📄 ক্রুসেডারদের উপর্যুপরি বিপদ
দিগন্তজুড়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু সৈনিক হিসেবে তিনি সবার মুখেমুখে চর্চিত হতে থাকেন। সকলে অনুভব করে, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে।
৫২৫ হিজরি সন মুসলমানদের জন্য সুখকর আরও কিছু সংবাদ নিয়ে আসে। আল্লাহর ইচ্ছায় সে বছরই (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট) মারা যান বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইন। (৩৭২) ২য় বল্ডউইন ছিলেন বিস্তৃত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ক্রুসেডার নেতা। তিনি আঠারো বছর এডেসা রাজ্যের শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এরপর তেরো বছর ছিলেন বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা। এই পুরোটা সময়ে তিনি ক্রুসেডারদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব মজবুতকরণে কাজ করেছেন। এ অঞ্চলের মুসলমান এবং ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তিনি অত্যুচ্চ দক্ষতা ও সুগভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
২য় বল্ডউইনের মৃত্যু ছিল ক্রুসেডারদের জন্য অনেক বড় আঘাত। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, ২য় বোহেমন্ডের মৃত্যু এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এলিসের ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এন্টিয়কে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তখন থেকে ২য় বল্ডউইনই ছিলেন এন্টিয়কের তত্ত্বাবধায়ক।
২য় বল্ডউইনের মৃত্যুতে বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়ক রাজ্য বিরাট সংকটে পড়ে যায়। বল্ডউইনের মৃত্যুর পর যিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন, ইসলামি ভূখণ্ডে তার পদচারণা ছিল অতি সাম্প্রতিক; এ অঞ্চলে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল না। নতুন এই শাসকের নাম ফাল্ক (Fulk the Younger) ।(৩৭৩)
ফাল্ক কীভাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে উঠে আসেন, তার ইতিহাস বলতে গেলে ফিরে যেতে হবে আরও তিন বছর পেছনে ৫২১ হিজরি সনে (১১২৮ খ্রিষ্টাব্দে)। এ সময় ২য় বল্ডউইন তার বড় মেয়েকে এমন কোনো রাজন্যের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মনস্থ করেন, যে তার মৃত্যুর পর বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার গ্রহণের যোগ্যতা রাখে। ২য় বল্ডউইনের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না; ছিল চার কন্যাসন্তান। এক মেয়ে এলিসকে তিনি এন্টিয়কের শাসক ২য় বোহেমন্ডের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। এ আলোচনা আমরা পেছনে করে এসেছি। যেহেতু ২য় বল্ডউইন এ অঞ্চলের ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের মাঝে কন্যাদানে উপযুক্ত কাউকে পাচ্ছিলেন না, তাই তিনি ফ্রান্সের তৎকালীন রাজা ৬ষ্ঠ লুই-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে মেয়ের পাণিগ্রহণের উপযুক্ত কোনো যোগ্য রাজন্যকে মনোনীত করার অনুরোধ জানান। রাজা লুই ফ্রান্সের অত্যন্ত প্রভাবশালী এক রাজন্য অ্যাঞ্জো অঞ্চলের কাউন্ট (Count of Anjou) ফাল্ককে উপযুক্ত বিবেচনা করে বাইতুল মুকাদ্দাসে পাঠিয়ে দেন। ২য় বল্ডউইন তার প্রতি আশ্বস্ত হয়ে জ্যেষ্ঠ কন্যা মেলিসেন্ড (Melisende)-কে তার কাছে বিয়ে দেন। এরপর তিনি জামাতা ফাল্ক অ্যাঞ্জোকে সুর ও আক্কা নগরীর জায়গির প্রদান করেন। ২য় বল্ডউইন ফাল্কের সামরিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি ইহধাম ত্যাগ করলে ফাল্ক বাইতুল মুকাদ্দাসের মসনদে অধিষ্ঠিত হন এবং প্রয়াত রাজার যাবতীয় ক্ষমতা ও অধিকার লাভ করেন। স্বভাবতই তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়কও নির্বাচিত হন। (৩৭৪) আর তাই নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি সামনে অনেকটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। ফাল্কের অনভিজ্ঞতাই এর একমাত্র কারণ নয়; বরং লাতাকিয়ায় নির্বাসিত রাজকন্যা এলিস নিশ্চয়ই সামনে সুযোগ পেলেই এন্টিয়কের ক্ষমতায় বাগড়া বসাবেন।
এর অল্প কদিন পরই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়। এডেসার অভিজ্ঞ শাসক জোসেলিন ডি কার্টেনি ইহধাম ত্যাগ করেন এবং তার পুত্র ২য় জোসেলিন (Joscelin II of Edessa) এডেসার শাসনভার গ্রহণ করেন। ২য় জোসেলিন তার পিতার অভিজ্ঞতার এক-দশমাংশেরও অধিকারী ছিলেন না। (*".) নিঃসন্দেহে এ ঘটনা ছিল মুসলমানদের পক্ষে বিরাট সহায়ক। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, পরপর দুজন ঝানু ক্রুসেডার শাসকের মৃত্যু এমন সময়ে হয়েছিল, যখন ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্বে মুসলমানদের শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
টিকাঃ
৩৭২, Guillaume de Tyr pp. 601-602.
