📄 সেলজুক পরিবারে সংঘাতের আগুন
ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরি।
খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ যদিও ইরাকের পরবর্তী সুলতান হিসেবে সুলতান সানজারের নাম ঘোষণা করার মনস্থ করেছিলেন; কিন্তু সানজারের সসৈন্য রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান। তা ছাড়া সানজার সঙ্গে নিয়ে আসছেন সুলতান তুগরল বিন মুহাম্মাদকে। সানজার চলে গেলেও তুগরল তো পুরো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবেন।
এ সময়ই পারস্য ভূমিতে সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ ও তার চাচা সুলতান মাসউদের বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হয়। প্রত্যেক পক্ষ অপর পক্ষকে বাগদাদ পৌঁছতে বাধা দিলে শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত দু-পক্ষের সন্ধি হয়। কিন্তু দুজনই খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর কাছে দ্রুত বার্তা পাঠিয়ে সুলতান পদ লাভের দাবি জানান।
সুলতান দাউদ ও সুলতান মাসউদের মধ্যকার এই লড়াইয়ের সুযোগে ক্ষমতার আরেক দাবিদার সেলজুকশাহ সবার আগে বাগদাদে পৌঁছে যেতে সক্ষম হন এবং এরপর স্বভাবতই তিনি নিজের জন্য সুলতান পদ দাবি করেন! (৩৯১)
খলিফা যখন সেলজুকশাহকে অভ্যর্থনা জানিয়ে পারস্পরিক বৈঠকে মিলিত হন, তখনই বাগদাদের নিকটে পৌঁছে যায় দুটি বাহিনী! উত্তর-পূর্ব দিক থেকে পৌঁছায় সুলতান মাসউদের বাহিনী আর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে পৌঁছায় সুলতান মাসউদের মিত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনী।
খলিফা পড়ে যান কঠিন সংকটে। বিশেষত দুবাইস বিন সাদাকার ব্যাপারটি নিয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। আর তাই তিনি সেলজুকশাহর সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা করেন এবং উভয়ে বাগদাদের প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে আগত বাহিনীদুটির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, খলিফা নিজেও জানতেন না, তিনি কার স্বার্থে বাগদাদ রক্ষায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন! তিনি বাগদাদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন নিজের জন্য, সুলতান সেলজুকশাহর জন্য, নাকি সানজার বা সুলতান দাউদের জন্য?! নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি ছিল অতি ঘোলাটে। এদিকে যারা বাগদাদ আক্রমণ করতে এসেছে, তারাও পূর্ণ উদ্যম ও শক্তিব্যয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে না। কারণ, যত যা হোক, দিনশেষে তো এই বাগদাদ ইসলামি খিলাফতের রাজধানী ও প্রাণকেন্দ্র। তারা, তাদের ভাই-বন্ধু, পরিবার ও আপনজন তো সারাজীবন এই বাগদাদের নিরাপত্তা রক্ষায়ই সচেষ্ট থেকেছে।
আর তাই এসব যুদ্ধ ছিল একেবারেই প্রাণহীন। যোদ্ধাদের সুপ্রসিদ্ধ যুদ্ধদক্ষতার প্রদর্শনী এসব যুদ্ধে হয়নি।
সেলজুকশাহ তার বাহিনী নিয়ে সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বের হন আর খলিফা বের হন ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে!
প্রথম সংঘর্ষ হয় খলিফার নেতৃত্বাধীন বাগদাদের বাহিনী ও ইমাদুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মসুলের বাহিনীর মধ্যে। এটি সুস্পষ্ট যে, ইমাদুদ্দিন এ যুদ্ধে তার চিরাচরিত শক্তিমত্তা ও উদ্দীপনা প্রদর্শন করেননি। ফলে যা ঘটার, তা-ই ঘটে; তিনি খলিফার বাহিনীর কাছে পরাজিত হন! আমরা বলব, এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। কারণ, খলিফা লড়েছিলেন তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে; তার সঙ্গে ছিল বাগদাদের ত্রিশ হাজার সৈন্য। অপরদিকে ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন যুদ্ধে জড়াতেই দ্বিধা করছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল একটি প্রতীকী বাহিনী নিয়ে বাগদাদে পৌঁছে কেবল এ বিষয়টি ঘোষণা করা যে, মসুল ও শাম অঞ্চল সুলতান মাসউদের পাশে আছে।
