📄 ইমাদুদ্দিনের কূটকৌশল!
ইমাদুদ্দিন জিনকির আলেপ্পো প্রবেশের সময়ই বা এর সামান্য পূর্বে ৫২২ হিজরি সনেই ইন্তেকাল করেন দামেশকের অধিপতি তুগতেকিন। ৪৯৭ হিজরি থেকে ৫২২ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর তিনি দামেশক শাসন করেন। তার অসিয়ত অনুযায়ী এরপর দামেশকের মসনদে আরোহণ করেন তার পুত্র বুরি বিন তুগতেকিন। (৩৪৪) আসুন, তুগতেকিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে আমরাও নতুন করে নজর বোলাই দামেশকের নথিপত্রে!
নিঃসন্দেহে দামেশক পুরো শাম অঞ্চলের সর্ববৃহৎ নগরী এবং এ অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহে অন্যতম প্রভাবক শক্তি। আপন জনশক্তি, ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও সামরিক সামর্থ্যের কারণে নগরীটি মুসলমানদের যেকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের ভূমিকা রাখে। সার্বিক পরিস্থিতি শোধিত, সুন্দর ও শক্তিশালী থাকলে দামেশক চলমান সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক শক্তি বিবেচিত হয়; বিপরীতে দামেশক-পরিস্থিতি কলুষিত ও দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বিষয়টি আমরা মোটেও উপেক্ষা করতে পারি না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যেহেতু ক্রুসেডারদেরকে ইসলামি ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত করার ন্যায় একটি বৃহৎ ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা লালন করতেন, তাই স্বভাবতই দামেশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরী তার কর্মপরিকল্পনায় বিশাল স্থানজুড়েই ছিল। তা ছাড়া শামের মধ্যবিন্দুতে অবস্থানের কারণে দামেশক হতে পারত এন্টিয়ক, ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসে অভিযানে গমন ও প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত সামরিক ঘাঁটি।
আর তাই ক্রুসেডার বিতাড়ন পরিকল্পনা সফলভাবে আঞ্জাম দিতে হলে এই পুরো অঞ্চলের শক্তিকে একীভূত করার পদক্ষেপে দামেশককেও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি ছিল। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তায় ছিল; ছিল তার পরে একই দায়িত্ব পালনকারী নুরুদ্দিন মাহমুদ ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চিন্তাজগতে; বরং সালাহুদ্দিন-পরবর্তী সময়ে আইয়ুবি ও মামলুক সাম্রাজ্যের অন্যান্য শাসকের চিন্তাজগতেও। এমনকি আমরা মনে করি, আমাদের বর্তমান যুগ পর্যন্ত প্রতিযুগের শাসক-প্রশাসকদের কাছে দামেশকের গুরুত্ব ছিল-আছে-থাকবে। কারণ, দামেশক এমন গুরুত্বপূর্ণ ও উপযুক্ত একটি কেন্দ্র, যাকে উপেক্ষা করা মোটেই সম্ভব নয়।
কিন্তু অতি পরিতাপের বিষয়, এমন নানামাত্রিক গুরুত্ব ও প্রভাবের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও শাম ও ফিলিস্তিনে ক্রুসেডাররা চেপে বসার সেই যুগসন্ধিক্ষণে দামেশক যেকোনো ইসলামি ঐক্য পরিকল্পনার সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দায়িত্ব পালন করত!
এমন ঘনঘোর অমানিশাকালে দামেশকের জনগণের পশ্চাৎপদতার মৌলিক কার্যকারণগুলো আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। কেন তারা কোনো মৌলিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি, কেন কোনো সংহত ইসলামি জাগরণ তাদের দ্বারা সম্ভব হয়নি—তা-ও আমরা বলেছি। এর নেপথ্য কারণ ছিল এ অঞ্চলে শতাব্দীকালের অধিক সময় উবায়দিদের অপশাসন, তারপর জালিম তুতুশ ও তার পুত্র দাক্কাকের দুঃশাসন। দাক্কাকের পরবর্তী শাসক তুগতেকিন যদিও পূর্বসূরিদের তুলনায় ব্যতিক্রম ছিলেন, কিন্তু তিনিও ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে উম্মাহর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দানকারী মহৎপুরুষ ছিলেন না। এর অন্যতম প্রমাণ, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতেও দ্বিধা করেননি।
দামেশকের একটি বড় সমস্যা এই ছিল যে, যিনিই দামেশকের ক্ষমতা লাভ করতেন, তিনি নিজেকে স্বাধীন-স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবতেন। এর কারণ হলো, দামেশক ছিল বৃহৎ, বিস্তৃত, ঐতিহ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি নগরী। সবকিছু মিলে সেখানকার সামাজিক পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, দামেশকের শাসক অন্যের আনুগত্য বা বশ্যতা স্বীকারের চিন্তাও করতেন না। তিনি তো দামেশকের 'সম্রাট'! তিনি কীভাবে অন্যের অধীনস্থ রাজন্য হবেন; তা সেই 'অন্য' যে কেউ হন না কেন! এই চিন্তাগত দীনতা যেমন তুগてকিনের মধ্যে ছিল; ছিল পরবর্তী সময়ে তার পুত্রদের মধ্যেও।
