📄 ব্যর্থ বিদ্রোহ প্রচেষ্টা!
সবদিক বিবেচনা করে ইমাদুদ্দিন জিনকি ৫৩৯ হিজরি সনের রমজান মাসে (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) আলবেরা নগরীর চারপাশে মজবুত অবরোধ আরোপ করেন এবং বাইরে থেকে সব ধরনের রসদ বা সংবাদ প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। রসদের অভাবে একসময় নগরবাসী ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয় এবং আত্মসমর্পণের কাছাকাছি চলে যায়।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই নাজুকতর মুহূর্তে মসুল থেকে সংবাদ আসে, মসুলে ইমাদুদ্দিন জিনকির নায়েব মহান আমির নাসিরুদ্দিন জাকারকে হত্যা করা হয়েছে। প্রয়াত সেলজুক সুলতান মাহমুদের পুত্র ও বর্তমান সুলতান মাসউদের ভ্রাতুষ্পুত্র আলপ আরসালান বিন মাহমুদের এক বিদ্রোহ প্রচেষ্টায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অবশ্য এই বিদ্রোহ প্রচেষ্টা ছিল সম্পূর্ণই তার নিজস্ব পরিকল্পনা। এতে সুলতান মাসউদের কোনো ধরনের সম্পৃক্তি বা ইন্ধন ছিল না। আলপ আরসালানের সহযোগীরা তাকে বুঝিয়েছিল যে, এখন ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। যদি নাসিরুদ্দিন জাকারকে হত্যা করা যায়, তাহলে তিনি সহজেই মসুলের ক্ষমতা লাভ করতে পারবেন। (৫৭০) আর মসুল তার হাতে চলে এলে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্বাধীন পুরো অঞ্চল তার অধিকারে চলে আসবে। তখন তিনি পরিণত হবেন ইসলামি বিশ্বের সর্বোচ্চ নেতায়! তারা ধারণা করেছিল, গৌরব ও মর্যাদা একটিমাত্র পদক্ষেপেই রচনা করা যায় এবং যুগ-যুগান্তের অর্জন মাত্র একটি আঘাতে বা সাময়িক একটি অবস্থানের মাধ্যমে চুরি করা যায়!
আলপ আরসালান নাসিরুদ্দিন জাকারকে হত্যা করতে সক্ষম হন। কিন্তু জিনকি রাষ্ট্রের প্রশাসনে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তির সংখ্যা ছিল আলপ আরসালানের কল্পনার চেয়েও বেশি। তার রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ, সৈন্যসামন্ত, সাধারণ জনগণ সকলে তাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসত। ইমাদুদ্দিন জিনকি সকলের সঙ্গে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করতেন, সবার সঙ্গে প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির যেমন বলেছেন, 'ইমাদুদ্দিন জিনকির রাষ্ট্র ছিল যোগ্য-অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সৈন্যসামন্তে সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র।' তাদেরই একজন মসুলের কাজি তাজুদ্দিন ইয়াহইয়া বিন শাহরাযুরি কৌশলে আলপ আরসালান ও তার সহযোগীদের নগরীর দুর্গে বন্দি করে ফেলতে সক্ষম হন। এরপর তিনি কালবিলম্ব না করে এ সংবাদ ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে পাঠিয়ে দেন। (৫৭১)
এই দুঃখজনক সংবাদ শুনে ইমাদুদ্দিন জিনকি আলবেরা নগরীর অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন এবং রাজধানীতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পথ ধরেন। মসুলে পৌঁছেই তিনি যথোচিত পন্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি প্রয়াত সেনাপতি নাসিরুদ্দিন জাকারের স্থানে যায়নুদ্দিন আলি বিন বুকতেকিনকে মসুলের আমির নিযুক্ত করেন। মসুল পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হয়ে যায়। মাঝখান থেকে নষ্ট হয়ে যায় আলবেরা নগরীর پتن ঘটানোর সুবর্ণ সুযোগ। (৫৭২)
এদিকে আলবেরাবাসী ইমাদুদ্দিন জিনকির পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কায় নিজেদের নগরী ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতিপক্ষ হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আশা করছিল, হুসামুদ্দিন তাদের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখবেন। কারণ, তারা আশঙ্কা করছিল, অবরোধের সময় তারা যেভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রতিরোধ করেছে, তিনি হয়তো নগরীটির পতন ঘটাতে পারলে তার কঠিন প্রতিশোধ নেবেন। আলবেরাবাসীর এই সিদ্ধান্তের ফলে নগরীটি জিনকি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত না হলেও সেখানে ক্রুসেড শাসনের বিলোপ ঘটে এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। (৫৭৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন, এই মহান বিজয়ই চূড়ান্ত মনজিল নয়। পথ এখনো শেষ হয়নি। এখনো শাম ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে কয়েকটি ক্রুসেড রাজ্য রয়ে গেছে। আর তাই তিনি দ্রুত নতুন করে জিহাদি তৎপরতা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এন্টিয়ক নগরীসহ রাজ্যটির অধীনস্থ অন্যান্য অধিকৃত ইসলামি নগরী পুনরুদ্ধার করাকে পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় রাজ্যের পতন ঘটবে।
