📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্ব

📄 দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্ব


প্রায় একই সময় ঘটে আরেক কাণ্ড, যার প্রভাবে চলমান পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। শিয়া বনু মাজিদ গোত্রের নেতা ও সেলজুক পরিবারের প্রবীণ পুরুষ সুলতান সানজারের মিত্র দুবাইস বিন সাদাকা এ সময় দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে বন্দি হয়। কোনো যুদ্ধে বা সংঘাতে নয়; ঘটনাক্রমে দুবাইস পথ হারিয়ে হাসসান বিন কুলসুম আল-কালবির হাতে পড়ে যায়। হাসসান তাকে চিনতে পেরে এবং তার মূল্য উপলব্ধি করে তাকে বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে তুলে দেন এবং এর মাধ্যমে দামেশক অধিপতির নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হন।
দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্বের সংবাদ জানতে পেরে ইমাদুদ্দিন জিনকি এ বিষয়ে উদ্যোগী হন এবং বুরি বিন তুগতেকিনের কাছে দূত প্রেরণ করে সমঝোতা আলোচনা করেন। শেষে উভয়ের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের চুক্তি হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ইমাদুদ্দিন জিনকি দামেশক অধিপতির পুত্র সোনজকে মুক্তিদানের বিনিময়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে গ্রহণ করবেন। (০৭৬)
চুক্তি অনুযায়ী বন্দিবিনিময় কার্যকর হয়। স্বয়ং দুবাইস বিন সাদাকাসহ সকলের ধারণা ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি দুবাইসকে হাতে পেয়ে প্রচণ্ড শান্তি দেবেন। কারণ, দুবাইস ছিল প্রচণ্ড দুরাচারী ও ফিতনার প্ররোচক। তা ছাড়া ইতিপূর্বে সে আলেপ্পো ও মসুলের প্রশাসক পদে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু ইমাদুদ্দিন তার সুবিখ্যাত কূটনৈতিক প্রজ্ঞা খাটিয়ে সকলের প্রত্যাশার বিপরীত এক কাজ করেন। (৩৭৭)
তিনি দুবাইসকে একজন নেতা ও শাসকের মতো অভ্যর্থনা জানান, তাকে একজন মহান রাজার মতো নৈকট্য ও মর্যাদা প্রদান করেন। তার এ আচরণ সকলকে বিস্মিত ও হতবাক করে দেয়। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এই সক্রিয় চরিত্রটিকে নিজের পক্ষে টেনে তার দ্বারা উপকৃত হতে এবং আপন রাজ্যের বৃহৎ স্বার্থে তাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছিলেন। (৩৭৮)
দুবাইস বিন সাদাকা ছিল সে সময়ের সমাজে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র। যদিও এ কথা অনস্বীকার্য যে, তার প্রভাব ছিল পুরোপুরি নেতিবাচক; কিন্তু সে এমন বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে পরিচালিত করতে পারত, যারা বিশেষ করে ওয়াসিত ও হিল্লা অঞ্চলসহ মধ্য ইরাকের বিরাট এলাকাজুড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন একজন ব্যক্তি ইতিপূর্বে কীভাবে বাগদাদে শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল? এমন পরিকল্পনা করার মতো দক্ষতা, ক্ষমতা, প্রভাব ও জনশক্তি ছিল বলেই সে এই পরিকল্পনা করতে পেরেছিল। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি কেন এই পরিস্থিতিতে তার মিত্রতা কিনে নেবেন না?! এর মাধ্যমে তো তিনি তার 'উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডারদের বিতাড়ন'-এর বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুবাইসকে তার পাশে পাবেন কিংবা নিদেনপক্ষে তার নিরপেক্ষতা ও নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হবেন।
দুবাইসের গোত্র বনু মাজিদ কখনোই ময়দান থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হবে না। দুবাইসের অবর্তমানে কেউ না কেউ তাদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করবে। তাহলে ইমাদুদ্দিন কেন দুবাইসকে নিজের পক্ষে টেনে বৃহৎ গোত্রটির ঝোঁক তার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন না?
