📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আল্লাহপ্রদত্ত মহান বিজয়

📄 আল্লাহপ্রদত্ত মহান বিজয়


ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি জানতেন, এডেসার দুর্গগুলো অত্যন্ত দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত। তিনি এও জানতেন যে, ২য় জোসেলিন ও তারা সৈন্যরা চাইলেই এসব মজবুত দুর্গে অবস্থান গ্রহণ করে তার আক্রমণ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে। বিগত পঞ্চাশ বছরের মুসলিম নেতৃবৃন্দের পূর্ব অভিজ্ঞতাও একে সমর্থন করছিল। আর তাই মৌলিকভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল এমন আকস্মিক সময়ে এডেসায় হামলা চালানো, যখন নগরীটি শাসক ও সৈন্যবাহিনীশূন্য থাকবে। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি কি এমন সুযোগ আসার প্রতীক্ষায় বসে থাকবেন? এর জন্য তো দীর্ঘ দিনও দেরি করতে হতে পারে। তিনি তো জানেন না, আগামী দিনগুলো তার জন্য কী বার্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে! ইমাদুদ্দিন জিনকির এমন কিছু করতে হবে, যাতে ২য় জোসেলিন দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত হন। কিন্তু তাকে মোটেও ঘাবড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, ২য় জোসেলিন যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রতি মোটেও আগ্রহী নন; তিনি পছন্দ করেন আরাম ও বিলাসিতা।
কী করা যায় তাহলে?! ইমাদুদ্দিন জিনকি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি প্রথমে ২য় জোসেলিনের তৎকালীন মিত্র কারা আরসালানের শাসনাধীন কোনো দুর্গে আক্রমণ করতে যাওয়ার ভান করবেন। বাস্তবেও তিনি এডেসার নিকটবর্তী সে অঞ্চলে বাহিনী নিয়ে রওনা হবেন। এর পাশাপাশি তিনি বাতাসে খবর ছড়িয়ে দেবেন যে, তার সহায়তায় শীঘ্রই আলেপ্পো থেকে একটি বাহিনী রওনা হবে। তিনি আশা করছিলেন, এ সংবাদ পেয়ে ২য় জোসেলিন আলেপ্পো থেকে আগত সামরিক সহায়তার পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নিজ দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত হবেন। ২য় জোসেলিন যখন এডেসা থেকে বের হয়ে দূরে চলে আসবেন, তখন হঠাৎ করেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার গতিপথ পরিবর্তন করবেন এবং উরতুকিদের অঞ্চল রেখে সরাসরি এডেসায় পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করবেন। আর এভাবে হয়তো এডেসা নগরীর পতন ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে! (৫৪১)
এটি ছিল একটি মানবিক পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা। ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে এতটুকুই করার ছিল। দার্শনিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলে এক্ষেত্রে এমন হাজারো প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা তার পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং সফলতার পথ বন্ধ করে দিতে পারে। হতে পারে ২য় জোসেলিন দ্বিধান্বিত হয়ে আর বের হবেন না। হতে পারে তিনি ইচ্ছা করেই তার মিত্রকে সাহায্য করার বিষয়টি মনে না থাকার ভান করবেন। হতে পারে কারা আরসালান ইমাদুদ্দিন জিনকির পথ রুখে দাঁড়াবেন; ফলে তিনি উপযুক্ত সময়ে এডেসায় পৌঁছতে ব্যর্থ হবেন। এমন আরও অনেক কিছুই হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই আল্লাহ তাআলা চাননি। আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, তার মুমিন বান্দাদের ওপর নুসরত ও সহায়তা অবতীর্ণ করবেন। তাই তিনি যাবতীয় অবস্থান ও পরিস্থিতিকে মুসলমানদের কল্যাণের দিকেই পরিচালিত করেন এবং পথের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেন। ফলে সবকিছুই পরিচালিত হয় ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনামতো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। এ তো জগৎ-সংসারের প্রতিপালকের সিদ্ধান্ত! পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
إِنَّمَا أَمْرَةً إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
