📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিনের গৃহীত কৌশলের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণসমূহ

📄 ইমাদুদ্দিনের গৃহীত কৌশলের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণসমূহ


বাস্তবতা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানটির বিশ্লেষণ অতি কঠিন। কারণ, বাস্তবেই প্রতারণা কোনো মুমিনের স্বভাব ও আচরণ হতে পারে না। তবে বিষয়টি এমন সাদাসিধা নয়। যারা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রতারক বলতে চান, তাদের উচিত ঘটনার সংঘটন-কালের পারিপার্শ্বিক সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া, সবগুলো পয়েন্ট ও যুক্তি-প্রমাণ পাশাপাশি সাজিয়ে রেখে ঘটনার আদ্যোপান্ত নির্মোহ বিশ্লেষণের চেষ্টা করা। এমনটি করা হলে শেষে ঘটনাটির একটি সঠিক চিত্র বের হয়ে আসবে। এমনটি না করে সরাসরি তার অবস্থানকে সুস্পষ্ট প্রতারণা আখ্যায়িত করা মোটেও উচিত হবে না।
যেহেতু এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে আছি, তাই এক্ষেত্রে আমাদের কিছু বিষয় জেনে রাখা উচিত।
১. ঘটনা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার আগে আমাদের ইমাদুদ্দিন জিনকির ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। তিনি সেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যারা দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখল করে রেখেছিল, অতীতের ত্রিশ বছরের মতো তখনও মুসলিম জনপদগুলোতে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে 'সময়' একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ বিবেচিত হচ্ছিল।
২. এসব নেতা ঐক্যপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছিল। সুস্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান না করলেও তাদের প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানই প্রকাশ পাচ্ছিল। স্বভাবতই এর ফলে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একক শক্তিশালী প্লাটফর্মে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিতে বৃহৎ পরিসরের ঐক্য ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে জিহাদের ন্যায় মহান ওয়াজিব দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। আর শরিয়তের স্বতঃসিদ্ধ বিধান হলো, অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনে যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়, তা-ও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে যায়।
৩. এসব নেতা কেবল ঐক্যের বিরোধিতা ও জিহাদের পথে বাধা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল। তাদের অতীত ইতিহাসে যেমন এর দৃষ্টান্ত আছে, আছে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও। আর ভবিষ্যতেও আমরা প্রত্যক্ষ করব হিমস ও দামেশকের প্রতিরক্ষায় ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর মোকাবিলায় ক্রুসেডার বাহিনীর সরব উপস্থিতি।
৪. এই প্রক্রিয়ার বিকল্প পদ্ধতি কী হতে পারত?!
বিকল্প হতে পারত শক্তিপ্রয়োগ করে দখল করে নেওয়া। অর্থাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরদুটিকে সসৈন্য ঘেরাও করতে পারতেন। এরপর ভেতর-বাইরের দুই মুসলিম বাহিনীতে তুমুল লড়াই হতো। দু- পক্ষের মুসলিম সৈন্যদের লাশ পড়ত, ইসলামি দুর্গগুলো ধসে পড়ত; নগরপ্রাচীরগুলো বিধ্বস্ত হতো এবং পরিশেষে দু-পক্ষের বুকে দানা বেঁধে থাকত চরম ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা।
এই বিকল্প যদিও বড় কঠিন ও তিক্ত; তবে ফকিহগণ হয়তো একে বৈধ বলে মেনে নিতেন। তবে স্বভাবতই তারা তা মেনে নিতেন একেবারে শেষ পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অন্যান্য সব পন্থার প্রয়োগ ও ব্যর্থতা নিশ্চিত হওয়ার পর। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অনেক মুজাহিদের জীবনে আমরা এভাবে কোনো ইসলামি নগরীকে নিজ রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সামরিক প্রচেষ্টা চালাতে দেখেছি। বিশেষ করে খিলাফতব্যবস্থা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন যেহেতু শতধা বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো সম্পর্কসূত্র ছিল না, তাই সে সময় এ জাতীয় প্রচেষ্টা বেশি দেখা গিয়েছিল।
আমরা যদি এই সামরিক বিকল্প ও তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলকে এক পাশে রাখি, আরেক পাশে রাখি এক ফোঁটা রক্তপাত ছাড়া হামা দখল করে নেওয়ার ঘটনাকে, তাহলে সহজেই এ বিষয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির গৃহীত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা অনুমান করতে পারব।
৫. বুরি বিন তুগতেকিন ও খায়র খান বিন কুরাজার কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রেরিত বার্তার ভাষ্য আমাদের সামনে নেই। আর তাই তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জিহাদের কথা বলেছিলেন, নাকি দ্ব্যর্থবোধক কোনো ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছিলেন, তা আমরা জানি না। এমনও হতে পারে, তিনি সুস্পষ্ট প্রতারণা এড়িয়ে আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একাধিক মর্মের সম্ভাবনা রাখে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