কিন্তু তিনি প্রত্যাশা না করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে যুদ্ধে জড়াতে হয়। খলিফার কাছে এটি ছিল প্রাণপণ লড়াই। তাই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেন। তিনি হয়তো এ যুদ্ধের মাধ্যমে ইরাকে সেলজুক সালতানাতের চূড়ান্ত পতনের স্বপ্ন দেখছিলেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার বাহিনী পরাজিত হয়ে এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ইমাদুদ্দিন নিজে পালিয়ে উত্তর দিকে চলে যান এবং তিকরিতে গিয়ে পৌঁছেন। তিকরিতের অবস্থান ছিল বাগদাদ ও মসুলের মাঝামাঝি এলাকায়। এ সময় আব্বাসি বাহিনীর একটি অংশ তার পিছু নেয়। স্বভাবতই মারাত্মক কিছু ঘটার আশঙ্কা ছিল। কারণ, মাঝে দজলার প্রতিবন্ধকতা থাকায় তার পক্ষে মসুলে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিকরিত দুর্গপতি ইমাদুদ্দিনকে চিনতে পেরে দ্রুত তার নদী পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে আব্বাসি বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করেন। বরং এরপর তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সসম্মানে তার দুর্গে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দেন এবং বেশ কয়েকদিন তার সেবা-শুশ্রূষা করে তার হৃদয় প্রশান্ত করেন। তিকরিত দুর্গের অধিপতি অনুভব করছিলেন, এ ব্যক্তি মুসলমানদের স্বপ্নসম্বল এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝান্ডাবাহী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিকরিত তখন অন্য কারও নয়, স্বয়ং আব্বাসি খলিফার অধীনস্থ ছিল। অর্থাৎ তিকরিত দুর্গের অধিপতি নিজের পদ ও ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে রক্ষায় অগ্রসর হয়েছিলেন। (৩৬২)
দুর্গপতির পরিচয় এখনো বলা হয়নি! তিনি হলেন নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাজি। তার অন্যতম পরিচয়, তিনি পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসের মহানায়ক সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা। অবশ্য, আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখনও সালাহুদ্দিনের জন্ম হয়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও ইমাদুদ্দিন জিনকির মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। এর সূত্র ধরেই সালাহুদ্দিন পরবর্তীকালে ইমাদুদ্দিন জিনকির পুত্রদের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং 'সালাহুদ্দিন' হয়ে ওঠেন! স্বভাবতই এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির জ্যেষ্ঠ পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ।
দেখুন, রাব্বে কারিমের কী অপূর্ব ব্যবস্থাপনা! আলোচ্য ফিতনা ও দুর্যোগের যদি আর কোনো কল্যাণ না-ও থেকে থাকে, নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও ইমাদুদ্দিন জিনকির পারস্পরিক পরিচিতিই তো কল্যাণ হিসেবে যথেষ্ট! এই পরিচয় তো পরবর্তী ইতিহাসের গতিধারাই বদলে দিয়েছিল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন—
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
কখনো তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করো, অথচ তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ। [সূরা বাকারা: ২১৬]
ইমাদুদ্দিন জিনকির পরাজয়ের সংবাদ পৌঁছে যায় সুলতান মাসউদের কানে। তিনি তখন ভাই সেলজুকশাহর সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। তিনি বুঝতে পারেন, সামরিক পথে কোনো সমাধানে পৌঁছা সম্ভব নয়। এদিকে সুলতান সানজারের বাহিনীও বাগদাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। সবদিক বিবেচনা করে সুলতান মাসউদ ভাই সেলজুকশাহর সঙ্গে সন্ধি করেন এবং খলিফার কাছে উভয়ের সম্মিলিত একটি প্রস্তাব প্রেরণ করেন! তাদের সম্মিলিত প্রস্তাব ছিল— ইরাকের শাসনভার খলিফার হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। তিনি নিজের পছন্দমতো একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে তার মাধ্যমে ইরাক অঞ্চল শাসন করবেন। এর পাশাপাশি খলিফা সুলতান মাসউদকে বর্তমান সুলতান এবং তার ভাই সেলজুকশাহকে ওলিয়ে আহদ (৩৯৩) বা পরবর্তী সুলতান ঘোষণা করবেন। অর্থাৎ সুলতান মাসউদের মৃত্যুর পর তার কোনো সন্তান নয়; ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হবেন তার ভাই সেলজুকশাহ। (৩৯৪)
খলিফা চিন্তা করে দেখেন, সুলতান সানজারকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ প্রদানের চেয়ে এই সমাধানই শ্রেয়তর। তাই তিনি এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন। ইরাকে খুতবায় এবার সুলতান সানজারের পরিবর্তে সুলতান মাসউদের নাম উচ্চারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এদিকে সুলতান সানজার ধীরে ধীরে বাগদাদের আরও নিকটে চলে এসেছেন। বাধ্য হয়ে সুলতান মাসউদ ও সেলজুকশাহ তাদের চাচা সুলতান সানজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। অথচ তারা জানতেন, চাচার বাহিনীতে তাদের অপর ভাই সুলতান তুগরলও আছেন!