তা ছাড়া দুবাইস ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ব্যক্তি সুলতান সানজারের অতি নিকটভাজন। ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ নিশ্চিত করেই সুলতান সানজারের মনকে প্রশমিত করবে। সুলতান সানজার তো ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিনের জায়গায় এই দুবাইসকে মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি এখন অবাক বিস্ময়ে দেখবেন, সেই ইমাদুদ্দিন জিনকিই এখন তার অতি নিকটভাজন বন্ধুকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই আচরণ পারস্য ও ইরাকের সেলজুক নেতা সুলতান মাহমুদের নিকটও সমালোচিত হবে না। কারণ, দু-বছর পূর্বে ইমাদুদ্দিন যদি মজবুত যুক্তি-প্রমাণ ও চমৎকার উপস্থাপনের মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করতে না পারতেন, তাহলে তো তিনি দুবাইসকে মসুল ও আলেপ্পোর শাসনভার প্রদানে দ্বিধা করতেন না।
এই আচরণের একমাত্র নেতিবাচক দিক হলো, এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। কারণ, তিনি দুবাইসকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। এই দুবাইস তাকে খলিফা পদ থেকে অপসারণের জন্য বিদ্রোহ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যা খলিফাদের নীতিতে বিস্মরণ-অযোগ্য অমার্জনীয় এক অপরাধ। তাই স্বভাবতই অনুমিত ছিল যে, খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন শুরু থেকেই তার দৃষ্টিভঙ্গি সুনির্ধারিত করে রেখেছিলেন। এ অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট। তার মূল মিত্রতা ও আনুগত্য ছিল সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের প্রতি, খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর প্রতি নয়। এমনকি খলিফা কিছুটা শক্তি প্রদর্শন করলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে পরিবর্তন আসবে না।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে নিজের পক্ষে টানার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি আকিদা ও বিশ্বাস এবং ফিকহ ও শরিয়তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা করেননি; আদর্শগত নমনীয়তাও প্রদর্শন করেননি। তার এই আচরণ ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং দুবাইসের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামের স্বার্থমুখী করার কৌশলী প্রচেষ্টা। দুবাইসের ইসলামবিরোধী ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ যেমন তার উদ্দেশ্য ছিল না, বিপরীত দুই মেরুর দুই মতাদর্শকে মৈত্রিক সহাবস্থানে নিয়ে আসাও তার উদ্দেশ্য ছিল না।
যেমনটি স্বাভাবিক ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের মনঃপূত হয় এবং একই সঙ্গে তা খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ করে। খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে দূত পাঠিয়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু এত কিছু করার পর দুবাইসকে মেরে ফেলার জন্য খলিফার কাছে হস্তান্তর করা ইমাদুদ্দিনের জন্য স্বভাবতই অসম্ভব ছিল। তিনি খলিফার দাবি নাকচ করে দেন। এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। (৩৭৯)
৫২৪ হিজরি সনের শুরু ও মধ্যভাগের প্রতি সামগ্রিকভাবে নজর বোলালে আমরা বলতে পারি, ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসারিব দুর্গ পুনরুদ্ধার করেছেন, হারিমে অভাবনীয় সফলতা লাভ করেছেন এবং জনহৃদয়ের প্রিয়তম নেতায় পরিণত হয়েছেন। চলমান রাজনৈতিক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো ঘুঁটি এখন তার হাতে। বিশেষত নুসায়বিন ও দারা নগরী জয়ের পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবাই মনে করছে—শীঘ্রই তিনি এডেসায় অভিযান পরিচালনা করবেন। এরপর দুবাইস বিন সাদাকাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তিনি বিদ্যমান সকল শক্তিকে একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্যে ব্যবহারের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আর তা হলো—উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডার বিতাড়ন।