তার ব্যাপার তো এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন কেবল বলেন, 'হয়ে যাও'। অমনি তা হয়ে যায়। [সুরা ইয়াসিন: ৮২]
৫৩৯ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসের শেষ দিকে (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) ইমাদুদ্দিন জিনকি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মসুল থেকে এডেসা রাজ্য অভিমুখে রওনা হন। তিনি তার সকল সেনাপতি ও সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ যেন এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে যোগদানে বিরত না থাকে। আর তাই সকলে তার সঙ্গে এ অভিযানে বের হয়। তিনি তার সেই বাহিনী নিয়ে রওনা হন, যা প্রস্তুত করার জন্য তার পুরো জীবন ব্যয় করেছেন।
২য় জোসেলিন ও তার গুপ্তচররা যেন মনে করে যে, তিনি এডেসার উদ্দেশে বের হননি এবং এডেসায় অভিযান পরিচালনার চিন্তাও করছেন না, এজন্য তিনি তার বাহিনী নিয়ে উরতুকিদের শাসনাধীন আমিদ নগরী অভিমুখে অগ্রসর হন। ২য় জোসেলিন পুরোপুরি প্রতারিত হন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তো বিগত ছয় বছর করে জাযিরা অঞ্চলে উরতুকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই পুরোপুরি ব্যস্ত ছিলেন। আর তাই এ অভিযান নতুন কিছু নয়; আরেকটি উরতুকি দমন অভিযান! ইমাদুদ্দিন জিনকি যেভাবে পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই ২য় জোসেলিন তার বাহিনী নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং আলেপ্পো থেকে আগত সামরিক সহায়তার পথ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে দক্ষিণে অগ্রসর হন। ইমাদুদ্দিন জিনকির গোয়েন্দারা দ্রুত এ সংবাদ তার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি তৎক্ষণাৎ গতিপথ বদলে ফেলেন এবং এডেসা অভিমুখে অগ্রসর হন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজে এক পথে রওনা হন আর তার হাজিব সালাহুদ্দিন ইয়াগিসিয়ানিকে অন্য পথে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, পথে যদি ক্রুসেডার গুপ্তচররা ওত পেতে থাকে, তবে তাদেরকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করে ফেলা। মুসলিম বাহিনী অধিকাংশ সময় রাতের অন্ধকারে পথ চলে।
যে রাতে মুসলিম বাহিনী এডেসার কাছাকাছি পৌঁছায়, সে রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। শীতও ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি; বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্রুসেডার গুপ্তচরদের নজরদারির ক্ষেত্রে।
একসময় রাতের ঘন অন্ধকার দূরীভূত হয়; ভোরের উষায় উদ্ভাসিত হয় দিদিগন্ত।
৫৩৯ হিজরি সনের ২৮ রবিউস সানি।
১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ নভেম্বর। (৫৪২)
ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হতেই এডেসা নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থানরত ক্রুসেডার সৈন্যরা আবিষ্কার করে, মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে এডেসা ঘিরে ফেলেছে! (৫৪৩)
এই ভীতিকর সংবাদ এডেসার শাসক ২য় জোসেলিনের কাছেও পৌঁছে যায়। তবে বড় দেরি করে! তিনি এডেসায় ফিরে সুবিশাল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভীত হয়ে পড়েন। এর পরিবর্তে তিনি এডেসা রাজ্যভুক্ত তিল-বাশির নগরীতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এডেসা নগরী ও তিল-বাশির নগরীর মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল ফুরাত নদী। ২য় জোসেলিন চাচ্ছিলেন ঘটনাপ্রবাহের যথাসম্ভব নিকটে অবস্থান করে শুরু থেকে প্রতিটি পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত অবগত হতে এবং সুযোগমতো উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। অধিকন্তু ফুরাত নদীর প্রতিবন্ধকতার কারণে তিল-বাশির অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। পরিস্থিতির দাবি মেনে তাকে যদি পালাতেও হয়, ফুরাত তাকে পালানোর যথেষ্ট সময়ের ব্যবস্থা করে দেবে! (৫৪৪)
