📄 তৃতীয় শিক্ষা : আমরা তাদের শক্তির কারণে পরাজিত হই না; পরাজিত হই নিজেদের দুর্বলতার কারণে!
এই প্রভাবক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, মুসলমানরা কাফিরদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বা তাদের সাজ-সরঞ্জামের শক্তির কারণে পরাজিত হয়নি; মূলত পরাজিত হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে নিজেদের দুর্বলতার কারণে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিজেদের কৃত বিভিন্ন অপরাধ-ত্রুটি ও ভয়াবহ বিভিন্ন ব্যাধির কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কাফিরদের হাতে ছেড়ে দেন।
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে আমরা মুসলমানদের চরম দ্বীন-বিচ্ছিন্নতা, শরিয়তের প্রতি উদাসীনতা, ফ্যাসাদ-জুলুম ও অন্যায়কর্মে অবিচলতা এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত অসুস্থ চিন্তাধারী ব্যক্তিদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখেছি। আমরা আরও দেখেছি পরকালের ওপর পার্থিব চাহিদাকে প্রাধান্যদান, যৎসামান্য সহায়সম্পত্তির ন্যায় তুচ্ছ সামগ্রীকে আঁকড়ে ধরা, জীবন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তাড়নায় দ্বীন-ধর্ম এবং ভূমি ও সম্পদকে সরাসরি বিকিয়ে দেওয়া। আমরা মুসলিম জনসাধারণকে জালিম ক্রুসেডারদের হাদিয়া-তোহফা ও পুষ্পমালা নিয়ে স্বাগত জানাতে দেখেছি। এই লাঞ্ছনাকর আচরণ ও এই অবমাননাকর তোষণ-নীতি ছিল কেবল এই আশায় যে, ক্রুসেডাররা তাদেরকে বেঁচে থাকতে দেবে। হ্যাঁ, শুধু বেঁচে থাকার জন্য। হোক সে জীবন লাঞ্ছনা ও অবমাননার, হোক সে জীবন দাসত্ব ও পরাধীনতার।
আমরা আমাদের এই ইতিহাসে দেখেছি মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা, হানাহানি-সংঘাত ও বিবাদ-বিসংবাদ। দেখেছি, কীভাবে বিভিন্ন মুসলিম ক্ষুদ্র রাজ্য অনুমানপ্রসূত সীমানা বা একটি দুর্গের জন্য আরেক মুসলিম ক্ষুদ্র রাজ্যের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আর ক্রুসেডাররা উদ্যোগ ও পদক্ষেপ থেকে দূরে থেকেও ইসলামি অনৈক্যের 'সুফল' ভোগ করেছে!
বর্তমান সিরিয়াভূমি তৎকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছিল। জাযিরা অঞ্চল গোটা দশেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। কেবল ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলই প্রতিনিধিত্ব করছিল দশ-পনেরোটি বিচ্ছিন্ন ইসলামি রাষ্ট্রের। প্রতিটি নগরী একেকটি ইমারত ও ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি অঞ্চল একেকটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। ভার ও ভারসাম্যহীন একেকজন নেতা পরিণত হয়েছিল মুসলমানদের শাসকে। এই বেদনাদায়ক পরিবেশে ইসলামি ভূখণ্ডে ঘৃণ্য দখলদারিত্ব প্রচেষ্টার সফলতা এবং মুসলিম শাসক ও সেনাপতিদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার ছিল অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
আলোচ্য ঘটনাপ্রবাহে আমরা আরও দেখেছি, বিশেষ করে শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুসলিম শাসকদের অনেকের সুস্পষ্ট, প্রত্যক্ষ ও সরাসরি দালালি। এই দালালি নীতিই টেনে এনেছিল সেই কলঙ্কজনক দুর্যোগ, যার বিবরণ আমরা পাঠ করে এসেছি। যদিও আমরা ইসলামি ভূখণ্ডের ধ্বংস ও সম্পদ নিঃশেষ হওয়ার বিরাট দায়ভার এসব শাসকদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছি; কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের পক্ষে সেসব জনগণকেও কক্ষনো ক্ষমা করা সম্ভব নয়, যারা এসব নেতার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি মেনে নিয়েছিল; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে এবং উম্মাহর সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের ঐক্য প্রচেষ্টায় বাধা দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেছিল। আমরা দেখেছি, কীভাবে দামেশক ও হিমসের জনগণ ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একক সংঘবদ্ধ কাঠামোতে একীভূত হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করতে জঘন্য ও নির্লজ্জভাবে অটল থেকেছিল। আর এ কারণেই ক্রুসেডারদের দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছিল আরও অনেক বছর।
