📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 প্রথম শিক্ষা : প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না!

📄 প্রথম শিক্ষা : প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না!


আমরা একসঙ্গে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের মাত্র পঞ্চাশ বছরের বিবরণ পর্যবেক্ষণ করেছি। তাও পঞ্চাশ বছরের জাতি-ইতিহাসের একটিমাত্র দিক-ক্রুসেড যুদ্ধ ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি। পঞ্চাশ বছরের পুরো মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসও নয়; মুসলিম বিশ্বের একটিমাত্র অঞ্চলের ইতিহাস-শাম ও ইরাক অঞ্চল। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও আমরা পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করতে পারি যে, অধিকাংশ পাঠক এসব ঘটনাপ্রবাহ জীবনে এই প্রথমবার পাঠ করেছেন!
পাঠকদের মাঝে কে ইতিপূর্বে মওদুদ বিন তুনতেকিনের নাম শুনেছেন?! কে শুনেছেন সুকমান বিন উরতুক, ইলগাজি বিন উরতুক বা বাল্ক বিন বাহরামের নাম?
কে জানেন মালিকশাহ ও নিজামুল মুলকের জীবনকথা?
কে ইতিপূর্বে পাঠ করেছেন বারিনের বিজয়াভিযান বা শাইজার অবরোধের ইতিহাস?
বরং বলুন, এমনকি কে কে জানতেন স্বয়ং ইমাদুদ্দিন জিনকিকে?!
জানা মানে শুধু নাম জানা নয়; আমরা বলতে চাচ্ছি ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য, সংস্কার ও সংগ্রামের পদ্ধতি, জীবনের পথ ও পন্থা এবং সংগ্রামী জীবনের বিবরণ জানার কথা।
প্রিয় পাঠক, কেউ কি পারবেন আপন সন্তান ও সমাজের সামনে সেই পদ্ধতির বিশ্লেষণ করতে, যার মাধ্যমে গড়ে উঠেছেন একজন ইমাদুদ্দিন জিনকি; যার ছোঁয়ায় পৌঁছে গেছেন কর্ম-অবদানের সর্বোচ্চ শিখরে?! আমরা তো তার প্রতিপালন ও শিক্ষাগ্রহণের সুস্পষ্ট কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছি, প্রত্যক্ষ করেছি তার তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যার সুদৃঢ় পদ্ধতি। আমরা যদি আমাদের জাতির জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকির ন্যায় ব্যক্তি তৈরি করতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের প্রয়োজন তার জীবন ও জীবনীর প্রতিটি অধ্যায়ের গভীর ও বিস্তৃত অধ্যয়ন।
তারপর দেখুন, আমরা এ গ্রন্থে শুধু ক্রুসেড অভিযান সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ আলোচনা করেছি। আমরা আলোচনা করিনি সমকালীন আলিম-উলামা ও জ্ঞানী-গুণীজনের বিস্তারিত জীবন সম্পর্কে; আলোচনা করিনি সে যুগের মুসলমানদের চিকিৎসা, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা ও ভূগোলসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন অঙ্গনের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে; আলোচনা করিনি স্থাপত্যশৈলি এবং শিল্প ও প্রযুক্তিগত অবদান সম্পর্কে; আলোচনা করিনি অর্থনৈতিক জীবনধারা বা বাণিজ্যিক প্রকল্প-পরিকল্পনা সম্পর্কে; আলোচনা করিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলন বা সাহিত্য জাগরণ সম্পর্কেও!
