানের পাশাপাশি বালাবাক্কু দুর্গের নিয়ন্ত্রণ সমর্পণের প্রস্তাব!
কিন্তু দামেশকের অধিবাসীরা তো নুরুদ্দিনেরই প্রতীক্ষা করছিল! তারা এবার অগ্রসর হয়ে নুরুদ্দিনের জন্য নগরীর প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। নুরুদ্দিন দামেশকে প্রবেশ করে সাধারণ নিরাপত্তা ঘোষণা করেন এবং জনগণের উপর আরোপিত কর বাতিল করেন। নুরুদ্দিন জিনকি রহ. দামেশককেই তার রাজধানী নির্ধারণ করেন। কিছুদিন পর তিনি শাইজার ও বালাবাক্কু নগরীকেও জিনকি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে পুরো শাম অঞ্চল তার নেতৃত্বে একক-ঐক্যবদ্ধ ইসলামি শক্তিতে পরিণত হয়।
৫৫২ হিজরি সনে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি হঠাৎ করেই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আলেপ্পোর দায়িত্ব তার ভাই নুসরতুদ্দিনের হাতে সোপর্দ করেন। নুরুদ্দিনের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ক্রুসেডাররা কয়েকটি যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে। অবশ্য আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে তিনি কিছুদিন পরই সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নবোদ্যমে অগ্রসর হন।
এরপর নুরুদ্দিন জিনকি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন মিশরের প্রতি। কারণ, ক্রুসেডাররা ইতিমধ্যে উবায়দি শাসকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মিশরে লোলুপ দৃষ্টি ফেলতে শুরু করেছে। মিশর যদি ক্রুসেডারদের দখলে চলে যায়, তাহলে শাম অঞ্চলে ইসলামি শক্তির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা নিশ্চিতভাবেই বাধার সম্মুখীন হবে। অধিকন্তু শাম ও মিশর মিলে যদি একক শক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক দুর্জেয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হতে পারবে।
মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্য তখন দুর্বলতার সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়েছিল। উবায়দি খলিফা উজিরদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। উজিরই মূলত প্রশাসনসহ যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। উজির পদ নিয়েও চলছিল প্রতিযোগিতা ও চরম বিবাদ-সংঘাত। এ সময় উজির পদ-প্রত্যাশী কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসকদের কাছেও ধরনা দেয়। তাদেরই একজন ছিলেন শাওয়ার বিন মুজির। তিনি ৫৫৮ হিজরি সনে (১১৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) যিরগাম নামক জনৈক সেনাপতির কাছে পরাজিত হন এবং উজির পদ হতে পদচ্যুত হয়ে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদের কাছে আশ্রয় নেন। শাওয়ার মিশরের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে নুরুদ্দিনের কাছে সামরিক সহায়তা প্রার্থনা করেন এবং বিনিময়ে মিশরের রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ প্রদানের অঙ্গীকার করেন। নুরুদ্দিন শাওয়ারের প্রস্তাবে রাজি হয়ে আসাদুদ্দিন শিরকুহের নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী দিয়ে শাওয়ারকে সহায়তা করেন। দামেশক বাহিনীর সহায়তায় শাওয়ার যিরগামকে পরাজিত করে ৫৫৯ হিজরি সনে পুনরায় মিশরের উজির পদে আসীন হন। কিন্তু কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েই শাওয়ার তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। তিনি একদিকে শিরকুহকে মিশর ত্যাগ করে শামে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন, অন্যদিকে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক অ্যামালরিকের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। তিনি অ্যামালরিককে বোঝান যে, নুরুদ্দিন মিশর ভূমি দখল করতে পারলে ভবিষ্যতে তার রাজ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবেন। অ্যামালরিক দ্রুত শাওয়ারের সহায়তায় ছুটে আসেন এবং আসাদুদ্দিন শিরকুহকে মিশর ত্যাগে বাধ্য করেন।
শাওয়ারের বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত জবাব দিতে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ৫৬২ হিজরি সনে (১১৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) শিরকুহের নেতৃত্বেই আরেকটি বাহিনী মিশরে প্রেরণ করেন। শিরকুহের ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহুদ্দিন আইয়ুবিও এই অভিযানে অংশ নেন।
শাওয়ার এবারও অ্যামালরিকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি আবারও তার মিত্রের সাহায্যে ছুটে আসেন। মিশরের বাবাইন এলাকায় শিরকুহের নেতৃত্বাধীন বাহিনী শাওয়ার ও অ্যামালরিকের বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে জিনকি বাহিনী জয়লাভ করে। শিরকুহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী কায়রো অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে বিজিত অঞ্চলে কর্তৃত্ব দৃঢ়করণে মনোযোগ দেন এবং সেখান থেকে কর উসুল করেন। এরপর তিনি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছেন এবং ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহুদ্দিনকে সেখানকার প্রশাসক নিযুক্ত করে সামনে অগ্রসর হন। কিন্তু ক্রুসেডার-উবায়দি সম্মিলিত বাহিনী জল-স্থল উভয় দিক থেকে আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করলে শিরকুহ দ্রুত সালাহুদ্দিনকে সহায়তা করতে ফিরে আসেন। তখন সম্মিলিত বাহিনী তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে চাইলে তিনি এই শর্তে চুক্তি করতে সম্মত হন যে, ক্রুসেডার বাহিনী মিশরে অবস্থান করতে পারবে না। এরপর শিরকুহ দামেশকে ফিরে আসেন। কিন্তু শাওয়ার আবারও তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন এবং ক্রুসেডারদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি করেন। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, কায়রোতে সব সময় একটি ক্রুসেডার প্রতিরক্ষা বাহিনী অবস্থান করবে এবং কায়রো নগরদ্বারসমূহের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। তারা মিশরে নুরুদ্দিনের প্রেরিত বাহিনীকে বাধা প্রদান করবে।
