📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উরতুক পরিবারের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের সংঘর্ষ

📄 উরতুক পরিবারের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের সংঘর্ষ


ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলে ফিরে নতুন করে চলমান পরিস্থিতির ওপর নজর বোলান। তিনি অনুভব করেন যে, ইতিমধ্যে তিনি উত্তরে এডেসা ও পশ্চিমে এন্টিয়ক রাজ্যের সীমানার খুব কাছে চলে এসেছেন। এখন ঠিক করতে হবে—কোনটিকে দিয়ে শুরু করবেন তার ক্রুসেডার বিতাড়ন অভিযান।
সন্দেহাতীতভাবেই এডেসা রাজ্য এন্টিয়ক রাজ্যের তুলনায় অনেক গুণ দুর্বল ছিল। এন্টিয়কের কেবল দুর্ভেদ্য দুর্গই ছিল না; ছিল শক্তিশালী নরম্যান যোদ্ধাবাহিনী। ওদিকে এডেসায় ছিল ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের সম্মিলিত বসবাস এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্ক-সংকট। আর্মেনীয়রা ভুলতে পারেনি বল্ডউইনের ঘটানো সেই গণহত্যার কালো ইতিহাস। অপরদিকে এন্টিয়কে ছিল অভিন্ন জাতির সহাবস্থান, যেখানে আধিক্য ছিল নরম্যান ক্যাথলিকদের।
দুই রাজ্যের এসব পার্থক্যের কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়কের পূর্বে তুলনামূলক দুর্বল রাজ্য এডেসায় আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এডেসামুখী অভিযানের পথে বড় একটি বাধা ছিল।
এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল জাযিরা অঞ্চলের উত্তর অংশে ফুরাত নদীর তীর-ঘেঁষে। জাযিরার উত্তর অংশের অন্যান্য নগরী তখন উরতুক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। উরতুক পরিবারের সমকালীন প্রজন্ম ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। তাদের মাঝে সুকমান বিন উরতুক, ইলগাজি বিন উরতুক বা বাল্ক বিন বাহরামের সমজাতীয় কেউ ছিল না। সমকালীন প্রজন্মের উরতুকি নেতৃবৃন্দ ছিল নিতান্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রকৃতির। তারা নিজেদের মাঝে রাজ্য ও জনবল বিভক্ত করে নিয়ে মুসলমানদের দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত করে রেখেছিল। এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, অঞ্চলটি তখন গোটাদশেক আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সবগুলোই ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসার আশেপাশে এবং এডেসা ও ইমাদুদ্দিন জিনকির মাঝে অন্তরায়।
এডেসার ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উরতুকিদের রাজ্য মাড়ানোর ঝুঁকি নিলে ইমাদুদ্দিন জিনকি একাধিক সংকটে পড়ে যাবেন। যেমন:
১. এসব মুসলিম নেতাই হয়তো পেছন দিক থেকে তার ওপর হামলে পড়বে। ইমাদুদ্দিন জিনকিকে তারা ক্রুসেডারদের মতো নিজেদের জন্যও ঝুঁকি মনে করবে।
২. তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করতে পারে। এমনটি ঘটলে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীকে বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যেতে হবে।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি যদি এডেসায় পরাজিত হন, তাহলে পিছু হটে কোথায় আশ্রয় নেবেন? হাররান, আলেপ্পো বা মসুলে ফিরে আশ্রয় গ্রহণের চিন্তা করলে বিরাট দূরত্বের কারণে সমূহ সংকটের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর তাই ধারেকাছে কোথাও এমন কোনো ঘাঁটি থাকা দরকার, যেখান থেকে তিনি অভিযানে বের হবেন এবং প্রয়োজনে সেখানে ফিরে আসবেন।
৪. অঞ্চলটি ছিল অতি ঘনবসতিপূর্ণ। আর অধিবাসীরা সকলেই ছিল মুসলিম। তাই তাদের শক্তিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত সহায়ক সংযুক্তি বিবেচিত হবে। বিপরীতে তারা যদি তাকে প্রতিরোধ করে এবং তার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়, তাহলে এমন সংকট সৃষ্টি হবে, যার সমাধান অতি কঠিন।
এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা রাজ্যে অভিযান চালানোর পূর্বে এ অঞ্চলটিকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপকে অতি জরুরি বিবেচনা করেন। তিনি অঞ্চলটির পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করতে শুরু করেন এবং মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করেন।
এ অঞ্চলে গোটাদশেক রাজন্যের অস্তিত্ব থাকলেও মূল ও কেন্দ্রীয় নেতা ছিল তিনজন।
১. উরতুক পরিবারের সদস্য হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, তিনি ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৩৫৭) ক্রুসেডারদের বিতাড়নচিন্তার কোনো স্থান তার মনোজগতে ছিল না। তিনি মারদিনে বাস করতেন। মারদিনের পাশাপাশি আরও কিছু নগরী তার অধিকারে ছিল। সম্ভবত সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল নুসায়বিন (বর্তমান তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত একটি নগরী)।