৩৭৩. Guillaume de Tyr pp. 601-602.
৩৭৪. Guillaume de Tyr pp. 594.
*". Guillaume de Tyr pp. 610.
📄 দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্ব
প্রায় একই সময় ঘটে আরেক কাণ্ড, যার প্রভাবে চলমান পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। শিয়া বনু মাজিদ গোত্রের নেতা ও সেলজুক পরিবারের প্রবীণ পুরুষ সুলতান সানজারের মিত্র দুবাইস বিন সাদাকা এ সময় দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে বন্দি হয়। কোনো যুদ্ধে বা সংঘাতে নয়; ঘটনাক্রমে দুবাইস পথ হারিয়ে হাসসান বিন কুলসুম আল-কালবির হাতে পড়ে যায়। হাসসান তাকে চিনতে পেরে এবং তার মূল্য উপলব্ধি করে তাকে বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে তুলে দেন এবং এর মাধ্যমে দামেশক অধিপতির নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হন।
দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্বের সংবাদ জানতে পেরে ইমাদুদ্দিন জিনকি এ বিষয়ে উদ্যোগী হন এবং বুরি বিন তুগতেকিনের কাছে দূত প্রেরণ করে সমঝোতা আলোচনা করেন। শেষে উভয়ের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের চুক্তি হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ইমাদুদ্দিন জিনকি দামেশক অধিপতির পুত্র সোনজকে মুক্তিদানের বিনিময়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে গ্রহণ করবেন। (০৭৬)
চুক্তি অনুযায়ী বন্দিবিনিময় কার্যকর হয়। স্বয়ং দুবাইস বিন সাদাকাসহ সকলের ধারণা ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি দুবাইসকে হাতে পেয়ে প্রচণ্ড শান্তি দেবেন। কারণ, দুবাইস ছিল প্রচণ্ড দুরাচারী ও ফিতনার প্ররোচক। তা ছাড়া ইতিপূর্বে সে আলেপ্পো ও মসুলের প্রশাসক পদে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু ইমাদুদ্দিন তার সুবিখ্যাত কূটনৈতিক প্রজ্ঞা খাটিয়ে সকলের প্রত্যাশার বিপরীত এক কাজ করেন। (৩৭৭)
তিনি দুবাইসকে একজন নেতা ও শাসকের মতো অভ্যর্থনা জানান, তাকে একজন মহান রাজার মতো নৈকট্য ও মর্যাদা প্রদান করেন। তার এ আচরণ সকলকে বিস্মিত ও হতবাক করে দেয়। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এই সক্রিয় চরিত্রটিকে নিজের পক্ষে টেনে তার দ্বারা উপকৃত হতে এবং আপন রাজ্যের বৃহৎ স্বার্থে তাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছিলেন। (৩৭৮)
দুবাইস বিন সাদাকা ছিল সে সময়ের সমাজে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র। যদিও এ কথা অনস্বীকার্য যে, তার প্রভাব ছিল পুরোপুরি নেতিবাচক; কিন্তু সে এমন বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে পরিচালিত করতে পারত, যারা বিশেষ করে ওয়াসিত ও হিল্লা অঞ্চলসহ মধ্য ইরাকের বিরাট এলাকাজুড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন একজন ব্যক্তি ইতিপূর্বে কীভাবে বাগদাদে শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল? এমন পরিকল্পনা করার মতো দক্ষতা, ক্ষমতা, প্রভাব ও জনশক্তি ছিল বলেই সে এই পরিকল্পনা করতে পেরেছিল। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি কেন এই পরিস্থিতিতে তার মিত্রতা কিনে নেবেন না?! এর মাধ্যমে তো তিনি তার 'উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডারদের বিতাড়ন'-এর বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুবাইসকে তার পাশে পাবেন কিংবা নিদেনপক্ষে তার নিরপেক্ষতা ও নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হবেন।
দুবাইসের গোত্র বনু মাজিদ কখনোই ময়দান থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হবে না। দুবাইসের অবর্তমানে কেউ না কেউ তাদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করবে। তাহলে ইমাদুদ্দিন কেন দুবাইসকে নিজের পক্ষে টেনে বৃহৎ গোত্রটির ঝোঁক তার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন না?
