📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 চলমান ফিতনা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিচ্ছিন্নতা

📄 চলমান ফিতনা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিচ্ছিন্নতা


উম্মাহর এই ঘনঘোর দুর্যোগকাল অনেকের শক্তি ও সম্ভাবনার পরিধি প্রকাশ করে দিচ্ছিল, উন্মোচিত করছিল ব্যক্তির স্বভাব ও অন্তর্নিহিত মনোভাব। প্রশ্ন হলো—এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সঠিক ও বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াই-বা কী হতে পারে?
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার পিতার মতোই সেলজুক সালতানাতের আনুগত্যে অভ্যস্ত ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সেলজুক সুলতানই বর্তমানের সর্বোচ্চ শক্তি এবং শাসনব্যবস্থার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। সেলজুক সুলতানই মুসলমানদের জাতীয় বিষয়সমূহ নিয়ে চিন্তা করেন, উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নে ব্রতী হন। শুরু থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকি এমনটিই ভাবতেন। কিন্তু অতীতের সুলতান ও বর্তমানের সুলতানদের মাঝে তো কত পার্থক্য! যেন আকাশপাতাল ব্যবধান!
আলপ আরসালান, মালিকশাহ, বারকিয়ারুক বা সুলতান মুহাম্মাদের মতো দৃঢ়চেতা সুলতান কি একজনও আছেন বর্তমানে সংঘাতরত সুলতানদের কাতারে?! এমনকি বয়সে প্রবীণ না হলেও প্রয়াত সুলতান মাহমুদেরও একটি স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল; মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার স্পৃহা ছিল। অধিকন্তু প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের পরাভূত করার মতো পর্যাপ্ত শক্তিও তার ছিল। আর তাই তার শাসনামলে সাম্রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজ করত; তিনি বহিঃরাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা-পরিকল্পনার সুযোগ পেতেন, বিশেষ করে ক্রুসেডারদের বিতাড়নের বিষয়ে ভাবতে পারতেন।
অপরদিকে বর্তমানের এই খর্ব শক্তির সুলতানগণ কীসের ভিত্তিতে ক্রমাগত লড়ছেন?!
একজনও কি দাবি করতে পারবেন, এ লড়াই আল্লাহর জন্য?!
বরং একজনও কি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবেন, এই বিবাদে তিনিই আছেন ন্যায়ের পক্ষে; অন্যরা নয়?!
তারা কেন, ঘটনার সমসাময়িক যারা, তারাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারত না, চলমান বিরোধে অমুকই বৈধ দাবিদার আর বাকিরা অন্যায় দাবি করছে! এ কারণেই আমরা দেখেছি, এ সময় অনেক সেনাপতি, রাজন্য, সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণ কদিন পরপরই এক সুলতানকে রেখে আরেক সুলতানের আনুগত্য শুরু করেছে। এটি কিন্তু নীতি-আদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রের দুর্বলতা ছিল না; ছিল দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের দুর্বলতা।
তা ছাড়া সংঘাতরত সুলতানদের সকলেই ছিল দুর্বল; কিংবা তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বলা যায়, সকলেই ছিল প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। এ কারণেই একজন হয়তো কয়েক মাস বা কয়েকদিন সুলতান পদ ধরে রাখতে পারত, তারপরই অন্য একজন তাকে সরিয়ে তার জায়গা দখল করত! এক এলাকায় একজনের নাম সুলতান হিসেবে ঘোষিত হতো, একই সময়ে আরেক অঞ্চলে ঘোষিত হতো আরেকজনের নাম! খলিফা আজ এক সুলতানের পাশে দাঁড়াতেন, তো কাল আরেকজনের পাশে। আগামী পরশুই হয়তো তাকে দেখা যাবে তৃতীয়জনের পক্ষাবলম্বন করতে!
এ এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, যা অতি সহনশীল ব্যক্তিকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ছাড়বে!
সুলতান মাহমুদের মৃত্যু-পরবর্তী তিন বছরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছেন সুলতান দাউদ, সুলতান মাসউদ, সুলতান তুগরল, সুলতান মাসউদ এবং এখন আবার সুলতান তুগরল। কারও জানা নেই, আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে সুলতান হিসেবে কাকে দেখতে পাবে?!
এটা কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো বিষয়?! কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য?!
এদিকে উচ্চাভিলাষী খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহও সংঘাতের স্বতন্ত্র একটি পক্ষে পরিণত হয়েছেন। সবাইকে আপন নির্দেশনা মানতে বাধ্য করার মতো বড় না হলেও তারও একটি মোটামুটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। কিন্তু তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে এখন পরিণত হয়েছেন চলমান সমীকরণে অন্যদের হাতে ব্যবহৃত এক প্রভাবক উপাদানে। সামনে কি এমন সময় আদৌ আসবে, যখন খলিফা কেবল নামে নয়, দায়িত্ব ও প্রভাবক্ষমতায়ও খলিফাতুল মুসলিমীনে পরিণত হবেন?!
এমন ক্রম পরিবর্তিত সময়ে এটি বড় জটিল প্রশ্নই বটে!
আমরা বরং আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে বিচরণ করি!
তিনি তাদের মধ্য হতে কার সঙ্গে যুক্ত হবেন? কাকে সাহায্য করবেন? তার দৃষ্টিতে চলমান সংঘাতে কোন পক্ষ মহান ও শ্রেষ্ঠ?
শুরুতে তিনি সুলতান মাসউদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। কারণ, সংঘাতে জড়ানো ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠতম। ইমাদুদ্দিন জিনকির মনে হয়েছিল, অন্যদের তুলনায় তার সালতানাত লাভের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা সকলেই দুর্বল; চারিত্রিক উৎকর্ষ ও স্বভাবগত নম্রতা থাকলেও সকলেই পার্থিব স্বার্থান্বেষী। এখন তিনি কী করবেন? সুলতান মাসউদকেই সঙ্গ দিয়ে যাবেন, অন্য কোনো সুলতানের পক্ষ নেবেন, নাকি খলিফার পাশে দাঁড়াবেন?!