এভাবে আমরা সভ্যতার হাজারো দিকের আলোচনা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছি। কারণ, ক্রুসেড যুদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে সেসব বিষয়ের মজবুত কোনো যোগসূত্র নেই। যদি আমরা সেসব অঙ্গন নিয়েও আলোচনার ক্ষেত্র উন্মুক্ত করি, তাহলে অবাক বিস্ময়ে এমন সব উজ্জ্বল ও অত্যুজ্জ্বল চিত্র প্রত্যক্ষ করব, যার বিশ্লেষণ ও গবেষণার জন্য প্রয়োজন এমন দশ-বিশ খণ্ড বিশিষ্ট গ্রন্থের!
অধিকন্তু আমরা এতক্ষণ যা কিছু উল্লেখ করেছি, তা ছিল কেবল শাম ও ইরাক অঞ্চলের জীবনযাত্রার অবদান!
আমরা যদি দৃষ্টি আরও প্রসারিত করে সে যুগের প্রতিটি ইসলামি জনপদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকেও আলোচনার পরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করে নিই; আলোচনা করি আন্দালুস, মাগরিব ভূমি ও পশ্চিম আফ্রিকা সম্পর্কে, মিশর, সুদান ও পূর্ব আফ্রিকা সম্পর্কে, ইয়ামেন, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতবর্ষ সম্পর্কে এবং তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য নগর ও জনপদ সম্পর্কে, তাহলে?!
প্রতিটি জনপদেই তো ঘটেছে উত্তপ্ত সংঘাত ও মনোমুগ্ধকর ঘটনাবলি। আমরা যদি এভাবে দৃষ্টিকে বিস্তৃত করি, নিশ্চিত উপলব্ধি করতে সক্ষম হব যে, আমাদের ইতিহাস এমন এক সম্পদভান্ডার, যার কোনো সীমানা নেই এবং অমূল্য সেই জ্ঞানসম্পদ হতে আমরা যে শিক্ষা ও উপদেশ আহরণ করতে পারব, তা গণনাতীত। একই সঙ্গে আমরা আমাদের যাপিত জীবনের শিক্ষা-দীক্ষা ও পরিচর্যা-প্রতিপালনের অঙ্গনে ত্রুটি ও অবহেলার পরিমাণও অনুমান করতে পারব। ধারণা করতে পারব যে, কতটা উদাসীনতার পর আমরা আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অবহেলার এই নিম্নতম স্তরে উপনীতি হয়েছি!
নিঃসন্দেহে দুর্যোগ ও সংকট এক ক্ষেত্রে নয়; অনেকগুলো বিষয়ের সমন্বয়ে তৈরি!
আমাদের সংকট আমরাই তৈরি করেছি!
শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠক্রম-কারিকুলাম, তথ্য ও প্রচার অঙ্গন, প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড ইত্যাদির ব্যাপক নিরীক্ষণ অতীব জরুরি। তদ্রূপ শরিয়তবোদ্ধা আলিমসমাজ এবং জাতির চিন্তাবিদ ও সংস্কারকদেরও উচিত নিজেদের কর্মপন্থার পুনঃবিন্যাস ও নবপরিকল্পনা প্রণয়ন। ইসলামি ইতিহাসকেও শিক্ষা-কারিকুলাম ও প্রচারণামূলক কর্মতৎপরতার অন্তর্ভুক্ত করা এবং সামাজিক সংস্কারকার্যে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তখন ইতিহাস অবশ্যই আমাদের জন্য সুপ্ত সব মণিমুক্তা বের করে আনবে, কর্মের বিভিন্ন অঙ্গনে উত্থাপিত সব সংশয়-সন্দেহ হতে রক্ষা করবে, সৎ আদর্শ ও দৃষ্টান্ত প্রকাশ করবে এবং মহান শিক্ষা ও উপদেশ দান করবে।
নিঃসন্দেহে এর জন্য একজন বা গুটিকয়েক ব্যক্তির প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন জাতির সম্মিলিত প্রয়াস-প্রচেষ্টা!

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দ্বিতীয় শিক্ষা : পারস্পরিক সংঘাত একটি বিশ্বজনীন রীতি!

📄 দ্বিতীয় শিক্ষা : পারস্পরিক সংঘাত একটি বিশ্বজনীন রীতি!


আলোচ্য ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ক্রুসেডাররা বিভিন্ন অসত্য, অমূলক ও ভিত্তিহীন যুক্তিতে পশ্চিম ইউরোপ থেকে এসে ইসলামি ভূখণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল।
আমরা আরও প্রত্যক্ষ করেছি, ক্রুসেডাররা ইসলামি ভূখণ্ডে পা রাখার প্রথম দিন থেকে যে সংঘাত ও সংঘর্ষের সূচনা হয়েছিল, আলোচ্য সময়ে এক মুহূর্তের জন্যও তা স্তিমিত হয়নি। এই পুরো সময়ে কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো মাধ্যম ছিল না, যার মাধ্যমে তাদেরকে তুষ্ট করে ইসলামি ভূখণ্ড ত্যাগ করে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে রাজি করানো সম্ভব হতো। আর তাই সামরিক সংঘাতই ছিল অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যা ঘটেছে, তা ছিল পৃথিবীর এক শাশ্বত রীতি ও নিয়মের বাস্তবায়ন। কারণ, প্রতিযুগেই থাকবে ভালো ও মন্দ, সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায় এবং ঈমান ও কুফর। এ সবকিছুই থাকবে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। আর এই দ্বিমুখী গুণ ও বৈশিষ্ট্য যখন স্থায়ী, যুদ্ধ ও লড়াই এবং সংঘাত ও হানাহানিও থাকবে চিরকাল। রাজনীতিবিদ ও কূটনৈতিক নেতৃবৃন্দ যতই স্মিত হাসি বিনিময় করুন না কেন, এই বাস্তবতা থেকে নিষ্কৃতির কোনো পথ নেই! যতই তারা হৃদ্যতা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহাবস্থানের বুলি আওড়ান না কেন, দিন শেষে সবাই ফিরে যান এই অমোঘ বাস্তবতা ও বিশ্বজনীন নিয়মের দিকে!
নিঃসন্দেহে এটি এক শাশ্বত রীতি। এর নাম 'পারস্পরিক প্রতিরোধ' নীতি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَ لَوْ لَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْاَرْضُ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ ذُوْ فَضْلٍ عَلَى الْعٰلَمِيْنَ
আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কতকের মাধ্যমে কতককে প্রতিহত না করতেন, তবে পৃথিবীতে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু আল্লাহ জগৎসমূহের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল। [সুরা বাকারা: ২৫১]
আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন-
(وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا)
তারা ক্রমাগত তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে সম্ভব হলে তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন থেকে সরিয়ে দিতে পারে। [সুরা বাকারা: ২১৭]
আমরা মুসলমানদেরকে যুদ্ধ ও লড়াইয়ের প্রতি উত্তেজিত করার জন্য কিংবা তাদেরকে হিংস্র আচরণে প্ররোচিত করার জন্য এ বাস্তবতার কথা আলোচনা করছি না। আমরা এই বাস্তবতা এজন্য তুলে ধরেছি, যেন মুসলমানরা সতর্কতা অবলম্বন করে এবং নিজেদের শত্রুদের বুঝতে পারে; যেন কোনো প্রতারক-প্রবঞ্চক মিষ্টি বুলি ও ভালো ভালো কথার মাধ্যমে আমাদেরকে প্রতারিত করার সুযোগ না পায়। আমরা এ বিশ্বজনীন বাস্তবতা এজন্য তুলে ধরেছি, যেন মুসলমানরা সদা প্রস্তুত থাকে এবং সার্বক্ষণিক তৎপরতা বজায় রাখে। কারণ, সামান্য একটু নিদ্রা, আরাম বা শিথিলতা হয়তো এমন দখলদারিত্ব ও জবরদখলের পরিণতি ডেকে আনবে, যার ফল ভোগ করতে হবে দশকের পর দশক!

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 তৃতীয় শিক্ষা : আমরা তাদের শক্তির কারণে পরাজিত হই না; পরাজিত হই নিজেদের দুর্বলতার কারণে!

📄 তৃতীয় শিক্ষা : আমরা তাদের শক্তির কারণে পরাজিত হই না; পরাজিত হই নিজেদের দুর্বলতার কারণে!


