📄 ৫২৬ হিজরি সনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি
নতুন সুলতান তুগরল দায়িত্ব গ্রহণের পর কি পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছিল?!
একটুও না। ফিতনা ও গোলযোগ মোটেও থামেনি। সকলের অন্তর্জগৎ ছিল সমস্যাগ্রস্ত। প্রত্যেকের চিন্তাজগৎ ছিল নানাবিধ কল্পনা-পরিকল্পনায় ব্যস্ত। আসুন, আমরা এই সংঘাত আলোচনা থেকে একটু বিশ্রাম নিই! দেখি, এ বছরের শেষ দিকের পরিস্থিতি কেমন। কারণ, এই গোলযোগের সময়ই এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। দশটি পয়েন্টে আমরা সেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করছি।
১. তুগরলকে ইরাকের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে সুলতান সানজার দ্রুত তার রাজ্যে ফিরে যান। কারণ, তার শাসিত রাজ্য খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চল ছিল বাগদাদ থেকে বেশ দূরে, মধ্য এশিয়ায়। দীর্ঘকাল সুলতানের অনুপস্থিতি সেখানে হয়তো ক্ষমতালোভীদের প্ররোচিত করে তুলবে।
২. সুলতান তুগরল এখন সালতানাতের ক্ষমতা ভোগ করলেও চাচা সানজারের বাহিনী ছাড়া তার একক শক্তি খুবই দুর্বল। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি তার অবস্থানকে প্রভাবিত করছিল এবং অপর ভাইদের তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করছিল।
৩. সুলতান মাসউদ চাচা সানজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে গেলেও তার সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ, সুলতান সানজার তার ও তার বাহিনীর প্রতি অনুগ্রহ করে তাদেরকে পারস্যে ফিরে যেতে দিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই, ইরাকের সালতানাতের প্রতি সুলতান মাসউদের আগ্রহ ও অভিলাষ মোটেও হ্রাস পাবে না। তা ছাড়া তিনি সুলতান তুগরলের বড় ভাই, তাকে বাদ দিয়ে তুগরলকে ক্ষমতা প্রদানের কোনো যৌক্তিকতা তার দৃষ্টিতে নেই।
৪. প্রয়াত সুলতান মাহমুদের পুত্র দাউদ ছিলেন ঘোষিত সুলতান। তাকে সুলতান পদ থেকে অপসারণ করে তার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অবশ্যই তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করবেন। তিনি প্রয়াত সুলতানের পুত্র। তার পিতা তাকেই সুলতান ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাদা ও চাচারা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তিনি কি শান্ত হয়ে যাবেন, নাকি হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করবেন?!
৫. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ। তার প্রত্যাশার বিপরীতে সালতানাত এখন সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে। তিনি নিশ্চয়ই সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিষ্কৃতি লাভের সুযোগের প্রতিক্ষায় ওত পেতে থাকবেন।
৬. শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তাতে ইমাদুদ্দিন জিনকির আফসোস ও দুঃখই কেবল বেড়েছে। ক্রুসেডাররা এখন চরম বিশৃঙ্খল ও কঠিন সময়কাল পার করছে, সামনে হয়তো আরও কঠিন দুর্যোগের শিকার হবে। মুসলিম উম্মাহ যদি এই ফিতনা ও জটিলতার শিকার না হতো, তাহলে এটি ছিল ক্রুসেডারদের ওপর ব্যাপক পরিসরে হামলা চালানোর এক মোক্ষম সুযোগ। এদিকে মুসলমানদের চলমান ফিতনা অতি দ্রুত শেষ হওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই।
৭. যে মাসে সুলতান তুগরল সেলজুক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব লাভ করেন, সে মাসেই অর্থাৎ ৫২৬ হিজরি সনের ২১ রজব দামেশকের আমির বুরি বিন তুগতেকিন মৃত্যুবরণ করেন। (৩৯৬) তার অবর্তমানে দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র ইসমাইল বিন বুরি বিন তুগতেকিন। তিনি 'শামসুল মুলুক' উপাধি ধারণ করেন। ইসমাইল বিন বুরি ছিলেন দুরাচারী-অত্যাচারী একজন শাসক। জীবনে এত বড় বড় অন্যায় ও অনাচার তিনি ঘটান, যা তাকে সকলের বিরাগভাজনে পরিণত করে। তিনি তার রাজ্যের সকল কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গেই যুদ্ধ শুরু করেন। ফলে জনমনে তৈরি হয় ব্যাপক আতঙ্ক। বুরি বিন তুগতেকিনের ইন্তেকাল ও তার অত্যাচারী পুত্রের দায়িত্ব গ্রহণ দামেশকবাসীর জন্য বিরাট দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (৩৯৭)
৮. ক্ষমতা নিয়ে দামেশকের আমির শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি ও তার ভাই বালাবাক্কু অঞ্চলের আমির শামসুদ্দৌলা মুহাম্মাদ বিন বুরির মাঝে বিরোধ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বিরাট যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। উভয়ের বিরোধের পরিসমাপ্তি ঘটে দামেশকের উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দুর্গের অধিকার শামসুল মুলুক ইসমাইলের হাতে আসার মধ্য দিয়ে। অবশ্য তিনি ভাই শামসুদ্দৌলাকে বালাবাক্কুর আমির হিসেবে স্বীকৃতি দেন। (৩৯৮) দামেশকের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ঘটনা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য দামেশককে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ। কিন্তু ইরাকে যে আরও কঠিন ফিতনা তরঙ্গায়িত হয়ে তাকে কার্যত নিশ্চল করে দিয়েছে!
