📄 দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা
এমন উত্তাল ঘটনাবহুল সময়েও ইমাদুদ্দিন জিনকি তার মূল ও প্রধান লক্ষ্য থেকে উদাস থাকেননি। সুলতান মাসউদের বিজয় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পরও তিনি তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী সুলতানের প্রতি প্রতিশোধপ্রবণ হওয়ার সামান্য চিন্তাও করেননি। অথচ ইমাদুদ্দিন জিনকির সেনাশক্তি, জনমনে তার মর্যাদা ও সম্মান সুলতান মাসউদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি কোনো পারিপার্শ্বিক যুদ্ধে জড়িয়ে উম্মাহকে দ্বিধাবিভক্ত করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি বরং সব সময় জীবনের সবচেয়ে বড় দুই গুরুদায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকতে সচেষ্ট ছিলেন— মুসলমানদের ঐক্য ও ক্রুসেডবিরোধী জিহাদ।
সে মতে ইমাদুদ্দিন জিনকি ৫৩০ হিজরি সনের শেষ ও ৫৩১ হিজরি সনের শুরু ভাগে চারটি মৌলিক বিষয়কে কেন্দ্র করে কাজ করে যান।
১. খলিফা মুকতাফি লি-আমরিল্লাহর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা। উদ্দেশ্য ছিল আব্বাসি কাঠামোর সঙ্গে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ার নিশ্চয়তা লাভ। যদিও আব্বাসিরা তখন উদ্বেগ জাগানোর মতো কোনো শক্তি ছিল না; কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে এটি স্পষ্ট ছিল যে, দুর্বল হলেও মুসলমান জনসাধারণ তখনও খলিফার মত ও সম্মানের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছিল। তদুপরি নতুন খলিফা একজন সদাচারী, জনপ্রিয় ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। (৪৪১)
২. হুসামুদ্দিন তামারতাশের সহায়তায় জাযিরা অঞ্চলের দিকে জিনকি রাজ্যের বিস্তৃতি। ইমাদুদ্দিন ও তার মিত্র হুসামুদ্দিন মিলে দিয়ারে বকরের উত্তরে অবস্থিত জুর পাহাড় ও সিওয়ান অঞ্চলে সম্মিলিত অভিযান পরিচালনা করেন। এর মধ্য দিয়ে জাযিরা অঞ্চলে জিনকি রাষ্ট্র যথেষ্ট বিস্তৃতি লাভ করে এবং ঐক্য পরিকল্পনার বিরোধীরা কার্যত নিষ্ক্রিয় ও শান্ত হয়ে যায়। ফলে জাযিরা অঞ্চলের পরিস্থিতিও অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে আসে। ইমাদুদ্দিন জিনকিও নিশ্চিন্তে ক্রুসেডার দমনে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পান। (৪৪২)
৩. হিমস নগরী! দামেশকের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমস নগরী। তদ্রূপ ইমাদুদ্দিন জিনকি যদি এন্টিয়ক বা ত্রিপোলি রাজ্যে অভিযান পরিচালনা করতে চান, তখনও তার পৃষ্ঠদেশে দুর্বলতার তিলক-চিহ্ন হয়ে থাকবে হিমস। ইমাদুদ্দিন বারবার অবরোধ-চেষ্টা চালালেও নগরটি জয়ে ব্যর্থ হন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির অব্যাহত চেষ্টায় হিমসের শাসক কুরাইশ বিন খায়র খানের অন্তর্জগৎ প্রকম্পিত হয়ে পড়ে। তিনি নিরুপায় হয়ে হিমসের নিয়ন্ত্রণ দামেশকের অধিপতি শিহাবুদ্দিন মাহমুদের হাতে সমর্পণ করেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্তৃত্ব থেকে নগরীটিকে রক্ষা করতে তার সহযোগিতা কামনা করেন। শিহাবুদ্দিন হিমসের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব প্রদান করেন তার সবচেয়ে শক্তিশালী ও কঠোর সেনাপতি মুইনুদ্দিন আনুরকে। (৪৪৩)
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ক্রুসেডারদের দমন। ইমাদুদ্দিন জিনকি ক্রুসেডারদের সুসংগঠিত হওয়ার সামান্য সুযোগও দিতে চাচ্ছিলেন না। তাই তিনি কদিন পরপরই অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা চালাতে থাকেন। এমনই এক অভিযানে তিনি লাতাকিয়া অঞ্চলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জন করেন। তিনি লাতাকিয়া অঞ্চলের ক্রুসেড দুর্গগুলো গুঁড়িয়ে দেন, প্রচুর সৈন্যকে হত্যা করেন এবং একবারেই বন্দি করেন সাত হাজারের অধিক ক্রুসেড সেনাকে। মুসলিম বাহিনী অগণিত যুদ্ধলব্ধ সম্পদও লাভ করে। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে প্রাপ্ত ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, গরু ও মেষের সংখ্যাই ছিল এক লক্ষের অধিক! আর ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের ভাষ্যমতে পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার ও আসবাবপত্রের পরিমাণ ছিল গণনাতীত!