সুতরাং এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এ সকল পর্যবেক্ষণ এ কথাই প্রমাণ করে যে, মুসলমানরা তাদের দুশমনদের শক্তি দ্বারা পরাজিত হয় না; পরাজিত হয় নিজেদের দুর্বলতার কারণে। আর তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেদের ভেতর থেকে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমরা কখনোই প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য ও বিরাট বাহিনী দেখে ভীত হব না। কারণ, আমরা যদি ইসলামের সঙ্গে জুড়ে থাকি, শরিয়তকে আঁকড়ে ধরি, তাহলে বিজয় আমাদের পক্ষেই লেখা হবে। দেখুন, কত মূল্যবান ও অলংকারপূর্ণ মন্তব্য করেছেন উম্মাহর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.। জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠিতে হাত রেখে তিনি বলেছেন—
“নিঃসন্দেহে তোমরা সংখ্যা ও সরঞ্জামের আধিক্যে তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ কর না; তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করা হয় তোমাদের আপন রবের প্রতি আনুগত্য ও তাদের অবাধ্যতার কারণে। যদি অন্যায় ও অবাধ্যতায় তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও, তাহলে সংখ্যা ও শক্তি এবং উপায় ও সরঞ্জামের প্রাচুর্যের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে জয় তাদেরই হবে।” (৫৮১)
টিকাঃ
৫৮১. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি কৃত নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব-এর সূত্রে মাহমুদ শিদ খাত্তাব, আল-ফারুক আল-কায়িদ, পৃষ্ঠা: ১৫৫।
📄 চতুর্থ শিক্ষা : ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে জিহাদের কোনো বিকল্প নেই!
মুসলিম উম্মাহর সৎ ও যোগ্য সন্তানেরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলমানদের ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার একমাত্র পথ হচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। জবরদখলকারী বাহিনী স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হবে না; বরং যেতে বাধ্য করতে হবে! এ কারণেই তাদের জীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত জিহাদি তৎপরতা অব্যাহত ছিল। আমাদের আলোচ্য ইতিহাসে সম্ভবত আমরা এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করেছি মওদুদ বিন তুনিকতিন রহ.-এর ক্ষেত্রে, এরপর শক্তিশালী বীরযোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ক্ষেত্রে। এই দুই মহান নেতার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে যে বিষয়টি আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়, তা হলো—তারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে নিজেদের জীবনের মূল ব্যস্ততা বানিয়ে নিয়েছিলেন। আর তাই তাদের উভয়ের শাসনক্ষমতা লাভের সময় থেকে নিয়ে নিজেদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি মুহূর্তও জিহাদি চিন্তা দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়নি।
আর জিহাদও হতে হবে একমাত্র আল্লাহর পথে। অন্য কোনো নিয়ত ও মনোবাঞ্ছা বা দ্বৈত কোনো লক্ষ্য এক্ষেত্রে বৈধ নয়। সুতরাং ক্ষমতার মসনদ লাভের জন্য, অর্থসম্পদ অর্জনের জন্য, মালিকানাধীন ভূসম্পদ বিস্তৃত করার জন্য, গোত্র বা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, এমনকি শাসক বা সুলতানের স্বার্থ রক্ষার জন্য জিহাদও সঠিক জিহাদ নয়। অনেক বাহিনী কেবল এ কারণে যুদ্ধ করে যে, তাদের সেনাপতি যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমন বাহিনীর সদস্যদের লড়াই হয় বিক্ষিপ্ত; তাদের কোনো লক্ষ্য থাকে না। আর সাধারণত এ জাতীয় বাহিনী জয়লাভও করে না। কারণ, তারা আল্লাহর জন্য কাজ করে না। আর আল্লাহ কেবল তাদেরকেই সাহায্য করেন, যারা তাকে সাহায্য করে; আল্লাহ কেবল তাদেরকে সহায়তা করেন, যারা তাদের কর্ম-ইচ্ছা পুরোপুরি আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ﴾
আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তার (দ্বীনের) সাহায্য করবে। [সুরা হজ্জ: ৪০]
মওদুদ ও ইমাদুদ্দিন জিনকি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই আপন আপন সেনাবাহিনী ও জনসাধারণকে এই মর্মকথা শিক্ষাদানে সচেষ্ট ছিলেন। আর এ কারণেই তাদের আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর প্রকৃত ঝান্ডা এবং বিদ্বেষ-শত্রুতা ও অস্বচ্ছতা-মুক্ত নির্ভেজাল একনিষ্ঠতা। যেদিন মুসলিম উম্মাহ মওদুদ ও ইমাদুদ্দিনের ন্যায় নিষ্ঠাবান ও সচেতন নেতা জন্ম দিতে পারবে, আল্লাহর হুকুমে সেদিন আমরা নুসরত ও বিজয় প্রত্যক্ষ করব। আর আল্লাহর পক্ষে তা মোটেও কঠিন নয়।
📄 পঞ্চম শিক্ষা : বিজয় নিশ্চিত করার জন্য ঐক্য জরুরি!
