📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস 📄 অমার্জনীয় এই অপরাধের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণ

📄 অমার্জনীয় এই অপরাধের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণ


নিঃসন্দেহে সকলের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই কাপুরুষ ভৃত্যটি কেন জাতি-জীবনের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুসলমানদের মহান নেতা ও সুমহান সেনাপতিকে হত্যা করল?!
বাস্তবতা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ইসলামি ইতিহাসের এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ও অমীমাংসিত রহস্য। প্রাচীন ও আধুনিক ঐতিহাসিকগণ এর কারণ নির্ণয়ে বিভিন্ন মত পেশ করেছেন। কোনো কোনো গ্রন্থে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. যখন ঘুমাতে গিয়েছিলেন, তখন উক্ত ভৃত্য প্রয়োজনের চেয়ে অধিক উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিল। এতে তার ঘুমে সমস্যা হচ্ছিল বিধায় তিনি ভৃত্যটিকে কঠিন ভাষায় তিরস্কার করেন। এতে ভয় পেয়ে ভৃত্যটি কিছুক্ষণ পর নিদ্রায় নিমগ্ন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করে!
আমার দৃষ্টিতে এ সম্ভাবনাটি একেবারেই দূরবর্তী। কারণ, ভৃত্যটি যদি এমন কোনো অপরাধ করেও থাকে, তার জন্য তো কঠিন কোনো শাস্তির ভয় পাওয়ার কথা নয়। এর শাস্তি যত বড়ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কোনো সাধারণ কিছুই হবে। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকি সম্পর্কে প্রসিদ্ধ ছিল, তিনি তার ভৃত্য ও অনুচরদের সঙ্গে সদয় ও কোমল আচরণ করতেন। পুরো জীবনে তিনি কোনো ভৃত্যকে প্রহার করেছেন বা শাস্তি দিয়েছেন, এমন কোনো বিবরণ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না। ভৃত্যটি তো জানত যে, সাধারণ শাস্তি থেকে বাঁচতে সে যে অন্যায় করতে যাচ্ছে, তার শান্তি নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। তাহলে কীভাবে সে একটি আনুমানিক শাস্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার দুঃসাহস দেখাবে?!
এসব দিক বিবেচনা করে আমরা এই সম্ভাবনাটিকে একেবারেই সুদূরপরাহত মনে করছি। অবশ্য এই মতটি বিভিন্ন গ্রন্থে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং কতিপয় প্রাচ্যবিদ ও তাদের অনুসারীরা তা বর্ণনাও করেছে। কারণ, এ বর্ণনাটিকে মেনে নিলে শেষ পর্যন্ত ইমাদুদ্দিন জিনকির চরিত্র কলুষিত হয় এবং তাকে এমন একজন দাম্ভিক, উদ্ধত ও জালিম মনিবরূপে উপস্থাপন করা যায়, যিনি তার ভৃত্যকে এত ভয়াবহ শাস্তির হুমকি দিয়েছিলেন যে, বেচারা ভৃত্য নিরুপায় হয়ে তাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে! অথচ পূর্বে আলোচিত বিবরণ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত।
আমার বিশ্বাস, এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও অনুপ্রাণিকা কিছুতেই নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের বাইরে হতে পারে না। তিনটিই ছিল বাইরের কারণ, যা উক্ত ভৃত্যকে প্রভাবিত করেছিল এবং উদ্দেশ্যসিদ্ধিতে তাকে ব্যবহার করেছিল। অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে উক্ত কারণ-তিনটির একাধিক বা সবগুলোর অস্তিত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের সম্ভাবনাও অসম্ভব নয়।
১. কতিপয় ঐতিহাসিক উক্ত ভৃত্যের ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, সে ছিল মামলুক বা ক্রীতদাস। সম্ভবত ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকির উপর্যুপরি বিজয়, বিশেষ করে তার সর্বশেষ বিজয় ও এডেসা রাজ্যের পতনের কারণে ভৃত্যটি তার প্রতি কঠিন বিদ্বেষ পোষণ করত। আর তাই সে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করে স্বজাতির পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিয়েছিল।