এই মহান বিজয় বাস্তবার্থেই মুসলমানদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। এটি ছিল ৫৩০ হিজরি সনের শাবান মাসের ঘটনা। (৪৪৪)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এই চারটি কেন্দ্রে সম্মিলিতভাবে তার কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখলেও নিজের পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। সুলতান মাসউদ আবারও যেন কোনো ধরনের প্রতারণা করতে না পারেন, এজন্য তিনি ইরবিল ও বাগদাদের মধ্যবর্তী দাকুকা নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। দাকুকার অবস্থান ছিল মসুলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। এখন থেকে দাকুকা নগরী তার ও সুলতান মাসউদের শাসিত অঞ্চলের মধ্যে প্রতিবন্ধকরূপে বিবেচিত হবে। সুলতান মাসউদ যদি মসুলে কোনো ধরনের অভিযান চালাতে চান, দাকুকা থেকে ইমাদুদ্দিন তা জেনে ফেলবেন এবং আকস্মিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন না। ৫৩১ হিজরি সনের শুরুতে তিনি নগরীটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৪৪৫)
টিকাঃ
৪৪১, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৪৪৩ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৬৭-৭১।
৪৪২, ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ১১৯।
৪৪৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯৮।
৪৪৪. প্রাগুক্ত, ৯/২৯১।
৪৪৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০০।
📄 জেগে উঠেছে মুজাহিদদের আত্মমর্যাদাবোধ!
এরপর আল্লাহ তাআলা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে ক্রুসেডারদের শক্তিকে আরও দুর্বল করার ব্যবস্থা করে দেন। বাযওয়াশ নামক দামেশকের জনৈক সেনাপতি এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে ওঠেন। অথচ ইতিপূর্বে আমরা দামেশককে প্রয়োজনে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় করতেও দ্বিধা করতে দেখিনি! নিকট ভবিষ্যতেও আমরা এর আরেকটি দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করব। ব্যতিক্রমী এই ঘটনার বিবরণ হলো, এই সেনাপতি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে ত্রিপোলি অভিমুখে অগ্রসর হন। এ অঞ্চল ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের বেশ কিছু তুর্কমেন সৈন্যও তাকে সহায়তা করে। তারা দ্রুতবেগে ত্রিপোলি রাজ্যে হামলা চালায়। মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় ত্রিপোলির শাসক পন্স বেরিয়ে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। পন্সের পিতামহ ৪র্থ রেমন্ডের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট গিল্স দুর্গের নিকটে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধে ত্রিপোলির শাসক পন্স নিহত হন; বন্দি হয় প্রচুর ক্রুসেড সেনা। পাশাপাশি প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। (৪৪৬) ৫৩১ হিজরি সনের রজব মাসে (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি উম্মাহর হৃদয়ে সুপ্ত জিহাদি চেতনাকে এমনভাবে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, কখনোই জিহাদে অভ্যস্ত নয় এমন এক বাহিনী জিহাদের জন্য বেরিয়ে এসেছে এবং বিরাট সফলতা এনে দিয়েছে। তারা শুধু ত্রিপোলির ক্রুসেডশক্তির সমূহ ক্ষতিসাধনই করেনি, কার্যত ক্রুসেড শিবিরের দম্ভই চূর্ণ করে দিয়েছে।
পন্সের মৃত্যুর পর ত্রিপোলি রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন তার পুত্র ২য় রেমন্ড (Raymond II)। কঠিন সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের মাঝে শুরু হয় তার শাসনামল।
হিলাল-ছালিব সংঘাতের ইতিহাসে এ যুদ্ধটি এক বিস্ময়কর যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কারণ, তৎকালীন দামেশক-প্রশাসন ও দামেশকের সেনাপতিগণ ক্রুসেডারদের অত্যন্ত নিকটভাজন ছিল। এমনকি তারা ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধের লক্ষ্যে পরস্পর পত্রবিনিময় করত। এতে অনুমিত হয় যে, ত্রিপোলির এ যুদ্ধ ছিল দামেশক বাহিনীর একটি অংশের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, যাতে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে শক্তি জুগিয়েছিল প্রচুর সংখ্যক তুর্কমেন সৈন্য। তাদের হাত ধরেই এরূপ মহান বিজয় ও প্রভাবক ফলাফল অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এরপরও দামেশক-ক্রুসেডার মিত্রতায় তেমন একটা ফাটল ধরেনি! আর তাই এ সম্ভাবনাই দৃঢ়তা লাভ করে যে, ত্রিপোলি অভিযানে অংশগ্রহণকারী দামেশক বাহিনী মোটেও তৎকালীন দামেশক প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করেনি।
টিকাঃ
৪৪৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯৮ ও Guillaume de Tyr., pp. 640.