২য় জোসেলিন এর পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যদিও এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল; কিন্তু তিনি তার কাছে দ্রুত সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। ওদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অবস্থান যদিও এডেসা থেকে অনেক দূরে, অধিকন্তু রাজ্যটি তখন ছায়াশাসক মেলিসেন্ডের দুর্বল শাসনে পরিচালিত হচ্ছিল, তথাপি তিনি মেলিসেন্ডের কাছেও একটি সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৫৪৫)
এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স অবশ্য কিলিকিয়া অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ২য় জোসেলিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। (৫৪৬) আর বাইতুল মুকাদ্দাস প্রশাসনের হর্তাকর্তা মেলিসেন্ড তার অধীনস্থ নাবলুস অঞ্চলের প্রশাসক ফিলিপ ও জালিল অঞ্চলের প্রশাসক অ্যালিন্যান্ড (Elinand)-এর নেতৃত্বে দ্রুত একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বের কারণে তারা যতক্ষণে এ অঞ্চলে পৌঁছায়, ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে! (৫৪৭)
ইমাদুদ্দিন জিনকির জিহাদি অভিযান সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপকভাবে জিহাদি চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। আর তাই ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী মুজাহিদ মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ফলে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা গণনাতীত পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
নগরীর অভ্যন্তরে যেন কোনো ধরনের সাহায্য-সহায়তা পৌঁছতে না পারে, এ উদ্দেশ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসায় পৌঁছার সকল পথ বন্ধ করে দেন। এই মহান দুঃসাহসী বীর নগরপ্রাচীরের পাশে ভারী ভারী অবরোধসামগ্রী স্থাপন করেন, যার মধ্যে ছিল গোটা দশেক মিনজানিক। এরপর তার নির্দেশে নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে একটানা গোলাবর্ষণ শুরু হয়। অবরোধের দিনগুলোতে এক মুহূর্তের জন্যও গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়নি। (৫৪৮)
নগরপ্রাচীরের ভেতরে অবস্থানরত এডেসাবাসী প্রমাদ গুনতে থাকে। তারা অনুভব করে, চতুর্দিক থেকে তারা কঠিন বিপদে আটকে গেছে। অধিকাংশ যোগ্য সেনাপতিই শাসক জোসেলিনের সঙ্গে নগরের বাইরে রয়ে গেছে। নগরের অভ্যন্তরে এমন কোনো সামরিক যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি নেই, যে এই কঠিন মুহূর্তে সকলকে নেতৃত্ব দিতে পারে। অবশেষে খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাই প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিতে অগ্রসর হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাথলিক বিশপ ২য় হিউ। তার সঙ্গে ছিলেন আর্মেনীয় বিশপ জন ও ইয়াকুব গোষ্ঠীয় বিশপ বাসিল। সম্ভবত মুসলিম সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা নগরীর অভ্যন্তরে নিজস্ব গুপ্তচর রেখেছিলেন। তাদের মাধ্যমে এ সংবাদ অবগত হয়ে তিনি খ্রিষ্টানদের এই জোট ভেঙে ফেলার মনস্থ করেন। (৫৪৯) ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রাচ্যকেন্দ্রিক দুই বিশপ অর্থাৎ আর্মেনীয় ও ইয়াকুবি বিশপের কাছে গোপনে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে নিরাপত্তার বিনিময়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন। তারা উভয়ে প্রথমে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও শেষদিকে আত্মসমর্পণে রাজি হয়। কিন্তু ক্যাথলিক বিশপ ২য় হিউ প্রতিরোধের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং তাদের দুজনকেও সামরিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করেন। (৫৫০)
দিনে দিনে আহারসামগ্রী ও রসদসম্ভার ফুরিয়ে যেতে থাকে। এডেসা নগরী উপনীত হয় অতি কঠিন এক পর্যায়ে। অবরোধও এত দুর্ভেদ্য ছিল যে, না বাইরে থেকে শাসক ২য় জোসেলিনের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল, না ভেতরের কারও সূক্ষ্ম সামরিক প্রহরা ভেদ করে বের হওয়া সম্ভব ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীতে প্রবেশের সকল পয়েন্টে কঠিন প্রহরার ব্যবস্থা করেছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে নগরপ্রাচীর ধ্বংস করার জন্য 'খননকারী ফোর্স' নামে একটি বিশেষ বাহিনী ছিল। এবার এই বিশেষ বাহিনীটি অগ্রসর হয়ে প্রচণ্ড উদ্যমে নিজেদের কাজ শুরু করে। গোলাবর্ষণকারীরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল। সময়ের পরিক্রমায় বিজয়ের সুবাতাস বইতে শুরু করে। প্রতিপক্ষের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখেও একসময় নগরপ্রাচীরের একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহর পথের মুজাহিদরা এবার দ্বিগুণ উৎসাহে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এক মুহূর্তের জন্যও কাজ বন্ধ ছিল না। আপন আপন সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয়ে কেউ সামান্য ত্রুটি করছিল না।
অবরোধ শুরু হওয়ার আটাশ দিন পর(৫৫১) ৫৩৯ হিজরি সনের ২৬ জুমাদাল উখরা (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর) (৫৫২) আল্লাহর হুকুমে নগরপ্রাচীরের একটি অংশ ধসে পড়ে! (৫৫৩)
মুসলিম বাহিনীর উদ্দীপনা যেন নবোদ্যমে জেগে ওঠে। চতুর্দিক থেকে তাকবিরধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে। প্রাচীরের ভাঙা অংশ দিয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা স্রোতের ন্যায় সুরক্ষিত নগরীর ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ভেতর থেকে নগরদ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয়। এবার সুবিশাল মুসলিম বাহিনী বীর সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্বে ভেতরে প্রবেশ করে। মুসলিম বাহিনী নগরীর ভেতরে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনরত ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সবার আগে ক্রুসেডারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বয়ং ইমাদুদ্দিন জিনকি। (৫৫৪) অল্প সময়ের মধ্যেই নগরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ধুলোমেঘে ঢেকে যায় সবকিছু। পথে-ঘাটে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। এখানে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে লাশ পড়ে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলমানরা প্রতিটি প্রাচীর, নিরাপত্তা-চৌকি ও নগরদ্বারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। নগরীর অভ্যন্তরে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার নিহত ক্রুসেডারের মৃতদেহ বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেন।
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
(সুতরাং হে মুসলিমগণ! প্রকৃতপক্ষে) তোমরা তাদেরকে (অর্থাৎ কাফিরদেরকে) হত্যা করোনি; বরং আল্লাহ-ই তাদেরকে হত্যা করেছিলেন। এবং (হে নবী!) আপনি যখন তাদের ওপর মাটি নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন তা আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহ-ই নিক্ষেপ করেছিলেন। [সুরা আনফাল: ১৭]
বিশপ ২য় হিউ নিহত হয়ে সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট হতে থাকেন। তার পতনের ফলে ক্রুসেডারদের মনোবল পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তারা পালিয়ে নগরের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলিম সৈন্যরা নগরীর প্রতিটি স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। তারা প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও বন্দি লাভ করে। মুসলিম বাহিনীর একটি শক্তিশালী রেজিমেন্ট দুর্গ অবরোধ করার জন্য অগ্রসর হয়। দুদিন না যেতেই দুর্গটিরও পতন ঘটে। ইমাদুদ্দিন জিনকি দুর্গে অবস্থানকারী ক্রুসেডারদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। অপরদিকে আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। (৫৫৫)
নিঃসন্দেহে দিনটি ছিল মহান আল্লাহর অনুগ্রহ-দানে সিক্ত একটি দিন। ইসলামি ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন!
