📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

📄 ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত


ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও কাগজে-কলমে ছিলেন একটি রাজ্যের প্রশাসক মাত্র; কিন্তু ততদিনে তিনি অন্যতম শক্তিশালী সামরিক নেতা ও প্রভাবশালী প্রশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি মসুল, আলেপ্পো, হাররান, হামা, নুসায়বিন ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বরং তার কর্তৃত্ব এন্টিয়ক রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। অধিকন্তু তিনি সেই মহান বীর, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয় অর্জন করেছেন। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়জগতের স্বপ্ন এখন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। হ্যাঁ, এ পর্যায়ে তিনি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা প্রদানের সক্ষমতা রাখতেন না এবং স্বাধীনতা ঘোষণা ও একটি নির্ভেজাল জিহাদি চেতনানির্ভর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাকে সার্বিক সহায়তা করার মতো বৃহৎ কোনো গোত্র ও পর্যাপ্ত সহযোগী-সমর্থক তার পাশে ছিল না। কিন্তু এ পর্যায়ের শক্তি তার ছিল যে, সালতানাতের ক্ষমতা নিয়ে বিবাদরত কোনো পক্ষই তাকে উপেক্ষা করতে পারত না। তদ্রূপ এ সময় হুট করে তাকে পদচ্যুত করাও কারও জন্য সহজ ছিল না। কারণ, এতে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার প্রয়োজনীয়তাও তখন সকলের সামনে দৃশ্যমান ছিল।
আর তাই এমনটিই প্রত্যাশিত ছিল যে, ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মাঠে থাকা এক বা একাধিক শক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে আর ইমাদুদ্দিন জিনকিও ভেবে-চিন্তে উত্তম ও অনুকূল সিদ্ধান্ত নেবেন। এমন কারও সঙ্গে তার সংঘাতে জড়ানো চলবে না, যে পরবর্তী সময়ে হয়তো সুলতান পদ লাভ করবে। সেক্ষেত্রে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়বে এবং অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদি তৎপরতাও স্থগিত হয়ে যাবে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে কী ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা?
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। কারণ, ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদাররা অনেকটা সমশক্তিসম্পন্ন ছিল এবং প্রত্যেকের সম্ভাবনা ছিল কাছাকাছি পর্যায়ের। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ধারণা অনুযায়ী প্রয়াত সুলতান মাহমুদের জীবিত ভাইদের মধ্যে সবার বড় মাসউদ বিন মুহাম্মাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল অন্যদের চেয়ে বেশি। (৩৮৫)
তিনি ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হওয়ায় তার পক্ষে জনসমাগমের সম্ভাবনা বেশি ছিল। তদ্রূপ প্রয়াত সুলতান মাহমুদের শিশু পুত্র দাউদের চেয়েও তিনি শ্রেয়তর বিকল্প। কারণ, দাউদের কোনো কিছু করার ক্ষমতাই নেই; তিনি সুলতান হলে অচিরেই আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলির হাতের পুতুলে পরিণত হবেন। সুলতান সানজারের চেয়েও সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা প্রবল ছিল। কারণ, সুলতান সানজার বয়সে প্রবীণ ও প্রভাবশালী হলেও প্রয়াত সুলতানের সাম্রাজ্য থেকে বেশ দূরে ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল অনেকটা সম্মানসূচক।
বাকি রইল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সম্ভাবনা! খলিফার সাধ ও সাধ্যের মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। চলমান দুর্যোগে দুর্বল সামরিক শক্তির অধিকারী খলিফার পাশে দাঁড়ানো হবে সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত।
এ সবকিছুর পাশাপাশি সুলতান মাসউদ ছিলেন জননন্দিত সদাচারী একজন ব্যক্তি। আর তাই সুলতান পদে জনগণের তাকে মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন, সুলতান মাসউদও তখন সালতানাতের দায়িত্ব প্রাপ্তিতে সহায়তা লাভের জন্য দৃশ্যপটে বিদ্যমান শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো মিত্র খুঁজে ফিরছিলেন। আর তার মাথায় প্রথমেই আসে প্রভাবশালী আমির ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম!
সুলতান মাসউদ ইমাদুদ্দিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ক্ষমতার মসনদে যেতে তার সামরিক সহায়তা কামনা করেন এবং বিনিময়ে তাকে সামরিক বিবেচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ নগরী ইরবিলের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি সুলতান মাসউদের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। (৩৮৬)
তৎকালে অনুসৃত রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন সুলতানের জন্য আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রাপ্তি জরুরি বিবেচিত হতো। খলিফার স্বীকৃতি লাভের পর সমগ্র ইসলামি বিশ্বে নতুন সুলতানের আনুগত্য-প্রভাব বিস্তৃত ও প্রসারিত হতো। কারণ, জনসাধারণ অন্তত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও খলিফার মতামতকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করত। জনসাধারণ যদিও খলিফার কেন্দ্রীয় দুর্বলতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানত; কিন্তু তারা মনে করত, খলিফার বিরুদ্ধাচরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এজন্য সুলতানরা সব সময় খলিফার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভে সচেষ্ট থাকত। যিনি মনে করতেন যে, খলিফা তাকে কিছুতেই স্বীকৃতি প্রদান করবেন না, তিনি খলিফাকে পুরোপুরি অপসারিত করে নতুন করে এমন কাউকে খলিফা পদে বসাতে সামান্য দ্বিধা করতেন না, যিনি তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করবেন!
