📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ফিতনার উত্তপ্ত সময়

📄 ফিতনার উত্তপ্ত সময়


আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সময় নিরুপায় হয়ে বাগদাদের উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহের নিকটেই মসুলে সসৈন্য নিশ্চল বসে ছিলেন। কারণ, বাগদাদে চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বিন্যাসে রদবদল ঘটার আশঙ্কা ছিল। এ সময় তিনি তার অধীনস্থ আলেপ্পোর প্রশাসক সিওয়ারের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কিছু খণ্ড যুদ্ধ পরিচালনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন। (৪০৭) পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, দামেশকের অন্যতম শক্তিশালী সেনাপতি সিওয়ার ৫২৪ হিজরি সনে দামেশক থেকে পলায়ন করলে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আলেপ্পো ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়চেতা মুজাহিদ ছিলেন; ইমাদুদ্দিন জিনকির মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তার পদের যথোচিত মর্যাদা রক্ষা করে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে গেছেন।
আবারও ইরাকের জটিল পরিস্থিতিতে ফিরে আসছি!
স্বভাবতই পরিস্থিতি মোটেও শান্ত হয়নি। সুলতান সানজার ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে খোরাসান ফিরে গিয়েছিলেন। ফলে তুগরলের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা আবারও ক্ষমতা লাভের আশায় উদ্যোগী হয়ে ওঠে। সুলতান তুগরল বাগদাদের পরিবর্তে হামাদান নগরীকে তার আবাসভূমি নির্বাচন করেছিলেন। সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ ও তার আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলি এ সময় সুলতান তুগরলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং সৈন্যসমাবেশ ঘটান। ৫২৬ হিজরি সনের রমজান মাসে হামাদানের অদূরে দু-পক্ষের মাঝে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সুলতান দাউদ পরাজিত হন এবং পুনরায় পরিস্থিতি সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কিন্তু বিষয়টি এখানেই সমাপ্ত হয়নি। পরাজিত সুলতান দাউদ সেখান থেকে সোজা বাগদাদে চলে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খলিফা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন এবং বাগদাদের সুলতান-প্রাসাদ তার জন্য ছেড়ে দেন। অবশ্য খলিফা তাকে সুলতান উপাধি প্রদানে বিরত থাকেন। শত হোক, দাউদ তো এখন পরাজিত ও দুর্বল! (৪০৮)
যথারীতি এ সংবাদ পৌঁছে যায় সুলতান মাসউদের কাছে। তিনি মনে করতেন, ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে তিনিই সালতানাত লাভের অধিক হকদার। অন্তত বর্তমান সুলতান ও তার ছোট ভাই সুলতান তুগরলের চেয়ে তো তিনি অবশ্যই অগ্রাধিকার রাখেন। তাই তিনি দ্রুত বাগদাদে ছুটে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান দাউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনজন এ বিষয়ে একমত হন যে, খলিফা সুলতান মাসউদকে সুলতান উপাধি প্রদান করবেন, আর দাউদ হবেন তার ওলিয়ে আহদ বা পরবর্তী 'সুলতান। এভাবে মূলত খলিফা ও সুলতান মাসউদের পূর্বের পুরোনো সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে; পাল্টে যাবে শুধু ওলিয়ে আহদের জায়গাটুকু। পূর্বের চুক্তিতে ওলিয়ে আহদ হওয়ার কথা ছিল সেলজুকশাহর, আর নতুন চুক্তিতে সেখানে সুলতান দাউদ বিন মাহমুদের নাম!
সুলতান মাসউদ ও সুলতান দাউদ তাদের সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং পারস্যের বিভিন্ন স্থানে সুলতান তুগরলের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এসব যুদ্ধে সুলতান মাসউদ জয়লাভ করেন এবং এর অনিবার্য দাবি অনুযায়ী তিনিই এবার ইরাক ও পারস্যের সুলতান উপাধি ধারণ করেন। এটি ৫২৭ হিজরি সনের শেষ দিকের ঘটনা। অর্থাৎ দুঃখজনক এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পূর্ণ এক বছর চলে যায়। (৪০৯)
এই অব্যাহত সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সময় দামেশকের অত্যাচারী শাসক ইসমাইল বিন বুরি ঘটনাপ্রবাহের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। সুযোগ বুঝে তিনি হঠাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হামা নগরীতে অভিযান চালান। কঠিন অবরোধ আরোপের পর একসময় তিনি নগরীটির পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এটি ছিল নবগঠিত জিনকি রাজ্যের জন্য বড় ধরনের আঘাত। (৪১০) কারণ, হামা ছিল দামেশক অভিমুখে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। তা ছাড়া ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলিতে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও হামা হতে পারত অন্যতম ঘাঁটি। কিন্তু সেলজুক সুলতানদের অব্যাহত সংঘাতের কারণে নিরাপত্তার যে চরম অবনতি হয়েছিল, তাতে এমন দুঃখজনক ঘটনার অবতারণা একদম স্বাভাবিক ছিল।
তবে ইরাকে চলমান দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা যেন মুসলমানদের ভূখণ্ডে লোলুপ দৃষ্টি ফেলার সাহস না করে, এ উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ প্রশাসক ইমাদুদ্দিন জিনকি এতকিছুর পরও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। অবশ্য এ সময়ের অধিকাংশ অভিযান পরিচালিত হয় আলেপ্পোর আমির সিওয়ারের নেতৃত্বে। এসব অভিযানের অন্যতম হলো, সিওয়ার ৫২৭ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে এডেসা রাজ্যের অন্তর্গত তিল-বাশির নগরীতে হামলা চালান এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। হাজারখানেক ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়। মুসলিম বাহিনী প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদও লাভ করে। সিওয়ার এর পাশাপাশি জাযিরা অঞ্চলের তুর্কমেন গোত্রগুলো থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে বেশ কয়েকটি বাহিনী গঠন করেন এবং বাহিনীগুলোকে ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক রাজ্যে হামলার কাজে ব্যবহার করে বিক্ষিপ্ত আরও কিছু বিজয় অর্জন করেন। এসব অভিযানেও ক্রুসেডারদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয় এবং প্রভূত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। (৪১১) রাজ্যগুলোর পতন ঘটানো এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল না। কারণ, ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পতন ঘটানোর মতো শক্তি এসব বাহিনীর ছিল না। অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরাকের ফিতনা নিরসন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির নতুন করে জিহাদি তৎপরতা শুরু করার আগ পর্যন্ত আলেপ্পো ও এর আশপাশের অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে কোনো দুর্গ বা নগরী পুনরুদ্ধার না হলেও এসব অভিযান ছিল অনেকটাই সফল।