কিন্তু এ লক্ষ্যের দাবি ছিল, বিশেষ করে ফুরাতের পশ্চিম তীরসহ পুরো শাম অঞ্চলে বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে লড়াই করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষ প্রস্তুতি ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগৎজুড়ে ছিল, তা হলো দামেশক নগরীর অবস্থান।
টিকাঃ
৫৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭০।
৫৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৩, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭১ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮০-২৮১।
৫৭১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৩।
৫৭২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৩ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮১।
৫৭০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৪।
📄 মহান নেতার জীবনাবসান
ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধে দামেশক সুস্পষ্টভাবে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করেছিল। দামেশক ইমাদুদ্দিন জিনকির নিয়ন্ত্রিত বানিয়াস নগরী দখলের চেষ্টা করতে এবং নগরীটির মুসলিম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে নগরীটি ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেনি! আর তাই দামেশক জয় না করে ক্রুসেডারদের সঙ্গে লড়াইয়ে উপনীত হলে বিরাট ঝুঁকির আশঙ্কা ছিল। তা ছাড়া পশ্চিমে এতটা গভীরে পৌঁছে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এমন কোনো নিকটবর্তী সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজন ছিল, যেখান থেকে জিনকি বাহিনী বের হয়ে অভিযানে যেতে পারবে এবং প্রয়োজনে ফিরে এসে আশ্রয় নিতে পারবে। শাম অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এবং ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে দামেশক নগরী এই প্রয়োজন পূরণের একটি আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
আর তাই ৫৪০ হিজরি সনের শাবান মাসে (১১৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) ইমাদুদ্দিন জিনকি তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অবরোধের লক্ষ্যে রওনা হন। (৫৭৪)
কিন্তু দামেশকের পথে থাকা অবস্থায়ই তার কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, এডেসা রাজ্যে একটি গোপন ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেখানকার কিছু আর্মেনীয় নেতা ২য় জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে পরামর্শ করেছে যে, এডেসায় অবস্থানকারী মুসলিম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধ্বংস করে সেখানে পুনরায় ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হবে!
সংবাদ পাওয়ামাত্র ইমাদুদ্দিন জিনকি তার গতিপথ পরিবর্তন করে এডেসা অভিমুখে অগ্রসর হন। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তিনি ফিতনা দমন করতে সক্ষম হন। ষড়যন্ত্রকারীদের কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, বাকিদের এডেসা থেকে বিতাড়িত করা হয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের পরিবর্তে তিনশ ইহুদি পরিবারকে নিয়ে এসে এডেসায় বসবাস করতে দেন। (৫৭৫) তিনি জানতেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে পরস্পর প্রচণ্ড ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা কাজ করে। আর তাই তার বিরুদ্ধে উভয় দলের সম্মিলিত যোগসাজশ ও আঁতাঁতের আশঙ্কা ছিল না। বরং আশা করা যায়, উভয় দল একে অপরের বিরুদ্ধে গুপ্তচরের কাজ করবে। ফলে পরিস্থিতি কখনোই গুরুতর আকার ধারণ করবে না এবং এমন পর্যায়ে উপনীত হবে না, যা ঘটনাপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
এডেসার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর ইমাদুদ্দিন জিনকি পুনরায় দামেশক অভিমুখে রওনা হওয়ার মনস্থ করেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি দেখতে পান, দামেশক গমনের পথে জাবার নামক একটি সামরিক দুর্গ বনু উকায়লের নিয়ন্ত্রণে আছে। দুর্গটি ফুরাত নদীর তীরে বালিস ও রাক্কার মাঝে সিফফিনের কাছে অবস্থিত। জাবার দুর্গের প্রশাসক ইযযুদ্দিন আলি বিন মালিক আল-উকায়লি ইমাদুদ্দিন জিনকির আনুগত্য স্বীকারে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ফলে জিনকি রাষ্ট্রের মধ্যখানে এই দুর্গটি অবিজিত অবস্থায় থেকে যায়। তা ছাড়া দুর্গটি জয় না করে সামনে অগ্রসর হলে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি অবরোধ করে দুর্গটির পতন ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৫৪০ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে) দুর্গটি অবরোধ করা হয়। (৫৭৬)