আর তাই সুলতান পদপ্রত্যাশী সকলে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় ছিল। সাধারণত একজন সুলতানের মৃত্যুর পর সেলজুক পরিবার যার বিষয়ে একমত হতো, খলিফা নতুন সুলতান হিসেবে তাকেই স্বীকৃতি দিতেন। কিন্তু এবার তো পরিস্থিতি ভিন্ন; সেলজুক পরিবারেরই পাঁচ সদস্য নেমেছে ক্ষমতার লড়াইয়ে। প্রয়াত সুলতানের চাচা সানজার, তিন ভাই মাসউদ, তুগরল ও সেলজুকশাহ এবং পুত্র দাউদ। খলিফা তাদের মধ্য হতে কাকে বেছে নেবেন?!
যেহেতু খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ নিজেও ক্ষমতাপ্রত্যাশী ছিলেন, তাই তিনি তাদের মধ্য হতে এমন কাউকে নির্বাচন করতে চাচ্ছিলেন, প্রশাসনে যার ক্ষমতা ও প্রভাব হবে সবচেয়ে কম। তখন তিনি নিজেই প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে খলিফার পছন্দ ছিল সুলতান সানজার। কারণ, সানজারের অবস্থান ছিল ইরাক থেকে অনেক দূরে। সানজারকে সুলতান নির্বাচিত করা হলে অন্ততপক্ষে ইরাক অঞ্চলে খলিফার কর্তৃত্ব সৃষ্টি হবে, এমনকি ভাগ্য ভালো হলে হয়তো শাম অঞ্চলেও! (০৮৭)
এই ছিল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর পরিকল্পনা ও অভিলাষ!
খলিফা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সুলতান হিসেবে সানজারের নাম খুতবায় চালু করে দেন। পাশাপাশি তিনি সানজারের প্রতিটি পদক্ষেপকে নতুন সুলতানের পদক্ষেপ বিবেচনা করে সমর্থন জানাতে থাকেন। সুলতান সানজার এতে যারপরনাই মুগ্ধ ও আনন্দিত হন। (৩৮৮)
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর পূর্বে তার পুত্র দাউদকে পরবর্তী সুলতান নির্বাচিত করেছিলেন। দাউদের সঙ্গে ছিল সেলুজক বাহিনীর মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তি ইস্পাহানের বাহিনী। ইতিপূর্বে তারা স্বয়ং সুলতান মাহমুদের অধীনস্থ ছিল। সুলতান দাউদ বয়সে অপরিণত হলেও কিছুতেই তার ক্ষমতা অপহৃত হতে দিতে পারেন না। আর তাই তিনি তাকে নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য খলিফাকে বাধ্য করতে নিজ বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অভিমুখে রওনা হন।
একই সময় প্রয়াত সুলতানের দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহও আলাদা আলাদা বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের উদ্দেশ্যও একই— নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি লাভে খলিফাকে চাপ প্রয়োগ! বাগদাদের পথে এখন তিনটি বাহিনী। দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহর বাহিনী এবং তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদের বাহিনী।
একই সময় মসুল থেকে মাসউদের সমর্থনে সসৈন্য রওনা হন ইমাদুদ্দিন জিনকি।
সুলতান সানজার অনুভব করেন, পথের দূরত্বের কারণে তিনি পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তাই তিনি তার তৃতীয় ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন এবং বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে বাগদাদের পথে যাত্রা করেন।
খলিফা তো এমন কিছু একদমই প্রত্যাশা করেননি। তিনি কল্পনাই করেননি যে, সানজার নিজে তুগরলকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ চলে আসবেন আর খলিফা তাদের নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বেন; যেমন ইতিপূর্বে তিনি অন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। (৩৮৯)

টিকাঃ
৩৮৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৭।
০৮৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৬-৪৭।
৩৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২-২৬৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আত্মঘাতী সংঘাতের কার্যকারণ

📄 আত্মঘাতী সংঘাতের কার্যকারণ


সম্ভাব্য সংঘাতের পরিণতি আলোচনা করার আগে এই বিস্ময়কর পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনুসন্ধান করা জরুরি, কেন সহোদর ভাই ও একেবারে নিকটাত্মীয়দের নেতৃত্বে শক্তিশালী বাহিনীগুলো এভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
কেন এমনটি হলো? কেমন ছিল তাদের পারস্পরিক সংঘাতের প্রকৃতি? আমি এখানে কয়েকটি পর্যালোচনামূলক মন্তব্য করব, যা ঘটনার ভেতর থেকে সঠিক সমীক্ষা বের করে আনতে সহায়ক হবে, ইনশাআল্লাহ!
১. পার্থিব মোহ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ مَا يُخْرِجُ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ زَهْرَةِ الدُّنْيَا 'আমি তোমাদের জন্য যেসব ফিতনার আশঙ্কা করি, তার অন্যতম হলো পার্থিব শোভা ও চাকচিক্য, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেবেন' (৩৯০)
তাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল ক্ষমতামোহের বিরাট ফিতনা। সামান্য ত্যাজ্য সম্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা ভাইদের বিরোধ দেখতে পাই; সেখানে অনেকগুলো বৃহৎ রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কে ছাড়তে চাইবে?!