আবারও ফিরে আসছি ইরাক ও পারস্যের ঘটনাপ্রবাহে।
আমরা এখন আছি ৫২৮ হিজরি সনে। ইরাকি সেলজুক সালতানাতের মসনদে এখন সুলতান মাসউদ। কিন্তু নিঃসন্দেহে অপসারিত সুলতান তুগরল এতে বিলকুল সন্তুষ্ট নন। অতীতে তিনি দূর থেকে তার চাচা সুলতান সানজারের সহযোগিতা পেয়ে আসছিলেন। এবার তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি সুলতান দাউদ বিন মাহমুদকেও সুলতান মাসউদের পক্ষ ত্যাগ করতে প্ররোচিত করতে থাকেন এবং তাতে সফলও হন। এমনকি তিনি খোদ সুলতান মাসউদের বাহিনীর কিছু অংশকেও নিজের দলে টানতে সক্ষম হন।
পারস্য ভূমিতে দুই ভাই সুলতান মাসউদ ও সুলতান তুগরলের বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধে সুলতান তুগরল সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং পুনরায় সালতানাতের মসনদ লাভ করতে সক্ষম হন। (৪১২)
মুসলিম জনসাধারণ এক অব্যাহত ফিতনা ও সংঘাতের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এবং মুসলিম বাহিনীগুলোর পারস্পরিক যুদ্ধ নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়। তদ্রূপ কয়েক মাস পরপর সুলতান পদে পালাবদলও যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। ইরাকের সুলতান পদ যেন অতি সাধারণ একটি পদ; জাতির পথচলায় যার কোনো দায়িত্ব ও ভূমিকা নেই!

টিকাঃ
৪০৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৮-২৬৯।
৪০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৬-২৬৭।
৪০৯. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৯-২৭০।
৪১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১ ও Grousset: Hist, des Croisades, II. p. 55.
৪১১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১-২৭২।
৪১২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৩-২৭৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইরাকের চলমান ফিতনার অনিবার্য ফল

📄 ইরাকের চলমান ফিতনার অনিবার্য ফল


এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগাতে অসুস্থ মনের অধিকারী প্রতিটি ব্যক্তি হামলে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক। চলমান ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার উপযুক্ত একটি একক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। এখন তার চোখের সামনে সেই ঐক্য-কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম সুলতানগণ বিশুদ্ধ চেতনায় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করার পরিবর্তে নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং প্রত্যেকেই একদল সাধারণ মুসলমানকে নিজের পক্ষে টেনে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা। বিস্তৃত জিনকি রাজ্যের অভ্যন্তরেও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। জনসাধারণ অনুভব করছে, সুলতানদের এই সংঘাতে শেষ পরিণতি দেখার অপেক্ষা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকির এখন কিছু করার নেই। স্বয়ং ইমাদুদ্দিনও এই বিরোধে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে মসুলেই অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রতীক্ষা করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি যে কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না!
এ সময় মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কুর্দি হাকারিয়া ও হামিদিয়া গোত্র অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, গোত্রদুটি ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিন জিনকির বশ্যতা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এই অশান্ত সময়ে সুযোগ পেয়ে তারা জিনকি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। এমনকি তারা মসুলের কৃষিক্ষেত্র ও বাজারগুলোতে হামলা ও লুটপাট শুরু করে। ফলে নতুন করে মসুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি পূর্ণ বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে নিজে এ অঞ্চলে গমন করেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি যুদ্ধের পর মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তাদেরকে দমন করতে সক্ষম হন। তিনি বিদ্রোহীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত তাদের কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং নতুন করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। (৪১৩)
কদিন না যেতেই নতুন করে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে নতুন আরেক অঞ্চলে। এবার জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের স্থানীয় কিছু নেতা উপলব্ধি করে যে, ইরাকের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে। সুতরাং ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিপূর্বে তাদের অঞ্চলের যেসব এলাকা নিজের রাজ্যভুক্ত করে নিয়েছিলেন, সেগুলো পুনরুদ্ধার করার এটিই সুবর্ণ সুযোগ।
পূর্বেও আমরা বলেছি, এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, অঞ্চলটিতে রাজ্য ও শাসকের অভাব নেই! তবে অধিকাংশ শাসকই প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন। এ অঞ্চলের তুলনামূলক শক্তিশালী ও প্রধান নেতা ছিল তিনজন।
১. মারদিনের আমির হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি।
২. (প্রথমজনের চাচাতো ভাই) হাসানকেইফের আমির রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি।