মুসলমানদের এমন ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে ক্রুসেড শিবিরে তখন ব্যাপক বিপর্যয়-চিত্র। ২য় বল্ডউইন ও ১ম জোসেলিন দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এ অঞ্চলে একেবারে সীমিত অভিজ্ঞতার অধিকারী ফাল্ক অ্যাঞ্জো এবং পিতার তুলনায় যোগ্যতা ও বীরত্বে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা ২য় জোসেলিন। এ ছাড়াও আছে এন্টিয়কের বিধ্বস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
চলমান পরিস্থিতি এ বার্তাই ঘোষণা করছিল যে, আগামী দিনগুলো হবে মুসলমানদের উন্নতি-অগ্রগতি ও বিজয়ের দিন এবং ক্রুসেডারদের উদ্বেগ-অস্থিরতা ও পরাজয়ের দিন।

টিকাঃ
০৭৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৮।
৩৭৭. প্রাগুক্ত, ৯/২৫৮-২৫৯।
৩৭৮. হাসান ইবরাহিম হাসান, তারীখুল ইসলাম, ৪/৭১।
৩৭৯. প্রাগুক্ত, ৪/৭১।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুলতান মাহমুদের ইন্তেকাল

📄 সুলতান মাহমুদের ইন্তেকাল


কিন্তু বাতাস তো অনেক সময় প্রবাহিত হয় জীবনতরীর প্রতিকূলে! হঠাৎ করেই এমন এক ঘটনা ঘটে, যা ঘটনাপ্রবাহের গতিধারাই পরিবর্তন করে দেয় এবং পরবর্তী প্রায় চার বছরের জন্য জিহাদি তৎপরতা থামিয়ে দেয়। মাত্র সাতাশ বছরেরও কম বয়সে ইন্তেকাল করেন সুলতান মাহমুদ। (৩৮০)
আকস্মিক এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। অল্পবয়সী সুলতান মৃত্যুকালে অপরিণত কয়েকটি শিশুসন্তান রেখে যান। ফলে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য ক্ষমতালোভী বিভিন্ন শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। উম্মাহর অবস্থা হয়ে যায় কুরআনে বর্ণিত সেই নারীর ন্যায়, যে বহু পরিশ্রম করে মজবুত সুতা তৈরি করার পর পাক খুলে তা টুকরো টুকরো করে ফেলেছে!
সালতানাতের মসনদ বড় লোভনীয় ও আকর্ষণীয় বস্তু। বহু দিন, বহু বছর পর এই মসনদ দখলের সুযোগ আসে। আবার কত দিন পর এ সুযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না! আর তাই ক্ষমতালোভী প্রতিটি শক্তি এই আরামদায়ক মসনদের কর্তৃত্ব দখলে মরিয়া হয়ে ওঠে। কারা ছিল সালতানাতের ক্ষমতাপ্রত্যাশী? এক-দুজন নয়; গুনে গুনে ছয়জন!
১. দাউদ বিন সুলতান মাহমুদ। সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর আগে তাকেই সালতানাতের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু এ সময় তার বয়স ছিল দশ বছরেরও কম। এ কারণেই তিনি তার আতাবিক (রাজশিক্ষক) আক সুনকুর আহমাদিলির তত্ত্বাবধানে ছিলেন। (৩৮১)
২. সুলতান মাহমুদের ভাই মাসউদ বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। সদাচারী ও সচ্চরিত্রবান সুলতান মাসউদ এ সময় জুরজানের শাসনকর্তা ছিলেন। যথেষ্ট সামরিক শক্তি ও বৃহৎ একটি সেনাবাহিনী তার অধীনে ছিল। এ সময় তার বয়স ছিল তেইশ বছর। (৩৮২)
৩. সুলতান মাহমুদের আরেক ভাই তুগরল বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। তিনি মহানুভব, ন্যায়পরায়ণ ও জনসাধারণের প্রিয়পাত্র ছিলেন। এ সময় তার বয়স ছিল বাইশ বছর। (৩৮৩)
৪. সুলতান মাহমুদের তৃতীয় আরেক ভাই সেলজুকশাহ বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। তিনি পারস্য ও খোজেস্তানের শাসক ছিলেন। তার বয়স অজ্ঞাত।
৫. সুলতান মাহমুদের চাচা সুলতান সানজার। তৎকালীন সেলজুক পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বয়সেও সবার প্রবীণ ছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ছেচল্লিশ বছর। তবে প্রয়াত সুলতান মাহমুদের রাজ্য ইরাক ও পূর্ব পারস্য থেকে তার শাসিত অঞ্চল ছিল বেশ দূরে। (৩৮৪)
৬. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ। তিনি সেলজুক পরিবারের প্রভাব-কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী হতে চাচ্ছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি সফল হলেও কেবল বাগদাদ ও আশেপাশের এলাকার শাসনক্ষমতার চেয়ে বড় কিছু লাভ করতে পারবেন না। কারণ, সে সময় খলিফা ও খিলাফতের সামরিক শক্তি ও নিজস্ব বাহিনী ছিল খুবই দুর্বল।
ক্ষমতার লড়াইয়ে ছিল এই ছয় শক্তি। রাজত্ব হাসিলের পেছনে তাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিশেষ স্বার্থ ও যৌক্তিকতা আছে। প্রত্যেকের পেছনেই আছে কিছু সহযোগী, সমর্থক, জনতা ও সৈন্যদল!