হতভম্ব করে দেওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি!
বরং অতি জটিল পরিস্থিতি!
জটিলতা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ জানেন?!
জটিলতার কারণ কেবল এই নয় যে, পরস্পরবিরোধী অনেকজনের মধ্য হতে একজনকে বেছে নিতে হবে। জটিলতার কারণ আরও জটিল! সময় ততদিনে প্রমাণ করে দিয়েছে, ইমাদুদ্দিন জিনকি সবার চেয়ে শক্তিশালী!
তিনি সমকালীন সকল সুলতানের চেয়ে শক্তিশালী, প্রতাপশালী আব্বাসি খলিফার চেয়েও। কেবল বিশ্বাসশক্তি ও চরিত্রগুণের বিচারে নয়; সামরিক ও জাগতিক শক্তির বিবেচনায়ও তিনি তাদের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি তাদের চেয়ে যোগ্য ও শক্তিশালী চিন্তায়, মেধায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও। তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি ক্রুসেডার বিতাড়নকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র শাসক, যিনি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধকরণের কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, যিনি নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে আলিম ও ফকিহদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
জনপ্রিয়তায়ও তিনি সবার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের জনগণের হৃদয় তার প্রতি ধাবমান। তার প্রতিটি সংবাদ জানার জন্য সকলের হৃদয়জগৎ উন্মুখ, ভালোবাসায় টইটম্বুর। জনসাধারণের মাঝেও তার বিষয়ে দ্বিমত নেই। বিপরীতে এসব সুলতানের কারও সঙ্গে কি জনসাধারণের সামান্য সখ্য আছে? সালতানাতের মসনদে তুগরল আছেন, না মাসউদ; সেলজুকশাহ, না দাউদ বিন মাহমুদ, জনতার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন ঘটে?! বরং তারা চারজন বাদে পঞ্চম-ষষ্ঠ বা দশম কোনো ব্যক্তিও মসনদে আরোহণ করলে জনমনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা আলাদা গুরুত্ব রাখবে না।
এটিই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকিই কেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান ব্যক্তি হবেন না? যে দায়িত্ব সুলতান পালন করেন, সে দায়িত্ব কেন তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেবেন না? নিঃসন্দেহে বড় ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্ন!
কিন্তু এটিই বাস্তব প্রশ্ন!
হয়তো এ প্রশ্নের দুঃখজনক উত্তর হবে—তিনি তো সেলজুক পরিবারের সদস্য নন। তাহলে তিনি কীভাবে সেলজুক সুলতানের স্থলাভিষিক্ত হবেন?!
কিন্তু সুলতান হতে হলে কি সেলজুক পরিবারের সদস্য হওয়া জরুরি?! খলিফাকে আব্বাসি পরিবারেরই হতে হবে?! শাসনক্ষমতা কি বংশগত অধিকার?!
এগুলো নিশ্চয়ই দুঃসাহসী প্রশ্ন; কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর এমন অনেক ভুল প্রকাশ করে দেবে, মুসলিম উম্মাহ তার যাপিত জীবনে বারবার যার শিকার হয়েছে।
আমি বলছি না, পিতার পর তার পুত্র রাষ্ট্রশাসনভার গ্রহণ করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন; শর্ত হলো সন্তানকে হতে হবে মালিকশাহর মতো; যিনি পিতা আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এই উত্তরাধিকার শরিয়তের কোনো মূলনীতি লঙ্ঘন করেনি; প্রশাসনিক রীতিনীতি বিনষ্ট করেনি।
একজন মুসলিম প্রশাসকের মাঝে জ্ঞান, শক্তি, সদাচার, শরিয়তের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিপুণ কূটনীতির মতো অপরিহার্য কিছু গুণ বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। কোনো ভাই বা পুত্রের মাঝে এসব গুণ বিদ্যমান থাকলে প্রয়াত ভাই বা পিতার পর তার স্থলাভিষিক্ত হতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এসব গুণ না থাকা সত্ত্বেও কেবল পূর্ববর্তী শাসকের আত্মীয়তার 'যোগ্যতা'বলে মুসলমানদের শাসক বনে যাওয়া না ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ, না বিবেকের যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য।
সেলজুক সাম্রাজ্যকাল ছিল মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ কথা প্রযোজ্য সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তুগরল বেগ, এরপর আলপ আরসালান, মালিকশাহ ও অন্যান্য প্রতাপশালী সুলতানের শাসনামলের ক্ষেত্রে, যারা ইসলামের পতাকা সমুন্নত করেছিলেন। কিন্তু সেলজুকদের শক্তি ও প্রভাব যখন ঝিমিয়ে আসে, তখন ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখতে অন্য কারও এগিয়ে আসাই ছিল বাস্তবতার দাবি। সুনির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে তো উম্মাহর অস্তিত্ব শেষ করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে-ইমরান: ১৪০]
এ রাজত্ব তো অন্য এক পরিবারের হাত থেকেই সেলজুক পরিবারের হাতে এসেছিল। সুতরাং এমন একদিন আসবেই, যখন তাদের হাত থেকে কর্তৃত্ব চলে যাবে অন্য কারও হাতে।
স্পষ্টতই অনুমিত হচ্ছিল, তৎকালে সেই 'অন্য' হতে যাচ্ছেন ইমাদুদ্দিন জিনকি!
জিহাদের অঙ্গনে তার অবিচলতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, অবস্থান ও মর্যাদা সে যুগে তাকে এ পদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছিল। সালতানাতের পদ নিয়ে যারা সংঘাতে লিপ্ত ছিল, তাদের মধ্যে কে যোগ্যতা ও মর্যাদায় তার কাছে ভিড়তে পারে? অন্য সব বিষয় না হয় বাদ দিলাম, কেবল অভিজ্ঞতার কথাই বলি! তারা সকলেই তো ছিল বয়সে নবীন, অভিজ্ঞতায় কাঁচা। বয়সে তাদের জ্যেষ্ঠতম ছিলেন সুলতান মাসউদ; ৫২৮ হিজরি সনে তার বয়স সাতাশ পেরোয়নি। অথচ সে সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির বয়স ছিল একান্ন বছর! তিনি পদে পদে হাজারো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, ঘটনা-দুর্ঘটনার দুর্বিপাকে জ্বলে-পুড়ে সমৃদ্ধ হয়েছেন, সুনিপুণ দক্ষতায় কাছের-দূরের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার শক্তি ও দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার কথা সকলে জানে। তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব লাভ করেন, সকলে তাতে সুখী হবে, সকলে তার নির্দেশনা মেনে নেবে।
কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এখন কী করবেন?!