যখন নগরজুড়ে মুসলমানদের সুস্পষ্ট প্রাধান্য প্রতিভাত হয় এবং পুরো নগরীতে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দমন অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং সামরিক ক্রুসেডারদের ব্যতীত সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। যোদ্ধা ক্রুসেডারদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাদের নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়।
আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের ক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অথচ তারাও ক্রুসেডারদের সঙ্গে নগরীর প্রতিরক্ষায় শরিক ছিল। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের অবস্থান বিবেচনা করে উপলব্ধি করেন যে, তারা বাধ্য হয়ে এতে শরিক ছিল। এ কারণেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের প্রতি মার্জনার আচরণ করেন। (৫৫৬)

টিকাঃ
৫৪১. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরী, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/১৪৩।
৫৪২. অগ্রগণ্য মতানুসারে এডেসা অবরোধ শুরু হয় ১ জুমাদাল উখরা (২৮ নভেম্বর)। [সম্পাদক]
৫৪৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩১ ও Eliasseff: op. cit. 11, pp. 379-380.
৫৪৪. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৭-৭৩৮।
৫৪৫. Stevenson: op. cit., p. 149.
৫৪৬. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৮০।
৫৪৭. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৯।
৫৪৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩১-৩৩২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৯।
৫৪৯. Nerses, Shnorhail: Sur la Prised Edesse Doc. Arm Vol. 1, pp. 247-255.
৫৫০. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৮-৭৩৯।
৫৫১, মূলত ছাব্বিশ দিন পর। [সম্পাদক]
৫৫২, আরেক মতানুসারে এডেসার পতন ঘটে ৬ জুমাদাল উখরা (৩ ডিসেম্বর)। [সম্পাদক]
৫৫০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩২।
৫৫৪, প্রাগুক্ত, ৯/৩৩১।
৫৫৫. L'AnoymeSyriaque, p. 282.
৫৫৬. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৯ ও ইবনুল ইবরি, তারীখুয-যামান, পৃষ্ঠা: ১৫৬-১৫৭।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুদৃঢ় কিছু সিদ্ধান্ত

📄 সুদৃঢ় কিছু সিদ্ধান্ত


এডেসা বিজয় সমাপ্ত হওয়ার পর ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তিনি বলেন, 'এমন একটি নগরীকে ধ্বংস করে ফেলা রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বৈধ নয়।' (৫৫৭) ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন যে, এডেসার মতো একটি সুপ্রাচীন বৃহৎ নগরীকে ধ্বংস করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। বরং তার কর্তব্য একে সংরক্ষণ করে যথার্থ তত্ত্বাবধান করা। আর তাই তিনি এমন কিছু মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, একজন বিজয়ী সেনাপতির পক্ষে এর চেয়ে চমৎকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভবপর নয়।
১. তিনি আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করেন। (৫৫৮)
২. আর্মেনীয় ও ইয়াকুবি গোষ্ঠীর যেসব ব্যক্তিকে মুসলমানরা বন্দি করেছিল বা তাদের ধনসম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তিনি তা ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। প্রাচ্যের এসব খ্রিষ্টান নাগরিক ছিল এখানকার স্থানীয় অধিবাসী, যারা বহু বছর ধরে এ অঞ্চলে বসবাস করছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির নির্দেশে সৈন্যরা সবকিছু ফেরত দিয়ে দেয়। ফলে এডেসা নগরী আবারও সেই অবস্থায় ফিরে আসে, যেমনটি ইসলামি বিজয়ের পূর্বে ছিল! (৫৫৯)
৩. সকলকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। খ্রিষ্টানদের গির্জাগুলোতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হতে বিরত থাকা হয়। (৫৬০)
৪. আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের নগরীর অভ্যন্তরে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে তাদের মুসলমানদের শরণাপন্ন হতে হবে না। অবশ্য তারা ইসলামি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনস্থ থাকবে। (৫৬১)