এই প্রভাবক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, মুসলমানরা কাফিরদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বা তাদের সাজ-সরঞ্জামের শক্তির কারণে পরাজিত হয়নি; মূলত পরাজিত হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে নিজেদের দুর্বলতার কারণে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিজেদের কৃত বিভিন্ন অপরাধ-ত্রুটি ও ভয়াবহ বিভিন্ন ব্যাধির কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কাফিরদের হাতে ছেড়ে দেন।
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে আমরা মুসলমানদের চরম দ্বীন-বিচ্ছিন্নতা, শরিয়তের প্রতি উদাসীনতা, ফ্যাসাদ-জুলুম ও অন্যায়কর্মে অবিচলতা এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত অসুস্থ চিন্তাধারী ব্যক্তিদের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখেছি। আমরা আরও দেখেছি পরকালের ওপর পার্থিব চাহিদাকে প্রাধান্যদান, যৎসামান্য সহায়সম্পত্তির ন্যায় তুচ্ছ সামগ্রীকে আঁকড়ে ধরা, জীবন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তাড়নায় দ্বীন-ধর্ম এবং ভূমি ও সম্পদকে সরাসরি বিকিয়ে দেওয়া। আমরা মুসলিম জনসাধারণকে জালিম ক্রুসেডারদের হাদিয়া-তোহফা ও পুষ্পমালা নিয়ে স্বাগত জানাতে দেখেছি। এই লাঞ্ছনাকর আচরণ ও এই অবমাননাকর তোষণ-নীতি ছিল কেবল এই আশায় যে, ক্রুসেডাররা তাদেরকে বেঁচে থাকতে দেবে। হ্যাঁ, শুধু বেঁচে থাকার জন্য। হোক সে জীবন লাঞ্ছনা ও অবমাননার, হোক সে জীবন দাসত্ব ও পরাধীনতার।
আমরা আমাদের এই ইতিহাসে দেখেছি মুসলমানদের পারস্পরিক বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা, হানাহানি-সংঘাত ও বিবাদ-বিসংবাদ। দেখেছি, কীভাবে বিভিন্ন মুসলিম ক্ষুদ্র রাজ্য অনুমানপ্রসূত সীমানা বা একটি দুর্গের জন্য আরেক মুসলিম ক্ষুদ্র রাজ্যের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আর ক্রুসেডাররা উদ্যোগ ও পদক্ষেপ থেকে দূরে থেকেও ইসলামি অনৈক্যের 'সুফল' ভোগ করেছে!
বর্তমান সিরিয়াভূমি তৎকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছিল। জাযিরা অঞ্চল গোটা দশেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। কেবল ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলই প্রতিনিধিত্ব করছিল দশ-পনেরোটি বিচ্ছিন্ন ইসলামি রাষ্ট্রের। প্রতিটি নগরী একেকটি ইমারত ও ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি অঞ্চল একেকটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। ভার ও ভারসাম্যহীন একেকজন নেতা পরিণত হয়েছিল মুসলমানদের শাসকে। এই বেদনাদায়ক পরিবেশে ইসলামি ভূখণ্ডে ঘৃণ্য দখলদারিত্ব প্রচেষ্টার সফলতা এবং মুসলিম শাসক ও সেনাপতিদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার ছিল অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
আলোচ্য ঘটনাপ্রবাহে আমরা আরও দেখেছি, বিশেষ করে শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুসলিম শাসকদের অনেকের সুস্পষ্ট, প্রত্যক্ষ ও সরাসরি দালালি। এই দালালি নীতিই টেনে এনেছিল সেই কলঙ্কজনক দুর্যোগ, যার বিবরণ আমরা পাঠ করে এসেছি। যদিও আমরা ইসলামি ভূখণ্ডের ধ্বংস ও সম্পদ নিঃশেষ হওয়ার বিরাট দায়ভার এসব শাসকদের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছি; কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের পক্ষে সেসব জনগণকেও কক্ষনো ক্ষমা করা সম্ভব নয়, যারা এসব নেতার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি মেনে নিয়েছিল; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে এবং উম্মাহর সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের ঐক্য প্রচেষ্টায় বাধা দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করেছিল। আমরা দেখেছি, কীভাবে দামেশক ও হিমসের জনগণ ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একক সংঘবদ্ধ কাঠামোতে একীভূত হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করতে জঘন্য ও নির্লজ্জভাবে অটল থেকেছিল। আর এ কারণেই ক্রুসেডারদের দখলদারিত্ব স্থায়ী হয়েছিল আরও অনেক বছর।
সুতরাং এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এ সকল পর্যবেক্ষণ এ কথাই প্রমাণ করে যে, মুসলমানরা তাদের দুশমনদের শক্তি দ্বারা পরাজিত হয় না; পরাজিত হয় নিজেদের দুর্বলতার কারণে। আর তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেদের ভেতর থেকে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমরা কখনোই প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য ও বিরাট বাহিনী দেখে ভীত হব না। কারণ, আমরা যদি ইসলামের সঙ্গে জুড়ে থাকি, শরিয়তকে আঁকড়ে ধরি, তাহলে বিজয় আমাদের পক্ষেই লেখা হবে। দেখুন, কত মূল্যবান ও অলংকারপূর্ণ মন্তব্য করেছেন উম্মাহর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.। জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠিতে হাত রেখে তিনি বলেছেন—
“নিঃসন্দেহে তোমরা সংখ্যা ও সরঞ্জামের আধিক্যে তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ কর না; তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করা হয় তোমাদের আপন রবের প্রতি আনুগত্য ও তাদের অবাধ্যতার কারণে। যদি অন্যায় ও অবাধ্যতায় তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও, তাহলে সংখ্যা ও শক্তি এবং উপায় ও সরঞ্জামের প্রাচুর্যের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে জয় তাদেরই হবে।” (৫৮১)