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার রাজ্য নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন?
নাকি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল একজনের পাশে দাঁড়াবেন এবং তাকে শক্তিশালী করবেন?
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করলে হয়তো পুরো সেলজুক পরিবার একসঙ্গে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে! কারণ, তিনি তো সেলজুক পরিবারের কেউ নন। তখন তো রাষ্ট্র উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতিত হবে! জাতি আটকে যাবে সংঘাতের এক গোলকধাঁধায়!
আর তিনি যদি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল এক পক্ষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে দুর্বল সেই ব্যক্তি হয়তো এমন পদে অধিষ্ঠিত হবে, সে যার যোগ্য নয়; এমন অবস্থানে পৌঁছে যাবে, যা তার যথোচিত নয়। এটা তো হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং উম্মাহর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
তা ছাড়া এই আত্মঘাতী গৃহবিবাদের স্রোতে ক্রুসেডার বিতাড়ন তৎপরতা পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে যাবে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি কী করবেন?!
মহৎপুরুষদের চিন্তাধারা তো অভাবনীয়ই হয়ে থাকে!
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চলমান বিরোধের নথিপত্র পুরোপুরি বন্ধ করে তিনি মনোযোগ দেবেন ক্রুসেডারদের দমনে। তিনি সচেষ্ট হবেন নির্যাতিত-নিপীড়িত, অধিকার ও মর্যাদাবঞ্চিত, আপন বসতভিটা থেকে বিতাড়িত মুসলমানদের ঠোঁটে হাসি ফিরিয়ে আনতে।
কিন্তু ফিতনার এমন ভীতিপ্রদ জটিল সময়ে এমন চিন্তা বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হতে পারে?!
ইমাদুদ্দিন জিনকি ভাবতে থাকেন। অনেক চিন্তার পর তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, কার্যত তিনি সালতানাত ও খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথ চলবেন। তবে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আশঙ্কায় তিনি বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন না।
তিনি এসব দুর্বল সুলতানদের সবাইকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনকি তাদের চলমান সংঘাত যদি শেষ হয়ে যায় এবং কোনো একজন পরিস্থিতির ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন, তখনও তার নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে না। পক্ষান্তরে তিনি তাদের পেছনে পড়ে থাকলে অচিরেই তারা তাকে তাদের পছন্দের 'দুনিয়া'য় নিয়ে যাবে এবং তাকে নিজেদের পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের মাধ্যম বানাবে। তাই তিনিই জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন গৌরব ও মর্যাদার পথে এবং তার আগে-পরে আপন রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথে।
তার কাঁধে এক কঠিন আমানত ও দায়িত্বভার। তিনি তাই দীর্ঘ বিরোধ ও ফলহীন সংঘাতে সময় অপচয় করতে চান না।
তিনি এখনই নিজেকে উম্মাহর অনুসরণীয় প্রধান নেতা ঘোষণা করবেন না; হয়তো জাহির করবেন না কখনোই। কিন্তু তিনি কাজ করে যাবেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান নেতার মতো করে। একই সঙ্গে তিনি সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যথাসম্ভব কোমল আচরণ করবেন। তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচতে এবং নিজের মহান কর্মতৎপরতাকে তাদের বাধামুক্ত রাখতে এটিই হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতির দাবি।
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ তার নিয়োগপত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য যে রাজ্যসীমা নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন, তিনি সে অঞ্চলেই অর্থাৎ মসুল, জাযিরা ও শাম অঞ্চলে তার কর্মধারা সীমাবদ্ধ রাখবেন। সেলজুক ও আব্বাসিদের সংঘাতক্ষেত্র বাগদাদ, মধ্য ইরাক, পারস্য ও অন্যান্য অঞ্চলে তিনি মোটেও নজর দেবেন না। তা ছাড়া আল্লাহ তাওফিক দিলে মসুল, জাযিরা ও শামের সম্মিলিত শক্তিই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অনেক মূল্যবান দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে। আর ভবিষ্যতের কথা কে জানে?! হয়তো ইমাদুদ্দিন জিনকির এ চেষ্টা ও সাধনা অন্য কারও হাতে পূর্ণতা লাভ করবে; যিনি এ ঐক্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করে উম্মাহর সম্মান ও গৌরব আরও ব্যাপক ও সমৃদ্ধ করবেন। তুগরল বেগ ও আলপ আরসালানের রাজ্য তো মালিকশাহর রাজত্বের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। সব সময় তো এমনই হয়; ধীরে ধীরে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি!
শেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতেন। এর স্বপক্ষে ইতিপূর্বে আমরা বিভিন্ন প্রমাণ উল্লেখ করে এসেছি। আর যে আল্লাহর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার চেষ্টা ও সাধনা নিষ্ফল করেন না। হয়তো জীবদ্দশায় সে তার কাজের পরিণতি দেখে যেতে পারে না, কিন্তু আল্লাহ তার কর্মফল ও পুরস্কার পরকালের জন্য গচ্ছিত রেখে দেন। আর এটিই তো মুমিনের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, সর্বশেষ চাওয়া।
মহান বীরপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকির মনমস্তিষ্কে এসব চিন্তা ও পরিকল্পনাই বিচরণ করছিল। দীর্ঘ তিন বছরের ধারাবাহিক সংকটের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং আপন করণীয় নির্ণয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার পর তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ফিতনা তো চলছেই; আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কবে এর অবসান হবে।
আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার তার গৃহীত নতুন কূটনীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষের পাশে দাঁড়ানোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে নমনীয়তা ও সুসম্পর্কের নীতি।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে দিয়ে। সুলতান মাসউদের পক্ষে অগ্রসর হওয়ার পর থেকে বিগত দুই বছর ধরে খলিফার সঙ্গে তার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। তিনি এবার খলিফা বরাবর মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা প্রেরণ করেন। বরং খলিফার মর্যাদার স্বীকৃতি এবং খলিফার প্রতি আনুগত্য ও মিত্রতার নিদর্শনস্বরূপ তিনি তার বড় পুত্র সাইফুদ্দিন গাজিকে খলিফার খেদমতে প্রেরণ করেন। এতে খলিফার মন প্রশান্ত হয়ে যায়। তিনিও ইমাদুদ্দিন জিনকির উদ্দেশে হাদিয়া প্রেরণ করেন। (৪১৮)

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দামেশক নগরীকে রাজ্যভুক্ত করার প্রচেষ্টা

📄 দামেশক নগরীকে রাজ্যভুক্ত করার প্রচেষ্টা


৫২৯ হিজরি সনের শুরু ভাগ। বিগত কয়েক মাস ধরে সালতানাতের মসনদে আছেন সুলতান তুগরল। ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সময় তার নতুন চিন্তার প্রেক্ষিতে সুলতানদের সঙ্গে কর্মনীতির পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে মসুলে এক বিস্ময়কর সংবাদ পৌঁছায়। হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন সুলতান তুগরল! তার বয়স হয়েছিল মাত্র ছাব্বিশ বছর। ৫২৯ হিজরি সনের মুহাররম মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। সুযোগ পেয়ে সুলতান মাসউদ দ্রুত তার সৈন্য ও সহযোগীদের সমবেত করে ছুটে আসেন এবং সালতানাতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন! (৪১৯)
নতুন সুলতান হওয়ার জন্য সুলতান মাসউদের সামনে এখন শূন্য ময়দান। তুগরল তো চলেই গেলেন! দাউদ বিন মাহমুদ তার আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলি নিহত হওয়ার পর শক্তিতে অনেক দুর্বল হয়ে গেছেন। কথিত আছে, স্বয়ং সুলতান মাসউদই বাতিনি গুপ্তঘাতকদের মাধ্যমে তাকে হত্যা করিয়েছেন। ওদিকে সুলতান সানজারও উপলব্ধি করেছেন যে, তার মনোনীত সুলতান তুগরলের মৃত্যুর পর ইরাক ও পারস্যে চলমান বিরোধে হস্তক্ষেপ করা তার সামর্থ্যে কুলাবে না। সালতানাতের আরেক দাবিদার সেলজুকশাহ তো সবার চেয়ে দুর্বল। এভাবে সুলতান মাসউদ পৌঁছে যান কাঙ্ক্ষিত সালতানাতের মসনদে; যোগ্যতাবলে নয়; ময়দানে অন্য কারও অনুপস্থিতির সুযোগে। সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, সেলজুক সালতানাত তার অন্তিমকাল অতিক্রম করছে!
এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে দামেশক থেকে এক বিস্ময়কর বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় দামেশকের দুষ্কর্ম অধিপতি শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি ইমাদুদ্দিন জিনকির সাহায্যপ্রার্থনা করেছেন এবং তাকে দামেশকে এসে নগরীটির দায়িত্বভার গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন!
মূল ঘটনা হলো, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি একের পর এক অপ্রত্যাশিত অন্যায় করে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তার ভাই সোনজ বিন বুরিকে দীর্ঘদিন এক কুঠুরিতে আটকে রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত বেচারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা যায়। এরপর তিনি দামেশকের জনগণের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেন, তাদের সম্পত্তি লুট করে নেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তু ছিনিয়ে নিতেও তিনি সামান্য দ্বিধা করতেন না। অসহায় ও দরিদ্র জনতার অর্থ চুরি করতেও তিনি সংকোচ করতেন না। ফলে দামেশকের জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধে। তার কিছু সহযোগী তার আচরণের প্রতিবাদ করলে তিনি তাদেরকে হত্যা করেন এবং এরপর প্রত্যেক বিরোধীকে প্রকাশ্যে বিনা দ্বিধায় হত্যা করার ঘোষণা দেন। দামেশকের পরিবেশ ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একসময় ইসমাইল নিজের নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি আশঙ্কা করেন যে, শীঘ্রই জনতা প্রতিশোধ নেবে। এমনকি তিনি অতি আপনজনদেরকেও ভয় করতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন, যেকোনো মুহূর্তে তাকে হত্যা করা হতে পারে। এ কারনেই তিনি নিরুপায় হয়ে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। তিনি নিজের নিরাপত্তালাভের বিনিময়ে ইমাদুদ্দিনের কাছে দামেশকের কর্তৃত্ব সমর্পণের প্রস্তাব দেন। বরং অতি ভীত ইসমাইল বিন বুরি হুমকি দেন যে, ইমাদুদ্দিন যদি দ্রুত না আসেন, তাহলে তিনি দামেশকের নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেবেন! (৪২০)
ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান, এটি দামেশককে রাজ্যভুক্ত করার এক মূল্যবান সুযোগ। তিনি কালবিলম্ব না করে মসুল থেকে দামেশক অভিমুখে রওনা হন। তবে পথিমধ্যে তিনি রাক্কা নগরীকে তার ঐক্যবদ্ধ কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার এক অভাবিত সুযোগ পেয়ে যান। রাক্কা জাযিরা অঞ্চলের একটি নগরী। নগরীটির অবস্থান ফুরাতের পূর্ব দিকে হাররানের নিকটে। (৪২১) ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও রাক্কা নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন; কিন্তু এতে তার অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ফলে দামেশক পৌঁছতে তার তুলনামূলক দেরি হয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, শামসুল মুলুক ইসমাইল ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন!
শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি এমন এক দিক থেকে ষড়যন্ত্রের শিকার হন, যা তার কল্পনাতেও ছিল না। অন্য কেউ নয়; তাকে হত্যা করেন তার গর্ভধারিণী মা। নিঃসন্দেহে এটি ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা যে, একজন মা তার শাসকপুত্রকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছেন। এর কারণ হলো, চরম দুরাচারী ইসমাইল একসময় তার মাকে পর্যন্ত হত্যার পরিকল্পনা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তার মা-ই আগে তার দফারফা করে দেন। শামসুল মুলুক নিহত হওয়ার পর দামেশকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তার ভাই শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরি। দামেশকবাসী তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। (৪২২)
ইমাদুদ্দিন জিনকি আপন রাজ্যভুক্ত করার চেষ্টায় দামেশক অবরোধ করেন। কিন্তু দুর্ভেদ্য দামেশকের পতন ঘটানো দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। দামেশক মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ কাঠামোতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। নগরবাসী বিভিন্ন দুর্গে আশ্রয় নেয়। দামেশকের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেন প্রয়াত অধিপতি তুগতেকিনের জনৈক ক্রীতদাস মুইনুদ্দিন আনুর।৪২০ মুইনুদ্দিন আনুর অসাধারণ সামরিক দক্ষতার অধিকারী সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু সমানতালে তিনি ছিলেন চরম স্বার্থবাদী। পদ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো মাধ্যম গ্রহণ করতে তিনি দ্বিধা করতেন না। অচিরেই আমরা তাকে ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রকাশ্যে সহযোগিতা বিনিময় করতেও দেখব। দামেশকের আগামী ইতিহাসে অন্যতম নীতিনির্ধারক চরিত্র বিবেচিত হবেন এই মুইনুদ্দিন আনুর।
এরই মধ্যে ইরাক পরিস্থিতিতে ঘটে যায় এক উষ্ণ বিবর্তন। খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ আবারও সেলজুক সাম্রাজ্যের শেকল ছিঁড়ে স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্নপূরণে উদ্যোগী হন। তার স্বপ্নের পালে বাতাস জোগান সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ! তিনি চাচা সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য খলিফার সঙ্গে জোট করে খলিফাকে প্ররোচিত করেন। খলিফা সৈন্যসমাবেশ শুরু করেন এবং সরাসরি নতুন সুলতান মাসউদের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।৪২৪
শামের ময়দানে অবস্থানরত ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, দামেশক পতনের সুযোগ ও সম্ভাবনা ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছে। ওদিকে ইরাকে যেভাবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং উম্মাহর দিগন্তজুড়ে কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে দামেশকের নগরপ্রাচীরের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগও নেই। অধিকন্তু এরই মধ্যে তিনি জানতে পারেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দামেশকের নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে হামা নগরীর প্রতিরক্ষাবাহিনীর সিংহভাগ সদস্য দামেশকে চলে এসেছে এবং হামা এখন কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বছরতিনেক পূর্বে ইরাক-বিপর্যয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শামসুল মুলুক ইসমাইল হামা নগরীকে দামেশকের সঙ্গে একীভূত করে নিয়েছিলেন।
সব দিক বিবেচনা করে ইমাদুদ্দিন জিনকি সুযোগ কাজে লাগান এবং সুরক্ষিত দামেশকের অবরোধ তুলে নিয়ে হামার দিকে অগ্রসর হন। (৪২৫) তিনি সহজেই নগরটি অধিভুক্ত করে নেন। এরপর তিনি হিমস অভিমুখে অগ্রসর হয়ে নগরীটি অবরোধ করেন। কিন্তু কুরাইশ বিন খায়র খানের নেতৃত্বে সুরক্ষিত হিমস নগরী প্রতিরোধ গড়ে তুললে অপারগ হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি আলেপ্পোতে ফিরে আসেন। (৪২৬)
এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই সংবাদ আসে— ৫২৯ হিজরি সনের ১০ রমজান (১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান মাসউদের মধ্যে দুঃখজনক লড়াই সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধে সুলতান মাসউদ বিজয়ী হয়েছেন এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ তার হাতে বন্দি হয়েছেন। বন্দি খলিফাকে সুলতান মাসউদের মূল নিবাস হামাদানে সুলতানের হেফাজতে রাখা হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এ যুদ্ধে কোনো পক্ষের একজন সৈন্যও নিহত হয়নি!