যিনি এ পদ লাভ করবেন, তার হাতে ইরাক, ইরান ও বিভক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রসহ পুরো শাম অঞ্চল, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব এসে যাবে। পরবর্তী সময়ে হয়তো রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়ে আরব উপদ্বীপ ও তুর্কিস্তানও তাতে যুক্ত হবে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল এক বিশাল আকর্ষণ। বিশেষত মানুষের হৃদয়ের সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ চাহিদা থাকে রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রতি—তা কি আর অস্বীকার করা যায়?
২. বিবাদরত ভাইয়েরা এক পিতার সন্তান হলেও প্রতিপালিত হয়েছিল পরস্পর বিচ্ছিন্ন পরিবেশে। একেকজন বড় হয়েছিল একেক রাজ্যে। কারও কারও ক্ষেত্রে মাতৃপরিচয় ছিল ভিন্ন; শিক্ষক-দীক্ষকও ছিল ভিন্ন। আর তাই ভাইদের মধ্যকার স্বভাবজাত যে হৃদ্যতা আমরা দেখে থাকি, তা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।
৩. নিরেট সামরিক ছত্রছায়ায় প্রতিপালন। বিশেষত সেলজুক সাম্রাজ্যের মতো সর্বোচ্চ স্তরের সামরিক শক্তিনির্ভর সাম্রাজ্যে রাজপরিবারের সন্তানগণ সামরিক পরিবেশেই প্রতিপালিত হতো। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি, সাধারণত সেলজুক পরিবারের সন্তানদের প্রতিপালন-দায়িত্ব কোনো সামরিক ব্যক্তিকেই প্রদান করা হতো। বরং কখনো সরাসরি সেনাপ্রধানই এই দায়িত্ব পালন করতেন। তুর্কি সেলজুকগণ তাদেরকে 'আতাবিক' বা রাজপুত্রের দীক্ষক নামে অভিহিত করত। যেমন ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন সুলতান মাহমুদের পুত্র আলপ আরসালানের আতাবিক, দামেশকের আমির তুগতেকিন ছিলেন দাক্কাক বিন তুতুশের পুত্রদের আতাবিক। এরূপ দৃষ্টান্ত আরও আছে। নিঃসন্দেহে এরূপ সামরিক প্রতিপালনের কারণে তাদের কাছে পারিবারিক সম্পর্কবোধ ও মানবিক সম্পর্কের অনুভূতি অন্যদের তুলনায় কম ছিল।
৪. যুগটাই ছিল ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার। খলিফা ছিলেন দুর্বল। এদিকে ক্ষমতার অভিলাষী প্রত্যেকেরই ক্ষমতা লাভের কোনো না কোনো যৌক্তিকতা আছে। হয়তো সেসব যৌক্তিকতা সন্তোষজনকও ছিল। প্রত্যেকে মনে করছিল, সে আপন ন্যায্য অধিকার লাভের জন্য লড়াই করছে; যাতে শিথিলতার সুযোগ নেই।
পরিস্থিতি যে সত্যিই অস্পষ্ট ও গোলযোগপূর্ণ ছিল, তার একটি প্রমাণ এটিও যে, মুসলিম উম্মাহর আস্থাভাজন শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশও এতে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। বরং ক্ষমতা নিয়ে বিবাদমান সুলতানরাও ছিল উন্নত চরিত্র ও উৎকৃষ্ট আচরণগুণের অধিকারী। সামগ্রিকভাবে তারা তাদের জনগণের কাছে প্রিয় ও নিকটভাজন ছিল।
৫. যোগাযোগ-দুর্বলতা অনেক নেতিবাচক ফলাফল ও জটিল সমীকরণের জন্ম দেয়। তাদের প্রত্যেকেই প্রথমে খলিফার কাছে পৌঁছতে মরিয়া ছিল। অথচ বাগদাদে পৌঁছতে যেমন দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, দীর্ঘ সময় প্রয়োজন ফিরতেও। এর সঙ্গে যোগ করুন তাদের প্রত্যেকের শাসিত অঞ্চলের বিস্তৃতির বিষয়টি, তাহলে অনুধাবন করা যাবে যে, বিষয়টি কত জটিল ছিল।
৬. নিঃসন্দেহে তাদের প্রত্যেকের চারপাশে যেসব অনুচর ছিল, তারা তাদের প্রত্যেককে আচরণে-উচ্চারণে এ কথাই বোঝাচ্ছিল যে, আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান এবং দায়িত্ব লাভের অধিক হকদার। কারণ, তাদের নেতা সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হতে পারলে লাভ তো তাদেরও। অর্থাৎ এটি কেবল সম্ভাব্য সুলতানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নয়; আরও অনেকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়!
