📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এডেসা পতনের প্রভাব ও ফলাফল

📄 এডেসা পতনের প্রভাব ও ফলাফল


নিঃসন্দেহে এ জাতীয় একটি মহান বিজয়ের অসংখ্য প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল থাকে। এডেসা বিজয়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। আমরা নির্দিষ্ট করে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রভাবের কথা উল্লেখ করতে পারি।
১. মুসলমানদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণে সমুন্নত হয়। কেবল ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজত্বের মুসলমানগণ নয়; বরং পুরো বিশ্বের মুসলমানদের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। বিভিন্ন স্থানে বিজয় উদ্যাপন করা হয়, প্রশস্তিমূলক কবিতা রচিত হয়, বক্তা ও খতিবদের আলোচনাজুড়ে থাকে এই বিজয়গাথা। এটি তো বিজয়ের আশা ও স্বপ্ন ছিল না, ছিল না সাফল্যের প্রতিশ্রুতি; এ তো প্রকৃত ফলাফল, অনুভবযোগ্য প্রভাব।
২. বিপরীত দিকে ক্রুসেডারদের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। ২য় জোসেলিন কল্পনাও করেননি যে, সুরক্ষিত এডেসা রাজ্যের দুর্গগুলোর পতন ঘটতে পারে। তিনি মনে করেছিলেন, ইমাদুদ্দিন জিনকির এ অভিযান বিগত বছরগুলোর আর দশটা অভিযানের মতোই সাধারণ কোনো অভিযান। এই অবিশ্বাস্য অভিযান তাকে বলতে গেলে নিশ্চল করে দেয়। আর তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে নগরীর প্রতিরক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহসই করেননি। নিঃসন্দেহে এটি তার, তার সঙ্গী ও সেনাপতিদের মনোজগতে গভীর ব্যর্থতার ক্ষত সৃষ্টি করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তদ্রূপ আমরা এই ঐতিহ্যবাহী রাজ্যটিকে উদ্ধার করার জন্য অন্যান্য ক্রুসেড রাজ্যের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের প্রচেষ্টা লক্ষ করিনি। এতে প্রমাণিত হয় যে, তারা বিজয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে পুরোপুরি নিরাশ হয়ে গিয়েছিল।
৩. এই সুস্পষ্ট বিজয়ের পর এ অঞ্চলের মুসলমানরা ক্রুসেডারদের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হয়। পূর্বের পঞ্চাশ বছর সব সময়ই ক্রুসেডারদের শক্তির পাল্লা ভারী ছিল। এমনকি এ সময় মুসলমানরা বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ করলেও সেসব যুদ্ধ হয়েছিল কোনো বাহিনী বা সীমিত জনশক্তির সঙ্গে। যুদ্ধ শেষে দু-পক্ষ আপন আপন নগরীতে ফিরে যেত, কাউকে কিছু হারাতে হতো না। মুসলমানরা কোনো নগরী বা দুর্গ পুনরুদ্ধার করলেও ক্রুসেডাররা দ্রুতই তা পুনর্দখল করে ফেলত। কিন্তু এখন শক্তিতে ভারসাম্য এসেছে। মুসলমানদের এখন ক্রুসেডারদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জিত হয়েছে। মুসলমানদের কৌশলও এখন বদলে গেছে। এতদিন কৌশল ছিল-'প্রতিপক্ষ আক্রমণ করলে প্রতিরোধ প্রচেষ্টা'। আর এখন কৌশল হলো- 'আক্রমণই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা'!
৪. ক্রুসেডারদের এই ভীতিপ্রদ পরাজয় পশ্চিম ইউরোপকে জাগিয়ে তোলে। এতদিন তারা প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। এবার ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে বসবাসকারী ক্রুসেডারদের উদ্ধারের লক্ষ্যে পশ্চিম ইউরোপে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের রানী মেলিসেন্ড রোমে পোপের কাছে একটি সাহায্যবার্তা প্রেরণ করে ক্রুসেডারদের সহায়তায় বড় ধরনের সৈন্যসমাবেশের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। ইউরোপীয় এই জাগরণই ছিল অল্প কয়েক বছর পর সংঘটিত হওয়া দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের বীজ। (৫৬৫)
৫. এই বিজয়ের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে এন্টিয়ক রাজ্যের নীতিও বদলে যায়। যে রেমন্ড কিছুদিন পূর্বেও বাইজান্টাইনদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কিলিকিয়া অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন, তিনি হঠাৎ করেই অনুভব করেন যে, এ অঞ্চলে নতুন করে জেগে ওঠা ইসলামি শক্তির সামনে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। এই অনুভূতি থেকেই তিনি বাইজান্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল কমনিনোসের সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা শুরু করেন এবং মুসলমানদের মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। তার এ প্রস্তাবই পরবর্তী সময়ে আরও একবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে হিলাল-ছালিব চলমান সংঘাত-ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করে। (৫৬৬)