নিঃসন্দেহে এটি ছিল আব্বাসি খলিফার জন্য চরম অবমাননাকর এক পরিণতি। খলিফা এরপর সুলতান মাসউদের সঙ্গে লাঞ্ছনাকর সন্ধিচুক্তি করতেও বাধ্য হন। চুক্তির শর্ত ছিল, খলিফা সুলতান মাসউদকে চার লক্ষ দিনার মুক্তিপণ প্রদান করবেন, ভবিষ্যতে সৈন্যসমাবেশ ঘটাবেন না, নিজ বাসস্থান থেকে কখনো বের হবেন না এবং সুলতান মাসউদকে সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া খলিফার উপায় ছিল না। তিনি যখন বাগদাদে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই ঘটে বড় বেদনাদায়ক এক ঘটনা। অতর্কিতে চব্বিশজনের একটি বাতিনি গুপ্তঘাতকদল খলিফার তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে! দিনটি ছিল ৫২৯ হিজরি সনের ১৭ জিলকদ। (৪২৭)
চারিদিকে রটে যায়, সুলতান মাসউদই খলিফাকে হত্যার মদদ জুগিয়েছেন। কারণ, এমন কঠোর শর্তযুক্ত সন্ধিচুক্তির পরও তিনি খলিফার বিষয়ে চিন্তামুক্ত ছিলেন না। অবশ্য এরপর প্রয়াত খলিফার পুত্র আবু জাফর মানসুরের হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করা হয় এবং তিনি 'রাশিদ বিল্লাহ' উপাধি গ্রহণ করেন। (৪২৮) কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, ইরাক অঞ্চল ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ইরাকের পরিস্থিতি তখন প্রচণ্ড তাপে টগবগ করা উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো! এদিকে সুলতান মাসউদ এতটুকুতেই শান্ত হয়ে এরপর রওনা হন তার ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে; যিনি তার বিরুদ্ধে খলিফার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। (৪২৯)

টিকাঃ
৪১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৪৭-৪৮।
৪১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮।
৪২০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮-২৭৯।
৪২১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫৭।
৪২২, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫৬-২৫৭।
৪২০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৯-২৮০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৯১।
৪২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮১-২৮২।
৪২৫, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/২৭৫-২৭৮।
৪২৬, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৯৭-৩৯৮।
৪২৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮১-২৮৩।
৪২৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮৩ ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাজাম, ১০/৫৫।
৪২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮৮।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিনের অব্যাহত বিজয়

📄 ইমাদুদ্দিনের অব্যাহত বিজয়


এতসব দুর্যোগ চলাকালে ইমাদুদ্দিন জিনকি ব্যস্ত ছিলেন অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে। তিনি হামা অধিকার ও হিমসে ব্যর্থ হওয়ার পর আলেপ্পোতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের সামরিক অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজ্যটিতে অভিযান পরিচালনার ছক আঁকতে শুরু করেন। তিনি জানতেন, এন্টিয়ক এখন এলিসের মতো অবিবেচক মহিলার প্রত্যক্ষ শাসনে চলছে। নিকটবর্তী আরেক ক্রুসেড রাজ্য এডেসা থেকে এন্টিয়কে যেন কোনো ধরনের সামরিক সাহায্য পৌঁছতে না পারে, এ উদ্দেশ্যে ইমাদুদ্দিন জিনকি আলেপ্পোর আমির সিওয়ারকে তিল-বাশির, আনতেপ (Antep) ও আযায নগরীতে হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে তিনি এডেসা ও এন্টিয়কের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেন। এডেসার সৈন্যরা এখন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবে বলে এন্টিয়কের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সামান্য সুযোগও তাদের থাকবে না।
পরিকল্পনা প্রণয়নের পর ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়ক নগরীর আশেপাশের বিভিন্ন দুর্গে এবং এ অঞ্চলের অধিকৃত বিভিন্ন মুসলিম নগরীতে হামলা চালাতে থাকেন। একটানা কয়েকটি যুদ্ধের পর আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি কাফারতাব, মাআ'ররাতুন-নোমান ও যারদানা নগরী পুনরুদ্ধার করেন। ইরাক পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকির এ বিজয়গুলো ক্ষতস্থানে মলমের কাজ করে! (৪০০)
ইমাদুদ্দিনের এই বিজয়ধারা হিলাল-ছালিব উভয় শিবিরের সকলকে সমান্তরালে সচেতন ও সতর্ক করে তোলে!
ইমাদুদ্দিন জিনকির ধারাবাহিক বিজয় ক্রুসেড শিবিরের এন্টিয়ক শাসক এলিসের অন্তরে প্রচণ্ড ভীতি সৃষ্টি করে। তিনি এবার নতুন এক পাগলামি করে বসেন! এলিস বাইজান্টাইন সম্রাট ২য় জন কম নিনোসের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তার পুত্রের সঙ্গে নিজের কন্যা কন্সটেন্সের বিয়ের প্রস্তাব দেন (৪০১) এবং এর মধ্য দিয়ে কার্যত ক্যাথলিক এন্টিয়ক রাজ্যের ওপর অর্থোডক্স বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেন!
এলিসের এমন পদক্ষেপ ক্রুসেডারদের শেকড় নাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ প্রায় চল্লিশটি বছর ধরে তারা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে এন্টিয়ক থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। আজ এই অবিবেচক নারী শাসক এক মুহূর্তে ক্রুসেডারদের এতদিনের সব সাধনা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাচ্ছেন! এন্টিয়কের ক্রুসেডাররা প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাজা ফাল্কের সঙ্গে পত্রবিনিময় করে। ফাল্ক আর কোনো সমাধান না খুঁজে পেয়ে এন্টিয়কের শিশু রাজকন্যা কন্সটেন্সকে তার এমন কোনো মিত্রের কাছে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যিনি এন্টিয়ক রাজ্যভার সামলাতে পারবেন। অথচ কন্সটেন্সের বয়স তখন দশ বছরও হয়নি! ফাল্ক এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বেছে নেন আকুইতিনের ডিউক (The Duke of Aquitaine) ৯ম উইলিয়ামের (৪০২) পুত্র যুবরাজ রেমন্ড অফ পয়টিয়ার্স (Raymond of Poitiers)-কে। (৪০৩) ফরাসি এই যুবরাজ তখন তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজা ১ম হেনরির রাজপ্রাসাদে তার তত্ত্বাবধানে বাস করতেন। ফাল্কের ত্বরিত বার্তা পেয়ে রেমন্ড এন্টিয়কে চলে আসেন এবং কন্সটেন্সকে বিয়ে করে এন্টিয়কের শাসনভার গ্রহণ করেন! শক্তিশালী এই তরুণ শাসক এন্টিয়কের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নতুন করে গুছিয়ে নেন। স্বভাবতই বেপরোয়া নারী শাসক এলিস প্রশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে লাতাকিয়ার চলে যান। কিছুদিন পরই তিনি সেখানে মারা যান। (৪০৪)
এই ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির অব্যাহত বিজয়ধারায় ক্রুসেড শিবিরের প্রতিক্রিয়া।
ওদিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিজয়ধারা মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি করে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া। সাধারণ জনতা, আলিম ও ফকিহসমাজ এবং উম্মাহর সৎ ও পুণ্যবান ব্যক্তিগণ এ বিজয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। (৪০৫) সকলের হৃদয়ে চলমান সংকট থেকে নিষ্কৃতির আশা আরও জোরালো হয়। কিন্তু বিপরীতে মুসলিম সমাজেরই কিছু মানুষ ইমাদুদ্দিনের বিজয় সংবাদে প্রচণ্ড বিচলিত- উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে! তাদের অন্তর্জগতে সাম্প্রদায়িক চেতনা আরও তীব্র হয়ে জেগে ওঠে!