উভয়পক্ষ এই মর্মেও সম্মত হয় যে, ক্রুসেডাররা প্রতিবছর মিশরের রাজস্ব হতে এক লক্ষ দিনার লাভ করবে।
মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের এই দুর্বল ও পরাশ্রয়ী নীতি বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি অ্যামালরিককে নতুন করে মিশর নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করে। তিনি ৫৬৪ হিজরি সনে (১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর জয় করার জন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হন। নিরুপায় শাওয়ার খ্রিষ্টান বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এমন এক পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন। খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা যেন মিশর আক্রমণে নিরুৎসাহিত হয়, এজন্য তিনি ফুসতাত নগরীতে আগুন লাগিয়ে দেন। একটানা চুয়ান্ন দিন আগুন জ্বলতে থাকে। এরপর তিনি অ্যামালরিকের কাছে বার্তা পাঠান, 'আপনি যদি মিশরে প্রবেশ করেন, তাহলে নুরুদ্দিন মাহমুদ মিশর দখল করতে অগ্রসর হতে পারেন।' পাশাপাশি তিনি অ্যামালরিককে বার্ষিক দশ লক্ষ দিনার প্রদানের শর্তে সন্ধি করারও প্রস্তাব দেন।
শাওয়ার জানতেন, তার এই প্রস্তাব পাওয়ার পরও অ্যামালরিক ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে পারেন। তাই তিনি নুরুদ্দিনের কাছেও সাহায্যপ্রার্থনা করে বার্তা পাঠান। তিনি নুরুদ্দিনকে প্রতিশ্রুতি দেন, মিশরের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি তিনি নুরুদ্দিনকে ছেড়ে দেবেন এবং আসাদুদ্দিন শিরকুহকে সসৈন্য কায়রোতে অবস্থানের অনুমতি দেবেন। শিরকুহের বাহিনীর সৈন্যদেরকে জায়গির হিসেবে প্রচুর জমি প্রদান করা হবে, যা নুরুদ্দিনকে প্রদত্ত এক-তৃতীয়াংশ ভূমির বাইরে অতিরিক্ত বিবেচিত হবে।
নুরুদ্দিন মিশর অভিযানের জন্য দ্রুততার সঙ্গে আসাদুদ্দিন শিরকুহের নেতৃত্বে বিরাট এক বাহিনী প্রস্তুত করেন। অ্যামালরিকের ক্রুসেডার বাহিনী এ সংবাদ জানতে পেরে যুদ্ধ না করেই বাইতুল মুকাদ্দাসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৫৬৪ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) আসাদুদ্দিন শিরকুহ কায়রোতে প্রবেশ করেন। কায়রোবাসী তাকে স্বাগত জানায়। স্বয়ং উবায়দি খলিফা আবদুল্লাহ আল-আযিদ তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সম্মানসূচক আলখেল্লা প্রদান করেন। এরপর আসাদুদ্দিন শিরকুহ খলিফার প্রধান উজির মনোনীত হন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই উবায়দি সাম্রাজ্যের ক্ষমতার লাগাম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে সক্ষম হন।
আসাদুদ্দিন কায়রোয় প্রবেশের মাস-তিনেক পরই ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর নতুন উজির মনোনীত হন তার ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহুদ্দিন আইয়ুবি।
দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সালাহুদ্দিন আইয়ুবি জনকল্যাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। ফলে মিশরে তার বিপুল জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। তিনি খুতবায় উবায়দি খলিফার নামের পর নুরুদ্দিনের নাম পাঠের নির্দেশ জারি করেন। উজির সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তার বাহিনীর সেনাপতিদের বিভিন্ন অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের অধিষ্ঠিত করেন।
জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদের কর্তৃত্ব মিশরেও বিস্তৃত হওয়ায় বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা অ্যামালরিক অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি এবার নতুন করে মিশরে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম ম্যানুয়েল কমনিনোস অ্যামালরিকের সাহায্যপ্রার্থনায় সাড়া দিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামে সমৃদ্ধ একটি বাইজান্টাইন নৌবহর প্রেরণ করেন। মিশর জয়ের উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান বাহিনী ৫৬৫ হিজরি সনের সফর মাসে (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) দিমইয়াতে (Damietta) পৌঁছায়। নিজে কায়রো ত্যাগ করলে উবায়দিরা ষড়যন্ত্র করতে পারে—এই আশঙ্কায় সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কায়রোতেই অবস্থান করেন এবং খালিদ শিহাবুদ্দিন মাহমুদ ও ভ্রাতুষ্পুত্র তাকিউদ্দিন উমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীর মোকাবিলায় প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে ক্রুসেডারদের যুদ্ধ-উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ৫৬৫ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থান করে।