৫. বিশপ ও ধর্মযাজকদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি, তত্ত্বাবধান ও উপঢৌকন প্রদান করা হয়। কারণ, তারাই সাধারণ জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।
৬. যেসব আর্মেনীয় নাগরিক ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের নিপীড়নে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল, তাদেরকে ইসলামি শাসনের অধীনে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাসের জন্য পুনরায় এডেসায় ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। (৫৬২)
এভাবে প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রশাসননীতি ও উদার চেতনার বাস্তবায়নের কারণে এডেসা নগরীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় পর এডেসা আবারও ফিরে আসে মুসলমানদের হাতে। ফিরে আসে ক্রুসেডাররা দখল করার পূর্বের সেই পুরোনো চেহারায়; অর্থাৎ একটি ইসলামি শাসনাধীন খ্রিষ্টান অধ্যুষিত নগরীর অবয়বে।
নিঃসন্দেহে এটি ছিল এক অমর বিজয়। আল্লাহ তাআলা মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির অনন্যসাধারণ প্রচেষ্টাকে এই বিজয়মাল্যে ভূষিত করেন। এ বিজয়ের মাহাত্ম্য বোঝাতে আমরা এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের মন্তব্য তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করছি। তিনি বলেন,
"মুসলমানরা এরূপ বিজয় কখনো উপভোগ করেনি। চারিদিকে এর আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে, জনেজনে চর্চিত হতে থাকে এবং লোকসমাবেশ এর প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠে। এটি ছিল শ্রেষ্ঠতম বিজয়। সত্যই একে তুলনা করা যেতে পারে বদরের বিজয়ের সঙ্গে।" (৫৬৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা নগরীর পতন ঘটিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি এরপর দ্রুত এডেসা রাজ্যের অধীনস্থ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দুর্গে অভিযান পরিচালনা করে সেগুলোরও পতন ঘটান। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় সারুজ নগরীর দুর্গের কথা। এডেসা বিজয়ের এক মাসেরও কম সময় পর ৫৩৯ হিজরি সনের রজব মাসে (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) দুর্গটির পতন ঘটে। (৫৬৪) এরপর অবিজিত থেকে যায় এডেসা রাজ্যের অধীনস্থ ফুরাতের পশ্চিম তীরের ছোট ছোট কয়েকটি নগরী, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিল-বাশির নগরী। ২য় জোসেলিন সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছিলেন।
এভাবেই এডেসা রাজ্যের পতন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। যে ক্রুসেড রাজ্যটি প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পতনের মিছিলেও সে যোগ দেয় সবার আগে!

টিকাঃ
৫৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩২।
৫৫৮. L'AnoymeSyriaque, p. 282.
৫৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৯।
৫৬০. Runciman: op. cit., 11, p. 237.
৫৬১. Grousset: Hist. des Croisades, 11, p. 190.
৫৬২. Michel Le Syrien. L11. pp. 262-268.
৫৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৯।
৫৬৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩২, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭০ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৯৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এডেসা পতনের প্রভাব ও ফলাফল

📄 এডেসা পতনের প্রভাব ও ফলাফল


নিঃসন্দেহে এ জাতীয় একটি মহান বিজয়ের অসংখ্য প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল থাকে। এডেসা বিজয়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। আমরা নির্দিষ্ট করে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রভাবের কথা উল্লেখ করতে পারি।
১. মুসলমানদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণে সমুন্নত হয়। কেবল ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজত্বের মুসলমানগণ নয়; বরং পুরো বিশ্বের মুসলমানদের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। বিভিন্ন স্থানে বিজয় উদ্যাপন করা হয়, প্রশস্তিমূলক কবিতা রচিত হয়, বক্তা ও খতিবদের আলোচনাজুড়ে থাকে এই বিজয়গাথা। এটি তো বিজয়ের আশা ও স্বপ্ন ছিল না, ছিল না সাফল্যের প্রতিশ্রুতি; এ তো প্রকৃত ফলাফল, অনুভবযোগ্য প্রভাব।