এই তিনজনই চার বছর পূর্বে ৫২৪ হিজরি সনে দারা নগরীতে একজোট হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (৪১৪)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, নতুন করে তাদের এই ঐক্য প্রচেষ্টা বিশেষভাবে চলমান দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্যে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে। এমনিতেই ইরাক ও পারস্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, ওদিকে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বারবার বিদ্রোহপ্রচেষ্টা সংঘটিত হচ্ছে। আর আলেপ্পো ও তার আশেপাশের এলাকায় ক্রুসেডারদের আক্রমণের আশঙ্কা তো আছেই। সার্বিক বিবেচনায় এই নতুন সমস্যার মোকাবিলায় সহসা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত দমনের কোনো বিকল্প ছিল না। (৪১৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, তাদের সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে এ মুহূর্তে যুদ্ধে জড়ালে বড় ধরনের ক্ষতি পোহাতে হবে। তাই তিনি যথাসম্ভব কম ক্ষতি স্বীকার করে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ঐক্য প্রচেষ্টায় ফাটল ধরিয়ে কাউকে তার পক্ষে টানার জন্য কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিপক্ষ তিন নেতার ব্যক্তিত্ব, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা বিচার করে তিনি উপলব্ধি করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ অত্যন্ত কঠোর ও একগুঁয়ে প্রকৃতির মানুষ, সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি একদম দুর্বল এবং তার সামর্থ্যও সীমিত, আর হুসামুদ্দিন তামারতাশ বৃহৎ ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। অবশ্য ব্যক্তি হিসাবে তিনি নমনীয়। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৪১৬) আর তাই হুসামুদ্দিন তামারতাশের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তাকে অন্যান্য দুর্বল নেতার সঙ্গে মিত্রতা পরিহারে প্ররোচিত করার পরিকল্পনা একটি ফলপ্রসূ চিন্তা হতে পারে। এমন ভাবনা থেকেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নৈকট্য অর্জনে চেষ্টা শুরু করেন। তিনি হুসামুদ্দিনের রাজ্য অভিমুখে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে দেন এবং তার কাছে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি তাকে মুসলমানদের পারস্পরিক ঐক্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে ঐক্য গড়লে তার রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে বলে তাকে প্ররোচিত করতে থাকেন। দ্রুত তার কৌশল কাজ করতে থাকে; অল্পতেই হুসামুদ্দিন প্রভাবিত হন। হুসামুদ্দিন অনুভব করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ বা সাদুদ্দৌলা ইকলিদির চেয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে মিত্রতা বেশি ফলদায়ক হবে। তিনি ইমাদুদ্দিনের প্রস্তাবে সাড়া দেন। অল্প কদিন না যেতেই প্রকাশ্যে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধ সামরিক কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশ এ অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার শুরু করেন। এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রশাসক তাদেরকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও তারা দুজন প্রথম মোকাবিলাতেই বিজয় লাভ করেন। রুকনুদ্দৌলার নিয়ন্ত্রিত মারদিনের অদূরে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ সাওর দুর্গ তাদের অধিকারে চলে আসে। ইমাদুদ্দিন জিনকি পারস্পরিক মিত্রতা মজবুত করার লক্ষ্যে দুর্গটি তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশকে উপহার দেন। (৪১৭)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. তার প্রজ্ঞাপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে হুসামুদ্দিনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগান। এর মাধ্যমে নতুন কিছু ভূখণ্ডই কেবল তার রাজ্যভুক্ত হয়নি; বরং বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি ছাড়াই এ অঞ্চলের মজবুত নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে।
জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চল; বরং পুরো জিনকি রাজ্য ছেড়ে এবার চলুন দ্রুত ঘুরে আসা যাক আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে!

টিকাঃ
৪১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৫-২৭৬।
৪১৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।
৪১৫. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
৪১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৪১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৪ ও উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০১।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 চলমান ফিতনা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিচ্ছিন্নতা

📄 চলমান ফিতনা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিচ্ছিন্নতা


উম্মাহর এই ঘনঘোর দুর্যোগকাল অনেকের শক্তি ও সম্ভাবনার পরিধি প্রকাশ করে দিচ্ছিল, উন্মোচিত করছিল ব্যক্তির স্বভাব ও অন্তর্নিহিত মনোভাব। প্রশ্ন হলো—এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সঠিক ও বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াই-বা কী হতে পারে?
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার পিতার মতোই সেলজুক সালতানাতের আনুগত্যে অভ্যস্ত ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সেলজুক সুলতানই বর্তমানের সর্বোচ্চ শক্তি এবং শাসনব্যবস্থার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। সেলজুক সুলতানই মুসলমানদের জাতীয় বিষয়সমূহ নিয়ে চিন্তা করেন, উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নে ব্রতী হন। শুরু থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকি এমনটিই ভাবতেন। কিন্তু অতীতের সুলতান ও বর্তমানের সুলতানদের মাঝে তো কত পার্থক্য! যেন আকাশপাতাল ব্যবধান!
আলপ আরসালান, মালিকশাহ, বারকিয়ারুক বা সুলতান মুহাম্মাদের মতো দৃঢ়চেতা সুলতান কি একজনও আছেন বর্তমানে সংঘাতরত সুলতানদের কাতারে?! এমনকি বয়সে প্রবীণ না হলেও প্রয়াত সুলতান মাহমুদেরও একটি স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল; মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার স্পৃহা ছিল। অধিকন্তু প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের পরাভূত করার মতো পর্যাপ্ত শক্তিও তার ছিল। আর তাই তার শাসনামলে সাম্রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজ করত; তিনি বহিঃরাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা-পরিকল্পনার সুযোগ পেতেন, বিশেষ করে ক্রুসেডারদের বিতাড়নের বিষয়ে ভাবতে পারতেন।
অপরদিকে বর্তমানের এই খর্ব শক্তির সুলতানগণ কীসের ভিত্তিতে ক্রমাগত লড়ছেন?!
একজনও কি দাবি করতে পারবেন, এ লড়াই আল্লাহর জন্য?!
