📄 বাইজান্টাইন বাহিনীর পুনঃআগমন
বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিনোস ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সম্রাট তার কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করে এন্টিয়কের আশেপাশের অঞ্চলে প্রবেশের কৈফিয়ত প্রদান করেন। বার্তায় তিনি বলেন, আমি এখানে মুসলমানদের সঙ্গে লড়তে আসিনি; বরং আর্মেনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছি। (৪৬১) কিন্তু ইমাদুদ্দিন তার জবাবদিহিতায় প্রতারিত না হয়ে চিন্তা করেন, জিনকি রাজ্যের মর্যাদার দাবি হলো এমন অনৈতিক হস্তক্ষেপের উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন। ভেবে-চিন্তে তিনি ইসলামি ভূখণ্ডের সীমানা অবমাননার উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামরিক পদক্ষেপকেই খুঁজে পান। তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর ওপর আক্রমণ করতে আলেপ্পোর আমির সিওয়ারের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সিওয়ারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীটি বিপুল সংখ্যক বাইজান্টাইন সৈন্য হত্যা করে, বন্দিও করে অনেককে। অথচ সিওয়ারের বাহিনীটি বাইজান্টাইন বাহিনীর তুলনায় জনবলে অনেক ছোট ছিল। সরাসরি এমন লাঞ্ছনাকর পরাজয় বরণের পরও বাইজান্টাইন সম্রাট মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তিনি মুসলমানদের মহান নেতা ইমাদুদ্দিন জিনকির বীরত্ব সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছিলেন। আর তাই সমূহ ক্ষতি উপেক্ষা করে তিনি প্রস্থান করেন আর সিদ্ধান্ত নেন আরও বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আগামী বছর পুনরায় আগমনের। (৪৬২)
এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বা বাইজান্টাইন কোনো পক্ষই এ সময় পারস্পরিক চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেনি। ইমাদুদ্দিন জিনকিও তখন এ বিষয়ে কিছু জানতে পারেননি। অবশ্য ক্রুসেডারদের উল্লেখযোগ্য কোনো আপত্তি ছাড়া এন্টিয়ক নগরপ্রাচীরের ওপর বাইজান্টাইন পতাকা উড়তে দেখে তিনি অনুমান করেন, উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা ও সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি হয়েছে। এজন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজ্যের এশিয়া মাইনর অঞ্চল সংলগ্ন উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ জারি করেন। এ দিকটায় বাইজান্টাইনরা কিলিকিয়া অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেখানে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে সম্পাদিত এসব বিজয় এবং ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের অবৈধ অনুপ্রবেশের মোকাবিলায় তার শক্তিশালী উদ্যোগ নির্বিবাদে তাকে তৎকালীন মুসলিম নেতাদের অঘোষিত নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। বিশেষত এসব মাহাত্ম্যপূর্ণ বিজয় ও সুস্পষ্ট সম্মান তিনি এমন সময় অর্জন করেন যখন অন্যান্য মুসলিম সুলতান, রাজন্য ও নেতার পার্থিব ক্ষমতালিপ্সা সকলের সামনে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল। এসব নেতার দুর্বলতার এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মুসলমানদের একক শক্তিতে পরিণত করতে চেষ্টা করছিলেন, সে সময়ই তারা ইরাক ও পারস্য ভূমিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে ছিল। শাম অঞ্চলে যখন এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, পারস্য ও ইরাকে তখনও চলছে সুলতান মাসউদ ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের ধারাবাহিক বিবাদ-সংঘাত! (৪৬৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করছিলেন, ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইনদের সঙ্গে মিলে শাম অঞ্চলে বড়সড় কোনো কাণ্ড ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই তিনি শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য সম্মিলিত আক্রমণ মোকাবিলায় শক্তি লাভের লক্ষ্যে শামের বিভিন্ন দুর্গ ও নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রথমে লেবানন অঞ্চলে বালাবাক্কু নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে নগরীটি জয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নগরটির নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত মজুবত হওয়ায় তার কাজ কঠিন হয়ে যায়। বালাবাক্কু তখন দামেশকের অধীনে ছিল। নগরীটির প্রশাসক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের বিনিময়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে ইমাদুদ্দিন তাতে সম্মত হন। কারণ, এর ফলে অন্তত নগরীটি ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে আর তিনি এখন অন্যত্র অভিযানের লক্ষ্যে অগ্রসর হতে পারবেন। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, ইমাদুদ্দিন জিনকি সিদ্ধান্ত ও কর্মতৎপরতায় দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। তার অনুমানে কোনো স্থানের পতন-সম্ভাবনা ক্ষীণ হলে তিনি জেদ ধরে সেখানে অবরোধ করে পড়ে থাকতেন না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এরপর বালাবাক্কু ছেড়ে মিজদাল দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হন। সামান্য চেষ্টার পর তিনি দুর্গটি জয় করে নিজ রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। এ দুর্গটিও দামেশকের অধীনস্থ ছিল। এরপর তিনি অগ্রসর হন দামেশক রাজ্যেরই অন্তর্গত বানিয়াস নগরীর দিকে। বানিয়াস নগরীও অতি সহজে তার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। এগুলো ৫৩২ হিজরি সনের শুরু ভাগের (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকের) ঘটনা। (৪৬৪)
দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ সিংহভাগ এলাকার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর দামেশক নগরী দখলের জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে এখন একটি বাধাই বাকি আছে। আর তা হলো হিমস নগরী। হামা ও দামেশকের মধ্যবর্তী পথে সটান দাঁড়িয়ে ছিল হিমস নগরী। আর তাই তিনি এরপর সরাসরি হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করেন। কিন্তু হিমস শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়। দীর্ঘ অবরোধের পর হিমসবাসী যখন নতি স্বীকার করে নগরদ্বার খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখনই মুসলমানদের কাছে এক উদ্বেগজনক সংবাদ এসে পৌঁছায়!
শামের জমিনে পৌঁছে গেছে বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী। তাদের নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং সম্রাট ২য় জন কমনিনোস। গত বছর এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের সঙ্গে কৃত চুক্তি বাস্তবায়নে লক্ষ্যে তারা সরাসরি আলেপ্পোর দিকে এগিয়ে আসছে।
নিঃসন্দেহে এ সংবাদে মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট শঙ্কা ও ভীতির উপাদান ছিল। কারণ, আলেপ্পোর পতন হলে চলমান উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টা একেবারে গোড়া থেকে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং অর্জন শূন্যের ঘরে নেমে যাবে। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সঙ্গে হিমসের অবরোধে শরিক আলেপ্পোর আমির সিওয়ারকে অবরোধ ছেড়ে দ্রুত আলেপ্পোতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে সর্বোচ্চ স্তরের প্রস্তুতি গ্রহণ, নগরীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংহতকরণ ও পরিখাগুলো গভীর করার ব্যবস্থা নিতে বলেন। পাশাপাশি তিনি সিওয়ারকে বলেন, 'নগরবাসীকে আশ্বস্ত করো; মুসলিম সেনারা তাদের সহায়তায় দ্রুতই চলে আসছে।' এটি ৫৩২ হিজরি সনের রজব মাসের (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) কথা। (৪৬৫)
বাইজান্টাইন বাহিনী মুসলিম ভূখণ্ডে অবতরণ করতেই এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স ও এডেসার শাসক ২য় জোসেলিন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এ ছাড়াও নাইট টেম্পলার সংগঠনের একটি শক্তিশালী স্কোয়াড তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। সম্মিলিত বাহিনী বালাত নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নগরটি দখল করে নেয়। এরপর তারা অগ্রসর হয় আলেপ্পোর অন্তর্গত সুরক্ষিত ইসলামি নগরী বিজায়া নগরী অভিমুখে। যেহেতু নগরীটির অবস্থান ছিল আলেপ্পো ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের যোগাযোগপথের পাশে, তাই বাইজান্টাইন সম্রাট যেকোনো মূল্যে নগরটি দখলের জন্য জেদ ধরেন। সাতদিন অবরোধের পর দু-পক্ষ পত্রবিনিময় শুরু করে। চুক্তি হয়, নগরবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের শর্তে নগরদ্বার খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু চুক্তিমতো নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিয়োস মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেন এবং নগরজুড়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালানোর নির্দেশ দেন। পাঁচ হাজার আটশ মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করা হয়, বাকিদের দাস হিসেবে বন্দি করা হয়। কিছু মুসলিম নাগরিক পালিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিলে বাইজান্টাইন সম্রাট গুহাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে আত্মগোপনকারী মুসলমানরা সেখানেই নির্মমভাবে মারা যায়। ৫৩২ হিজরি সনের ২৫ রজব বিজায়া নগরীর পতন ঘটে। (৪৬৬)
নিঃসন্দেহে এটি ছিল সুবিশাল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাটের এক ন্যাক্কারজনক প্রতারণা!