২. উরতুক পরিবারের আরেক সদস্য রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান। তিনি ছিলেন হাসানকেইফের আমির। রুকনুদ্দৌলা চূড়ান্ত কঠোর ও রূঢ় স্বভাবের শাসক ছিলেন।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি। সামরিক শক্তিতে তিনি ছিলেন তিনজনের মধ্যে দুর্বলতম। (৩৫৮)
ইমাদুদ্দিন দেখতে পান, তার রাজ্যের সবচেয়ে নিকটতম নগরী হচ্ছে হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসিত নুসায়বিন নগরী। দামেশক নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার স্মরণে ছিল। তিনি জানতেন, শান্তিপূর্ণ সমঝোতা প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর ফলাফল এনে দেয় না। আর তাই বাগদাদ থেকে ফেরার পরই ৫২৪ হিজরি সনের শুরুতে তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং নুসায়বিন অবরোধ করেন। শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন মারদিনে অবস্থান করছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে শক্তির তুলনা করে উরতুকি প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজেদের অসহায় ভাবতে থাকে। তারা দ্রুত হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠায়। জবাবে হুসামুদ্দিন বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিন দিনের ভেতর তিনি নুসায়বিনে সেনাসাহায্য পাঠাবেন। অথচ নগরদুটির মাঝে দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারেরও কম। হুসামুদ্দিনের ফিরতি বার্তাই তার প্রস্তুতিহীনতা ও অদূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করছিল। আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় বার্তাবাহী কবুতরের মাধ্যমে পাঠানো হুসামুদ্দিনের বার্তাটি এসে পড়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে! তিনি বার্তার শব্দে রদবদল ঘটান এবং তিন দিনকে বিশ দিন বানিয়ে দিয়ে কবুতরটি ছেড়ে দেন! তিনি আশা করছিলেন, এর ফলে নগরীটির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনারা প্রতিরোধের বিষয়ে নিরাশ হয়ে পড়বে এবং শান্তি প্রত্যাশায় নগরদ্বার খুলে দেবে। বাস্তবেও তা-ই ঘটে। ইমাদুদ্দিন জিনকি অনায়াসে বিনা রক্তপাতে নগরটিকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। (°৫৯)
এ সংবাদ হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত উরতুক পরিবারের অন্যান্য নেতার সঙ্গে আলোচনা করে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের নেতৃত্বে আবু মানসুর ইকলিদি ও দাউদের মিত্র অন্যান্য তুর্কমেন প্রশাসকসহ সহযোগী সবাইকে একত্র করেন। সম্মিলিত বাহিনী 'দারা' নগরীতে সমবেত হয়। বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে নিজ বাহিনীর চার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই তাদের মোকাবিলায় ছুটে যান। এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়েই তিনি অল্প সময়ের যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। বিজয়যাত্রা অব্যাহত রেখে তিনি দারা ও সারজা দুর্গসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। (°৬০)
মাত্র চার হাজার সৈন্যের জিনকি বাহিনীর কাছে উরতুকি বাহিনীর এমন শোচনীয় পরাজয় এ কথাই প্রমাণ করে যে, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য যেসব মৌলিক উপাদান থাকা জরুরি, তা মোটেও সমকালীন উরতুকি নেতৃবৃন্দের মাঝে ছিল না। তারা প্রত্যেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একেকটি ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের শাসক-রাজাধিরাজ জ্ঞান করত এবং উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে সম্ভাব্য অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করে দিত।
উরতুকিদের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের এই প্রথম সংঘাত অভাবনীয় ও দ্রুত সফলতা বয়ে আনে। এটি ছিল পুরো জাযিরা অঞ্চলকে ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত করার নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা। সামান্য প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসহ পুরো অঞ্চলই এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির পদানত হয়ে যেত, যদি না সেই মুহূর্তেই এন্টিয়ক থেকে উড়ে আসত এক আকস্মিক সংবাদ!