৯. এন্টিয়কের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। সদ্য গত হওয়া ২য় বল্ডউইনের কন্যা এলিস এন্টিয়কের মসনদ দখলের জন্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন। তিনি ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে বাইতুল মুকাদ্দাসের নতুন রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর অনভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রথম সারির তিনজন ক্রুসেডার নেতার মদদে এন্টিয়কের ক্ষমতা হাতানোর পাঁয়তারা করেন। এতে ক্রুসেড শিবিরে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপর্যয় কেবল এজন্য নয় যে, এলিস এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অঘোষিত প্রধান নেতা ফাল্কের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করছেন এবং তার মতো একজন অপরিণত-অযোগ্য নারীর হাতে এন্টিয়কের শাসনভার চলে যাচ্ছে। বরং এর চেয়েও বড় শঙ্কার কারণ ছিল, এলিসের সঙ্গে একজোট হওয়া সেই তিন নেতার পরিচিতি। এলিসের সঙ্গে এন্টিয়কের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যারা একমত হয়েছিল, তারা হলো-এডেসা রাজ্যের শাসক ২য় জোসেলিন, ত্রিপোলির শাসক পন্স এবং এন্টিয়ক রাজ্যের অধীনস্থ লাতাকিয়া অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ জিয়ন (Zion) দুর্গের প্রশাসক উইলিয়াম। অর্থাৎ এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলে ক্রুসেড শিবিরে বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি হবে। কারণ, এন্টিয়কের শাসনক্ষমতা প্রশ্নে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বিরুদ্ধে বাকি তিন রাজ্য একজোট হয়েছে।
ঘটনাক্রমে এন্টিয়কের কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা গোপন ষড়যন্ত্রের বিষয়টি জেনে ফেলে এবং দ্রুত পত্র পাঠিয়ে রাজা ফাল্ককে বিষয়টি অবহিত করে। রাজা ফাল্ক তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে বেপরোয়া এলিসের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন। (*.) কিন্তু ত্রিপোলির শাসক পন্স মাঝপথে লেবাননে তার পথ আগলে দাঁড়ান। সেখানে বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনী ও ত্রিপোলির বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। শাম ও ফিলিস্তিন ভূমিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এটি ছিল ক্রুসেড শিবিরের ইতিহাসে প্রথম পারস্পরিক যুদ্ধ। ঘোরতর লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। রাজা ফাল্ক রণাঙ্গন থেকে পিছু হটেন। অবশ্য তিনি বৈরুত নৌবন্দর হয়ে সমুদ্রপথে এন্টিয়কে পৌঁছতে সক্ষম হন। (400) তিনি এন্টিয়কে প্রবেশ করে এলিসের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেন। এদিকে এলিসের কর্তৃত্ব মজবুত করতে পন্সও দ্রুত এন্টিয়কে ছুটে আসেন। এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। (৪০১) শেষ পর্যন্ত ত্রিপোলির শাসক পন্স শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং এন্টিয়কের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রাজা ফাল্কের হাতে। (৪০২) তিনি তার পক্ষ থেকে রেনাড মাশোয়ের (Renaud Masoier) নামক জনৈক ব্যক্তিকে এন্টিয়কের শাসক নিযুক্ত করেন। (40.) নিঃসন্দেহে ক্রুসেডারদের এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে মুসলমানদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু মুসলমানরা তো ব্যস্ত নিজেদের দুর্যোগ নিরসনে!
১০. এটিই চলমান সময়ে ক্রুসেডারদের একমাত্র সমস্যা ছিল না। এ সময় তারা আরেকটি বিপর্যয়ের শিকার হয়, যা ছিল আগেরটির চেয়েও গুরুতর। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজা ফাল্ক ও জাফা নগরীর প্রশাসক ২য় হিউ (Hugh II of Jaffa)-এর মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সংঘাতের কারণ ছিল, রাজা ফাল্ক জেনে ফেলেন যে, তার স্ত্রী মেলিসেন্ড যুবক প্রশাসক ২য় হিউয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন! লড়াই শেষে রাজা ফাল্ক ২য় হিউকে বন্দি করতে সক্ষম হন এবং তাকে মারাত্মক আহত করে সিসিলিতে নির্বাসিত করেন। অল্প কদিন পরই হিউ সেখানে ইহধাম ত্যাগ করে। (408)
দাম্পত্য জীবনে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণিত হওয়ায় খ্রিষ্টধর্ম মতে যদিও রাজা ফাল্ক তার স্ত্রীকে পরিত্যাগের অধিকার লাভ করেন; কিন্তু তিনি জানতেন, মেলিসেন্ডকে পরিত্যাগ করার অর্থ তার ক্ষমতাই শেষ হয়ে যাওয়া! কারণ, তিনি তো প্রয়াত রাজা ২য় বল্ডউইনের মেয়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার লাভ করেছেন। আর তাই তিনি যদি স্ত্রী মেলিসেন্ডকে অভিযুক্ত করে দোষী প্রমাণ করেন, তাহলে শাসনভার চলে যাবে তার অন্য কোনো বোনের হাতে এবং সেই সূত্রে সেই বোনের স্বামীর হাতে। সবদিক বিবেচনা করে রাজা ফাল্ক সিদ্ধান্ত নেন, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন এবং স্ত্রীকে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলবেন। বরং পরবর্তী সময়ে যখন মেলিসেন্ড তার প্রেমিক পুরুষকে হত্যা করায় ফাল্কের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করেন, রাজা ফাল্ক নতজানু হয়ে বিভিন্ন উপায়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকেন। (405)
স্ত্রী মেলিসেন্ডকে তুষ্ট করার জন্য ফাল্ক যেসব অতিরঞ্জনমূলক আচরণ করেন, তার অন্যতম হলো তিনি মেলিসেন্ডের দাবি মেনে নিয়ে এন্টিয়কের শাসক পদ হতে রেনাড মাশোয়েরকে সরিয়ে মেলিসেন্ডের বোন এলিসকে এন্টিয়কের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন! (406) এর মাধ্যমে রাজা ফাল্ক কেবল যে তার মর্যাদা ও প্রতিপত্তি খুইয়ে ফেলেন তা-ই নয়; বরং ইতিপূর্বে তিনি যে এলিসের বিষয়ে প্রচণ্ড কঠোর ছিলেন, তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং এন্টিয়কের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেন। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে তিনি পুরুষোচিত আত্মমর্যাদা ও মানবিক বিবেচনাবোধই হারিয়ে ফেলেন।
সুতরাং ৫২৬ হিজরি সনের শেষ দিকে ক্রুসেড শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্য শুভবার্তা বয়ে আনছিল। এ সময় মুসলমানরা যদি ইরাকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত না থাকত, নিশ্চিত করেই পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারত। মুসলমানদের উপলব্ধি করা উচিত নিজেদের বিভেদ-বিসংবাদের কারণে যুগে যুগে তাদের কত বিরাট মূল্য চুকাতে হয়েছে!
টিকাঃ
৩৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৫ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৫।
৩৯৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮-২৭৯।
৩৯৮. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৬।
*. Guillaume de Tyr, p. 611.
400. Michaud: op.cit.,ll, p,85.
৪০১. Stevenson: op.cit.,ll, p.141.
৪০২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫১।
40. Guillaume de Tyr., p. 612-613.
408. Guillaume de Tyr., p. 627-633; Besant, Palmer: Jerusalem, pp. 291-292.
405. Runciman: op.cit.,ll, p.193.
406. Guillaume de Tyr.,p. 636.
📄 ফিতনার উত্তপ্ত সময়
আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সময় নিরুপায় হয়ে বাগদাদের উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহের নিকটেই মসুলে সসৈন্য নিশ্চল বসে ছিলেন। কারণ, বাগদাদে চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বিন্যাসে রদবদল ঘটার আশঙ্কা ছিল। এ সময় তিনি তার অধীনস্থ আলেপ্পোর প্রশাসক সিওয়ারের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কিছু খণ্ড যুদ্ধ পরিচালনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন। (৪০৭) পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, দামেশকের অন্যতম শক্তিশালী সেনাপতি সিওয়ার ৫২৪ হিজরি সনে দামেশক থেকে পলায়ন করলে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আলেপ্পো ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়চেতা মুজাহিদ ছিলেন; ইমাদুদ্দিন জিনকির মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তার পদের যথোচিত মর্যাদা রক্ষা করে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে গেছেন।
আবারও ইরাকের জটিল পরিস্থিতিতে ফিরে আসছি!
স্বভাবতই পরিস্থিতি মোটেও শান্ত হয়নি। সুলতান সানজার ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে খোরাসান ফিরে গিয়েছিলেন। ফলে তুগরলের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা আবারও ক্ষমতা লাভের আশায় উদ্যোগী হয়ে ওঠে। সুলতান তুগরল বাগদাদের পরিবর্তে হামাদান নগরীকে তার আবাসভূমি নির্বাচন করেছিলেন। সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ ও তার আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলি এ সময় সুলতান তুগরলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং সৈন্যসমাবেশ ঘটান। ৫২৬ হিজরি সনের রমজান মাসে হামাদানের অদূরে দু-পক্ষের মাঝে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সুলতান দাউদ পরাজিত হন এবং পুনরায় পরিস্থিতি সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কিন্তু বিষয়টি এখানেই সমাপ্ত হয়নি। পরাজিত সুলতান দাউদ সেখান থেকে সোজা বাগদাদে চলে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খলিফা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন এবং বাগদাদের সুলতান-প্রাসাদ তার জন্য ছেড়ে দেন। অবশ্য খলিফা তাকে সুলতান উপাধি প্রদানে বিরত থাকেন। শত হোক, দাউদ তো এখন পরাজিত ও দুর্বল! (৪০৮)
যথারীতি এ সংবাদ পৌঁছে যায় সুলতান মাসউদের কাছে। তিনি মনে করতেন, ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে তিনিই সালতানাত লাভের অধিক হকদার। অন্তত বর্তমান সুলতান ও তার ছোট ভাই সুলতান তুগরলের চেয়ে তো তিনি অবশ্যই অগ্রাধিকার রাখেন। তাই তিনি দ্রুত বাগদাদে ছুটে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান দাউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনজন এ বিষয়ে একমত হন যে, খলিফা সুলতান মাসউদকে সুলতান উপাধি প্রদান করবেন, আর দাউদ হবেন তার ওলিয়ে আহদ বা পরবর্তী 'সুলতান। এভাবে মূলত খলিফা ও সুলতান মাসউদের পূর্বের পুরোনো সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে; পাল্টে যাবে শুধু ওলিয়ে আহদের জায়গাটুকু। পূর্বের চুক্তিতে ওলিয়ে আহদ হওয়ার কথা ছিল সেলজুকশাহর, আর নতুন চুক্তিতে সেখানে সুলতান দাউদ বিন মাহমুদের নাম!
