📄 ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সন্ধিচুক্তি
ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি।
বাইজান্টাইন বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। রাজা ফাল্ককে উদ্ধার করা বা তার রাজ্যের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার চিন্তা তাদের পরিকল্পনায় বিলকুল ছিল না। অতীত আলোচনায় আমরা দেখেছি, ক্রুসেড যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই বাইজান্টাইন ও ক্রুসেডারদের মধ্যে স্বার্থের বিরোধ লেগে আছে। (৪৫৮) আর তাই সম্রাট ২য় জন কমনিমোসের প্রথম দৃষ্টি ছিল এন্টিয়ক ও তার আশপাশের প্রাচীন বাইজান্টাইন ভূমিগুলোর প্রতি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কিলিকিয়া অঞ্চল; বিশেষ করে সুপ্রাচীন তারসুস, আদানা ও মপসুয়েসটিয়া নগরী। অঞ্চলটি এ সময় আর্মেনীয় নেতা লিওনের শাসনাধীন ছিল।
আর তাই মুসলমানদের হাত থেকে বারিন দুর্গ উদ্ধারের জন্য এ অঞ্চলে দ্রুত আগমনের কোনো ইচ্ছাই বাইজান্টাইন সম্রাটের ছিল না। তিনি তার বিশাল বাহিনী নিয়ে প্রথমে কিলিকিয়া অঞ্চল অভিমুখে অগ্রসর হন। আর্মেনীয়রা এত বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী দেখে ভড়কে যায়। বিগত কয়েক দশকেও এ অঞ্চলে বাইজান্টাইনরা এরূপ বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটায়নি। মূলত এন্টিয়ক প্রশাসনের দীর্ঘ দিনের অস্থিরতা এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে ক্রুসেড শিবিরের বিপর্যস্ত অবস্থা অনুধাবন করেই বাইজান্টাইন সম্রাট এরূপ দুঃসাহস দেখাতে প্ররোচিত হন। তিনি অনুভব করেন, এমন সহজ সুযোগ বারবার আসবে না।
বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিনোস অনায়াসে কিলিকিয়ার বেশ কিছু নগরী দখল করে নেন। অবশ্য আর্মেনীয় শাসক লিওন পালিয়ে তোরোস পবর্তমালায় আশ্রয় নেওয়ায় বাইজান্টাইন বাহিনীকে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীনও হতে হয়নি। প্রাথমিক সফলতায় উদ্যমী হয়ে সম্রাট ২য় জন কমনিনোস এরপর সরাসরি এন্টিয়ক অভিমুখে অগ্রসর হন এবং নগরীটির চারপাশে কঠিন অবরোধ আরোপ করেন। এন্টিয়কের নতুন শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স এতে প্রচণ্ড ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।
রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স চিন্তা করে দেখেন, ইমাদুদ্দিন জিনকির উপর্যুপরি আঘাতে এ অঞ্চলের ক্রুসেড শিবির বর্তমানে একেবারে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। বড় দুই নেতা রাজা ফাল্ক ও ২য় রেমন্ড নিজেদের ঘর সামলাতে ব্যস্ত; আরেক নেতা ২য় জোসেলিন আলেপ্পোর প্রশাসক সিওয়ারের উপর্যুপরি আঘাতে পর্যুদস্ত। আর তাই তার সামনে এখন মাত্র দুটি পথ খোলা আছে— হয় বাইজান্টাইন বাহিনীর সামরিক প্রতিরোধ করা কিংবা সম্রাটের সঙ্গে সমঝোতা করে যৎসামান্য যা মেলে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা।
কিন্তু রেমন্ড স্পষ্টতই অনুভব করেন, বাইজান্টাইন বাহিনীর তুলনায় তার সমরশক্তি একদমই দুর্বল। তিনি যদি সামরিক পন্থায় প্রতিরোধের চেষ্টা চালান আর এরপর নগরীটির পতন ঘটে, তাহলে সবকিছুই হারাতে হবে। এমনকি প্রতিরোধ লড়াইয়ে নিজের অতি সাধের প্রাণটুকুও হারাতে হতে পারে! আর তাই তিনি প্রতিরোধের চিন্তা বাদ দিয়ে সমঝোতা আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। (৪৫৯)
দীর্ঘ আলোচনার পর দু-পক্ষ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাসহ একটি সমঝোতা চুক্তিতে উপনীত হয়। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে মুসলমানদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি টেনে আনতে পারে। চুক্তির ধারাগুলো ছিল—