২. বিপরীত দিকে ক্রুসেডারদের আত্মবিশ্বাসে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। ২য় জোসেলিন কল্পনাও করেননি যে, সুরক্ষিত এডেসা রাজ্যের দুর্গগুলোর পতন ঘটতে পারে। তিনি মনে করেছিলেন, ইমাদুদ্দিন জিনকির এ অভিযান বিগত বছরগুলোর আর দশটা অভিযানের মতোই সাধারণ কোনো অভিযান। এই অবিশ্বাস্য অভিযান তাকে বলতে গেলে নিশ্চল করে দেয়। আর তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে নগরীর প্রতিরক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সাহসই করেননি। নিঃসন্দেহে এটি তার, তার সঙ্গী ও সেনাপতিদের মনোজগতে গভীর ব্যর্থতার ক্ষত সৃষ্টি করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তদ্রূপ আমরা এই ঐতিহ্যবাহী রাজ্যটিকে উদ্ধার করার জন্য অন্যান্য ক্রুসেড রাজ্যের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের প্রচেষ্টা লক্ষ করিনি। এতে প্রমাণিত হয় যে, তারা বিজয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে পুরোপুরি নিরাশ হয়ে গিয়েছিল।
৩. এই সুস্পষ্ট বিজয়ের পর এ অঞ্চলের মুসলমানরা ক্রুসেডারদের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে উপনীত হয়। পূর্বের পঞ্চাশ বছর সব সময়ই ক্রুসেডারদের শক্তির পাল্লা ভারী ছিল। এমনকি এ সময় মুসলমানরা বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ করলেও সেসব যুদ্ধ হয়েছিল কোনো বাহিনী বা সীমিত জনশক্তির সঙ্গে। যুদ্ধ শেষে দু-পক্ষ আপন আপন নগরীতে ফিরে যেত, কাউকে কিছু হারাতে হতো না। মুসলমানরা কোনো নগরী বা দুর্গ পুনরুদ্ধার করলেও ক্রুসেডাররা দ্রুতই তা পুনর্দখল করে ফেলত। কিন্তু এখন শক্তিতে ভারসাম্য এসেছে। মুসলমানদের এখন ক্রুসেডারদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জিত হয়েছে। মুসলমানদের কৌশলও এখন বদলে গেছে। এতদিন কৌশল ছিল-'প্রতিপক্ষ আক্রমণ করলে প্রতিরোধ প্রচেষ্টা'। আর এখন কৌশল হলো- 'আক্রমণই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা'!
৪. ক্রুসেডারদের এই ভীতিপ্রদ পরাজয় পশ্চিম ইউরোপকে জাগিয়ে তোলে। এতদিন তারা প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। এবার ক্রুসেড রাজ্যগুলোতে বসবাসকারী ক্রুসেডারদের উদ্ধারের লক্ষ্যে পশ্চিম ইউরোপে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের রানী মেলিসেন্ড রোমে পোপের কাছে একটি সাহায্যবার্তা প্রেরণ করে ক্রুসেডারদের সহায়তায় বড় ধরনের সৈন্যসমাবেশের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। ইউরোপীয় এই জাগরণই ছিল অল্প কয়েক বছর পর সংঘটিত হওয়া দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের বীজ। (৫৬৫)
৫. এই বিজয়ের ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে এন্টিয়ক রাজ্যের নীতিও বদলে যায়। যে রেমন্ড কিছুদিন পূর্বেও বাইজান্টাইনদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কিলিকিয়া অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন, তিনি হঠাৎ করেই অনুভব করেন যে, এ অঞ্চলে নতুন করে জেগে ওঠা ইসলামি শক্তির সামনে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। এই অনুভূতি থেকেই তিনি বাইজান্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল কমনিনোসের সঙ্গে সমঝোতা আলোচনা শুরু করেন এবং মুসলমানদের মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। তার এ প্রস্তাবই পরবর্তী সময়ে আরও একবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে হিলাল-ছালিব চলমান সংঘাত-ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করে। (৫৬৬)
৬. এই মহান বিজয়ের পর সুলতান মাসউদের পক্ষ থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ক্ষমতা ও রাজত্ব হতে অপসারণ করার প্রচেষ্টা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই মহান বীরের তুলনায় নিজের আয়তন কতটা ক্ষুদ্র, তিনি তা অনুমান করতে সক্ষম হন। তিনি বুঝতে পারেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অপসারণের কোনো চেষ্টা মুসলিম জনসাধারণ কিছুতেই বরদাশত করবে না। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনামলের শেষ সময় পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক বিরাজমান ছিল।