৬. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো কৌশল'। (৩৪৮) আর এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ, জিহাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে সুনিষ্ঠ মুজাহিদদের লড়াই। ইমাদুদ্দিন জিনকি একে এক ধরনের যুদ্ধকৌশল হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন। এটা ছিল ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগবেষণা, যা কখনো ঠিক হয়, কখনো ভুল।
তা ছাড়া তখন তিনি যুদ্ধপরিস্থিতিতে ছিলেন। আর যুদ্ধের এমন কিছু বিশেষ বিধিবিধান আছে, যা শান্তিকালীন পরিস্থিতির বিধিবিধানের তুলনায় একদমই ভিন্ন হয়ে থাকে।
৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব বিন আশরাফকে হত্যার মনস্থ করেন, তখন মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. নবীজিকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি?' নবীজি সম্মতিসূচক উত্তর দিলে তিনি বলেছিলেন, 'তাহলে আমাকে তার সঙ্গে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন।' নবীজি তাকে অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, 'বলতে পারো। ' (৩৪৯)
এরপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা ও কাব বিন আশরাফের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়, যাতে মুহাম্মাদ বিন মাসলামার পক্ষ থেকে বড় ধরনের কৌশল ছিল। উভয়ের কথোপকথন শেষ হয় মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কর্তৃক কাব বিন আশরাফকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
আমার এ বিষয়টি জানা আছে যে, এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কোনো মুসলমান নয়; বরং একজন কাফির ছিল। কিন্তু বিধান তো ব্যাপক। তা ছাড়া এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, এসব নগরীর নেতৃবৃন্দ কাফির ক্রুসেডারদের সঙ্গে সরাসরি ঘৃণ্য সহযোগিতা বিনিময়ে লিপ্ত ছিল।
৮. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্বে সমকালীন বিশিষ্ট ফকিহগণের কাছে সে বিষয়ে শরীয়তের বিধান জিজ্ঞেস করে নিতেন। তৎকালীন ফকিহগণ সম্ভবত এই কৌশলটিকে ক্ষতিকর হিসেবে স্বীকার করলেও এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনাবশ্যক বিবেচনা করলেও চলমান বিশেষ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের চেয়ে কম ক্ষতিকর বিবেচনা করেছিলেন।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, কেবল অনুমাননির্ভর হয়ে তৎকালীন ফকিহগণের প্রতি অপবাদ দেওয়াও ন্যায় ও ইনসাফের দাবি নয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক তো সমকালীন ফকিহদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'এমন ফতোয়া দিয়েছে দ্বীনহীন কিছু লোক, যাদের শরিয়ত ও সামাজিকতা সম্বন্ধে সুষ্ঠু জ্ঞান নেই। তারা একটি অবৈধ বিষয়কে বৈধ ঘোষণা করেছিল।' (৩৫০)
বাস্তবতা হলো, এমনটি হতেই পারে না যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় চেতনাহীন আলিমের কাছ থেকে শরিয়তের সমাধান গ্রহণ করবেন। আর তার রাজ্যের আলিমগণও এমন ছিলেন যে, শরিয়তকে উপেক্ষা করে ইমাদুদ্দিন জিনকির চাহিদার অনুকূলে ফতোয়া দেবেন। বরং সমস্ত ঐতিহাসিকের সাক্ষ্যমতে তার রাজ্যের আলিমগণ ছিলেন সমসাময়িক শ্রেষ্ঠতম আলিম। তাদের ফতোয়া যদি ভুল হয়ে থাকে, সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যেতে পারে যে, তারা কল্যাণ ও সত্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই ইজতিহাদ করেছিলেন; কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।
৯. একজন ব্যক্তির অস্পষ্ট কর্মের ভালো-মন্দ বিবেচিত হয় তার জীবনাদর্শের আলোকে। ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনাদর্শ পর্যালোচনার পর আমরা কি এ কথা বলতে পারি যে, তিনি এমন একজন প্রতারক নেতা ছিলেন, যিনি শরিয়তের সিদ্ধান্তের প্রতি অবহেলা করতেন?! বরং আমরা তো এ ঘটনার আগে-পরে তার পুরো জীবনের কর্মবিবরণীতে দেখতে পাই, তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ চেষ্টায় লড়াই করেছেন এবং এ পথে নিজের চেষ্টা-সাধনা, সময় এমনকি পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তাই আমরা বলতেই পারি যে, তার এই পদক্ষেপ যদি এমন ভুলও হয়ে থাকে, যার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়; তথাপি তিনি এ কাজ ব্যক্তিস্বার্থে নয়: বরং কেবল মুসলমানদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের চিন্তা থেকেই করেছিলেন।
আমরা এ কথা এজন্য বলছি, যাতে কোনো ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকির এ পদক্ষেপকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে যেকোনো স্বার্থে উম্মাহর ঐক্যের দোহাই দিয়ে কোনো ইসলামি অঞ্চলে অভিযান চালাতে না পারে। যারা এভাবে বিভিন্ন জনপদকে নিজের রাজ্যভুক্ত করতে চায়, তাদের জীবনাদর্শ দেখে নির্ণয় করতে হবে যে, তারা কি মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি, না জালিম শাসক তুতুশ বিন আরসালান ও তার পুত্রদের মতো?!