সঙ্গে এ তথ্যটিও যুক্ত করুন যে, তুগতেকিন ছিলেন এ অঞ্চলের অন্যান্য বৃহৎ শাসকপরিবার হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক তুর্কি পরিবারের সদস্য। তিনি না সেলজুক ছিলেন, না আব্বাসি; আর না বনু উকায়ল, বনু মিরদাস, বনু মুনকিযের মতো এমন কোনো আরব পরিবারের সদস্য, যাদের এ অঞ্চলে দীর্ঘ শাসন-ইতিহাস আছে। ফলে তুগতেকিন কার্যত দামেশকের পরিসরেই সংকুচিত হয়ে থাকতেন। অন্য কোনো নগরীতে তার কোনো সহযোগী ছিল না। এটি ছিল তুগতেকিনের অন্যতম বৃহৎ সমস্যা। তিনি দামেশকের মতো শক্তিশালী নগরীর অধিকর্তা হয়েও অন্য কোনো নগরীকে আপন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারতেন না; পারলেও নিতান্ত সাময়িক সময়ের জন্য। তাই তিনি কেবল দামেশক নিয়েই তুষ্ট ছিলেন। আমরা প্রত্যক্ষ করব, পরবর্তীকালে তার পুত্ররাও একই মানসিকতা লালন করবে। পিতার মতো তারাও দামেশকে নিজেদের শাসনক্ষমতা স্থায়ী করার মানসে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা মাথা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখবে! (৩৪৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সবকিছুই জানতেন ও বুঝতেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের লক্ষ্যে যে কাঙ্ক্ষিত ঐক্য প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তাতে দামেশককেও যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। মসুল ও আলেপ্পোর সঙ্গে দামেশক যুক্ত হলে নিঃসন্দেহে সম্মিলিত এ শক্তিতে ভাঙন ধরানো সহজ হবে না।
একটানা পঁচিশ বছরের শাসন শেষে তুগতেকিনের মৃত্যুর পর দামেশক স্বভাবতই শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্য হারাতে বসেছিল। নতুন শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের দামেশকের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার মতো উপযুক্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। আর তাই দামেশককে আপন রাজ্য-পরিসরে যুক্ত করতে চাইলে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য কালবিলম্ব না করে তখনই চেষ্টা করা জরুরি ছিল।
এর সঙ্গে এ বিষয়টিও যুক্ত করা যেতে পারে যে, দামেশক তখন দুষ্ট বাতিনিদের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল। পুরোটা জীবন তুগতেকিন তাদেরকে সমীহ করে চলতেন। নিজের নিয়ন্ত্রণ-রশিও তিনি তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ফলে তাদের হিংস্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে; দিন-দিন বেড়েছে আতঙ্ক। এ পরিস্থিতি কেবল দামেশকে নয়; পুরো শাম অঞ্চলেই ছিল। এ বিষয়টি চিন্তা করলে বলতে হয়, অনতিবিলম্বে দামেশকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে হয়তো পুরো শাম অঞ্চলেই নিরাপত্তা ফিরে আসবে, মুসলমানদের চেষ্টা-সাধনা সংস্কারমুখী হবে এবং আলিম-উলামা ও নেতা-শাসকদের জন্য বাতিনি শিয়াদের খঞ্জর-তরবারির আশঙ্কামুক্ত হয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।
কিন্তু একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন যে, দামেশক, আলেপ্পো ও মসুলের শান্তিপূর্ণ ঐক্য প্রচেষ্টা কার্যত অসম্ভব। তুগতেকিন নিজে ঐক্যের মনোভাব পোষণকারী ছিলেন না। তার পুত্রও নিঃসন্দেহে দামেশকের ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকবেন। আর তাই দামেশককে নতুন ইসলামি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হলে ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল—কৌশল ও চাতুরির পথ কিংবা শক্তি প্রয়োগ ও রক্তপাতের পথ।
ইমাদুদ্দিন জিনকির নীতি ছিল, তিনি একান্ত নিরুপায় পরিস্থিতির শিকার না হলে রক্তপাত এড়িয়ে চলতেন। সারাজীবন তিনি সামরিক সংঘর্ষ পরিহার করে বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য ও নগরী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই দামেশকের ক্ষেত্রে তিনি প্রথম পথটিই বেছে নেন এবং অসামরিক পন্থায় কৌশলে বুরি বিন তুগতেকিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দামেশককে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। উল্লেখ্য, ত্রিপোলির নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আরেক নগরী 'হামা'ও তখন দামেশকের অধীনে ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সেই কৌশলের বিবরণে যাওয়ার পূর্বে এ বিষয়টি জানা দরকার যে, এ অঞ্চলের আরেকটি স্বাধীন রাজ্য ছিল হিমস। এ সময় হিমসের ক্ষমতা ছিল সামসামুদ্দৌলা খায়র খান বিন কুরাজা নামক জনৈক অত্যাচারী শাসকের হাতে। সামসামুদ্দৌলা হিমসবাসীর ওপর প্রচুর জুলুম-নিপীড়ন চালাতেন। তা ছাড়া হিমসের জনগণও দামেশকের মতো একই পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় হুবহু একই মন-মানসিকতা লালন করত। হিমসও শতাব্দীকালের অধিক সময় উবায়দি শিয়াদের হাতে শাসিত ছিল। উবায়দিদের প্রস্থানের পর হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছিল পর্যায়ক্রমে তুতুশ বিন আলপ আরসালান ও তার পুত্র দাক্কাকের হাতে। এমনকি দাক্কাকের শাসনকালে দীর্ঘ সময় তুগতেকিন হিমসের গভর্নর ছিলেন।
আমরা যদি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান লক্ষ করি, তাহলে সুস্পষ্ট উপলব্ধি করব যে, দামেশকে পৌঁছতে হলে এর পূর্বেই আলেপ্পো ও দামেশকের মাঝপথে অবস্থিত হিমস ও হামা নগরীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প ছিল না।(৩৪৬)
এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। এই যখন পরিস্থিতি, তাহলে প্রথমে হিমস ও হামা নগরীর ওপর এবং তারপর দামেশকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কী হতে পারে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্মপন্থা?