১. এন্টিয়ক রাজ্যের অধিকার বাইজান্টাইন সম্রাটকে অর্পণ করা হবে।
২. ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইন বাহিনী জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করবে।
৩. রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের জন্য বিকল্প নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাজ্যটির অবস্থান হবে এন্টিয়কের উত্তরে, যার মূল ঘাঁটি হবে আলেপ্পো নগরী। বর্তমানে ইমাদুদ্দিন জিনকির নিয়ন্ত্রণে থাকা হামা নগরীসহ এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু নগরী রাজ্যটিতে যুক্ত হবে। এ ছাড়াও বনু মুনকিযের কাছ থেকে শাইজার নগরী এবং দামেশকের কাছ থেকে হিমস নগরী কেড়ে নিয়ে রাজ্যটিতে যুক্ত করা হবে। হিমস হবে পরিকল্পিত রাজ্যটির দক্ষিণ সীমা।
৪. আগামী বছরের (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দের) গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত সাময়িক সময়ের জন্য রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সই এন্টিয়কের শাসনদায়িত্ব পালন করবেন। আগামী গ্রীষ্মে দু-পক্ষ পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা বিনিময়ের মাধ্যমে চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু করবে। অবশ্য পরাধীনতার নিদর্শনস্বরূপ এখন থেকেই এন্টিয়ক নগরপ্রাচীরের শীর্ষদেশে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতাকা ওড়ানো হবে।
এই ছিল দু-পক্ষের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত উদ্বেগজনক চুক্তিটির ধারাসমূহ। চুক্তি সম্পাদনের পাশাপাশি তারা এ বিষয়ে এ অঞ্চলের প্রধান ক্রুসেডার নেতা রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর সম্মতিও গ্রহণ করে নেয়। (৪৬০)
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে সার্বিকভাবে এ চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক। এর মাধ্যমে বাইজান্টাইন সম্রাট শুধু বাইজান্টাইন নাগরিকদের স্বপ্নের নগরী এন্টিয়কের কর্তৃত্বই ফিরে পাবেন না, আঘাত হানতে পারবেন ইসলামি শক্তির একেবারে ভিত্তিমূলে। শুধু তা-ই নয়; পরিকল্পিত নতুন রাজ্যটি এন্টিয়ক ও মুসলমানদের মাঝে প্রাচীরের কাজ করবে। ফলে ক্রুসেডাররাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এন্টিয়ক রাজ্যের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে।
রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, তার মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে একটি রাজ্যের শাসক হওয়া। তিনি এন্টিয়ক রাজ্য প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখেননি; বরং মাত্র বছরদুয়েক পূর্বে বলতে গেলে ইউরোপ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন! তা ছাড়া বাইজান্টাইন সম্রাট তাকে বিকল্প যে রাজ্যের শাসনভার প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা এন্টিয়কের চেয়ে শ্রেয়তর। আলেপ্পো, হিমস, শাইজার ও হামার মতো নগরী যে রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিশ্চিত করেই একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
আর তাই উভয় পক্ষই সন্তুষ্টচিত্তে চুক্তিতে সম্মত হয়। রাজা ফাল্ক এতে সম্মতি প্রদান করেন। তবে নিঃসন্দেহে এ চুক্তি ও সিদ্ধান্ত ছিল ক্রুসেড রাজ্যটির মূল প্রতিষ্ঠাতা নরম্যানদের প্রত্যাশা-বিরোধী। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স বা রাজা ফাল্ক ছিলেন ফরাসি, আর এন্টিয়কের প্রতিষ্ঠাতা নরম্যানরা ছিল ইতালিয়ান।
টিকাঃ
৪৫৮. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১৩৮-১৩৯ ও সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৪৫৯।
