📄 পূর্ণ পাঁচ বছর
মসুলে ফিরে এসে ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান, এদিকে এক নতুন সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে। মসুলের পূর্ব দিকে শাহরায়ুর নগরীতে কাফজাক বিন আরসালান তাশ তুর্কমানি নামক জনৈক তুর্কমেন সেনাপতি সুসংহত অবস্থান গড়ে তুলেছে এবং তার চারপাশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারীকেও সমবেত করতে সক্ষম হয়েছে। কাফকাজের এ অবস্থান ছিল মসুলে ইমাদুদ্দিন জিনকির দুর্গের জন্য সরাসরি বিরাট হুমকি। বিষয়টি এ কারণেও উদ্বেগজনক ছিল যে, সুলতান মাসউদের সঙ্গে কাফজাকের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি আশঙ্কা করছিলেন, তিনি হয়তো সুলতান মাসউদের পক্ষ থেকে মসুল জয়ের কোনো ধরনের গোপন প্রচেষ্টার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। এ কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি কালবিলম্ব না করে শাহরায়ুর অভিমুখে অগ্রসর হন। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত শাহরায়ুর অঞ্চল ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও সুরক্ষিত। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধ করেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন। কাফজাকের পরাজিত সৈন্যরা পালিয়ে বিভিন্ন দিকে আশ্রয় নেয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি শাহরায়ুর অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গ অবরোধ করে সবগুলোর পতন ঘটান এবং পাহাড়ি অঞ্চলটির সবগুলো কেন্দ্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা এ জাতীয় পরিস্থিতিতে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তিনি কাফজাককে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং সে তার আনুগত্যে ফিরে এলে তার সঙ্গে সদয় আচরণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বাস্তবেও কাফজাক ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে ফিরে আসেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে সাদরে স্বাগত জানান এবং ইতিপূর্বে তার হাতে যে অঞ্চলের কর্তৃত্ব ছিল, তার কর্তৃত্ব তার হাতেই তুলে দিয়ে তাকে নিজের অধীনস্থ করে নেন। কাফজাক ইমাদুদ্দিন জিনকির এই সদয় আচরণের মূল্য রক্ষা করেছিলেন। তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলেছেন এবং আজীবন জিনকি পরিবারের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন। কাফজাক ও তার পুত্রগণ পরবর্তী ষাট বছরেরও অধিক সময় অর্থাৎ হিজরি ছয়শ সনের পরও নিজেদের আনুগত্যের অঙ্গীকারে অটল ছিল। (৫১৬) এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি মার্জনা, প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি ও সদাচরণের মাধ্যমে উক্ত অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন।
৫৩৫ হিজরি সনে (১১৪০ খ্রিষ্টাব্দে) রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান হুসামুদ্দিনের শাসিত সিলভান নগরীতে আক্রমণ করেন। হুসামুদ্দিন স্বভাবমতো ইমাদুদ্দিন জিনকির সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি দ্রুত আবেদনে সাড়া দেন এবং সিলভানের ওপর থেকে চাপ সরানোর লক্ষ্যে রুকনুদ্দৌলার শাসনাধীন বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালান। ইমাদুদ্দিন হাসানকেইফের নিকটবর্তী বাহমারুদ দুর্গকে আক্রমণের জন্য বেছে নেন। তার এ নির্বাচন ছিল বুদ্ধিদীপ্ত সামরিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কারণ, দুর্গটির নিয়ন্ত্রণভার ছিল রুকনুদ্দৌলার পুত্র কারা আরসালানের হাতে। তা ছাড়া দুর্গটি ছিল হাসানকেইফের একেবারে সন্নিকটে। সংবাদ পেয়ে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি একদিকে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বাহমারুদ দুর্গে অবরুদ্ধ তার পুত্রের নিরাপত্তা নিয়ে, অপরদিকে বাহমারুদ দুর্গের নিকটে অবস্থিত তার আবাসস্থল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ হাসানকেইফের পরিণতি নিয়ে। বাধ্য হয়ে তিনি সিলভান নগরীর অবরোধ প্রত্যাহার করে বাহমারুদ দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এর পূর্বেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্ষম হন এবং গুরুত্বপূর্ণ বাহমারুদ দুর্গের অধিকার লাভ করেন। (৫১৭) এরপর দাউদ বিন সুকমান সরাসরি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে ভীত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকির অনুকূলে চলে আসে।
536 হিজরি সনে (1141 খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকি আমিদ নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। এ সময় নগরীটির প্রশাসক আবু মানসুর ইকলিদি তার বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এর ফলে জাযিরা অঞ্চলে ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান আরও সংহত হয়। (518) কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির এই কর্তৃত্ব নতুন করে হুসামুদ্দিন তামারতাশকে অস্থির করে তোলে। তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ করে অনেক বছর পর তার প্রতিদ্বন্দ্বী রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মিত্রতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন! (519) বাস্তবেই জাযিরা অঞ্চল তখন ফিতনা ও মনোবৃত্তি চরিতার্থের উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খাচ্ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রতিপক্ষের জোট ভাঙার উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রুকনুদ্দৌলার সঙ্গে পত্রবিনিময় করে তাকে হুসামুদ্দিনকে ছেড়ে তার সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। রুকনুদ্দৌলা দাউদ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে থাকেন। তিনি উপলব্ধি করেন, ইমাদুদ্দিন জিনকি হুসামুদ্দিনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তিনি যদি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে সংঘাত ও বিবাদের ওপর অটল থাকেন, তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি শীঘ্রই শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে তার রাজ্য দখল করে নিতে পারবেন। তা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিপূর্বে হুসামুদ্দিন তামারতাশের সঙ্গে মিত্রতা করার পর তার সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করেননি; বরং তাকে উপহার ও অনুগ্রহদান হিসেবে বিভিন্ন দুর্গ প্রদান করেছেন। হুসামুদ্দিনই মূলত ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। হতে পারে ভবিষ্যতে হুসামুদ্দিন তার সঙ্গেও প্রতারণা করবেন। সর্বদিক বিবেচনায় দাউদ বিন সুকমানের কাছে হুসামুদ্দিনের মিত্রতা ত্যাগ করে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনই শ্রেয়তর বিবেচিত হয়! (৫২০)