ইমাদুদ্দিন জিনকি একটি রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে একটি বাহিনী গঠন করার ভাব প্রকাশ করেন, এরপর হিমসের আমির খায়র খান বিন কুরাজা ও দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের কাছে আসন্ন অভিযানে সহযোগিতা আহ্বান করেন। ইমাদুদ্দিনের পরিকল্পনা ছিল তারা দুজন তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আগমন করলে তিনি তাদেরকে বন্দি করে ফেলবেন। এতে নগরীদুটি শাসকহীন ও প্রতিরক্ষাশূন্য হয়ে পড়বে এবং তিনি সহজেই বিনা যুদ্ধে নগরীদুটিতে প্রবেশ করতে পারবেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনার প্রথমাংশ সফল হয়। খায়র খান বিন কুরাজা নিজ বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে আগমন করেন এবং ফাঁদে আটকা পড়েন। কিন্তু বুরি বিন তুগতেকিন নিজে না এসে তার পুত্র সোনজের নেতৃত্বে পাঁচশ সৈন্যের একটি প্রতীকী বাহিনী প্রেরণ করেন। সোনজ তখন হামা নগরীর আমির ছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি সঙ্গে সঙ্গে সোনজকে আটক করে দ্রুত হামায় প্রবেশ করেন। শাসক ও নিরাপত্তাবাহিনী না থাকায় নগরীটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তখন দুর্বল হয়ে আছে। ফলে বিনা রক্তপাতেই হামা নগরী ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়। হামার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েই তিনি খায়র খান বিন কুরাজাকে আটক করে হিমসেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। কিন্তু হিমসে তখনও বিরাট সংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছিল। তারা নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে অস্বীকৃতি জানালে ইমাদুদ্দিন ভেতরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। (৩৪১)
ইমাদুদ্দিন জিনকি পুত্রমুক্তির বিনিময়ে দামেশকের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার জন্য বুরি বিন তুগতেকিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু বুরি নতি স্বীকার না করায় দামেশক ইমাদুদ্দিনের একক ইসলামি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে যায়।
অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ইমাদুদ্দিন জিনকির এ কৌশল কেবল হামা নগরীতে সফল হয় আর হিমস ও দামেশকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। শুধু তা-ই নয়; নগরীদুটির সামনে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা প্রকাশ পেয়ে যায়। দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিন ও হিমসের নতুন আমির (বন্দি আমির খায়র খানের পুত্র) কুরাইশ বিন খায়র খান জেনে যান যে, ভবিষ্যতে ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীদুটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে সামরিক সমাধান গ্রহণেও দ্বিধা করবেন না।
অনেক ঐতিহাসিক ইমাদুদ্দিনের এমন কৌশল অবলম্বন; বুরি ও খায়র খানকে জিহাদের কথা বলে আহ্বান জানানো, এরপর প্রতারণা করে প্রথমজনের পুত্র ও দ্বিতীয়জনকে বন্দি করাকে সুস্পষ্ট প্রতারণা আখ্যা দিয়েছেন। আর গাদ্দারি ও প্রতারণা কোনো মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।
টিকাঃ
৩৪৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৮।
৩৪৫. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১৬।
৩৪৬. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা : ১১৯।
৩৪১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৬১-৩৬২।
📄 ইমাদুদ্দিনের গৃহীত কৌশলের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণসমূহ
বাস্তবতা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানটির বিশ্লেষণ অতি কঠিন। কারণ, বাস্তবেই প্রতারণা কোনো মুমিনের স্বভাব ও আচরণ হতে পারে না। তবে বিষয়টি এমন সাদাসিধা নয়। যারা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রতারক বলতে চান, তাদের উচিত ঘটনার সংঘটন-কালের পারিপার্শ্বিক সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া, সবগুলো পয়েন্ট ও যুক্তি-প্রমাণ পাশাপাশি সাজিয়ে রেখে ঘটনার আদ্যোপান্ত নির্মোহ বিশ্লেষণের চেষ্টা করা। এমনটি করা হলে শেষে ঘটনাটির একটি সঠিক চিত্র বের হয়ে আসবে। এমনটি না করে সরাসরি তার অবস্থানকে সুস্পষ্ট প্রতারণা আখ্যায়িত করা মোটেও উচিত হবে না।
যেহেতু এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে আছি, তাই এক্ষেত্রে আমাদের কিছু বিষয় জেনে রাখা উচিত।
১. ঘটনা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার আগে আমাদের ইমাদুদ্দিন জিনকির ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। তিনি সেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যারা দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখল করে রেখেছিল, অতীতের ত্রিশ বছরের মতো তখনও মুসলিম জনপদগুলোতে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে 'সময়' একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ বিবেচিত হচ্ছিল।
২. এসব নেতা ঐক্যপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছিল। সুস্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান না করলেও তাদের প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানই প্রকাশ পাচ্ছিল। স্বভাবতই এর ফলে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একক শক্তিশালী প্লাটফর্মে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিতে বৃহৎ পরিসরের ঐক্য ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে জিহাদের ন্যায় মহান ওয়াজিব দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। আর শরিয়তের স্বতঃসিদ্ধ বিধান হলো, অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনে যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়, তা-ও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে যায়।
৩. এসব নেতা কেবল ঐক্যের বিরোধিতা ও জিহাদের পথে বাধা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল। তাদের অতীত ইতিহাসে যেমন এর দৃষ্টান্ত আছে, আছে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও। আর ভবিষ্যতেও আমরা প্রত্যক্ষ করব হিমস ও দামেশকের প্রতিরক্ষায় ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর মোকাবিলায় ক্রুসেডার বাহিনীর সরব উপস্থিতি।
৪. এই প্রক্রিয়ার বিকল্প পদ্ধতি কী হতে পারত?!