টিকাঃ
৪৬১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩।
৪৬২, প্রাগুক্ত, ২/২৬৩।
৪৬০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৪-৩০৫।
৪৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০১ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩-২৬৪।
৪৬৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৪-২৬৫।
৪৬৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০১-৩০২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৫।
📄 মুসলমানদের নির্ভীক প্রতিরোধ
অবশ্য বিজয়া নগরী অবরোধ এবং মুসলিম নাগরিকদের হত্যা ও বন্দি করতে গিয়ে খ্রিষ্টান বাহিনী মূল্যবান কিছু সময় নষ্ট করে ফেলে। এ সুযোগে আলেপ্পো সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষার যথাযথ প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হয় এবং প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার জন্য পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুত হয়ে যায়। বাইজান্টাইন সম্রাট নগরটিতে অতর্কিতে হামলে পড়ার সুযোগ খুইয়ে বসেন। বিজায়ার পতন ঘটিয়ে অবশেষে তিনি আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। (৪৬৭)
এমন কঠিন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকি কী করছিলেন?! আসুন উপভোগ করি এমন জটিল বিপর্যয়ের মুখে ইমাদুদ্দিন জিনকির চমৎকার প্রতিক্রিয়া; একসঙ্গে অধ্যয়ন করি এই জরুরি সংকটের মোকাবিলায় তার কর্মনীতি। জানতে চেষ্টা করি, ঘটনাপ্রবাহের ওপর তার সামগ্রিক দৃষ্টি কেমন ছিল এবং কর্মক্ষেত্রে তার খোদাপ্রদত্ত বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল।
১. প্রথমেই তিনি আলেপ্পোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ দৃঢ় ও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হন এবং আলেপ্পোবাসীর মনোবল দৃঢ় রাখতে সাহসী প্রশাসক সিওয়ারকে আলেপ্পোতে ফেরত পাঠান। (৪৬৮)
২. হিমসে আক্রমণ অব্যাহত রাখার জন্য তিনি তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশকে হিমসেই রেখে যান। সুতরাং হিমসের প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন নিজেদের দুর্গের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যস্ত থাকবে এবং পেছন দিক থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির ওপর আক্রমণ করতে পারবে না।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজে মূল বাহিনী নিয়ে হিমস থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। তার লক্ষ্য ছিল শামের মধ্যবর্তী এ অঞ্চলে অবস্থান গ্রহণ করে বাইজান্টাইন বাহিনীর গতিবিধির প্রতি খেয়াল রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তর শাম অঞ্চলের যেকোনো স্থানে দ্রুত অগ্রসর হওয়া নিশ্চিত করা।
৪. ইমাদুদ্দিন জিনকি এক বিরল ও বিস্ময়কর ধরনের বার্তা প্রেরণ করেন। পত্রটির ভাষ্য দ্বারা আল্লাহর প্রতি তার পূর্ণ নিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর সংকট নিরূপণে তার সুগভীর বোধ ও চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তিনি সে সময় বাগদাদে অবস্থানরত সেলজুক সুলতান মাসউদের কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করেন এবং তাকে আলেপ্পো ও শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় একটি বিশাল বাহিনী পাঠানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন! (৪৬৯)
ইমাদুদ্দিন জিনকির এ পদক্ষেপ অনেক কিছু বলে যায়! মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে তিনি মুহূর্তের মধ্যে যেন সুলতান মাসউদের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের ইতিহাস ভুলে যান। ভুলে যান, এই সুলতান মাসউদ দু-বছর পূর্বে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তার যেন মনেই নেই যে, সুলতান মাসউদই ৫২৫ হিজরি সনে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর থেকে গত সাতটি বছর পার্থিব স্বার্থে একের পর এক অনর্থক যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টি করছেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি মুসলমানদের দুর্যোগ দূর করতে নিজের বাহিনীকে সুলতান মাসউদের শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে এ সবকিছু ভুলে যান। শুধু কি এতটুকুই! এ সময় কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে পুরোপুরি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'সুলতান মাসউদ তার বাহিনী নিয়ে শাম অঞ্চলে আগমন করলে নিশ্চয়ই পুরো অঞ্চলকে নিজের রাজত্বে জুড়ে নেবেন এবং এর ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্ব ও ক্ষমতার অবসান ঘটবে।' ইমাদুদ্দিন বড় আশ্চর্য উত্তর প্রদান করেন। তিনি বলেন, 'শত্রুপক্ষ মুসলিম ভূখণ্ড দখলে লালায়িত হয়ে উঠেছে। তারা আলেপ্পো দখল করে নিতে পারলে শাম অঞ্চলে ইসলামের অস্তিত্বই থাকবে না। আর শাম অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কাফিরদের হাতে না থেকে যেকোনোভাবে মুসলমানদের হাতে থাকা আমার কাম্য।' (৪৭০)
এই বিস্ময়কর চেতনা এবং এই অপূর্ব নিষ্ঠাই ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির বিজয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকারণ। কত পার্থক্য সেই দু-ব্যক্তির মাঝে, যাদের একজন কাজ করে আল্লাহর জন্য, আর অন্যজন কাজ করে নিজের স্বার্থপূরণের জন্য!
ইমাদুদ্দিন জিনকি শামের মুসলমানদের সহায়তায় বাহিনী প্রেরণের জন্য সুলতান মাসউদকে উৎসাহিত করতে বাগদাদে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন এবং খোদ কামালুদ্দিন শাহরাযুরিকে প্রতিনিধিদলের প্রধান নির্বাচন করেন।
৫. নিষ্ঠাবান বীর সেনানী ইমাদুদ্দিন জিনকি আরেকটি অভিনব বার্তা প্রেরণ করেন জাযিরা অঞ্চলে তার চরম বিদ্বেষী প্রতিপক্ষ রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান উরতুকির কাছে! (৪৭ ১) বিগত এক দশক ধরে যদিও দু-পক্ষের বিরোধ-সংঘাত চলছিল; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি চিন্তা করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পেছনের সব বিরোধ ও সংঘাত ভুলে গিয়ে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্মিলিত বৃহৎ শক্তির মোকাবিলা করতে সক্ষম একক কাঠামোয় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রচেষ্টা চালানো তার অপরিহার্য দায়িত্ব।
৬. তিনি তৃতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্র প্রেরণ করেন, যা দ্বারা পরিস্থিতি অনুধাবনে তার সূক্ষ্ম সামরিক প্রজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ত্বরিত বার্তাটি তিনি প্রেরণ করেন এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দুই মুসলিম নেতা রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের শাসক সুলতান মাসউদ বিন কিলিজ আরসালান এবং দানিশমান্দ রাষ্ট্রের শাসক মুহাম্মাদ বিন গাজি দানিশমান্দির কাছে। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাইজান্টাইনদের অধিকৃত এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ইসলামি জনপদগুলোতে হামলা চালানোর আহ্বান জানান। তিনি আশা করছিলেন, এর ফলে বাইজান্টাইন সম্রাট এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মুসলমানদের হামলা প্রতিরোধ করার জন্য শাম ছেড়ে সেদিকে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। (৪৭২)
নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল অতি নিখুঁত, চমৎকার এবং তার অনন্যসাধারণ সামরিক জ্ঞানের অনুপম দৃষ্টান্ত।
টিকাঃ
৪৬৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৪।
৪৬৮. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৮।
৪৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩।
৪৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬২।
৪৭ ১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২-৩০৩ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৯-৮০।
৪৭২, সাঈদ মাহমুদ ইমরান, আত-তারীখুল ইসলামি, পৃষ্ঠা: ২০৯।
📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ
আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?