এসব প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখলে এই বিস্ময়কর ফিতনা ও সংঘাত সৃষ্টির কারণ আমাদের সামনে কিছুটা হলেও সুস্পষ্ট হবে। অবশ্য এসব কারণে এই বিবাদ ও সংঘাতকে কিছুতেই বৈধতা প্রদান বা মার্জনীয় বিবেচনা করা যায় না। কারণ, এই ফিতনা ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিরাট দুর্যোগ, যা চলমান জিহাদি তৎপরতাকে পরবর্তী চারটি বছরের জন্য স্তিমিত করে দিয়েছিল। আমরা এসব কার্যকারণ মূলত উল্লেখ করেছি ঘটনাপ্রবাহের আদ্যোপান্ত সঠিকভাবে উপলব্ধির মানসে।

টিকাঃ
৩৯০. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৬৩ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সেলজুক পরিবারে সংঘাতের আগুন

📄 সেলজুক পরিবারে সংঘাতের আগুন


ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরি।
খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ যদিও ইরাকের পরবর্তী সুলতান হিসেবে সুলতান সানজারের নাম ঘোষণা করার মনস্থ করেছিলেন; কিন্তু সানজারের সসৈন্য রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়ে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান। তা ছাড়া সানজার সঙ্গে নিয়ে আসছেন সুলতান তুগরল বিন মুহাম্মাদকে। সানজার চলে গেলেও তুগরল তো পুরো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবেন।
এ সময়ই পারস্য ভূমিতে সুলতান দাউদ বিন মাহমুদ ও তার চাচা সুলতান মাসউদের বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি হয়। প্রত্যেক পক্ষ অপর পক্ষকে বাগদাদ পৌঁছতে বাধা দিলে শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত দু-পক্ষের সন্ধি হয়। কিন্তু দুজনই খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর কাছে দ্রুত বার্তা পাঠিয়ে সুলতান পদ লাভের দাবি জানান।
সুলতান দাউদ ও সুলতান মাসউদের মধ্যকার এই লড়াইয়ের সুযোগে ক্ষমতার আরেক দাবিদার সেলজুকশাহ সবার আগে বাগদাদে পৌঁছে যেতে সক্ষম হন এবং এরপর স্বভাবতই তিনি নিজের জন্য সুলতান পদ দাবি করেন! (৩৯১)
খলিফা যখন সেলজুকশাহকে অভ্যর্থনা জানিয়ে পারস্পরিক বৈঠকে মিলিত হন, তখনই বাগদাদের নিকটে পৌঁছে যায় দুটি বাহিনী! উত্তর-পূর্ব দিক থেকে পৌঁছায় সুলতান মাসউদের বাহিনী আর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে পৌঁছায় সুলতান মাসউদের মিত্র ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনী।
খলিফা পড়ে যান কঠিন সংকটে। বিশেষত দুবাইস বিন সাদাকার ব্যাপারটি নিয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। আর তাই তিনি সেলজুকশাহর সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা করেন এবং উভয়ে বাগদাদের প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে আগত বাহিনীদুটির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, খলিফা নিজেও জানতেন না, তিনি কার স্বার্থে বাগদাদ রক্ষায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন! তিনি বাগদাদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবেন নিজের জন্য, সুলতান সেলজুকশাহর জন্য, নাকি সানজার বা সুলতান দাউদের জন্য?! নিঃসন্দেহে পরিস্থিতি ছিল অতি ঘোলাটে। এদিকে যারা বাগদাদ আক্রমণ করতে এসেছে, তারাও পূর্ণ উদ্যম ও শক্তিব্যয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে না। কারণ, যত যা হোক, দিনশেষে তো এই বাগদাদ ইসলামি খিলাফতের রাজধানী ও প্রাণকেন্দ্র। তারা, তাদের ভাই-বন্ধু, পরিবার ও আপনজন তো সারাজীবন এই বাগদাদের নিরাপত্তা রক্ষায়ই সচেষ্ট থেকেছে।
আর তাই এসব যুদ্ধ ছিল একেবারেই প্রাণহীন। যোদ্ধাদের সুপ্রসিদ্ধ যুদ্ধদক্ষতার প্রদর্শনী এসব যুদ্ধে হয়নি।
সেলজুকশাহ তার বাহিনী নিয়ে সুলতান মাসউদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বের হন আর খলিফা বের হন ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে!
প্রথম সংঘর্ষ হয় খলিফার নেতৃত্বাধীন বাগদাদের বাহিনী ও ইমাদুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মসুলের বাহিনীর মধ্যে। এটি সুস্পষ্ট যে, ইমাদুদ্দিন এ যুদ্ধে তার চিরাচরিত শক্তিমত্তা ও উদ্দীপনা প্রদর্শন করেননি। ফলে যা ঘটার, তা-ই ঘটে; তিনি খলিফার বাহিনীর কাছে পরাজিত হন! আমরা বলব, এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। কারণ, খলিফা লড়েছিলেন তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে; তার সঙ্গে ছিল বাগদাদের ত্রিশ হাজার সৈন্য। অপরদিকে ইমাদুদ্দিন জিনকি এমন যুদ্ধে জড়াতেই দ্বিধা করছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল একটি প্রতীকী বাহিনী নিয়ে বাগদাদে পৌঁছে কেবল এ বিষয়টি ঘোষণা করা যে, মসুল ও শাম অঞ্চল সুলতান মাসউদের পাশে আছে।
কিন্তু তিনি প্রত্যাশা না করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে যুদ্ধে জড়াতে হয়। খলিফার কাছে এটি ছিল প্রাণপণ লড়াই। তাই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেন। তিনি হয়তো এ যুদ্ধের মাধ্যমে ইরাকে সেলজুক সালতানাতের চূড়ান্ত পতনের স্বপ্ন দেখছিলেন!
ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার বাহিনী পরাজিত হয়ে এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ইমাদুদ্দিন নিজে পালিয়ে উত্তর দিকে চলে যান এবং তিকরিতে গিয়ে পৌঁছেন। তিকরিতের অবস্থান ছিল বাগদাদ ও মসুলের মাঝামাঝি এলাকায়। এ সময় আব্বাসি বাহিনীর একটি অংশ তার পিছু নেয়। স্বভাবতই মারাত্মক কিছু ঘটার আশঙ্কা ছিল। কারণ, মাঝে দজলার প্রতিবন্ধকতা থাকায় তার পক্ষে মসুলে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিকরিত দুর্গপতি ইমাদুদ্দিনকে চিনতে পেরে দ্রুত তার নদী পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং তাকে আব্বাসি বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করেন। বরং এরপর তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে সসম্মানে তার দুর্গে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দেন এবং বেশ কয়েকদিন তার সেবা-শুশ্রূষা করে তার হৃদয় প্রশান্ত করেন। তিকরিত দুর্গের অধিপতি অনুভব করছিলেন, এ ব্যক্তি মুসলমানদের স্বপ্নসম্বল এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঝান্ডাবাহী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিকরিত তখন অন্য কারও নয়, স্বয়ং আব্বাসি খলিফার অধীনস্থ ছিল। অর্থাৎ তিকরিত দুর্গের অধিপতি নিজের পদ ও ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে রক্ষায় অগ্রসর হয়েছিলেন। (৩৬২)
দুর্গপতির পরিচয় এখনো বলা হয়নি! তিনি হলেন নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাজি। তার অন্যতম পরিচয়, তিনি পরবর্তী ইসলামি ইতিহাসের মহানায়ক সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা। অবশ্য, আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তখনও সালাহুদ্দিনের জন্ম হয়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও ইমাদুদ্দিন জিনকির মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। এর সূত্র ধরেই সালাহুদ্দিন পরবর্তীকালে ইমাদুদ্দিন জিনকির পুত্রদের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং 'সালাহুদ্দিন' হয়ে ওঠেন! স্বভাবতই এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির জ্যেষ্ঠ পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ।
দেখুন, রাব্বে কারিমের কী অপূর্ব ব্যবস্থাপনা! আলোচ্য ফিতনা ও দুর্যোগের যদি আর কোনো কল্যাণ না-ও থেকে থাকে, নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও ইমাদুদ্দিন জিনকির পারস্পরিক পরিচিতিই তো কল্যাণ হিসেবে যথেষ্ট! এই পরিচয় তো পরবর্তী ইতিহাসের গতিধারাই বদলে দিয়েছিল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন—
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
কখনো তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করো, অথচ তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ। [সূরা বাকারা: ২১৬]
ইমাদুদ্দিন জিনকির পরাজয়ের সংবাদ পৌঁছে যায় সুলতান মাসউদের কানে। তিনি তখন ভাই সেলজুকশাহর সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। তিনি বুঝতে পারেন, সামরিক পথে কোনো সমাধানে পৌঁছা সম্ভব নয়। এদিকে সুলতান সানজারের বাহিনীও বাগদাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। সবদিক বিবেচনা করে সুলতান মাসউদ ভাই সেলজুকশাহর সঙ্গে সন্ধি করেন এবং খলিফার কাছে উভয়ের সম্মিলিত একটি প্রস্তাব প্রেরণ করেন! তাদের সম্মিলিত প্রস্তাব ছিল— ইরাকের শাসনভার খলিফার হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। তিনি নিজের পছন্দমতো একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে তার মাধ্যমে ইরাক অঞ্চল শাসন করবেন। এর পাশাপাশি খলিফা সুলতান মাসউদকে বর্তমান সুলতান এবং তার ভাই সেলজুকশাহকে ওলিয়ে আহদ (৩৯৩) বা পরবর্তী সুলতান ঘোষণা করবেন। অর্থাৎ সুলতান মাসউদের মৃত্যুর পর তার কোনো সন্তান নয়; ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হবেন তার ভাই সেলজুকশাহ। (৩৯৪)
খলিফা চিন্তা করে দেখেন, সুলতান সানজারকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ প্রদানের চেয়ে এই সমাধানই শ্রেয়তর। তাই তিনি এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন। ইরাকে খুতবায় এবার সুলতান সানজারের পরিবর্তে সুলতান মাসউদের নাম উচ্চারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এদিকে সুলতান সানজার ধীরে ধীরে বাগদাদের আরও নিকটে চলে এসেছেন। বাধ্য হয়ে সুলতান মাসউদ ও সেলজুকশাহ তাদের চাচা সুলতান সানজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। অথচ তারা জানতেন, চাচার বাহিনীতে তাদের অপর ভাই সুলতান তুগরলও আছেন!
