📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 নুসায়বিন ষড়যন্ত্র

📄 নুসায়বিন ষড়যন্ত্র


এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি এ দুটি বিষয়কেই তার মূল কর্মব্যস্ততা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইসলামি ভূখণ্ড থেকে বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রস্থানের পরবর্তী পাঁচ বছর এ দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে পূর্ণ শক্তি ব্যয় করেন।
ইমাদুদ্দিন যেমন ধারণা করেছিলেন, হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিভিন্ন সমস্যা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। ইমাদুদ্দিনের বিভিন্ন দান-অনুদানেও হুসামুদ্দিন তুষ্ট ছিলেন না। তিনি অনুভব করছিলেন, এভাবে বিজয়ধারা অব্যাহত রাখলে ইমাদুদ্দিন জিনকি অচিরেই এ অঞ্চলের একক নেতায় পরিণত হবেন। স্বভাবতই এতে হুসামুদ্দিনের স্বপ্ন মাঠে মারা যাবে। এ চিন্তা থেকেই হুসামুদ্দিন অত্যন্ত দুঃসাহসী ও ভয়াবহ এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি নুসায়বিনে ইমাদুদ্দিন জিনকির নিযুক্ত আমির আবু বকরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ইমাদুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করেন। আমির আবু বকর ইমাদুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং তাকে বিরাট সমস্যায় ফেলে দেন। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি যে, ৫২৪ হিজরি সনে ইমাদুদ্দিন জিনকি নুসায়বিনকে আপন রাজ্যভুক্ত করার পূর্বে নগরীটি হুসামুদ্দিনের অধিকারে ছিল।
আবু বকর বিদ্রোহ করলেও ইমাদুদ্দিন জিনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। আমির আবু বকর পালিয়ে হুসামুদ্দিনের কাছে আশ্রয় নেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি হুসামুদ্দিনের কাছে আবু বকরকে তার হাতে সোপর্দ করার দাবি জানান। কিন্তু হুসামুদ্দিন তা প্রত্যাখ্যান করেন। একে কেন্দ্র করে দু-পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা, দেনদরবার চলতে থাকে। কিন্তু হুসামুদ্দিন আবু বকরকে হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। বাধ্য হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার তার মিত্র হুসামুদ্দিনকে সামরিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার হুমকি দেন। হুসামুদ্দিন তখন একটি মধ্যবর্তী সমাধান গ্রহণ করেন এবং সুলতান মাসউদকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করে আবু বকরকে তার হাতে সোপর্দ করেন। তবে সুলতান মাসউদ চিন্তা করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে কোনো ধরনের দরকষাকষি করে লাভ হবে না। আর এখন ইমাদুদ্দিনের সঙ্গে বিবাদে জড়ালে তা মোটেও সুলতানের স্বার্থে প্রবাহিত হবে না। তাই তিনি পারস্পরিক হৃদ্যতার নিদর্শন হিসেবে আবু বকরকে ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে তুলে দেন! এটি ৫৩৩ হিজরি সনের ঘটনা।
এভাবেই নুসায়বিন সমস্যা ও আমির আবু বকর সমস্যার সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এর মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকি জাযিরা অঞ্চলের পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। অবশ্য এরপরও তিনি হুসামুদ্দিনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে তাকে মৃদু তিরস্কার করেই ক্ষান্ত থাকেন। পরিস্থিতিও ইমাদুদ্দিনকে সহায়তা করে। এ সময়ই রুকনুদ্দৌলা দাউদ হুসামুদ্দিনের রাজ্যের কিছু এলাকায় হামলা চালালে বাধ্য হয়ে হুসামুদ্দিন ইমাদুদ্দিনের সহায়তা কামনা করেন। (৫০৩) ইমাদুদ্দিনও একে কাজে লাগিয়ে হুসামুদ্দিনের সঙ্গে পুনরায় মৈত্রীচুক্তি করেন। (৫০৪) ফলে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানই এ অঞ্চলের মূল সমস্যা হিসেবে বাকি থাকেন।
এ বছরই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে হাররান-পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়। হাররানে নিযুক্ত ইমাদুদ্দিনের প্রশাসক সুতকিন কারজি নামক জনৈক আমির বিদ্রোহ করলেও হঠাৎ করেই ৫৩৩ হিজরি সনে মৃত্যুবরণ করে। ফলে নগরীটি শান্তিপূর্ণভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্বে ফিরে আসে। (৫০৫)

টিকাঃ
৫০৩. ইবনুল আযরাক আল-ফারিকি, তারীখুল আযরাকিল-ফারিকি আ'লা হামিশি যায়লি তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৭।
৫০৪. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-জিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১৩।
৫০৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭১।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দামেশক অবরোধ

📄 দামেশক অবরোধ


জাযিরা অঞ্চলে যখন তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই দামেশকে শুরু হয় পট পরিবর্তন!