এভাবে জাযিরা অঞ্চলে ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তি আরও বৃদ্ধি পায় আর হুসামুদ্দিন তামারতাশ মিত্রহীন ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ইমাদুদ্দিন জিনকি এতেই ক্ষান্ত না হয়ে এরপর দক্ষিণে তার রাজ্য সম্প্রসারিত করেন এবং প্রথমে হাদিসা(৫২১) ও পরে আনা নগরীকে(৫২২) জিনকি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এর মাধ্যমে জাযিরা অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়। (৫২৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও আপন কেন্দ্রীয় শক্তিকে কাজে লাগানোর মনস্থ করেন। তিনি ৫৩৭ হিজরি সনে (১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে) দিয়ারে বকরের নিম্নভূমি ও জাযিরার উচ্চভূমিতে অবস্থিত বিভিন্ন দুর্গে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত অভিযানে বের হন। এই অভিযানে তিনি এমন অনেক স্থানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইতিপূর্বে কোনো সেলজুক সেনাপতি বা অন্য কেউ পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। তিনি তানজা, আসআরাদ ও হিযান অঞ্চলকে তার রাজ্যভুক্ত করেন। এ ছাড়াও দিউক, মাতলিস, বানসিবা ও জুলকারনাইনের মতো বিভিন্ন দুর্গও এ অভিযানে জিনকি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি এসব নগরী ও দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তার অধীনস্থ বিভিন্ন সেনাপতির হাতে ছেড়ে দেন। (৫২৪) এর ফলে জাযিরা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এমন স্তরে উপনীত হয়, যা ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। নিশ্চিতভাবেই এখন দাবি করা যায় যে, এডেসা রাজ্যের পথ পুরোপুরি নিরাপদ ও উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। একমাত্র বাকি রয়ে গেছে হুসামুদ্দিন তামারতাশের শাসনাধীন এলাকা। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকি জানতেন যে, তিনি যদি এডেসার উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করেন, দুর্বল হুসামুদ্দিনের পক্ষে কিছুতেই তাকে পথে বাধাপ্রদান সম্ভব হবে না।
জাযিরা অঞ্চলে এই ব্যাপক ও বিস্তৃত অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি কিন্তু তার সুবিশাল রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন ছিলেন না। বরং তিনি রাজ্যের যেকোনো স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ফিতনা প্রচেষ্টার প্রতি সতর্ক-দৃষ্টি রাখতেন। মসুলের পূর্ব দিকে কুর্দি হাকারিয়া গোত্র অধ্যুষিত অঞ্চলে একবার বিদ্রোহ প্রচেষ্টা সংঘটিত হলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। অঞ্চলটির নেতা ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির মিত্র আবুল হাইজা আল-হাকারি। তার মৃত্যুর পর তার নায়েব বাউ আলারুজি অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ইমাদুদ্দিন জিনকির আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান। ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত সে অঞ্চলে পৌঁছে তার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে পরাভূত করেন। তিনি বিরোধীদের মূল ঘাঁটি আশুব (Amadiya) দুর্গসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গে পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৫২৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকির সচেতনতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তিনি একই সময় আলেপ্পোর নিকটবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের হামলাও মোকাবিলা করেন। আলেপ্পোর প্রতিরক্ষা বাহিনী ক্রুসেডারদের হামলা প্রতিরোধ করে। এ সময় সাতশ ক্রুসেডার যোদ্ধা প্রাণ হারায়। মুসলমানরা লাভ করে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (৫২৬)
কুর্দি মিহরানিয়া গোত্রও এ সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। গোত্রটি জাযিরা ইবনে উমরের নিকটবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গে বসবাস করত। এসব দুর্গের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাওয়াশি দুর্গ। সংবাদ পেয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত মিহরানিয়া গোত্রের মোকাবিলায় অগ্রসর হন এবং পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে তাদেরকে বশীভূত করেন। ফলে তার রাজ্যের সকল স্থানে পুনরায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে। (৫২৭) এভাবে ৫৩৭ হিজরি সনের শেষে এবং ৫৩৮ হিজরি সনের শুরুর দিকে ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদিক থেকে পূর্ণ স্থিতিশীলতার অধিকারী হন। এখন তিনি চাইলেই সেই প্রাচীন রাজ্যটিকে জয় করার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, যে রাজ্যের নাম 'এডেসা ক্রুসেড রাজ্য'!
টিকাঃ
৫১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৪-৩১৫।
৫১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৭, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৬, ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৯ ও ইবনুল আযরাক আল-ফারিকি, তারীখুল আযরাকিল-ফারিকি আ'লা হামিশি যায়লি তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৭।
518. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, 9/324 ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: 64।
519. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, 1/89।
৫২০. Elisself: op. cit., p. 373.
৫২১. হাদিসাতুল ফুরাত' ফুরাত নদীর মাঝে একটি দ্বীপে অবস্থিত। হাদিসা নামে আরেকটি এলাকা আছে মসুলে, যা দজলা নদীর পূর্ব তীরে যাবুল আ'লা মোহনার নিকটে অবস্থিত। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ২/২৩০।
৫২২. 'আনা' রাক্কা ও হিতের মধ্যবর্তী একটি প্রসিদ্ধ নগরী। নগরীটিকে জাযিরা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হয়। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৪/৭২।
৫২৩, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩০, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪ ও ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাযাম, ১০/১০২।
৫২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৯।
৫২৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৬ ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪।
৫২৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৭-২৭৮।
৫২৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪।
📄 আল্লাহর সৈনিক
৫৩৩ হিজরি সন হতে ইতিমধ্যে পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। এ দীর্ঘ সময়ে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তবে এই পাঁচটি বছর বিনা কাজে অবহেলায় নষ্টও হয়নি। এ সময়টুকু অতিবাহিত হয়েছে লাগাতার প্রস্তুতি গ্রহণ ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার কাজে। ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার চিন্তা ইমাদুদ্দিন জিনকির মনমস্তিষ্ক হতে কখনোই অদৃশ্য হয়নি। বরং খোদ এডেসা নগরীর বিষয়টি এই মহান বীর সেনানীর চিন্তায় সব সময় বিরাজমান ছিল। যেমন ইবনুল কালানিসি রহ. যায়লু তারীখি দিমাশক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, 'এই নগরীটির স্মৃতি তার মানসপটে ভাস্বর ছিল; এ সম্পর্কে করণীয় চিন্তা তার মন ও হৃদয়জুড়ে ছিল।' (৫২৮)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার নথিপত্র গুছিয়ে নিয়ে এডেসা রাজ্যে ব্যাপক পরিসরে সুবিন্যস্ত অভিযান পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেন। তিনি যখন এই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, এর মধ্যেই অর্থাৎ ৫৩৮ হিজরি সনে (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) চলমান ঘটনাপ্রবাহে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম করে দেয়।
এমনটি ভাবা মোটেও উচিত হবে না যে, এসব পরিবর্তন ছিল বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনা। কারণ, পৃথিবীতে যা কিছু সংঘটিত হয়, মহান আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত তাকদির মেনেই সংঘটিত হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইমাদুদ্দিন জিনকির আন্তরিক নিষ্ঠা ও নিবিড় কর্মপ্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করে তাঁর জন্য পরিস্থিতি অনুকূল করে দিয়েছিলেন এবং আগামীর পথচলা সহজ করে দিয়েছিলেন। ইমাদুদ্দিন তো লড়াই করছেন ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পূরণ করতে, দখলদার শত্রুর নাগপাশ থেকে। মুসলমানদের ভূখণ্ড মুক্ত করার লক্ষ্যে।
আসুন, আমরা এবার ৫৩৮ হিজরি সনের শেষভাগে এবং ৫৩৯ হিজরি সনের প্রথমভাগে সংঘটিত সেসব ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করি, যা ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য এডেসা বিজয়ের পথ সুগম করে দিয়েছিল।
১. ৫৩৮ হিজরি সনে (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিনোস মৃত্যুবরণ করেন (৫২৯) এবং তার পুত্র ১ম ম্যানুয়েল কমনিনোস (Manuel I Komnenos) তার স্থলাভিষিক্ত হন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য শাসনকারী ২য় জন কমনিনোসের প্রয়াণ-ঘটনা নিশ্চিত করেই সাম্রাজ্যটিকে কঠিন সংকটে ফেলে দেয়। নতুন সম্রাট ম্যানুয়েল কমনিনোস তার যাবতীয় কর্মপ্রচেষ্টা সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিধানেই ব্যয় করতে বাধ্য হন। এর ফলে সাম্রাজ্যটি শাম অঞ্চলের সম্ভাব্য সংঘাতের সমীকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পক্ষে তখন এডেসা রাজ্যের স্বার্থে অগ্রসর হওয়ার মতো সময় ও শক্তি ছিল না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, ইতিপূর্বে মাত্র ছয় বছর আগে ৫৩২ হিজরি সনে আমরা বাইজান্টাইন-ক্রুসেডার জোটের অস্তিত্ব দেখেছি। এডেসা রাজ্যের শাসক ২য় জোসেলিনও উক্ত জোটে শরিক ছিলেন। নিঃসন্দেহে নতুন করে এ জাতীয় কোনো জোট ও মৈত্রী তৈরি হলে ইমাদুদ্দিন জিনকির এডেসা অভিযান পরিকল্পনা আটকে যেতে পারত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এ আশঙ্কা দূর করে দেন।
২. সম্রাট ২য় জন কমনিনোসের মৃত্যুর পর এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স কিলিকিয়া অঞ্চল দখলে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ৫৩২ হিজরি সনে এ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার সময় বাইজান্টাইনরা কিলিকিয়া অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। রেমন্ড তার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে কিলিকিয়া অঞ্চল দখল করে নেন। স্বভাবতই এ ঘটনা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ করে এবং কিলিকিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও এন্টিয়কের মধ্যে বিবাদ-সংঘাত সৃষ্টি হয়। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ন্যায় বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কারণে এন্টিয়ক শাসক রেমন্ডের চিন্তাজগৎ থেকে এডেসা রাজ্য বলতে গেলে বিস্মৃত হয়ে যায়। ফলে এডেসা রাজ্যও তার সবচেয়ে নিকটবর্তী ক্রুসেড রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্তির আশা হারিয়ে ফেলে। (৫৩০)
৩. হঠাৎ করেই শিকার ভ্রমণে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যান বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক ফাল্ক অ্যাঞ্জো! মৃত্যুর পূর্বে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক দুজন পুত্র রেখে যান। প্রথমজন ৩য় বল্ডউইন (Baldwin III)-এর বয়স তখন তেরো বছর আর দ্বিতীয়জন অ্যামালরিক (Amalric I)-এর বয়স সাত বছর। ফলে কিশোর ৩য় বল্ডউইন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তার মা ও ২য় বল্ডউইনের কন্যা মেলিসেন্ড শাসনকার্যে তার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফাল্কের সঙ্গে প্রতারণা করা মেলিসেন্ডের আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করে এসেছি। (৫৩১)
এর ফলে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের মূল কর্তৃত্ব চলে যায় এই নারীর হাতে। পুত্র ৩য় বল্ডউইনের নামে তিনিই রাজ্যশাসন করতে থাকেন। ফলে রাজ্যটির প্রভাব-প্রতিপত্তি বহুলাংশে দুর্বল হয়ে যায় এবং ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পারস্পরিক ঐক্য কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। কারণ, দীর্ঘদিন যাবৎ বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজাই সকল ক্রুসেডার নেতাকে ঐক্যবদ্ধ রাখতেন এবং তাদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ দূর করতেন। এখন তো রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স ও ২য় জোসেলিনের ন্যায় সামরিক নেতৃবৃন্দ কিছুতেই একজন নারীর কথা শুনবেন না এবং একজন শিশুর কর্তৃত্ব কিছুতেই মেনে নেবেন না।(৫৩২)