তা ছাড়া দুবাইস ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ব্যক্তি সুলতান সানজারের অতি নিকটভাজন। ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ নিশ্চিত করেই সুলতান সানজারের মনকে প্রশমিত করবে। সুলতান সানজার তো ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিনের জায়গায় এই দুবাইসকে মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি এখন অবাক বিস্ময়ে দেখবেন, সেই ইমাদুদ্দিন জিনকিই এখন তার অতি নিকটভাজন বন্ধুকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই আচরণ পারস্য ও ইরাকের সেলজুক নেতা সুলতান মাহমুদের নিকটও সমালোচিত হবে না। কারণ, দু-বছর পূর্বে ইমাদুদ্দিন যদি মজবুত যুক্তি-প্রমাণ ও চমৎকার উপস্থাপনের মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করতে না পারতেন, তাহলে তো তিনি দুবাইসকে মসুল ও আলেপ্পোর শাসনভার প্রদানে দ্বিধা করতেন না।
এই আচরণের একমাত্র নেতিবাচক দিক হলো, এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। কারণ, তিনি দুবাইসকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। এই দুবাইস তাকে খলিফা পদ থেকে অপসারণের জন্য বিদ্রোহ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যা খলিফাদের নীতিতে বিস্মরণ-অযোগ্য অমার্জনীয় এক অপরাধ। তাই স্বভাবতই অনুমিত ছিল যে, খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন শুরু থেকেই তার দৃষ্টিভঙ্গি সুনির্ধারিত করে রেখেছিলেন। এ অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট। তার মূল মিত্রতা ও আনুগত্য ছিল সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের প্রতি, খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর প্রতি নয়। এমনকি খলিফা কিছুটা শক্তি প্রদর্শন করলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে পরিবর্তন আসবে না।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে নিজের পক্ষে টানার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি আকিদা ও বিশ্বাস এবং ফিকহ ও শরিয়তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা করেননি; আদর্শগত নমনীয়তাও প্রদর্শন করেননি। তার এই আচরণ ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং দুবাইসের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামের স্বার্থমুখী করার কৌশলী প্রচেষ্টা। দুবাইসের ইসলামবিরোধী ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ যেমন তার উদ্দেশ্য ছিল না, বিপরীত দুই মেরুর দুই মতাদর্শকে মৈত্রিক সহাবস্থানে নিয়ে আসাও তার উদ্দেশ্য ছিল না।
যেমনটি স্বাভাবিক ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের মনঃপূত হয় এবং একই সঙ্গে তা খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ করে। খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে দূত পাঠিয়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু এত কিছু করার পর দুবাইসকে মেরে ফেলার জন্য খলিফার কাছে হস্তান্তর করা ইমাদুদ্দিনের জন্য স্বভাবতই অসম্ভব ছিল। তিনি খলিফার দাবি নাকচ করে দেন। এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। (৩৭৯)