এর কিছুদিন পর সুলতান নুরুদ্দিন সালাহুদ্দিন আইয়ুবিকে মিশরের মসজিদসমূহে উবায়দি খলিফার পরিবর্তে সমকালীন আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠের নির্দেশ জারি করতে বলেন। কিন্তু মিশরবাসীর বিক্ষুব্ধ হওয়ার আশঙ্কায় সালাহুদ্দিন এই নির্দেশ জারি করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। নুরুদ্দিন বারবার একই নির্দেশ প্রেরণ করতে থাকলে ৫৬৭ হিজরি সনের প্রথম জুমার দিন (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) সালাহুদ্দিন মিশরের সকল খতিবকে খুতবায় আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাযি বি-আমরিল্লাহর নাম পাঠের নির্দেশনা জারি করেন। উবায়দি খলিফা আযিদ তখন অসুস্থ থাকায় তার পরিবার তাকে এ বিষয়ে অবগত করেনি। ৫৬৭ হিজরি সনের ১০ মুহাররম (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর) খলিফা আযিদ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিশরে শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
নুরুদ্দিন জিনকির বড় ভাই ও মসুলের শাসক সাইফুদ্দিন গাজি ৫৪৪ হিজরি সনে (১১৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেছিলেন। এরপর মসুল রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাদের আরেক ভাই কুতুবুদ্দিন মওদুদ। কুতুবুদ্দিন নুরুদ্দিনের পূর্ণ অনুগত ছিলেন। তিনি তার রাজ্যে ভাই নুরুদ্দিনের নামে খুতবা পাঠ চালু করেন এবং নুরুদ্দিনের সঙ্গে অধিকাংশ যুদ্ধে শরিক হন। ৫৬৫ হিজরি সনে (১১৭০ খ্রিষ্টাব্দে) কুতুবুদ্দিনের মৃত্যু হলে মসুল রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। এ সময় মসুলের উজির ফখরুদ্দিন কুতুবুদ্দিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ২য় ইমাদুদ্দিনের পরিবর্তে অপর পুত্র ২য় সাইফুদ্দিন গাজিকে মসনদে বসিয়ে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। মসুলের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে নুরুদ্দিন মসুল অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি পথিমধ্যে সিনজারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ভ্রাতুষ্পুত্র ২য় ইমাদুদ্দিনকে নগরটির দায়িত্ব প্রদান করেন। এরপর তিনি মসুল অবরোধ করেন এবং ফখরুদ্দিনকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে নগরীটিকে আপন রাজ্যভুক্ত করে নেন। অবশ্য ভ্রাতুষ্পুত্র সাইফুদ্দিনকে তিনি মসুলের প্রশাসক পদে বহাল রাখেন। এর মধ্য দিয়ে পুরো জিনকি রাষ্ট্র আবারও একক নেতৃত্বে চলে আসে। এটি ৫৬৬ হিজরি সনের ঘটনা।
সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি রহ. অসুস্থ অবস্থায় ৫৬৯ হিজরি সনের ১১ শাওয়াল (১১৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মে) বুধবার আটান্ন বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বলেন, 'উমর ইবনে আবদুল আজিজের পর নুরুদ্দিনের চেয়ে অধিক ন্যায়পরায়ণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট কোনো শাসক ছিল না।'
আরেক ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে নুরুদ্দিন জিনকি রহ.-এর চরিত্রগুণের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা সেখান থেকে সামান্য কিছু অংশ তুলে ধরছি।
নুরুদ্দিন রহ. সুন্দর হস্তলিপির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রচুর দ্বীনি কিতাবাদি অধ্যয়ন করতেন, নববি নির্দেশনাবলি অনুসরণ করতেন। তিনি জামাতে নামাজ আদায়ে যত্নবান ছিলেন। তিনি অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, কল্যাণমূলক কাজ ভালোবাসতেন।
সুলতান নুরুদ্দিন মিতাহারী ও সংযমী ছিলেন। নিজের ও পরিবারের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন। এমনকি কথিত আছে, তার শাসনামলের সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তির খরচও তার চেয়ে বেশি ছিল। তিনি সম্পদ সঞ্চয় করতেন না, পার্থিব চাহিদাকে প্রাধান্য দিতেন না।
স্বাভাবিক বা রাগান্বিত-কোনো অবস্থায়ই তার মুখ থেকে কোনো অশ্লীল বা অশোভনীয় উচ্চারণ শোনা যায়নি। তিনি মৌনতাপ্রিয় ও গম্ভীর ছিলেন।
সুলতান নুরুদ্দিন হানাফি মাজহাবের ফকিহ ছিলেন। তিনি হাদিসের শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, হাদিসের পাঠগ্রহণ ও পাঠদান করেছেন। রাতভর প্রচুর নামাজ পড়তেন, সাহরির সময় হতে দিবসে ঘোড়ায় আরোহণের পূর্ব পর্যন্ত সময় নামাজে কাটিয়ে দিতেন।
সুলতান নুরুদ্দিন বিভিন্ন সড়ক ও পথের পাশে অনেক ছাউনি ও সরাইখানা নির্মাণ করেন। তিনি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তারক্ষী নিয়োজিত করেন এবং তাদের কাছ থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে পাওয়ার জন্য বার্তাবাহী কবুতরের ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রচুর খানকাও প্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতান নুরুদ্দিন তার কাছে ফুকাহায়ে কেরাম, উলামা-মাশায়েখ ও সুফি-বুজুর্গদের সমবেত করতেন এবং তাদের সম্মান করতেন। তিনি সৎ লোকদের ভালোবাসতেন।
তিনি হাদিসে নববির পাঠদানের জন্য দামেশকে একটি দারুল হাদিস প্রতিষ্ঠা করেন। ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে তিনিই প্রথম দারুল হাদিস (নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতান নুরুদ্দিন অত্যন্ত গম্ভীর ও প্রতাপসম্পন্ন ছিলেন। প্রশাসক ও সেনাপতিদের অন্তরে তার ব্যক্তিত্বের প্রবল ভীতি ও প্রতাপ কাজ করত। তার অনুমতি ব্যতীত কেউ তার সামনে বসার সাহস করত না। কিন্তু কোনো আলিম বা ফকিহ আগমন করলে নুরুদ্দিন তার সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং কয়েক কদম এগিয়ে আসতেন; এরপর তাকে শান্তভাবে ধীরস্থিরতার সঙ্গে নিজের সঙ্গে গালিচায় বসাতেন। কোনো আলিমকে প্রচুর পরিমাণ হাদিয়া প্রদান করার পর তিনি বলতেন, 'তারা হচ্ছেন আল্লাহর সৈনিক। তাদের দোয়ার বরকতেই আমরা শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করি। আমি যে হাদিয়া প্রদান করি, তার চেয়ে বাইতুল মালে তাদের অনেকগুণ বেশি অধিকার আছে। সুতরাং, তারা যদি তাদের অধিকারের এই যৎসামান্য প্রাপ্তিতেই আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন, তা তো আমাদের প্রতি তাদের অপার অনুগ্রহ।' (৫৮৪)