৪. এডেসার শাসক ২য় জোসেলিন ও এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের মধ্যকার বিবাদ এবার প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে। তারা আগে থেকেই একে অপরকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন এবং শত্রুতা পোষণ করতেন। উভয়ের রাজত্বের মধ্যবর্তী মুসলিম শাসনভুক্ত অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে উভয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। (৫৩৩) ইতিপূর্বে অধিকৃত ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে রাজা ফাল্ক এ জাতীয় সংঘাতকে আড়াল করে রাখতেন এবং তাদের উভয়কে প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়াতে নিষেধ করতেন। তার মৃত্যুর পর এমন কেউ ছিল না, যিনি তাদেরকে বাধা দেবেন এবং বিবাদ দূর করার চেষ্টা করবেন। এ কারণে উভয়ের মধ্যকার বিবাদ এবার প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়। (৫৩৪)
৫. হঠাৎ করেই ইন্তেকাল করেন শক্তিশালী উরতুকি নেতা রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান। যদিও শেষ সময়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির মিত্র ছিলেন; কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব আস্থা রাখার মতো ছিল না। এমন আশঙ্কা মোটেও অমূলক ছিল না যে, রুকনুদ্দৌলা যেকোনো মুহূর্তে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে চলে যাবেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির পৃষ্ঠদেশে আঘাত হানবেন। নিজের রাজ্য ও ক্ষমতা রক্ষার প্রয়োজনে হয়তো তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিত্রতা করতেও দ্বিধা করবেন না।
রুকনুদ্দৌলার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র কারা আরসালান বিন দাউদ। (৫৩৫) তিনি ছিলেন তার পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। পিতার ন্যায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রণকুশলতা তার ছিল না। বরং দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতেই তিনি এডেসার শাসক ২য় জোসেলিনের সঙ্গে জোট বাঁধার সিদ্ধান্ত নেন। (৫৩৬) যদিও এ সিদ্ধান্ত বাহ্যত অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল; কিন্তু এর দ্বারা শুরুতেই কারা আরসালানের নীতি উন্মোচিত হয়ে যায় এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজ্যে আক্রমণ চালানোর জন্য উপযুক্ত যৌক্তিকতা পেয়ে যান। আর ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে তখন কারা আরসালানের রাজ্যে অভিযান পরিচালনা একেবারেই সহজতর ছিল। কারণ, কারা আরসালানের সামরিক অভিজ্ঞতার যেমন অভাব ছিল, নিজ সৈন্যদের ওপর তার প্রভাবও ছিল দুর্বল।
এভাবেই চলমান সময়ের বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ঘটনা সম্মিলিতভাবে এডেসা রাজ্যের পতন প্রক্রিয়া তরান্বিত করে। একদিকে এডেসা রাজ্য এন্টিয়ক রাজ্য ও বাইতুল মুকাদ্দাস সাম্রাজ্যের সহায়তা হারিয়ে ফেলে, আরেকদিকে হারিয়ে ফেলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে। এর পাশাপাশি জাযিরা অঞ্চল হারায় রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের মতো একজন একগুঁয়ে রাষ্ট্রনায়ককে। ফলে মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে এডেসা রাজ্যের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
টিকাঃ
৫২৮. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৮২।
*২৯, Runciman: op. cit., 11, p. 224.
৫৩০. Brehier, op. cit., p. 328.
৫৩১. Setton: op. cit. 1, p. 444.
৫৩২. Grousset: op. cit. 11, pp. 147-175 & Setton: op. cit. 1, p. 444.
৫৩৩. Guillaume de Tyr, 1, p. 709.
৫৩৪. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৪৭৯।
৫০৫. ইবনুল আযরাক আল-ফারিকি, তারীখুল আযরাকিল-ফারিকি আ'লা হামিশি যায়লি তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৭।
৫০৬. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরী, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/১৩৯ ও রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৭৯।
📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির বিনম্রতা
এই তো এডেসার পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে!
ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার সামরিক দৃষ্টিতে এডেসা রাজ্যের দিকে তাকান। তিনি দেখতে পান, সম্রাট ২য় জন কমনিনোস ও রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর মৃত্যু এবং এন্টিয়ক রাজ্যের সঙ্গে সংঘাতের কারণে রাজ্যটির সহায়তা-সম্পর্ক শেকড় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন রাজ্যটির কেবল নতুন উরতুকি শাসক কারা আরসালান বিন দাউদের মাধ্যমে জাযিরা অঞ্চলের উরতুকিদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। এবার তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি এই সম্পর্কটিও কেটে ফেলে এডেসা রাজ্যকে পার্শ্ববর্তী জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মনস্থ করেন। তখন তার জন্য এডেসা রাজ্যের ওপর আঘাত হানা আরও সহজ হবে। ইমাদুদ্দিন জিনকি সে বছরই অর্থাৎ ৫৩৮ হিজরি সনে (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) শাবিখতান অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন ক্রুসেড দুর্গের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করেন। জাযিরা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত শাবিখতান অঞ্চলকে এডেসা রাজ্য ও কারা আরসালানের কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলের সীমান্তরেখা বিবেচনা করা হতো। তিনি এ অভিযানের মাধ্যমে দুই মিত্রকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাচ্ছিলেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি জামলিন, মাওযার, তিল-মাওযান (Urkesh) ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গসহ শাবিখতান অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দুর্গের পতন ঘটান। (৫৩৭) এর মাধ্যমে তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্ষম হন। এডেসা রাজ্য আশেপাশের সবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ইমাদুদ্দিন জিনকি এখন চাইলেই এডেসা অভিমুখে রওনা হতে পারেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই তার কাছে এমন এক আকস্মিক ও আশঙ্কাজনক সংবাদ এসে পৌঁছায়, যার কারণে তার সকল পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হওয়ার এবং সকল প্রস্তুতি ভন্ডুল হওয়ার উপক্রম হয়!
বাগদাদ থেকে সংবাদ আসে যে, সেলজুক সুলতান মাসউদ ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার কাছ থেকে তার রাজত্ব কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন! (৫০৮)
এমন এক সময়ে সুলতান মাসউদের ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শখ হলো!
নিঃসন্দেহে সুলতান মাসউদ ছিলেন বিভিন্ন ধরনের আত্মিক ও চারিত্রিক ব্যাধিতে আক্রান্ত!
তিনি রাজনৈতিক বক্রতার ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি জানতেন না, কোন দিকে যুদ্ধে অগ্রসর হওয়া উচিত এবং কোন পথে নিজ বাহিনীকে পরিচালিত করা উচিত!