যেহেতু দুর্গটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট মজবুত, তাই অবরোধ কয়েক মাস স্থায়ী হয়। তা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকি তার পুরো বাহিনী নিয়ে দুর্গটি অবরোধ করেননি। তার বাহিনীর বিভিন্ন অংশ তার সুবিস্তৃত রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছিল। বিশেষত মসুলের উত্তরে তখন কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বাশনাবিয়া শাখাগোত্রের কুর্দিরা সেখানে হুসামুদ্দিন তামারতাশের নেতৃত্বে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছিল। তাদের কর্তৃত্বাধীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ছিল দজলার তীরে অবস্থিত কানাক দুর্গ। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদেরকে বশীভূত করার লক্ষ্যে কানাক দুর্গ অবরোধ করার জন্য তার বাহিনীর একটি অংশকে প্রেরণ করেছিলেন। (৫৭৭)
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অতিবাহিত হতে থাকে। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. ধৈর্য ও অটলতার সঙ্গে অবরোধ অব্যাহত রাখেন। তিনি না বিরক্ত হচ্ছেন, না ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তিনি তো কখনো বিশ্রাম তালাশ করেননি, আরাম খুঁজে ফিরেননি। অবরোধ চলাকালে এক রাতে, নির্দিষ্ট করে বললে ৫৪১ হিজরি সনের ৬ রবিউস সানি (১১৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর) রাতে আল্লাহ পাক তার ক্লান্ত দেহকে বিশ্রাম গ্রহণের এবং চিরব্যস্ত আত্মাকে আপন প্রভুপানে পরিভ্রমণের অনুমতি দান করেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি সেদিন রাতে তাঁবুতে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় ইয়ারনাকুশ নামক তার জনৈক ভৃত্য তাঁবুতে ঢুকে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে! সমাপ্ত হয় সেই মহান বীরের জীবনসফর, যিনি ক্রুসেডারদের বশীভূত করেছিলেন এবং দীর্ঘ অনেক বছরের লাঞ্ছনা ও অবসন্নতার পর মুসলমানদের শির সমুন্নত করেছিলেন।
ভৃত্যটি নিজ সর্দার ও মুসলমানদের সর্দারকে হত্যা করার পর দ্রুত বাইরে এসে দুর্গবাসীকে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করে বলতে থাকে, 'সুসংবাদ গ্রহণ করো! আমি তো ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি।' কিন্তু অবরুদ্ধ দুর্গবাসীর প্রতিক্রিয়া ছিল বড় বিস্ময়কর! তারা একযোগে বলে ওঠে, 'তাকে হত্যা করে তো তুমি সকল মুসলমানকেই হত্যা করেছ!' (৫৭৮)
অথচ এই ইমাদুদ্দিন জিনকি বিগত কয়েক মাস ধরে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন!
বাস্তবেই ইমাদুদ্দিন জিনকির হত্যাকাণ্ড ছিল উম্মাহর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। মুসলিম উম্মাহ হারিয়েছিল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ-এর এক অনন্যসাধারণ সেনাপতিকে, রাজনীতি ও নেতৃত্বজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে, ইসলামের এক প্রকৃত সংস্কারককে এবং ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিকে। তিনি এমন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন যোগ্য ব্যক্তির বড় অভাব ছিল।
টিকাঃ
৫৭৪, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৮২।
৫৭৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮১ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৮২ ও Setton: op. cit. 1, pp. 462.
৫৭৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮১।
৫৭৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৯ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরুব, ১/৯৮-৯৯।
৫৭৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৯, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮১-২৮২ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৯৯।
📄 অমার্জনীয় এই অপরাধের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণ
নিঃসন্দেহে সকলের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই কাপুরুষ ভৃত্যটি কেন জাতি-জীবনের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুসলমানদের মহান নেতা ও সুমহান সেনাপতিকে হত্যা করল?!