দামেশকের পথে থাকা অবস্থায়ই তার কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, এডেসা রাজ্যে একটি গোপন ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেখানকার কিছু আর্মেনীয় নেতা ২য় জোসেলিনের সঙ্গে গোপনে পরামর্শ করেছে যে, এডেসায় অবস্থানকারী মুসলিম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ধ্বংস করে সেখানে পুনরায় ক্রুসেড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হবে!
পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, ইমাদুদ্দিন জিনকি দামেশকের শাসক শিহাবুদ্দিন মাহমুদের মা যামরাদ খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন। দামেশকের রাজপ্রাসাদে যামরাদ খাতুনের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি আশা করেছিলেন, একে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সহজে দামেশককে নিজ রাজভুক্ত করতে পারবেন। কিন্তু ৫৩৩ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে সংবাদ আসে যে, শিহাবুদ্দিন মাহমুদ তার প্রশাসনের জনৈক কর্মকর্তার হাতে নিহত হয়েছেন! এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে দামেশকের সেনাপ্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি মুইনুদ্দিন আনুরের ভূমিকা থাকা মোটেও অসম্ভব নয়। (৫০৬) পরবর্তী ঘটনায় সন্দেহটি আরও দৃঢ়তা লাভ করে। মুইনুদ্দিন আনুর এ সময় শিহাবুদ্দিনের কোনো সহোদর ভাইয়ের পরিবর্তে ক্ষমতায় বসান তার বৈমাত্রেয় ভাই জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বুরিকে। জামালুদ্দিন (ইমাদুদ্দিন জিনকির স্ত্রী) সাফওয়াতুল মালিক যামরাদ খাতুনের পুত্র নন।
এর মাধ্যমে মুইনুদ্দিন আনুর নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে, দামেশক প্রশাসনের একচ্ছত্র ক্ষমতা তার হাতেই থাকবে এবং তিনি যামরাদ খাতুনকে প্রভাব-কর্তৃত্ব থেকে দূরে রাখতে পারবেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন তার স্বামী ইমাদুদ্দিন জিনকিও দামেশক প্রশাসনের নাড়ি-নক্ষত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন না। অধিকন্তু নতুন শাসক জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ দুর্বল হওয়ায় সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুইনুদ্দিনের হাতে চলে আসবে এবং তিনিই দামেশকের প্রকৃত শাসনকর্তায় পরিণত হবেন।
সবকিছু মুইনুদ্দিন আনুরের প্রত্যাশামতোই এগিয়ে চলে। জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ দামেশক প্রশাসনের কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দেন। বরং তিনি মুইনুদ্দিনকে গুরুত্বপূর্ণ বালাবাক্কু নগরীর জায়গির-ক্ষমতাও প্রদান করেন। উত্তর দিক থেকে দামেশকগামী পথের ওপর বালাবাক্কুর নিয়ন্ত্রণ ছিল। দামেশকের উত্তরে বালাবাক্কুই ছিল একমাত্র নগরী, যা তখন পর্যন্ত ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়নি। তার হাতে বালাবাক্কুর পতন ঘটলে দামেশকের পথ তার জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যাবে। (৫০৭)
এই অস্বস্তিকর সংবাদ ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে পৌঁছায়। এর ফলে তার দামেশকে রাজনৈতিক পন্থায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন মসুলে ছিলেন। এর অল্প কদিন পরই তার কাছে আলেপ্পো থেকে স্ত্রী যামরাদ খাতুনের পাঠানো একটি পত্র এসে পৌঁছায়। পত্রে যামরাদ খাতুন তাকে দামেশক অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করে পুত্র শিহাবুদ্দিন হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ এবং হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার অনুরোধ জানান। (৫০৮) প্রায় একই সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে উপস্থিত হন দামেশকের নতুন শাসক জামালুদ্দিন মুহাম্মাদের ভাই বাহরামশাহ বিন বুরি। (৫০৯) তিনি মসুলে পৌঁছে তাকে সাহায্য করার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অনুরোধ জানান এবং অঙ্গীকার করেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির সহায়তায় তিনি দামেশকের কর্তৃত্ব লাভ করলে ইমাদুদ্দিন জিনকির মিত্রে পরিণত হবেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সবগুলো অংশকে পরস্পর জোড়া লাগিয়ে করণীয় নির্ণয়ে সচেষ্ট হন। তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, এখন তার মোটেও সময় নষ্ট করা সমীচীন হবে না। তিনি তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন! এটি ৫৩৩ হিজরি সনের জিলকদ মাসের (১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসের) ঘটনা।