৬. এই মহান বিজয়ের পর সুলতান মাসউদের পক্ষ থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ক্ষমতা ও রাজত্ব হতে অপসারণ করার প্রচেষ্টা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই মহান বীরের তুলনায় নিজের আয়তন কতটা ক্ষুদ্র, তিনি তা অনুমান করতে সক্ষম হন। তিনি বুঝতে পারেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অপসারণের কোনো চেষ্টা মুসলিম জনসাধারণ কিছুতেই বরদাশত করবে না। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনামলের শেষ সময় পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক বিরাজমান ছিল।
৭. এ মহান বিজয় আব্বাসি খলিফা মুকতাফি লি-আমরিল্লাহর চেতনা ও অনুভূতিতেও নাড়া দিতে সক্ষম হয়। মুকতাফি লি-আমরিল্লাহ ছিলেন খোদাভীরু ও সচ্চরিত্রবান একজন খলিফা। বিজয়ের সংবাদ পেয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য সম্মানসূচক বিভিন্ন উপহার প্রেরণ করেন এবং এতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তাকে এমন সব উপাধি প্রদান করেন, যা সাধারণত কোনো প্রশাসক বা সেনাপতিকে প্রদান করা হতো না। ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকি নতুন রূপে পরিচিত হতে থাকেন। এসব উপাধির মধ্যে ছিল—আল-মালিকুল আদিল (ন্যায়পরায়ণ শাসক), রুকনুল ইসলাম (ইসলামের স্তম্ভ), আল- আমিরুল মুযাফফার (বিজয়ী শাসক), উমদাতুস সালাতিন (শ্রেষ্ঠতম সুলতান), মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক, মালিকুল উমারা (শাসক-প্রধান) ইত্যাদি। (৫৬৭) খলিফাপ্রদত্ত এসব উপাধির মাধ্যমে মূলত ইমাদুদ্দিন জিনকির স্বাধিকার, স্বাধীন রাজত্ব, একক নেতৃত্ব ও কারও অধীনস্থ না হওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকির কাঁধে আগের দায়িত্বসমূহের পাশাপাশি আরও অনেক বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়।
৮. এসব মহিমান্বিত বিজয় এবং সুলতান মাসউদ ও খলিফা মুকতাফি লি-আমিরিল্লাহর এই পরিবর্তিত অবস্থান মূলত স্বাধীন জিনকি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘোষণা করছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকিই হলেন এই সুমহান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। তার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিগণ এ রাষ্ট্র শাসন করে। বহু শাসকপরিবার জিনকি রাজপরিবারের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীকালে এই জিনকি পরিবারই ইসলামি বিশ্বের পথিকৃৎ ও নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করে। মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্বের পতাকা সেলজুক রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্থানান্তরিত হয় জিনকি রাষ্ট্রের কাছে। আবারও বাস্তবায়িত হয় যুগে যুগে হাজার বার বাস্তবায়িত হওয়া সেই অমোঘ বিধান-
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে-ইমরান: ১৪০]
৯. এই বিজয়ের পর জাযিরা অঞ্চলে উরতুক পরিবারের কর্মতৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়। যদিও কারা আরসালান বিন দাউদ ও হুসামুদ্দিন তামারতাশ প্রকাশ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকির পতাকাতলে শামিল হওয়ার কথা ঘোষণা করেননি; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি বা বিদ্রোহের কথাও শুনিনি। এই মহান ও প্রভাবক বিজয়ের কারণে তারা উভয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তির পরিধি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আর তাই তারা আপন আপন শাসনাধীন ভূখণ্ড নিয়ে তুষ্ট থাকেন আর অপেক্ষা করতে থাকেন আগামী দিন কী বার্তা নিয়ে আসে, তা জানার জন্য!
১০. সামরিক দিক থেকে বিবেচনা করলে এই বিজয়ের ফলে মসুল ও শাম অঞ্চলের মধ্যবর্তী সকল পথ ক্রুসেডার-মুক্ত হয়ে যায়। ইরাক এবার তার পুরো সামর্থ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে মুসলিম-ক্রুসেডার সংঘাতের অঙ্গনে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। ইরাক ও পারস্য থেকে নিরাপদে সৈন্যরা শাম অঞ্চলে আসতে থাকে। তা ছাড়া সমৃদ্ধ এডেসা নগরী মুসলমানদের শাসনাধীনে চলে আসায় ইসলামি রাষ্ট্র লাভ করে বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ। পুরো ফুরাত উপত্যকা ইসলামি উপত্যকায় পরিণত হওয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশও বহুগুণ সমৃদ্ধ হয়।

টিকাঃ
৫৬০. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৯৭।
৫৬৬. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-জিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১৫৫।
৫৬৭. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00