পিতা ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো নুরুদ্দিন জিনকিও ইসলামি ভূখণ্ডকে ক্রুসেডারমুক্ত করার লক্ষ্যে আজীবন চেষ্টা-সাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, আল-কুদস নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে আবারও ইসলামের পতাকা উড্ডীন হবে এবং মসজিদুল আকসায় মুমিনদের সিজদা-চিহ্ন অঙ্কিত হবে। এ লক্ষ্যেই তিনি ৫৬৩ হিজরি সনে (১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) মসজিদুল আকসায় স্থাপনের জন্য একটি মিম্বর তৈরি করেন। নুরুদ্দিন জিনকি রহ. জীবদ্দশায় যদিও এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি; কিন্তু তার শিষ্য সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কুদস পুনরুদ্ধার করেন এবং মিম্বরটি সেখানে স্থাপন করেন। এই সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-ই হলেন আমাদের ক্রুসেড ইতিহাসের পরবর্তী তথা তৃতীয় মহানায়ক।
নুরুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ইন্তেকালের পর তার পুত্র সালিহ ইসমাইলের নামে জিনকি রাষ্ট্রের নেতৃত্বের বায়আত গ্রহণ করা হয়। সালিহ তখন বয়সের বিবেচনায় একেবারেই নবীন ছিলেন। তাই সেনাপতি শামসুদ্দিন ইবনে মুকাদ্দিমকে তার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসক ও সেনাপতিগণ বিরোধে জড়িয়ে পড়ে এবং মতবিরোধকে কেন্দ্র করে পুরো জিনকি রাষ্ট্রে অস্থিরতা-অরাজকতা শুরু হয়। চতুর্দিক থেকে ইসলামের শত্রুরা মুসলমান ও ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ফেলতে থাকে। ক্রুসেডাররা মুসলমানদের হাত থেকে দামেশক নগরী কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। শামসুদ্দিন ইবনে মুকাদ্দিম তাদের প্রতিরোধে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত প্রচুর সম্পদ প্রদান করে তাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। অবশ্য তিনি যদি ক্রুসেডারদের (মিশরের প্রশাসক) সালাহুদ্দিন আইয়ুবির আগমনের ভয় না দেখাতেন, তাহলে তারা সন্ধিপ্রস্তাবেও রাজি হতো না।
সালাহুদ্দিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং ক্রুসেডারদের সঙ্গে আপস করে তাদেরকে অর্থ প্রদান করায় ইবনে মুকাদ্দিমসহ শামের বিভিন্ন অঞ্চলের সেনাপতি ও প্রশাসকদের কাছে পত্র পাঠিয়ে তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। সালাহুদ্দিনের পত্র পেয়ে অনুতপ্ত হওয়া দূরে থাক, সেনাপতি ও প্রশাসকগণ কঠোর ভাষায় জবাবি পত্র প্রেরণ করে। তখন সুলতান সালাহুদ্দিন শাম অভিমুখে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু এরই মধ্যে ৫৭০ হিজরি সনে ক্রুসেডাররা মিশরে হামলা চালায়। এদিকে উবায়দিরাও সালাহুদ্দিনকে হটিয়ে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার জন্য সার্বক্ষণিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়ে সালাহুদ্দিন শাম অভিযানের পরিকল্পনা আপাতত মুলতবি রাখেন।
এ সময় সিসিলি থেকে ক্রুসেডারদের বিশাল এক নৌবহর মিশরে আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। নৌবহরটিতে ছিল সৈন্যবহনকারী দুইশ জাহাজ, অশ্ববহনকারী ছত্রিশটি জাহাজ, যুদ্ধাস্ত্রে পূর্ণ ছয়টি বিশাল জাহাজ এবং রসদসামগ্রীতে পূর্ণ চল্লিশটি বড় জাহাজ। নৌবহরটিতে পঞ্চাশ হাজার পদাতিক সৈন্য এবং দেড় হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। ক্রুসেডার বাহিনী আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছেই কামান ও মিনজানিক স্থাপন করে আক্রমণ শুরু করে। আলেকজান্দ্রিয়াবাসী বীরত্বের সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ করে। দ্বিতীয় দিন অন্যান্য অঞ্চল থেকেও মুসলিম সৈন্যগণ ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছে যায়। তৃতীয় দিনই মুসলিম সৈন্যদের প্রচণ্ড আক্রমণে ক্রুসেডাররা পিছু হটে এবং পলায়নের পথ ধরে। মুসলমানরা ক্রুসেডারদের কামানগুলো জ্বালিয়ে দেয় এবং পলায়নরত ক্রুসেডারদের তাড়া করে। অসংখ্য খ্রিষ্টান সৈন্য নিহত হয়, অনেকে পানিতে ডুবে মারা যায়। এভাবে ক্রুসেডারদের মিশর দখলের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিন উবায়দিদের সব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র সফলতার সঙ্গে দমন করেন। মিশরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়ার পর তিনি শাম অভিমুখে রওনা হন। ৫৭০ হিজরি সনে তিনি তার ভাই আবু বকরকে মিশরে অস্থায়ী নায়েব নিযুক্ত করে দামেশক অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই দামেশকে প্রবেশ করেন এবং নুরুদ্দিনের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে সেখানে সৃষ্ট সকল বিশৃঙ্খলা দূর করেন। এরপর তিনি তার আরেক ভাই সাইফুল ইসলাম তুগতেকিনকে দামেশকের প্রশাসক নিযুক্ত করে আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। এ সময় উবায়দি গুপ্তঘাতক ও আলেপ্পোর সেনাপতিরা মিলে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলেও আল্লাহ তাআলা ইসলামের এই মহান সৈনিককে রক্ষা করেন এবং তিনি তাদের সকলকে পরাভূত করেন।