বড় বিস্ময়কর যুদ্ধ। উভয় পক্ষে বিপুল সংখ্যক সৈন্য। বিশেষ করে সুলতান সানজারের বাহিনীতে এক লক্ষ বা তারও বেশি সৈন্য ছিল। যুদ্ধে সুলতান সানজার সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করেন। যুদ্ধ শেষে সানজার তার ভ্রাতুষ্পুত্র সুলতান মাসউদকে ডেকে এনে কপালে চুমু খান, সম্মান দেখান এবং এমন অবাধ্যতার দরুণ তিরস্কার করেন। তিনি মাসউদকে সসম্মানে পারস্যের কানজায় ফেরত পাঠান। এরপর সানজার খলিফার সিদ্ধান্তের সামান্য তোয়াক্কা না করে তার আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলকে সুলতানের মসনদে অধিষ্ঠিত করেন। খলিফা নাখোশ হলেও তুগরলকে স্বীকৃতি দান করতে বাধ্য হন। এভাবে ৫২৬ হিজরি সনের ৮ রজব (১১৩২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) সুলতান সানজারের তত্ত্বাবধানে ইরাক ও পারস্যের নতুন সুলতান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সুলতান তুগরল। (৩৯৫)

টিকাঃ
৩৯১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২-২৬৩।
৩৬২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩।
৩৯৩. শাসনকর্তা কর্তৃক রাজপরিবারের কাউকে ভবিষ্যৎ শাসনকর্তা হিসেবে ঘোষণা করা হলে তাকে ওলিয়ে আহদ (ভবিষ্যৎ শাসক/যুবরাজ) বলা হয়। শাসনকর্তার মৃত্যু, মারাত্মক অসুস্থতা বা বরখাস্তের ঘটনা ঘটলে ঘোষিত ওলিয়ে আহদ তার স্থলাভিষিক্ত হন। রাজতন্ত্রে পরিচালিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানেও ওলিয়ে আহদ বা যুবরাজ ঘোষণার রীতি প্রচলিত আছে। [সম্পাদক]
৩৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৯৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩-২৬৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ৫২৬ হিজরি সনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি

📄 ৫২৬ হিজরি সনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি


নতুন সুলতান তুগরল দায়িত্ব গ্রহণের পর কি পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছিল?!
একটুও না। ফিতনা ও গোলযোগ মোটেও থামেনি। সকলের অন্তর্জগৎ ছিল সমস্যাগ্রস্ত। প্রত্যেকের চিন্তাজগৎ ছিল নানাবিধ কল্পনা-পরিকল্পনায় ব্যস্ত। আসুন, আমরা এই সংঘাত আলোচনা থেকে একটু বিশ্রাম নিই! দেখি, এ বছরের শেষ দিকের পরিস্থিতি কেমন। কারণ, এই গোলযোগের সময়ই এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। দশটি পয়েন্টে আমরা সেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করছি।
১. তুগরলকে ইরাকের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করে সুলতান সানজার দ্রুত তার রাজ্যে ফিরে যান। কারণ, তার শাসিত রাজ্য খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চল ছিল বাগদাদ থেকে বেশ দূরে, মধ্য এশিয়ায়। দীর্ঘকাল সুলতানের অনুপস্থিতি সেখানে হয়তো ক্ষমতালোভীদের প্ররোচিত করে তুলবে।
২. সুলতান তুগরল এখন সালতানাতের ক্ষমতা ভোগ করলেও চাচা সানজারের বাহিনী ছাড়া তার একক শক্তি খুবই দুর্বল। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি তার অবস্থানকে প্রভাবিত করছিল এবং অপর ভাইদের তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করছিল।
৩. সুলতান মাসউদ চাচা সানজারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে গেলেও তার সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ, সুলতান সানজার তার ও তার বাহিনীর প্রতি অনুগ্রহ করে তাদেরকে পারস্যে ফিরে যেতে দিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই, ইরাকের সালতানাতের প্রতি সুলতান মাসউদের আগ্রহ ও অভিলাষ মোটেও হ্রাস পাবে না। তা ছাড়া তিনি সুলতান তুগরলের বড় ভাই, তাকে বাদ দিয়ে তুগরলকে ক্ষমতা প্রদানের কোনো যৌক্তিকতা তার দৃষ্টিতে নেই।
৪. প্রয়াত সুলতান মাহমুদের পুত্র দাউদ ছিলেন ঘোষিত সুলতান। তাকে সুলতান পদ থেকে অপসারণ করে তার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অবশ্যই তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করবেন। তিনি প্রয়াত সুলতানের পুত্র। তার পিতা তাকেই সুলতান ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাদা ও চাচারা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তিনি কি শান্ত হয়ে যাবেন, নাকি হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করবেন?!