দামেশক অভিমুখে রওনা হওয়ার পর পথিমধ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন যে, বালাবাক্কুর পতন না ঘটিয়ে দামেশক অবরোধে অগ্রসর হওয়ার অর্থ নিজ বাহিনীকে নিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। কারণ, তখন তিনি দামেশকের বাহিনী ও বালাবাক্কুর প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাঝে পড়ে যাবেন। যথা চিন্তা, তথা কর্ম! ইমাদুদ্দিন জিনকি তার গতিপথ বদলে এবার বালাবাক্কু অভিমুখে রওনা হন এবং গন্তব্যে পৌঁছে জিলহজের ২০ তারিখে বালাবাক্কু অবরোধ করেন। তিনি বালাবাক্কুর চারপাশে চৌদ্দটি মিনজানিক স্থাপন করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রথমে নগরবাসীকে যুদ্ধ ব্যতিরেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেও তারা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। বাধ্য হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি আক্রমণের পথ অবলম্বন করেন। তার নির্দেশে বালাবাক্কুর নগরপ্রাচীর লক্ষ্য করে মিনজানিকগুলোর মাধ্যমে রাতদিন গোলা নিক্ষেপ করা হতে থাকে এবং নগরীর চারপাশে অবরোধ আরও কঠিন ও দুর্ভেদ্য করে তোলা হয়। বালাবান্ধুবাসী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ধীরে ধীরে তাদের শক্তি দুর্বল হতে থাকে। অবশেষে একটানা চল্লিশ দিনেরও অধিক সময় অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর বালাবাক্কুর পতন ঘটে। ৫৩৪ হিজরি সনের সফর মাসে (১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীটিকে নিজ রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে দামেশক রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন উত্তরের সবগুলো নগরীর ওপর ইমাদুদ্দিন জিনকির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। নগরীগুলো হলো বালাবাক্কু, হিমস, হামা, বানিয়াস ও মিজদাল। (৫১০)
ইমাদুদ্দিন জিনকি পূর্ণ এক মাস বালাবাক্কুতে অবস্থান করে নগরীটির প্রশাসন পুনঃবিন্যস্ত করেন এবং অবরোধ চলাকালে উপর্যুপরি গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত নগরপ্রাচীরগুলোর সংস্কার করেন। এরপর তিনি (সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা) নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে নগরীটির দায়িত্ব প্রদান করেন। (৫১১)
দামেশক অভিমুখে রওনা হওয়ার পূর্বে ইমাদুদ্দিন জিনকি সামরিক অবরোধের পথে অগ্রসর হওয়ার আগে শান্তিপূর্ণ পথে দামেশক-সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বিকা উপত্যকায় (The Beqaa Valley) শিবির স্থাপন করেন, এরপর দামেশকের শাসক জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বুরির কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। তিনি দামেশক শাসককে প্রস্তাব দেন যে, দামেশকের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে তুলে দেওয়া হলে বিনিময়ে তিনি জামালুদ্দিনকে হিমস ও বালাবাক্কুর কর্তৃত্ব প্রদান করবেন। কিন্তু জামালুদ্দিন ও দামেশকের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। স্বভাবতই তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মুইনুদ্দিন আনুর। বাধ্য হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার তার বাহিনী নিয়ে দামেশক অভিমুখে অগ্রসর হন এবং ৫৩৪ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) দামেশক অবরোধ করেন।