১. তিনি তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত বাইজান্টাইন বাহিনীকে ধাওয়া করতে ছুটে যান। তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর পেছনের অংশের নাগাল পেয়ে যান। তাদের সঙ্গে লড়াই হলে মুসলমানরা তাদের বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে, বন্দিও করে অনেককে। এ সময় মুসলমানরা প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। (৪৯৪) ইমাদুদ্দিন জিনকির তাড়া খেয়ে বাইজান্টাইনরা ত্রস্তপদে নিজেদের দেশে পালাতে থাকে।
২. বাইজান্টাইন বাহিনী আলেপ্পো অবরোধে যেসব ভারী ভারী অবরোধসামগ্রী ব্যবহার করেছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি সেগুলো দখলে নেওয়ার জন্য দ্রুত অগ্রসর হন। এসব অবরোধসামগ্রী তৈরিতে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছিল। তিনি অধিকাংশ অবরোধসামগ্রীই হস্তগত করতে সক্ষম হন। এসব ভারী সামগ্রী নিয়ে দ্রুত চলা সম্ভব ছিল না বিধায় বাইজান্টাইনরা বাকি সামগ্রীগুলো পুড়িয়ে ফেলে। নিঃসন্দেহে এগুলো ছিল অনেক মূল্যবান যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (৪৯৫)
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সহকারী সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানির নেতৃত্বে একটি বাহিনী কাফারতাব থেকে বাইজান্টাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে নগরীটি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইন বাহিনী যে মাসে প্রস্থান করে, সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ নগরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন (৪৯৬)
৪. ইমাদুদ্দিন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন। তিনি এই মহান বিজয়ের রেশ বাকি থাকতেই হঠাৎ ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ ইরকা দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করেন। দীর্ঘ অবরোধ ও অব্যাহত গোলাবর্ষণের পর তিনি দুর্গটি অধিকার করেন এবং সেখানে থাকা ক্রুসেড সেনাদের বন্দি করেন। (৪৯৭) এ অভিযান ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির তুখোড় সামরিক মেধার অনুপম দলিল। কারণ, স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, তিনি অভিযান চালাবেন এডেসা ও এন্টিয়কে, বাইজান্টাইন বাহিনীকে সহায়তা করার প্রতিশোধ হিসেবে। কিন্তু তিনি অভিযান চালান ত্রিপোলি রাজ্যে; যারা এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
৫. ইমাদুদ্দিন জিনকি উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধকরণের গুরুদায়িত্বও ভুলে যাননি। ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রস্থানের পরই তিনি দ্রুত পতন ঘটানোর আশায় পুনরায় হিমস অবরোধ করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সারা জীবনে কখনোই বিশ্রাম খোঁজেননি। এমনকি শাইজার নগরপ্রাচীরের কাছে এত পরিশ্রমের পরও সামান্য অবসর না নিয়ে তিনি পুনরায় অবতীর্ণ হন উম্মাহর কল্যাণের ময়দানে।
কিন্তু এবারের হিমস অবরোধকালে ইমাদুদ্দিন জিনকি ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বনের চিন্তা করেন। এতে সামান্য পরিশ্রমেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যাবে; পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বহু নগরী জিনকি রাজ্যভুক্ত করার পথ খুলে যাবে। তিনি দামেশকের অধিপতি শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির ঘনিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'রাজনৈতিক বিয়ে' সম্পাদনের পরিকল্পনা করেন। ইমাদুদ্দিন বিনিময় হিসেবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করে শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির মা সাফওয়াতুল মালিক যামরাদ খাতুনকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান!
কারও কৌতূহল হতে পারে, বিয়ের বিনিময়ে কিছু না দিয়ে তিনি উল্টো কীভাবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করতে পারেন?!