বাস্তবতা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ইসলামি ইতিহাসের এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ও অমীমাংসিত রহস্য। প্রাচীন ও আধুনিক ঐতিহাসিকগণ এর কারণ নির্ণয়ে বিভিন্ন মত পেশ করেছেন। কোনো কোনো গ্রন্থে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. যখন ঘুমাতে গিয়েছিলেন, তখন উক্ত ভৃত্য প্রয়োজনের চেয়ে অধিক উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিল। এতে তার ঘুমে সমস্যা হচ্ছিল বিধায় তিনি ভৃত্যটিকে কঠিন ভাষায় তিরস্কার করেন। এতে ভয় পেয়ে ভৃত্যটি কিছুক্ষণ পর নিদ্রায় নিমগ্ন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করে!
আমার দৃষ্টিতে এ সম্ভাবনাটি একেবারেই দূরবর্তী। কারণ, ভৃত্যটি যদি এমন কোনো অপরাধ করেও থাকে, তার জন্য তো কঠিন কোনো শাস্তির ভয় পাওয়ার কথা নয়। এর শাস্তি যত বড়ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কোনো সাধারণ কিছুই হবে। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকি সম্পর্কে প্রসিদ্ধ ছিল, তিনি তার ভৃত্য ও অনুচরদের সঙ্গে সদয় ও কোমল আচরণ করতেন। পুরো জীবনে তিনি কোনো ভৃত্যকে প্রহার করেছেন বা শাস্তি দিয়েছেন, এমন কোনো বিবরণ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না। ভৃত্যটি তো জানত যে, সাধারণ শাস্তি থেকে বাঁচতে সে যে অন্যায় করতে যাচ্ছে, তার শান্তি নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। তাহলে কীভাবে সে একটি আনুমানিক শাস্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার দুঃসাহস দেখাবে?!
এসব দিক বিবেচনা করে আমরা এই সম্ভাবনাটিকে একেবারেই সুদূরপরাহত মনে করছি। অবশ্য এই মতটি বিভিন্ন গ্রন্থে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং কতিপয় প্রাচ্যবিদ ও তাদের অনুসারীরা তা বর্ণনাও করেছে। কারণ, এ বর্ণনাটিকে মেনে নিলে শেষ পর্যন্ত ইমাদুদ্দিন জিনকির চরিত্র কলুষিত হয় এবং তাকে এমন একজন দাম্ভিক, উদ্ধত ও জালিম মনিবরূপে উপস্থাপন করা যায়, যিনি তার ভৃত্যকে এত ভয়াবহ শাস্তির হুমকি দিয়েছিলেন যে, বেচারা ভৃত্য নিরুপায় হয়ে তাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে! অথচ পূর্বে আলোচিত বিবরণ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত।
আমার বিশ্বাস, এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও অনুপ্রাণিকা কিছুতেই নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের বাইরে হতে পারে না। তিনটিই ছিল বাইরের কারণ, যা উক্ত ভৃত্যকে প্রভাবিত করেছিল এবং উদ্দেশ্যসিদ্ধিতে তাকে ব্যবহার করেছিল। অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে উক্ত কারণ-তিনটির একাধিক বা সবগুলোর অস্তিত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের সম্ভাবনাও অসম্ভব নয়।
১. কতিপয় ঐতিহাসিক উক্ত ভৃত্যের ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, সে ছিল মামলুক বা ক্রীতদাস। সম্ভবত ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকির উপর্যুপরি বিজয়, বিশেষ করে তার সর্বশেষ বিজয় ও এডেসা রাজ্যের পতনের কারণে ভৃত্যটি তার প্রতি কঠিন বিদ্বেষ পোষণ করত। আর তাই সে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করে স্বজাতির পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিয়েছিল।