বিকল্প হতে পারত শক্তিপ্রয়োগ করে দখল করে নেওয়া। অর্থাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরদুটিকে সসৈন্য ঘেরাও করতে পারতেন। এরপর ভেতর-বাইরের দুই মুসলিম বাহিনীতে তুমুল লড়াই হতো। দু- পক্ষের মুসলিম সৈন্যদের লাশ পড়ত, ইসলামি দুর্গগুলো ধসে পড়ত; নগরপ্রাচীরগুলো বিধ্বস্ত হতো এবং পরিশেষে দু-পক্ষের বুকে দানা বেঁধে থাকত চরম ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা।
এই বিকল্প যদিও বড় কঠিন ও তিক্ত; তবে ফকিহগণ হয়তো একে বৈধ বলে মেনে নিতেন। তবে স্বভাবতই তারা তা মেনে নিতেন একেবারে শেষ পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অন্যান্য সব পন্থার প্রয়োগ ও ব্যর্থতা নিশ্চিত হওয়ার পর। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অনেক মুজাহিদের জীবনে আমরা এভাবে কোনো ইসলামি নগরীকে নিজ রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সামরিক প্রচেষ্টা চালাতে দেখেছি। বিশেষ করে খিলাফতব্যবস্থা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন যেহেতু শতধা বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো সম্পর্কসূত্র ছিল না, তাই সে সময় এ জাতীয় প্রচেষ্টা বেশি দেখা গিয়েছিল।
আমরা যদি এই সামরিক বিকল্প ও তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলকে এক পাশে রাখি, আরেক পাশে রাখি এক ফোঁটা রক্তপাত ছাড়া হামা দখল করে নেওয়ার ঘটনাকে, তাহলে সহজেই এ বিষয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির গৃহীত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা অনুমান করতে পারব।
৫. বুরি বিন তুগতেকিন ও খায়র খান বিন কুরাজার কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রেরিত বার্তার ভাষ্য আমাদের সামনে নেই। আর তাই তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জিহাদের কথা বলেছিলেন, নাকি দ্ব্যর্থবোধক কোনো ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছিলেন, তা আমরা জানি না। এমনও হতে পারে, তিনি সুস্পষ্ট প্রতারণা এড়িয়ে আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একাধিক মর্মের সম্ভাবনা রাখে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
৬. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো কৌশল'। (৩৪৮) আর এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ, জিহাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে সুনিষ্ঠ মুজাহিদদের লড়াই। ইমাদুদ্দিন জিনকি একে এক ধরনের যুদ্ধকৌশল হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন। এটা ছিল ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগবেষণা, যা কখনো ঠিক হয়, কখনো ভুল।
তা ছাড়া তখন তিনি যুদ্ধপরিস্থিতিতে ছিলেন। আর যুদ্ধের এমন কিছু বিশেষ বিধিবিধান আছে, যা শান্তিকালীন পরিস্থিতির বিধিবিধানের তুলনায় একদমই ভিন্ন হয়ে থাকে।
৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব বিন আশরাফকে হত্যার মনস্থ করেন, তখন মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. নবীজিকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি?' নবীজি সম্মতিসূচক উত্তর দিলে তিনি বলেছিলেন, 'তাহলে আমাকে তার সঙ্গে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন।' নবীজি তাকে অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, 'বলতে পারো। ' (৩৪৯)
এরপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা ও কাব বিন আশরাফের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়, যাতে মুহাম্মাদ বিন মাসলামার পক্ষ থেকে বড় ধরনের কৌশল ছিল। উভয়ের কথোপকথন শেষ হয় মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কর্তৃক কাব বিন আশরাফকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
আমার এ বিষয়টি জানা আছে যে, এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কোনো মুসলমান নয়; বরং একজন কাফির ছিল। কিন্তু বিধান তো ব্যাপক। তা ছাড়া এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, এসব নগরীর নেতৃবৃন্দ কাফির ক্রুসেডারদের সঙ্গে সরাসরি ঘৃণ্য সহযোগিতা বিনিময়ে লিপ্ত ছিল।
৮. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্বে সমকালীন বিশিষ্ট ফকিহগণের কাছে সে বিষয়ে শরীয়তের বিধান জিজ্ঞেস করে নিতেন। তৎকালীন ফকিহগণ সম্ভবত এই কৌশলটিকে ক্ষতিকর হিসেবে স্বীকার করলেও এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনাবশ্যক বিবেচনা করলেও চলমান বিশেষ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের চেয়ে কম ক্ষতিকর বিবেচনা করেছিলেন।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, কেবল অনুমাননির্ভর হয়ে তৎকালীন ফকিহগণের প্রতি অপবাদ দেওয়াও ন্যায় ও ইনসাফের দাবি নয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক তো সমকালীন ফকিহদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'এমন ফতোয়া দিয়েছে দ্বীনহীন কিছু লোক, যাদের শরিয়ত ও সামাজিকতা সম্বন্ধে সুষ্ঠু জ্ঞান নেই। তারা একটি অবৈধ বিষয়কে বৈধ ঘোষণা করেছিল।' (৩৫০)