৫২৪ হিজরি সনের শুরু ও মধ্যভাগের প্রতি সামগ্রিকভাবে নজর বোলালে আমরা বলতে পারি, ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসারিব দুর্গ পুনরুদ্ধার করেছেন, হারিমে অভাবনীয় সফলতা লাভ করেছেন এবং জনহৃদয়ের প্রিয়তম নেতায় পরিণত হয়েছেন। চলমান রাজনৈতিক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো ঘুঁটি এখন তার হাতে। বিশেষত নুসায়বিন ও দারা নগরী জয়ের পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবাই মনে করছে—শীঘ্রই তিনি এডেসায় অভিযান পরিচালনা করবেন। এরপর দুবাইস বিন সাদাকাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তিনি বিদ্যমান সকল শক্তিকে একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্যে ব্যবহারের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আর তা হলো—উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডার বিতাড়ন।
মুসলমানদের এমন ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে ক্রুসেড শিবিরে তখন ব্যাপক বিপর্যয়-চিত্র। ২য় বল্ডউইন ও ১ম জোসেলিন দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এ অঞ্চলে একেবারে সীমিত অভিজ্ঞতার অধিকারী ফাল্ক অ্যাঞ্জো এবং পিতার তুলনায় যোগ্যতা ও বীরত্বে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা ২য় জোসেলিন। এ ছাড়াও আছে এন্টিয়কের বিধ্বস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
চলমান পরিস্থিতি এ বার্তাই ঘোষণা করছিল যে, আগামী দিনগুলো হবে মুসলমানদের উন্নতি-অগ্রগতি ও বিজয়ের দিন এবং ক্রুসেডারদের উদ্বেগ-অস্থিরতা ও পরাজয়ের দিন।
টিকাঃ
০৭৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৮।
৩৭৭. প্রাগুক্ত, ৯/২৫৮-২৫৯।
৩৭৮. হাসান ইবরাহিম হাসান, তারীখুল ইসলাম, ৪/৭১।
৩৭৯. প্রাগুক্ত, ৪/৭১।
📄 সুলতান মাহমুদের ইন্তেকাল
কিন্তু বাতাস তো অনেক সময় প্রবাহিত হয় জীবনতরীর প্রতিকূলে! হঠাৎ করেই এমন এক ঘটনা ঘটে, যা ঘটনাপ্রবাহের গতিধারাই পরিবর্তন করে দেয় এবং পরবর্তী প্রায় চার বছরের জন্য জিহাদি তৎপরতা থামিয়ে দেয়। মাত্র সাতাশ বছরেরও কম বয়সে ইন্তেকাল করেন সুলতান মাহমুদ। (৩৮০)
আকস্মিক এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। অল্পবয়সী সুলতান মৃত্যুকালে অপরিণত কয়েকটি শিশুসন্তান রেখে যান। ফলে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য ক্ষমতালোভী বিভিন্ন শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। উম্মাহর অবস্থা হয়ে যায় কুরআনে বর্ণিত সেই নারীর ন্যায়, যে বহু পরিশ্রম করে মজবুত সুতা তৈরি করার পর পাক খুলে তা টুকরো টুকরো করে ফেলেছে!
সালতানাতের মসনদ বড় লোভনীয় ও আকর্ষণীয় বস্তু। বহু দিন, বহু বছর পর এই মসনদ দখলের সুযোগ আসে। আবার কত দিন পর এ সুযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না! আর তাই ক্ষমতালোভী প্রতিটি শক্তি এই আরামদায়ক মসনদের কর্তৃত্ব দখলে মরিয়া হয়ে ওঠে। কারা ছিল সালতানাতের ক্ষমতাপ্রত্যাশী? এক-দুজন নয়; গুনে গুনে ছয়জন!