বড় বিস্ময়কর যুদ্ধ। উভয় পক্ষে বিপুল সংখ্যক সৈন্য। বিশেষ করে সুলতান সানজারের বাহিনীতে এক লক্ষ বা তারও বেশি সৈন্য ছিল। যুদ্ধে সুলতান সানজার সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করেন। যুদ্ধ শেষে সানজার তার ভ্রাতুষ্পুত্র সুলতান মাসউদকে ডেকে এনে কপালে চুমু খান, সম্মান দেখান এবং এমন অবাধ্যতার দরুণ তিরস্কার করেন। তিনি মাসউদকে সসম্মানে পারস্যের কানজায় ফেরত পাঠান। এরপর সানজার খলিফার সিদ্ধান্তের সামান্য তোয়াক্কা না করে তার আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলকে সুলতানের মসনদে অধিষ্ঠিত করেন। খলিফা নাখোশ হলেও তুগরলকে স্বীকৃতি দান করতে বাধ্য হন। এভাবে ৫২৬ হিজরি সনের ৮ রজব (১১৩২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) সুলতান সানজারের তত্ত্বাবধানে ইরাক ও পারস্যের নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সুলতান তুগরল। (৩৯৫)
টিকাঃ
৩৯১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২-২৬৩।
৩৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩।
৩৯৩. শাসনকর্তা কর্তৃক রাজপরিবারের কাউকে ভবিষ্যৎ শাসনকর্তা হিসেবে ঘোষণা করা হলে তাকে ওলিয়ে আহদ (ভবিষ্যৎ শাসক/যুবরাজ) বলা হয়। শাসনকর্তার মৃত্যু, মারাত্মক অসুস্থতা বা বরখাস্তের ঘটনা ঘটলে ঘোষিত ওলিয়ে আহদ তার স্থলাভিষিক্ত হন। রাজতন্ত্রে পরিচালিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানেও ওলিয়ে আহদ বা যুবরাজ ঘোষণার রীতি প্রচলিত আছে। [সম্পাদক]
৩৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৯৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩-২৬৫।
📄 ৫২৬ হিজরি সনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি
নতুন সুলতান তুগরল দায়িত্ব গ্রহণের পর কি পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছিল?!
একটুও না। ফিতনা ও গোলযোগ মোটেও থামেনি। সকলের অন্তর্জগৎ ছিল সমস্যাগ্রস্ত। প্রত্যেকের চিন্তাজগৎ ছিল নানাবিধ কল্পনা-পরিকল্পনায় ব্যস্ত। আসুন, আমরা এই সংঘাত আলোচনা থেকে একটু বিশ্রাম নিই! দেখি, এ বছরের শেষ দিকের পরিস্থিতি কেমন। কারণ, এই গোলযোগের সময়ই এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। দশটি পয়েন্টে আমরা সেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করছি।
১. তুগরলকে ইরাকের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে সুলতান সানজার দ্রুত তার রাজ্যে ফিরে যান। কারণ, তার শাসিত রাজ্য খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চল ছিল বাগদাদ থেকে বেশ দূরে, মধ্য এশিয়ায়। দীর্ঘকাল সুলতানের অনুপস্থিতি সেখানে হয়তো ক্ষমতালোভীদের প্ররোচিত করে তুলবে।
২. সুলতান তুগরল এখন সালতানাতের ক্ষমতা ভোগ করলেও চাচা সানজারের বাহিনী ছাড়া তার একক শক্তি খুবই দুর্বল। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি তার অবস্থানকে প্রভাবিত করছিল এবং অপর ভাইদের তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করছিল।
৩. সুলতান মাসউদ চাচা সানজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে গেলেও তার সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ, সুলতান সানজার তার ও তার বাহিনীর প্রতি অনুগ্রহ করে তাদেরকে পারস্যে ফিরে যেতে দিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই, ইরাকের সালতানাতের প্রতি সুলতান মাসউদের আগ্রহ ও অভিলাষ মোটেও হ্রাস পাবে না। তা ছাড়া তিনি সুলতান তুগরলের বড় ভাই, তাকে বাদ দিয়ে তুগরলকে ক্ষমতা প্রদানের কোনো যৌক্তিকতা তার দৃষ্টিতে নেই।
৪. প্রয়াত সুলতান মাহমুদের পুত্র দাউদ ছিলেন ঘোষিত সুলতান। তাকে সুলতান পদ থেকে অপসারণ করে তার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অবশ্যই তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করবেন। তিনি প্রয়াত সুলতানের পুত্র। তার পিতা তাকেই সুলতান ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাদা ও চাচারা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তিনি কি শান্ত হয়ে যাবেন, নাকি হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করবেন?!