দামেশক নগরী ঘিরে দুর্ভেদ্য অবরোধ আরোপ করা হয়। একটানা কয়েক মাসের অবরোধ চলাকালে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মুইনুদ্দিন যদি প্রতিরোধের জন্য পীড়াপীড়ি না করতেন, তাহলে জামালুদ্দিন হয়তো নগরী সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতেন। দীর্ঘ অবরোধের ফলে দামেশকের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি খুব জটিল হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ৫৩৪ হিজরি সনের শাবান মাসে (১১৪০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) এক আকস্মিক ঘটনা ঘটে। দামেশকের শাসক জামালুদ্দিন হঠাৎ করেই মারা যান। তার মৃত্যুর পর দামেশকের শাসনক্ষমতা নিয়ে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহবিবাদ শুরু হয় এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ এসে যায়। কিন্তু মুইনুদ্দিন আনুর দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য মৃত শাসক জামালুদ্দিনের পুত্র মুজিরুদ্দিন আবিক বিন মুহাম্মাদকে ক্ষমতায় বসান। এরপর দামেশক নতুন করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে ইমাদুদ্দিন জিনকি অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। দামেশক অবরোধ করার পর ইতিমধ্যে ছয় মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। অবশ্য তিনি এরপরও অবরোধ অব্যাহত রাখেন। তিনি আশা করছিলেন, দামেশকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একসময় ভেঙে পড়বে এবং তখন তারা বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করবে। (৫১২)

টিকাঃ
৫০৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৯, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭২ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৯।
৫০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১০ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭২।
৫০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১০।
৫০৯. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭২।
৫১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১০, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭২, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২৬৯-২৭০ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৬।
৫১১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২৬১।
৫১২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৩, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৩।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দামেশক-ক্রুসেডার মিত্রতা

📄 দামেশক-ক্রুসেডার মিত্রতা


মজবুত অবরোধের শিকার মুইনুদ্দিন আনুর এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অবরোধ প্রত্যাহার করে দামেশক ত্যাগে বাধ্য করার জন্য নতুন এক কৌশল অবলম্বন করেন। কৌশলটি ছিল অতি নিকৃষ্ট। এর দ্বারাই আমরা সুস্পষ্টভাবে অনুমান করতে পারব মুইনুদ্দিন আনুরের স্বভাব-প্রকৃতি, নতুন শাসক মুজিরুদ্দিন আবিকের নীতি এবং সেসব জনগণের স্বভাব-চরিত্র, যারা এই প্রচেষ্টায় সমর্থন জোগাচ্ছিল। মুইনুদ্দিন আনুর এ সময় বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাকে বৃহৎ আকারের ক্রুসেডার বাহিনী নিয়ে আগমনের অনুরোধ জানান। তিনি ফাল্ককে এই বলে সতর্ক করেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি যদি দামেশক জয় করতে পারেন, তাহলে তা বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে! (৫১৩)
দেখুন, মুইনুদ্দিন আনুর কীভাবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ক্রুসেডারদের নিরাপত্তা রক্ষার চিন্তা করছেন!
এরপর তিনি রাজা ফাল্ককে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করার জন্য বিভিন্ন প্রলুব্ধকর প্রস্তাব প্রদান করেন।
কী সেই প্রলুব্ধকর প্রস্তাব?!
১. মুইনুদ্দিন আনুর ক্রুসেডার বাহিনীর যুদ্ধব্যয় বহন করবেন। তিনি এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মাসিক বিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, যা রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোকে প্রদান করা হবে!
২. ইমাদুদ্দিন জিনকির হাত থেকে বানিয়াস নগরী পুনরুদ্ধারের অভিযানে ক্রুসেডার বাহিনী দামেশক বাহিনীর সঙ্গে শরিক থাকবে। নগরীটি পুনরুদ্ধার করার পর মুইনুদ্দিন তা উপহার হিসেবে ক্রুসেডার বাহিনীর হাতে তুলে দেবেন!