বাস্তবতা হলো, এমনটি হতেই পারে না যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় চেতনাহীন আলিমের কাছ থেকে শরিয়তের সমাধান গ্রহণ করবেন। আর তার রাজ্যের আলিমগণও এমন ছিলেন যে, শরিয়তকে উপেক্ষা করে ইমাদুদ্দিন জিনকির চাহিদার অনুকূলে ফতোয়া দেবেন। বরং সমস্ত ঐতিহাসিকের সাক্ষ্যমতে তার রাজ্যের আলিমগণ ছিলেন সমসাময়িক শ্রেষ্ঠতম আলিম। তাদের ফতোয়া যদি ভুল হয়ে থাকে, সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যেতে পারে যে, তারা কল্যাণ ও সত্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই ইজতিহাদ করেছিলেন; কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।
৯. একজন ব্যক্তির অস্পষ্ট কর্মের ভালো-মন্দ বিবেচিত হয় তার জীবনাদর্শের আলোকে। ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনাদর্শ পর্যালোচনার পর আমরা কি এ কথা বলতে পারি যে, তিনি এমন একজন প্রতারক নেতা ছিলেন, যিনি শরিয়তের সিদ্ধান্তের প্রতি অবহেলা করতেন?! বরং আমরা তো এ ঘটনার আগে-পরে তার পুরো জীবনের কর্মবিবরণীতে দেখতে পাই, তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ চেষ্টায় লড়াই করেছেন এবং এ পথে নিজের চেষ্টা-সাধনা, সময় এমনকি পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তাই আমরা বলতেই পারি যে, তার এই পদক্ষেপ যদি এমন ভুলও হয়ে থাকে, যার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়; তথাপি তিনি এ কাজ ব্যক্তিস্বার্থে নয়: বরং কেবল মুসলমানদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের চিন্তা থেকেই করেছিলেন।
আমরা এ কথা এজন্য বলছি, যাতে কোনো ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকির এ পদক্ষেপকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে যেকোনো স্বার্থে উম্মাহর ঐক্যের দোহাই দিয়ে কোনো ইসলামি অঞ্চলে অভিযান চালাতে না পারে। যারা এভাবে বিভিন্ন জনপদকে নিজের রাজ্যভুক্ত করতে চায়, তাদের জীবনাদর্শ দেখে নির্ণয় করতে হবে যে, তারা কি মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি, না জালিম শাসক তুতুশ বিন আরসালান ও তার পুত্রদের মতো?!
১০. সর্বশেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. ৫২১ হিজরি থেকে ৫৪১ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বছর মুসলমানদের শাসক ছিলেন। এই দীর্ঘ শাসকজীবনে তিনি কয়টি অন্যায় করেছেন?! যদি আমরা তার এ পদক্ষেপকে নিরেট ভুল হিসেবে মেনেও নিই; স্বীকার করে নিই যে, এমন অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ তার জন্য মোটেও ঠিক হয়নি; তারপরও আমরা দেখতে পাব যে, তার পুরো জীবনে এরূপ ঘটনার অস্তিত্ব বিরল। আর মানবজাতির মাঝে নিষ্পাপ নবীগণ ছাড়া কে এমন আছে, যার জীবনে কোনো ভুলত্রুটি নেই?!
একজন ব্যক্তির ভুলের সংখ্যা সীমিত হওয়া তার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। ভুলে গেলে চলবে না, সময়টা ছিল ভয়াবহ ফিতনার যুগ। খিলাফতব্যবস্থা ছিল দুর্বল; কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তদানের ক্ষমতা খলিফার ছিল না। আর তাই নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত ঐক্য প্রচেষ্টায় কিছু সংশয় ও জটিলতার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ, এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাউকে এ বিষয়ে সকল মুসলমানের দায়িত্ব দেওয়া হতো না। ফলে কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রজ্ঞাসুলভ সিদ্ধান্তের বিপরীতও হতো।
এই বিশ্লেষণের পর আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মানবিক পরিসীমা থেকে বের করে দিচ্ছি না। আমরা বলছি না, তিনি ছিলেন অতিমানব, যার কোনো ভুল হতে পারে না! আমরা তার কোনো সুস্পষ্ট ভুল বা অন্যায়কর্মের সাফাইও গাচ্ছি না। আমরা বলতে চাচ্ছি, পরিস্থিতি কঠিন ও জটিল হলে এ জাতীয় বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সময় কঠিন হয়ে যায় এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সর্বাবস্থায় সুফলদায়ক হয় না।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, যিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি চলমান সুকঠিন ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি দেখেছেন, ক্রুসেডাররা মুসলমানদের ঘরেঘরে লুটপাট চালাচ্ছে; দেখেছেন, কিছু মুসলিম নেতা ও ক্রুসেডারদের মধ্যে ঘৃণ্য আঁতাঁত ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তার মতো পরিস্থিতির জলজ্যান্ত সাক্ষী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর ঘটনার শতাব্দীকাল বা কয়েক শতক পরে এসে নিজের কামরায় শান্ত-সুস্থির বসে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও আলোচনা-সমালোচনা করা, ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করা এবং নির্লিপ্তচিত্তে বলে দেওয়া যে, এটি বৈধ আর সেটি অবৈধ; দুয়ের মধ্যে যোজন যোজন তফাত!