৫. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ। তার প্রত্যাশার বিপরীতে সালতানাত এখন সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে। তিনি নিশ্চয়ই সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিষ্কৃতি লাভের সুযোগের প্রতিক্ষায় ওত পেতে থাকবেন।
৬. শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তাতে ইমাদুদ্দিন জিনকির আফসোস ও দুঃখই কেবল বেড়েছে। ক্রুসেডাররা এখন চরম বিশৃঙ্খল ও কঠিন সময়কাল পার করছে, সামনে হয়তো আরও কঠিন দুর্যোগের শিকার হবে। মুসলিম উম্মাহ যদি এই ফিতনা ও জটিলতার শিকার না হতো, তাহলে এটি ছিল ক্রুসেডারদের ওপর ব্যাপক পরিসরে হামলা চালানোর এক মোক্ষম সুযোগ। এদিকে মুসলমানদের চলমান ফিতনা অতি দ্রুত শেষ হওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই।
৭. যে মাসে সুলতান তুগরল সেলজুক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব লাভ করেন, সে মাসেই অর্থাৎ ৫২৬ হিজরি সনের ২১ রজব দামেশকের আমির বুরি বিন তুগতেকিন মৃত্যুবরণ করেন। (৩৯৬) তার অবর্তমানে দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র ইসমাইল বিন বুরি বিন তুগতেকিন। তিনি 'শামসুল মুলুক' উপাধি ধারণ করেন। ইসমাইল বিন বুরি ছিলেন দুরাচারী-অত্যাচারী একজন শাসক। জীবনে এত বড় বড় অন্যায় ও অনাচার তিনি ঘটান, যা তাকে সকলের বিরাগভাজনে পরিণত করে। তিনি তার রাজ্যের সকল কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গেই যুদ্ধ শুরু করেন। ফলে জনমনে তৈরি হয় ব্যাপক আতঙ্ক। বুরি বিন তুগতেকিনের ইন্তেকাল ও তার অত্যাচারী পুত্রের দায়িত্ব গ্রহণ দামেশকবাসীর জন্য বিরাট দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (৩৯৭)
৮. ক্ষমতা নিয়ে দামেশকের আমির শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি ও তার ভাই বালাবাক্কু অঞ্চলের আমির শামসুদ্দৌলা মুহাম্মাদ বিন বুরির মাঝে বিরোধ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বিরাট যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। উভয়ের বিরোধের পরিসমাপ্তি ঘটে দামেশকের উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দুর্গের অধিকার শামসুল মুলুক ইসমাইলের হাতে আসার মধ্য দিয়ে। অবশ্য তিনি ভাই শামসুদ্দৌলাকে বালাবাক্কুর আমির হিসেবে স্বীকৃতি দেন। (৩৯৮) দামেশকের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ঘটনা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য দামেশককে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ। কিন্তু ইরাকে যে আরও কঠিন ফিতনা তরঙ্গায়িত হয়ে তাকে কার্যত নিশ্চল করে দিয়েছে!
৯. এন্টিয়কের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। সদ্য গত হওয়া ২য় বল্ডউইনের কন্যা এলিস এন্টিয়কের মসনদ দখলের জন্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন। তিনি ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে বাইতুল মুকাদ্দাসের নতুন রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর অনভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রথম সারির তিনজন ক্রুসেডার নেতার মদদে এন্টিয়কের ক্ষমতা হাতানোর পাঁয়তারা করেন। এতে ক্রুসেড শিবিরে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপর্যয় কেবল এজন্য নয় যে, এলিস এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অঘোষিত প্রধান নেতা ফাল্কের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করছেন এবং তার মতো একজন অপরিণত-অযোগ্য নারীর হাতে এন্টিয়কের শাসনভার চলে যাচ্ছে। বরং এর চেয়েও বড় শঙ্কার কারণ ছিল, এলিসের সঙ্গে একজোট হওয়া সেই তিন নেতার পরিচিতি। এলিসের সঙ্গে এন্টিয়কের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যারা একমত হয়েছিল, তারা হলো-এডেসা রাজ্যের শাসক ২য় জোসেলিন, ত্রিপোলির শাসক পন্স এবং এন্টিয়ক রাজ্যের অধীনস্থ লাতাকিয়া অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ জিয়ন (Zion) দুর্গের প্রশাসক উইলিয়াম। অর্থাৎ এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলে ক্রুসেড শিবিরে বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি হবে। কারণ, এন্টিয়কের শাসনক্ষমতা প্রশ্নে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বিরুদ্ধে বাকি তিন রাজ্য একজোট হয়েছে।
ঘটনাক্রমে এন্টিয়কের কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা গোপন ষড়যন্ত্রের বিষয়টি জেনে ফেলে এবং দ্রুত পত্র পাঠিয়ে রাজা ফাল্ককে বিষয়টি অবহিত করে। রাজা ফাল্ক তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে বেপরোয়া এলিসের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন। (*.) কিন্তু ত্রিপোলির শাসক পন্স মাঝপথে লেবাননে তার পথ আগলে দাঁড়ান। সেখানে বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনী ও ত্রিপোলির বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। শাম ও ফিলিস্তিন ভূমিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এটি ছিল ক্রুসেড শিবিরের ইতিহাসে প্রথম পারস্পরিক যুদ্ধ। ঘোরতর লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। রাজা ফাল্ক রণাঙ্গন থেকে পিছু হটেন। অবশ্য তিনি বৈরুত নৌবন্দর হয়ে সমুদ্রপথে এন্টিয়কে পৌঁছতে সক্ষম হন। (400) তিনি এন্টিয়কে প্রবেশ করে এলিসের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেন। এদিকে এলিসের কর্তৃত্ব মজবুত করতে পন্সও দ্রুত এন্টিয়কে ছুটে আসেন। এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। (৪০১) শেষ পর্যন্ত ত্রিপোলির শাসক পন্স শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং এন্টিয়কের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রাজা ফাল্কের হাতে। (৪০২) তিনি তার পক্ষ থেকে রেনাড মাশোয়ের (Renaud Masoier) নামক জনৈক ব্যক্তিকে এন্টিয়কের শাসক নিযুক্ত করেন। (40.) নিঃসন্দেহে ক্রুসেডারদের এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে মুসলমানদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু মুসলমানরা তো ব্যস্ত নিজেদের দুর্যোগ নিরসনে!