টিকাঃ
৪০০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬০-২৬১।
৪০১. Runciman: op.cit.,ll, pp. 88-90.
৪০২. এই ৯ম উইলিয়াম ইতিপূর্বে একটি ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর বিবরণ পূর্বে গত হয়েছে। [সম্পাদক]
৪০৩. Guillaume de Tyr., p. 618.
৪০৪. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৪৩৪।
৪০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯১।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 হত্যাপ্রচেষ্টা থেকে ইমাদুদ্দিনের নিষ্কৃতি

📄 হত্যাপ্রচেষ্টা থেকে ইমাদুদ্দিনের নিষ্কৃতি


বীরযোদ্ধা ইমাদুদ্দিন জিনকির অব্যাহত বিজয় সুলতান মাসউদের মনে প্রচণ্ড উদ্বেগের জন্ম দেয়। বেশ কিছু কারণে তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পেয়ে শঙ্কায় রূপ নেয়। যথা-
১. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর শেষ সময়ে খলিফার সঙ্গে ইমাদুদ্দিন জিনকির বেশ চমৎকার সম্পর্ক ছিল। হতে পারে, খলিফার হত্যাকাণ্ড তাকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অধিকন্তু আমজনতার মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে, সুলতান মাসউদই খলিফাকে হত্যা করতে বাতিনিদের প্ররোচিত করেছেন।
২. এসব ধারাবাহিক বিজয়ের ঘটনা মুসলিমসমাজে ইমাদুদ্দিন জিনকির মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। ফলে সকল সুলতানের তুলনায় তার ধার-ভার অনেক বেড়ে গেছে। মোটেও অসম্ভব কিছু নয় যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি তার শাসিত অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন রাজ্যের দাবি তুলবেন। ইতিপূর্বে তার চেয়ে শক্তিতে দুর্বল অনেকেও এরূপ দুঃসাহস দেখিয়েছে। দামেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তুগতেকিনের বংশধরগণ, হিমস শাসন করছে খায়র খানের পুত্ররা, শাইজার শাসন করছে মুনকিযের ছেলেরা।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্বে শুরু হওয়া ঐক্য-প্রচেষ্টার যথার্থতা সকলের কাছে সুস্পষ্ট। তিনি ইতিমধ্যে মসুলের সঙ্গে আলেপ্পো ও হামা নগরীকে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। জাযিরা অঞ্চলের বেশ কিছু নগরীও তিনি অধিকার করে নিয়েছেন। তিনি কুর্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করেছেন; সখ্যতা ও হৃদ্যতা গড়ে তুলেছেন উরতুকি শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজির সঙ্গেও। এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির একীভূতকরণ প্রচেষ্টা অন্যান্য ইসলামি নগরীতেও প্রসারিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এরই ধারাবাহিকতায় অচিরেই একসময় হয়তো তিনি নজর দেবেন বাগদাদের দিকে এবং সেলজুকদের দুর্গ পারস্য ভূমির দিকেও।
৪. সুলতান মাসউদের শত্রুর অভাব নেই। এক্ষেত্রে সবার ওপরে আছে ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদ, ভাই সেলজুকশাহ ও চাচা সুলতান সানজারের নাম। তাদের কেউ যদি সুলতান মাসউদের বিপক্ষে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে জোট করেন, তখন তিনি কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন?!
সবগুলো বিষয় সামনে রেখে সুলতান মাসউদ এমন এক গর্হিত কর্মের পরিকল্পনা করেন, যা তার মতো 'সচ্চরিত্রে'র পরিচয়ে খ্যাতিমান ব্যক্তির কাছ থেকে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন!
সুলতান মাসউদ তাকে পদচ্যুত করবেন না। কারণ, তাহলে তো ইমাদুদ্দিন তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে ময়দানে থেকে যাবেন। তাই তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যা করেই পুরোপুরি নিষ্কৃতি লাভ করবেন! মুসলমানদের স্বপ্ন-সাধনা, ক্রুসেডবিরোধী জিহাদ-সংগ্রাম বা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টা—এসব বিষয়ের কী হবে, সে চিন্তা সুলতান মাসউদের বিলকুল ছিল না।
এরই নাম আত্মকেন্দ্রিকতা ও অহমিকা! তিনি মনে করছিলেন, পৃথিবীর সবকিছু আবর্তিত হবে তাকে কেন্দ্র করে। তিনি চাচ্ছিলেন, চারিদিকের সবকিছু পরিচালিত হবে তার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে; ফলাফল যাই হোক না কেন!
সুলতান মাসউদ যদিও এমন নিকৃষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো আপন বান্দার প্রতি পরম দয়াশীল। আল্লাহ তাআলা ইমাদুদ্দিন জিনকির নিষ্কৃতির ব্যবস্থা করে দেন এমন এক ব্যক্তির মাধ্যমে, যার হাত ধরে কোনো কল্যাণ আসতে পারে, এমনটি কারও দূরতম কল্পনাতেও ছিল না।
সেই ব্যক্তির নাম দুবাইস বিন সাদাকা!