সুন্নিদের কাছে মিশরের কর্তৃত্ব হারানো শিয়া উবায়দি শক্তি কিন্তু নিশ্চুপ বসে ছিল না। তারা এবার খ্রিষ্টরাজ্য ত্রিপোলির শাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সালাহুদ্দিনের বিরুদ্ধে তাদেরকে সহায়তা করলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দিন ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্ক ও দূরদর্শী। তিনি তাদের সকল চক্রান্ত প্রতিহত করেন এবং হিমস, আলেপ্পো ও হামা অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে ইসলামি ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। এভাবে এ অঞ্চলের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সালাহুদ্দিন এমন এক সুবিশাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার ব্যাপ্তি ছিল উত্তর ইরাক (কুর্দিস্তান), শাম, মিশর ও বারকা (Cyrenaica) অঞ্চলজুড়ে। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি-প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্র পরিচিতি লাভ করে আইয়ুবি রাষ্ট্র নামে।
৫৮২ হিজরিতে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অধীনস্থ কারাক অঞ্চলের প্রশাসক রেনাল্ড (Raynald of Châtillon) মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার উপর আক্রমণ করে। অথচ বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের সঙ্গে তখন সুলতান সালাহুদ্দিনের শান্তিচুক্তি কার্যকর ছিল এবং চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, যেকোনো মুসলিম কাফেলা নির্বিঘ্নে মিশর থেকে শামে আসা-যাওয়া করতে পারবে; ক্রুসেডাররা তাতে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি করবে না। কিন্তু রেনাল্ড চুক্তিভঙ্গ করে কাফেলার সদস্যদের বন্দি করে এবং ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে বন্দিদেরকে বলে, 'তোমরা যদি মুহাম্মাদের ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে থাকো, তাহলে এখন তাকে ডাকো। সে এসে তোমাদের মুক্ত করুক এবং এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুক!' সালাহুদ্দিনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি রেনাল্ডকে বন্দি করতে পারলে নিজ হাতে হত্যা করার শপথ করেন।
টিকাঃ
৫৮৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/২৫৮-২৬৪।
📄 ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ
ক্রুসেডারদের এই চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের পর সুলতান সালাহুদ্দিন দ্রুত যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি ৫৮৩ হিজরি সনের ১৭ রবিউল আউয়াল দামেশক থেকে বেরিয়ে আসেন। বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে অবশেষে তিনি তাবারিয়ায় পৌঁছান।
সুলতান সালাহুদ্দিনের বিস্তৃত পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৈন্যসমাবেশ শুরু করে। এরপর তারাও তাবারিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। উভয় বাহিনী হিত্তিন নামক স্থানে পরস্পর মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী পূর্বেই যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশের পানির উৎসগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় ক্রুসেডার বাহিনী এ সময় প্রচণ্ড পানিস্বল্পতার সম্মুখীন হয়।
৫৮৩ হিজরি সনের ২৫ রবিউস সানি (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই) উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সুলতান সালাহুদ্দিন এ যুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। চরমভাবে পরাজিত ক্রুসেডার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত বা বন্দি হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম সৈন্যরা পলায়নপর ক্রুসেডারদের পিছু নিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতে থাকে এবং তাদের তরবারির আঘাতে খ্রিষ্টান সৈন্যরা লুটিয়ে পড়তে থাকে। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় (Guy of Lusignan)-এর পাশে থাকে মাত্র দেড়শ সৈন্য। ক্লান্তি ও ক্ষুৎপিপাসায় একসময় তারা পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়। বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় ও কারকের প্রশাসক রেনাল্ড মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রেই সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির জন্য একটি তাঁবু প্রস্তুত করা হয়। তাঁবুতে সুলতানের বিজ্ঞ উপদেষ্টা ও সেনাপতিগণ সমবেত হয়। সকলে কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হয়ে পড়ে। এরপর সুলতানের নির্দেশে বন্দি রাজা ও প্রশাসককে উপস্থিত করা হয় এবং তাঁবুর ভেতরে বসানো হয়। প্রচণ্ড পিপাসায় কাতর বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় পানি পান করতে চাইলে তার জন্য ঠান্ডা পানি পরিবেশন করা হয়। সামান্য পানি পান করার পর তিনি অবশিষ্ট পানি রেনাল্ডকে দিতে উদ্যত হলে সালাহুদ্দিন বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আমরা এ পানি তাকে পান করার জন্য দিইনি। কাজেই তার নিজেকে নিরাপদ ভাবার কোনো কারণ নেই।' এরপর ক্রুদ্ধ সুলতান দাঁড়িয়ে যান এবং রেনাল্ডকে তার গর্হিত আচরণ ও নবীজির শানে ধৃষ্টতার জন্য ভর্ৎসনা করেন। এরপর তিনি আপন প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে নিজ হাতে তাকে হত্যা করেন। রেনাল্ডের পরিণতি স্বচক্ষে অবলোকন করে রাজা গায় ভীত হয়ে পড়লে সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে বলেন, 'রাজাদের হত্যা করা রাজন্যবর্গের নীতি নয়; কিন্তু এই লোক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।'