১০. এটিই চলমান সময়ে ক্রুসেডারদের একমাত্র সমস্যা ছিল না। এ সময় তারা আরেকটি বিপর্যয়ের শিকার হয়, যা ছিল আগেরটির চেয়েও গুরুতর। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজা ফাল্ক ও জাফা নগরীর প্রশাসক ২য় হিউ (Hugh II of Jaffa)-এর মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সংঘাতের কারণ ছিল, রাজা ফাল্ক জেনে ফেলেন যে, তার স্ত্রী মেলিসেন্ড যুবক প্রশাসক ২য় হিউয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন! লড়াই শেষে রাজা ফাল্ক ২য় হিউকে বন্দি করতে সক্ষম হন এবং তাকে মারাত্মক আহত করে সিসিলিতে নির্বাসিত করেন। অল্প কদিন পরই হিউ সেখানে ইহধাম ত্যাগ করে। (408)
দাম্পত্য জীবনে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণিত হওয়ায় খ্রিষ্টধর্ম মতে যদিও রাজা ফাল্ক তার স্ত্রীকে পরিত্যাগের অধিকার লাভ করেন; কিন্তু তিনি জানতেন, মেলিসেন্ডকে পরিত্যাগ করার অর্থ তার ক্ষমতাই শেষ হয়ে যাওয়া! কারণ, তিনি তো প্রয়াত রাজা ২য় বল্ডউইনের মেয়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার লাভ করেছেন। আর তাই তিনি যদি স্ত্রী মেলিসেন্ডকে অভিযুক্ত করে দোষী প্রমাণ করেন, তাহলে শাসনভার চলে যাবে তার অন্য কোনো বোনের হাতে এবং সেই সূত্রে সেই বোনের স্বামীর হাতে। সবদিক বিবেচনা করে রাজা ফাল্ক সিদ্ধান্ত নেন, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন এবং স্ত্রীকে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলবেন। বরং পরবর্তী সময়ে যখন মেলিসেন্ড তার প্রেমিক পুরুষকে হত্যা করায় ফাল্কের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করেন, রাজা ফাল্ক নতজানু হয়ে বিভিন্ন উপায়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকেন। (405)
স্ত্রী মেলিসেন্ডকে তুষ্ট করার জন্য ফাল্ক যেসব অতিরঞ্জনমূলক আচরণ করেন, তার অন্যতম হলো তিনি মেলিসেন্ডের দাবি মেনে নিয়ে এন্টিয়কের শাসক পদ হতে রেনাড মাশোয়েরকে সরিয়ে মেলিসেন্ডের বোন এলিসকে এন্টিয়কের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন! (406) এর মাধ্যমে রাজা ফাল্ক কেবল যে তার মর্যাদা ও প্রতিপত্তি খুইয়ে ফেলেন তা-ই নয়; বরং ইতিপূর্বে তিনি যে এলিসের বিষয়ে প্রচণ্ড কঠোর ছিলেন, তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং এন্টিয়কের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেন। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে তিনি পুরুষোচিত আত্মমর্যাদা ও মানবিক বিবেচনাবোধই হারিয়ে ফেলেন।
সুতরাং ৫২৬ হিজরি সনের শেষ দিকে ক্রুসেড শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্য শুভবার্তা বয়ে আনছিল। এ সময় মুসলমানরা যদি ইরাকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত না থাকত, নিশ্চিত করেই পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারত। মুসলমানদের উপলব্ধি করা উচিত নিজেদের বিভেদ-বিসংবাদের কারণে যুগে যুগে তাদের কত বিরাট মূল্য চুকাতে হয়েছে!
টিকাঃ
৩৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৫ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৫।
৩৯৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮-২৭৯।
৩৯৮. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৬।
*. Guillaume de Tyr, p. 611.
400. Michaud: op.cit.,ll, p,85.
৪০১. Stevenson: op.cit.,ll, p.141.
৪০২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫১।
40. Guillaume de Tyr., p. 612-613.
408. Guillaume de Tyr., p. 627-633; Besant, Palmer: Jerusalem, pp. 291-292.
405. Runciman: op.cit.,ll, p.193.
406. Guillaume de Tyr.,p. 636.
📄 ফিতনার উত্তপ্ত সময়
আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সময় নিরুপায় হয়ে বাগদাদের উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহের নিকটেই মসুলে সসৈন্য নিশ্চল বসে ছিলেন। কারণ, বাগদাদে চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বিন্যাসে রদবদল ঘটার আশঙ্কা ছিল। এ সময় তিনি তার অধীনস্থ আলেপ্পোর প্রশাসক সিওয়ারের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কিছু খণ্ড যুদ্ধ পরিচালনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন। (৪০৭) পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, দামেশকের অন্যতম শক্তিশালী সেনাপতি সিওয়ার ৫২৪ হিজরি সনে দামেশক থেকে পলায়ন করলে ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আলেপ্পো ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়চেতা মুজাহিদ ছিলেন; ইমাদুদ্দিন জিনকির মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তার পদের যথোচিত মর্যাদা রক্ষা করে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে গেছেন।
আবারও ইরাকের জটিল পরিস্থিতিতে ফিরে আসছি!