১. দাউদ বিন সুলতান মাহমুদ। সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর আগে তাকেই সালতানাতের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু এ সময় তার বয়স ছিল দশ বছরেরও কম। এ কারণেই তিনি তার আতাবিক (রাজশিক্ষক) আক সুনকুর আহমাদিলির তত্ত্বাবধানে ছিলেন। (৩৮১)
২. সুলতান মাহমুদের ভাই মাসউদ বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। সদাচারী ও সচ্চরিত্রবান সুলতান মাসউদ এ সময় জুরজানের শাসনকর্তা ছিলেন। যথেষ্ট সামরিক শক্তি ও বৃহৎ একটি সেনাবাহিনী তার অধীনে ছিল। এ সময় তার বয়স ছিল তেইশ বছর। (৩৮২)
৩. সুলতান মাহমুদের আরেক ভাই তুগরল বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। তিনি মহানুভব, ন্যায়পরায়ণ ও জনসাধারণের প্রিয়পাত্র ছিলেন। এ সময় তার বয়স ছিল বাইশ বছর। (৩৮৩)
৪. সুলতান মাহমুদের তৃতীয় আরেক ভাই সেলজুকশাহ বিন মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহ। তিনি পারস্য ও খোজেস্তানের শাসক ছিলেন। তার বয়স অজ্ঞাত।
৫. সুলতান মাহমুদের চাচা সুলতান সানজার। তৎকালীন সেলজুক পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের শাসক ছিলেন। বয়সেও সবার প্রবীণ ছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ছেচল্লিশ বছর। তবে প্রয়াত সুলতান মাহমুদের রাজ্য ইরাক ও পূর্ব পারস্য থেকে তার শাসিত অঞ্চল ছিল বেশ দূরে। (৩৮৪)
৬. খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ। তিনি সেলজুক পরিবারের প্রভাব-কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী হতে চাচ্ছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি সফল হলেও কেবল বাগদাদ ও আশেপাশের এলাকার শাসনক্ষমতার চেয়ে বড় কিছু লাভ করতে পারবেন না। কারণ, সে সময় খলিফা ও খিলাফতের সামরিক শক্তি ও নিজস্ব বাহিনী ছিল খুবই দুর্বল।
ক্ষমতার লড়াইয়ে ছিল এই ছয় শক্তি। রাজত্ব হাসিলের পেছনে তাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিশেষ স্বার্থ ও যৌক্তিকতা আছে। প্রত্যেকের পেছনেই আছে কিছু সহযোগী, সমর্থক, জনতা ও সৈন্যদল!
নিঃসন্দেহে এটি ছিল এক কঠিন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি, যা উম্মাহকে ঠেলে দিচ্ছিল সংঘাত ও বিভক্তির এক জ্বলন্ত উনুনে।
এর সঙ্গে যদি যোগ করা হয় সেসব শক্তিকে, যারা সালতানাতের মসনদ লাভের অভিলাষী না হলেও অন্যতম প্রভাবক শক্তি ছিল, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল বিবেচিত হবে। নিঃসন্দেহে এ জাতীয় শক্তিসমূহের মধ্যে সর্বশীর্ষে থাকবে ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম।
টিকাঃ
৩৮০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৯।
৩৮১. প্রাগুক্ত, ৯/২৫৯।
৩৮২. প্রাগুক্ত, ৯/৩৭৩।
৩৮৩. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৮।
৩৮৪. সুলতান মাহমুদের জীবনী সম্পর্কে জানতে দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৪১৫-৪১৬।
📄 ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত
ইমাদুদ্দিন জিনকি যদিও কাগজে-কলমে ছিলেন একটি রাজ্যের প্রশাসক মাত্র; কিন্তু ততদিনে তিনি অন্যতম শক্তিশালী সামরিক নেতা ও প্রভাবশালী প্রশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি মসুল, আলেপ্পো, হাররান, হামা, নুসায়বিন ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বরং তার কর্তৃত্ব এন্টিয়ক রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। অধিকন্তু তিনি সেই মহান বীর, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয় অর্জন করেছেন। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়জগতের স্বপ্ন এখন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। হ্যাঁ, এ পর্যায়ে তিনি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা প্রদানের সক্ষমতা রাখতেন না এবং স্বাধীনতা ঘোষণা ও একটি নির্ভেজাল জিহাদি চেতনানির্ভর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাকে সার্বিক সহায়তা করার মতো বৃহৎ কোনো গোত্র ও পর্যাপ্ত সহযোগী-সমর্থক তার পাশে ছিল না। কিন্তু এ পর্যায়ের শক্তি তার ছিল যে, সালতানাতের ক্ষমতা নিয়ে বিবাদরত কোনো পক্ষই তাকে উপেক্ষা করতে পারত না। তদ্রূপ এ সময় হুট করে তাকে পদচ্যুত করাও কারও জন্য সহজ ছিল না। কারণ, এতে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার প্রয়োজনীয়তাও তখন সকলের সামনে দৃশ্যমান ছিল।
আর তাই এমনটিই প্রত্যাশিত ছিল যে, ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মাঠে থাকা এক বা একাধিক শক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে আর ইমাদুদ্দিন জিনকিও ভেবে-চিন্তে উত্তম ও অনুকূল সিদ্ধান্ত নেবেন। এমন কারও সঙ্গে তার সংঘাতে জড়ানো চলবে না, যে পরবর্তী সময়ে হয়তো সুলতান পদ লাভ করবে। সেক্ষেত্রে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়বে এবং অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদি তৎপরতাও স্থগিত হয়ে যাবে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে কী ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা?