কাজেই যিনি বিশ্লেষণ করতে চান, এসব প্রেক্ষাপট সামনে রেখে তারপর বিশ্লেষণ করুন। সঠিক বিশ্লেষণ তো তিনিই করতে পারবেন, মহান আল্লাহ যাকে তাওফিক দেবেন!
টিকাঃ
৩৪৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৮৬৬, ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৩৯, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৬৭৫ ও ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ২৮৩৩।
৩৪৯. কাব বিন আশরাফের হত্যাঘটনার বিস্তারিত পড়ুন: ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৮১১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮০১।
৩৫০. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪২।
📄 কঠিন সংকট!
ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথায় ইমাদুদ্দিন জিনকি ইতিমধ্যে মসুল, আলেপ্পো ও হামা নগরীর শাসনকর্তায় পরিণত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে তখন তার এ শক্তিকে মোটেও অবহেলা করার সুযোগ ছিল না।
এরপর তিনি তার রাজ্যকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে নগরী-তিনটির পারস্পরিক যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে তিনি ৫২২ হিজরি সনের শেষ দিকে (১১২৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে) মসুল ও আলেপ্পোর মধ্যবর্তী সিনজার নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। (৩৫১) এদিকে ইযযুদ্দিন মাসউদ বিন আক সুনকুর আল-বুরসুকির মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বশূন্য হয়ে ক্রুসেডারদের হামলার শিকার হওয়া হাররান নগরীর অধিবাসীরা এ সময় নগরীটিকে জিনকি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার জন্য ইমাদুদ্দিন জিনকিকে আহ্বান জানায়। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ৫২৩ হিজরি সনে (১১২৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন হাররানকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। হাররান যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নবগঠিত রাজ্যটি সার্বিকভাবে নিরাপদ ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। (৩৫২)
ইমাদুদ্দিন জিনকির এরূপ সর্বময় প্রচেষ্টা ও সাধনায় যদিও এ অঞ্চলে এমন এক নতুন ও অদম্য শক্তির উত্থানবার্তা ঘোষিত হচ্ছিল; যা ক্রুসেডারদের আগ্রাসন থেকে মুসলিম জাতিকে উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে; কিন্তু এই নবশক্তির উত্থান সমসাময়িক সকলের জন্য প্রশান্তিদায়ক ছিল না!
খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের সেলজুক শাসক সুলতান সানজার এ সময় অনুভব করেন যে, এই উদীয়মান শক্তিটি একসময় খোদ সেলজুক সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তিনি পারস্য ও ইরাক অঞ্চলের সেলজুক শাসক ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র সুলতান মাহমুদকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে বরখাস্ত করে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন! আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, দুবাইস ছিল বনু মাজিদ গোত্রের নেতা। সে ও তার পুরো গোত্র ছিল শিয়া মতাবলম্বী। নয় বছর পূর্বে ৫১৪ হিজরি সনে সে বাগদাদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহচেষ্টা চালিয়েছিল। (৩৫৩) এ সময় সে সুলতান সানজারের আশ্রয়ে ছিল এবং তার বিশেষ আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিল। সানজার মসুল ও আলেপ্পোতে তাকে বসিয়ে এ অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন। সানজার এ বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছিলেন যে, পূর্ব বিরোধের কারণে আব্বাসি খলিফাও দুবাইসকে নিজের পক্ষে টানতে পারবেন না।
নিঃসন্দেহে এটি ছিল স্বার্থ ও কুপ্রবৃত্তির যুদ্ধ। সুলতান সানজার মুসলমানদের স্বার্থ ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছিলেন না; চিন্তা করছিলেন নিজের স্বার্থের কথা। তাই তিনি সুলতান মাহমুদের কাছে এমন অন্যায় আবদার করে বসেন। সুলতান মাহমুদই ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মসুলের শাসনভার প্রদান করেছিলেন। তিনি তার চাচার মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে সরাসরি তার বিরোধিতা না করে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করতে ইমাদুদ্দিন জিনকিকে ডেকে পাঠান।
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। যে পরিকল্পনা দানা বাঁধছিল, তা হয়তো মুসলমানদের ঐক্যের স্বপ্ন ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ভাবনাতেই সমাপ্তি-রেখা টেনে দেবে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি দ্রুত বাগদাদে পৌঁছে সুলতান মাহমুদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি সুলতানকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের পূর্ণ মেধা ও কূটনৈতিক দক্ষতা ব্যবহার করে এ পদে তাকে বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি এমন কিছু কার্যকারণ উত্থাপন করেন, যেগুলোর কারণে তাকে স্বপদে বহাল রাখা জরুরি ছিল। যথা—
১. তিনি এই দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর কোনো ভুল করেননি। বরং উল্টো এমন কিছু সফলতা এনে দিয়েছেন, যার অতীত দৃষ্টান্ত নেই। তিনি মসুল, আলেপ্পো, হামা, সিনজার, হাররান ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলকে এক পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হয়েছেন।