স্বভাবতই পরিস্থিতি মোটেও শান্ত হয়নি। সুলতান সানজার ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে খোরাসান ফিরে গিয়েছিলেন। ফলে তুগরলের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা আবারও ক্ষমতা লাভের আশায় উদ্যোগী হয়ে ওঠে। সুলতান তুগরল বাগদাদের পরিবর্তে হামাদান নগরীকে তার আবাসভূমি নির্বাচন করেছিলেন। সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ ও তার আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলি এ সময় সুলতান তুগরলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং সৈন্যসমাবেশ ঘটান। ৫২৬ হিজরি সনের রমজান মাসে হামাদানের অদূরে দু-পক্ষের মাঝে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সুলতান দাউদ পরাজিত হন এবং পুনরায় পরিস্থিতি সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কিন্তু বিষয়টি এখানেই সমাপ্ত হয়নি। পরাজিত সুলতান দাউদ সেখান থেকে সোজা বাগদাদে চলে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খলিফা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন এবং বাগদাদের সুলতান-প্রাসাদ তার জন্য ছেড়ে দেন। অবশ্য খলিফা তাকে সুলতান উপাধি প্রদানে বিরত থাকেন। শত হোক, দাউদ তো এখন পরাজিত ও দুর্বল! (৪০৮)
যথারীতি এ সংবাদ পৌঁছে যায় সুলতান মাসউদের কাছে। তিনি মনে করতেন, ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে তিনিই সালতানাত লাভের অধিক হকদার। অন্তত বর্তমান সুলতান ও তার ছোট ভাই সুলতান তুগরলের চেয়ে তো তিনি অবশ্যই অগ্রাধিকার রাখেন। তাই তিনি দ্রুত বাগদাদে ছুটে যান এবং খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সুলতান দাউদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনজন এ বিষয়ে একমত হন যে, খলিফা সুলতান মাসউদকে সুলতান উপাধি প্রদান করবেন, আর দাউদ হবেন তার ওলিয়ে আহদ বা পরবর্তী 'সুলতান। এভাবে মূলত খলিফা ও সুলতান মাসউদের পূর্বের পুরোনো সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে; পাল্টে যাবে শুধু ওলিয়ে আহদের জায়গাটুকু। পূর্বের চুক্তিতে ওলিয়ে আহদ হওয়ার কথা ছিল সেলজুকশাহর, আর নতুন চুক্তিতে সেখানে সুলতান দাউদ বিন মাহমুদের নাম!
সুলতান মাসউদ ও সুলতান দাউদ তাদের সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং পারস্যের বিভিন্ন স্থানে সুলতান তুগরলের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এসব যুদ্ধে সুলতান মাসউদ জয়লাভ করেন এবং এর অনিবার্য দাবি অনুযায়ী তিনিই এবার ইরাক ও পারস্যের সুলতান উপাধি ধারণ করেন। এটি ৫২৭ হিজরি সনের শেষ দিকের ঘটনা। অর্থাৎ দুঃখজনক এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পূর্ণ এক বছর চলে যায়। (৪০৯)
এই অব্যাহত সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সময় দামেশকের অত্যাচারী শাসক ইসমাইল বিন বুরি ঘটনাপ্রবাহের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। সুযোগ বুঝে তিনি হঠাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হামা নগরীতে অভিযান চালান। কঠিন অবরোধ আরোপের পর একসময় তিনি নগরীটির পতন ঘটাতে সক্ষম হন। এটি ছিল নবগঠিত জিনকি রাজ্যের জন্য বড় ধরনের আঘাত। (৪১০) কারণ, হামা ছিল দামেশক অভিমুখে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। তা ছাড়া ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলিতে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও হামা হতে পারত অন্যতম ঘাঁটি। কিন্তু সেলজুক সুলতানদের অব্যাহত সংঘাতের কারণে নিরাপত্তার যে চরম অবনতি হয়েছিল, তাতে এমন দুঃখজনক ঘটনার অবতারণা একদম স্বাভাবিক ছিল।
তবে ইরাকে চলমান দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ক্রুসেডাররা যেন মুসলমানদের ভূখণ্ডে লোলুপ দৃষ্টি ফেলার সাহস না করে, এ উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ প্রশাসক ইমাদুদ্দিন জিনকি এতকিছুর পরও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাহিনী প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। অবশ্য এ সময়ের অধিকাংশ অভিযান পরিচালিত হয় আলেপ্পোর আমির সিওয়ারের নেতৃত্বে। এসব অভিযানের অন্যতম হলো, সিওয়ার ৫২৭ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে এডেসা রাজ্যের অন্তর্গত তিল-বাশির নগরীতে হামলা চালান এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। হাজারখানেক