১০. সর্বশেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. ৫২১ হিজরি থেকে ৫৪১ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বছর মুসলমানদের শাসক ছিলেন। এই দীর্ঘ শাসকজীবনে তিনি কয়টি অন্যায় করেছেন?! যদি আমরা তার এ পদক্ষেপকে নিরেট ভুল হিসেবে মেনেও নিই; স্বীকার করে নিই যে, এমন অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ তার জন্য মোটেও ঠিক হয়নি; তারপরও আমরা দেখতে পাব যে, তার পুরো জীবনে এরূপ ঘটনার অস্তিত্ব বিরল। আর মানবজাতির মাঝে নিষ্পাপ নবীগণ ছাড়া কে এমন আছে, যার জীবনে কোনো ভুলত্রুটি নেই?!
একজন ব্যক্তির ভুলের সংখ্যা সীমিত হওয়া তার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। ভুলে গেলে চলবে না, সময়টা ছিল ভয়াবহ ফিতনার যুগ। খিলাফতব্যবস্থা ছিল দুর্বল; কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তদানের ক্ষমতা খলিফার ছিল না। আর তাই নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত ঐক্য প্রচেষ্টায় কিছু সংশয় ও জটিলতার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ, এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাউকে এ বিষয়ে সকল মুসলমানের দায়িত্ব দেওয়া হতো না। ফলে কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রজ্ঞাসুলভ সিদ্ধান্তের বিপরীতও হতো।
এই বিশ্লেষণের পর আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মানবিক পরিসীমা থেকে বের করে দিচ্ছি না। আমরা বলছি না, তিনি ছিলেন অতিমানব, যার কোনো ভুল হতে পারে না! আমরা তার কোনো সুস্পষ্ট ভুল বা অন্যায়কর্মের সাফাইও গাচ্ছি না। আমরা বলতে চাচ্ছি, পরিস্থিতি কঠিন ও জটিল হলে এ জাতীয় বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সময় কঠিন হয়ে যায় এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সর্বাবস্থায় সুফলদায়ক হয় না।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, যিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি চলমান সুকঠিন ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি দেখেছেন, ক্রুসেডাররা মুসলমানদের ঘরেঘরে লুটপাট চালাচ্ছে; দেখেছেন, কিছু মুসলিম নেতা ও ক্রুসেডারদের মধ্যে ঘৃণ্য আঁতাঁত ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তার মতো পরিস্থিতির জলজ্যান্ত সাক্ষী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর ঘটনার শতাব্দীকাল বা কয়েক শতক পরে এসে নিজের কামরায় শান্ত-সুস্থির বসে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও আলোচনা-সমালোচনা করা, ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করা এবং নির্লিপ্তচিত্তে বলে দেওয়া যে, এটি বৈধ আর সেটি অবৈধ; দুয়ের মধ্যে যোজন যোজন তফাত!
কাজেই যিনি বিশ্লেষণ করতে চান, এসব প্রেক্ষাপট সামনে রেখে তারপর বিশ্লেষণ করুন। সঠিক বিশ্লেষণ তো তিনিই করতে পারবেন, মহান আল্লাহ যাকে তাওফিক দেবেন!

টিকাঃ
৩৪৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৮৬৬, ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৩৯, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৬৭৫ ও ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ২৮৩৩।
৩৪৯. কাব বিন আশরাফের হত্যাঘটনার বিস্তারিত পড়ুন: ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৮১১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮০১।
৩৫০. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 কঠিন সংকট!

📄 কঠিন সংকট!


ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথায় ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিমধ্যে মসুল, আলেপ্পো ও হামা নগরীর শাসনকর্তায় পরিণত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে তখন তার এ শক্তিকে মোটেও অবহেলা করার সুযোগ ছিল না।
এরপর তিনি তার রাজ্যকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে নগরী-তিনটির পারস্পরিক যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে তিনি ৫২২ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১২৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে) মসুল ও আলেপ্পোর মধ্যবর্তী সিনজার নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৩৫১) এদিকে ইযযুদ্দিন মাসউদ বিন আক সুনকুর আল-বুরসুকির মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বশূন্য হয়ে ক্রুসেডারদের হামলার শিকার হওয়া হাররান নগরীর অধিবাসীরা এ সময় নগরীটিকে জিনকি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকিকে আহ্বান জানায়। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ৫২৩ হিজরি সনে (১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন হাররানকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। হাররান যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নবগঠিত রাজ্যটি সার্বিকভাবে নিরাপদ ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। (৩৫২)
ইমাদুদ্দিন জিনকির এরূপ সর্বময় প্রচেষ্টা ও সাধনায় যদিও এ অঞ্চলে এমন এক নতুন ও অদম্য শক্তির উত্থানবার্তা ঘোষিত হচ্ছিল; যা ক্রুসেডারদের আগ্রাসন থেকে মুসলিম জাতিকে উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে; কিন্তু এই নবশক্তির উত্থান সমসাময়িক সকলের জন্য প্রশান্তিদায়ক ছিল না!
খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের সেলজুক শাসক সুলতান সানজার এ সময় অনুভব করেন যে, এই উদীয়মান শক্তিটি একসময় খোদ সেলজুক সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তিনি পারস্য ও ইরাক অঞ্চলের সেলজুক শাসক ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র সুলতান মাহমুদকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে বরখাস্ত করে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন! আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, দুবাইস ছিল বনু মাজিদ গোত্রের নেতা। সে ও তার পুরো গোত্র ছিল শিয়া মতাবলম্বী। নয় বছর পূর্বে ৫১৪ হিজরি সনে সে বাগদাদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহচেষ্টা চালিয়েছিল। (৩৫৩) এ সময় সে সুলতান সানজারের আশ্রয়ে ছিল এবং তার বিশেষ আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিল। সানজার মসুল ও আলেপ্পোতে তাকে বসিয়ে এ অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন। সানজার এ বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছিলেন যে, পূর্ব বিরোধের কারণে আব্বাসি খলিফাও দুবাইসকে নিজের পক্ষে টানতে পারবেন না।
নিঃসন্দেহে এটি ছিল স্বার্থ ও কুপ্রবৃত্তির যুদ্ধ। সুলতান সানজার মুসলমানদের স্বার্থ ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছিলেন না; চিন্তা করছিলেন নিজের স্বার্থের কথা। তাই তিনি সুলতান মাহমুদের কাছে এমন অন্যায় আবদার করে বসেন। সুলতান মাহমুদই ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মসুলের শাসনভার প্রদান করেছিলেন। তিনি তার চাচার মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে সরাসরি তার বিরোধিতা না করে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করতে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ডেকে পাঠান।
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। যে পরিকল্পনা দানা বাঁধছিল, তা হয়তো মুসলমানদের ঐক্যের স্বপ্ন ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ভাবনাতেই সমাপ্তি-রেখা টেনে দেবে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত বাগদাদে পৌঁছে সুলতান মাহমুদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি সুলতানকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের পূর্ণ মেধা ও কূটনৈতিক দক্ষতা ব্যবহার করে এ পদে তাকে বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি এমন কিছু কার্যকারণ উত্থাপন করেন, যেগুলোর কারণে তাকে স্বপদে বহাল রাখা জরুরি ছিল। যথা—
১. তিনি এই দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর কোনো ভুল করেননি। বরং উল্টো এমন কিছু সফলতা এনে দিয়েছেন, যার অতীত দৃষ্টান্ত নেই। তিনি মসুল, আলেপ্পো, হামা, সিনজার, হাররান ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলকে এক পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হয়েছেন।
২. এসব সফলতার সুনাম ও কল্যাণফল মূলত সুলতান মাহমুদই ভোগ করছেন। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নামেই রাজ্য পরিচালনা করছেন।
৩. সুলতান সানজার সুলতান মাহমুদের চাচা হলেও তিনি মূলত এ অঞ্চলে সুলতান মাহমুদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাচ্ছেন না; বরং নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্যই তিনি নিজের অনুগত লোককে মসুলের মসনদে বসাতে চাচ্ছেন। তিনি মূলত সুলতান মাহমুদকে আপন অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই এমনটি করতে চাচ্ছেন। (৩৫৪)
৪. তা ছাড়া ইমাদুদ্দিনের বিকল্প হিসেবে কার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে? দুবাইস বিন সাদাকা! যে ভ্রষ্ট লোকটি ইতিপূর্বে বাগদাদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছিল। অধিকন্তু সে হলো শিয়া মতাদর্শী, আর সেলজুক সাম্রাজ্য আপাদমস্তক সুন্নি মতাদর্শে প্রতিষ্ঠিত।
৫. দুবাইস বিন সাদাকা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় অভিলাষী একজন লোক। মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, তাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলে সে কিছুদিন পর মসুল ও আলেপ্পোতে সেলজুক বশ্যতামুক্ত স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি করবে। ইতিপূর্বে তো সে একেবারে দারুল খিলাফত বাগদাদেই এমন কিছু করার পাঁয়তারা চালিয়েছিল।
৬. দুবাইস বিন সাদাকাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলে সে অবশ্যই এ মুহূর্তে মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও লক্ষ্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দেবে। কেননা, ইতিপূর্বে সে কেবল নেতিবাচক অবস্থানই গ্রহণ করেনি; মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছে।
মুসলমানদের কল্যাণ ও সুলতান মাহমুদের স্বার্থ রক্ষার এসব সম্মিলিত কার্যকারণের দাবি ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকিকে স্বপদে বহাল রাখা। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বলেছেন, সুলতান মাহমুদ ছিলেন সহনশীল ও প্রজ্ঞাবান একজন শাসক। (৩৫৫) ইমাদুদ্দিন জিনকির দীর্ঘ আলোচনা ও এসব যুক্তি শোনার পর তিনি তাকে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বরং পূর্বের নিয়োগপত্রের সমর্থনে তিনি নতুন আরেকটি নিয়োগপত্র জারি করেন। নতুন নিয়োগপত্রে তিনি ইমাদুদ্দিনকে মসুল, জাযিরা অঞ্চল এবং ইমাদুদ্দিন ইতিমধ্যে শাম অঞ্চলের যেসব নগরী রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, সেসব এলাকার শাসনভার প্রদান করেন। (৩৫৬)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির সূচিত অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়া ব্যতিরেকেই উম্মাহর ওপর নেমে আসা ভয়াবহ এক সংকটের সমাপ্তি ঘটে।
এ ঘটনা আমাদেরকে আশ্বস্ত করে যে, আল্লাহ এ প্রজন্মের কল্যাণ চান। কারণ, তিনি তাদের হৃদয়ের সততা ও নিষ্ঠার কথা জানতেন। যদি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অপসারণ করে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হতো, নিশ্চিত করেই জিহাদি আন্দোলন ও জাতি-জাগরণের নবসূচিত উদ্যোগ পুরোপুরি থেমে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই একমাত্র রক্ষাকর্তা।
সুলতান মাহমুদের সমর্থন ও অনুপ্রেরণা সঙ্গে নিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে মসুলে ফিরে আসেন। খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহও এতে সন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ, খলিফা জানতেন, দুবাইস বিন সাদাকা যদি মসুল ও আলেপ্পোর প্রশাসক হতে পারে, পূর্ব শত্রুতার কারণে নিশ্চিত করেই সে খলিফার জন্য সমূহ সংকট সৃষ্টি করবে। সে ধরনের আশঙ্কা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকিই তো তাকে মুক্ত করেছেন!