২. এসব সফলতার সুনাম ও কল্যাণফল মূলত সুলতান মাহমুদই ভোগ করছেন। কারণ, ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নামেই রাজ্য পরিচালনা করছেন।
৩. সুলতান সানজার সুলতান মাহমুদের চাচা হলেও তিনি মূলত এ অঞ্চলে সুলতান মাহমুদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাচ্ছেন না; বরং নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্যই তিনি নিজের অনুগত লোককে মসুলের মসনদে বসাতে চাচ্ছেন। তিনি মূলত সুলতান মাহমুদকে আপন অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই এমনটি করতে চাচ্ছেন। (৩৫৪)
৪. তা ছাড়া ইমাদুদ্দিনের বিকল্প হিসেবে কার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে? দুবাইস বিন সাদাকা! যে ভ্রষ্ট লোকটি ইতিপূর্বে বাগদাদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছিল। অধিকন্তু সে হলো শিয়া মতাদর্শী, আর সেলজুক সাম্রাজ্য আপাদমস্তক সুন্নি মতাদর্শে প্রতিষ্ঠিত।
৫. দুবাইস বিন সাদাকা স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় অভিলাষী একজন লোক। মোটেও সুদূরপরাহত নয় যে, তাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলে সে কিছুদিন পর মসুল ও আলেপ্পোতে সেলজুক বশ্যতামুক্ত স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি করবে। ইতিপূর্বে তো সে একেবারে দারুল খিলাফত বাগদাদেই এমন কিছু করার পাঁয়তারা চালিয়েছিল।
৬. দুবাইস বিন সাদাকাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলে সে অবশ্যই এ মুহূর্তে মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও লক্ষ্য ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দেবে। কেননা, ইতিপূর্বে সে কেবল নেতিবাচক অবস্থানই গ্রহণ করেনি; মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্রুসেডারদের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময়ও করেছে।
মুসলমানদের কল্যাণ ও সুলতান মাহমুদের স্বার্থ রক্ষার এসব সম্মিলিত কার্যকারণের দাবি ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকিকে স্বপদে বহাল রাখা। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বলেছেন, সুলতান মাহমুদ ছিলেন সহনশীল ও প্রজ্ঞাবান একজন শাসক। (৩৫৫) ইমাদুদ্দিন জিনকির দীর্ঘ আলোচনা ও এসব যুক্তি শোনার পর তিনি তাকে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বরং পূর্বের নিয়োগপত্রের সমর্থনে তিনি নতুন আরেকটি নিয়োগপত্র জারি করেন। নতুন নিয়োগপত্রে তিনি ইমাদুদ্দিনকে মসুল, জাযিরা অঞ্চল এবং ইমাদুদ্দিন ইতিমধ্যে শাম অঞ্চলের যেসব নগরী রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, সেসব এলাকার শাসনভার প্রদান করেন। (৩৫৬)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকির সূচিত অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়া ব্যতিরেকেই উম্মাহর ওপর নেমে আসা ভয়াবহ এক সংকটের সমাপ্তি ঘটে।
এ ঘটনা আমাদেরকে আশ্বস্ত করে যে, আল্লাহ এ প্রজন্মের কল্যাণ চান। কারণ, তিনি তাদের হৃদয়ের সততা ও নিষ্ঠার কথা জানতেন। যদি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে অপসারণ করে দুবাইস বিন সাদাকাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হতো, নিশ্চিত করেই জিহাদি আন্দোলন ও জাতি-জাগরণের নবসূচিত উদ্যোগ পুরোপুরি থেমে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই একমাত্র রক্ষাকর্তা।
সুলতান মাহমুদের সমর্থন ও অনুপ্রেরণা সঙ্গে নিয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে মসুলে ফিরে আসেন। খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহও এতে সন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ, খলিফা জানতেন, দুবাইস বিন সাদাকা যদি মসুল ও আলেপ্পোর প্রশাসক হতে পারে, পূর্ব শত্রুতার কারণে নিশ্চিত করেই সে খলিফার জন্য সমূহ সংকট সৃষ্টি করবে। সে ধরনের আশঙ্কা থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকিই তো তাকে মুক্ত করেছেন!
টিকাঃ
০০১. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/৭৭।
৩০২, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৭।
৩৫০. সে সময়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জানতে আরও পড়তে পারেন আল-হুসায়নি কৃত আখবারুদ-দাওলাতিস সালজুকিয়া, পৃষ্ঠা: ৮৮-৯০।
৩৫৪, ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ৫১।
৩৫৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৯।
৩৫৬. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪০ও আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৯।
📄 উরতুক পরিবারের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের সংঘর্ষ
ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলে ফিরে নতুন করে চলমান পরিস্থিতির ওপর নজর বোলান। তিনি অনুভব করেন যে, ইতিমধ্যে তিনি উত্তরে এডেসা ও পশ্চিমে এন্টিয়ক রাজ্যের সীমানার খুব কাছে চলে এসেছেন। এখন ঠিক করতে হবে—কোনটিকে দিয়ে শুরু করবেন তার ক্রুসেডার বিতাড়ন অভিযান।
সন্দেহাতীতভাবেই এডেসা রাজ্য এন্টিয়ক রাজ্যের তুলনায় অনেক গুণ দুর্বল ছিল। এন্টিয়কের কেবল দুর্ভেদ্য দুর্গই ছিল না; ছিল শক্তিশালী নরম্যান যোদ্ধাবাহিনী। ওদিকে এডেসায় ছিল ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের সম্মিলিত বসবাস এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্ক-সংকট। আর্মেনীয়রা ভুলতে পারেনি বল্ডউইনের ঘটানো সেই গণহত্যার কালো ইতিহাস। অপরদিকে এন্টিয়কে ছিল অভিন্ন জাতির সহাবস্থান, যেখানে আধিক্য ছিল নরম্যান ক্যাথলিকদের।