একই সঙ্গে তিনি প্রচণ্ড পর্যায়ের ধর্মীয় দুর্বলতার ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। আর তাই জাতির এই চরম দুর্যোগপূর্ণ সময়েও মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করতে তার বিবেকে সামান্য বাঁধেনি। তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য দ্বিধা করেননি, যা দ্বারা ক্রুসেডারদের প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ হবে আর মুসলমানদের ধ্বংস ত্বরান্বিত হবে!
তিনি চারিত্রিক অধঃপতনের ব্যাধিতেও আক্রান্ত ছিলেন। এ কারণেই তিনি একজন মুজাহিদের পিঠে ছুরি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ঈমানদারদের বাহিনীর জন্য ফাঁদ পাততে অগ্রসর হচ্ছিলেন!
যেকোনো বিবেচনায় এটি ছিল চরম দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি!
এই চরম ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির মোকাবিলায় ইমাদুদ্দিন জিনকি এখন কী করবেন?!
যেহেতু তার এডেসা অভিযানের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে, তাহলে কি তিনি সুলতান মাসউদের বিষয়টি উপেক্ষা করার ভান করে এডেসা অভিমুখেই অগ্রসর হবেন? কিন্তু এতে তো সুলতান মাসউদের সামনে তার পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। তখন তো মাসউদ পেছন থেকে হামলা করে সবকিছু শেষ করে দেবেন।
নাকি তিনি সুলতান মাসউদের মোকাবিলা করবেন এবং এডেসা রাজ্য জয়ের সুযোগ নষ্ট করবেন, যার জন্য তিনি তার শাসনামলের শুরু থেকে অর্থাৎ আঠারো বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?!
সুলতান মাসউদ তাকে ভয়াবহ সংকটে ফেলে দিয়েছেন!
কিন্তু সুলতান মাসউদ কেন এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গেলেন?!
তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, তার চারপাশের ভূখণ্ড দিনে দিনে সংকীর্ণ হয়ে আসছে। তিনি অনুভব করছিলেন, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক কমে গেছে। এখন চারিদিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির জয়জয়কার। তিনি স্পষ্টতই প্রত্যক্ষ করছিলেন যে, আশেপাশের যেসব আমির ও প্রশাসক একসময় তার আনুগত্য স্বীকার করত, তারা এখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে এবং তার আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি ধারণা করছিলেন যে, এ সবকিছুই ঘটছে তার শক্তি ও ক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়। (৫০৯)
সুলতান মাসউদ সব সময় তার ক্ষমতা, সালতানাত ইত্যাদি নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিষয়ে সর্বদা বিস্মৃতির ভান করেছেন, অজ্ঞতার ভান করেছেন মুসলমানদের বিপদ সম্পর্কে। আর এখন তিনি এমন এক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন, যা তাকে, ক্রুসেডারদেরকে ও শয়তানকে ছাড়া আর কাউকে সন্তুষ্ট করবে না! নিঃসন্দেহে এ বড় দুর্যোগ!
ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. চিন্তার সাগরে ডুবে যান। তিনি ভাবতে থাকেন, কী করবেন?
অবশেষে তিনি এমন সিদ্ধান্তেই উপনীত হন, যা এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি সঠিক ছিল।
এই সংকটের সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান ছিল যেকোনো মূল্যে এমনকি সুলতান মাসউদের সামনে বিনীত হয়ে এবং তার সালতানাত ও ক্ষমতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করে হলেও তার সন্তুষ্টি কিনে নেওয়া। অথচ সকলেই জানে যে, নিশ্চিতভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি সুলতান মাসউদের চেয়ে অনেক গুণ শক্তিশালী। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে পারিপার্শ্বিক কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে সময় নষ্ট করার সুযোগ ছিল না। তা ছাড়া তিনি তো কোনো উপাধি বা সম্মানের প্রতি লালায়িত নন। তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তিনি চান তার এই প্রচেষ্টায় কোনো কিছুই যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়; তা যেকোনো বিষয়ই হোক না কেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে এই সংবাদ পৌঁছার অব্যবহিত পরেই তার পুত্র সাইফুদ্দিন গাজি পিতাকে একই সংবাদ অবহিত করতে বাগদাদ থেকে পালিয়ে মসুলে চলে আসেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার বড় পুত্র সাইফুদ্দিন গাজিকে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সুলতান মাসউদের খেদমতে রেখে দিয়েছিলেন। এটি ছিল তার একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে তিনি সুলতানের নৈকট্য অর্জন এবং অকল্যাণ থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাচ্ছিলেন। তা ছাড়া সাইফুদ্দিন গাজি সুলতানের দরবারের বিভিন্ন কর্মতৎপরতার সংবাদ তার পিতার কাছে পৌঁছিয়ে দিতেন। সাইফুদ্দিন যখন সুলতান মাসউদের দরবারের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন, তখন কালবিলম্ব না করে তার পিতাকে সতর্ক করার জন্য সেখান থেকে পালিয়ে মসুলে চলে আসেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এক বিস্ময়কর আচরণ করেন। তিনি পুত্রকে সাক্ষাতের অনুমতিদানে অস্বীকৃতি জানান এবং তাকে সুলতানের কাছে ফেরত পাঠান। ইমাদুদ্দিন জিনকি পুত্রের সঙ্গে নিজের পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহকও প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক সুলতান মাসউদের কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির বার্তা পৌঁছিয়ে দেয়। বার্তায় ইমাদুদ্দিন জিনকি বলেন, 'আমার পুত্র সুলতানকে আমার প্রতি অপ্রসন্ন ও বিরাগভাজন হতে দেখে ভয়ে পালিয়ে চলে এসেছিল। আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই তাকে আবার সুলতানের খেদমতে পাঠিয়ে দিলাম। সে তো আপনার গোলাম। আমার পুরো রাজ্যই তো আপনার!'