সুলতান মাসউদ ও সুলতান দাউদ তাদের সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং পারস্যের বিভিন্ন স্থানে সুলতান তুগরলের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এসব যুদ্ধে সুলতান মাসউদ জয়লাভ করেন এবং এর অনিবার্য দাবি অনুযায়ী তিনিই এবার ইরাক ও পারস্যের সুলতান উপাধি ধারণ করেন। এটি ৫২৭ হিজরি সনের শেষ দিকের ঘটনা। অর্থাৎ দুঃখজনক এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পূর্ণ এক বছর চলে যায়। (৪০৯)
এই অব্যাহত সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সময় দামেশকের অত্যাচারী শাসক ইসমাইল বিন বুরি ঘটনাপ্রবাহের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। সুযোগ বুঝে তিনি হঠাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হামা নগরীতে অভিযান চালান। কঠিন অবরোধ আরোপের পর একসময় তিনি নগরীটির পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এটি ছিল নবগঠিত জিনকি রাজ্যের জন্য বড় ধরনের আঘাত। (৪১০) কারণ, হামা ছিল দামেশক অভিমুখে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। তা ছাড়া ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলিতে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও হামা হতে পারত অন্যতম ঘাঁটি। কিন্তু সেলজুক সুলতানদের অব্যাহত সংঘাতের কারণে নিরাপত্তার যে চরম অবনতি হয়েছিল, তাতে এমন দুঃখজনক ঘটনার অবতারণা একদম স্বাভাবিক ছিল।
তবে ইরাকে চলমান দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা যেন মুসলমানদের ভূখণ্ডে লোলুপ দৃষ্টি ফেলার সাহস না করে, এ উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ প্রশাসক ইমাদুদ্দিন জিনকি এতকিছুর পরও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। অবশ্য এ সময়ের অধিকাংশ অভিযান পরিচালিত হয় আলেপ্পোর আমির সিওয়ারের নেতৃত্বে। এসব অভিযানের অন্যতম হলো, সিওয়ার ৫২৭ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে এডেসা রাজ্যের অন্তর্গত তিল-বাশির নগরীতে হামলা চালান এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। হাজারখানেক ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়। মুসলিম বাহিনী প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদও লাভ করে। সিওয়ার এর পাশাপাশি জাযিরা অঞ্চলের তুর্কমেন গোত্রগুলো থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে বেশ কয়েকটি বাহিনী গঠন করেন এবং বাহিনীগুলোকে ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক রাজ্যে হামলার কাজে ব্যবহার করে বিক্ষিপ্ত আরও কিছু বিজয় অর্জন করেন। এসব অভিযানেও ক্রুসেডারদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয় এবং প্রভূত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। (৪১১) রাজ্যগুলোর পতন ঘটানো এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল না। কারণ, ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পতন ঘটানোর মতো শক্তি এসব বাহিনীর ছিল না। অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরাকের ফিতনা নিরসন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির নতুন করে জিহাদি তৎপরতা শুরু করার আগ পর্যন্ত আলেপ্পো ও এর আশপাশের অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে কোনো দুর্গ বা নগরী পুনরুদ্ধার না হলেও এসব অভিযান ছিল অনেকটাই সফল।
আবারও ফিরে আসছি ইরাক ও পারস্যের ঘটনাপ্রবাহে।
আমরা এখন আছি ৫২৮ হিজরি সনে। ইরাকি সেলজুক সালতানাতের মসনদে এখন সুলতান মাসউদ। কিন্তু নিঃসন্দেহে অপসারিত সুলতান তুগরল এতে বিলকুল সন্তুষ্ট নন। অতীতে তিনি দূর থেকে তার চাচা সুলতান সানজারের সহযোগিতা পেয়ে আসছিলেন। এবার তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি সুলতান দাউদ বিন মাহমুদকেও সুলতান মাসউদের পক্ষ ত্যাগ করতে প্ররোচিত করতে থাকেন এবং তাতে সফলও হন। এমনকি তিনি খোদ সুলতান মাসউদের বাহিনীর কিছু অংশকেও নিজের দলে টানতে সক্ষম হন।
পারস্য ভূমিতে দুই ভাই সুলতান মাসউদ ও সুলতান তুগরলের বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধে সুলতান তুগরল সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং পুনরায় সালতানাতের মসনদ লাভ করতে সক্ষম হন। (৪১২)
মুসলিম জনসাধারণ এক অব্যাহত ফিতনা ও সংঘাতের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এবং মুসলিম বাহিনীগুলোর পারস্পরিক যুদ্ধ নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়। তদ্রূপ কয়েক মাস পরপর সুলতান পদে পালাবদলও যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। ইরাকের সুলতান পদ যেন অতি সাধারণ একটি পদ; জাতির পথচলায় যার কোনো দায়িত্ব ও ভূমিকা নেই!
টিকাঃ
৪০৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৮-২৬৯।
৪০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৬-২৬৭।
৪০৯. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৯-২৭০।
৪১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১ ও Grousset: Hist, des Croisades, II. p. 55.
৪১১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১-২৭২।
৪১২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৩-২৭৪।
📄 ইরাকের চলমান ফিতনার অনিবার্য ফল
এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগাতে অসুস্থ মনের অধিকারী প্রতিটি ব্যক্তি হামলে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক। চলমান ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার উপযুক্ত একটি একক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। এখন তার চোখের সামনে সেই ঐক্য-কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম সুলতানগণ বিশুদ্ধ চেতনায় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করার পরিবর্তে নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং প্রত্যেকেই একদল সাধারণ মুসলমানকে নিজের পক্ষে টেনে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা। বিস্তৃত জিনকি রাজ্যের অভ্যন্তরেও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। জনসাধারণ অনুভব করছে, সুলতানদের এই সংঘাতে শেষ পরিণতি দেখার অপেক্ষা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকির এখন কিছু করার নেই। স্বয়ং ইমাদুদ্দিনও এই বিরোধে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে মসুলেই অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রতীক্ষা করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি যে কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না!