ক্রুসেডার সৈন্য এ সময় নিহত হয়। মুসলিম বাহিনী প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদও লাভ করে। সিওয়ার এর পাশাপাশি জাযিরা অঞ্চলের তুর্কমেন গোত্রগুলো থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে বেশ কয়েকটি বাহিনী গঠন করেন এবং বাহিনীগুলোকে ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক রাজ্যে হামলার কাজে ব্যবহার করে বিক্ষিপ্ত আরও কিছু বিজয় অর্জন করেন। এসব অভিযানেও ক্রুসেডারদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয় এবং প্রভূত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়। (৪১১) রাজ্যগুলোর পতন ঘটানো এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল না। কারণ, ক্রুসেড রাজ্যগুলোর পতন ঘটানোর মতো শক্তি এসব বাহিনীর ছিল না। অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল, ইরাকের ফিতনা নিরসন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির নতুন করে জিহাদি তৎপরতা শুরু করার আগ পর্যন্ত আলেপ্পো ও এর আশপাশের অঞ্চলকে ক্রুসেডারদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে কোনো দুর্গ বা নগরী পুনরুদ্ধার না হলেও এসব অভিযান ছিল অনেকটাই সফল।
আবারও ফিরে আসছি ইরাক ও পারস্যের ঘটনাপ্রবাহে।
আমরা এখন আছি ৫২৮ হিজরি সনে। ইরাকি সেলজুক সালতানাতের মসনদে এখন সুলতান মাসউদ। কিন্তু নিঃসন্দেহে অপসারিত সুলতান তুগরল এতে বিলকুল সন্তুষ্ট নন। অতীতে তিনি দূর থেকে তার চাচা সুলতান সানজারের সহযোগিতা পেয়ে আসছিলেন। এবার তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি সুলতান দাউদ বিন মাহমুদকেও সুলতান মাসউদের পক্ষ ত্যাগ করতে প্ররোচিত করতে থাকেন এবং তাতে সফলও হন। এমনকি তিনি খোদ সুলতান মাসউদের বাহিনীর কিছু অংশকেও নিজের দলে টানতে সক্ষম হন।
পারস্য ভূমিতে দুই ভাই সুলতান মাসউদ ও সুলতান তুগরলের বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধে সুলতান তুগরল সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং পুনরায় সালতানাতের মসনদ লাভ করতে সক্ষম হন। (৪১২)
মুসলিম জনসাধারণ এক অব্যাহত ফিতনা ও সংঘাতের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এবং মুসলিম বাহিনীগুলোর পারস্পরিক যুদ্ধ নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়। তদ্রূপ কয়েক মাস পরপর সুলতান পদে পালাবদলও যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। ইরাকের সুলতান পদ যেন অতি সাধারণ একটি পদ; জাতির পথচলায় যার কোনো দায়িত্ব ও ভূমিকা নেই!
টিকাঃ
৪০৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৮-২৬৯।
৪০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৬-২৬৭।
৪০৯. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৯-২৭০।
৪১০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১ ও Grousset: Hist, des Croisades, II. p. 55.
৪১১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭১-২৭২।
৪১২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৩-২৭৪।
📄 ইরাকের চলমান ফিতনার অনিবার্য ফল
এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগাতে অসুস্থ মনের অধিকারী প্রতিটি ব্যক্তি হামলে পড়বে এমনটাই স্বাভাবিক। চলমান ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার উপযুক্ত একটি একক শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। এখন তার চোখের সামনে সেই ঐক্য-কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম সুলতানগণ বিশুদ্ধ চেতনায় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করার পরিবর্তে নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং প্রত্যেকেই একদল সাধারণ মুসলমানকে নিজের পক্ষে টেনে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা। বিস্তৃত জিনকি রাজ্যের অভ্যন্তরেও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। জনসাধারণ অনুভব করছে, সুলতানদের এই সংঘাতে শেষ পরিণতি দেখার অপেক্ষা ছাড়া ইমাদুদ্দিন জিনকির এখন কিছু করার নেই। স্বয়ং ইমাদুদ্দিনও এই বিরোধে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। তাই তিনি তার বাহিনী নিয়ে মসুলেই অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রতীক্ষা করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি যে কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না!