বরং একজনও কি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবেন, এই বিবাদে তিনিই আছেন ন্যায়ের পক্ষে; অন্যরা নয়?!
তারা কেন, ঘটনার সমসাময়িক যারা, তারাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারত না, চলমান বিরোধে অমুকই বৈধ দাবিদার আর বাকিরা অন্যায় দাবি করছে! এ কারণেই আমরা দেখেছি, এ সময় অনেক সেনাপতি, রাজন্য, সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণ কদিন পরপরই এক সুলতানকে রেখে আরেক সুলতানের আনুগত্য শুরু করেছে। এটি কিন্তু নীতি-আদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রের দুর্বলতা ছিল না; ছিল দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের দুর্বলতা।
তা ছাড়া সংঘাতরত সুলতানদের সকলেই ছিল দুর্বল; কিংবা তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বলা যায়, সকলেই ছিল প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। এ কারণেই একজন হয়তো কয়েক মাস বা কয়েকদিন সুলতান পদ ধরে রাখতে পারত, তারপরই অন্য একজন তাকে সরিয়ে তার জায়গা দখল করত! এক এলাকায় একজনের নাম সুলতান হিসেবে ঘোষিত হতো, একই সময়ে আরেক অঞ্চলে ঘোষিত হতো আরেকজনের নাম! খলিফা আজ এক সুলতানের পাশে দাঁড়াতেন, তো কাল আরেকজনের পাশে। আগামী পরশুই হয়তো তাকে দেখা যাবে তৃতীয়জনের পক্ষাবলম্বন করতে!
এ এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, যা অতি সহনশীল ব্যক্তিকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ছাড়বে!
সুলতান মাহমুদের মৃত্যু-পরবর্তী তিন বছরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছেন সুলতান দাউদ, সুলতান মাসউদ, সুলতান তুগরল, সুলতান মাসউদ এবং এখন আবার সুলতান তুগরল। কারও জানা নেই, আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে সুলতান হিসেবে কাকে দেখতে পাবে?!
এটা কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো বিষয়?! কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য?!
এদিকে উচ্চাভিলাষী খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহও সংঘাতের স্বতন্ত্র একটি পক্ষে পরিণত হয়েছেন। সবাইকে আপন নির্দেশনা মানতে বাধ্য করার মতো বড় না হলেও তারও একটি মোটামুটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। কিন্তু তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে এখন পরিণত হয়েছেন চলমান সমীকরণে অন্যদের হাতে ব্যবহৃত এক প্রভাবক উপাদানে। সামনে কি এমন সময় আদৌ আসবে, যখন খলিফা কেবল নামে নয়, দায়িত্ব ও প্রভাবক্ষমতায়ও খলিফাতুল মুসলিমীনে পরিণত হবেন?!
এমন ক্রম পরিবর্তিত সময়ে এটি বড় জটিল প্রশ্নই বটে!
আমরা বরং আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে বিচরণ করি!
তিনি তাদের মধ্য হতে কার সঙ্গে যুক্ত হবেন? কাকে সাহায্য করবেন? তার দৃষ্টিতে চলমান সংঘাতে কোন পক্ষ মহান ও শ্রেষ্ঠ?
শুরুতে তিনি সুলতান মাসউদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। কারণ, সংঘাতে জড়ানো ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠতম। ইমাদুদ্দিন জিনকির মনে হয়েছিল, অন্যদের তুলনায় তার সালতানাত লাভের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা সকলেই দুর্বল; চারিত্রিক উৎকর্ষ ও স্বভাবগত নম্রতা থাকলেও সকলেই পার্থিব স্বার্থান্বেষী। এখন তিনি কী করবেন? সুলতান মাসউদকেই সঙ্গ দিয়ে যাবেন, অন্য কোনো সুলতানের পক্ষ নেবেন, নাকি খলিফার পাশে দাঁড়াবেন?!
হতভম্ব করে দেওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি!
বরং অতি জটিল পরিস্থিতি!
জটিলতা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ জানেন?!
জটিলতার কারণ কেবল এই নয় যে, পরস্পরবিরোধী অনেকজনের মধ্য হতে একজনকে বেছে নিতে হবে। জটিলতার কারণ আরও জটিল! সময় ততদিনে প্রমাণ করে দিয়েছে, ইমাদুদ্দিন জিনকি সবার চেয়ে শক্তিশালী!
তিনি সমকালীন সকল সুলতানের চেয়ে শক্তিশালী, প্রতাপশালী আব্বাসি খলিফার চেয়েও। কেবল বিশ্বাসশক্তি ও চরিত্রগুণের বিচারে নয়; সামরিক ও জাগতিক শক্তির বিবেচনায়ও তিনি তাদের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি তাদের চেয়ে যোগ্য ও শক্তিশালী চিন্তায়, মেধায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও। তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি ক্রুসেডার বিতাড়নকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র শাসক, যিনি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধকরণের কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, যিনি নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে আলিম ও ফকিহদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
জনপ্রিয়তায়ও তিনি সবার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের জনগণের হৃদয় তার প্রতি ধাবমান। তার প্রতিটি সংবাদ জানার জন্য সকলের হৃদয়জগৎ উন্মুখ, ভালোবাসায় টইটম্বুর। জনসাধারণের মাঝেও তার বিষয়ে দ্বিমত নেই। বিপরীতে এসব সুলতানের কারও সঙ্গে কি জনসাধারণের সামান্য সখ্য আছে? সালতানাতের মসনদে তুগরল আছেন, না মাসউদ; সেলজুকশাহ, না দাউদ বিন মাহমুদ, জনতার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন ঘটে?! বরং তারা চারজন বাদে পঞ্চম-ষষ্ঠ বা দশম কোনো ব্যক্তিও মসনদে আরোহণ করলে জনমনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা আলাদা গুরুত্ব রাখবে না।
এটিই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকিই কেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান ব্যক্তি হবেন না? যে দায়িত্ব সুলতান পালন করেন, সে দায়িত্ব কেন তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেবেন না? নিঃসন্দেহে বড় ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্ন!