মুসলিম উম্মাহর সৎ ও যোগ্য সন্তানগণ এ বিষয়টিও উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঐক্য ব্যতীত জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ কার্যকর হয় না। এ কারনেই রণাঙ্গনের কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই তারা জাতিকে এক ও অভিন্ন কাঠামোতে ঐক্যবদ্ধ করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থেকেছেন এবং নিজেদের পূর্ণ সময় ও প্রচেষ্টা এ উদ্দেশ্যে ব্যয় করেছেন। এ পথে তারা প্রচুর সংকট অতিক্রম করেছেন, কঠিন সব বিপদ-আপদ মোকাবিলা করেছেন; কিন্তু তবুও এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুরো জীবন আগ্রহী ও সচেষ্ট থেকেছেন। কারণ, তারা প্রকৃতই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বিভেদ-বিচ্ছিন্নতাই ব্যর্থতার কারণ এবং কলহ-বিবাদের সঙ্গেই পরাজয় সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন—
﴿وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ )
এবং পরস্পরে কলহ করবে না, অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্যধারণ করবে। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সুরা আনফাল: ৪৬]
ঐক্য ও একক ইসলামি কাঠামো সকল নেতা ও শাসকের চাহিদা ছিল না। অনেকেই অতি সামান্য ভূখণ্ডের ব্যক্তিক্ষমতার লোভে ঐক্যের বিরোধিতা করেছে, ঐক্যপ্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। একে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে মোকাবিলা, সংঘর্ষ ও সংঘাত। আর তাই অর্থহীন ফাঁপা নেতৃত্বের প্রত্যাশী যেসব নেতা কেবল নিজেদের স্বার্থ অনুসন্ধান করে, তাদের মোকাবিলার জন্য সকল পন্থায় চেষ্টা করা অপরিহার্য ছিল।
সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতৃবৃন্দ কখনো আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে, কখনো অর্থসম্পদ বা জায়গিরের প্রস্তাব দিয়ে, কখনো-বা হুমকি-ধমকির মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যের পথে আনতে চেষ্টা করেছেন; আবার কখনো এসব পন্থায় কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সামরিক লড়াইয়ের মাধ্যমে সমাধানে সচেষ্ট হয়েছেন। এভাবে তাদের প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। যদিও বৃহত্তর জাতির বিবেচনায় তা ছিল আংশিক ঐক্য; কিন্তু তার মাধ্যমেই বিজয় নিশ্চিত হয়েছে এবং আমরা স্বস্তি ও আনন্দ প্রত্যক্ষ করেছি।
আমরা আমাদের পঠিত ইতিহাসে দেখেছি, আমাদের ইসলামি ইতিহাসের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য মাত্রায় ঐক্যের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি অর্থসম্পদ বা জায়গির প্রদান করে, কাউকে ক্ষমতা প্রদান করে ঐক্যের পথে আনতে চেয়েছেন; জাতির যৌথ নেতৃত্বের নিদর্শন হিসেবে কারও হাতে হাত রেখেছেন। আবার কখনো তিনি দুটি রাজ্যকে একীভূত করার জন্য বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ সারি যেন বিভক্ত না হয়ে যায়, এজন্য তিনি সুলতান মাসউদ বা অন্যদের কষ্টদায়ক আচরণও উপেক্ষা করেছেন। এসব আচরণ তিনি করেছেন সেলজুক, আব্বাসি, উরতুক, তুর্কমেন, আরব, বনু মুনকিয, বনু দানিশমান্দসহ সকলের সঙ্গে। ঐক্য প্রত্যাখ্যানকারী কোনো নগরী তিনি মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অবরোধ করে রেখেছেন। উম্মাহর ঐক্যের অতি মূল্যবান স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি তার জীবনের শুরু থেকে শেষ পুরোটাই ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। আর এভাবেই তিনি মৃত্যুর সময় রেখে যেতে পেরেছেন এক বিরাট একক রাষ্ট্রকাঠামো, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল মসুল, আলেপ্পো, হাররান, নুসায়বিন, হিমস, হামা ও বালাবান্ধু নগরী।
নিঃসন্দেহে এ এক কঠিন জীবন। কিন্তু যেহেতু তার সামনে এর লক্ষ্য সুস্পষ্ট ছিল, আর দৃষ্টি ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি, তাই এই সুকঠিন কাজও তার জন্য সহজ কাজে পরিণত হয়েছিল।
📄 ষষ্ঠ শিক্ষা : আদর্শ নমুনা ব্যতীত পরিবর্তন ও সংস্কারের আশা নেই!