৫. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ। তার প্রত্যাশার বিপরীতে সালতানাত এখন সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণে। তিনি নিশ্চয়ই সুলতান তুগরলের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিষ্কৃতি লাভের সুযোগের প্রতিক্ষায় ওত পেতে থাকবেন।
৬. শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তাতে ইমাদুদ্দিন জিনকির আফসোস ও দুঃখই কেবল বেড়েছে। ক্রুসেডাররা এখন চরম বিশৃঙ্খল ও কঠিন সময়কাল পার করছে, সামনে হয়তো আরও কঠিন দুর্যোগের শিকার হবে। মুসলিম উম্মাহ যদি এই ফিতনা ও জটিলতার শিকার না হতো, তাহলে এটি ছিল ক্রুসেডারদের ওপর ব্যাপক পরিসরে হামলা চালানোর এক মোক্ষম সুযোগ। এদিকে মুসলমানদের চলমান ফিতনা অতি দ্রুত শেষ হওয়ারও কোনো লক্ষণ নেই।
৭. যে মাসে সুলতান তুগরল সেলজুক সাম্রাজ্যের দায়িত্ব লাভ করেন, সে মাসেই অর্থাৎ ৫২৬ হিজরি সনের ২১ রজব দামেশকের আমির বুরি বিন তুগতেকিন মৃত্যুবরণ করেন। (৩৯৬) তার অবর্তমানে দামেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র ইসমাইল বিন বুরি বিন তুগতেকিন। তিনি 'শামসুল মুলুক' উপাধি ধারণ করেন। ইসমাইল বিন বুরি ছিলেন দুরাচারী-অত্যাচারী একজন শাসক। জীবনে এত বড় বড় অন্যায় ও অনাচার তিনি ঘটান, যা তাকে সকলের বিরাগভাজনে পরিণত করে। তিনি তার রাজ্যের সকল কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গেই যুদ্ধ শুরু করেন। ফলে জনমনে তৈরি হয় ব্যাপক আতঙ্ক। বুরি বিন তুগতেকিনের ইন্তেকাল ও তার অত্যাচারী পুত্রের দায়িত্ব গ্রহণ দামেশকবাসীর জন্য বিরাট দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (৩৯৭)
৮. ক্ষমতা নিয়ে দামেশকের আমির শামসুল মুলুক ইসমাইল বিন বুরি ও তার ভাই বালাবাক্কু অঞ্চলের আমির শামসুদ্দৌলা মুহাম্মাদ বিন বুরির মাঝে বিরোধ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বিরাট যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। উভয়ের বিরোধের পরিসমাপ্তি ঘটে দামেশকের উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দুর্গের অধিকার শামসুল মুলুক ইসমাইলের হাতে আসার মধ্য দিয়ে। অবশ্য তিনি ভাই শামসুদ্দৌলাকে বালাবাক্কুর আমির হিসেবে স্বীকৃতি দেন। (৩৯৮) দামেশকের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ঘটনা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য দামেশককে নিজের রাজ্যভুক্ত করে নেওয়ার এক চমৎকার সুযোগ। কিন্তু ইরাকে যে আরও কঠিন ফিতনা তরঙ্গায়িত হয়ে তাকে কার্যত নিশ্চল করে দিয়েছে!
৯. এন্টিয়কের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। সদ্য গত হওয়া ২য় বল্ডউইনের কন্যা এলিস এন্টিয়কের মসনদ দখলের জন্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন। তিনি ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে বাইতুল মুকাদ্দাসের নতুন রাজা ফাল্ক অ্যাঞ্জোর অনভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রথম সারির তিনজন ক্রুসেডার নেতার মদদে এন্টিয়কের ক্ষমতা হাতানোর পাঁয়তারা করেন। এতে ক্রুসেড শিবিরে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপর্যয় কেবল এজন্য নয় যে, এলিস এ অঞ্চলে ক্রুসেডারদের অঘোষিত প্রধান নেতা ফাল্কের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করছেন এবং তার মতো একজন অপরিণত-অযোগ্য নারীর হাতে এন্টিয়কের শাসনভার চলে যাচ্ছে। বরং এর চেয়েও বড় শঙ্কার কারণ ছিল, এলিসের সঙ্গে একজোট হওয়া সেই তিন নেতার পরিচিতি। এলিসের সঙ্গে এন্টিয়কের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিষয়ে যারা একমত হয়েছিল, তারা হলো-এডেসা রাজ্যের শাসক ২য় জোসেলিন, ত্রিপোলির শাসক পন্স এবং এন্টিয়ক রাজ্যের অধীনস্থ লাতাকিয়া অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ জিয়ন (Zion) দুর্গের প্রশাসক উইলিয়াম। অর্থাৎ এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলে ক্রুসেড শিবিরে বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি হবে। কারণ, এন্টিয়কের শাসনক্ষমতা প্রশ্নে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রুসেড রাজ্য বাইতুল মুকাদ্দাসের বিরুদ্ধে বাকি তিন রাজ্য একজোট হয়েছে।
ঘটনাক্রমে এন্টিয়কের কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা গোপন ষড়যন্ত্রের বিষয়টি জেনে ফেলে এবং দ্রুত পত্র পাঠিয়ে রাজা ফাল্ককে বিষয়টি অবহিত করে। রাজা ফাল্ক তৎক্ষণাৎ তার বাহিনী নিয়ে বেপরোয়া এলিসের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন। (*.) কিন্তু ত্রিপোলির শাসক পন্স মাঝপথে লেবাননে তার পথ আগলে দাঁড়ান। সেখানে বাইতুল মুকাদ্দাসের বাহিনী ও ত্রিপোলির বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। শাম ও ফিলিস্তিন ভূমিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এটি ছিল ক্রুসেড শিবিরের ইতিহাসে প্রথম পারস্পরিক যুদ্ধ। ঘোরতর লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। রাজা ফাল্ক রণাঙ্গন থেকে পিছু হটেন। অবশ্য তিনি বৈরুত নৌবন্দর হয়ে সমুদ্রপথে এন্টিয়কে পৌঁছতে সক্ষম হন। (400) তিনি এন্টিয়কে প্রবেশ করে এলিসের ষড়যন্ত্র বানচাল করে দেন। এদিকে এলিসের কর্তৃত্ব মজবুত করতে পন্সও দ্রুত এন্টিয়কে ছুটে আসেন। এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। (৪০১) শেষ পর্যন্ত ত্রিপোলির শাসক পন্স শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং এন্টিয়কের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রাজা ফাল্কের হাতে। (৪০২) তিনি তার পক্ষ থেকে রেনাড মাশোয়ের (Renaud Masoier) নামক জনৈক ব্যক্তিকে এন্টিয়কের শাসক নিযুক্ত করেন। (40.) নিঃসন্দেহে ক্রুসেডারদের এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে মুসলমানদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু মুসলমানরা তো ব্যস্ত নিজেদের দুর্যোগ নিরসনে!