টিকাঃ
০০১. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/৭৭।
৩০২, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৭।
৩৫০. সে সময়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জানতে আরও পড়তে পারেন আল-হুসায়নি কৃত আখবারুদ-দাওলাতিস সালজুকিয়া, পৃষ্ঠা: ৮৮-৯০।
৩৫৪, ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ৫১।
৩৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৯।
৩৫৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪০ও আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৯।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উরতুক পরিবারের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের সংঘর্ষ

📄 উরতুক পরিবারের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের সংঘর্ষ


ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলে ফিরে নতুন করে চলমান পরিস্থিতির ওপর নজর বোলান। তিনি অনুভব করেন যে, ইতিমধ্যে তিনি উত্তরে এডেসা ও পশ্চিমে এন্টিয়ক রাজ্যের সীমানার খুব কাছে চলে এসেছেন। এখন ঠিক করতে হবে—কোনটিকে দিয়ে শুরু করবেন তার ক্রুসেডার বিতাড়ন অভিযান।
সন্দেহাতীতভাবেই এডেসা রাজ্য এন্টিয়ক রাজ্যের তুলনায় অনেক গুণ দুর্বল ছিল। এন্টিয়কের কেবল দুর্ভেদ্য দুর্গই ছিল না; ছিল শক্তিশালী নরম্যান যোদ্ধাবাহিনী। ওদিকে এডেসায় ছিল ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের সম্মিলিত বসবাস এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্ক-সংকট। আর্মেনীয়রা ভুলতে পারেনি বল্ডউইনের ঘটানো সেই গণহত্যার কালো ইতিহাস। অপরদিকে এন্টিয়কে ছিল অভিন্ন জাতির সহাবস্থান, যেখানে আধিক্য ছিল নরম্যান ক্যাথলিকদের।
দুই রাজ্যের এসব পার্থক্যের কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়কের পূর্বে তুলনামূলক দুর্বল রাজ্য এডেসায় আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এডেসামুখী অভিযানের পথে বড় একটি বাধা ছিল।
এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল জাযিরা অঞ্চলের উত্তর অংশে ফুরাত নদীর তীর-ঘেঁষে। জাযিরার উত্তর অংশের অন্যান্য নগরী তখন উরতুক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। উরতুক পরিবারের সমকালীন প্রজন্ম ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। তাদের মাঝে সুকমান বিন উরতুক, ইলগাজি বিন উরতুক বা বাল্ক বিন বাহরামের সমজাতীয় কেউ ছিল না। সমকালীন প্রজন্মের উরতুকি নেতৃবৃন্দ ছিল নিতান্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রকৃতির। তারা নিজেদের মাঝে রাজ্য ও জনবল বিভক্ত করে নিয়ে মুসলমানদের দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত করে রেখেছিল। এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, অঞ্চলটি তখন গোটাদশেক আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সবগুলোই ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসার আশেপাশে এবং এডেসা ও ইমাদুদ্দিন জিনকির মাঝে অন্তরায়।
এডেসার ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উরতুকিদের রাজ্য মাড়ানোর ঝুঁকি নিলে ইমাদুদ্দিন জিনকি একাধিক সংকটে পড়ে যাবেন। যেমন:
১. এসব মুসলিম নেতাই হয়তো পেছন দিক থেকে তার ওপর হামলে পড়বে। ইমাদুদ্দিন জিনকিকে তারা ক্রুসেডারদের মতো নিজেদের জন্যও ঝুঁকি মনে করবে।
২. তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করতে পারে। এমনটি ঘটলে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীকে বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যেতে হবে।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি যদি এডেসায় পরাজিত হন, তাহলে পিছু হটে কোথায় আশ্রয় নেবেন? হাররান, আলেপ্পো বা মসুলে ফিরে আশ্রয় গ্রহণের চিন্তা করলে বিরাট দূরত্বের কারণে সমূহ সংকটের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর তাই ধারেকাছে কোথাও এমন কোনো ঘাঁটি থাকা দরকার, যেখান থেকে তিনি অভিযানে বের হবেন এবং প্রয়োজনে সেখানে ফিরে আসবেন।
৪. অঞ্চলটি ছিল অতি ঘনবসতিপূর্ণ। আর অধিবাসীরা সকলেই ছিল মুসলিম। তাই তাদের শক্তিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত সহায়ক সংযুক্তি বিবেচিত হবে। বিপরীতে তারা যদি তাকে প্রতিরোধ করে এবং তার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়, তাহলে এমন সংকট সৃষ্টি হবে, যার সমাধান অতি কঠিন।
এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা রাজ্যে অভিযান চালানোর পূর্বে এ অঞ্চলটিকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপকে অতি জরুরি বিবেচনা করেন। তিনি অঞ্চলটির পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করতে শুরু করেন এবং মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করেন।
এ অঞ্চলে গোটাদশেক রাজন্যের অস্তিত্ব থাকলেও মূল ও কেন্দ্রীয় নেতা ছিল তিনজন।