নিঃসন্দেহে এটি ছিল এক কঠিন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি, যা উম্মাহকে ঠেলে দিচ্ছিল সংঘাত ও বিভক্তির এক জ্বলন্ত উনুনে।
এর সঙ্গে যদি যোগ করা হয় সেসব শক্তিকে, যারা সালতানাতের মসনদ লাভের অভিলাষী না হলেও অন্যতম প্রভাবক শক্তি ছিল, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল বিবেচিত হবে। নিঃসন্দেহে এ জাতীয় শক্তিসমূহের মধ্যে সর্বশীর্ষে থাকবে ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম।

টিকাঃ
৩৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৯।
৩৮১. প্রাগুক্ত, ৯/২৫৯।
৩৮২. প্রাগুক্ত, ৯/৩৭৩।
৩৮৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮।
৩৮৪. সুলতান মাহমুদের জীবনী সম্পর্কে জানতে দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৪১৫-৪১৬।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

📄 ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত


ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও কাগজে-কলমে ছিলেন একটি রাজ্যের প্রশাসক মাত্র; কিন্তু ততদিনে তিনি অন্যতম শক্তিশালী সামরিক নেতা ও প্রভাবশালী প্রশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি মসুল, আলেপ্পো, হাররান, হামা, নুসায়বিন ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বরং তার কর্তৃত্ব এন্টিয়ক রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। অধিকন্তু তিনি সেই মহান বীর, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয় অর্জন করেছেন। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়জগতের স্বপ্ন এখন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। হ্যাঁ, এ পর্যায়ে তিনি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা প্রদানের সক্ষমতা রাখতেন না এবং স্বাধীনতা ঘোষণা ও একটি নির্ভেজাল জিহাদি চেতনানির্ভর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাকে সার্বিক সহায়তা করার মতো বৃহৎ কোনো গোত্র ও পর্যাপ্ত সহযোগী-সমর্থক তার পাশে ছিল না। কিন্তু এ পর্যায়ের শক্তি তার ছিল যে, সালতানাতের ক্ষমতা নিয়ে বিবাদরত কোনো পক্ষই তাকে উপেক্ষা করতে পারত না। তদ্রূপ এ সময় হুট করে তাকে পদচ্যুত করাও কারও জন্য সহজ ছিল না। কারণ, এতে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার প্রয়োজনীয়তাও তখন সকলের সামনে দৃশ্যমান ছিল।
আর তাই এমনটিই প্রত্যাশিত ছিল যে, ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মাঠে থাকা এক বা একাধিক শক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে আর ইমাদুদ্দিন জিনকিও ভেবে-চিন্তে উত্তম ও অনুকূল সিদ্ধান্ত নেবেন। এমন কারও সঙ্গে তার সংঘাতে জড়ানো চলবে না, যে পরবর্তী সময়ে হয়তো সুলতান পদ লাভ করবে। সেক্ষেত্রে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়বে এবং অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদি তৎপরতাও স্থগিত হয়ে যাবে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে কী ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা?
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। কারণ, ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদাররা অনেকটা সমশক্তিসম্পন্ন ছিল এবং প্রত্যেকের সম্ভাবনা ছিল কাছাকাছি পর্যায়ের। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ধারণা অনুযায়ী প্রয়াত সুলতান মাহমুদের জীবিত ভাইদের মধ্যে সবার বড় মাসউদ বিন মুহাম্মাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল অন্যদের চেয়ে বেশি। (৩৮৫)
তিনি ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হওয়ায় তার পক্ষে জনসমাগমের সম্ভাবনা বেশি ছিল। তদ্রূপ প্রয়াত সুলতান মাহমুদের শিশু পুত্র দাউদের চেয়েও তিনি শ্রেয়তর বিকল্প। কারণ, দাউদের কোনো কিছু করার ক্ষমতাই নেই; তিনি সুলতান হলে অচিরেই আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলির হাতের পুতুলে পরিণত হবেন। সুলতান সানজারের চেয়েও সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা প্রবল ছিল। কারণ, সুলতান সানজার বয়সে প্রবীণ ও প্রভাবশালী হলেও প্রয়াত সুলতানের সাম্রাজ্য থেকে বেশ দূরে ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল অনেকটা সম্মানসূচক।
বাকি রইল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সম্ভাবনা! খলিফার সাধ ও সাধ্যের মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। চলমান দুর্যোগে দুর্বল সামরিক শক্তির অধিকারী খলিফার পাশে দাঁড়ানো হবে সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত।
এ সবকিছুর পাশাপাশি সুলতান মাসউদ ছিলেন জননন্দিত সদাচারী একজন ব্যক্তি। আর তাই সুলতান পদে জনগণের তাকে মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন, সুলতান মাসউদও তখন সালতানাতের দায়িত্ব প্রাপ্তিতে সহায়তা লাভের জন্য দৃশ্যপটে বিদ্যমান শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো মিত্র খুঁজে ফিরছিলেন। আর তার মাথায় প্রথমেই আসে প্রভাবশালী আমির ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম!