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। কারণ, ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদাররা অনেকটা সমশক্তিসম্পন্ন ছিল এবং প্রত্যেকের সম্ভাবনা ছিল কাছাকাছি পর্যায়ের। তবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ধারণা অনুযায়ী প্রয়াত সুলতান মাহমুদের জীবিত ভাইদের মধ্যে সবার বড় মাসউদ বিন মুহাম্মাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল অন্যদের চেয়ে বেশি। (৩৮৫)
তিনি ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হওয়ায় তার পক্ষে জনসমাগমের সম্ভাবনা বেশি ছিল। তদ্রূপ প্রয়াত সুলতান মাহমুদের শিশু পুত্র দাউদের চেয়েও তিনি শ্রেয়তর বিকল্প। কারণ, দাউদের কোনো কিছু করার ক্ষমতাই নেই; তিনি সুলতান হলে অচিরেই আতাবিক আক সুনকুর আহমাদিলির হাতের পুতুলে পরিণত হবেন। সুলতান সানজারের চেয়েও সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা প্রবল ছিল। কারণ, সুলতান সানজার বয়সে প্রবীণ ও প্রভাবশালী হলেও প্রয়াত সুলতানের সাম্রাজ্য থেকে বেশ দূরে ছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল অনেকটা সম্মানসূচক।
বাকি রইল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সম্ভাবনা! খলিফার সাধ ও সাধ্যের মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। চলমান দুর্যোগে দুর্বল সামরিক শক্তির অধিকারী খলিফার পাশে দাঁড়ানো হবে সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত।
এ সবকিছুর পাশাপাশি সুলতান মাসউদ ছিলেন জননন্দিত সদাচারী একজন ব্যক্তি। আর তাই সুলতান পদে জনগণের তাকে মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন সুলতান মাসউদের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন, সুলতান মাসউদও তখন সালতানাতের দায়িত্ব প্রাপ্তিতে সহায়তা লাভের জন্য দৃশ্যপটে বিদ্যমান শক্তিগুলোর মধ্যে কোনো মিত্র খুঁজে ফিরছিলেন। আর তার মাথায় প্রথমেই আসে প্রভাবশালী আমির ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম!
সুলতান মাসউদ ইমাদুদ্দিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ক্ষমতার মসনদে যেতে তার সামরিক সহায়তা কামনা করেন এবং বিনিময়ে তাকে সামরিক বিবেচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ নগরী ইরবিলের কর্তৃত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি সুলতান মাসউদের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। (৩৮৬)
তৎকালে অনুসৃত রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী নতুন সুলতানের জন্য আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রাপ্তি জরুরি বিবেচিত হতো। খলিফার স্বীকৃতি লাভের পর সমগ্র ইসলামি বিশ্বে নতুন সুলতানের আনুগত্য-প্রভাব বিস্তৃত ও প্রসারিত হতো। কারণ, জনসাধারণ অন্তত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও খলিফার মতামতকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করত। জনসাধারণ যদিও খলিফার কেন্দ্রীয় দুর্বলতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানত; কিন্তু তারা মনে করত, খলিফার বিরুদ্ধাচরণ কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। এজন্য সুলতানরা সব সময় খলিফার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভে সচেষ্ট থাকত। যিনি মনে করতেন যে, খলিফা তাকে কিছুতেই স্বীকৃতি প্রদান করবেন না, তিনি খলিফাকে পুরোপুরি অপসারিত করে নতুন করে এমন কাউকে খলিফা পদে বসাতে সামান্য দ্বিধা করতেন না, যিনি তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করবেন!