এ সময় মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কুর্দি হাকারিয়া ও হামিদিয়া গোত্র অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, গোত্রদুটি ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিন জিনকির বশ্যতা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এই অশান্ত সময়ে সুযোগ পেয়ে তারা জিনকি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। এমনকি তারা মসুলের কৃষিক্ষেত্র ও বাজারগুলোতে হামলা ও লুটপাট শুরু করে। ফলে নতুন করে মসুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি পূর্ণ বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে নিজে এ অঞ্চলে গমন করেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি যুদ্ধের পর মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তাদেরকে দমন করতে সক্ষম হন। তিনি বিদ্রোহীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত তাদের কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং নতুন করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। (৪১৩)
কদিন না যেতেই নতুন করে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে নতুন আরেক অঞ্চলে। এবার জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের স্থানীয় কিছু নেতা উপলব্ধি করে যে, ইরাকের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে। সুতরাং ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিপূর্বে তাদের অঞ্চলের যেসব এলাকা নিজের রাজ্যভুক্ত করে নিয়েছিলেন, সেগুলো পুনরুদ্ধার করার এটিই সুবর্ণ সুযোগ।
পূর্বেও আমরা বলেছি, এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, অঞ্চলটিতে রাজ্য ও শাসকের অভাব নেই! তবে অধিকাংশ শাসকই প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন। এ অঞ্চলের তুলনামূলক শক্তিশালী ও প্রধান নেতা ছিল তিনজন।
১. মারদিনের আমির হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি।
২. (প্রথমজনের চাচাতো ভাই) হাসানকেইফের আমির রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি।
এই তিনজনই চার বছর পূর্বে ৫২৪ হিজরি সনে দারা নগরীতে একজোট হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (৪১৪)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, নতুন করে তাদের এই ঐক্য প্রচেষ্টা বিশেষভাবে চলমান দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্যে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে। এমনিতেই ইরাক ও পারস্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, ওদিকে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বারবার বিদ্রোহপ্রচেষ্টা সংঘটিত হচ্ছে। আর আলেপ্পো ও তার আশেপাশের এলাকায় ক্রুসেডারদের আক্রমণের আশঙ্কা তো আছেই। সার্বিক বিবেচনায় এই নতুন সমস্যার মোকাবিলায় সহসা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত দমনের কোনো বিকল্প ছিল না। (৪১৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, তাদের সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে এ মুহূর্তে যুদ্ধে জড়ালে বড় ধরনের ক্ষতি পোহাতে হবে। তাই তিনি যথাসম্ভব কম ক্ষতি স্বীকার করে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ঐক্য প্রচেষ্টায় ফাটল ধরিয়ে কাউকে তার পক্ষে টানার জন্য কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিপক্ষ তিন নেতার ব্যক্তিত্ব, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা বিচার করে তিনি উপলব্ধি করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ অত্যন্ত কঠোর ও একগুঁয়ে প্রকৃতির মানুষ, সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি একদম দুর্বল এবং তার সামর্থ্যও সীমিত, আর হুসামুদ্দিন তামারতাশ বৃহৎ ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। অবশ্য ব্যক্তি হিসাবে তিনি নমনীয়। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৪১৬) আর তাই হুসামুদ্দিন তামারতাশের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তাকে অন্যান্য দুর্বল নেতার সঙ্গে মিত্রতা পরিহারে প্ররোচিত করার পরিকল্পনা একটি ফলপ্রসূ চিন্তা হতে পারে। এমন ভাবনা থেকেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নৈকট্য অর্জনে চেষ্টা শুরু করেন। তিনি হুসামুদ্দিনের রাজ্য অভিমুখে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে দেন এবং তার কাছে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি তাকে মুসলমানদের পারস্পরিক ঐক্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে ঐক্য গড়লে তার রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে বলে তাকে প্ররোচিত করতে থাকেন। দ্রুত তার কৌশল কাজ করতে থাকে; অল্পতেই হুসামুদ্দিন প্রভাবিত হন। হুসামুদ্দিন অনুভব করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ বা সাদুদ্দৌলা ইকলিদির চেয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে মিত্রতা বেশি ফলদায়ক হবে। তিনি ইমাদুদ্দিনের প্রস্তাবে সাড়া দেন। অল্প কদিন না যেতেই প্রকাশ্যে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধ সামরিক কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশ এ অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার শুরু করেন। এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রশাসক তাদেরকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও তারা দুজন প্রথম মোকাবিলাতেই বিজয় লাভ করেন। রুকনুদ্দৌলার নিয়ন্ত্রিত মারদিনের অদূরে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ সাওর দুর্গ তাদের অধিকারে চলে আসে। ইমাদুদ্দিন জিনকি পারস্পরিক মিত্রতা মজবুত করার লক্ষ্যে দুর্গটি তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশকে উপহার দেন। (৪১৭)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. তার প্রজ্ঞাপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে হুসামুদ্দিনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগান। এর মাধ্যমে নতুন কিছু ভূখণ্ডই কেবল তার রাজ্যভুক্ত হয়নি; বরং বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি ছাড়াই এ অঞ্চলের মজবুত নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে।
জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চল; বরং পুরো জিনকি রাজ্য ছেড়ে এবার চলুন দ্রুত ঘুরে আসা যাক আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে!
টিকাঃ
৪১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৫-২৭৬।
৪১৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।
৪১৫. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
৪১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৪১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৪ ও উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০১।
📄 চলমান ফিতনা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিচ্ছিন্নতা
উম্মাহর এই ঘনঘোর দুর্যোগকাল অনেকের শক্তি ও সম্ভাবনার পরিধি প্রকাশ করে দিচ্ছিল, উন্মোচিত করছিল ব্যক্তির স্বভাব ও অন্তর্নিহিত মনোভাব। প্রশ্ন হলো—এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সঠিক ও বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াই-বা কী হতে পারে?
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার পিতার মতোই সেলজুক সালতানাতের আনুগত্যে অভ্যস্ত ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সেলজুক সুলতানই বর্তমানের সর্বোচ্চ শক্তি এবং শাসনব্যবস্থার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। সেলজুক সুলতানই মুসলমানদের জাতীয় বিষয়সমূহ নিয়ে চিন্তা করেন, উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়নে ব্রতী হন। শুরু থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকি এমনটিই ভাবতেন। কিন্তু অতীতের সুলতান ও বর্তমানের সুলতানদের মাঝে তো কত পার্থক্য! যেন আকাশপাতাল ব্যবধান!
