📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ
আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?
১. তিনি তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত বাইজান্টাইন বাহিনীকে ধাওয়া করতে ছুটে যান। তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর পেছনের অংশের নাগাল পেয়ে যান। তাদের সঙ্গে লড়াই হলে মুসলমানরা তাদের বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে, বন্দিও করে অনেককে। এ সময় মুসলমানরা প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। (৪৯৪) ইমাদুদ্দিন জিনকির তাড়া খেয়ে বাইজান্টাইনরা ত্রস্তপদে নিজেদের দেশে পালাতে থাকে।
২. বাইজান্টাইন বাহিনী আলেপ্পো অবরোধে যেসব ভারী ভারী অবরোধসামগ্রী ব্যবহার করেছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি সেগুলো দখলে নেওয়ার জন্য দ্রুত অগ্রসর হন। এসব অবরোধসামগ্রী তৈরিতে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছিল। তিনি অধিকাংশ অবরোধসামগ্রীই হস্তগত করতে সক্ষম হন। এসব ভারী সামগ্রী নিয়ে দ্রুত চলা সম্ভব ছিল না বিধায় বাইজান্টাইনরা বাকি সামগ্রীগুলো পুড়িয়ে ফেলে। নিঃসন্দেহে এগুলো ছিল অনেক মূল্যবান যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (৪৯৫)
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সহকারী সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানির নেতৃত্বে একটি বাহিনী কাফারতাব থেকে বাইজান্টাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে নগরীটি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইন বাহিনী যে মাসে প্রস্থান করে, সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ নগরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন (৪৯৬)
৪. ইমাদুদ্দিন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন। তিনি এই মহান বিজয়ের রেশ বাকি থাকতেই হঠাৎ ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ ইরকা দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করেন। দীর্ঘ অবরোধ ও অব্যাহত গোলাবর্ষণের পর তিনি দুর্গটি অধিকার করেন এবং সেখানে থাকা ক্রুসেড সেনাদের বন্দি করেন। (৪৯৭) এ অভিযান ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির তুখোড় সামরিক মেধার অনুপম দলিল। কারণ, স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, তিনি অভিযান চালাবেন এডেসা ও এন্টিয়কে, বাইজান্টাইন বাহিনীকে সহায়তা করার প্রতিশোধ হিসেবে। কিন্তু তিনি অভিযান চালান ত্রিপোলি রাজ্যে; যারা এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
৫. ইমাদুদ্দিন জিনকি উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধকরণের গুরুদায়িত্বও ভুলে যাননি। ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রস্থানের পরই তিনি দ্রুত পতন ঘটানোর আশায় পুনরায় হিমস অবরোধ করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সারা জীবনে কখনোই বিশ্রাম খোঁজেননি। এমনকি শাইজার নগরপ্রাচীরের কাছে এত পরিশ্রমের পরও সামান্য অবসর না নিয়ে তিনি পুনরায় অবতীর্ণ হন উম্মাহর কল্যাণের ময়দানে।
কিন্তু এবারের হিমস অবরোধকালে ইমাদুদ্দিন জিনকি ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বনের চিন্তা করেন। এতে সামান্য পরিশ্রমেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যাবে; পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বহু নগরী জিনকি রাজ্যভুক্ত করার পথ খুলে যাবে। তিনি দামেশকের অধিপতি শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির ঘনিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'রাজনৈতিক বিয়ে' সম্পাদনের পরিকল্পনা করেন। ইমাদুদ্দিন বিনিময় হিসেবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করে শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির মা সাফওয়াতুল মালিক যামরাদ খাতুনকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান!
কারও কৌতূহল হতে পারে, বিয়ের বিনিময়ে কিছু না দিয়ে তিনি উল্টো কীভাবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করতে পারেন?!
উত্তর হলো, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি বিয়ের পর স্ত্রীকে মোহর ও বিভিন্ন মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রদান করেছিলেন। তবে তিনি হিমসের কর্তৃত্ব দাবি করেছিলেন সেই মহা গৌরবের বিনিময়ে, যা তার স্ত্রী সে যুগের মহাবীর ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাজ্য শাসন করছেন। তিনি সেই দুঃসাহসী বীর, ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনের বিরুদ্ধে যার রয়েছে ধারাবাহিক বিজয়-গৌরব। এমন ব্যক্তির সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে পারা নিঃসন্দেহে অতি মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রত্যাশা পূরণ হয়। শিহাবুদ্দিন মাহমুদ এ প্রস্তাবে সম্মতি জানান। সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বিয়ে সম্পন্ন হয়(৪৯৮) এবং হিমস ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়।
টিকাঃ
৪৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৬. প্রাগুক্ত, ২/২৬৮।
৪৯৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৪।
৪৬৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৯।
📄 সৌভাগ্য ও কল্যাণে সমৃদ্ধ একটি বছর
এ সময়ের আলোচনায় সমাপ্তি টানার আগে আমরা আরেকটি বিষয় জানব। আর তা হলো ইমাদুদ্দিন জিনকি কর্তৃক কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরির নেতৃত্বে বাগদাদে সুলতান মাসউদের কাছে প্রেরিত প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টার পরিণতি!
কামালুদ্দিন শাহরাযুরি দ্রুত বাগদাদে পৌঁছে সুলতান মাসউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুলতান শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় শিথিলতা করলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তিনি তাকে তা বোঝাতে চেষ্টা করেন এবং একে কেন্দ্র করে যে তার রাজত্বও শেষ হয়ে যেতে পারে, এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করেন। তিনি সুলতানকে বলেন, 'বাইজান্টাইনরা আলেপ্পো দখল করতে পারলে ফোরাত নদী পাড়ি দিয়ে বাগদাদে পৌঁছে যাবে এবং খিলাফতের রাজধানী বাগদাদও দখল করে নেবে!'
সুলতান মাসউদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?!
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. বলেন, 'কাজি কামালুদ্দিন তার মাঝে কোনো স্পন্দনই দেখতে পেলেন না!'
অর্থাৎ সুলতান বিষয়টিকে একেবারে শীতলভাবে গ্রহণ করেন। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এক নিষ্প্রাণ জড়বস্তু; তার মাঝে কোনো প্রাণ ও প্রাণশক্তিই অবশিষ্ট নেই! তাই তার কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, কোনো আচরণগত বহিঃপ্রকাশও নেই। তার কাছে বিষয়টির যেন কোনো গুরুত্বই নেই!
কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরি ব্যর্থ মনোরথে সুলতান মাসউদের দরবার থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি এরপর সুলতানের বোধ ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তুলতে তার ওপর চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা করেন। কাজি কামালুদ্দিন তার এক সঙ্গীকে বলেন, তুমি আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে খলিফার প্রাসাদের নিকটবর্তী মসজিদে যাবে। খতিব সাহেব মিম্বরে আরোহণ করতেই তোমরা সকলে একযোগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকবে, 'হায়! ইসলামের কী হবে! হায়! দ্বীনে মুহাম্মাদির কী হবে!' এ সময় তোমরা পরিধেয় বস্ত্র ছিঁড়ে ফেলবে, মাথার পাগড়ি খুলে ছুড়ে মারবে। এরপর মাতম করতে করতে সুলতানের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হবে।
কাজি কামালুদ্দিন তার আরেক সঙ্গীকে একই নির্দেশনা দিয়ে সুলতানের মসজিদে প্রেরণ করেন।
উদ্দেশ্য ছিল বাগদাদে গণবিক্ষোভ তৈরির মাধ্যমে সুলতানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বিক্ষোভ এমন পর্যায়ের হতে হবে, যেন সুলতান বিদ্রোহের আশঙ্কা করেন এবং প্রভাবিত হন। তা ছাড়া তখনও সালতানাতের মসনদ নিয়ে ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের সঙ্গে সুলতানের পুরোনো বিরোধ জিইয়ে ছিল। জনগণের বিক্ষোভ দেখে সুলতান নিশ্চয়ই আশঙ্কা করবেন যে, দাউদ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে সাধারণ জনতাকে ক্রুসেডবিরোধী জিহাদের জন্য প্রস্তুত করবেন। নিশ্চয়ই এ চিন্তা সুলতান মাসউদকে বিরাট ঝামেলায় ফেলে দেবে।