৩. রাজা ফাল্ক যেন মুইনুদ্দিনের অঙ্গীকারের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখেন, তার জামানতস্বরূপ তিনি কয়েকজন মুসলিম আমিরকে ফাল্কের কাছে জিম্মি হিসেবে সোপর্দ করার প্রস্তাব দেন। যুদ্ধ শেষে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রস্থান এবং প্রতিশ্রুত উপহার বানিয়াস নগরীর কর্তৃত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তারা রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর হেফাজতে থাকবে! (৫১৪)
তৎকালে দামেশকের মুসলমানরা এতটাই লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছিল যে, তাদের বিবেক-বুদ্ধি এ ধরনের অযৌক্তিক ও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হতেও বাধা দেয়নি; বরং ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় না করার জন্য সব ধরনের ঝুঁকি বরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এমনকি এর বিনিময়ে যদি ক্রুসেডারদের সঙ্গে সুস্পষ্ট ও সরাসরি সহযোগিতা বিনিময় করতে হয়, তারা তাতেও রাজি আছে! যে মূল্যই চুকাতে হোক, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য!
বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের শাসক ফাল্ক অ্যাঞ্জো ভেবে দেখেন যে, এ তো একটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই অনেকগুলো লক্ষ্য বাস্তবায়নের এক বিনিময়হীন সুযোগ!
এর মাধ্যমে তিনি তার অহমিকার শোধ নিতে পারবেন এবং তিন বছর পূর্বে বারিনের যুদ্ধে যে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে তিক্ত পরাজয়ের স্বাদ উপহার দিয়েছিলেন, তাকে এবার পাল্টা শিক্ষা দিতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি মূল ইসলামি শক্তিকেই আঘাত করতে পারবেন আর এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করবে দামেশক বাহিনীর ন্যায় শক্তিশালী এক বাহিনী!
তার চেয়েও বড় কথা, এর মাধ্যমে তিনি লাভ করবেন শামের পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় পথে অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের অধিকারী বানিয়াস নগরীর কর্তৃত্ব।
তা ছাড়া এর মাধ্যমে দামেশক নগরীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হবে, যা ভবিষ্যতে তার জন্য নগরীটি দখল করা সহজ করে দেবে বা নিদেনপক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কারণ, দামেশক তখন বাইতুল মুকাদ্দাস এবং আলেপ্পো ও মসুলের মুসলমানদের মাঝে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হবে।
নিঃসন্দেহে এ এক সুবর্ণ সুযোগ! রাজা ফাল্ক এ সুযোগ কেন হেলায় হারাবেন!
ক্রুসেডার বাহিনী দ্রুত দামেশকের সহায়তায় ছুটে আসে। ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন যে, তিনি এক কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। কারণ, তিনি যদি ক্রুসেডার বাহিনী ও দামেশক বাহিনীর মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন, তাহলে হয়তো কোনো সামরিক দুর্যোগের শিকার হবেন। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার করে ক্রুসেডার বাহিনী দামেশকের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্বেই নিজ বাহিনী নিয়ে হাওরান অভিমুখে অগ্রসর হয়ে ক্রুসেডার বাহিনীর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন।
রাজা ফাল্ক সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি জানতে পারেন যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি তার বাহিনী নিয়ে হাওরান অঞ্চল অভিমুখে এগিয়ে আসছেন। রাজা ফাল্ক তাবারিয়া হ্রদের কাছে অপেক্ষা করতে থাকেন। তিনি একা তার বাহিনী নিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছিলেন। এদিকে মুইনুদ্দিন এবার এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের কাছে নতুন আরেকটি সাহায্যবার্তা পাঠান। রেমন্ড তৎক্ষণাৎ অবরুদ্ধ দামেশক নগরীকে উদ্ধার করার জন্য তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, এসব বাহিনী যদি একত্রে মিলিত হয়, তাহলে তার বাহিনী বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। তাই তিনি প্রত্যাগমন করে প্রথমে হিমসে, তারপর সেখান থেকে মসুলে চলে আসেন। এদিকে মুইনুদ্দিন তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে বানিয়াস নগরী অবরোধ করে নগরীটির পতন ঘটান। বানিয়াসে অবস্থানরত ইমাদুদ্দিন জিনকির অধীনস্থ প্রতিরক্ষা বাহিনী অবশ্য প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বানিয়াস নগরীর পতন ঘটিয়েই কালবিলম্ব না করে মুইনুদ্দিন তার চুক্তি পূর্ণ করেন এবং নগরীটিকে উপাদেয় লোকমার মতো রাজা ফাল্কের মুখে তুলে দেন! (৫১৫)
হায়! কী আজব কালের গল্প করছি! যে যুগে একজন মুসলমান তার সময়, প্রচেষ্টা ও জীবন ব্যয় করছে মুসলমানদের শাসন থেকে একটি মুসলিম ভূখণ্ডকে 'উদ্ধার' করতে, তারপর তা 'বন্ধু' ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দিতে!