৭. এ মহান বিজয় আব্বাসি খলিফা মুকতাফি লি-আমরিল্লাহর চেতনা ও অনুভূতিতেও নাড়া দিতে সক্ষম হয়। মুকতাফি লি-আমরিল্লাহ ছিলেন খোদাভীরু ও সচ্চরিত্রবান একজন খলিফা। বিজয়ের সংবাদ পেয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য সম্মানসূচক বিভিন্ন উপহার প্রেরণ করেন এবং এতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তাকে এমন সব উপাধি প্রদান করেন, যা সাধারণত কোনো প্রশাসক বা সেনাপতিকে প্রদান করা হতো না। ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকি নতুন রূপে পরিচিত হতে থাকেন। এসব উপাধির মধ্যে ছিল—আল-মালিকুল আদিল (ন্যায়পরায়ণ শাসক), রুকনুল ইসলাম (ইসলামের স্তম্ভ), আল- আমিরুল মুযাফফার (বিজয়ী শাসক), উমদাতুস সালাতিন (শ্রেষ্ঠতম সুলতান), মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক, মালিকুল উমারা (শাসক-প্রধান) ইত্যাদি। (৫৬৭) খলিফাপ্রদত্ত এসব উপাধির মাধ্যমে মূলত ইমাদুদ্দিন জিনকির স্বাধিকার, স্বাধীন রাজত্ব, একক নেতৃত্ব ও কারও অধীনস্থ না হওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকির কাঁধে আগের দায়িত্বসমূহের পাশাপাশি আরও অনেক বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়।
৮. এসব মহিমান্বিত বিজয় এবং সুলতান মাসউদ ও খলিফা মুকতাফি লি-আমিরিল্লাহর এই পরিবর্তিত অবস্থান মূলত স্বাধীন জিনকি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘোষণা করছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকিই হলেন এই সুমহান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। তার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিগণ এ রাষ্ট্র শাসন করে। বহু শাসকপরিবার জিনকি রাজপরিবারের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীকালে এই জিনকি পরিবারই ইসলামি বিশ্বের পথিকৃৎ ও নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করে। মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্বের পতাকা সেলজুক রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্থানান্তরিত হয় জিনকি রাষ্ট্রের কাছে। আবারও বাস্তবায়িত হয় যুগে যুগে হাজার বার বাস্তবায়িত হওয়া সেই অমোঘ বিধান-
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে-ইমরান: ১৪০]
৯. এই বিজয়ের পর জাযিরা অঞ্চলে উরতুক পরিবারের কর্মতৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়। যদিও কারা আরসালান বিন দাউদ ও হুসামুদ্দিন তামারতাশ প্রকাশ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকির পতাকাতলে শামিল হওয়ার কথা ঘোষণা করেননি; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আপত্তি বা বিদ্রোহের কথাও শুনিনি। এই মহান ও প্রভাবক বিজয়ের কারণে তারা উভয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তির পরিধি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আর তাই তারা আপন আপন শাসনাধীন ভূখণ্ড নিয়ে তুষ্ট থাকেন আর অপেক্ষা করতে থাকেন আগামী দিন কী বার্তা নিয়ে আসে, তা জানার জন্য!
১০. সামরিক দিক থেকে বিবেচনা করলে এই বিজয়ের ফলে মসুল ও শাম অঞ্চলের মধ্যবর্তী সকল পথ ক্রুসেডার-মুক্ত হয়ে যায়। ইরাক এবার তার পুরো সামর্থ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে মুসলিম-ক্রুসেডার সংঘাতের অঙ্গনে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। ইরাক ও পারস্য থেকে নিরাপদে সৈন্যরা শাম অঞ্চলে আসতে থাকে। তা ছাড়া সমৃদ্ধ এডেসা নগরী মুসলমানদের শাসনাধীনে চলে আসায় ইসলামি রাষ্ট্র লাভ করে বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ। পুরো ফুরাত উপত্যকা ইসলামি উপত্যকায় পরিণত হওয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশও বহুগুণ সমৃদ্ধ হয়।

টিকাঃ
৫৬০. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৯৭।
৫৬৬. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-জিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১৫৫।
৫৬৭. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00