টিকাঃ
৩৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৩৫৮. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
°৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৬-৩৭।
°৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের পথে

📄 এন্টিয়কের পথে


ঘটনা হলো, ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের উত্তর সীমান্তের নিকটবর্তী তোরোস পর্বতমালায় আর্মেনীয়রা একটি আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সময় তারা এন্টিয়কের শাসক ২য় বোহেমন্ডের হামলার শিকার হয়। আর্মেনীয় রাজ্যটির অধিপতি ১ম লিওন তখন নিরুপায় হয়ে মালাতিয়ার(৩৬১) মুসলিম শাসক ইলগাজি দানিশমান্দির কাছে সহযোগিতা কামনা করেন। একে কেন্দ্র করে ইলগাজি দানিশমান্দির নেতৃত্বাধীন দানিশমান্দ বাহিনী ও ২য় বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন নরম্যান বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে যুদ্ধে নরম্যান বাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং ২য় বোহেমন্ড নিহত হন!(৩৬২)
এর ফলে এন্টিয়ক হয়ে পড়ে নেতৃত্বশূন্য!
২য় বোহেমন্ড তখন বয়সে উঠতি যুবক ছিলেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইনের কন্যা এলিসকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান রাজকন্যা কন্সটেন্স (Constance of Hauteville) তখন কোলের শিশু। পশ্চিম ইউরোপের জায়গির রীতি অনুযায়ী এন্টিয়কের শাসনভার এখন চলে যাবে প্রয়াত শাসকের একমাত্র উত্তরাধিকারী শিশু কন্সটেন্সের কাছে! অবশ্য সে পরিণত বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত তার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত থাকবে। এ সময় পিতা ২য় বল্ডউইনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে তার কন্যা এলিস নিজেকেই কন্সটেন্সের তত্ত্বাবধায়ক ঘোষণা করেন। সুস্পষ্টই অনুমিত হচ্ছিল যে, তিনি তখন রাজক্ষমতার অভিলাষী হয়ে উঠেছিলেন। বরং এন্টিয়কজুড়ে এ কথা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি শিশুকন্যা কন্সটেন্সের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নয়: বরং স্বাধীন শাসক হিসেবেই রাজ্যশাসন করতে চাচ্ছেন! (৩৬০)
এন্টিয়ক থেকে এসব সংবাদ দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এসব সংবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তিনি অনুভব করেন, এন্টিয়ক পরিস্থিতি এখন একেবারেই বিশৃঙ্খল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি যদি আকস্মিকভাবে রাজ্যটির ওপর আক্রমণ চালাতে পারেন, তাহলে হয়তো রাজ্যটি জয় করতে পারবেন এবং অঞ্চলটিকে ক্রুসেডারদের জবরদখল থেকে মুক্ত করতে পারবেন।
খবর পৌঁছে যায় বাইতুল মুকাদ্দাসে রাজা ২য় বল্ডউইনের কাছেও। উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচনের লক্ষ্যে তিনি দ্রুত এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন।
২য় বল্ডউইন এন্টিয়ক নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছতেই এক আকস্মিক বিপর্যয়ের শিকার হন! তার কন্যা এলিস তার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেকে এন্টিয়কের একচ্ছত্র শাসক ঘোষণা করেন। (৩৬৪) বরং এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে বার্তা প্রেরণ করেন এবং তাকে এন্টিয়ক শাসনে সহায়তা করার বিনিময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে আনুগত্য ও বশ্যতার নিদর্শনস্বরূপ জিজিয়া কর প্রদানের অঙ্গীকার করেন। (৩৬৫)