উত্তর হলো, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি বিয়ের পর স্ত্রীকে মোহর ও বিভিন্ন মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রদান করেছিলেন। তবে তিনি হিমসের কর্তৃত্ব দাবি করেছিলেন সেই মহা গৌরবের বিনিময়ে, যা তার স্ত্রী সে যুগের মহাবীর ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাজ্য শাসন করছেন। তিনি সেই দুঃসাহসী বীর, ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনের বিরুদ্ধে যার রয়েছে ধারাবাহিক বিজয়-গৌরব। এমন ব্যক্তির সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে পারা নিঃসন্দেহে অতি মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রত্যাশা পূরণ হয়। শিহাবুদ্দিন মাহমুদ এ প্রস্তাবে সম্মতি জানান। সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বিয়ে সম্পন্ন হয়(৪৯৮) এবং হিমস ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়।
টিকাঃ
৪৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৬. প্রাগুক্ত, ২/২৬৮।
৪৯৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৪।
৪৬৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৯।
📄 সৌভাগ্য ও কল্যাণে সমৃদ্ধ একটি বছর
এ সময়ের আলোচনায় সমাপ্তি টানার আগে আমরা আরেকটি বিষয় জানব। আর তা হলো ইমাদুদ্দিন জিনকি কর্তৃক কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরির নেতৃত্বে বাগদাদে সুলতান মাসউদের কাছে প্রেরিত প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টার পরিণতি!
কামালুদ্দিন শাহরাযুরি দ্রুত বাগদাদে পৌঁছে সুলতান মাসউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুলতান শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় শিথিলতা করলে তার পরিণতি কী হতে পারে, তিনি তাকে তা বোঝাতে চেষ্টা করেন এবং একে কেন্দ্র করে যে তার রাজত্বও শেষ হয়ে যেতে পারে, এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করেন। তিনি সুলতানকে বলেন, 'বাইজান্টাইনরা আলেপ্পো দখল করতে পারলে ফোরাত নদী পাড়ি দিয়ে বাগদাদে পৌঁছে যাবে এবং খিলাফতের রাজধানী বাগদাদও দখল করে নেবে!'
সুলতান মাসউদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?!
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. বলেন, 'কাজি কামালুদ্দিন তার মাঝে কোনো স্পন্দনই দেখতে পেলেন না!'
অর্থাৎ সুলতান বিষয়টিকে একেবারে শীতলভাবে গ্রহণ করেন। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এক নিষ্প্রাণ জড়বস্তু; তার মাঝে কোনো প্রাণ ও প্রাণশক্তিই অবশিষ্ট নেই! তাই তার কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, কোনো আচরণগত বহিঃপ্রকাশও নেই। তার কাছে বিষয়টির যেন কোনো গুরুত্বই নেই!
কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরি ব্যর্থ মনোরথে সুলতান মাসউদের দরবার থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি এরপর সুলতানের বোধ ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তুলতে তার ওপর চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা করেন। কাজি কামালুদ্দিন তার এক সঙ্গীকে বলেন, তুমি আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে খলিফার প্রাসাদের নিকটবর্তী মসজিদে যাবে। খতিব সাহেব মিম্বরে আরোহণ করতেই তোমরা সকলে একযোগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকবে, 'হায়! ইসলামের কী হবে! হায়! দ্বীনে মুহাম্মাদির কী হবে!' এ সময় তোমরা পরিধেয় বস্ত্র ছিঁড়ে ফেলবে, মাথার পাগড়ি খুলে ছুড়ে মারবে। এরপর মাতম করতে করতে সুলতানের বাসভবনের দিকে অগ্রসর হবে।
কাজি কামালুদ্দিন তার আরেক সঙ্গীকে একই নির্দেশনা দিয়ে সুলতানের মসজিদে প্রেরণ করেন।
উদ্দেশ্য ছিল বাগদাদে গণবিক্ষোভ তৈরির মাধ্যমে সুলতানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বিক্ষোভ এমন পর্যায়ের হতে হবে, যেন সুলতান বিদ্রোহের আশঙ্কা করেন এবং প্রভাবিত হন। তা ছাড়া তখনও সালতানাতের মসনদ নিয়ে ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের সঙ্গে সুলতানের পুরোনো বিরোধ জিইয়ে ছিল। জনগণের বিক্ষোভ দেখে সুলতান নিশ্চয়ই আশঙ্কা করবেন যে, দাউদ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে সাধারণ জনতাকে ক্রুসেডবিরোধী জিহাদের জন্য প্রস্তুত করবেন। নিশ্চয়ই এ চিন্তা সুলতান মাসউদকে বিরাট ঝামেলায় ফেলে দেবে।