২. উক্ত ভৃত্য শিয়া বাতিনি মতাদর্শী ছিল। সম্প্রদায়টির হিংস্রতা ও বর্বরতার পরিধি সম্বন্ধে আমাদের জানা আছে। আমাদের আলোচ্য কালের অসংখ্য হত্যা, গুপ্তহত্যা, হত্যাপ্রচেষ্টাসহ নানাবিধ অপরাধের সঙ্গে বাতিনি গোষ্ঠীর নাম জড়িয়ে আছে। বিশেষত রাজনৈতিক গুপ্তহত্যায় তারা বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেছিল। আর ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতায় বাতিনিদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার বিষয়টি তো সর্বজ্ঞাত। কারণ, সন্দেহাতীতভাবেই এই মহান মুসলিম নেতা ছিলেন ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা দমনকারী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইকারী এবং পুরো রাজ্যে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী। এ সবকিছু ছিল দাঙ্গা-ফ্যাসাদ ও সন্ত্রাসপ্রিয় বাতিনিদের কর্মক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। অধিকন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন সুন্নি নেতা। তিনি ইসলামি শরিয়তের পাবন্দ ছিলেন। স্বভাবতই এসব দুষ্ট ইসমাইলিরা তার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। তাই তাদের পক্ষে তাকে হত্যা করা বা ঘাতককে হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করা মোটেও অসম্ভব বা সুদূরপরাহত ছিল না।
৩. তৃতীয় সম্ভাবনাটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রবল মনে হয়। আর তা হলো, উক্ত ভৃত্যের সঙ্গে অবরুদ্ধ জাবার দুর্গের প্রশাসক ইযযুদ্দিন বিন মালিক আল-উকায়লির গোপনে চুক্তি হয়েছিল। ইযযুদ্দিন অর্থসম্পদ, জায়গির, পদ-পদবি বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে তাকে প্ররোচিত করেছিল। এই সম্ভাবনার স্বপক্ষে দুটি প্রমাণ রয়েছে।
ক. ভৃত্যটি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করেই দ্রুত দুর্গের কাছে চলে গিয়ে দুর্গবাসীকে হত্যাকাণ্ডের সুসংবাদ জানিয়েছিল। এটি তার ও তাদের মধ্যকার গোপন চুক্তির ইঙ্গিত বহন করে। (৫৭৯)
খ. ঐতিহাসিক ইবনুল আদিম দুর্গ-অধিপতি ইযযুদ্দিন আলি বিন মালিক ও মানবিজের অধিপতি হাসসান আল-বালাবাক্কির মধ্যকার একটি কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। মানবিজ অধিপতি হাসসান ইযযুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'কীভাবে আপনি ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন?!' তখন ইযযুদ্দিন উত্তর দিয়েছিলেন, 'মানবিজ অবরুদ্ধ হওয়ার পর যা আপনাকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল, আমাকেও ...!'(৫৮০)
মহান বীর বাল্ক বিন বাহরাম মানবিজে হাসসানকে অবরোধ করেছিলেন। তখন অজ্ঞাত আততায়ীর নিক্ষিপ্ত তিরে বাল্ক বিন বাহরাম নিহত হয়েছিলেন এবং হাসসান নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন। ইযযুদ্দিন যেন ইঙ্গিত করেছিলেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির হত্যাকাণ্ডই তাকে এই অবরোধ থেকে নিষ্কৃতি দান করবে। এতে ইঙ্গিত মেলে যে, তিনি এ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
বাস্তব কারণ যাই হোক, এ জঘন্য অন্যায়ের কারণ, কার্যকারণ ও অনুপ্রাণিকার কথা বাদ দিয়ে আসল কথা হলো, এই মহান বীরযোদ্ধা বিদায় নিয়েছেন। এর মাধ্যমে কর্ম-অবদানে সমৃদ্ধ এক মহান জীবনে সমাপ্তি-পর্দা নেমে এসেছে; যে জীবন ছিল প্রতিরোধ ও সংগ্রামের চেতনায় পরিপূর্ণ। আমাদের এই মহান বীর তার জীবনের প্রতিটি ছত্রে প্রমাণ করেছেন যে, পৃথিবীতে এমন মানুষও আগমন করেন, যাদের প্রভাব কেবল একটি সমাজ বা একটি রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাদের অস্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয় পুরো মানবতা ও সমগ্র মানবজাতি।
আল্লাহ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি রহম করুন, তার সকল কর্ম-অবদান দ্বারা তার সৎকর্মের পাল্লাকে সমৃদ্ধ করুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ আমাদেরকে তার মতো আরও অনেক মহান পুরুষ দান করুন এবং যারা তার পথ অনুসরণ করবে, তাদের সকলের পদক্ষেপে বরকত দান করুন。
টিকাঃ
৫৭৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩৯-৩৪০।
৫৮০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৩।