এ সময় মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কুর্দি হাকারিয়া ও হামিদিয়া গোত্র অধ্যুষিত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, গোত্রদুটি ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিন জিনকির বশ্যতা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এই অশান্ত সময়ে সুযোগ পেয়ে তারা জিনকি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। এমনকি তারা মসুলের কৃষিক্ষেত্র ও বাজারগুলোতে হামলা ও লুটপাট শুরু করে। ফলে নতুন করে মসুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি পূর্ণ বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে নিজে এ অঞ্চলে গমন করেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি যুদ্ধের পর মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তাদেরকে দমন করতে সক্ষম হন। তিনি বিদ্রোহীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত তাদের কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং নতুন করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। (৪১৩)
কদিন না যেতেই নতুন করে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে নতুন আরেক অঞ্চলে। এবার জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চলের স্থানীয় কিছু নেতা উপলব্ধি করে যে, ইরাকের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অনেকটা স্থবির করে দিয়েছে। সুতরাং ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিপূর্বে তাদের অঞ্চলের যেসব এলাকা নিজের রাজ্যভুক্ত করে নিয়েছিলেন, সেগুলো পুনরুদ্ধার করার এটিই সুবর্ণ সুযোগ।
পূর্বেও আমরা বলেছি, এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, অঞ্চলটিতে রাজ্য ও শাসকের অভাব নেই! তবে অধিকাংশ শাসকই প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন। এ অঞ্চলের তুলনামূলক শক্তিশালী ও প্রধান নেতা ছিল তিনজন।
১. মারদিনের আমির হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি।
২. (প্রথমজনের চাচাতো ভাই) হাসানকেইফের আমির রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি।
এই তিনজনই চার বছর পূর্বে ৫২৪ হিজরি সনে দারা নগরীতে একজোট হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। (৪১৪)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, নতুন করে তাদের এই ঐক্য প্রচেষ্টা বিশেষভাবে চলমান দুর্যোগপূর্ণ সময়ে মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্যে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে। এমনিতেই ইরাক ও পারস্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, ওদিকে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বারবার বিদ্রোহপ্রচেষ্টা সংঘটিত হচ্ছে। আর আলেপ্পো ও তার আশেপাশের এলাকায় ক্রুসেডারদের আক্রমণের আশঙ্কা তো আছেই। সার্বিক বিবেচনায় এই নতুন সমস্যার মোকাবিলায় সহসা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত দমনের কোনো বিকল্প ছিল না। (৪১৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন, তাদের সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে এ মুহূর্তে যুদ্ধে জড়ালে বড় ধরনের ক্ষতি পোহাতে হবে। তাই তিনি যথাসম্ভব কম ক্ষতি স্বীকার করে সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ঐক্য প্রচেষ্টায় ফাটল ধরিয়ে কাউকে তার পক্ষে টানার জন্য কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিপক্ষ তিন নেতার ব্যক্তিত্ব, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা বিচার করে তিনি উপলব্ধি করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ অত্যন্ত কঠোর ও একগুঁয়ে প্রকৃতির মানুষ, সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি একদম দুর্বল এবং তার সামর্থ্যও সীমিত, আর হুসামুদ্দিন তামারতাশ বৃহৎ ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। অবশ্য ব্যক্তি হিসাবে তিনি নমনীয়। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ.-এর ভাষ্য অনুসারে হুসামুদ্দিন ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৪১৬) আর তাই হুসামুদ্দিন তামারতাশের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তাকে অন্যান্য দুর্বল নেতার সঙ্গে মিত্রতা পরিহারে প্ররোচিত করার পরিকল্পনা একটি ফলপ্রসূ চিন্তা হতে পারে। এমন ভাবনা থেকেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নৈকট্য অর্জনে চেষ্টা শুরু করেন। তিনি হুসামুদ্দিনের রাজ্য অভিমুখে সামরিক তৎপরতা বন্ধ করে দেন এবং তার কাছে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি তাকে মুসলমানদের পারস্পরিক ঐক্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে ঐক্য গড়লে তার রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে বলে তাকে প্ররোচিত করতে থাকেন। দ্রুত তার কৌশল কাজ করতে থাকে; অল্পতেই হুসামুদ্দিন প্রভাবিত হন। হুসামুদ্দিন অনুভব করেন, রুকনুদ্দৌলা দাউদ বা সাদুদ্দৌলা ইকলিদির চেয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে মিত্রতা বেশি ফলদায়ক হবে। তিনি ইমাদুদ্দিনের প্রস্তাবে সাড়া দেন। অল্প কদিন না যেতেই প্রকাশ্যে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধ সামরিক কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশ এ অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার শুরু করেন। এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রশাসক তাদেরকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও তারা দুজন প্রথম মোকাবিলাতেই বিজয় লাভ করেন। রুকনুদ্দৌলার নিয়ন্ত্রিত মারদিনের অদূরে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ সাওর দুর্গ তাদের অধিকারে চলে আসে। ইমাদুদ্দিন জিনকি পারস্পরিক মিত্রতা মজবুত করার লক্ষ্যে দুর্গটি তার নতুন মিত্র হুসামুদ্দিন তামারতাশকে উপহার দেন। (৪১৭)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. তার প্রজ্ঞাপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে হুসামুদ্দিনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগান। এর মাধ্যমে নতুন কিছু ভূখণ্ডই কেবল তার রাজ্যভুক্ত হয়নি; বরং বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি ছাড়াই এ অঞ্চলের মজবুত নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে।
জাযিরা ও দিয়ারে বকর অঞ্চল; বরং পুরো জিনকি রাজ্য ছেড়ে এবার চলুন দ্রুত ঘুরে আসা যাক আমাদের মহান বীর ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তাজগতে!
টিকাঃ
৪১৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৫-২৭৬।
৪১৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।
৪১৫. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
৪১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৪১৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৪ ও উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০১।