টিকাঃ
৫১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৩-৩১৪।
৫১৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৩, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৭২ ও উইলিয়াম সুরি, তারীখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৭৮-৬৭৯।
৫১৫, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৪ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 পূর্ণ পাঁচ বছর

📄 পূর্ণ পাঁচ বছর


মসুলে ফিরে এসে ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান, এদিকে এক নতুন সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে। মসুলের পূর্ব দিকে শাহরায়ুর নগরীতে কাফজাক বিন আরসালান তাশ তুর্কমানি নামক জনৈক তুর্কমেন সেনাপতি সুসংহত অবস্থান গড়ে তুলেছে এবং তার চারপাশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারীকেও সমবেত করতে সক্ষম হয়েছে। কাফকাজের এ অবস্থান ছিল মসুলে ইমাদুদ্দিন জিনকির দুর্গের জন্য সরাসরি বিরাট হুমকি। বিষয়টি এ কারণেও উদ্বেগজনক ছিল যে, সুলতান মাসউদের সঙ্গে কাফজাকের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি আশঙ্কা করছিলেন, তিনি হয়তো সুলতান মাসউদের পক্ষ থেকে মসুল জয়ের কোনো ধরনের গোপন প্রচেষ্টার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। এ কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি কালবিলম্ব না করে শাহরায়ুর অভিমুখে অগ্রসর হন। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত শাহরায়ুর অঞ্চল ছিল অত্যন্ত দুর্গম ও সুরক্ষিত। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধ করেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন। কাফজাকের পরাজিত সৈন্যরা পালিয়ে বিভিন্ন দিকে আশ্রয় নেয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি শাহরায়ুর অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গ অবরোধ করে সবগুলোর পতন ঘটান এবং পাহাড়ি অঞ্চলটির সবগুলো কেন্দ্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা এ জাতীয় পরিস্থিতিতে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তিনি কাফজাককে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং সে তার আনুগত্যে ফিরে এলে তার সঙ্গে সদয় আচরণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বাস্তবেও কাফজাক ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে ফিরে আসেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে সাদরে স্বাগত জানান এবং ইতিপূর্বে তার হাতে যে অঞ্চলের কর্তৃত্ব ছিল, তার কর্তৃত্ব তার হাতেই তুলে দিয়ে তাকে নিজের অধীনস্থ করে নেন। কাফজাক ইমাদুদ্দিন জিনকির এই সদয় আচরণের মূল্য রক্ষা করেছিলেন। তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলেছেন এবং আজীবন জিনকি পরিবারের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন। কাফজাক ও তার পুত্রগণ পরবর্তী ষাট বছরেরও অধিক সময় অর্থাৎ হিজরি ছয়শ সনের পরও নিজেদের আনুগত্যের অঙ্গীকারে অটল ছিল। (৫১৬) এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি মার্জনা, প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি ও সদাচরণের মাধ্যমে উক্ত অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন।
৫৩৫ হিজরি সনে (১১৪০ খ্রিষ্টাব্দে) রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান হুসামুদ্দিনের শাসিত সিলভান নগরীতে আক্রমণ করেন। হুসামুদ্দিন স্বভাবমতো ইমাদুদ্দিন জিনকির সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি দ্রুত আবেদনে সাড়া দেন এবং সিলভানের ওপর থেকে চাপ সরানোর লক্ষ্যে রুকনুদ্দৌলার শাসনাধীন বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালান। ইমাদুদ্দিন হাসানকেইফের নিকটবর্তী বাহমারুদ দুর্গকে আক্রমণের জন্য বেছে নেন। তার এ নির্বাচন ছিল বুদ্ধিদীপ্ত সামরিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। কারণ, দুর্গটির নিয়ন্ত্রণভার ছিল রুকনুদ্দৌলার পুত্র কারা আরসালানের হাতে। তা ছাড়া দুর্গটি ছিল হাসানকেইফের একেবারে সন্নিকটে। সংবাদ পেয়ে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি একদিকে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বাহমারুদ দুর্গে অবরুদ্ধ তার পুত্রের নিরাপত্তা নিয়ে, অপরদিকে বাহমারুদ দুর্গের নিকটে অবস্থিত তার আবাসস্থল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ হাসানকেইফের পরিণতি নিয়ে। বাধ্য হয়ে তিনি সিলভান নগরীর অবরোধ প্রত্যাহার করে বাহমারুদ দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এর পূর্বেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্ষম হন এবং গুরুত্বপূর্ণ বাহমারুদ দুর্গের অধিকার লাভ করেন। (৫১৭) এরপর দাউদ বিন সুকমান সরাসরি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে ভীত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকির অনুকূলে চলে আসে।