আলপ আরসালান, মালিকশাহ, বারকিয়ারুক বা সুলতান মুহাম্মাদের মতো দৃঢ়চেতা সুলতান কি একজনও আছেন বর্তমানে সংঘাতরত সুলতানদের কাতারে?! এমনকি বয়সে প্রবীণ না হলেও প্রয়াত সুলতান মাহমুদেরও একটি স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল; মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার স্পৃহা ছিল। অধিকন্তু প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের পরাভূত করার মতো পর্যাপ্ত শক্তিও তার ছিল। আর তাই তার শাসনামলে সাম্রাজ্যজুড়ে শান্তি বিরাজ করত; তিনি বহিঃরাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা-পরিকল্পনার সুযোগ পেতেন, বিশেষ করে ক্রুসেডারদের বিতাড়নের বিষয়ে ভাবতে পারতেন।
অপরদিকে বর্তমানের এই খর্ব শক্তির সুলতানগণ কীসের ভিত্তিতে ক্রমাগত লড়ছেন?!
একজনও কি দাবি করতে পারবেন, এ লড়াই আল্লাহর জন্য?!
বরং একজনও কি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবেন, এই বিবাদে তিনিই আছেন ন্যায়ের পক্ষে; অন্যরা নয়?!
তারা কেন, ঘটনার সমসাময়িক যারা, তারাও নিশ্চিতভাবে বলতে পারত না, চলমান বিরোধে অমুকই বৈধ দাবিদার আর বাকিরা অন্যায় দাবি করছে! এ কারণেই আমরা দেখেছি, এ সময় অনেক সেনাপতি, রাজন্য, সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণ কদিন পরপরই এক সুলতানকে রেখে আরেক সুলতানের আনুগত্য শুরু করেছে। এটি কিন্তু নীতি-আদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রের দুর্বলতা ছিল না; ছিল দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের দুর্বলতা।
তা ছাড়া সংঘাতরত সুলতানদের সকলেই ছিল দুর্বল; কিংবা তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বলা যায়, সকলেই ছিল প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। এ কারণেই একজন হয়তো কয়েক মাস বা কয়েকদিন সুলতান পদ ধরে রাখতে পারত, তারপরই অন্য একজন তাকে সরিয়ে তার জায়গা দখল করত! এক এলাকায় একজনের নাম সুলতান হিসেবে ঘোষিত হতো, একই সময়ে আরেক অঞ্চলে ঘোষিত হতো আরেকজনের নাম! খলিফা আজ এক সুলতানের পাশে দাঁড়াতেন, তো কাল আরেকজনের পাশে। আগামী পরশুই হয়তো তাকে দেখা যাবে তৃতীয়জনের পক্ষাবলম্বন করতে!
এ এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, যা অতি সহনশীল ব্যক্তিকেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ছাড়বে!
সুলতান মাহমুদের মৃত্যু-পরবর্তী তিন বছরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছেন সুলতান দাউদ, সুলতান মাসউদ, সুলতান তুগরল, সুলতান মাসউদ এবং এখন আবার সুলতান তুগরল। কারও জানা নেই, আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে সুলতান হিসেবে কাকে দেখতে পাবে?!
এটা কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো বিষয়?! কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য?!
এদিকে উচ্চাভিলাষী খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহও সংঘাতের স্বতন্ত্র একটি পক্ষে পরিণত হয়েছেন। সবাইকে আপন নির্দেশনা মানতে বাধ্য করার মতো বড় না হলেও তারও একটি মোটামুটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। কিন্তু তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে এখন পরিণত হয়েছেন চলমান সমীকরণে অন্যদের হাতে ব্যবহৃত এক প্রভাবক উপাদানে। সামনে কি এমন সময় আদৌ আসবে, যখন খলিফা কেবল নামে নয়, দায়িত্ব ও প্রভাবক্ষমতায়ও খলিফাতুল মুসলিমীনে পরিণত হবেন?!
এমন ক্রম পরিবর্তিত সময়ে এটি বড় জটিল প্রশ্নই বটে!
আমরা বরং আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে বিচরণ করি!
তিনি তাদের মধ্য হতে কার সঙ্গে যুক্ত হবেন? কাকে সাহায্য করবেন? তার দৃষ্টিতে চলমান সংঘাতে কোন পক্ষ মহান ও শ্রেষ্ঠ?
শুরুতে তিনি সুলতান মাসউদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। কারণ, সংঘাতে জড়ানো ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠতম। ইমাদুদ্দিন জিনকির মনে হয়েছিল, অন্যদের তুলনায় তার সালতানাত লাভের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা সকলেই দুর্বল; চারিত্রিক উৎকর্ষ ও স্বভাবগত নম্রতা থাকলেও সকলেই পার্থিব স্বার্থান্বেষী। এখন তিনি কী করবেন? সুলতান মাসউদকেই সঙ্গ দিয়ে যাবেন, অন্য কোনো সুলতানের পক্ষ নেবেন, নাকি খলিফার পাশে দাঁড়াবেন?!
হতভম্ব করে দেওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি!
বরং অতি জটিল পরিস্থিতি!
জটিলতা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ জানেন?!
জটিলতার কারণ কেবল এই নয় যে, পরস্পরবিরোধী অনেকজনের মধ্য হতে একজনকে বেছে নিতে হবে। জটিলতার কারণ আরও জটিল! সময় ততদিনে প্রমাণ করে দিয়েছে, ইমাদুদ্দিন জিনকি সবার চেয়ে শক্তিশালী!