৪৫৯. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৯৭-৬৯৯।
৪৬০. Grousset: op.cit., II, p.97.
📄 বাইজান্টাইন বাহিনীর পুনঃআগমন
বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিনোস ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সম্রাট তার কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করে এন্টিয়কের আশেপাশের অঞ্চলে প্রবেশের কৈফিয়ত প্রদান করেন। বার্তায় তিনি বলেন, আমি এখানে মুসলমানদের সঙ্গে লড়তে আসিনি; বরং আর্মেনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছি। (৪৬১) কিন্তু ইমাদুদ্দিন তার জবাবদিহিতায় প্রতারিত না হয়ে চিন্তা করেন, জিনকি রাজ্যের মর্যাদার দাবি হলো এমন অনৈতিক হস্তক্ষেপের উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন। ভেবে-চিন্তে তিনি ইসলামি ভূখণ্ডের সীমানা অবমাননার উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামরিক পদক্ষেপকেই খুঁজে পান। তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর ওপর আক্রমণ করতে আলেপ্পোর আমির সিওয়ারের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সিওয়ারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীটি বিপুল সংখ্যক বাইজান্টাইন সৈন্য হত্যা করে, বন্দিও করে অনেককে। অথচ সিওয়ারের বাহিনীটি বাইজান্টাইন বাহিনীর তুলনায় জনবলে অনেক ছোট ছিল। সরাসরি এমন লাঞ্ছনাকর পরাজয় বরণের পরও বাইজান্টাইন সম্রাট মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তিনি মুসলমানদের মহান নেতা ইমাদুদ্দিন জিনকির বীরত্ব সম্পর্কে অনেক কথাই শুনেছিলেন। আর তাই সমূহ ক্ষতি উপেক্ষা করে তিনি প্রস্থান করেন আর সিদ্ধান্ত নেন আরও বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আগামী বছর পুনরায় আগমনের। (৪৬২)
এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডার বা বাইজান্টাইন কোনো পক্ষই এ সময় পারস্পরিক চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেনি। ইমাদুদ্দিন জিনকিও তখন এ বিষয়ে কিছু জানতে পারেননি। অবশ্য ক্রুসেডারদের উল্লেখযোগ্য কোনো আপত্তি ছাড়া এন্টিয়ক নগরপ্রাচীরের ওপর বাইজান্টাইন পতাকা উড়তে দেখে তিনি অনুমান করেন, উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা ও সহযোগিতা বিনিময়ের চুক্তি হয়েছে। এজন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজ্যের এশিয়া মাইনর অঞ্চল সংলগ্ন উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ জারি করেন। এ দিকটায় বাইজান্টাইনরা কিলিকিয়া অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেখানে বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা রেজিমেন্ট অবস্থান করছিল।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে সম্পাদিত এসব বিজয় এবং ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের অবৈধ অনুপ্রবেশের মোকাবিলায় তার শক্তিশালী উদ্যোগ নির্বিবাদে তাকে তৎকালীন মুসলিম নেতাদের অঘোষিত নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। বিশেষত এসব মাহাত্ম্যপূর্ণ বিজয় ও সুস্পষ্ট সম্মান তিনি এমন সময় অর্জন করেন যখন অন্যান্য মুসলিম সুলতান, রাজন্য ও নেতার পার্থিব ক্ষমতালিপ্সা সকলের সামনে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল। এসব নেতার দুর্বলতার এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মুসলমানদের একক শক্তিতে পরিণত করতে চেষ্টা করছিলেন, সে সময়ই তারা ইরাক ও পারস্য ভূমিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে ছিল। শাম অঞ্চলে যখন এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, পারস্য ও ইরাকে তখনও চলছে সুলতান মাসউদ ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের ধারাবাহিক বিবাদ-সংঘাত! (৪৬৩)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করছিলেন, ক্রুসেডাররা বাইজান্টাইনদের সঙ্গে মিলে শাম অঞ্চলে বড়সড় কোনো কাণ্ড ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই তিনি শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য সম্মিলিত আক্রমণ মোকাবিলায় শক্তি লাভের লক্ষ্যে শামের বিভিন্ন দুর্গ ও নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রথমে লেবানন অঞ্চলে বালাবাক্কু নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয়ে নগরীটি জয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নগরটির নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত মজুবত হওয়ায় তার কাজ কঠিন হয়ে যায়। বালাবাক্কু তখন দামেশকের অধীনে ছিল। নগরীটির প্রশাসক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের বিনিময়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে ইমাদুদ্দিন তাতে সম্মত হন। কারণ, এর ফলে অন্তত নগরীটি ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে আর তিনি এখন অন্যত্র অভিযানের লক্ষ্যে অগ্রসর হতে পারবেন। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, ইমাদুদ্দিন জিনকি সিদ্ধান্ত ও কর্মতৎপরতায় দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। তার অনুমানে কোনো স্থানের পতন-সম্ভাবনা ক্ষীণ হলে তিনি জেদ ধরে সেখানে অবরোধ করে পড়ে থাকতেন না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এরপর বালাবাক্কু ছেড়ে মিজদাল দুর্গ অভিমুখে অগ্রসর হন। সামান্য চেষ্টার পর তিনি দুর্গটি জয় করে নিজ রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। এ দুর্গটিও দামেশকের অধীনস্থ ছিল। এরপর তিনি অগ্রসর হন দামেশক রাজ্যেরই অন্তর্গত বানিয়াস নগরীর দিকে। বানিয়াস নগরীও অতি সহজে তার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। এগুলো ৫৩২ হিজরি সনের শুরু ভাগের (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকের) ঘটনা। (৪৬৪)
দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ সিংহভাগ এলাকার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর দামেশক নগরী দখলের জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে এখন একটি বাধাই বাকি আছে। আর তা হলো হিমস নগরী। হামা ও দামেশকের মধ্যবর্তী পথে সটান দাঁড়িয়ে ছিল হিমস নগরী। আর তাই তিনি এরপর সরাসরি হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করেন। কিন্তু হিমস শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়। দীর্ঘ অবরোধের পর হিমসবাসী যখন নতি স্বীকার করে নগরদ্বার খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখনই মুসলমানদের কাছে এক উদ্বেগজনক সংবাদ এসে পৌঁছায়!
শামের জমিনে পৌঁছে গেছে বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী। তাদের নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং সম্রাট ২য় জন কমনিনোস। গত বছর এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্সের সঙ্গে কৃত চুক্তি বাস্তবায়নে লক্ষ্যে তারা সরাসরি আলেপ্পোর দিকে এগিয়ে আসছে।
নিঃসন্দেহে এ সংবাদে মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট শঙ্কা ও ভীতির উপাদান ছিল। কারণ, আলেপ্পোর পতন হলে চলমান উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টা একেবারে গোড়া থেকে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং অর্জন শূন্যের ঘরে নেমে যাবে। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সঙ্গে হিমসের অবরোধে শরিক আলেপ্পোর আমির সিওয়ারকে অবরোধ ছেড়ে দ্রুত আলেপ্পোতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে সর্বোচ্চ স্তরের প্রস্তুতি গ্রহণ, নগরীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংহতকরণ ও পরিখাগুলো গভীর করার ব্যবস্থা নিতে বলেন। পাশাপাশি তিনি সিওয়ারকে বলেন, 'নগরবাসীকে আশ্বস্ত করো; মুসলিম সেনারা তাদের সহায়তায় দ্রুতই চলে আসছে।' এটি ৫৩২ হিজরি সনের রজব মাসের (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) কথা। (৪৬৫)
বাইজান্টাইন বাহিনী মুসলিম ভূখণ্ডে অবতরণ করতেই এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স ও এডেসার শাসক ২য় জোসেলিন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এ ছাড়াও নাইট টেম্পলার সংগঠনের একটি শক্তিশালী স্কোয়াড তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। সম্মিলিত বাহিনী বালাত নগরী অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নগরটি দখল করে নেয়। এরপর তারা অগ্রসর হয় আলেপ্পোর অন্তর্গত সুরক্ষিত ইসলামি নগরী বিজায়া নগরী অভিমুখে। যেহেতু নগরীটির অবস্থান ছিল আলেপ্পো ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের যোগাযোগপথের পাশে, তাই বাইজান্টাইন সম্রাট যেকোনো মূল্যে নগরটি দখলের জন্য জেদ ধরেন। সাতদিন অবরোধের পর দু-পক্ষ পত্রবিনিময় শুরু করে। চুক্তি হয়, নগরবাসীকে নিরাপত্তা প্রদানের শর্তে নগরদ্বার খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু চুক্তিমতো নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কমনিয়োস মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেন এবং নগরজুড়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালানোর নির্দেশ দেন। পাঁচ হাজার আটশ মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করা হয়, বাকিদের দাস হিসেবে বন্দি করা হয়। কিছু মুসলিম নাগরিক পালিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিলে বাইজান্টাইন সম্রাট গুহাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে আত্মগোপনকারী মুসলমানরা সেখানেই নির্মমভাবে মারা যায়। ৫৩২ হিজরি সনের ২৫ রজব বিজায়া নগরীর পতন ঘটে। (৪৬৬)
নিঃসন্দেহে এটি ছিল সুবিশাল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাটের এক ন্যাক্কারজনক প্রতারণা!