📄 বারিনের যুদ্ধ
বিষয়টি আরও নিশ্চিত হয় পরবর্তী মাসের অর্থাৎ ৫৩১ হিজরি সনের শাবান মাসের একটি ঘটনায়। এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি হিমস নগরী অবরোধ করেন। দামেশক অধিপতি শিহাবুদ্দিন কর্তৃক নিযুক্ত হিমসের প্রশাসক মুইনুদ্দিন আনুর শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললেও একসময় অনুভব করেন, তার প্রতিরোধশক্তি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। তখন তিনি দ্রুত ক্রুসেডার নেতাদের কাছে সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। স্বয়ং বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ফাল্কের নেতৃত্বে ক্রুসেডারদের একটি বাহিনী হিমস রক্ষায় ছুটে আসে। এমনকি বাহিনীটিতে ত্রিপোলির নতুন শাসক ২য় রেমন্ডও ছিলেন, যার পিতা পন্স কদিন আগেই দামেশকের বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন! (৪৪৭) হিমস, দামেশক ও ক্রুসেডারদের সম্মিলিত শক্তি কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুললে ইমাদুদ্দিন জিনকি হিমসের অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু এ ঘটনার মাধ্যমে তার সামনে; বরং সকল মুসলমানের সামনে মুইনুদ্দিন আনুর ও শিহাবুদ্দিনের স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়ে যায়। তাদের এ অবস্থান অতি নিকৃষ্ট হলেও এর দ্বারা অন্তরালের পাতা উন্মোচিত হয়ে যায় এবং তাদের দুষ্ট মনোবৃত্তি প্রকাশ পেয়ে যায়। যে মুসলিম নেতাকে জবরদখলকারী জালিমরা সহযোগিতা করে, সে যে একজন দালাল নেতা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার কাজে-কর্মে ও চিন্তায়-দায়িত্বে ন্যূনতম নিষ্ঠা নেই। তার প্রতিটি কর্মতৎপরতা কেবল নিজের স্বার্থে। উম্মাহর সর্বময় বিজয়ের আশা অন্তত তার কাছ থেকে করা যায় না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও হিমসের পতন ঘটাতে ব্যর্থ হন; কিন্তু ক্রুসেডাররা শামের এত ভেতরে চলে আসায় তিনি এবার তাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের সুযোগ পেয়ে যান। এ বিষয়টিও তার বিবেচনায় ছিল যে, তুলনামূলক নিকটবর্তী ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলি এই কিছুদিন আগেই কঠিন পরাজয়-গ্লানির শিকার হয়েছে এবং তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শাসক পন্সের মৃত্যু হয়েছে। আরেক ক্রুসেডার নেতা ফাল্কও অনেক দূর থেকে এসেছেন; দুর্যোগে পড়লে সহসা নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ তার জন্য কঠিনই বটে। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি কৌশলে ক্রুসেডারদের হিমসের নগরপ্রাচীর থেকে দূরে টেনে এনে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি তিনি ক্রুসেডারদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করার মনস্থ করেন, যাতে তারা যুদ্ধ না করে রাজ্যে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করার পরিবর্তে যুদ্ধের পথই বেছে নেয়।
তিনি কী পরিকল্পনা করেন?