স্বভাবতই ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল। কিন্তু ২য় বল্ডউইন এলিসের পত্রবাহককে আটকে ফেলতে সক্ষম হন এবং তাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি এন্টিয়ক প্রশাসনের এমন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন, যারা স্পষ্টতই অনুভব করছিল যে, এলিসের এই প্রচেষ্টা মূলত এন্টিয়কের মতো একটি সামরিক শক্তিনির্ভর ক্রুসেডরাজ্যকে একচেটিয়া দখলের শিশুসুলভ প্রচেষ্টা। তারা এলিসের পিতা ২য় বল্ডউইনের জন্য নগরদ্বার খুলে দেয়। ২য় বল্ডউইন এন্টিয়কে প্রবেশ করেই দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন এবং কন্যা এলিসকে লাতাকিয়া অঞ্চলে নির্বাসিত করেন। (৩৬৬)
২য় বল্ডউইন যদিও এন্টিয়ক পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি জানতেন, এন্টিয়ক পরিস্থিতি তখনও অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। আর তাই তিনি এন্টিয়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত তার বাহিনী নিয়ে আলেপ্পোতে চলে আসেন। সম্ভবত চলমান পরিস্থিতিতে এডেসার তুলনায় এন্টিয়কে আক্রমণ করাটাই শ্রেয়তর হবে। আর তাই তিনি উরতুক পরিবার শাসিত রাজ্যগুলোর চিন্তা আপাতত স্থগিত রাখেন। রাজ্যগুলো তেমন শক্তিশালীও ছিল না বিধায় সেগুলো নিয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের তেমন প্রয়োজনও ছিল না।
এন্টিয়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান যে, এন্টিয়ক রাজ্য-শাসিত সবচেয়ে নিকটবর্তী দুর্গ হচ্ছে আসারিব দুর্গ। তখন থেকে পূর্ণ বিশ বছর পূর্বে ৫০৪ হিজরি সনে (১১১০ খ্রিষ্টাব্দে) রিজওয়ান বিন তুতুশ দুর্গটির কর্তৃত্ব হাতছাড়া করেছিলেন। (৩৬৭) আসারিব দুর্গ ছিল পুরো অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য দুর্গ। দুর্গটি থেকে সরাসরি আলেপ্পোর ওপর নজর রাখা যেত। তা ছাড়া আলেপ্পো ও এন্টিয়কের যোগাযোগপথও ছিল দুর্গটির নিয়ন্ত্রণে। এই অতি গুরুত্বের কারণে ক্রুসেডাররা এন্টিয়ক বাহিনীর বিশেষ দক্ষ একটি স্কোয়াডকে আসারিব দুর্গের প্রহরায় নিয়োজিত রেখেছিল। (৩৬৮)
ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন, আসারিব দুর্গের পতন ঘটানো গেলে এন্টিয়ককে প্রবলভাবে প্রকম্পিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আলেপ্পোর নিরাপত্তা জোরদার হবে। কারণ, ক্রুসেডার সৈন্যরা অনেক সময় দুর্গটি থেকে বের হয়ে এসে আলেপ্পোর কৃষকদের ওপর হামলা চালাত এবং ক্ষেত-খামারে লুটপাট চালিয়ে নিরাপদে দুর্গে ফিরে যেত। সবদিক বিবেচনা করে ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়ক রাজ্যের চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে সরাসরি আসারিব দুর্গ অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হন।
কিন্তু আপন সামরিক অভিজ্ঞতাবলে তিনি অনুভব করেন, দুর্গটি জয় করা অত্যন্ত কঠিন। হয়তো দীর্ঘসময় অবরোধ অব্যাহত রাখলেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ দুর্গটি অবিজিত অবস্থায় পেছনে রেখে গিয়ে পশ্চিমে এন্টিয়কে হামলা করাও নিরাপদ নয়। আর তাই তিনি এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন এবং আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বোঝান যে, তিনি এন্টিয়কের দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে নগরটির পতন ঘটাতে রওনা হয়েছেন। এটি সুস্পষ্ট যে, তিনি আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামনে নিজের পূর্ণ শক্তিমত্তা প্রকাশ করেননি। ফলে দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থানরত প্রতিরক্ষা বাহিনী ধারণা করে যে, তারা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ইমাদুদ্দিনের বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে এন্টিয়ক রাজ্যকে রক্ষা করতে পারবে।
আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইমাদুদ্দিনের বাহিনীর পিছু নেয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি কৌশলে ধীরে ধীরে তাদেরকে দুর্গ থেকে দূরে টেনে আনেন; এরপর হঠাৎ করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইমাদুদ্দিন তাদেরকে এক কৌশলী সামরিক ফাঁদে আটকে ফেলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতিরক্ষা বাহিনীটি পরাজিত হয়; অনেকে নিহত হয়, বাকিরা হয় বন্দি। (০৬৯) এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত আসারিবে ফিরে এসে যুদ্ধের মাধ্যমে দুর্গটি জয় করেন। তিনি ভেতরে প্রহরারত সৈন্যদের বন্দি করেন এবং ভবিষ্যতে যেন ক্রুসেডাররা আলেপ্পোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ না পায়, এ উদ্দেশ্যে দুর্গটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। (৩৭০)
নিঃসন্দেহে এ বিজয় ছিল অত্যন্ত প্রভাব সৃষ্টিকারী। কারণ, আসারিবে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীটি ছিল এন্টিয়কের অন্যতম শক্তিশালী ও সুদক্ষ বাহিনী। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এতেই তুষ্ট না হয়ে এন্টিয়ক অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন। তিনি এন্টিয়কের অতি নিকটবর্তী হারিম নগরী অবরোধ করেন। নগরবাসী তাকে নগরীর অর্ধেক রাজস্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়ে শান্তিচুক্তির আবেদন জানায়। ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন, বিদ্যমান সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তার পক্ষে নগরটির পতন ঘটানো কিছুতেই সম্ভব নয়। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত ছিলেন। আর তাই দুর্গ জয় অসম্ভব বিবেচিত হওয়ায় তিনি কালবিলম্ব না করে নগরবাসীর প্রস্তাব মেনে নেন এবং অবরোধ তুলে নেন। (৩৯)

টিকাঃ
৩৬১. মালাতিয়া: শাম সংলগ্ন প্রসিদ্ধ রোমান নগরী। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৫/১৯২।
৩৬২. আলি বিন মুহাম্মাদ তানুখি, তারীখুল উযায়মি, ২/৬৭৯।
৩৬০, Setton op.cit 1, p. 431.
৩৬৪. Stevenson: op.cit., p. 129.
৩৬৫. Runciman: op.cit., II, p.183.
৩৬৬. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৫০।
৩৬৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৪৭ ও Guillaume de Tyr, pp. 559-601.
৩৬৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪০ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৬।
০৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫।
৩৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৯-৪২।
৩৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেডারদের উপর্যুপরি বিপদ

📄 ক্রুসেডারদের উপর্যুপরি বিপদ


দিগন্তজুড়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ইসলামের লড়াকু সৈনিক হিসেবে তিনি সবার মুখেমুখে চর্চিত হতে থাকেন। সকলে অনুভব করে, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে।
৫২৫ হিজরি সন মুসলমানদের জন্য সুখকর আরও কিছু সংবাদ নিয়ে আসে। আল্লাহর ইচ্ছায় সে বছরই (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট) মারা যান বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইন। (৩৭২) ২য় বল্ডউইন ছিলেন বিস্তৃত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ক্রুসেডার নেতা। তিনি আঠারো বছর এডেসা রাজ্যের শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এরপর তেরো বছর ছিলেন বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা। এই পুরোটা সময়ে তিনি ক্রুসেডারদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব মজবুতকরণে কাজ করেছেন। এ অঞ্চলের মুসলমান এবং ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তিনি অত্যুচ্চ দক্ষতা ও সুগভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