তিনি সমকালীন সকল সুলতানের চেয়ে শক্তিশালী, প্রতাপশালী আব্বাসি খলিফার চেয়েও। কেবল বিশ্বাসশক্তি ও চরিত্রগুণের বিচারে নয়; সামরিক ও জাগতিক শক্তির বিবেচনায়ও তিনি তাদের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি তাদের চেয়ে যোগ্য ও শক্তিশালী চিন্তায়, মেধায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও। তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি ক্রুসেডার বিতাড়নকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র শাসক, যিনি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধকরণের কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, যিনি নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে আলিম ও ফকিহদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
জনপ্রিয়তায়ও তিনি সবার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের জনগণের হৃদয় তার প্রতি ধাবমান। তার প্রতিটি সংবাদ জানার জন্য সকলের হৃদয়জগৎ উন্মুখ, ভালোবাসায় টইটম্বুর। জনসাধারণের মাঝেও তার বিষয়ে দ্বিমত নেই। বিপরীতে এসব সুলতানের কারও সঙ্গে কি জনসাধারণের সামান্য সখ্য আছে? সালতানাতের মসনদে তুগরল আছেন, না মাসউদ; সেলজুকশাহ, না দাউদ বিন মাহমুদ, জনতার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন ঘটে?! বরং তারা চারজন বাদে পঞ্চম-ষষ্ঠ বা দশম কোনো ব্যক্তিও মসনদে আরোহণ করলে জনমনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা আলাদা গুরুত্ব রাখবে না।
এটিই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকিই কেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান ব্যক্তি হবেন না? যে দায়িত্ব সুলতান পালন করেন, সে দায়িত্ব কেন তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেবেন না? নিঃসন্দেহে বড় ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্ন!
কিন্তু এটিই বাস্তব প্রশ্ন!
হয়তো এ প্রশ্নের দুঃখজনক উত্তর হবে—তিনি তো সেলজুক পরিবারের সদস্য নন। তাহলে তিনি কীভাবে সেলজুক সুলতানের স্থলাভিষিক্ত হবেন?!
কিন্তু সুলতান হতে হলে কি সেলজুক পরিবারের সদস্য হওয়া জরুরি?! খলিফাকে আব্বাসি পরিবারেরই হতে হবে?! শাসনক্ষমতা কি বংশগত অধিকার?!
এগুলো নিশ্চয়ই দুঃসাহসী প্রশ্ন; কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর এমন অনেক ভুল প্রকাশ করে দেবে, মুসলিম উম্মাহ তার যাপিত জীবনে বারবার যার শিকার হয়েছে।
আমি বলছি না, পিতার পর তার পুত্র রাষ্ট্রশাসনভার গ্রহণ করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন; শর্ত হলো সন্তানকে হতে হবে মালিকশাহর মতো; যিনি পিতা আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এই উত্তরাধিকার শরিয়তের কোনো মূলনীতি লঙ্ঘন করেনি; প্রশাসনিক রীতিনীতি বিনষ্ট করেনি।
একজন মুসলিম প্রশাসকের মাঝে জ্ঞান, শক্তি, সদাচার, শরিয়তের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিপুণ কূটনীতির মতো অপরিহার্য কিছু গুণ বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। কোনো ভাই বা পুত্রের মাঝে এসব গুণ বিদ্যমান থাকলে প্রয়াত ভাই বা পিতার পর তার স্থলাভিষিক্ত হতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এসব গুণ না থাকা সত্ত্বেও কেবল পূর্ববর্তী শাসকের আত্মীয়তার 'যোগ্যতা'বলে মুসলমানদের শাসক বনে যাওয়া না ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ, না বিবেকের যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য।
সেলজুক সাম্রাজ্যকাল ছিল মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ কথা প্রযোজ্য সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তুগরল বেগ, এরপর আলপ আরসালান, মালিকশাহ ও অন্যান্য প্রতাপশালী সুলতানের শাসনামলের ক্ষেত্রে, যারা ইসলামের পতাকা সমুন্নত করেছিলেন। কিন্তু সেলজুকদের শক্তি ও প্রভাব যখন ঝিমিয়ে আসে, তখন ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখতে অন্য কারও এগিয়ে আসাই ছিল বাস্তবতার দাবি। সুনির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী বা পরিবারের স্বার্থে তো উম্মাহর অস্তিত্ব শেষ করার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে-ইমরান: ১৪০]
এ রাজত্ব তো অন্য এক পরিবারের হাত থেকেই সেলজুক পরিবারের হাতে এসেছিল। সুতরাং এমন একদিন আসবেই, যখন তাদের হাত থেকে কর্তৃত্ব চলে যাবে অন্য কারও হাতে।
স্পষ্টতই অনুমিত হচ্ছিল, তৎকালে সেই 'অন্য' হতে যাচ্ছেন ইমাদুদ্দিন জিনকি!
জিহাদের অঙ্গনে তার অবিচলতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, অবস্থান ও মর্যাদা সে যুগে তাকে এ পদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছিল। সালতানাতের পদ নিয়ে যারা সংঘাতে লিপ্ত ছিল, তাদের মধ্যে কে যোগ্যতা ও মর্যাদায় তার কাছে ভিড়তে পারে? অন্য সব বিষয় না হয় বাদ দিলাম, কেবল অভিজ্ঞতার কথাই বলি! তারা সকলেই তো ছিল বয়সে নবীন, অভিজ্ঞতায় কাঁচা। বয়সে তাদের জ্যেষ্ঠতম ছিলেন সুলতান মাসউদ; ৫২৮ হিজরি সনে তার বয়স সাতাশ পেরোয়নি। অথচ সে সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির বয়স ছিল একান্ন বছর! তিনি পদে পদে হাজারো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, ঘটনা-দুর্ঘটনার দুর্বিপাকে জ্বলে-পুড়ে সমৃদ্ধ হয়েছেন, সুনিপুণ দক্ষতায় কাছের-দূরের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার শক্তি ও দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার কথা সকলে জানে। তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব লাভ করেন, সকলে তাতে সুখী হবে, সকলে তার নির্দেশনা মেনে নেবে।
কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এখন কী করবেন?!
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার রাজ্য নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন?
নাকি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল একজনের পাশে দাঁড়াবেন এবং তাকে শক্তিশালী করবেন?
তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করলে হয়তো পুরো সেলজুক পরিবার একসঙ্গে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে! কারণ, তিনি তো সেলজুক পরিবারের কেউ নন। তখন তো রাষ্ট্র উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতিত হবে! জাতি আটকে যাবে সংঘাতের এক গোলকধাঁধায়!