টিকাঃ
৪৬১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩।
৪৬২, প্রাগুক্ত, ২/২৬৩।
৪৬০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৪-৩০৫।
৪৬৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০১ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩-২৬৪।
৪৬৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৪-২৬৫।
৪৬৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০১-৩০২ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৫।
📄 মুসলমানদের নির্ভীক প্রতিরোধ
অবশ্য বিজয়া নগরী অবরোধ এবং মুসলিম নাগরিকদের হত্যা ও বন্দি করতে গিয়ে খ্রিষ্টান বাহিনী মূল্যবান কিছু সময় নষ্ট করে ফেলে। এ সুযোগে আলেপ্পো সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষার যথাযথ প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হয় এবং প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার জন্য পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুত হয়ে যায়। বাইজান্টাইন সম্রাট নগরটিতে অতর্কিতে হামলে পড়ার সুযোগ খুইয়ে বসেন। বিজায়ার পতন ঘটিয়ে অবশেষে তিনি আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। (৪৬৭)
এমন কঠিন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকি কী করছিলেন?! আসুন উপভোগ করি এমন জটিল বিপর্যয়ের মুখে ইমাদুদ্দিন জিনকির চমৎকার প্রতিক্রিয়া; একসঙ্গে অধ্যয়ন করি এই জরুরি সংকটের মোকাবিলায় তার কর্মনীতি। জানতে চেষ্টা করি, ঘটনাপ্রবাহের ওপর তার সামগ্রিক দৃষ্টি কেমন ছিল এবং কর্মক্ষেত্রে তার খোদাপ্রদত্ত বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল।
১. প্রথমেই তিনি আলেপ্পোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ দৃঢ় ও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হন এবং আলেপ্পোবাসীর মনোবল দৃঢ় রাখতে সাহসী প্রশাসক সিওয়ারকে আলেপ্পোতে ফেরত পাঠান। (৪৬৮)
২. হিমসে আক্রমণ অব্যাহত রাখার জন্য তিনি তার বাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশকে হিমসেই রেখে যান। সুতরাং হিমসের প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন নিজেদের দুর্গের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যস্ত থাকবে এবং পেছন দিক থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির ওপর আক্রমণ করতে পারবে না।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজে মূল বাহিনী নিয়ে হিমস থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত সালামিয়া অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। তার লক্ষ্য ছিল শামের মধ্যবর্তী এ অঞ্চলে অবস্থান গ্রহণ করে বাইজান্টাইন বাহিনীর গতিবিধির প্রতি খেয়াল রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তর শাম অঞ্চলের যেকোনো স্থানে দ্রুত অগ্রসর হওয়া নিশ্চিত করা।
৪. ইমাদুদ্দিন জিনকি এক বিরল ও বিস্ময়কর ধরনের বার্তা প্রেরণ করেন। পত্রটির ভাষ্য দ্বারা আল্লাহর প্রতি তার পূর্ণ নিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর সংকট নিরূপণে তার সুগভীর বোধ ও চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তিনি সে সময় বাগদাদে অবস্থানরত সেলজুক সুলতান মাসউদের কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করেন এবং তাকে আলেপ্পো ও শাম অঞ্চলের মুসলমানদের সহায়তায় একটি বিশাল বাহিনী পাঠানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন! (৪৬৯)
ইমাদুদ্দিন জিনকির এ পদক্ষেপ অনেক কিছু বলে যায়! মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে তিনি মুহূর্তের মধ্যে যেন সুলতান মাসউদের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের ইতিহাস ভুলে যান। ভুলে যান, এই সুলতান মাসউদ দু-বছর পূর্বে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তার যেন মনেই নেই যে, সুলতান মাসউদই ৫২৫ হিজরি সনে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর থেকে গত সাতটি বছর পার্থিব স্বার্থে একের পর এক অনর্থক যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টি করছেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি মুসলমানদের দুর্যোগ দূর করতে নিজের বাহিনীকে সুলতান মাসউদের শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে এ সবকিছু ভুলে যান। শুধু কি এতটুকুই! এ সময় কাজি কামালুদ্দিন শাহরাযুরি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে পুরোপুরি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'সুলতান মাসউদ তার বাহিনী নিয়ে শাম অঞ্চলে আগমন করলে নিশ্চয়ই পুরো অঞ্চলকে নিজের রাজত্বে জুড়ে নেবেন এবং এর ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্ব ও ক্ষমতার অবসান ঘটবে।' ইমাদুদ্দিন বড় আশ্চর্য উত্তর প্রদান করেন। তিনি বলেন, 'শত্রুপক্ষ মুসলিম ভূখণ্ড দখলে লালায়িত হয়ে উঠেছে। তারা আলেপ্পো দখল করে নিতে পারলে শাম অঞ্চলে ইসলামের অস্তিত্বই থাকবে না। আর শাম অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কাফিরদের হাতে না থেকে যেকোনোভাবে মুসলমানদের হাতে থাকা আমার কাম্য।' (৪৭০)
এই বিস্ময়কর চেতনা এবং এই অপূর্ব নিষ্ঠাই ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির বিজয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকারণ। কত পার্থক্য সেই দু-ব্যক্তির মাঝে, যাদের একজন কাজ করে আল্লাহর জন্য, আর অন্যজন কাজ করে নিজের স্বার্থপূরণের জন্য!