536 হিজরি সনে (1141 খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকি আমিদ নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। এ সময় নগরীটির প্রশাসক আবু মানসুর ইকলিদি তার বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এর ফলে জাযিরা অঞ্চলে ইমাদুদ্দিন জিনকির অবস্থান আরও সংহত হয়। (518) কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির এই কর্তৃত্ব নতুন করে হুসামুদ্দিন তামারতাশকে অস্থির করে তোলে। তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ করে অনেক বছর পর তার প্রতিদ্বন্দ্বী রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মিত্রতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন! (519) বাস্তবেই জাযিরা অঞ্চল তখন ফিতনা ও মনোবৃত্তি চরিতার্থের উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খাচ্ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রতিপক্ষের জোট ভাঙার উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রুকনুদ্দৌলার সঙ্গে পত্রবিনিময় করে তাকে হুসামুদ্দিনকে ছেড়ে তার সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। রুকনুদ্দৌলা দাউদ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে থাকেন। তিনি উপলব্ধি করেন, ইমাদুদ্দিন জিনকি হুসামুদ্দিনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তিনি যদি ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে সংঘাত ও বিবাদের ওপর অটল থাকেন, তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি শীঘ্রই শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে তার রাজ্য দখল করে নিতে পারবেন। তা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিপূর্বে হুসামুদ্দিন তামারতাশের সঙ্গে মিত্রতা করার পর তার সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করেননি; বরং তাকে উপহার ও অনুগ্রহদান হিসেবে বিভিন্ন দুর্গ প্রদান করেছেন। হুসামুদ্দিনই মূলত ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। হতে পারে ভবিষ্যতে হুসামুদ্দিন তার সঙ্গেও প্রতারণা করবেন। সর্বদিক বিবেচনায় দাউদ বিন সুকমানের কাছে হুসামুদ্দিনের মিত্রতা ত্যাগ করে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনই শ্রেয়তর বিবেচিত হয়! (৫২০)
এভাবে জাযিরা অঞ্চলে ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তি আরও বৃদ্ধি পায় আর হুসামুদ্দিন তামারতাশ মিত্রহীন ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ইমাদুদ্দিন জিনকি এতেই ক্ষান্ত না হয়ে এরপর দক্ষিণে তার রাজ্য সম্প্রসারিত করেন এবং প্রথমে হাদিসা(৫২১) ও পরে আনা নগরীকে(৫২২) জিনকি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এর মাধ্যমে জাযিরা অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়। (৫২৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও আপন কেন্দ্রীয় শক্তিকে কাজে লাগানোর মনস্থ করেন। তিনি ৫৩৭ হিজরি সনে (১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে) দিয়ারে বকরের নিম্নভূমি ও জাযিরার উচ্চভূমিতে অবস্থিত বিভিন্ন দুর্গে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত অভিযানে বের হন। এই অভিযানে তিনি এমন অনেক স্থানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইতিপূর্বে কোনো সেলজুক সেনাপতি বা অন্য কেউ পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। তিনি তানজা, আসআরাদ ও হিযান অঞ্চলকে তার রাজ্যভুক্ত করেন। এ ছাড়াও দিউক, মাতলিস, বানসিবা ও জুলকারনাইনের মতো বিভিন্ন দুর্গও এ অভিযানে জিনকি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি এসব নগরী ও দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তার অধীনস্থ বিভিন্ন সেনাপতির হাতে ছেড়ে দেন। (৫২৪) এর ফলে জাযিরা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এমন স্তরে উপনীত হয়, যা ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। নিশ্চিতভাবেই এখন দাবি করা যায় যে, এডেসা রাজ্যের পথ পুরোপুরি নিরাপদ ও উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। একমাত্র বাকি রয়ে গেছে হুসামুদ্দিন তামারতাশের শাসনাধীন এলাকা। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকি জানতেন যে, তিনি যদি এডেসার উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করেন, দুর্বল হুসামুদ্দিনের পক্ষে কিছুতেই তাকে পথে বাধাপ্রদান সম্ভব হবে না।