২য় বল্ডউইনের মৃত্যু ছিল ক্রুসেডারদের জন্য অনেক বড় আঘাত। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, ২য় বোহেমন্ডের মৃত্যু এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এলিসের ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এন্টিয়কে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তখন থেকে ২য় বল্ডউইনই ছিলেন এন্টিয়কের তত্ত্বাবধায়ক।
২য় বল্ডউইনের মৃত্যুতে বাইতুল মুকাদ্দাস ও এন্টিয়ক রাজ্য বিরাট সংকটে পড়ে যায়। বল্ডউইনের মৃত্যুর পর যিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন, ইসলামি ভূখণ্ডে তার পদচারণা ছিল অতি সাম্প্রতিক; এ অঞ্চলে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল না। নতুন এই শাসকের নাম ফাল্ক (Fulk the Younger) ।(৩৭৩)
ফাল্ক কীভাবে বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসক পদে উঠে আসেন, তার ইতিহাস বলতে গেলে ফিরে যেতে হবে আরও তিন বছর পেছনে ৫২১ হিজরি সনে (১১২৮ খ্রিষ্টাব্দে)। এ সময় ২য় বল্ডউইন তার বড় মেয়েকে এমন কোনো রাজন্যের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মনস্থ করেন, যে তার মৃত্যুর পর বাইতুল মুকাদ্দাসের শাসনভার গ্রহণের যোগ্যতা রাখে। ২য় বল্ডউইনের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না; ছিল চার কন্যাসন্তান। এক মেয়ে এলিসকে তিনি এন্টিয়কের শাসক ২য় বোহেমন্ডের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। এ আলোচনা আমরা পেছনে করে এসেছি। যেহেতু ২য় বল্ডউইন এ অঞ্চলের ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের মাঝে কন্যাদানে উপযুক্ত কাউকে পাচ্ছিলেন না, তাই তিনি ফ্রান্সের তৎকালীন রাজা ৬ষ্ঠ লুই-এর কাছে পত্র পাঠিয়ে মেয়ের পাণিগ্রহণের উপযুক্ত কোনো যোগ্য রাজন্যকে মনোনীত করার অনুরোধ জানান। রাজা লুই ফ্রান্সের অত্যন্ত প্রভাবশালী এক রাজন্য অ্যাঞ্জো অঞ্চলের কাউন্ট (Count of Anjou) ফাল্ককে উপযুক্ত বিবেচনা করে বাইতুল মুকাদ্দাসে পাঠিয়ে দেন। ২য় বল্ডউইন তার প্রতি আশ্বস্ত হয়ে জ্যেষ্ঠ কন্যা মেলিসেন্ড (Melisende)-কে তার কাছে বিয়ে দেন। এরপর তিনি জামাতা ফাল্ক অ্যাঞ্জোকে সুর ও আক্কা নগরীর জায়গির প্রদান করেন। ২য় বল্ডউইন ফাল্কের সামরিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি ইহধাম ত্যাগ করলে ফাল্ক বাইতুল মুকাদ্দাসের মসনদে অধিষ্ঠিত হন এবং প্রয়াত রাজার যাবতীয় ক্ষমতা ও অধিকার লাভ করেন। স্বভাবতই তিনি এন্টিয়ক রাজ্যের তত্ত্বাবধায়কও নির্বাচিত হন। (৩৭৪) আর তাই নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি সামনে অনেকটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। ফাল্কের অনভিজ্ঞতাই এর একমাত্র কারণ নয়; বরং লাতাকিয়ায় নির্বাসিত রাজকন্যা এলিস নিশ্চয়ই সামনে সুযোগ পেলেই এন্টিয়কের ক্ষমতায় বাগড়া বসাবেন।
এর অল্প কদিন পরই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়। এডেসার অভিজ্ঞ শাসক জোসেলিন ডি কার্টেনি ইহধাম ত্যাগ করেন এবং তার পুত্র ২য় জোসেলিন (Joscelin II of Edessa) এডেসার শাসনভার গ্রহণ করেন। ২য় জোসেলিন তার পিতার অভিজ্ঞতার এক-দশমাংশেরও অধিকারী ছিলেন না। (*".) নিঃসন্দেহে এ ঘটনা ছিল মুসলমানদের পক্ষে বিরাট সহায়ক। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, পরপর দুজন ঝানু ক্রুসেডার শাসকের মৃত্যু এমন সময়ে হয়েছিল, যখন ইমাদুদ্দিন জিনকির নেতৃত্বে মুসলমানদের শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

টিকাঃ
৩৭২, Guillaume de Tyr pp. 601-602.