সেই দুরাচারী শিয়া নেতা, ইমাদুদ্দিন জিনকি যাকে কয়েক বছর পূর্বে বুরি বিন তুগতেকিনের বন্দিশালা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন; তার প্রতি সদ্ব্যবহার করে তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং সম্মানিত করেছিলেন। দুবাইস বিন সাদাকা ইমাদুদ্দিন জিনকির সেই সদাচরণের কথা মনে রেখেছিল। খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সঙ্গে প্রচণ্ড বিরোধের জের ধরে দুবাইস সুলতান মাসউদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। সুলতান মাসউদ যখন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন, সে তখন সুলতানের বাসভবনেই অবস্থান করছিল। দুবাইস সুলতান মাসউদের দুষ্ট পরিকল্পনার বিষয়টি জেনে ফেলে। সে আরও জানতে পারে, ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রথমে হামাদানে সুলতানের বাসভবনে ডেকে আনা হবে, এরপর অসতর্ক মুহূর্তে তাকে হত্যা করা হবে। দুবাইস দ্রুত ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত করে এবং সুলতানের আহ্বানে তার বাসভবনে আসতে কঠোরভাবে নিষেধ করে।
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর কী মহিমা! সুলতান মাসউদ জেনে ফেলেন যে, দুবাইস বিন সাদাকাই তার ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিয়ে ইমাদুদ্দিনকে গুপ্তহত্যার চক্রান্ত বানচাল করে দিয়েছে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ দুবাইসকে হত্যা করেন। এ সংবাদ জানার পরই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, 'আমরা তাকে অর্থের বিনিময়ে (বন্দিদশা থেকে) মুক্ত করেছিলাম; আর সে প্রাণের বিনিময়ে আমাদের রক্ষা করল!’ (৪০৬)
মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকি আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকবেন। কেননা, আল্লাহ তাআলা আরও কিছু মহৎ কর্ম তার জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন।
এমন বিতৃষ্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরও এবং ক্রুসেডবিরোধী যুদ্ধ তৎপরতার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত অবস্থায় এভাবে পৃষ্ঠদেশে আঘাতের শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইমাদুদ্দিন জিনকি তার জিহাদি তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। তিনি তো সুলতানদের পারস্পরিক পার্থিব সংঘাতে নিজেকে জড়াতে চাননি। তারপরও তিনি যখন এমন হত্যাষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হলেন, তখন বাধ্য হয়েই ভবিষ্যতে তিনি সুলতানদের বিরোধ-বিসংবাদ সম্পর্কে উদাসীন থাকবেন না এবং এই ঘনীভূত বিপর্যয়ে নিজে জড়িত না হলেও আত্মরক্ষায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবেন।
ইরাকের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। মুসতারশিদ বিল্লাহর পুত্র রাশিদ বিল্লাহর হাতে এই শর্তে বায়আত গ্রহণ করা হয়েছে যে, তিনি কখনো সৈন্যসমাবেশ ঘটাতে পারবেন না এবং সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু নতুন খলিফা কীভাবে সবার মুখের এই মন্তব্য উপেক্ষা করেন যে, সুলতান মাসউদই তার পিতাকে হত্যা করার জন্য বাতিনিদের প্ররোচিত করেছেন! তা ছাড়া সুলতান মাসউদের ভয়ে তটস্থ রাজন্যদের অনেকেই তখন তাকে ছেড়ে খলিফা রাশিদ বিল্লাহর পক্ষে সমবেত হয়েছে। নিজের হৃত সালতানাত খুঁজে ফেরা সুলতান দাউদ বিন মাহমুদও খলিফার পক্ষ নিয়েছেন। তারা সকলে সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তাদের বাহিনীগুলো বাগদাদে সমবেত হতে শুরু করে। সুলতান মাসউদ নিজে তখন অবস্থান করছেন হামাদানে! (৪০৭)
ইমাদুদ্দিন জিনকি ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সংঘাতে না জড়ালেও তিনি ঘটনার কাছাকাছি থাকবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি মসুলের নিকটে চলে আসেন এবং সম্ভাব্য প্রয়োজন দেখা দিলে তা পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। পাশাপাশি তিনি সুস্পষ্ট ঘোষণা করে দেন যে, তিনি খলিফা রাশিদ বিল্লাহর পক্ষে আছেন। (৪০৮) সুলতান মাসউদ কর্তৃক ইমাদুদ্দিন জিনকিকে হত্যার ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ার পর খলিফার সঙ্গে তার এই নতুন মিত্রতায় কারও আপত্তি করার কিছু ছিল না।
বাগদাদে খলিফা রাশিদ বিল্লাহ, অন্যান্য সহযোগী সুলতান ও দাউদ বিন মাহমুদের বাহিনীর সঙ্গে সুলতান মাসউদের বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধ হয়। যুদ্ধগুলোতে সুলতান মাসউদের বাহিনীরই প্রাধান্য ছিল। এরপর সুলতান মাসউদ শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে বাগদাদে প্রবেশ করেন। খলিফা রাশিদ বিল্লাহ বাধ্য হয়ে উত্তর দিকে পলায়ন করলে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে মসুলে আশ্রয় দেন এবং বাগদাদের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের প্রতি নজর রাখেন। (৪০৯)
সুলতান মাসউদ বাগদাদে আব্বাসি রাজপরিবারের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যেহেতু খলিফা রাশিদ বিল্লাহ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেছেন, তাই সুলতান মাসউদ তাকে অপসারণ করে এমন কাউকে নতুন খলিফা নির্বাচনের মনস্থ করেন, যিনি সুলতান মাসউদের প্রতি অনুগত থাকবেন আর জনগণ তার পক্ষে থাকবে। তখন আর নতুন করে কোনো সংঘাতের সূচনাও হবে না। আব্বাসি নেতৃবৃন্দ এমন এক ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করে, যিনি ছিলেন সকলের প্রিয়, সদাচারী, ন্যায়বান ও সচ্চরিত্রের অধিকারী। সুলতান মাসউদও তাদের প্রস্তাব মেনে নেন। ফলে ইরাকের পরিস্থিতিও অনেকাংশে শান্ত হয়ে আসে। প্রস্তাবিত সেই ব্যক্তি হলেন, প্রয়াত খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর ভাই ও অপসারিত খলিফা রাশিদ বিল্লাহর চাচা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন মুসতাযহির বিল্লাহ। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি 'আল-মুকতাফি লি- আমরিল্লাহ' উপাধি গ্রহণ করেন। পরবর্তী চব্বিশ বছরেরও অধিক সময় তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ফলে বাগদাদ-পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। খলিফা মুকতাফি লি-আমরিল্লাহ ৫৩০ হিজরি সনের জিলহজ মাসে (১১৩৬ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (৪৪°)

টিকাঃ
৪০৮. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫০।
৪০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ২৮৮-২৮৯।
৪০৮. প্রাগুক্ত, ৯/২৮৮-২৮৯।
৪০৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৯১-২৯২।
৪৪°, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/ ২৯২-২৯৩ ও ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৬৫-৬৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00