ইবনুল আছির লিখেছেন, ‘তার এ আচরণ সুলতানের মনে বিরাট প্রভাব ফেলে।’ (৫৪০)
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত প্রভাবিত হন। হয়তো তিনি মনে করেছিলেন যে, এটি তার প্রতি ইমাদুদ্দিন জিনকির বাস্তব আনুগত্য অথবা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এটি সম্পূর্ণই একটি কূটনৈতিক প্রতারণা। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তার পক্ষে এরপরও ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। এরপরও যদি তিনি জিনকির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, তাহলে সাধারণ মুসলিম জনগণ কিছুতেই তার প্রতি দয়া করবে না। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতি সুস্পষ্ট ভাষায় আনুগত্য প্রকাশ করায় তিনি বাহ্যত যুদ্ধের বৈধতা ও যৌক্তিকতা হারিয়ে ফেলেছেন।
এভাবেই সুলতান মাসউদ তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি এই আকস্মিক দুর্যোগ হতে নিষ্কৃতি লাভ করেন। এবার তিনি পূর্ণ মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন এডেসা অভিমুখে।
টিকাঃ
৫০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৯।
৫০৮. প্রাগুক্ত, ৯/৩২৮।
৫০৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৮।
৫৪০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৮-৩২৯।
📄 আল্লাহপ্রদত্ত মহান বিজয়
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি জানতেন, এডেসার দুর্গগুলো অত্যন্ত দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত। তিনি এও জানতেন যে, ২য় জোসেলিন ও তারা সৈন্যরা চাইলেই এসব মজবুত দুর্গে অবস্থান গ্রহণ করে তার আক্রমণ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে। বিগত পঞ্চাশ বছরের মুসলিম নেতৃবৃন্দের পূর্ব অভিজ্ঞতাও একে সমর্থন করছিল। আর তাই মৌলিকভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল এমন আকস্মিক সময়ে এডেসায় হামলা চালানো, যখন নগরীটি শাসক ও সৈন্যবাহিনীশূন্য থাকবে। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি কি এমন সুযোগ আসার প্রতীক্ষায় বসে থাকবেন? এর জন্য তো দীর্ঘ দিনও দেরি করতে হতে পারে। তিনি তো জানেন না, আগামী দিনগুলো তার জন্য কী বার্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে! ইমাদুদ্দিন জিনকির এমন কিছু করতে হবে, যাতে ২য় জোসেলিন দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত হন। কিন্তু তাকে মোটেও ঘাবড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, ২য় জোসেলিন যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রতি মোটেও আগ্রহী নন; তিনি পছন্দ করেন আরাম ও বিলাসিতা।
কী করা যায় তাহলে?! ইমাদুদ্দিন জিনকি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি প্রথমে ২য় জোসেলিনের তৎকালীন মিত্র কারা আরসালানের শাসনাধীন কোনো দুর্গে আক্রমণ করতে যাওয়ার ভান করবেন। বাস্তবেও তিনি এডেসার নিকটবর্তী সে অঞ্চলে বাহিনী নিয়ে রওনা হবেন। এর পাশাপাশি তিনি বাতাসে খবর ছড়িয়ে দেবেন যে, তার সহায়তায় শীঘ্রই আলেপ্পো থেকে একটি বাহিনী রওনা হবে। তিনি আশা করছিলেন, এ সংবাদ পেয়ে ২য় জোসেলিন আলেপ্পো থেকে আগত সামরিক সহায়তার পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নিজ দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত হবেন। ২য় জোসেলিন যখন এডেসা থেকে বের হয়ে দূরে চলে আসবেন, তখন হঠাৎ করেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার গতিপথ পরিবর্তন করবেন এবং উরতুকিদের অঞ্চল রেখে সরাসরি এডেসায় পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করবেন। আর এভাবে হয়তো এডেসা নগরীর পতন ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে! (৫৪১)
এটি ছিল একটি মানবিক পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা। ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে এতটুকুই করার ছিল। দার্শনিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলে এক্ষেত্রে এমন হাজারো প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা তার পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং সফলতার পথ বন্ধ করে দিতে পারে। হতে পারে ২য় জোসেলিন দ্বিধান্বিত হয়ে আর বের হবেন না। হতে পারে তিনি ইচ্ছা করেই তার মিত্রকে সাহায্য করার বিষয়টি মনে না থাকার ভান করবেন। হতে পারে কারা আরসালান ইমাদুদ্দিন জিনকির পথ রুখে দাঁড়াবেন; ফলে তিনি উপযুক্ত সময়ে এডেসায় পৌঁছতে ব্যর্থ হবেন। এমন আরও অনেক কিছুই হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই আল্লাহ তাআলা চাননি। আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, তার মুমিন বান্দাদের ওপর নুসরত ও সহায়তা অবতীর্ণ করবেন। তাই তিনি যাবতীয় অবস্থান ও পরিস্থিতিকে মুসলমানদের কল্যাণের দিকেই পরিচালিত করেন এবং পথের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেন। ফলে সবকিছুই পরিচালিত হয় ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনামতো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। এ তো জগৎ-সংসারের প্রতিপালকের সিদ্ধান্ত! পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
إِنَّمَا أَمْرَةً إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
তার ব্যাপার তো এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন কেবল বলেন, 'হয়ে যাও'। অমনি তা হয়ে যায়। [সুরা ইয়াসিন: ৮২]
৫৩৯ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসের শেষ দিকে (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) ইমাদুদ্দিন জিনকি বিশাল এক বাহিনী নিয়ে মসুল থেকে এডেসা রাজ্য অভিমুখে রওনা হন। তিনি তার সকল সেনাপতি ও সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ যেন এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে যোগদানে বিরত না থাকে। আর তাই সকলে তার সঙ্গে এ অভিযানে বের হয়। তিনি তার সেই বাহিনী নিয়ে রওনা হন, যা প্রস্তুত করার জন্য তার পুরো জীবন ব্যয় করেছেন।