ইমাদুদ্দিন জিনকি শামের মুসলমানদের সহায়তায় বাহিনী প্রেরণের জন্য সুলতান মাসউদকে উৎসাহিত করতে বাগদাদে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন এবং খোদ কামালুদ্দিন শাহরাযুরিকে প্রতিনিধিদলের প্রধান নির্বাচন করেন।
৫. নিষ্ঠাবান বীর সেনানী ইমাদুদ্দিন জিনকি আরেকটি অভিনব বার্তা প্রেরণ করেন জাযিরা অঞ্চলে তার চরম বিদ্বেষী প্রতিপক্ষ রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান উরতুকির কাছে! (৪৭ ১) বিগত এক দশক ধরে যদিও দু-পক্ষের বিরোধ-সংঘাত চলছিল; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি চিন্তা করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পেছনের সব বিরোধ ও সংঘাত ভুলে গিয়ে ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন সম্মিলিত বৃহৎ শক্তির মোকাবিলা করতে সক্ষম একক কাঠামোয় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রচেষ্টা চালানো তার অপরিহার্য দায়িত্ব।
৬. তিনি তৃতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্র প্রেরণ করেন, যা দ্বারা পরিস্থিতি অনুধাবনে তার সূক্ষ্ম সামরিক প্রজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ত্বরিত বার্তাটি তিনি প্রেরণ করেন এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দুই মুসলিম নেতা রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের শাসক সুলতান মাসউদ বিন কিলিজ আরসালান এবং দানিশমান্দ রাষ্ট্রের শাসক মুহাম্মাদ বিন গাজি দানিশমান্দির কাছে। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাইজান্টাইনদের অধিকৃত এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ইসলামি জনপদগুলোতে হামলা চালানোর আহ্বান জানান। তিনি আশা করছিলেন, এর ফলে বাইজান্টাইন সম্রাট এশিয়া মাইনর অঞ্চলের মুসলমানদের হামলা প্রতিরোধ করার জন্য শাম ছেড়ে সেদিকে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। (৪৭২)
নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা ছিল অতি নিখুঁত, চমৎকার এবং তার অনন্যসাধারণ সামরিক জ্ঞানের অনুপম দৃষ্টান্ত।
টিকাঃ
৪৬৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৪।
৪৬৮. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৮।
৪৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩।
৪৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৬২।
৪৭ ১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২-৩০৩ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৭৯-৮০।
৪৭২, সাঈদ মাহমুদ ইমরান, আত-তারীখুল ইসলামি, পৃষ্ঠা: ২০৯।
📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ
আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন?