কামালুদ্দিনের পরিকল্পনা সফল হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে, 'হায় ইসলামের কী হবে! মুহাম্মাদের দ্বীনের কী হবে!' প্রাসাদের সামনে বিপুল সংখ্যক জনতাকে দেখে সুলতান ভয় পেয়ে যান। তিনি তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দেন, 'ইবনে শাহরাযুরিকে আমার সামনে হাজির করো।' কামালুদ্দিন শাহরাযুরিকে উপস্থিত করা হলে সুলতান তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'এ কোন ফিতনা শুরু করলে?!' কামালুদ্দিন নির্বিকার চিত্তে উত্তর দেন, 'আমি কিছু করিনি, আমি তো আমার ঘরেই ছিলাম। জনগণই দ্বীন ও ইসলামের কল্যাণ চিন্তায় বিক্ষোভ শুরু করেছে; তারা এই শিথিলতার পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।' এরপর সুলতান নিরুপায় হয়ে বলেন, 'যাও, জনগণকে বুঝিয়ে এখান থেকে সরাও। আর আগামীকাল এসে যত সৈন্য চাও, নিয়ে যেয়ো।'
কামালুদ্দিন বাইরে এসে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন এবং তাদেরকে জানান যে, সুলতান শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় শীঘ্রই বাহিনী প্রস্তুত করবেন। পরের দিন কামালুদ্দিন সুলতানের দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান, সুলতান ইতিমধ্যে বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেছেন! এমনকি বাহিনীর বিশালতা দেখে কামালুদ্দিন ভয় পেয়ে যান এবং আশঙ্কা করেন যে, সুলতান হয়তো ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইন বাহিনীর মোকাবিলা করার পর শাম অঞ্চলকে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নেবেন। যেহেতু ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন অনেক দূরে শাম ভূমিতে অবস্থান করছেন, তাই কাজি কামালুদ্দিন দ্রুত মসুলের আমির নাসিরুদ্দিন জাকারের কাছে পরামর্শ চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেন। ফিরতি বার্তায় নাসিরুদ্দিন বলেন, 'শাম ভূমি তো নিশ্চিত কারও না কারও দখলে যাবেই। সুতরাং কাফিরদের হাতে চলে যাওয়ার চেয়ে তা মুসলমানদের হাতে যাওয়াই শ্রেয়!'
চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নাসিরুদ্দিন জাকার যেন তার নেতারই প্রতিচ্ছবি! ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন সুলতান মাসউদকে শাম অঞ্চলে আহ্বানের মনস্থ করেছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠজনদের আপত্তির জবাবে যে উত্তর প্রদান করেছিলেন, নাসিরুদ্দিনও ঠিক একই উত্তর দেন।
বাগদাদের বাহিনী প্রস্তুতি শেষে যখন যাত্রার উদ্যোগ নেয়, তখনই ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষ থেকে একটি বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় তিনি কাজি কামালুদ্দিনকে বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রস্থান ও মুসলিম বাহিনীর বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন। ফলে বাগদাদ থেকে আলেপ্পোতে বাহিনী প্রেরণের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়! (৪৯৯)
এভাবে আল্লাহর তাআলার অনুগ্রহে পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে প্রবাহিত হয়। শেষ পর্যন্ত সুলতান মাসউদের বাহিনীর মুখোমুখি হতে হলে হয়তো তা আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াত।
ইতিমধ্যে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। ইমাদুদ্দিন জিনকির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র-সর্বমহলে। সবাই এখন অকুণ্ঠচিত্তে তার গুণ-কীর্তি এবং চেষ্টা ও অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করে। মুসলমানদের মিম্বরে মিম্বরে তার কল্যাণ কামনায় দোয়া করা হয়। পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে সুলতান মাসউদ চিন্তায় পড়ে যান যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে এখন তার কী আচরণ করা উচিত। তিনি চাইলেও এখন ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন না, পারবেন না এমন কোনো নির্দেশ দিতে, যা তাকে ক্রুদ্ধ করবে। কারণ, বৃহত্তর মুসলিম সমাজ তখন নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে দাঁড়াবে। সবদিক বিবেচনা করে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিজের পক্ষে আনার এবং তার সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সেনাপতির ন্যায় আচরণ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে রাজকীয় সম্মানসূচক পরিচ্ছদ ও অন্যান্য মূল্যবান উপহার প্রেরণ করেন এবং মুসলমানদের পক্ষে এত বড় বিজয় ও সাফল্য অর্জন করায় তাকে মোবারকবাদ জানান। সুলতান তার আচরণে বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সেলজুক সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন কোনো রাজ্যের শাসক মনে করছেন না; বরং তার অধীনস্থ একজন প্রশাসক মনে করছেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার এ আচরণ মেনে নেন। কারণ, তিনি তো কোনো অর্থহীন সংঘাতে জড়াতে চান না। তিনি চান মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে নিজের সমস্ত চিন্তা ও চেষ্টা ব্যয় করতে। (৫০০)
এভাবে মুসলমানদের জন্য একের পর এক সৌভাগ্য ও কল্যাণের বার্তা বয়ে এনে ৫৩২ হিজরি সনের সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা এত দিনে চিনতে পেরেছে ঐক্য ও জিহাদের পথ; জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি এখন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন; সবার হৃদয়ে এখন ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার আশা-প্রত্যাশা।
চলমান সময়ের ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বছরটির আলোচনার ইতি টানার আগে সে বছরেরই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করছি, যা মোটেও তৎকালীন জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি; অথচ পরবর্তী সময়ে তা কেবল মুসলিম সমাজে নয়; বরং পুরো বিশ্বের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। এই ৫৩২ হিজরি সনেই জন্মগ্রহণ করেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম বীরপুরুষ সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি! আল্লাহর কী মহিমা! সালাহুদ্দিন আইয়ুবি যেদিন জন্মগ্রহণ করেন; সেদিনই তার পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব বাগদাদের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন বাহরুযের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক পদ থেকে অপসারিত হন। নাজমুদ্দিন আইয়ুব তার পদচ্যুতির দিন জন্মগ্রহণকারী এই সন্তানকে বাহ্যত অশুভ মনে করেছিলেন!(৫০১) তিনি বুঝতেই পারেননি, এই সন্তানের জীবনেই একদিন দ্বীন ও দুনিয়ার সমূহ কল্যাণের সন্নিবেশ ঘটবে!
এরপর নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ তিকরিত থেকে মসুলে চলে আসেন এবং মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির অধীনে কাজ করতে থাকেন। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, ৫২৬ হিজরি সনে ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর কাছে পরাজিত হয়ে মসুলে ফিরছিলেন, তখন এই নাজমুদ্দিন আইয়ুব তাকে দজলা পাড়ি দিতে সহায়তা করেছিলেন এবং তাকে কয়েকদিন নিজ দুর্গে আশ্রয় দিয়ে সেবা-শুশ্রূষা করেছিলেন। এবার যখন নাজমুদ্দিন আইয়ুব তিকরিত দুর্গ থেকে বিতাড়িত হন, তখন তিনি এই দুর্যোগের সময় সাহায্যপ্রাপ্তির আশায় ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে আশ্রয় গ্রহণের চিন্তা করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি নাজমুদ্দিন আইয়ুবের প্রতি সুধারণা পোষণ করতেন। তিনি নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে সাদরে স্বাগত জানান এবং তার নেতৃত্ব-দক্ষতা যাচাই করতে তাকে কিছু জায়গিরের তত্ত্বাবধান-দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল নাজমুদ্দিনের দক্ষতা প্রমাণিত হলে তিনি তাকে সুউচ্চ কোনো পদে অধিষ্ঠিত করবেন। এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি ও নাজমুদ্দিন আইয়ুবের মধ্যে মজবুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতেকালে এ সূত্র ধরেই ইমাদুদ্দিন জিনকির পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ ও নাজমুদ্দিন আইয়ুবের পুত্র সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কত মহিমাময় সেই মহান সত্তা, যিনি এভাবেই আপন প্রজ্ঞায় জগৎ-সংসার পরিচালনা করেন!
টিকাঃ
৪৯৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩ ও আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা : ৬২-৬৩।
৫০০. হাসান ইবরাহিম হাসান, তারীখুস-সিয়াসি ওয়াদ-দীনি ওয়াস-সাক্বাফি ওয়াল ইজতিমায়ি, ৪/৭৫।
৫০১. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, ৭/১৪৪-১৪৫।