ইমাদুদ্দিন জিনকি ক্রুসেডারদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এক স্থাপনায় হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, যাতে ক্রুসেডাররা তা রক্ষায় বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসে এবং তার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইমাদুদ্দিন জিনকির নির্বাচিত সে স্থাপনাটি ছিল নাসিরিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রকাণ্ড বারিন দুর্গ। দুর্গটি বাকিয়া (Peki'in) অঞ্চলগামী পথের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। (৪৪৮)
বারিন দুর্গের অত্যধিক সামরিক গুরুত্বের আরেকটি কারণ হলো, দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে ওরোন্টেস নদীর অববাহিকার ওপর পূর্ণ নজর রাখা যেত। আর তাই মুসলমানরা যদি দুর্গটি জয় করতে পারে, তাহলে তারা উত্তরের এন্টিয়ক এবং দক্ষিণের ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের মধ্যকার যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে। তা ছাড়া দুর্গটি থেকে হিমস ও হামা নগরীর ওপরও সরাসরি নজরদারি করা সম্ভব ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনামতোই ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যেতে থাকে। ক্রুসেডার বাহিনী অতি গুরুত্বপূর্ণ বারিন দুর্গের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসে। দুর্গটি তখন ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখানেও প্রচুর সংখ্যক ক্রুসেডার সৈন্য অবস্থান করছিল।
বারিন দুর্গের পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত ময়দানে ৫৩১ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১১৩৭ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ।
এ যুদ্ধের নাম বারিনের যুদ্ধ (Battle of Ba'rin) ।
বারিনের যুদ্ধে তৎকালীন ক্রুসেড শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ফাল্ক ও ত্রিপোলির শাসক ২য় রেমন্ড অংশগ্রহণ করেন। তুমুল যুদ্ধ হয় দু-পক্ষের মধ্যে। ময়দানজুড়ে বিক্ষিপ্ত পড়ে থাকে অসংখ্য লাশ। উভয় পক্ষের সৈন্যদের অস্থির বিচরণ আর অশ্বের ছোটাছুটিতে ধুলো-মেঘে ঢাকা পড়ে সবকিছু। তবে অল্পক্ষণ পরেই মেঘ কেটে উদ্ভাসিত হয় চূড়ান্ত ফলাফল! মুসলমানদের পদচুম্বন করে এক আলোকিত বিজয়-গৌরব!
ক্রুসেডার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়, জীবিত ও আহতদের সিংহভাগ হয় বন্দি। বন্দিদের মাঝে ত্রিপোলির নতুন শাসক ২য় রেমন্ডও ছিলেন। রাজা ফাল্ক অবশ্য কিছু সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী বারিন দুর্গে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন।(৪৪৯) তিনি এন্টিয়কের শাসক রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স ও এডেসার শাসক ২য় জোসেলিনের কাছে ত্বরিত সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং তাদের দুজনকে দ্রুত নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে সুরক্ষিত বারিন দুর্গে অবরুদ্ধ ক্রুসেডারদের রক্ষায় চলে আসতে বলেন।(৪৫০)
ইমাদুদ্দিন জিনকিও যুদ্ধের পর বিলম্ব না করে দুর্গ ঘিরে শক্ত অবরোধ আরোপ করেন এবং দুর্গে প্রবেশের সকল পথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সব ধরনের সাহায্যের পথ রুদ্ধ করে দেন। ফলে রাজা ফাল্ক বহির্বিশ্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দুর্গের বাইরে কী ঘটছে, তা জানার কোনো উপায় এখন তার নেই।(৪৫১)
মুসলিম বাহিনী দিনরাত একটানা প্রকাণ্ড দুর্গটির প্রাচীর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ অব্যাহত রাখে। সুস্পষ্টই অনুমিত হচ্ছিল, দুর্গটির পতন নিয়ে কোনো সংশয় নেই, সংশয় কেবল তার সময়কাল নিয়ে। ওদিকে অবরুদ্ধ ক্রুসেডারদেরও বড় ধরনের সামরিক সহায়তা আসার পূর্বে যুদ্ধের লক্ষ্যে বের হওয়ার ন্যূনতম ইচ্ছা ছিল না।