পেছনের আলোচনায় আমরা অনুধাবন করেছি, মুসলিম জনগণের মধ্যে কল্যাণের অনেক উপাদান রয়েছে, আছে সুস্থ ও সঠিক প্রকৃতি ও স্বভাব। কিন্তু জাতির জন্য প্রয়োজন এমন সুস্পষ্ট ও সুন্দর আদর্শ নমুনা, সকলে যার অনুসরণ করবে। এমন আদর্শ নমুনা সামনে থাকলেই অন্তরে অন্তরে সুপ্ত কল্যাণ উদ্ভাসিত হবে এবং সততা ও কল্যাণের আগ্রহ ও প্রবণতা জনসাধারণের মাঝে স্পন্দিত হবে।
স্বভাবগতভাবেই মানুষ অনুসরণযোগ্য আদর্শের মুখাপেক্ষী। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্য হতে রাসুল প্রেরণ করেছেন, যেন তারা মানুষের জন্য সৎ ও উত্তম নমুনা হতে পারেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
বস্তুত আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ—এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। [সুরা আহযাব: ২১]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মানুষ যখন নবীজিকে নিজেদের মাঝে প্রত্যক্ষ করেছে এবং দেখেছে যে, তিনি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন নন, তিনি তাদের পরিচর্যা ও দীক্ষাদান করছেন, জিহাদ করছেন, দান করছেন, হক ও ন্যায়ের কথা বলছেন, মজলুমের পক্ষে প্রতিরক্ষা করছেন, কল্যাণ কাজ করছেন ও অন্যায় হতে দূরে থাকছেন, তখন সাধারণ মানুষও স্পন্দিত হয়েছে। মানুষ দেখেছে, তিনি তাদেরকে যা বলেন, তা বাস্তব, জীবন্ত এবং তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে, তখন তারা তাকে সত্যায়ন করেছে এবং তার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করেছে।
মুসলিম উম্মাহর সৎ ও ন্যায়বান ব্যক্তিগণও এমনই ছিলেন।
তাদের কথা-কাজে ভিন্নতা ছিল না।
তাদের ভেতর-বাহির অভিন্ন ছিল।
মানুষকে তারা যে উপদেশ দিতেন, তা অন্যদের কাছে দাবি করার পূর্বে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন।
আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দেখেছি, তিনি নিজের জন্য কোনো ভূসম্পদ বা অর্থসম্পদ গ্রহণ করেননি। এ কারণেই তিনি তার সৈন্যদের এবং সেনাপতি ও প্রশাসকদের মানুষের ভূসম্পত্তি ও সম্পদ গ্রহণে নিষেধ করতে পারতেন।
আমরা তাকে আরও দেখেছি, তিনি প্রতিদিন তার সম্পদ দরিদ্র- অসহায়দের দান করতেন। আর তাই তিনি তার সঙ্গীদেরকেও কৃষকসমাজ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সদয় আচরণ করার নির্দেশ প্রদানের শক্তি রাখতেন।
আমরা দেখেছি, তিনি সবার আগে লড়াই শুরু করতেন, অন্যান্য সৈন্যের তুলনায় তিনি সবার আগে শত্রুর কাছে পৌঁছে যেতেন। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, এডেসা নগরদ্বারে তিনিই সবার পূর্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এ কারণেই তিনি তার সৈন্যদেরকেও জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন।
আমরা তাকে দেখেছি, তিনি আলিম ও ফকিহগণের কাছে শরিয়তের বিধান জিজ্ঞেস করতেন, তাদের মতামত-পরামর্শ শুনতেন ও গ্রহণ করতেন। এ কারণেই তিনি তার জনগণকে আলিমদের কথা শ্রবণের ও অনুসরণের আদেশ করতে পেরেছিলেন।
দাঈ ও দ্বীনপ্রচারক, আলিম-উলামা, মুজাহিদ-সেনাপতি এবং শাসক ও নেতৃবৃন্দের জেনে রাখা উচিত, এক ব্যক্তির সামনে হাজারজনের কথার চেয়ে হাজারজনের মাঝে একজনের কাজ বেশি কার্যকর ও কল্যাণকর!