১০. এটিই চলমান সময়ে ক্রুসেডারদের একমাত্র সমস্যা ছিল না। এ সময় তারা আরেকটি বিপর্যয়ের শিকার হয়, যা ছিল আগেরটির চেয়েও গুরুতর। বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অভ্যন্তরে রাজা ফাল্ক ও জাফা নগরীর প্রশাসক ২য় হিউ (Hugh II of Jaffa)-এর মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সংঘাতের কারণ ছিল, রাজা ফাল্ক জেনে ফেলেন যে, তার স্ত্রী মেলিসেন্ড যুবক প্রশাসক ২য় হিউয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন! লড়াই শেষে রাজা ফাল্ক ২য় হিউকে বন্দি করতে সক্ষম হন এবং তাকে মারাত্মক আহত করে সিসিলিতে নির্বাসিত করেন। অল্প কদিন পরই হিউ সেখানে ইহধাম ত্যাগ করে। (408)
দাম্পত্য জীবনে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণিত হওয়ায় খ্রিষ্টধর্ম মতে যদিও রাজা ফাল্ক তার স্ত্রীকে পরিত্যাগের অধিকার লাভ করেন; কিন্তু তিনি জানতেন, মেলিসেন্ডকে পরিত্যাগ করার অর্থ তার ক্ষমতাই শেষ হয়ে যাওয়া! কারণ, তিনি তো প্রয়াত রাজা ২য় বল্ডউইনের মেয়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার লাভ করেছেন। আর তাই তিনি যদি স্ত্রী মেলিসেন্ডকে অভিযুক্ত করে দোষী প্রমাণ করেন, তাহলে শাসনভার চলে যাবে তার অন্য কোনো বোনের হাতে এবং সেই সূত্রে সেই বোনের স্বামীর হাতে। সবদিক বিবেচনা করে রাজা ফাল্ক সিদ্ধান্ত নেন, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন এবং স্ত্রীকে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলবেন। বরং পরবর্তী সময়ে যখন মেলিসেন্ড তার প্রেমিক পুরুষকে হত্যা করায় ফাল্কের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করেন, রাজা ফাল্ক নতজানু হয়ে বিভিন্ন উপায়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকেন। (405)
স্ত্রী মেলিসেন্ডকে তুষ্ট করার জন্য ফাল্ক যেসব অতিরঞ্জনমূলক আচরণ করেন, তার অন্যতম হলো তিনি মেলিসেন্ডের দাবি মেনে নিয়ে এন্টিয়কের শাসক পদ হতে রেনাড মাশোয়েরকে সরিয়ে মেলিসেন্ডের বোন এলিসকে এন্টিয়কের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন! (406) এর মাধ্যমে রাজা ফাল্ক কেবল যে তার মর্যাদা ও প্রতিপত্তি খুইয়ে ফেলেন তা-ই নয়; বরং ইতিপূর্বে তিনি যে এলিসের বিষয়ে প্রচণ্ড কঠোর ছিলেন, তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং এন্টিয়কের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেন। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে তিনি পুরুষোচিত আত্মমর্যাদা ও মানবিক বিবেচনাবোধই হারিয়ে ফেলেন।
সুতরাং ৫২৬ হিজরি সনের শেষ দিকে ক্রুসেড শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-পরিস্থিতি মুসলমানদের জন্য শুভবার্তা বয়ে আনছিল। এ সময় মুসলমানরা যদি ইরাকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত না থাকত, নিশ্চিত করেই পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারত। মুসলমানদের উপলব্ধি করা উচিত নিজেদের বিভেদ-বিসংবাদের কারণে যুগে যুগে তাদের কত বিরাট মূল্য চুকাতে হয়েছে!

টিকাঃ
৩৯৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৫ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৬৫।
৩৯৭, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮-২৭৯।
৩৯৮. প্রাগুক্ত, ৯/২৬৬।
*. Guillaume de Tyr, p. 611.
400. Michaud: op.cit.,ll, p,85.
৪০১. Stevenson: op.cit.,ll, p.141.
৪০২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫১।
40. Guillaume de Tyr., p. 612-613.
408. Guillaume de Tyr., p. 627-633; Besant, Palmer: Jerusalem, pp. 291-292.
405. Runciman: op.cit.,ll, p.193.
406. Guillaume de Tyr.,p. 636.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00