কিন্তু এটিই বাস্তব প্রশ্ন!
হয়তো এ প্রশ্নের দুঃখজনক উত্তর হবে—তিনি তো সেলজুক পরিবারের সদস্য নন। তাহলে তিনি কীভাবে সেলজুক সুলতানের স্থলাভিষিক্ত হবেন?!
কিন্তু সুলতান হতে হলে কি সেলজুক পরিবারের সদস্য হওয়া জরুরি?! খলিফাকে আব্বাসি পরিবারেরই হতে হবে?! শাসনক্ষমতা কি বংশগত অধিকার?!
এগুলো নিশ্চয়ই দুঃসাহসী প্রশ্ন; কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর এমন অনেক ভুল প্রকাশ করে দেবে, মুসলিম উম্মাহ তার যাপিত জীবনে বারবার যার শিকার হয়েছে।
আমি বলছি না, পিতার পর তার পুত্র রাষ্ট্রশাসনভার গ্রহণ করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন; শর্ত হলো সন্তানকে হতে হবে মালিকশাহর মতো; যিনি পিতা আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এই উত্তরাধিকার শরিয়তের কোনো মূলনীতি লঙ্ঘন করেনি; প্রশাসনিক রীতিনীতি বিনষ্ট করেনি।
একজন মুসলিম প্রশাসকের মাঝে জ্ঞান, শক্তি, সদাচার, শরিয়তের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিপুণ কূটনীতির মতো অপরিহার্য কিছু গুণ বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। কোনো ভাই বা পুত্রের মাঝে এসব গুণ বিদ্যমান থাকলে প্রয়াত ভাই বা পিতার পর তার স্থলাভিষিক্ত হতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এসব গুণ না থাকা সত্ত্বেও কেবল পূর্ববর্তী শাসকের আত্মীয়তার 'যোগ্যতা'বলে মুসলমানদের শাসক বনে যাওয়া না ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ, না বিবেকের যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য।
সেলজুক সাম্রাজ্যকাল ছিল মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ কথা প্রযোজ্য সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তুগরল বেগ, এরপর আলপ আরসালান, মালিকশাহ ও অন্যান্য প্রতাপশালী সুলতানের শাসনামলের ক্ষেত্রে, যারা ইসলামের পতাকা সমুন্নত করেছিলেন। কিন্তু সেলজুকদের শক্তি ও প্রভাব যখন ঝিমিয়ে আসে, তখন ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখতে অন্য কারও এগিয়ে আসাই ছিল বাস্তবতার দাবি। সুনির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে তো উম্মাহর অস্তিত্ব শেষ করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে-ইমরান: ১৪০]
এ রাজত্ব তো অন্য এক পরিবারের হাত থেকেই সেলজুক পরিবারের হাতে এসেছিল। সুতরাং এমন একদিন আসবেই, যখন তাদের হাত থেকে কর্তৃত্ব চলে যাবে অন্য কারও হাতে।
স্পষ্টতই অনুমিত হচ্ছিল, তৎকালে সেই 'অন্য' হতে যাচ্ছেন ইমাদুদ্দিন জিনকি!
জিহাদের অঙ্গনে তার অবিচলতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, অবস্থান ও মর্যাদা সে যুগে তাকে এ পদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছিল। সালতানাতের পদ নিয়ে যারা সংঘাতে লিপ্ত ছিল, তাদের মধ্যে কে যোগ্যতা ও মর্যাদায় তার কাছে ভিড়তে পারে? অন্য সব বিষয় না হয় বাদ দিলাম, কেবল অভিজ্ঞতার কথাই বলি! তারা সকলেই তো ছিল বয়সে নবীন, অভিজ্ঞতায় কাঁচা। বয়সে তাদের জ্যেষ্ঠতম ছিলেন সুলতান মাসউদ; ৫২৮ হিজরি সনে তার বয়স সাতাশ পেরোয়নি। অথচ সে সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির বয়স ছিল একান্ন বছর! তিনি পদে পদে হাজারো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, ঘটনা-দুর্ঘটনার দুর্বিপাকে জ্বলে-পুড়ে সমৃদ্ধ হয়েছেন, সুনিপুণ দক্ষতায় কাছের-দূরের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার শক্তি ও দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার কথা সকলে জানে। তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব লাভ করেন, সকলে তাতে সুখী হবে, সকলে তার নির্দেশনা মেনে নেবে।
কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এখন কী করবেন?!
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার রাজ্য নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন?
নাকি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল একজনের পাশে দাঁড়াবেন এবং তাকে শক্তিশালী করবেন?
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করলে হয়তো পুরো সেলজুক পরিবার একসঙ্গে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে! কারণ, তিনি তো সেলজুক পরিবারের কেউ নন। তখন তো রাষ্ট্র উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতিত হবে! জাতি আটকে যাবে সংঘাতের এক গোলকধাঁধায়!
আর তিনি যদি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল এক পক্ষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে দুর্বল সেই ব্যক্তি হয়তো এমন পদে অধিষ্ঠিত হবে, সে যার যোগ্য নয়; এমন অবস্থানে পৌঁছে যাবে, যা তার যথোচিত নয়। এটা তো হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং উম্মাহর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
তা ছাড়া এই আত্মঘাতী গৃহবিবাদের স্রোতে ক্রুসেডার বিতাড়ন তৎপরতা পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে যাবে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি কী করবেন?!
মহৎপুরুষদের চিন্তাধারা তো অভাবনীয়ই হয়ে থাকে!
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চলমান বিরোধের নথিপত্র পুরোপুরি বন্ধ করে তিনি মনোযোগ দেবেন ক্রুসেডারদের দমনে। তিনি সচেষ্ট হবেন নির্যাতিত-নিপীড়িত, অধিকার ও মর্যাদাবঞ্চিত, আপন বসতভিটা থেকে বিতাড়িত মুসলমানদের ঠোঁটে হাসি ফিরিয়ে আনতে।
কিন্তু ফিতনার এমন ভীতিপ্রদ জটিল সময়ে এমন চিন্তা বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হতে পারে?!
ইমাদুদ্দিন জিনকি ভাবতে থাকেন। অনেক চিন্তার পর তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, কার্যত তিনি সালতানাত ও খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথ চলবেন। তবে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আশঙ্কায় তিনি বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন না।
তিনি এসব দুর্বল সুলতানদের সবাইকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনকি তাদের চলমান সংঘাত যদি শেষ হয়ে যায় এবং কোনো একজন পরিস্থিতির ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন, তখনও তার নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে না। পক্ষান্তরে তিনি তাদের পেছনে পড়ে থাকলে অচিরেই তারা তাকে তাদের পছন্দের 'দুনিয়া'য় নিয়ে যাবে এবং তাকে নিজেদের পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের মাধ্যম বানাবে। তাই তিনিই জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন গৌরব ও মর্যাদার পথে এবং তার আগে-পরে আপন রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথে।
তার কাঁধে এক কঠিন আমানত ও দায়িত্বভার। তিনি তাই দীর্ঘ বিরোধ ও ফলহীন সংঘাতে সময় অপচয় করতে চান না।
তিনি এখনই নিজেকে উম্মাহর অনুসরণীয় প্রধান নেতা ঘোষণা করবেন না; হয়তো জাহির করবেন না কখনোই। কিন্তু তিনি কাজ করে যাবেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান নেতার মতো করে। একই সঙ্গে তিনি সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যথাসম্ভব কোমল আচরণ করবেন। তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচতে এবং নিজের মহান কর্মতৎপরতাকে তাদের বাধামুক্ত রাখতে এটিই হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতির দাবি।
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ তার নিয়োগপত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য যে রাজ্যসীমা নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন, তিনি সে অঞ্চলেই অর্থাৎ মসুল, জাযিরা ও শাম অঞ্চলে তার কর্মধারা সীমাবদ্ধ রাখবেন। সেলজুক ও আব্বাসিদের সংঘাতক্ষেত্র বাগদাদ, মধ্য ইরাক, পারস্য ও অন্যান্য অঞ্চলে তিনি মোটেও নজর দেবেন না। তা ছাড়া আল্লাহ তাওফিক দিলে মসুল, জাযিরা ও শামের সম্মিলিত শক্তিই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অনেক মূল্যবান দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে। আর ভবিষ্যতের কথা কে জানে?! হয়তো ইমাদুদ্দিন জিনকির এ চেষ্টা ও সাধনা অন্য কারও হাতে পূর্ণতা লাভ করবে; যিনি এ ঐক্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করে উম্মাহর সম্মান ও গৌরব আরও ব্যাপক ও সমৃদ্ধ করবেন। তুগরল বেগ ও আলপ আরসালানের রাজ্য তো মালিকশাহর রাজত্বের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। সব সময় তো এমনই হয়; ধীরে ধীরে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি!
শেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতেন। এর স্বপক্ষে ইতিপূর্বে আমরা বিভিন্ন প্রমাণ উল্লেখ করে এসেছি। আর যে আল্লাহর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার চেষ্টা ও সাধনা নিষ্ফল করেন না। হয়তো জীবদ্দশায় সে তার কাজের পরিণতি দেখে যেতে পারে না, কিন্তু আল্লাহ তার কর্মফল ও পুরস্কার পরকালের জন্য গচ্ছিত রেখে দেন। আর এটিই তো মুমিনের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, সর্বশেষ চাওয়া।
মহান বীরপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকির মনমস্তিষ্কে এসব চিন্তা ও পরিকল্পনাই বিচরণ করছিল। দীর্ঘ তিন বছরের ধারাবাহিক সংকটের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং আপন করণীয় নির্ণয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার পর তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ফিতনা তো চলছেই; আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কবে এর অবসান হবে।
আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার তার গৃহীত নতুন কূটনীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষের পাশে দাঁড়ানোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে নমনীয়তা ও সুসম্পর্কের নীতি।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে দিয়ে। সুলতান মাসউদের পক্ষে অগ্রসর হওয়ার পর থেকে বিগত দুই বছর ধরে খলিফার সঙ্গে তার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। তিনি এবার খলিফা বরাবর মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা প্রেরণ করেন। বরং খলিফার মর্যাদার স্বীকৃতি এবং খলিফার প্রতি আনুগত্য ও মিত্রতার নিদর্শনস্বরূপ তিনি তার বড় পুত্র সাইফুদ্দিন গাজিকে খলিফার খেদমতে প্রেরণ করেন। এতে খলিফার মন প্রশান্ত হয়ে যায়। তিনিও ইমাদুদ্দিন জিনকির উদ্দেশে হাদিয়া প্রেরণ করেন। (৪১৮)

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দামেশক নগরীকে রাজ্যভুক্ত করার প্রচেষ্টা

📄 দামেশক নগরীকে রাজ্যভুক্ত করার প্রচেষ্টা


৫২৯ হিজরি সনের শুরু ভাগ। বিগত কয়েক মাস ধরে সালতানাতের মসনদে আছেন সুলতান তুগরল। ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সময় তার নতুন চিন্তার প্রেক্ষিতে সুলতানদের সঙ্গে কর্মনীতির পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে মসুলে এক বিস্ময়কর সংবাদ পৌঁছায়। হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন সুলতান তুগরল! তার বয়স হয়েছিল মাত্র ছাব্বিশ বছর। ৫২৯ হিজরি সনের মুহাররম মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। সুযোগ পেয়ে সুলতান মাসউদ দ্রুত তার সৈন্য ও সহযোগীদের সমবেত করে ছুটে আসেন এবং সালতানাতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন! (৪১৯)
নতুন সুলতান হওয়ার জন্য সুলতান মাসউদের সামনে এখন শূন্য ময়দান। তুগরল তো চলেই গেলেন! দাউদ বিন মাহমুদ তার আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলি নিহত হওয়ার পর শক্তিতে অনেক দুর্বল হয়ে গেছেন। কথিত আছে, স্বয়ং সুলতান মাসউদই বাতিনি গুপ্তঘাতকদের মাধ্যমে তাকে হত্যা করিয়েছেন। ওদিকে সুলতান সানজারও উপলব্ধি করেছেন যে, তার মনোনীত সুলতান তুগরলের মৃত্যুর পর ইরাক ও পারস্যে চলমান বিরোধে হস্তক্ষেপ করা তার সামর্থ্যে কুলাবে না। সালতানাতের আরেক দাবিদার সেলজুকশাহ তো সবার চেয়ে দুর্বল। এভাবে সুলতান মাসউদ পৌঁছে যান কাঙ্ক্ষিত সালতানাতের মসনদে; যোগ্যতাবলে নয়; ময়দানে অন্য কারও অনুপস্থিতির সুযোগে। সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল যে, সেলজুক সালতানাত তার অন্তিমকাল অতিক্রম করছে!
এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে দামেশক থেকে এক বিস্ময়কর বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় দামেশকের দুষ্কর্ম অধিপতি শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি ইমাদুদ্দিন জিনকির সাহায্যপ্রার্থনা করেছেন এবং তাকে দামেশকে এসে নগরীটির দায়িত্বভার গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন!
মূল ঘটনা হলো, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি একের পর এক অপ্রত্যাশিত অন্যায় করে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তার ভাই সোনজ বিন বুরিকে দীর্ঘদিন এক কুঠুরিতে আটকে রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত বেচারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা যায়। এরপর তিনি দামেশকের জনগণের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেন, তাদের সম্পত্তি লুট করে নেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তু ছিনিয়ে নিতেও তিনি সামান্য দ্বিধা করতেন না। অসহায় ও দরিদ্র জনতার অর্থ চুরি করতেও তিনি সংকোচ করতেন না। ফলে দামেশকের জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধে। তার কিছু সহযোগী তার আচরণের প্রতিবাদ করলে তিনি তাদেরকে হত্যা করেন এবং এরপর প্রত্যেক বিরোধীকে প্রকাশ্যে বিনা দ্বিধায় হত্যা করার ঘোষণা দেন। দামেশকের পরিবেশ ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একসময় ইসমাইল নিজের নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি আশঙ্কা করেন যে, শীঘ্রই জনতা প্রতিশোধ নেবে। এমনকি তিনি অতি আপনজনদেরকেও ভয় করতে থাকেন এবং আশঙ্কা করেন, যেকোনো মুহূর্তে তাকে হত্যা করা হতে পারে। এ কারনেই তিনি নিরুপায় হয়ে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। তিনি নিজের নিরাপত্তালাভের বিনিময়ে ইমাদুদ্দিনের কাছে দামেশকের কর্তৃত্ব সমর্পণের প্রস্তাব দেন। বরং অতি ভীত ইসমাইল বিন বুরি হুমকি দেন যে, ইমাদুদ্দিন যদি দ্রুত না আসেন, তাহলে তিনি দামেশকের নিয়ন্ত্রণ ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেবেন! (৪২০)
ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান, এটি দামেশককে রাজ্যভুক্ত করার এক মূল্যবান সুযোগ। তিনি কালবিলম্ব না করে মসুল থেকে দামেশক অভিমুখে রওনা হন। তবে পথিমধ্যে তিনি রাক্কা নগরীকে তার ঐক্যবদ্ধ কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার এক অভাবিত সুযোগ পেয়ে যান। রাক্কা জাযিরা অঞ্চলের একটি নগরী। নগরীটির অবস্থান ফুরাতের পূর্ব দিকে হাররানের নিকটে। (৪২১) ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও রাক্কা নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন; কিন্তু এতে তার অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ফলে দামেশক পৌঁছতে তার তুলনামূলক দেরি হয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, শামসুল মুলুক ইসমাইল ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন!
শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি এমন এক দিক থেকে ষড়যন্ত্রের শিকার হন, যা তার কল্পনাতেও ছিল না। অন্য কেউ নয়; তাকে হত্যা করেন তার গর্ভধারিণী মা। নিঃসন্দেহে এটি ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা যে, একজন মা তার শাসকপুত্রকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছেন। এর কারণ হলো, চরম দুরাচারী ইসমাইল একসময় তার মাকে পর্যন্ত হত্যার পরিকল্পনা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তার মা-ই আগে তার দফারফা করে দেন। শামসুল মুলুক নিহত হওয়ার পর দামেশকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তার ভাই শিহাবুদ্দিন মাহমুদ বিন বুরি। দামেশকবাসী তার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। (৪২২)
ইমাদুদ্দিন জিনকি আপন রাজ্যভুক্ত করার চেষ্টায় দামেশক অবরোধ করেন। কিন্তু দুর্ভেদ্য দামেশকের পতন ঘটানো দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। দামেশক মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ কাঠামোতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। নগরবাসী বিভিন্ন দুর্গে আশ্রয় নেয়। দামেশকের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেন প্রয়াত অধিপতি তুগতেকিনের জনৈক ক্রীতদাস মুইনুদ্দিন আনুর।৪২০ মুইনুদ্দিন আনুর অসাধারণ সামরিক দক্ষতার অধিকারী সেনাপতি ছিলেন। কিন্তু সমানতালে তিনি ছিলেন চরম স্বার্থবাদী। পদ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো মাধ্যম গ্রহণ করতে তিনি দ্বিধা করতেন না। অচিরেই আমরা তাকে ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রকাশ্যে সহযোগিতা বিনিময় করতেও দেখব। দামেশকের আগামী ইতিহাসে অন্যতম নীতিনির্ধারক চরিত্র বিবেচিত হবেন এই মুইনুদ্দিন আনুর।
এরই মধ্যে ইরাক পরিস্থিতিতে ঘটে যায় এক উষ্ণ বিবর্তন। খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ আবারও সেলজুক সাম্রাজ্যের শেকল ছিঁড়ে স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্নপূরণে উদ্যোগী হন। তার স্বপ্নের পালে বাতাস জোগান সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ! তিনি চাচা সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য খলিফার সঙ্গে জোট করে খলিফাকে প্ররোচিত করেন। খলিফা সৈন্যসমাবেশ শুরু করেন এবং সরাসরি নতুন সুলতান মাসউদের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।৪২৪
শামের ময়দানে অবস্থানরত ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, দামেশক পতনের সুযোগ ও সম্ভাবনা ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছে। ওদিকে ইরাকে যেভাবে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং উম্মাহর দিগন্তজুড়ে কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে দামেশকের নগরপ্রাচীরের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগও নেই। অধিকন্তু এরই মধ্যে তিনি জানতে পারেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দামেশকের নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে হামা নগরীর প্রতিরক্ষাবাহিনীর সিংহভাগ সদস্য দামেশকে চলে এসেছে এবং হামা এখন কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বছরতিনেক পূর্বে ইরাক-বিপর্যয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শামসুল মুলুক ইসমাইল হামা নগরীকে দামেশকের সঙ্গে একীভূত করে নিয়েছিলেন।
সব দিক বিবেচনা করে ইমাদুদ্দিন জিনকি সুযোগ কাজে লাগান এবং সুরক্ষিত দামেশকের অবরোধ তুলে নিয়ে হামার দিকে অগ্রসর হন। (৪২৫) তিনি সহজেই নগরটি অধিভুক্ত করে নেন। এরপর তিনি হিমস অভিমুখে অগ্রসর হয়ে নগরীটি অবরোধ করেন। কিন্তু কুরাইশ বিন খায়র খানের নেতৃত্বে সুরক্ষিত হিমস নগরী প্রতিরোধ গড়ে তুললে অপারগ হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি আলেপ্পোতে ফিরে আসেন। (৪২৬)
এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই সংবাদ আসে— ৫২৯ হিজরি সনের ১০ রমজান (১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান মাসউদের মধ্যে দুঃখজনক লড়াই সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধে সুলতান মাসউদ বিজয়ী হয়েছেন এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ তার হাতে বন্দি হয়েছেন। বন্দি খলিফাকে সুলতান মাসউদের মূল নিবাস হামাদানে সুলতানের হেফাজতে রাখা হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এ যুদ্ধে কোনো পক্ষের একজন সৈন্যও নিহত হয়নি!
নিঃসন্দেহে এটি ছিল আব্বাসি খলিফার জন্য চরম অবমাননাকর এক পরিণতি। খলিফা এরপর সুলতান মাসউদের সঙ্গে লাঞ্ছনাকর সন্ধিচুক্তি করতেও বাধ্য হন। চুক্তির শর্ত ছিল, খলিফা সুলতান মাসউদকে চার লক্ষ দিনার মুক্তিপণ প্রদান করবেন, ভবিষ্যতে সৈন্যসমাবেশ ঘটাবেন না, নিজ বাসস্থান থেকে কখনো বের হবেন না এবং সুলতান মাসউদকে সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া খলিফার উপায় ছিল না। তিনি যখন বাগদাদে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই ঘটে বড় বেদনাদায়ক এক ঘটনা। অতর্কিতে চব্বিশজনের একটি বাতিনি গুপ্তঘাতকদল খলিফার তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে! দিনটি ছিল ৫২৯ হিজরি সনের ১৭ জিলকদ। (৪২৭)
চারিদিকে রটে যায়, সুলতান মাসউদই খলিফাকে হত্যার মদদ জুগিয়েছেন। কারণ, এমন কঠোর শর্তযুক্ত সন্ধিচুক্তির পরও তিনি খলিফার বিষয়ে চিন্তামুক্ত ছিলেন না। অবশ্য এরপর প্রয়াত খলিফার পুত্র আবু জাফর মানসুরের হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করা হয় এবং তিনি 'রাশিদ বিল্লাহ' উপাধি গ্রহণ করেন। (৪২৮) কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে, ইরাক অঞ্চল ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। ইরাকের পরিস্থিতি তখন প্রচণ্ড তাপে টগবগ করা উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো! এদিকে সুলতান মাসউদ এতটুকুতেই শান্ত হয়ে এরপর রওনা হন তার ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদ বিন মাহমুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে; যিনি তার বিরুদ্ধে খলিফার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। (৪২৯)

টিকাঃ
৪১৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৪৭-৪৮।
৪১৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮।
৪২০, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮-২৭৯।
৪২১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫৭।
৪২২, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৯ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫৬-২৫৭।
৪২০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৯-২৮০ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৯১।
৪২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮১-২৮২।
৪২৫, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/২৭৫-২৭৮।
৪২৬, ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৯৭-৩৯৮।
৪২৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮১-২৮৩।
৪২৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮৩ ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাজাম, ১০/৫৫।
৪২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00