আর তাই সুলতান পদপ্রত্যাশী সকলে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষায় ছিল। সাধারণত একজন সুলতানের মৃত্যুর পর সেলজুক পরিবার যার বিষয়ে একমত হতো, খলিফা নতুন সুলতান হিসেবে তাকেই স্বীকৃতি দিতেন। কিন্তু এবার তো পরিস্থিতি ভিন্ন; সেলজুক পরিবারেরই পাঁচ সদস্য নেমেছে ক্ষমতার লড়াইয়ে। প্রয়াত সুলতানের চাচা সানজার, তিন ভাই মাসউদ, তুগরল ও সেলজুকশাহ এবং পুত্র দাউদ। খলিফা তাদের মধ্য হতে কাকে বেছে নেবেন?!
যেহেতু খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ নিজেও ক্ষমতাপ্রত্যাশী ছিলেন, তাই তিনি তাদের মধ্য হতে এমন কাউকে নির্বাচন করতে চাচ্ছিলেন, প্রশাসনে যার ক্ষমতা ও প্রভাব হবে সবচেয়ে কম। তখন তিনি নিজেই প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে খলিফার পছন্দ ছিল সুলতান সানজার। কারণ, সানজারের অবস্থান ছিল ইরাক থেকে অনেক দূরে। সানজারকে সুলতান নির্বাচিত করা হলে অন্ততপক্ষে ইরাক অঞ্চলে খলিফার কর্তৃত্ব সৃষ্টি হবে, এমনকি ভাগ্য ভালো হলে হয়তো শাম অঞ্চলেও! (০৮৭)
এই ছিল খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর পরিকল্পনা ও অভিলাষ!
খলিফা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সুলতান হিসেবে সানজারের নাম খুতবায় চালু করে দেন। পাশাপাশি তিনি সানজারের প্রতিটি পদক্ষেপকে নতুন সুলতানের পদক্ষেপ বিবেচনা করে সমর্থন জানাতে থাকেন। সুলতান সানজার এতে যারপরনাই মুগ্ধ ও আনন্দিত হন। (৩৮৮)
প্রয়াত সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর পূর্বে তার পুত্র দাউদকে পরবর্তী সুলতান নির্বাচিত করেছিলেন। দাউদের সঙ্গে ছিল সেলুজক বাহিনীর মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তি ইস্পাহানের বাহিনী। ইতিপূর্বে তারা স্বয়ং সুলতান মাহমুদের অধীনস্থ ছিল। সুলতান দাউদ বয়সে অপরিণত হলেও কিছুতেই তার ক্ষমতা অপহৃত হতে দিতে পারেন না। আর তাই তিনি তাকে নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য খলিফাকে বাধ্য করতে নিজ বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অভিমুখে রওনা হন।
একই সময় প্রয়াত সুলতানের দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহও আলাদা আলাদা বাগদাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের উদ্দেশ্যও একই— নতুন সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি লাভে খলিফাকে চাপ প্রয়োগ! বাগদাদের পথে এখন তিনটি বাহিনী। দুই ভাই মাসউদ ও সেলজুকশাহর বাহিনী এবং তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র দাউদের বাহিনী।
একই সময় মসুল থেকে মাসউদের সমর্থনে সসৈন্য রওনা হন ইমাদুদ্দিন জিনকি।
সুলতান সানজার অনুভব করেন, পথের দূরত্বের কারণে তিনি পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তাই তিনি তার তৃতীয় ভ্রাতুষ্পুত্র তুগরলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন এবং বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে বাগদাদের পথে যাত্রা করেন।
খলিফা তো এমন কিছু একদমই প্রত্যাশা করেননি। তিনি কল্পনাই করেননি যে, সানজার নিজে তুগরলকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদ চলে আসবেন আর খলিফা তাদের নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বেন; যেমন ইতিপূর্বে তিনি অন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। (৩৮৯)
টিকাঃ
৩৮৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৭।
০৮৭. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪৬-৪৭।
৩৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২।
৩৮৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬২-২৬৪।