১. তিনি তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত বাইজান্টাইন বাহিনীকে ধাওয়া করতে ছুটে যান। তিনি বাইজান্টাইন বাহিনীর পেছনের অংশের নাগাল পেয়ে যান। তাদের সঙ্গে লড়াই হলে মুসলমানরা তাদের বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে, বন্দিও করে অনেককে। এ সময় মুসলমানরা প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। (৪৯৪) ইমাদুদ্দিন জিনকির তাড়া খেয়ে বাইজান্টাইনরা ত্রস্তপদে নিজেদের দেশে পালাতে থাকে।
২. বাইজান্টাইন বাহিনী আলেপ্পো অবরোধে যেসব ভারী ভারী অবরোধসামগ্রী ব্যবহার করেছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি সেগুলো দখলে নেওয়ার জন্য দ্রুত অগ্রসর হন। এসব অবরোধসামগ্রী তৈরিতে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছিল। তিনি অধিকাংশ অবরোধসামগ্রীই হস্তগত করতে সক্ষম হন। এসব ভারী সামগ্রী নিয়ে দ্রুত চলা সম্ভব ছিল না বিধায় বাইজান্টাইনরা বাকি সামগ্রীগুলো পুড়িয়ে ফেলে। নিঃসন্দেহে এগুলো ছিল অনেক মূল্যবান যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। (৪৯৫)
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সহকারী সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানির নেতৃত্বে একটি বাহিনী কাফারতাব থেকে বাইজান্টাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে নগরীটি পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইন বাহিনী যে মাসে প্রস্থান করে, সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ নগরটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন (৪৯৬)
৪. ইমাদুদ্দিন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন। তিনি এই মহান বিজয়ের রেশ বাকি থাকতেই হঠাৎ ত্রিপোলি রাজ্যের অধীনস্থ ইরকা দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করেন। দীর্ঘ অবরোধ ও অব্যাহত গোলাবর্ষণের পর তিনি দুর্গটি অধিকার করেন এবং সেখানে থাকা ক্রুসেড সেনাদের বন্দি করেন। (৪৯৭) এ অভিযান ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির তুখোড় সামরিক মেধার অনুপম দলিল। কারণ, স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, তিনি অভিযান চালাবেন এডেসা ও এন্টিয়কে, বাইজান্টাইন বাহিনীকে সহায়তা করার প্রতিশোধ হিসেবে। কিন্তু তিনি অভিযান চালান ত্রিপোলি রাজ্যে; যারা এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
৫. ইমাদুদ্দিন জিনকি উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধকরণের গুরুদায়িত্বও ভুলে যাননি। ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বাইজান্টাইন বাহিনীর প্রস্থানের পরই তিনি দ্রুত পতন ঘটানোর আশায় পুনরায় হিমস অবরোধ করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সারা জীবনে কখনোই বিশ্রাম খোঁজেননি। এমনকি শাইজার নগরপ্রাচীরের কাছে এত পরিশ্রমের পরও সামান্য অবসর না নিয়ে তিনি পুনরায় অবতীর্ণ হন উম্মাহর কল্যাণের ময়দানে।
কিন্তু এবারের হিমস অবরোধকালে ইমাদুদ্দিন জিনকি ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বনের চিন্তা করেন। এতে সামান্য পরিশ্রমেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যাবে; পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বহু নগরী জিনকি রাজ্যভুক্ত করার পথ খুলে যাবে। তিনি দামেশকের অধিপতি শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির ঘনিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'রাজনৈতিক বিয়ে' সম্পাদনের পরিকল্পনা করেন। ইমাদুদ্দিন বিনিময় হিসেবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করে শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরির মা সাফওয়াতুল মালিক যামরাদ খাতুনকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান!
কারও কৌতূহল হতে পারে, বিয়ের বিনিময়ে কিছু না দিয়ে তিনি উল্টো কীভাবে হিমস নগরীর কর্তৃত্ব দাবি করতে পারেন?!
উত্তর হলো, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি বিয়ের পর স্ত্রীকে মোহর ও বিভিন্ন মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রদান করেছিলেন। তবে তিনি হিমসের কর্তৃত্ব দাবি করেছিলেন সেই মহা গৌরবের বিনিময়ে, যা তার স্ত্রী সে যুগের মহাবীর ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার মাধ্যমে লাভ করেছিলেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি তখন মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাজ্য শাসন করছেন। তিনি সেই দুঃসাহসী বীর, ক্রুসেডার ও বাইজান্টাইনের বিরুদ্ধে যার রয়েছে ধারাবাহিক বিজয়-গৌরব। এমন ব্যক্তির সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে পারা নিঃসন্দেহে অতি মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রত্যাশা পূরণ হয়। শিহাবুদ্দিন মাহমুদ এ প্রস্তাবে সম্মতি জানান। সে মাসেই অর্থাৎ ৫৩২ হিজরি সনের রমজান মাসে বিয়ে সম্পন্ন হয়(৪৯৮) এবং হিমস ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়।
টিকাঃ
৪৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০৩ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৫. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৮।
৪৯৬. প্রাগুক্ত, ২/২৬৮।
৪৯৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৮৪।
৪৬৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৯।