সুলতান মাসউদ ইমাদুদ্দিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ক্ষমতার মসনদে যেতে তার সামরিক সহায়তা কামনা করেন এবং বিনিময়ে তাকে সামরিক বিবেচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ নগরী ইরবিলের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি সুলতান মাসউদের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। (৩৮৬)
তৎকালে অনুসৃত রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন সুলতানের জন্য আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রাপ্তি জরুরি বিবেচিত হতো। খলিফার স্বীকৃতি লাভের পর সমগ্র ইসলামি বিশ্বে নতুন সুলতানের আনুগত্য-প্রভাব বিস্তৃত ও প্রসারিত হতো। কারণ, জনসাধারণ অন্তত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও খলিফার মতামতকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করত। জনসাধারণ যদিও খলিফার কেন্দ্রীয় দুর্বলতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানত; কিন্তু তারা মনে করত, খলিফার বিরুদ্ধাচরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এজন্য সুলতানরা সব সময় খলিফার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভে সচেষ্ট থাকত। যিনি মনে করতেন যে, খলিফা তাকে কিছুতেই স্বীকৃতি প্রদান করবেন না, তিনি খলিফাকে পুরোপুরি অপসারিত করে নতুন করে এমন কাউকে খলিফা পদে বসাতে সামান্য দ্বিধা করতেন না, যিনি তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করবেন!
আর তাই সুলতান পদপ্রত্যাশী সকলে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় ছিল। সাধারণত একজন সুলতানের মৃত্যুর পর সেলজুক পরিবার যার বিষয়ে একমত হতো, খলিফা নতুন সুলতান হিসেবে তাকেই স্বীকৃতি দিতেন। কিন্তু এবার তো পরিস্থিতি ভিন্ন; সেলজুক পরিবারেরই পাঁচ সদস্য নেমেছে ক্ষমতার লড়াইয়ে। প্রয়াত সুলতানের চাচা সানজার, তিন ভাই মাসউদ, তুগরল ও সেলজুকশাহ এবং পুত্র দাউদ। খলিফা তাদের মধ্য হতে কাকে বেছে নেবেন?!
যেহেতু খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ নিজেও ক্ষমতাপ্রত্যাশী ছিলেন, তাই তিনি তাদের মধ্য হতে এমন কাউকে নির্বাচন করতে চাচ্ছিলেন, প্রশাসনে যার ক্ষমতা ও প্রভাব হবে সবচেয়ে কম। তখন তিনি নিজেই প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে খলিফার পছন্দ ছিল সুলতান সানজার। কারণ, সানজারের অবস্থান ছিল ইরাক থেকে অনেক দূরে। সানজারকে সুলতান নির্বাচিত করা হলে অন্ততপক্ষে ইরাক অঞ্চলে খলিফার কর্তৃত্ব সৃষ্টি হবে, এমনকি ভাগ্য ভালো হলে হয়তো শাম অঞ্চলেও! (০৮৭)
এই ছিল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর পরিকল্পনা ও অভিলাষ!
খলিফা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সুলতান হিসেবে সানজারের নাম খুতবায় চালু করে দেন। পাশাপাশি তিনি সানজারের প্রতিটি পদক্ষেপকে নতুন সুলতানের পদক্ষেপ বিবেচনা করে সমর্থন জানাতে থাকেন। সুলতান সানজার এতে যারপরনাই মুগ্ধ ও আনন্দিত হন। (৩৮৮)
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর পূর্বে তার পুত্র দাউদকে পরবর্তী সুলতান নির্বাচিত করেছিলেন। দাউদের সঙ্গে ছিল সেলুজক বাহিনীর মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তি ইস্পাহানের বাহিনী। ইতিপূর্বে তারা স্বয়ং সুলতান মাহমুদের অধীনস্থ ছিল। সুলতান দাউদ বয়সে অপরিণত হলেও কিছুতেই তার ক্ষমতা অপহৃত হতে দিতে পারেন না। আর তাই তিনি তাকে নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য খলিফাকে বাধ্য করতে নিজ বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অভিমুখে রওনা হন।
একই সময় প্রয়াত সুলতানের দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহও আলাদা আলাদা বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের উদ্দেশ্যও একই— নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি লাভে খলিফাকে চাপ প্রয়োগ! বাগদাদের পথে এখন তিনটি বাহিনী। দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহর বাহিনী এবং তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদের বাহিনী।
একই সময় মসুল থেকে মাসউদের সমর্থনে সসৈন্য রওনা হন ইমাদুদ্দিন জিনকি।
সুলতান সানজার অনুভব করেন, পথের দূরত্বের কারণে তিনি পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তাই তিনি তার তৃতীয় ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন এবং বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে বাগদাদের পথে যাত্রা করেন।
খলিফা তো এমন কিছু একদমই প্রত্যাশা করেননি। তিনি কল্পনাই করেননি যে, সানজার নিজে তুগরলকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ চলে আসবেন আর খলিফা তাদের নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বেন; যেমন ইতিপূর্বে তিনি অন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। (৩৮৯)

টিকাঃ
৩৮৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৭।
০৮৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৬-৪৭।
৩৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২-২৬৪।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 আত্মঘাতী সংঘাতের কার্যকারণ

📄 আত্মঘাতী সংঘাতের কার্যকারণ


সম্ভাব্য সংঘাতের পরিণতি আলোচনা করার আগে এই বিস্ময়কর পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনুসন্ধান করা জরুরি, কেন সহোদর ভাই ও একেবারে নিকটাত্মীয়দের নেতৃত্বে শক্তিশালী বাহিনীগুলো এভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
কেন এমনটি হলো? কেমন ছিল তাদের পারস্পরিক সংঘাতের প্রকৃতি? আমি এখানে কয়েকটি পর্যালোচনামূলক মন্তব্য করব, যা ঘটনার ভেতর থেকে সঠিক সমীক্ষা বের করে আনতে সহায়ক হবে, ইনশাআল্লাহ!
১. পার্থিব মোহ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ مَا يُخْرِجُ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ زَهْرَةِ الدُّنْيَا 'আমি তোমাদের জন্য যেসব ফিতনার আশঙ্কা করি, তার অন্যতম হলো পার্থিব শোভা ও চাকচিক্য, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেবেন' (৩৯০)
তাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল ক্ষমতামোহের বিরাট ফিতনা। সামান্য ত্যাজ্য সম্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা ভাইদের বিরোধ দেখতে পাই; সেখানে অনেকগুলো বৃহৎ রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কে ছাড়তে চাইবে?!
যিনি এ পদ লাভ করবেন, তার হাতে ইরাক, ইরান ও বিভক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রসহ পুরো শাম অঞ্চল, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব এসে যাবে। পরবর্তী সময়ে হয়তো রাজ্য আরও বিস্তৃত হয়ে আরব উপদ্বীপ ও তুর্কিস্তানও তাতে যুক্ত হবে। নিঃসন্দেহে এটি ছিল এক বিশাল আকর্ষণ। বিশেষত মানুষের হৃদয়ের সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ চাহিদা থাকে রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রতি—তা কি আর অস্বীকার করা যায়?
২. বিবাদরত ভাইয়েরা এক পিতার সন্তান হলেও প্রতিপালিত হয়েছিল পরস্পর বিচ্ছিন্ন পরিবেশে। একেকজন বড় হয়েছিল একেক রাজ্যে। কারও কারও ক্ষেত্রে মাতৃপরিচয় ছিল ভিন্ন; শিক্ষক-দীক্ষকও ছিল ভিন্ন। আর তাই ভাইদের মধ্যকার স্বভাবজাত যে হৃদ্যতা আমরা দেখে থাকি, তা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।
৩. নিরেট সামরিক ছত্রছায়ায় প্রতিপালন। বিশেষত সেলজুক সাম্রাজ্যের মতো সর্বোচ্চ স্তরের সামরিক শক্তিনির্ভর সাম্রাজ্যে রাজপরিবারের সন্তানগণ সামরিক পরিবেশেই প্রতিপালিত হতো। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি, সাধারণত সেলজুক পরিবারের সন্তানদের প্রতিপালন-দায়িত্ব কোনো সামরিক ব্যক্তিকেই প্রদান করা হতো। বরং কখনো সরাসরি সেনাপ্রধানই এই দায়িত্ব পালন করতেন। তুর্কি সেলজুকগণ তাদেরকে 'আতাবিক' বা রাজপুত্রের দীক্ষক নামে অভিহিত করত। যেমন ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন সুলতান মাহমুদের পুত্র আলপ আরসালানের আতাবিক, দামেশকের আমির তুগতেকিন ছিলেন দাক্কাক বিন তুতুশের পুত্রদের আতাবিক। এরূপ দৃষ্টান্ত আরও আছে। নিঃসন্দেহে এরূপ সামরিক প্রতিপালনের কারণে তাদের কাছে পারিবারিক সম্পর্কবোধ ও মানবিক সম্পর্কের অনুভূতি অন্যদের তুলনায় কম ছিল।
৪. যুগটাই ছিল ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার। খলিফা ছিলেন দুর্বল। এদিকে ক্ষমতার অভিলাষী প্রত্যেকেরই ক্ষমতা লাভের কোনো না কোনো যৌক্তিকতা আছে। হয়তো সেসব যৌক্তিকতা সন্তোষজনকও ছিল। প্রত্যেকে মনে করছিল, সে আপন ন্যায্য অধিকার লাভের জন্য লড়াই করছে; যাতে শিথিলতার সুযোগ নেই।
পরিস্থিতি যে সত্যিই অস্পষ্ট ও গোলযোগপূর্ণ ছিল, তার একটি প্রমাণ এটিও যে, মুসলিম উম্মাহর আস্থাভাজন শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশও এতে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। বরং ক্ষমতা নিয়ে বিবাদমান সুলতানরাও ছিল উন্নত চরিত্র ও উৎকৃষ্ট আচরণগুণের অধিকারী। সামগ্রিকভাবে তারা তাদের জনগণের কাছে প্রিয় ও নিকটভাজন ছিল।
৫. যোগাযোগ-দুর্বলতা অনেক নেতিবাচক ফলাফল ও জটিল সমীকরণের জন্ম দেয়। তাদের প্রত্যেকেই প্রথমে খলিফার কাছে পৌঁছতে মরিয়া ছিল। অথচ বাগদাদে পৌঁছতে যেমন দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, দীর্ঘ সময় প্রয়োজন ফিরতেও। এর সঙ্গে যোগ করুন তাদের প্রত্যেকের শাসিত অঞ্চলের বিস্তৃতির বিষয়টি, তাহলে অনুধাবন করা যাবে যে, বিষয়টি কত জটিল ছিল।
৬. নিঃসন্দেহে তাদের প্রত্যেকের চারপাশে যেসব অনুচর ছিল, তারা তাদের প্রত্যেককে আচরণে-উচ্চারণে এ কথাই বোঝাচ্ছিল যে, আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান এবং দায়িত্ব লাভের অধিক হকদার। কারণ, তাদের নেতা সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হতে পারলে লাভ তো তাদেরও। অর্থাৎ এটি কেবল সম্ভাব্য সুলতানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নয়; আরও অনেকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়!
এসব প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখলে এই বিস্ময়কর ফিতনা ও সংঘাত সৃষ্টির কারণ আমাদের সামনে কিছুটা হলেও সুস্পষ্ট হবে। অবশ্য এসব কারণে এই বিবাদ ও সংঘাতকে কিছুতেই বৈধতা প্রদান বা মার্জনীয় বিবেচনা করা যায় না। কারণ, এই ফিতনা ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিরাট দুর্যোগ, যা চলমান জিহাদি তৎপরতাকে পরবর্তী চারটি বছরের জন্য স্তিমিত করে দিয়েছিল। আমরা এসব কার্যকারণ মূলত উল্লেখ করেছি ঘটনাপ্রবাহের আদ্যোপান্ত সঠিকভাবে উপলব্ধির মানসে।

টিকাঃ
৩৯০. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৬৩ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00