২. উক্ত ভৃত্য শিয়া বাতিনি মতাদর্শী ছিল। সম্প্রদায়টির হিংস্রতা ও বর্বরতার পরিধি সম্বন্ধে আমাদের জানা আছে। আমাদের আলোচ্য কালের অসংখ্য হত্যা, গুপ্তহত্যা, হত্যাপ্রচেষ্টাসহ নানাবিধ অপরাধের সঙ্গে বাতিনি গোষ্ঠীর নাম জড়িয়ে আছে। বিশেষত রাজনৈতিক গুপ্তহত্যায় তারা বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেছিল। আর ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতায় বাতিনিদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার বিষয়টি তো সর্বজ্ঞাত। কারণ, সন্দেহাতীতভাবেই এই মহান মুসলিম নেতা ছিলেন ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা দমনকারী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইকারী এবং পুরো রাজ্যে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী। এ সবকিছু ছিল দাঙ্গা-ফ্যাসাদ ও সন্ত্রাসপ্রিয় বাতিনিদের কর্মক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। অধিকন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন সুন্নি নেতা। তিনি ইসলামি শরিয়তের পাবন্দ ছিলেন। স্বভাবতই এসব দুষ্ট ইসমাইলিরা তার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। তাই তাদের পক্ষে তাকে হত্যা করা বা ঘাতককে হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করা মোটেও অসম্ভব বা সুদূরপরাহত ছিল না।
৩. তৃতীয় সম্ভাবনাটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রবল মনে হয়। আর তা হলো, উক্ত ভৃত্যের সঙ্গে অবরুদ্ধ জাবার দুর্গের প্রশাসক ইযযুদ্দিন বিন মালিক আল-উকায়লির গোপনে চুক্তি হয়েছিল। ইযযুদ্দিন অর্থসম্পদ, জায়গির, পদ-পদবি বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে তাকে প্ররোচিত করেছিল। এই সম্ভাবনার স্বপক্ষে দুটি প্রমাণ রয়েছে।
ক. ভৃত্যটি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করেই দ্রুত দুর্গের কাছে চলে গিয়ে দুর্গবাসীকে হত্যাকাণ্ডের সুসংবাদ জানিয়েছিল। এটি তার ও তাদের মধ্যকার গোপন চুক্তির ইঙ্গিত বহন করে। (৫৭৯)
খ. ঐতিহাসিক ইবনুল আদিম দুর্গ-অধিপতি ইযযুদ্দিন আলি বিন মালিক ও মানবিজের অধিপতি হাসসান আল-বালাবাক্কির মধ্যকার একটি কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। মানবিজ অধিপতি হাসসান ইযযুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কীভাবে আপনি ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন?!' তখন ইযযুদ্দিন উত্তর দিয়েছিলেন, 'মানবিজ অবরুদ্ধ হওয়ার পর যা আপনাকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল, আমাকেও ...!'(৫৮০)
মহান বীর বাল্ক বিন বাহরাম মানবিজে হাসসানকে অবরোধ করেছিলেন। তখন অজ্ঞাত আততায়ীর নিক্ষিপ্ত তিরে বাল্ক বিন বাহরাম নিহত হয়েছিলেন এবং হাসসান নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন। ইযযুদ্দিন যেন ইঙ্গিত করেছিলেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির হত্যাকাণ্ডই তাকে এই অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি দান করবে। এতে ইঙ্গিত মেলে যে, তিনি এ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
বাস্তব কারণ যাই হোক, এ জঘন্য অন্যায়ের কারণ, কার্যকারণ ও অনুপ্রাণিকার কথা বাদ দিয়ে আসল কথা হলো, এই মহান বীরযোদ্ধা বিদায় নিয়েছেন। এর মাধ্যমে কর্ম-অবদানে সমৃদ্ধ এক মহান জীবনে সমাপ্তি-পর্দা নেমে এসেছে; যে জীবন ছিল প্রতিরোধ ও সংগ্রামের চেতনায় পরিপূর্ণ। আমাদের এই মহান বীর তার জীবনের প্রতিটি ছত্রে প্রমাণ করেছেন যে, পৃথিবীতে এমন মানুষও আগমন করেন, যাদের প্রভাব কেবল একটি সমাজ বা একটি রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাদের অস্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয় পুরো মানবতা ও সমগ্র মানবজাতি।
আল্লাহ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি রহম করুন, তার সকল কর্ম-অবদান দ্বারা তার সৎকর্মের পাল্লাকে সমৃদ্ধ করুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ আমাদেরকে তার মতো আরও অনেক মহান পুরুষ দান করুন এবং যারা তার পথ অনুসরণ করবে, তাদের সকলের পদক্ষেপে বরকত দান করুন。

টিকাঃ
৫৭৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৯-৩৪০।
৫৮০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية