📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [এক] শত্রুপক্ষের শক্তিক্ষয়ের লক্ষ্যে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ

📄 [এক] শত্রুপক্ষের শক্তিক্ষয়ের লক্ষ্যে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ


পূর্ণ শক্তির খ্রিষ্টান বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে ইমাদুদ্দিন জিনকি এই যুদ্ধনীতি অবলম্বন করেন। তিনি তার বাহিনীর বড় একটি অংশকে শাইজার অভিমুখে প্রেরণ করতেন। খ্রিষ্টান সৈন্যরা তাদেরকে দেখে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে এলে ইমাদুদ্দিন কৌশলে পিছু হটে তাদেরকে শাইজার অবরোধকারী মূল বাহিনী থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসতেন। এরপর তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদেরকে হত্যা ও বন্দি করতেন। (৪৮১) তিনি এই কৌশল প্রয়োগ করে খ্রিষ্টান বাহিনীকে উন্মুক্ত যুদ্ধের সুযোগ না দিয়েই তাদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করতে সক্ষম হন।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দুই] খ্রিস্টান বাহিনীর রসদ সরবরাহব্যবস্থা বিচ্ছিন্নকরণ

📄 [দুই] খ্রিস্টান বাহিনীর রসদ সরবরাহব্যবস্থা বিচ্ছিন্নকরণ


ইমাদুদ্দিন জিনকি তার বাহিনীর কয়েকটি অংশকে প্রেরণ করে খ্রিষ্টান বাহিনীর পেছনের পথগুলো বন্ধ করে দেন। ফলে তাদের কাছে যুদ্ধসামগ্রী ও রসদপত্র পৌঁছা অসম্ভব হয়ে যায়। স্বভাবতই যত সময় গড়াবে, খ্রিষ্টান বাহিনীর রসদ ফুরিয়ে আসবে এবং একসময় তারা অবরোধ অব্যাহত রাখার ধৈর্য ও সাহস হারিয়ে ফেলবে। (৪৮২)

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [তিন] স্নায়ুযুদ্ধ

📄 [তিন] স্নায়ুযুদ্ধ


ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রতিপক্ষ মিত্রবাহিনীর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন এবং তাদেরকে বোঝান যে, তার বাহিনীও অনেক বড় ও বিশাল। তিনি তাদেরকে উপহাস করে লেখেন, 'তোমরা আমার ভয়ে পালিয়ে এই পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছ! সাহস থাকলে ওখান থেকে বের হয়ে উন্মুক্ত ময়দানে আমাদের মুখোমুখি হও। যদি তোমরা জিতে যাও, শাইজার তোমাদের; আর যদি আমি বিজয়ী হই, তাহলে তোমাদের অনিষ্ট থেকে মুসলমানদের চিরদিনের জন্য মুক্ত করব!' (৪৮৩)
ইমাদুদ্দিন জানতেন, তার শক্তি শত্রুপক্ষের তুলনায় অনেক দুর্বল। তারা বের হয়ে আসুক, তিনি তা চাচ্ছিলেন না। কিন্তু তিনি এসব বলে তাদের মনোবল ভেঙে দিতে চাচ্ছিলেন; তাদেরকে বোঝাতে চাচ্ছিলেন, তাদের চেয়ে তার শক্তি অনেক বেশি এবং তিনি নিজের ও নিজ বাহিনীর সামর্থ্যের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল। তার এ কৌশল প্রতিপক্ষকে ভীত করে তোলে। জনৈক ক্রুসেডার সেনাপতি যখন বাইজান্টাইন সম্রাটকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেয়, তখন সম্রাট যে উত্তর দেন, তাতে এই ভীতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্রাট ভীত কণ্ঠে উত্তর দেন, 'তোমরা কি মনে করছ, শিবিরে থাকা এই বাহিনী ছাড়া তার আর কোনো সৈন্য নেই? সে চায়, তোমরা তার মুখোমুখি হও। তখন তার সাহায্যে মুসলমানদের এত বিরাট বাহিনী এসে যাবে, যা গণনা করেও শেষ করা যাবে না।' (৪৮৪)
এভাবেই তার 'ঘাবড়ে দেওয়া'র কৌশলে প্রভাবিত হয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট ভীত হয়ে পড়েন এবং দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন。

টিকাঃ
৪৮১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২।
৪৮২. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/২৯৭-২৯৮।
৪৮৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২, শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/১২৬ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮১।
৪৮৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [চার] মিত্রশক্তির ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি

📄 [চার] মিত্রশক্তির ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি


এক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকি আরেকটি অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি প্রতিপক্ষ মিত্রবাহিনীর ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে বলেন যে, বাইজান্টাইন সম্রাট শাম অঞ্চলে কোনো একটি দুর্গ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেই এরপর তাদের হাত থেকে তাদের রাজ্যগুলো ছিনিয়ে নেবেন। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অতীত নীতি ক্রুসেডারদের অজানা ছিল না। তাদের মনে পড়ে যায় বর্তমান সম্রাট ২য় জন কম্নিনোসের পিতা ১ম অ্যালেক্সিয়াস কম্নিনোসের সঙ্গে তাদের পূর্বসূরি ক্রুসেডার নেতাদের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস। তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির বক্তব্য তাদেরকে যথেষ্ট প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়।
এতটুকুতেই ক্ষান্ত না দিয়ে এরপর তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছেও একটি বার্তা প্রেরণ করে তাকে বলেন, 'শাম অঞ্চলের ক্রুসেডাররা আপনাকে ভয় পাচ্ছে; আপনি এখান থেকে ফিরে গেলেই তারা আপনার সঙ্গে প্রতারণা করবে।' তার এ বার্তা বাইজান্টাইন সম্রাটকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। (৪৮৫) কারণ, ক্রুসেডারদের ইতিহাস বলে, অতীতে তারা কনস্টান্টিনোপল চুক্তি ভঙ্গ করে এন্টিয়ক ও কিলিকিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন নগরী নিজেদের দখলে রেখেছিল। ফলে এটা একেবারেই স্বাভাবিক যে, বিজয় লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে তারা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসবে।
এভাবে কৌশলে ইমাদুদ্দিন জিনকি মিত্রশক্তিগুলোর মনে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও সংশয় ঢুকিয়ে দেন। এক পক্ষ অপর পক্ষকে ভয় পেতে শুরু করে এবং উভয় পক্ষের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়ে।
এমন সুষম পরিকল্পনার সুষ্ঠু প্রয়োগের ফলে বাইজান্টাইনরা শাইজারে অবরোধ দীর্ঘ করার ব্যাপারে দোদুল্যমান হয়ে পড়ে। তা ছাড়া নগরটিও ছিল যথেষ্ট সুরক্ষিত; যার پتن ঘটাতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। পুরো খ্রিষ্টান বাহিনীতে হতাশা ও দ্বিধাবিভক্তি ছড়িয়ে পড়ে। কোনো সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন ছাড়াই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিহত ও বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকাও এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
মহান আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল, তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রস্থান প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত করবেন। আর তাই প্রায় একই সময়ে এমন চারটি ঘটনা ঘটে, যা খ্রিষ্টান বাহিনীর রণকৌশল রদবদলে বিরাট প্রভাব ফেলে। ঘটনাগুলো হলো-
১. সংবাদ আসে, রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান ইমাদুদ্দিন জিনকির আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন এবং একসঙ্গে পঞ্চাশ হাজার তুর্কমেন সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছেন।(৪৮৬) খ্রিস্টান বাহিনীর মনোবল আরও ভেঙে দেওয়ার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সংবাদ কৌশলে খ্রিষ্টান শিবিরে পৌঁছিয়ে দেন।