আর তিনি যদি তার শক্তি নিয়ে দুর্বল এক পক্ষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে দুর্বল সেই ব্যক্তি হয়তো এমন পদে অধিষ্ঠিত হবে, সে যার যোগ্য নয়; এমন অবস্থানে পৌঁছে যাবে, যা তার যথোচিত নয়। এটা তো হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং উম্মাহর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
তা ছাড়া এই আত্মঘাতী গৃহবিবাদের স্রোতে ক্রুসেডার বিতাড়ন তৎপরতা পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে যাবে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি কী করবেন?!
মহৎপুরুষদের চিন্তাধারা তো অভাবনীয়ই হয়ে থাকে!
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চলমান বিরোধের নথিপত্র পুরোপুরি বন্ধ করে তিনি মনোযোগ দেবেন ক্রুসেডারদের দমনে। তিনি সচেষ্ট হবেন নির্যাতিত-নিপীড়িত, অধিকার ও মর্যাদাবঞ্চিত, আপন বসতভিটা থেকে বিতাড়িত মুসলমানদের ঠোঁটে হাসি ফিরিয়ে আনতে।
কিন্তু ফিতনার এমন ভীতিপ্রদ জটিল সময়ে এমন চিন্তা বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হতে পারে?!
ইমাদুদ্দিন জিনকি ভাবতে থাকেন। অনেক চিন্তার পর তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, কার্যত তিনি সালতানাত ও খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথ চলবেন। তবে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আশঙ্কায় তিনি বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন না।
তিনি এসব দুর্বল সুলতানদের সবাইকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনকি তাদের চলমান সংঘাত যদি শেষ হয়ে যায় এবং কোনো একজন পরিস্থিতির ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন, তখনও তার নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে না। পক্ষান্তরে তিনি তাদের পেছনে পড়ে থাকলে অচিরেই তারা তাকে তাদের পছন্দের 'দুনিয়া'য় নিয়ে যাবে এবং তাকে নিজেদের পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের মাধ্যম বানাবে। তাই তিনিই জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন গৌরব ও মর্যাদার পথে এবং তার আগে-পরে আপন রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথে।
তার কাঁধে এক কঠিন আমানত ও দায়িত্বভার। তিনি তাই দীর্ঘ বিরোধ ও ফলহীন সংঘাতে সময় অপচয় করতে চান না।
তিনি এখনই নিজেকে উম্মাহর অনুসরণীয় প্রধান নেতা ঘোষণা করবেন না; হয়তো জাহির করবেন না কখনোই। কিন্তু তিনি কাজ করে যাবেন মুসলিম বিশ্বের প্রধান নেতার মতো করে। একই সঙ্গে তিনি সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যথাসম্ভব কোমল আচরণ করবেন। তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচতে এবং নিজের মহান কর্মতৎপরতাকে তাদের বাধামুক্ত রাখতে এটিই হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতির দাবি।
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ তার নিয়োগপত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য যে রাজ্যসীমা নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন, তিনি সে অঞ্চলেই অর্থাৎ মসুল, জাযিরা ও শাম অঞ্চলে তার কর্মধারা সীমাবদ্ধ রাখবেন। সেলজুক ও আব্বাসিদের সংঘাতক্ষেত্র বাগদাদ, মধ্য ইরাক, পারস্য ও অন্যান্য অঞ্চলে তিনি মোটেও নজর দেবেন না। তা ছাড়া আল্লাহ তাওফিক দিলে মসুল, জাযিরা ও শামের সম্মিলিত শক্তিই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অনেক মূল্যবান দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে। আর ভবিষ্যতের কথা কে জানে?! হয়তো ইমাদুদ্দিন জিনকির এ চেষ্টা ও সাধনা অন্য কারও হাতে পূর্ণতা লাভ করবে; যিনি এ ঐক্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করে উম্মাহর সম্মান ও গৌরব আরও ব্যাপক ও সমৃদ্ধ করবেন। তুগরল বেগ ও আলপ আরসালানের রাজ্য তো মালিকশাহর রাজত্বের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। সব সময় তো এমনই হয়; ধীরে ধীরে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি!
শেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতেন। এর স্বপক্ষে ইতিপূর্বে আমরা বিভিন্ন প্রমাণ উল্লেখ করে এসেছি। আর যে আল্লাহর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার চেষ্টা ও সাধনা নিষ্ফল করেন না। হয়তো জীবদ্দশায় সে তার কাজের পরিণতি দেখে যেতে পারে না, কিন্তু আল্লাহ তার কর্মফল ও পুরস্কার পরকালের জন্য গচ্ছিত রেখে দেন। আর এটিই তো মুমিনের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, সর্বশেষ চাওয়া।
মহান বীরপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকির মনমস্তিষ্কে এসব চিন্তা ও পরিকল্পনাই বিচরণ করছিল। দীর্ঘ তিন বছরের ধারাবাহিক সংকটের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং আপন করণীয় নির্ণয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার পর তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ফিতনা তো চলছেই; আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কবে এর অবসান হবে।
আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার তার গৃহীত নতুন কূটনীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষের পাশে দাঁড়ানোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে নমনীয়তা ও সুসম্পর্কের নীতি।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেন খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে দিয়ে। সুলতান মাসউদের পক্ষে অগ্রসর হওয়ার পর থেকে বিগত দুই বছর ধরে খলিফার সঙ্গে তার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। তিনি এবার খলিফা বরাবর মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা প্রেরণ করেন। বরং খলিফার মর্যাদার স্বীকৃতি এবং খলিফার প্রতি আনুগত্য ও মিত্রতার নিদর্শনস্বরূপ তিনি তার বড় পুত্র সাইফুদ্দিন গাজিকে খলিফার খেদমতে প্রেরণ করেন। এতে খলিফার মন প্রশান্ত হয়ে যায়। তিনিও ইমাদুদ্দিন জিনকির উদ্দেশে হাদিয়া প্রেরণ করেন। (৪১৮)