জাযিরা অঞ্চলে এই ব্যাপক ও বিস্তৃত অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি কিন্তু তার সুবিশাল রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন ছিলেন না। বরং তিনি রাজ্যের যেকোনো স্থানে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ফিতনা প্রচেষ্টার প্রতি সতর্ক-দৃষ্টি রাখতেন। মসুলের পূর্ব দিকে কুর্দি হাকারিয়া গোত্র অধ্যুষিত অঞ্চলে একবার বিদ্রোহ প্রচেষ্টা সংঘটিত হলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। অঞ্চলটির নেতা ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির মিত্র আবুল হাইজা আল-হাকারি। তার মৃত্যুর পর তার নায়েব বাউ আলারুজি অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ইমাদুদ্দিন জিনকির আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান। ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত সে অঞ্চলে পৌঁছে তার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে পরাভূত করেন। তিনি বিরোধীদের মূল ঘাঁটি আশুব (Amadiya) দুর্গসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গে পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৫২৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকির সচেতনতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তিনি একই সময় আলেপ্পোর নিকটবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রুসেডারদের হামলাও মোকাবিলা করেন। আলেপ্পোর প্রতিরক্ষা বাহিনী ক্রুসেডারদের হামলা প্রতিরোধ করে। এ সময় সাতশ ক্রুসেডার যোদ্ধা প্রাণ হারায়। মুসলমানরা লাভ করে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (৫২৬)
কুর্দি মিহরানিয়া গোত্রও এ সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। গোত্রটি জাযিরা ইবনে উমরের নিকটবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গে বসবাস করত। এসব দুর্গের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাওয়াশি দুর্গ। সংবাদ পেয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত মিহরানিয়া গোত্রের মোকাবিলায় অগ্রসর হন এবং পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে তাদেরকে বশীভূত করেন। ফলে তার রাজ্যের সকল স্থানে পুনরায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে। (৫২৭) এভাবে ৫৩৭ হিজরি সনের শেষে এবং ৫৩৮ হিজরি সনের শুরুর দিকে ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদিক থেকে পূর্ণ স্থিতিশীলতার অধিকারী হন। এখন তিনি চাইলেই সেই প্রাচীন রাজ্যটিকে জয় করার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, যে রাজ্যের নাম 'এডেসা ক্রুসেড রাজ্য'!

টিকাঃ
৫১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৪-৩১৫।
৫১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩১৭, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৬, ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৯ ও ইবনুল আযরাক আল-ফারিকি, তারীখুল আযরাকিল-ফারিকি আ'লা হামিশি যায়লি তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৭।
518. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, 9/324 ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: 64।
519. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, 1/89।
৫২০. Elisself: op. cit., p. 373.
৫২১. হাদিসাতুল ফুরাত' ফুরাত নদীর মাঝে একটি দ্বীপে অবস্থিত। হাদিসা নামে আরেকটি এলাকা আছে মসুলে, যা দজলা নদীর পূর্ব তীরে যাবুল আ'লা মোহনার নিকটে অবস্থিত। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ২/২৩০।
৫২২. 'আনা' রাক্কা ও হিতের মধ্যবর্তী একটি প্রসিদ্ধ নগরী। নগরীটিকে জাযিরা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হয়। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৪/৭২।
৫২৩, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৩০, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪ ও ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাযাম, ১০/১০২।
৫২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৯।
৫২৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩২৬ ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪।
৫২৬. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৭-২৭৮।
৫২৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00