টিকাঃ
৫৮১. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি কৃত নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব-এর সূত্রে মাহমুদ শিদ খাত্তাব, আল-ফারুক আল-কায়িদ, পৃষ্ঠা: ১৫৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 চতুর্থ শিক্ষা : ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে জিহাদের কোনো বিকল্প নেই!

📄 চতুর্থ শিক্ষা : ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে জিহাদের কোনো বিকল্প নেই!


মুসলিম উম্মাহর সৎ ও যোগ্য সন্তানেরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলমানদের ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার একমাত্র পথ হচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। জবরদখলকারী বাহিনী স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হবে না; বরং যেতে বাধ্য করতে হবে! এ কারণেই তাদের জীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত জিহাদি তৎপরতা অব্যাহত ছিল। আমাদের আলোচ্য ইতিহাসে সম্ভবত আমরা এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করেছি মওদুদ বিন তুনিকতিন রহ.-এর ক্ষেত্রে, এরপর শক্তিশালী বীরযোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ক্ষেত্রে। এই দুই মহান নেতার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে যে বিষয়টি আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়, তা হলো—তারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে নিজেদের জীবনের মূল ব্যস্ততা বানিয়ে নিয়েছিলেন। আর তাই তাদের উভয়ের শাসনক্ষমতা লাভের সময় থেকে নিয়ে নিজেদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটি মুহূর্তও জিহাদি চিন্তা দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়নি।
আর জিহাদও হতে হবে একমাত্র আল্লাহর পথে। অন্য কোনো নিয়ত ও মনোবাঞ্ছা বা দ্বৈত কোনো লক্ষ্য এক্ষেত্রে বৈধ নয়। সুতরাং ক্ষমতার মসনদ লাভের জন্য, অর্থসম্পদ অর্জনের জন্য, মালিকানাধীন ভূসম্পদ বিস্তৃত করার জন্য, গোত্র বা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, এমনকি শাসক বা সুলতানের স্বার্থ রক্ষার জন্য জিহাদও সঠিক জিহাদ নয়। অনেক বাহিনী কেবল এ কারণে যুদ্ধ করে যে, তাদের সেনাপতি যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমন বাহিনীর সদস্যদের লড়াই হয় বিক্ষিপ্ত; তাদের কোনো লক্ষ্য থাকে না। আর সাধারণত এ জাতীয় বাহিনী জয়লাভও করে না। কারণ, তারা আল্লাহর জন্য কাজ করে না। আর আল্লাহ কেবল তাদেরকেই সাহায্য করেন, যারা তাকে সাহায্য করে; আল্লাহ কেবল তাদেরকে সহায়তা করেন, যারা তাদের কর্ম-ইচ্ছা পুরোপুরি আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ﴾
আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তার (দ্বীনের) সাহায্য করবে। [সুরা হজ্জ: ৪০]
মওদুদ ও ইমাদুদ্দিন জিনকি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই আপন আপন সেনাবাহিনী ও জনসাধারণকে এই মর্মকথা শিক্ষাদানে সচেষ্ট ছিলেন। আর এ কারণেই তাদের আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর প্রকৃত ঝান্ডা এবং বিদ্বেষ-শত্রুতা ও অস্বচ্ছতা-মুক্ত নির্ভেজাল একনিষ্ঠতা। যেদিন মুসলিম উম্মাহ মওদুদ ও ইমাদুদ্দিনের ন্যায় নিষ্ঠাবান ও সচেতন নেতা জন্ম দিতে পারবে, আল্লাহর হুকুমে সেদিন আমরা নুসরত ও বিজয় প্রত্যক্ষ করব। আর আল্লাহর পক্ষে তা মোটেও কঠিন নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00