১. উরতুক পরিবারের সদস্য হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, তিনি ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৩৫৭) ক্রুসেডারদের বিতাড়নচিন্তার কোনো স্থান তার মনোজগতে ছিল না। তিনি মারদিনে বাস করতেন। মারদিনের পাশাপাশি আরও কিছু নগরী তার অধিকারে ছিল। সম্ভবত সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল নুসায়বিন (বর্তমান তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত একটি নগরী)।
২. উরতুক পরিবারের আরেক সদস্য রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান। তিনি ছিলেন হাসানকেইফের আমির। রুকনুদ্দৌলা চূড়ান্ত কঠোর ও রূঢ় স্বভাবের শাসক ছিলেন।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি। সামরিক শক্তিতে তিনি ছিলেন তিনজনের মধ্যে দুর্বলতম। (৩৫৮)
ইমাদুদ্দিন দেখতে পান, তার রাজ্যের সবচেয়ে নিকটতম নগরী হচ্ছে হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসিত নুসায়বিন নগরী। দামেশক নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার স্মরণে ছিল। তিনি জানতেন, শান্তিপূর্ণ সমঝোতা প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর ফলাফল এনে দেয় না। আর তাই বাগদাদ থেকে ফেরার পরই ৫২৪ হিজরি সনের শুরুতে তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং নুসায়বিন অবরোধ করেন। শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন মারদিনে অবস্থান করছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে শক্তির তুলনা করে উরতুকি প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজেদের অসহায় ভাবতে থাকে। তারা দ্রুত হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠায়। জবাবে হুসামুদ্দিন বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিন দিনের ভেতর তিনি নুসায়বিনে সেনাসাহায্য পাঠাবেন। অথচ নগরদুটির মাঝে দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারেরও কম। হুসামুদ্দিনের ফিরতি বার্তাই তার প্রস্তুতিহীনতা ও অদূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করছিল। আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় বার্তাবাহী কবুতরের মাধ্যমে পাঠানো হুসামুদ্দিনের বার্তাটি এসে পড়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে! তিনি বার্তার শব্দে রদবদল ঘটান এবং তিন দিনকে বিশ দিন বানিয়ে দিয়ে কবুতরটি ছেড়ে দেন! তিনি আশা করছিলেন, এর ফলে নগরীটির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনারা প্রতিরোধের বিষয়ে নিরাশ হয়ে পড়বে এবং শান্তি প্রত্যাশায় নগরদ্বার খুলে দেবে। বাস্তবেও তা-ই ঘটে। ইমাদুদ্দিন জিনকি অনায়াসে বিনা রক্তপাতে নগরটিকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। (°৫৯)
এ সংবাদ হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত উরতুক পরিবারের অন্যান্য নেতার সঙ্গে আলোচনা করে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের নেতৃত্বে আবু মানসুর ইকলিদি ও দাউদের মিত্র অন্যান্য তুর্কমেন প্রশাসকসহ সহযোগী সবাইকে একত্র করেন। সম্মিলিত বাহিনী 'দারা' নগরীতে সমবেত হয়। বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে নিজ বাহিনীর চার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই তাদের মোকাবিলায় ছুটে যান। এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়েই তিনি অল্প সময়ের যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। বিজয়যাত্রা অব্যাহত রেখে তিনি দারা ও সারজা দুর্গসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। (°৬০)
মাত্র চার হাজার সৈন্যের জিনকি বাহিনীর কাছে উরতুকি বাহিনীর এমন শোচনীয় পরাজয় এ কথাই প্রমাণ করে যে, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য যেসব মৌলিক উপাদান থাকা জরুরি, তা মোটেও সমকালীন উরতুকি নেতৃবৃন্দের মাঝে ছিল না। তারা প্রত্যেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একেকটি ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের শাসক-রাজাধিরাজ জ্ঞান করত এবং উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে সম্ভাব্য অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করে দিত।
উরতুকিদের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের এই প্রথম সংঘাত অভাবনীয় ও দ্রুত সফলতা বয়ে আনে। এটি ছিল পুরো জাযিরা অঞ্চলকে ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত করার নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা। সামান্য প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসহ পুরো অঞ্চলই এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির পদানত হয়ে যেত, যদি না সেই মুহূর্তেই এন্টিয়ক থেকে উড়ে আসত এক আকস্মিক সংবাদ!