২য় জোসেলিন ও তার গুপ্তচররা যেন মনে করে যে, তিনি এডেসার উদ্দেশে বের হননি এবং এডেসায় অভিযান পরিচালনার চিন্তাও করছেন না, এজন্য তিনি তার বাহিনী নিয়ে উরতুকিদের শাসনাধীন আমিদ নগরী অভিমুখে অগ্রসর হন। ২য় জোসেলিন পুরোপুরি প্রতারিত হন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তো বিগত ছয় বছর করে জাযিরা অঞ্চলে উরতুকিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই পুরোপুরি ব্যস্ত ছিলেন। আর তাই এ অভিযান নতুন কিছু নয়; আরেকটি উরতুকি দমন অভিযান! ইমাদুদ্দিন জিনকি যেভাবে পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই ২য় জোসেলিন তার বাহিনী নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং আলেপ্পো থেকে আগত সামরিক সহায়তার পথ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে দক্ষিণে অগ্রসর হন। ইমাদুদ্দিন জিনকির গোয়েন্দারা দ্রুত এ সংবাদ তার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি তৎক্ষণাৎ গতিপথ বদলে ফেলেন এবং এডেসা অভিমুখে অগ্রসর হন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজে এক পথে রওনা হন আর তার হাজিব সালাহুদ্দিন ইয়াগিসিয়ানিকে অন্য পথে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, পথে যদি ক্রুসেডার গুপ্তচররা ওত পেতে থাকে, তবে তাদেরকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করে ফেলা। মুসলিম বাহিনী অধিকাংশ সময় রাতের অন্ধকারে পথ চলে।
যে রাতে মুসলিম বাহিনী এডেসার কাছাকাছি পৌঁছায়, সে রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। শীতও ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি; বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্রুসেডার গুপ্তচরদের নজরদারির ক্ষেত্রে।
একসময় রাতের ঘন অন্ধকার দূরীভূত হয়; ভোরের উষায় উদ্ভাসিত হয় দিদিগন্ত।
৫৩৯ হিজরি সনের ২৮ রবিউস সানি।
১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ নভেম্বর। (৫৪২)
ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হতেই এডেসা নগরীর অভ্যন্তরে অবস্থানরত ক্রুসেডার সৈন্যরা আবিষ্কার করে, মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে এডেসা ঘিরে ফেলেছে! (৫৪৩)
এই ভীতিকর সংবাদ এডেসার শাসক ২য় জোসেলিনের কাছেও পৌঁছে যায়। তবে বড় দেরি করে! তিনি এডেসায় ফিরে সুবিশাল মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভীত হয়ে পড়েন। এর পরিবর্তে তিনি এডেসা রাজ্যভুক্ত তিল-বাশির নগরীতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এডেসা নগরী ও তিল-বাশির নগরীর মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল ফুরাত নদী। ২য় জোসেলিন চাচ্ছিলেন ঘটনাপ্রবাহের যথাসম্ভব নিকটে অবস্থান করে শুরু থেকে প্রতিটি পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত অবগত হতে এবং সুযোগমতো উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। অধিকন্তু ফুরাত নদীর প্রতিবন্ধকতার কারণে তিল-বাশির অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। পরিস্থিতির দাবি মেনে তাকে যদি পালাতেও হয়, ফুরাত তাকে পালানোর যথেষ্ট সময়ের ব্যবস্থা করে দেবে! (৫৪৪)
২য় জোসেলিন এর পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যদিও এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল; কিন্তু তিনি তার কাছে দ্রুত সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। ওদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অবস্থান যদিও এডেসা থেকে অনেক দূরে, অধিকন্তু রাজ্যটি তখন ছায়াশাসক মেলিসেন্ডের দুর্বল শাসনে পরিচালিত হচ্ছিল, তথাপি তিনি মেলিসেন্ডের কাছেও একটি সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন। (৫৪৫)
এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স অবশ্য কিলিকিয়া অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ২য় জোসেলিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। (৫৪৬) আর বাইতুল মুকাদ্দাস প্রশাসনের হর্তাকর্তা মেলিসেন্ড তার অধীনস্থ নাবলুস অঞ্চলের প্রশাসক ফিলিপ ও জালিল অঞ্চলের প্রশাসক অ্যালিন্যান্ড (Elinand)-এর নেতৃত্বে দ্রুত একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বের কারণে তারা যতক্ষণে এ অঞ্চলে পৌঁছায়, ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে! (৫৪৭)
ইমাদুদ্দিন জিনকির জিহাদি অভিযান সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপকভাবে জিহাদি চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। আর তাই ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী মুজাহিদ মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ফলে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা গণনাতীত পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
নগরীর অভ্যন্তরে যেন কোনো ধরনের সাহায্য-সহায়তা পৌঁছতে না পারে, এ উদ্দেশ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসায় পৌঁছার সকল পথ বন্ধ করে দেন। এই মহান দুঃসাহসী বীর নগরপ্রাচীরের পাশে ভারী ভারী অবরোধসামগ্রী স্থাপন করেন, যার মধ্যে ছিল গোটা দশেক মিনজানিক। এরপর তার নির্দেশে নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে একটানা গোলাবর্ষণ শুরু হয়। অবরোধের দিনগুলোতে এক মুহূর্তের জন্যও গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়নি। (৫৪৮)
নগরপ্রাচীরের ভেতরে অবস্থানরত এডেসাবাসী প্রমাদ গুনতে থাকে। তারা অনুভব করে, চতুর্দিক থেকে তারা কঠিন বিপদে আটকে গেছে। অধিকাংশ যোগ্য সেনাপতিই শাসক জোসেলিনের সঙ্গে নগরের বাইরে রয়ে গেছে। নগরের অভ্যন্তরে এমন কোনো সামরিক যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি নেই, যে এই কঠিন মুহূর্তে সকলকে নেতৃত্ব দিতে পারে। অবশেষে খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাই প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিতে অগ্রসর হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাথলিক বিশপ ২য় হিউ। তার সঙ্গে ছিলেন আর্মেনীয় বিশপ জন ও ইয়াকুব গোষ্ঠীয় বিশপ বাসিল। সম্ভবত মুসলিম সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা নগরীর অভ্যন্তরে নিজস্ব গুপ্তচর রেখেছিলেন। তাদের মাধ্যমে এ সংবাদ অবগত হয়ে তিনি খ্রিষ্টানদের এই জোট ভেঙে ফেলার মনস্থ করেন। (৫৪৯) ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রাচ্যকেন্দ্রিক দুই বিশপ অর্থাৎ আর্মেনীয় ও ইয়াকুবি বিশপের কাছে গোপনে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে নিরাপত্তার বিনিময়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন। তারা উভয়ে প্রথমে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও শেষদিকে আত্মসমর্পণে রাজি হয়। কিন্তু ক্যাথলিক বিশপ ২য় হিউ প্রতিরোধের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং তাদের দুজনকেও সামরিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করেন। (৫৫০)