২. একই সময় সংবাদ আসে, রোমান সেলজুক ও দানিশমান্দ রাজ্যের বাহিনী একজোট হয়ে কিলিকিয়া অঞ্চলের আদানা নগরীতে হামলা চালিয়েছে।(৪৮৭) নগরটি কিছুদিন পূর্বে বাইজান্টাইনরা দখল করে নিয়েছিল। এর অর্থ হলো, বাইজান্টাইনরা সাম্রাজ্য বৃদ্ধির পরিবর্তে উল্টো সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ হারাতে যাচ্ছে।
৩. দুই ক্রুসেডার নেতা রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স ও ২য় জোসেলিনের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়! দুজনই একে অপরকে ঘৃণা করতে থাকে এবং অপরজনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ২য় জোসেলিন চিন্তা করছিলেন, বাইজান্টাইনরা যদি শাইজার ও আলেপ্পোর পতন ঘটাতে সক্ষম হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী নগরীদুটি রেমন্ডের হাতে তুলে দেয়, তাহলে তার স্বাধীনতা অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে আসবে। কারণ, তখন রেমন্ডের নতুন রাজ্যটি জোসেলিন ও বাইতুল মুকাদ্দাসের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। অথচ বাইতুল মুকাদ্দাস তাদের সকলের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছে। ওদিকে রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স তার পরিকল্পিত রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও রাজ্যটিতে তার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে প্রচুর দ্বিধান্বিত ছিলেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, এত বিশাল বাহিনীও আলেপ্পো ও শাইজার দখলের পরিকল্পনায় এখন পর্যন্ত সামান্য সফলতা অর্জন করতে পারেনি। তাহলে বাইজান্টাইন বাহিনী ফিরে যাওয়ার পর অবস্থা কী দাঁড়াবে? এসব আশঙ্কা, সম্ভাবনা ও দুশ্চিন্তা উভয় নেতাকে পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তা ছাড়া ২য় জোসেলিন রেমন্ডের বিরুদ্ধে বাইজান্টাইন সম্রাটের কান ভারী করায় উভয়ের সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটে। (৪৮৮)
৪. শাইজারের আমিরের পক্ষ থেকে বাইজান্টাইন সম্রাটের কাছে একটি সমঝোতা প্রস্তাব আসে। এতে সম্রাটকে সেই মুহূর্তে অবরোধ তুলে শাইজার ত্যাগের বিনিময়ে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়! (৪৮৯)
শাইজার শাসকের প্রস্তাব পাওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাটের চিন্তা-পরিকল্পনা নতুন করে ওলটপালট হওয়ার উপক্রম হয়। পরবর্তী করণীয় নির্ণয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। কারণ, অভিযান অব্যাহত রাখলে হয়তো তার নিজের ও বাহিনীর সমূহ ক্ষতি হতে পারে; আবার অভিযান মুলতবি করে প্রস্থান করলে তার মর্যাদা ও সম্মানে বিরাট আঘাত আসবে। তাহলে তিনি কী করবেন?
নিশ্চিত করেই বলা যায়, এ সময় তার মনমস্তিস্কে নানাবিধ চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি বিভিন্ন যুক্তি ও ঘটনাকে পাশাপাশি সাজিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা করছিলেন।
আসুন, ক্ষণিকের জন্য একসঙ্গে ঘুরে আসি বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমнинোসের ভাবনার জগৎ থেকে!
১. কোনো রকম অগ্রগতি ছাড়াই শাইজার অবরোধে ইতিমধ্যে তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে।
২. শাইজার অতি সমৃদ্ধ একটি নগরী। নগরীটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট মজবুত। তাই দীর্ঘ অবরোধ মোকাবিলা করে টিকে থাকার ক্ষমতা নগরীটির আছে।
৩. বাইজান্টাইন বাহিনী ইতিমধ্যে আলেপ্পো অবরোধে, আসারিব দুর্গে, শাইজারের নগরপ্রাচীরের সামনে এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির বিক্ষিপ্ত বেশ কিছু হামলায় প্রচুর সৈন্য হারিয়েছে। নিহতের সংখ্যা যেমন অনেক, বন্দিও হয়েছে অনেকে। আবার বিজায়া থেকে যেসব মুসলিম নাগরিককে বন্দি করা হয়েছিল, তাদেরকেও আলেপ্পোর আমির সিওয়ার আসারিব দুর্গ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত বাইজান্টাইনরা হারিয়েছে অনেক, পায়নি কিছুই!
৪. মুসলিম বাহিনীর প্রধান ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন দৃঢ়চিত্ত ও স্থিরপ্রতিজ্ঞ যে, বর্শার আঘাতও তাকে হটাতে পারে না; এমন অটল ও অবিচল যে, কিছুতেই তার সংকল্প দুর্বল হয় না; এমন অভিজ্ঞ ও পেশাদার যে, সমরনীতির প্রতিটি অধ্যায় তার আগাগোড়া রপ্ত আছে। কোনোভাবেই ভাবা যায় না যে, তিনি পরাজয় মেনে নেবেন!
৫. সম্রাটের সহযোগী ক্রুসেডার বাহিনীগুলো নিতান্ত দুর্বল। তদুপরি তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রচুর। দু-পক্ষের মাঝে পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতার সামান্য উপাদানও বিদ্যমান নেই।
৬. আদানা নগরী পতনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। (৪৯০) নগরীটি বেদখল হয়েই তো দুর্যোগ শেষ হবে না; বরং এর মধ্য দিয়ে বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। বাইজান্টাইন বাহিনী একদিকে রোমান সেলজুক ও দানিশমান্দ বাহিনী এবং অপরদিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর মধ্যে আটকে যাবে।
৭. সাবেক বাইজান্টাইন সম্রাট ৪র্থ রোমানোস (Romanos IV Diogenes) প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা অনুমান করতে না পেরে এবং সামরিক সমীকরণ মেলাতে না পেরে আরেক মহান ইসলামি বীরযোদ্ধা আলপ আরসালানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। ৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত 'মানজিকার্টের যুদ্ধ' নামে খ্যাত সেই যুদ্ধে শোচনীয় ও লজ্জাজনক পরাজয়ের খেসারত দিতে হয়েছিল সম্রাট ৪র্থ রোমানোসকে; বরং পুরো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে। এখন সম্রাট ২য় জন কমনিনোস কি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন, না সাম্রাজ্যে ফিরে গিয়ে নিজেকে ও বাইজান্টাইন বাহিনীকে রক্ষা করবেন?!
৮. এতসব ভয়াবহ জটিলতা তৈরি হয়েছে কেবল এক ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর কারণে। এখন যদি উরতুকি তুর্কমেন বাহিনীও চলে আসে, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে?! গুপ্তচরদের মাধ্যমে জানা গেছে, তাদের সৈন্যসংখ্যা পঞ্চাশ হাজার! (৪৯১) নিঃসন্দেহে বাইজান্টাইন বাহিনী তখন আরও ভয়াবহ বিপদ ও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাবে।
৯. এ সংবাদও এসেছে যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিমধ্যে বৃহৎ সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসক সুলতান মাসউদের কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছেন। (৪৯২) উনসত্তর বছর পূর্বে মানজিকার্টের যুদ্ধে বাইজান্টাইন বাহিনীকে যিনি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন, সেই আলপ আরসালানের অধস্তন পুরুষ সুলতান মাসউদের নেতৃত্বে এখন যদি বাগদাদ থেকেও বিরাট বাহিনী এসে পৌঁছায়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গড়াবে?!
১০. কোনো ধরনের সফলতা ছাড়াই বাইজান্টাইন সম্রাট যদি দেশে ফিরে যান, তাহলে নিশ্চিত করেই রাজপ্রাসাদে বহু তিরস্কার ও ভর্ৎসনা শুনতে হবে, যা এমনকি তার পদ নিয়েও টান দিতে পারে! কিন্তু এখন তার সামনে কিছু অর্জনের সুযোগ আছে। যুদ্ধব্যয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে শাইজারের আমির যে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছেন, তিনি তা গ্রহণ করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি বিজায়া ও কাফারতাবে একটি করে প্রতিরক্ষা বাহিনী রেখে গিয়ে নগরীদুটিকে শাম অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ঘাঁটি বানাতে পারেন। আর ফেরার পথে তিনি যদি দ্রুত আদানায় ছুটে যান, তাহলে হয়তো রোমান সেলজুক ও দানিশমান্দ বাহিনীর হাত থেকে নগরীটি রক্ষা করতে পারবেন। বাহিনীদুটিকে পরাজিত করে তিনি হয়তো কিলিকিয়া অঞ্চলে আরও কিছু এলাকা জয় করতে পারবেন এবং নিজের অর্জনের পাল্লা কিছু হলেও ভারী করতে পারবেন। এভাবে শাম অঞ্চলের ব্যর্থ অভিযানের ক্ষতি কিছুটা হলেও ঘোচানো যাবে!
সম্রাটের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেতে থাকা এই দশটি চিন্তা সামনে আসার পর আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারছি যে, যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও সুস্থ চিন্তার দাবি এটাই ছিল যে, বাইজান্টাইন সম্রাট শাইজারের আমিরের প্রস্তাব মেনে নিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে শাইজার ছেড়ে যাবেন। আর তার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত সবকিছু হারাবার পূর্বেই এবং এমন সময় আসার পূর্বেই, যখন হয়তো এই প্রস্তাবও তার সামনে থাকবে না। বাইজান্টাইন সম্রাট যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও সুস্থ চিন্তার দাবিই মেনে নেন!
অবরোধের তেইশ দিন গত হওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট ও তার মিত্রগণ শাইজার ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ঘোষণা করে!(৪৯০)
বাইজান্টাইন সম্রাটের এ ঘোষণা ছিল স্পষ্টতই মুসলিম বাহিনীর অটল মনোবল দমাতে না পারার ব্যর্থতার স্বীকৃতি!
এ ঘোষণা ছিল মুসলমানদের শাশ্বত বিজয়ের স্বীকৃতি!
সুবিশাল ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন মিত্রবাহিনী শাইজার ত্যাগ করে মুসলমানদের জ্বলন্ত উনুনের উত্তাপ থেকে আত্মরক্ষা করতে!
তারা প্রস্থান করে কোনো দিকে না তাকিয়ে! লাঞ্ছিত-অপদস্থ হয়ে! নিজেদের অবস্থান, প্রভাব, ইতিহাস এমনকি ভবিষ্যৎ বিস্মৃত হয়ে!
নিঃসন্দেহে সেই দিনটি ছিল ইসলামি ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিন! আল্লাহর দ্বীনের পতাকা সমুন্নত হওয়ার দিন। সমগ্র পৃথিবী শুনেছে সে দিনের ইতিহাস; মুসলিম-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সকলের মুখেমুখে আলোচিত হয়েছে সে দিনের বিবরণ। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের তাবৎ ঐতিহাসিক দিনটিকে সর্বময় গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখেছে; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সকলের মেধায়-মস্তিষ্কে দিনটি রয়ে গেছে খোদাইকৃত শিলালিপির মতো অটুট-অক্ষত।
৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) খ্রিষ্টান বাহিনী শাইজার ত্যাগ করে। অর্থাৎ ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বারিনের যুদ্ধে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিজয়ের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি বিনা তর্কে সমকালীন শ্রেষ্ঠতম মুসলিম বীর হিসেবে স্বীকৃত হয়ে ওঠেন। কেউ যদি মন থেকে বিষয়টি মেনে না-ও নেয়, অন্তত মুখে কারও পক্ষে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না। 'জিনকি রাষ্ট্র' শব্দটি সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, জিনকি রাষ্ট্রই তখন নির্বিবাদে, মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র।
এদিকে আমাদের প্রিয় বীরযোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকি কিন্তু খ্রিষ্টান বাহিনীর লাঞ্ছনাকর প্রস্থানেই তুষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। তিনি অনতিবিলম্বে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন, যেন সবাই বুঝতে পারে যে, ক্রুসেডার- বাইজান্টাইন মিত্রবাহিনী চলে যাওয়ায় তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেননি; শত্রুপক্ষেরই বরং এই ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করা উচিত যে, তারা প্রাণ হাতে নিয়ে মুসলমানদের নাগাল থেকে বের হতে পেরেছে!

টিকাঃ
৪৮৫. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরী, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/১৩৬ ও আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২।
৪৮৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৯-৮০।
৪৮৭. Guillaume de Tyr., pp. 662-665.
৪৮৮. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৯৬-৬৯৭ ও Runciman: op. cit., II, p.216.
৪৮৯. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৯৭ ও Setton:op.cit.I, p. 456.
৪৯০. Guillaume de Tyr, p.324.
৪৯১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৭।
৪৯২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩।
৪৯০. উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১১৩, ১১৪, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৬ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00