টিকাঃ
৩৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৩৫৮. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
°৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৬-৩৭।
°৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 এন্টিয়কের পথে

📄 এন্টিয়কের পথে


ঘটনা হলো, ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়কের উত্তর সীমান্তের নিকটবর্তী তোরোস পর্বতমালায় আর্মেনীয়রা একটি আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সময় তারা এন্টিয়কের শাসক ২য় বোহেমন্ডের হামলার শিকার হয়। আর্মেনীয় রাজ্যটির অধিপতি ১ম লিওন তখন নিরুপায় হয়ে মালাতিয়ার(৩৬১) মুসলিম শাসক ইলগাজি দানিশমান্দির কাছে সহযোগিতা কামনা করেন। একে কেন্দ্র করে ইলগাজি দানিশমান্দির নেতৃত্বাধীন দানিশমান্দ বাহিনী ও ২য় বোহেমন্ডের নেতৃত্বাধীন নরম্যান বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে যুদ্ধে নরম্যান বাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং ২য় বোহেমন্ড নিহত হন!(৩৬২)
এর ফলে এন্টিয়ক হয়ে পড়ে নেতৃত্বশূন্য!
২য় বোহেমন্ড তখন বয়সে উঠতি যুবক ছিলেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের রাজা ২য় বল্ডউইনের কন্যা এলিসকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান রাজকন্যা কন্সটেন্স (Constance of Hauteville) তখন কোলের শিশু। পশ্চিম ইউরোপের জায়গির রীতি অনুযায়ী এন্টিয়কের শাসনভার এখন চলে যাবে প্রয়াত শাসকের একমাত্র উত্তরাধিকারী শিশু কন্সটেন্সের কাছে! অবশ্য সে পরিণত বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত তার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত থাকবে। এ সময় পিতা ২য় বল্ডউইনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে তার কন্যা এলিস নিজেকেই কন্সটেন্সের তত্ত্বাবধায়ক ঘোষণা করেন। সুস্পষ্টই অনুমিত হচ্ছিল যে, তিনি তখন রাজক্ষমতার অভিলাষী হয়ে উঠেছিলেন। বরং এন্টিয়কজুড়ে এ কথা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি শিশুকন্যা কন্সটেন্সের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নয়: বরং স্বাধীন শাসক হিসেবেই রাজ্যশাসন করতে চাচ্ছেন! (৩৬০)
এন্টিয়ক থেকে এসব সংবাদ দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি এসব সংবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেন। তিনি অনুভব করেন, এন্টিয়ক পরিস্থিতি এখন একেবারেই বিশৃঙ্খল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি যদি আকস্মিকভাবে রাজ্যটির ওপর আক্রমণ চালাতে পারেন, তাহলে হয়তো রাজ্যটি জয় করতে পারবেন এবং অঞ্চলটিকে ক্রুসেডারদের জবরদখল থেকে মুক্ত করতে পারবেন।
খবর পৌঁছে যায় বাইতুল মুকাদ্দাসে রাজা ২য় বল্ডউইনের কাছেও। উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচনের লক্ষ্যে তিনি দ্রুত এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন।
২য় বল্ডউইন এন্টিয়ক নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছতেই এক আকস্মিক বিপর্যয়ের শিকার হন! তার কন্যা এলিস তার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেকে এন্টিয়কের একচ্ছত্র শাসক ঘোষণা করেন। (৩৬৪) বরং এতটুকুতেই ক্ষান্ত না হয়ে তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে বার্তা প্রেরণ করেন এবং তাকে এন্টিয়ক শাসনে সহায়তা করার বিনিময়ে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে আনুগত্য ও বশ্যতার নিদর্শনস্বরূপ জিজিয়া কর প্রদানের অঙ্গীকার করেন। (৩৬৫)
স্বভাবতই ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল। কিন্তু ২য় বল্ডউইন এলিসের পত্রবাহককে আটকে ফেলতে সক্ষম হন এবং তাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি এন্টিয়ক প্রশাসনের এমন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন, যারা স্পষ্টতই অনুভব করছিল যে, এলিসের এই প্রচেষ্টা মূলত এন্টিয়কের মতো একটি সামরিক শক্তিনির্ভর ক্রুসেডরাজ্যকে একচেটিয়া দখলের শিশুসুলভ প্রচেষ্টা। তারা এলিসের পিতা ২য় বল্ডউইনের জন্য নগরদ্বার খুলে দেয়। ২য় বল্ডউইন এন্টিয়কে প্রবেশ করেই দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন এবং কন্যা এলিসকে লাতাকিয়া অঞ্চলে নির্বাসিত করেন। (৩৬৬)
২য় বল্ডউইন যদিও এন্টিয়ক পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি জানতেন, এন্টিয়ক পরিস্থিতি তখনও অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। আর তাই তিনি এন্টিয়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত তার বাহিনী নিয়ে আলেপ্পোতে চলে আসেন। সম্ভবত চলমান পরিস্থিতিতে এডেসার তুলনায় এন্টিয়কে আক্রমণ করাটাই শ্রেয়তর হবে। আর তাই তিনি উরতুক পরিবার শাসিত রাজ্যগুলোর চিন্তা আপাতত স্থগিত রাখেন। রাজ্যগুলো তেমন শক্তিশালীও ছিল না বিধায় সেগুলো নিয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের তেমন প্রয়োজনও ছিল না।