এরপর বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ও তার জীবিত অনুচরদের সসম্মানে দামেশকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
📄 আল-কুদস পুনরুদ্ধার
৫৮৩ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে সুলতান সালাহুদ্দিন আক্কায় প্রবেশ করেন। মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে সেখানকার ক্রুসেডাররা পালিয়ে সুর নগরীতে চলে যায়। এরপর সালাহুদ্দিন তিবনিন (Tebnine), সিডন, ব্যাবলস ও বৈরুতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি উপকূলীয় পথ ধরে আসকালানে পৌঁছে আসকালান অবরোধ করেন। চৌদ্দ দিনের অবরোধের পর আসকালানবাসী আত্মসমর্পণ করে।
এর পাশাপাশি রামলা, দারুম, গাজা, বেথেলহাম, নাতরুন ইত্যাদি অঞ্চল বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে একদিকে আল-কুদস অবরোধ করার পথ সুগম হয়, অপরদিকে উপকূলীয় পথে আল-কুদসে সাহায্য প্রেরণের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
সার্বিক প্রস্তুতি শেষে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি অগ্রসর হন আল-কুদস অভিমুখে। তিনি সেখানে কোনো রক্তপাত ঘটাতে চাননি। কিন্তু ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বাধ্য হয়ে শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে আল-কুদসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ক্রুসেডাররা সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয় এবং এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হয় যে, আগামী চল্লিশ দিন তাদেরকে আল-কুদস ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিনিময়ে পুরুষগণ জনপ্রতি দশ দিনার, নারীগণ জনপ্রতি পাঁচ দিনার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিনিময়ে জনপ্রতি দুই দিনার প্রদান করতে হবে। কেউ নির্ধারিত দিনার প্রদান করতে না পারলে সে বন্দি বিবেচিত হবে। যারা শর্ত মেনে প্রস্থান করবে, তাদেরকে নিরাপদে সুর নগরীতে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কুদসে প্রবেশ করেন।
কত ব্যবধান ৪৯২ হিজরি ও ৫৮৩ হিজরি সনের মাঝে!
৪৯২ হিজরি সনের ২২ শাবান (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই) ক্রুসেডাররা আল-কুদস দখল করার পর নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিল, এক দিনে হত্যা করেছিল সত্তর হাজার মুসলিম নাগরিককে। এ সম্পর্কে দুজন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকের ভাষ্য দেখুন।
• তৎকালীন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম সুরি (William of Tyre) বলেন, ক্রুসেডারদের প্রবেশকালে আল-কুদস নগরী এক ভয়ানক হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে। মুসলমানদের রক্তে নগরীটি রক্তপ্রান্তরে পরিণত হয়। নগরীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভীতি ও আতঙ্ক। (৫৮৫)
• সমসাময়িক আরেক খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক উল্লেখ করেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে ক্রুসেডাররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরের দিন সকালে তিনি যখন দর্শনার্থী হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেন, তখন অনেক কষ্টে মুসলমানদের লাশের মধ্য দিয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে সক্ষম হন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিহতদের রক্ত তার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল!(৫৮৬)
বিপরীতে ৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কুদস পুনরুদ্ধার করার পর সেখানকার খ্রিষ্টান নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে কয়েকজন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকের ভাষ্য লক্ষ করুন।
• স্টিফেনসন বলেন, 'সুলতান সালাহুদ্দিন প্রচুর সংখ্যক লোককে মুক্তিপণ ছাড়াই বাইতুল মুকাদ্দাস ত্যাগের সুযোগ দিয়েছেন।'
• বৃটিশ প্রাচ্যবিদ স্ট্যানলি লেন পোল (Stanley Edward Lane-Poole) বলেন, সুলতান একদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময় নগরদ্বার খুলে রেখে অসহায় ও দরিদ্রদেরকে মুক্তিপণ ব্যতিরেকেই যেতে দিয়েছেন।'
• ভারতীয় প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমির আলি ইংরেজ ঐতিহাসিক মিলস-এর বরাতে উল্লেখ করেন-'আল-কুদস ত্যাগ করে প্রচুর সংখ্যক খ্রিষ্টান নাগরিক খ্রিষ্টরাজ্য এন্টিয়কের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু এন্টিয়কের শাসক তাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাড়িয়ে দেন। বাধ্য হয়ে তারা ফিরতি পথ ধরে এবং বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য অভিমুখে রওনা হয়। মুসলিম রাজ্যগুলোতে তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করা হয়।'
• আমির আলি আরও উল্লেখ করেন, স্ট্যানলি লেন পোলের বর্ণনামতে বাইতুল মুকাদ্দাসের তৎকালীন গির্জাধ্যক্ষ ছিলেন মায়া-মমতাহীন চরম নিষ্ঠুর একজন ব্যক্তি। দরিদ্র ও অসহায় নাগরিকদের মুক্তিপণ আদায়ে সাহায্য করার পরিবর্তে তিনি নিজের প্রচুর সম্পদ নিয়ে আল-কুদস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সালাহুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনি কেন মুসলমানদের উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করছেন না?' উত্তরে সুলতান বলেন, 'আমি তার কাছ থেকে দশ দিনারের চেয়ে সামান্য বেশিও গ্রহণ করব না এবং তার সঙ্গে প্রতারণা করব না।' এ ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্ট্যানলি লেন পোল বলেন, 'বিষয়টি এমন দাঁড়াল যে, একজন মুসলিম সুলতান এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে দয়া ও অনুগ্রহের পাঠদান করছেন।'