টিকাঃ
৪৪৮. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৫৮-২৫৯।
৪৪৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯৮।
৪৫০. Guillaume de Tyr., pp. 644-645.
৪৫১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯৯।
📄 বাইজান্টাইন সহায়ক বাহিনী
ইমাদুদ্দিন জিনকি বিশালকায় দুর্গটি অবরোধ করে রাখেন। এরই মধ্যে সংবাদ আসে এডেসা ও এন্টিয়কের বাহিনী বারিন দুর্গ অভিমুখে এগিয়ে আসছে। বরং হঠাৎ করেই এ অঞ্চলে বাইজান্টাইন বাহিনীর আবির্ভাবের সংবাদও প্রকাশ পায়। ক্রুসেড যুদ্ধ ইতিহাসে এই প্রথম পূর্ণ শক্তির বাইজান্টাইন বাহিনী এ অঞ্চলে পা রাখতে যাচ্ছে!
পরিস্থিতি আসলেই জটিল দিকে মোড় নিচ্ছিল। কারণ, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সুবিশাল বাহিনী যদি এডেসা ও এন্টিয়কের ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হয়, তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি উল্টো অবরুদ্ধ হয়ে পড়বেন। সামনে দুর্গের ভেতরে আছে ক্রুসেডার বাহিনী আর পেছনে বাইজান্টাইন- ক্রুসেডার সম্মিলিত বাহিনী! এতে হয়তো আগের বিজয়ের অর্জন এক ধাক্কায় ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
প্রশ্ন হলো—হঠাৎ করে কেন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এ অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করতে উদ্যোগী হলো? এর মূল কারণ ছিল দুটি।
১. রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জো বারিন দুর্গে অবরুদ্ধ হওয়ার পরই এডেসা ও এন্টিয়কের পাদরি ও সন্ন্যাসীদের একটি প্রতিনিধিদল বাইজান্টাইন রাজপ্রাসাদে পৌঁছে বাইজান্টাইন সম্রাটকে বারিন দুর্গে অবরুদ্ধ ক্রুসেডারদের উদ্ধারে হস্তক্ষেপ করার আবেদন জানায়। তারা সম্রাটকে সতর্ক করে বলে যে, রাজা ফাল্ক নিহত হলে মুসলমানদের জন্য বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়ে যাবে। (৪৫২)
২. এডেসার পদচ্যুত শাসক এলিসের কন্যা কন্সটেন্সকে রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স বিয়ে করায় বাইজান্টাইন সম্রাট প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলেন। কারণ, এর পূর্বেই তার পুত্রের কাছে কন্সটেন্সকে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। সম্রাট-পুত্রের জন্য প্রস্তাব পাঠানোর পর অন্য ছেলের কাছে কন্সটেন্সকে বিয়ে দেওয়াকে সম্রাট মহা অপমান বিবেচনা করেছিলেন। অধিকন্তু এর ফলে এন্টিয়ক রাজ্যকে সরাসরি বাইজান্টাইন কর্তৃত্বে নিয়ে আসার সুবর্ণ সুযোগও হাতছাড়া হয়েছিল। (৪৫৩)
এভাবে হঠাৎ করেই প্রেক্ষাপট বদলে যায় এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি ও মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ভীতিকর পরিস্থিতির অবতারণা হয়।
এখন কী করবেন আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি?!
তিনি বহির্বিশ্বের সঙ্গে রাজা ফাল্কের বিচ্ছিন্নতার সুযোগ কাজে লাগান এবং দুর্গ লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ আরও জোরদার করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি আশা করছিলেন, রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জো এতে ভীত হয়ে যেকোনো শর্তে দুর্গ সমর্পণে সম্মত হবেন। তখন যৌথ খ্রিষ্টান বাহিনী পৌঁছার আগেই বারিন দুর্গ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ইমাদুদ্দিন জিনকি যেমন আশা করেছিলেন, তেমনই ঘটে। রাজা ফাল্ক দুর্গের অবরোধ তুলে নিতে সমঝোতা আলোচনার প্রস্তাব পাঠান। (৪৫৪)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন!
এ ঘটনা কোনো বিরল বা আকস্মিক বিষয় ছিল না। যারা আল্লাহর দ্বীনের সহযোগিতা করে, আল্লাহ সর্বদা তাদের সহযোগী হন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُدْفِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ
নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতিরক্ষা করেন। জেনে রেখো, আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। [সুরা হজ্জ: ৩৮]
টিকাঃ
৪৫২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯৯ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৩৭।
৪৫৩. Stevenson: op.cit., p.138.
৪৫৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬২।