এন্টিয়ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পান যে, এন্টিয়ক রাজ্য-শাসিত সবচেয়ে নিকটবর্তী দুর্গ হচ্ছে আসারিব দুর্গ। তখন থেকে পূর্ণ বিশ বছর পূর্বে ৫০৪ হিজরি সনে (১১১০ খ্রিষ্টাব্দে) রিজওয়ান বিন তুতুশ দুর্গটির কর্তৃত্ব হাতছাড়া করেছিলেন। (৩৬৭) আসারিব দুর্গ ছিল পুরো অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য দুর্গ। দুর্গটি থেকে সরাসরি আলেপ্পোর ওপর নজর রাখা যেত। তা ছাড়া আলেপ্পো ও এন্টিয়কের যোগাযোগপথও ছিল দুর্গটির নিয়ন্ত্রণে। এই অতি গুরুত্বের কারণে ক্রুসেডাররা এন্টিয়ক বাহিনীর বিশেষ দক্ষ একটি স্কোয়াডকে আসারিব দুর্গের প্রহরায় নিয়োজিত রেখেছিল। (৩৬৮)
ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন, আসারিব দুর্গের পতন ঘটানো গেলে এন্টিয়ককে প্রবলভাবে প্রকম্পিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আলেপ্পোর নিরাপত্তা জোরদার হবে। কারণ, ক্রুসেডার সৈন্যরা অনেক সময় দুর্গটি থেকে বের হয়ে এসে আলেপ্পোর কৃষকদের ওপর হামলা চালাত এবং ক্ষেত-খামারে লুটপাট চালিয়ে নিরাপদে দুর্গে ফিরে যেত। সবদিক বিবেচনা করে ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়ক রাজ্যের চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে সরাসরি আসারিব দুর্গ অবরোধের লক্ষ্যে অগ্রসর হন।
কিন্তু আপন সামরিক অভিজ্ঞতাবলে তিনি অনুভব করেন, দুর্গটি জয় করা অত্যন্ত কঠিন। হয়তো দীর্ঘসময় অবরোধ অব্যাহত রাখলেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ দুর্গটি অবিজিত অবস্থায় পেছনে রেখে গিয়ে পশ্চিমে এন্টিয়কে হামলা করাও নিরাপদ নয়। আর তাই তিনি এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে এন্টিয়ক অভিমুখে রওনা হন এবং আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বোঝান যে, তিনি এন্টিয়কের দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে নগরটির পতন ঘটাতে রওনা হয়েছেন। এটি সুস্পষ্ট যে, তিনি আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামনে নিজের পূর্ণ শক্তিমত্তা প্রকাশ করেননি। ফলে দুর্গের অভ্যন্তরে অবস্থানরত প্রতিরক্ষা বাহিনী ধারণা করে যে, তারা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে ইমাদুদ্দিনের বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে এন্টিয়ক রাজ্যকে রক্ষা করতে পারবে।
আসারিবের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইমাদুদ্দিনের বাহিনীর পিছু নেয়। ইমাদুদ্দিন জিনকি কৌশলে ধীরে ধীরে তাদেরকে দুর্গ থেকে দূরে টেনে আনেন; এরপর হঠাৎ করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইমাদুদ্দিন তাদেরকে এক কৌশলী সামরিক ফাঁদে আটকে ফেলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতিরক্ষা বাহিনীটি পরাজিত হয়; অনেকে নিহত হয়, বাকিরা হয় বন্দি। (০৬৯) এরপর ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত আসারিবে ফিরে এসে যুদ্ধের মাধ্যমে দুর্গটি জয় করেন। তিনি ভেতরে প্রহরারত সৈন্যদের বন্দি করেন এবং ভবিষ্যতে যেন ক্রুসেডাররা আলেপ্পোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ না পায়, এ উদ্দেশ্যে দুর্গটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। (৩৭০)
নিঃসন্দেহে এ বিজয় ছিল অত্যন্ত প্রভাব সৃষ্টিকারী। কারণ, আসারিবে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীটি ছিল এন্টিয়কের অন্যতম শক্তিশালী ও সুদক্ষ বাহিনী। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি এতেই তুষ্ট না হয়ে এন্টিয়ক অভিমুখে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন। তিনি এন্টিয়কের অতি নিকটবর্তী হারিম নগরী অবরোধ করেন। নগরবাসী তাকে নগরীর অর্ধেক রাজস্ব প্রদানের প্রস্তাব দিয়ে শান্তিচুক্তির আবেদন জানায়। ইমাদুদ্দিন জিনকি উপলব্ধি করেন, বিদ্যমান সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তার পক্ষে নগরটির পতন ঘটানো কিছুতেই সম্ভব নয়। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত ছিলেন। আর তাই দুর্গ জয় অসম্ভব বিবেচিত হওয়ায় তিনি কালবিলম্ব না করে নগরবাসীর প্রস্তাব মেনে নেন এবং অবরোধ তুলে নেন। (৩৯)

টিকাঃ
৩৬১. মালাতিয়া: শাম সংলগ্ন প্রসিদ্ধ রোমান নগরী। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৫/১৯২।
৩৬২. আলি বিন মুহাম্মাদ তানুখি, তারীখুল উযায়মি, ২/৬৭৯।
৩৬০, Setton op.cit 1, p. 431.
৩৬৪. Stevenson: op.cit., p. 129.
৩৬৫. Runciman: op.cit., II, p.183.
৩৬৬. উইলিয়াম সুরি, তারিখুল হুরূবিস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৫০।
৩৬৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৪৭ ও Guillaume de Tyr, pp. 559-601.
৩৬৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/১৪০ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/১৫৬।
০৬৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫।
৩৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৯-৪২।
৩৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00