কামালুদ্দিনের পরিকল্পনা সফল হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে, 'হায় ইসলামের কী হবে! মুহাম্মাদের দ্বীনের কী হবে!' প্রাসাদের সামনে বিপুল সংখ্যক জনতাকে দেখে সুলতান ভয় পেয়ে যান। তিনি তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দেন, 'ইবনে শাহরাযুরিকে আমার সামনে হাজির করো।' কামালুদ্দিন শাহরাযুরিকে উপস্থিত করা হলে সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'এ কোন ফিতনা শুরু করলে?!' কামালুদ্দিন নির্বিকার চিত্তে উত্তর দেন, 'আমি কিছু করিনি, আমি তো আমার ঘরেই ছিলাম। জনগণই দ্বীন ও ইসলামের কল্যাণ চিন্তায় বিক্ষোভ শুরু করেছে; তারা এই শিথিলতার পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।' এরপর সুলতান নিরুপায় হয়ে বলেন, 'যাও, জনগণকে বুঝিয়ে এখান থেকে সরাও। আর আগামীকাল এসে যত সৈন্য চাও, নিয়ে যেয়ো।'
কামালুদ্দিন বাইরে এসে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন এবং তাদেরকে জানান যে, সুলতান শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় শীঘ্রই বাহিনী প্রস্তুত করবেন। পরের দিন কামালুদ্দিন সুলতানের দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান, সুলতান ইতিমধ্যে বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেছেন! এমনকি বাহিনীর বিশালতা দেখে কামালুদ্দিন ভয় পেয়ে যান এবং আশঙ্কা করেন যে, সুলতান হয়তো ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইন বাহিনীর মোকাবিলা করার পর শাম অঞ্চলকে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নেবেন। যেহেতু ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন অনেক দূরে শাম ভূমিতে অবস্থান করছেন, তাই কাজি কামালুদ্দিন দ্রুত মসুলের আমির নাসিরুদ্দিন জাকারের কাছে পরামর্শ চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন। ফিরতি বার্তায় নাসিরুদ্দিন বলেন, 'শাম ভূমি তো নিশ্চিত কারও না কারও দখলে যাবেই। সুতরাং কাফিরদের হাতে চলে যাওয়ার চেয়ে তা মুসলমানদের হাতে যাওয়াই শ্রেয়!'
চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নাসিরুদ্দিন জাকার যেন তার নেতারই প্রতিচ্ছবি! ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন সুলতান মাসউদকে শাম অঞ্চলে আহ্বানের মনস্থ করেছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠজনদের আপত্তির জবাবে যে উত্তর প্রদান করেছিলেন, নাসিরুদ্দিনও ঠিক একই উত্তর দেন।
বাগদাদের বাহিনী প্রস্তুতি শেষে যখন যাত্রার উদ্যোগ নেয়, তখনই ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি কাজি কামালুদ্দিনকে বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্থান ও মুসলিম বাহিনীর বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন। ফলে বাগদাদ থেকে আলেপ্পোতে বাহিনী প্রেরণের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়! (৪৯৯)
এভাবে আল্লাহর তাআলার অনুগ্রহে পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে প্রবাহিত হয়। শেষ পর্যন্ত সুলতান মাসউদের বাহিনীর মুখোমুখি হতে হলে হয়তো তা আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াত।
ইতিমধ্যে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। ইমাদুদ্দিন জিনকির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র-সর্বমহলে। সবাই এখন অকুণ্ঠচিত্তে তার গুণ-কীর্তি এবং চেষ্টা ও অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করে। মুসলমানদের মিম্বরে মিম্বরে তার কল্যাণ কামনায় দোয়া করা হয়। পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে সুলতান মাসউদ চিন্তায় পড়ে যান যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে এখন তার কী আচরণ করা উচিত। তিনি চাইলেও এখন ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন না, পারবেন না এমন কোনো নির্দেশ দিতে, যা তাকে ক্রুদ্ধ করবে। কারণ, বৃহত্তর মুসলিম সমাজ তখন নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে দাঁড়াবে। সবদিক বিবেচনা করে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিজের পক্ষে আনার এবং তার সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সেনাপতির ন্যায় আচরণ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে রাজকীয় সম্মানসূচক পরিচ্ছদ ও অন্যান্য মূল্যবান উপহার প্রেরণ করেন এবং মুসলমানদের পক্ষে এত বড় বিজয় ও সাফল্য অর্জন করায় তাকে মোবারকবাদ জানান। সুলতান তার আচরণে বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সেলজুক সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন কোনো রাজ্যের শাসক মনে করছেন না; বরং তার অধীনস্থ একজন প্রশাসক মনে করছেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার এ আচরণ মেনে নেন। কারণ, তিনি তো কোনো অর্থহীন সংঘাতে জড়াতে চান না। তিনি চান মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে নিজের সমস্ত চিন্তা ও চেষ্টা ব্যয় করতে। (৫০০)
এভাবে মুসলমানদের জন্য একের পর এক সৌভাগ্য ও কল্যাণের বার্তা বয়ে এনে ৫৩২ হিজরি সনের সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা এত দিনে চিনতে পেরেছে ঐক্য ও জিহাদের পথ; জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি এখন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন; সবার হৃদয়ে এখন ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার আশা-প্রত্যাশা।
চলমান সময়ের ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বছরটির আলোচনার ইতি টানার আগে সে বছরেরই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করছি, যা মোটেও তৎকালীন জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি; অথচ পরবর্তী সময়ে তা কেবল মুসলিম সমাজে নয়; বরং পুরো বিশ্বের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। এই ৫৩২ হিজরি সনেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম বীরপুরুষ সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি! আল্লাহর কী মহিমা! সালাহুদ্দিন আইয়ুবি যেদিন জন্মগ্রহণ করেন; সেদিনই তার পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব বাগদাদের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন বাহরুযের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক পদ থেকে অপসারিত হন। নাজমুদ্দিন আইয়ুব তার পদচ্যুতির দিন জন্মগ্রহণকারী এই সন্তানকে বাহ্যত অশুভ মনে করেছিলেন!(৫০১) তিনি বুঝতেই পারেননি, এই সন্তানের জীবনেই একদিন দ্বীন ও দুনিয়ার সমূহ কল্যাণের সন্নিবেশ ঘটবে!
এরপর নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ তিকরিত থেকে মসুলে চলে আসেন এবং মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির অধীনে কাজ করতে থাকেন। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, ৫২৬ হিজরি সনে ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর কাছে পরাজিত হয়ে মসুলে ফিরছিলেন, তখন এই নাজমুদ্দিন আইয়ুব তাকে দজলা পাড়ি দিতে সহায়তা করেছিলেন এবং তাকে কয়েকদিন নিজ দুর্গে আশ্রয় দিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করেছিলেন। এবার যখন নাজমুদ্দিন আইয়ুব তিকরিত দুর্গ থেকে বিতাড়িত হন, তখন তিনি এই দুর্যোগের সময় সাহায্যপ্রাপ্তির আশায় ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে আশ্রয় গ্রহণের চিন্তা করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি নাজমুদ্দিন আইয়ুবের প্রতি সুধারণা পোষণ করতেন। তিনি নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে সাদরে স্বাগত জানান এবং তার নেতৃত্ব-দক্ষতা যাচাই করতে তাকে কিছু জায়গিরের তত্ত্বাবধান-দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল নাজমুদ্দিনের দক্ষতা প্রমাণিত হলে তিনি তাকে সুউচ্চ কোনো পদে অধিষ্ঠিত করবেন। এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি ও নাজমুদ্দিন আইয়ুবের মধ্যে মজবুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতেকালে এ সূত্র ধরেই ইমাদুদ্দিন জিনকির পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ ও নাজমুদ্দিন আইয়ুবের পুত্র সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কত মহিমাময় সেই মহান সত্তা, যিনি এভাবেই আপন প্রজ্ঞায় জগৎ-সংসার পরিচালনা করেন!
টিকাঃ
৪৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩ ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা : ৬২-৬৩।
৫০০. হাসান ইবরাহিম হাসান, তারীখুস-সিয়াসি ওয়াদ-দীনি ওয়াস-সাক্বাফি ওয়াল ইজতিমায়ি, ৪/৭৫।
৫০১. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, ৭/১৪৪-১৪৫।