দিনে দিনে আহারসামগ্রী ও রসদসম্ভার ফুরিয়ে যেতে থাকে। এডেসা নগরী উপনীত হয় অতি কঠিন এক পর্যায়ে। অবরোধও এত দুর্ভেদ্য ছিল যে, না বাইরে থেকে শাসক ২য় জোসেলিনের ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল, না ভেতরের কারও সূক্ষ্ম সামরিক প্রহরা ভেদ করে বের হওয়া সম্ভব ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীতে প্রবেশের সকল পয়েন্টে কঠিন প্রহরার ব্যবস্থা করেছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে নগরপ্রাচীর ধ্বংস করার জন্য 'খননকারী ফোর্স' নামে একটি বিশেষ বাহিনী ছিল। এবার এই বিশেষ বাহিনীটি অগ্রসর হয়ে প্রচণ্ড উদ্যমে নিজেদের কাজ শুরু করে। গোলাবর্ষণকারীরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল। সময়ের পরিক্রমায় বিজয়ের সুবাতাস বইতে শুরু করে। প্রতিপক্ষের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখেও একসময় নগরপ্রাচীরের একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহর পথের মুজাহিদরা এবার দ্বিগুণ উৎসাহে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এক মুহূর্তের জন্যও কাজ বন্ধ ছিল না। আপন আপন সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয়ে কেউ সামান্য ত্রুটি করছিল না।
অবরোধ শুরু হওয়ার আটাশ দিন পর(৫৫১) ৫৩৯ হিজরি সনের ২৬ জুমাদাল উখরা (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর) (৫৫২) আল্লাহর হুকুমে নগরপ্রাচীরের একটি অংশ ধসে পড়ে! (৫৫৩)
মুসলিম বাহিনীর উদ্দীপনা যেন নবোদ্যমে জেগে ওঠে। চতুর্দিক থেকে তাকবিরধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে। প্রাচীরের ভাঙা অংশ দিয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা স্রোতের ন্যায় সুরক্ষিত নগরীর ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ভেতর থেকে নগরদ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয়। এবার সুবিশাল মুসলিম বাহিনী বীর সেনাপতি ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্বে ভেতরে প্রবেশ করে। মুসলিম বাহিনী নগরীর ভেতরে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনরত ক্রুসেডার বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সবার আগে ক্রুসেডারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বয়ং ইমাদুদ্দিন জিনকি। (৫৫৪) অল্প সময়ের মধ্যেই নগরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ধুলোমেঘে ঢেকে যায় সবকিছু। পথে-ঘাটে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। এখানে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে লাশ পড়ে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলমানরা প্রতিটি প্রাচীর, নিরাপত্তা-চৌকি ও নগরদ্বারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। নগরীর অভ্যন্তরে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার নিহত ক্রুসেডারের মৃতদেহ বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেন।
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
(সুতরাং হে মুসলিমগণ! প্রকৃতপক্ষে) তোমরা তাদেরকে (অর্থাৎ কাফিরদেরকে) হত্যা করোনি; বরং আল্লাহ-ই তাদেরকে হত্যা করেছিলেন। এবং (হে নবী!) আপনি যখন তাদের ওপর মাটি নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন তা আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহ-ই নিক্ষেপ করেছিলেন। [সুরা আনফাল: ১৭]
বিশপ ২য় হিউ নিহত হয়ে সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট হতে থাকেন। তার পতনের ফলে ক্রুসেডারদের মনোবল পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তারা পালিয়ে নগরের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলিম সৈন্যরা নগরীর প্রতিটি স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। তারা প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও বন্দি লাভ করে। মুসলিম বাহিনীর একটি শক্তিশালী রেজিমেন্ট দুর্গ অবরোধ করার জন্য অগ্রসর হয়। দুদিন না যেতেই দুর্গটিরও পতন ঘটে। ইমাদুদ্দিন জিনকি দুর্গে অবস্থানকারী ক্রুসেডারদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। অপরদিকে আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। (৫৫৫)
নিঃসন্দেহে দিনটি ছিল মহান আল্লাহর অনুগ্রহ-দানে সিক্ত একটি দিন। ইসলামি ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন!
যখন নগরজুড়ে মুসলমানদের সুস্পষ্ট প্রাধান্য প্রতিভাত হয় এবং পুরো নগরীতে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দমন অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং সামরিক ক্রুসেডারদের ব্যতীত সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। যোদ্ধা ক্রুসেডারদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাদের নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়।
আর্মেনীয় ও ইয়াকুবিদের ক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অথচ তারাও ক্রুসেডারদের সঙ্গে নগরীর প্রতিরক্ষায় শরিক ছিল। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের অবস্থান বিবেচনা করে উপলব্ধি করেন যে, তারা বাধ্য হয়ে এতে শরিক ছিল। এ কারণেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের প্রতি মার্জনার আচরণ করেন। (৫৫৬)
টিকাঃ
৫৪১. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরী, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/১৪৩।
৫৪২. অগ্রগণ্য মতানুসারে এডেসা অবরোধ শুরু হয় ১ জুমাদাল উখরা (২৮ নভেম্বর)। [সম্পাদক]
৫৪৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩১ ও Eliasseff: op. cit. 11, pp. 379-380.
৫৪৪. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৭-৭৩৮।
৫৪৫. Stevenson: op. cit., p. 149.
৫৪৬. রানচিমান, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৩৮০।
৫৪৭. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৯।
৫৪৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩১-৩৩২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৯।
৫৪৯. Nerses, Shnorhail: Sur la Prised Edesse Doc. Arm Vol. 1, pp. 247-255.
৫৫০. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৮-৭৩৯।
৫৫১, মূলত ছাব্বিশ দিন পর। [সম্পাদক]
৫৫২, আরেক মতানুসারে এডেসার পতন ঘটে ৬ জুমাদাল উখরা (৩ ডিসেম্বর)। [সম্পাদক]
৫৫০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩২।
৫৫৪, প্রাগুক্ত, ৯/৩৩১।
৫৫৫. L'AnoymeSyriaque, p. 282.
৫৫৬. উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৭৩৯ ও ইবনুল ইবরি, তারীখুয-যামান, পৃষ্ঠা: ১৫৬-১৫৭।