৩৭৩. Guillaume de Tyr pp. 601-602.
৩৭৪. Guillaume de Tyr pp. 594.
*". Guillaume de Tyr pp. 610.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্ব

📄 দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্ব


প্রায় একই সময় ঘটে আরেক কাণ্ড, যার প্রভাবে চলমান পরিস্থিতি অনেকটা বদলে যায়। শিয়া বনু মাজিদ গোত্রের নেতা ও সেলজুক পরিবারের প্রবীণ পুরুষ সুলতান সানজারের মিত্র দুবাইস বিন সাদাকা এ সময় দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে বন্দি হয়। কোনো যুদ্ধে বা সংঘাতে নয়; ঘটনাক্রমে দুবাইস পথ হারিয়ে হাসসান বিন কুলসুম আল-কালবির হাতে পড়ে যায়। হাসসান তাকে চিনতে পেরে এবং তার মূল্য উপলব্ধি করে তাকে বুরি বিন তুগতেকিনের হাতে তুলে দেন এবং এর মাধ্যমে দামেশক অধিপতির নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হন।
দুবাইস বিন সাদাকার বন্দিত্বের সংবাদ জানতে পেরে ইমাদুদ্দিন জিনকি এ বিষয়ে উদ্যোগী হন এবং বুরি বিন তুগতেকিনের কাছে দূত প্রেরণ করে সমঝোতা আলোচনা করেন। শেষে উভয়ের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের চুক্তি হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ইমাদুদ্দিন জিনকি দামেশক অধিপতির পুত্র সোনজকে মুক্তিদানের বিনিময়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে গ্রহণ করবেন। (০৭৬)
চুক্তি অনুযায়ী বন্দিবিনিময় কার্যকর হয়। স্বয়ং দুবাইস বিন সাদাকাসহ সকলের ধারণা ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি দুবাইসকে হাতে পেয়ে প্রচণ্ড শান্তি দেবেন। কারণ, দুবাইস ছিল প্রচণ্ড দুরাচারী ও ফিতনার প্ররোচক। তা ছাড়া ইতিপূর্বে সে আলেপ্পো ও মসুলের প্রশাসক পদে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু ইমাদুদ্দিন তার সুবিখ্যাত কূটনৈতিক প্রজ্ঞা খাটিয়ে সকলের প্রত্যাশার বিপরীত এক কাজ করেন। (৩৭৭)
তিনি দুবাইসকে একজন নেতা ও শাসকের মতো অভ্যর্থনা জানান, তাকে একজন মহান রাজার মতো নৈকট্য ও মর্যাদা প্রদান করেন। তার এ আচরণ সকলকে বিস্মিত ও হতবাক করে দেয়। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এই সক্রিয় চরিত্রটিকে নিজের পক্ষে টেনে তার দ্বারা উপকৃত হতে এবং আপন রাজ্যের বৃহৎ স্বার্থে তাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছিলেন। (৩৭৮)
দুবাইস বিন সাদাকা ছিল সে সময়ের সমাজে অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র। যদিও এ কথা অনস্বীকার্য যে, তার প্রভাব ছিল পুরোপুরি নেতিবাচক; কিন্তু সে এমন বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে পরিচালিত করতে পারত, যারা বিশেষ করে ওয়াসিত ও হিল্লা অঞ্চলসহ মধ্য ইরাকের বিরাট এলাকাজুড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন একজন ব্যক্তি ইতিপূর্বে কীভাবে বাগদাদে শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল? এমন পরিকল্পনা করার মতো দক্ষতা, ক্ষমতা, প্রভাব ও জনশক্তি ছিল বলেই সে এই পরিকল্পনা করতে পেরেছিল। তাহলে ইমাদুদ্দিন জিনকি কেন এই পরিস্থিতিতে তার মিত্রতা কিনে নেবেন না?! এর মাধ্যমে তো তিনি তার 'উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডারদের বিতাড়ন'-এর বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুবাইসকে তার পাশে পাবেন কিংবা নিদেনপক্ষে তার নিরপেক্ষতা ও নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হবেন।
দুবাইসের গোত্র বনু মাজিদ কখনোই ময়দান থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হবে না। দুবাইসের অবর্তমানে কেউ না কেউ তাদের নেতৃত্বভার গ্রহণ করবে। তাহলে ইমাদুদ্দিন কেন দুবাইসকে নিজের পক্ষে টেনে বৃহৎ গোত্রটির ঝোঁক তার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন না?