• প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি (Philip Khuri Hitti) শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'খ্রিষ্টান নাগরিকদের সঙ্গে সুলতান সালাহুদ্দিনের আচরণ ও ইতিপূর্বে আটাশি বছর ধরে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানদের আচরণের মাঝে পার্থক্য ছিল পুরোপুরি দৃশ্যমান ও সুস্পষ্ট।'
আল-কুদস জয়ের পর ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের প্রতিপত্তি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকে এন্টিয়ক ও সুর নগরীর মতো গোটাকয়েক নগরী। এ সময় মুসলমানদের হাতে বিজিত প্রতিটি নগরী হতে ক্রুসেডাররা ধীরে ধীরে সুর নগরীতে আশ্রয় নিতে থাকে। একত্রিত হয়েই তারা সালাহুদ্দিনের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সংগঠিত ক্রুসেড শক্তি এবার আক্কা অভিমুখে রওনা হয় এবং জল-স্থল উভয় দিক থেকে আক্কা অবরোধ করে। ৫৮৫ হিজরি সনের ৮ রজব (১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়া এ অবরোধ দুই বছর অব্যাহত থাকে।
সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীও আক্কায় পৌঁছে ক্রুসেডারদের স্থল ভাগে অবরুদ্ধ করে রাখে। সুলতান সালাহুদ্দিন নিজে তিল-কায়সানে (Tell Keisan) শিবির স্থাপন করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে অনেকবার যুদ্ধ সংঘটিত হলেও কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করতে পারেনি। এরই মধ্যে বেজে ওঠে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা।
টিকাঃ
৫৮৫. Guillaume de Tyr, 1, p. 354.
৫৮৬. Raymond d'Aigles, p. 300.
📄 তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ
[৫৮৫-৫৮৭ হিজরি/১১৮৯-১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ]
হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয় এবং এরপর আল-কুদস নগরীর পতনের ফলে ইউরোপে নতুন করে ক্রুসেড অভিযানের আওয়াজ ওঠে। তৎকালীন পোপ ৮ম গ্রেগরি (Gregory VIII) ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র নগরী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের ডাক দেন।
পোপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের শক্তিশালী কয়েকজন শাসক এবারের অভিযানে যোগদান করেন। তারা হলেন—
* জার্মানির রাজা ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের (The Holy Roman Emperor) সম্রাট ১ম ফ্রেডেরিক (Frederick Barbarossa)।
* ফ্রান্সের রাজা ২য় ফিলিপ (Philip Augustus) |
* ইংল্যান্ডের রাজা 'সিংহহৃদয়' খ্যাত প্রথম রিচার্ড (Richard the Lionheart) ।
ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রুসেডার বাহিনী আক্কা অভিমুখে রওনা হয়। জার্মানি থেকে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রওনা হওয়ার পর রাজা ১ম ফ্রেডেরিক ৫৮৬ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১১৯০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) পথিমধ্যে ডুবে মারা গেলে তার নেতৃত্বাধীন জার্মান বাহিনীর সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অধিকাংশই দেশে ফিরে যায়। অল্প কিছু সৈন্য আক্কায় পৌঁছতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে ২য় ফিলিপের নেতৃত্বাধীন ফরাসি বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী প্রথমে সিসিলিতে একত্র হয়। এরপর তারা নিজেরা পরস্পরে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় সিসিলিতেই অবস্থান করে। কিছুদিন পর ফরাসিরা সিসিলি ত্যাগ করে আক্কা অভিমুখে রওনা হয়।
ইংরেজরাও আক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে ইংরেজ নৌবহর সাইপ্রাস দ্বীপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সাইপ্রাস তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সাইপ্রাসে অবতরণ করার পর রাজা রিচার্ড বাইজান্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং সাইপ্রাস দখল করে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এরই মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা গায় রিচার্ডের কাছে দ্রুত ক্রুসেড অভিযানে যোগ দেওয়ার আবেদনবার্তা পাঠালে রিচার্ড সমুদ্রপথে আক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই গায়কেই সুলতান সালাহুদ্দিন বন্দি করার পরও ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফরাসি ও ইংরেজ বাহিনী আক্কায় পৌঁছে যাওয়ায় অবরোধকারী ক্রুসেডারদের মনোবল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আক্কার পতন ঘটানোর জন্য পূর্ণ উদ্যমে অবরোধ অব্যাহত রাখে।
৫৮৭ হিজরি সনের ১৭ জুমাদাল উখরা (১১৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই) শুক্রবার হঠাৎ করেই আক্কা নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে ক্রুশচিহ্নিত পতাকা উড়তে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলমানরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং ক্রুসেডারদের হিংস্র হামলার শিকার হয়। ষাট হাজার মুসলিম নাগরিকের প্রাণ-বিয়োগের পর আক্কার কর্তৃত্ব চলে যায় ক্রুসেডারদের হাতে।
আক্কা দখল করার পর ক্রুসেডার বাহিনীর সদস্যরা সেখানেই আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘ দিন সেখানেই কাটিয়ে দেয়। অথচ তারা বের হয়েছে 'পবিত্র ভূমি' আল-কুদস পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে!
এদিকে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজার মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বিরোধ ও সংঘাত। এর পরিণতিতে ফরাসি রাজা ফিলিপ দেশে ফিরে যান। এরপর সালাহুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী ও ১ম রিচার্ডের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনীর মাঝে একের পর এক রক্তক্ষয়ী লড়াই চলতে থাকে। জয়-পরাজয়ের পাল্লা ছিল উভয়দিকেই দোদুল্যমান।
এসব যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আরসুফের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ক্রুসেডাররা জয়ী হয়। ক্রুসেডারদের দৃষ্টিতে এ বিজয় ছিল হিত্তিনের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ।
ক্রুসেডাররা এ সময় আসকালান ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দিক থেকে আল-কুদস দখলের চেষ্টা করলেও মুসলিম প্রহরীদের তীব্র প্রতিরোধের কারণে কাছে ভিড়তে ব্যর্থ হয়। প্রহরীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তাদের লড়াই হচ্ছিল এবং লড়াইতে কখনো মুসলিম প্রহরীরা, আবার কখনো ক্রুসেডাররা জয়ী হচ্ছিল। অবশ্য এ সময় তারা উপকূলীয় বিভিন্ন নগরী দখল করতে সক্ষম হয়। একদিকে প্রচুর জনবল ক্ষয়, অপরদিকে দীর্ঘ দিনের মাতৃভূমির বিচ্ছেদের কারণে রাজা রিচার্ড এ সময় অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সন্ধিচুক্তির চেষ্টা চালান। তিনি একের পর এক কয়েকজন দূতকে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন। তার সন্ধিপ্রস্তাবে উল্লেখ ছিল— উভয়পক্ষ তিন বছর যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, আসকালানের অধিকার ক্রুসেডারদের ফিরিয়ে দিতে হবে, বাইতুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জা তাদেরকে দান করতে হবে এবং খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদেরকে বিনা মাশুলে আল-কিয়ামা গির্জা পরিদর্শন ও তীর্থযাত্রার সুযোগ দিতে হবে।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি আল-কিয়ামা গির্জা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হলেও আসকালান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তীর্থযাত্রীদের উপর যৎসামান্য অর্থ আরোপের কথা বলেন। কিন্তু ইংরেজরা দাবি জানায়, মুসলমানরা যদি আসকালানের নিরাপত্তাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করে নগরীটির নিয়ন্ত্রণ ইংরেজদের বুঝিয়ে না দেয়, তাহলে তারা সন্ধি করবে না। ফলে সুলতানও তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর সুলতান সালাহুদ্দিন জাফা পৌঁছে কঠিন অবরোধ আরোপ করেন এবং জাফা জয় করেন। ক্রুসেডারদের আবেদনের কারণে তাদের ছোট-বড় সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে সমুদ্রপথে সামরিক সহায়তা চলে আসায় ইংরেজ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রাজা রিচার্ড আক্রমণ চালিয়ে জাফা পুনরুদ্ধার করেন। যেসব মুসলমান পেছনে পড়ে গিয়েছিল, তাদেরকে বন্দি করে ইংরেজ রাজার সামনে হত্যা করা হয়।
এভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। এরই মাঝে ইংল্যান্ডের রাজা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অসুস্থ ইংরেজ রাজা মুসলিম সুলতানের কাছে ফলমূল ও বরফ চেয়ে বার্তা পাঠালে সুলতান উদার চিত্তে তার চাওয়া পূরণ করেন। অল্প কদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থ হওয়ার পরই পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমির বিরহে অস্থির ইংরেজ রাজা বারবার দূত পাঠিয়ে সুলতানকে সমঝোতাচুক্তি করার অনুরোধ জানান এবং আসকালানের দাবি ছেড়ে দিয়ে সুলতানের দাবিমতো চুক্তি করতেই সম্মতি জানান। ১৭ শাবান উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ হয়। 'রামলা চুক্তি' নামে খ্যাত চুক্তিটির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো—
• ক্রুসেডাররা সুর থেকে হাইফা পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করতে পারবে।
• কোনো প্রকার 'দর্শনার্থী মাশুল' প্রদান ছাড়াই খ্রিষ্টানরা আল-কুদসে ভ্রমণ করতে পারবে।
• আগামী তিন বছর আট মাস উভয় পক্ষের মাঝে শান্তি অবস্থা বিরাজমান থাকবে।
এই চুক্তি সম্পাদনের কারণে ইংল্যান্ডের রাজা ১ম রিচার্ড ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। চুক্তি সম্পাদনের কিছুদিন পর ৫৮৮ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১৯২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) তিনি নিজ দেশে ফিরে যান। অপরদিকে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, আরসুফ ও জাফার যুদ্ধে প্রচুর সৈন্যক্ষয় এবং শাম অঞ্চলের প্রশাসকদের অসহযোগিতার কারণে তিনি কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হন এবং যেকোনো মূল্যে আল-কুদসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এভাবেই দীর্ঘ কয়েক বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি ও বিভিন্ন নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে জার্মানি হারায় তাদের রাজাকে, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড হারায় তাদের নির্বাচিত ও সুদক্ষ অনেক সৈনিক ও সেনাপতিকে। যদিও সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী আল-কুদস পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে অভিযানে বের হয়েছিল; কিন্তু তাদের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এ অভিযানে তারা কেবল আক্কা দখল করতে সক্ষম হয়।