তা ছাড়া দুবাইস ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ব্যক্তি সুলতান সানজারের অতি নিকটভাজন। ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ নিশ্চিত করেই সুলতান সানজারের মনকে প্রশমিত করবে। সুলতান সানজার তো ইতিপূর্বে ইমাদুদ্দিনের জায়গায় এই দুবাইসকে মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি এখন অবাক বিস্ময়ে দেখবেন, সেই ইমাদুদ্দিন জিনকিই এখন তার অতি নিকটভাজন বন্ধুকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই আচরণ পারস্য ও ইরাকের সেলজুক নেতা সুলতান মাহমুদের নিকটও সমালোচিত হবে না। কারণ, দু-বছর পূর্বে ইমাদুদ্দিন যদি মজবুত যুক্তি-প্রমাণ ও চমৎকার উপস্থাপনের মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করতে না পারতেন, তাহলে তো তিনি দুবাইসকে মসুল ও আলেপ্পোর শাসনভার প্রদানে দ্বিধা করতেন না।
এই আচরণের একমাত্র নেতিবাচক দিক হলো, এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। কারণ, তিনি দুবাইসকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। এই দুবাইস তাকে খলিফা পদ থেকে অপসারণের জন্য বিদ্রোহ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যা খলিফাদের নীতিতে বিস্মরণ-অযোগ্য অমার্জনীয় এক অপরাধ। তাই স্বভাবতই অনুমিত ছিল যে, খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন শুরু থেকেই তার দৃষ্টিভঙ্গি সুনির্ধারিত করে রেখেছিলেন। এ অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট। তার মূল মিত্রতা ও আনুগত্য ছিল সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের প্রতি, খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর প্রতি নয়। এমনকি খলিফা কিছুটা শক্তি প্রদর্শন করলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে পরিবর্তন আসবে না।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, শিয়া নেতা দুবাইস বিন সাদাকাকে নিজের পক্ষে টানার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকি আকিদা ও বিশ্বাস এবং ফিকহ ও শরিয়তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা করেননি; আদর্শগত নমনীয়তাও প্রদর্শন করেননি। তার এই আচরণ ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং দুবাইসের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামের স্বার্থমুখী করার কৌশলী প্রচেষ্টা। দুবাইসের ইসলামবিরোধী ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ যেমন তার উদ্দেশ্য ছিল না, বিপরীত দুই মেরুর দুই মতাদর্শকে মৈত্রিক সহাবস্থানে নিয়ে আসাও তার উদ্দেশ্য ছিল না।
যেমনটি স্বাভাবিক ছিল, ইমাদুদ্দিন জিনকির এ আচরণ সুলতান সানজার ও সুলতান মাহমুদের মনঃপূত হয় এবং একই সঙ্গে তা খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহকে প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ করে। খলিফা ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে দূত পাঠিয়ে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু এত কিছু করার পর দুবাইসকে মেরে ফেলার জন্য খলিফার কাছে হস্তান্তর করা ইমাদুদ্দিনের জন্য স্বভাবতই অসম্ভব ছিল। তিনি খলিফার দাবি নাকচ করে দেন। এতে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। (৩৭৯)
৫২৪ হিজরি সনের শুরু ও মধ্যভাগের প্রতি সামগ্রিকভাবে নজর বোলালে আমরা বলতে পারি, ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসারিব দুর্গ পুনরুদ্ধার করেছেন, হারিমে অভাবনীয় সফলতা লাভ করেছেন এবং জনহৃদয়ের প্রিয়তম নেতায় পরিণত হয়েছেন। চলমান রাজনৈতিক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো ঘুঁটি এখন তার হাতে। বিশেষত নুসায়বিন ও দারা নগরী জয়ের পর পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবাই মনে করছে—শীঘ্রই তিনি এডেসায় অভিযান পরিচালনা করবেন। এরপর দুবাইস বিন সাদাকাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তিনি বিদ্যমান সকল শক্তিকে একটি সুনির্ধারিত লক্ষ্যে ব্যবহারের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আর তা হলো—উম্মাহর ঐক্য ও ক্রুসেডার বিতাড়ন।
মুসলমানদের এমন ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে ক্রুসেড শিবিরে তখন ব্যাপক বিপর্যয়-চিত্র। ২য় বল্ডউইন ও ১ম জোসেলিন দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এ অঞ্চলে একেবারে সীমিত অভিজ্ঞতার অধিকারী ফাল্ক অ্যাঞ্জো এবং পিতার তুলনায় যোগ্যতা ও বীরত্বে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা ২য় জোসেলিন। এ ছাড়াও আছে এন্টিয়কের বিধ্বস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
চলমান পরিস্থিতি এ বার্তাই ঘোষণা করছিল যে, আগামী দিনগুলো হবে মুসলমানদের উন্নতি-অগ্রগতি ও বিজয়ের দিন এবং ক্রুসেডারদের উদ্বেগ-অস্থিরতা ও পরাজয়ের দিন।

টিকাঃ
০৭৬, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৮।
৩৭৭. প্রাগুক্ত, ৯/২৫৮-২৫৯।
৩৭৮. হাসান ইবরাহিম হাসান, তারীখুল ইসলাম, ৪/৭১।
৩৭৯. প্রাগুক্ত, ৪/৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00