দুই রাজ্যের এসব পার্থক্যের কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এন্টিয়কের পূর্বে তুলনামূলক দুর্বল রাজ্য এডেসায় আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এডেসামুখী অভিযানের পথে বড় একটি বাধা ছিল।
এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল জাযিরা অঞ্চলের উত্তর অংশে ফুরাত নদীর তীর-ঘেঁষে। জাযিরার উত্তর অংশের অন্যান্য নগরী তখন উরতুক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। উরতুক পরিবারের সমকালীন প্রজন্ম ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। তাদের মাঝে সুকমান বিন উরতুক, ইলগাজি বিন উরতুক বা বাল্ক বিন বাহরামের সমজাতীয় কেউ ছিল না। সমকালীন প্রজন্মের উরতুকি নেতৃবৃন্দ ছিল নিতান্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রকৃতির। তারা নিজেদের মাঝে রাজ্য ও জনবল বিভক্ত করে নিয়ে মুসলমানদের দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত করে রেখেছিল। এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, অঞ্চলটি তখন গোটাদশেক আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সবগুলোই ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসার আশেপাশে এবং এডেসা ও ইমাদুদ্দিন জিনকির মাঝে অন্তরায়।
এডেসার ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উরতুকিদের রাজ্য মাড়ানোর ঝুঁকি নিলে ইমাদুদ্দিন জিনকি একাধিক সংকটে পড়ে যাবেন। যেমন:
১. এসব মুসলিম নেতাই হয়তো পেছন দিক থেকে তার ওপর হামলে পড়বে। ইমাদুদ্দিন জিনকিকে তারা ক্রুসেডারদের মতো নিজেদের জন্যও ঝুঁকি মনে করবে।
২. তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করতে পারে। এমনটি ঘটলে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীকে বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যেতে হবে।
৩. ইমাদুদ্দিন জিনকি যদি এডেসায় পরাজিত হন, তাহলে পিছু হটে কোথায় আশ্রয় নেবেন? হাররান, আলেপ্পো বা মসুলে ফিরে আশ্রয় গ্রহণের চিন্তা করলে বিরাট দূরত্বের কারণে সমূহ সংকটের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর তাই ধারেকাছে কোথাও এমন কোনো ঘাঁটি থাকা দরকার, যেখান থেকে তিনি অভিযানে বের হবেন এবং প্রয়োজনে সেখানে ফিরে আসবেন।
৪. অঞ্চলটি ছিল অতি ঘনবসতিপূর্ণ। আর অধিবাসীরা সকলেই ছিল মুসলিম। তাই তাদের শক্তিকে ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত সহায়ক সংযুক্তি বিবেচিত হবে। বিপরীতে তারা যদি তাকে প্রতিরোধ করে এবং তার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়, তাহলে এমন সংকট সৃষ্টি হবে, যার সমাধান অতি কঠিন।
এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা রাজ্যে অভিযান চালানোর পূর্বে এ অঞ্চলটিকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপকে অতি জরুরি বিবেচনা করেন। তিনি অঞ্চলটির পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করতে শুরু করেন এবং মূল ও কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোকে চিহ্নিত করেন।
এ অঞ্চলে গোটাদশেক রাজন্যের অস্তিত্ব থাকলেও মূল ও কেন্দ্রীয় নেতা ছিল তিনজন।
১. উরতুক পরিবারের সদস্য হুসামুদ্দিন তামারতাশ বিন ইলগাজি। আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, তিনি ছিলেন বিলাসী ও আরামপ্রিয় একজন শাসক। (৩৫৭) ক্রুসেডারদের বিতাড়নচিন্তার কোনো স্থান তার মনোজগতে ছিল না। তিনি মারদিনে বাস করতেন। মারদিনের পাশাপাশি আরও কিছু নগরী তার অধিকারে ছিল। সম্ভবত সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল নুসায়বিন (বর্তমান তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত একটি নগরী)।
২. উরতুক পরিবারের আরেক সদস্য রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমান। তিনি ছিলেন হাসানকেইফের আমির। রুকনুদ্দৌলা চূড়ান্ত কঠোর ও রূঢ় স্বভাবের শাসক ছিলেন।
৩. আমিদ নগরীর আমির সাদুদ্দৌলা আবু মানসুর ইকলিদি। সামরিক শক্তিতে তিনি ছিলেন তিনজনের মধ্যে দুর্বলতম। (৩৫৮)
ইমাদুদ্দিন দেখতে পান, তার রাজ্যের সবচেয়ে নিকটতম নগরী হচ্ছে হুসামুদ্দিন তামারতাশ শাসিত নুসায়বিন নগরী। দামেশক নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার স্মরণে ছিল। তিনি জানতেন, শান্তিপূর্ণ সমঝোতা প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর ফলাফল এনে দেয় না। আর তাই বাগদাদ থেকে ফেরার পরই ৫২৪ হিজরি সনের শুরুতে তিনি তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন এবং নুসায়বিন অবরোধ করেন। শাসক হুসামুদ্দিন তামারতাশ তখন মারদিনে অবস্থান করছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর সঙ্গে শক্তির তুলনা করে উরতুকি প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজেদের অসহায় ভাবতে থাকে। তারা দ্রুত হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠায়। জবাবে হুসামুদ্দিন বার্তা প্রেরণ করেন যে, তিন দিনের ভেতর তিনি নুসায়বিনে সেনাসাহায্য পাঠাবেন। অথচ নগরদুটির মাঝে দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারেরও কম। হুসামুদ্দিনের ফিরতি বার্তাই তার প্রস্তুতিহীনতা ও অদূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করছিল। আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় বার্তাবাহী কবুতরের মাধ্যমে পাঠানো হুসামুদ্দিনের বার্তাটি এসে পড়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে! তিনি বার্তার শব্দে রদবদল ঘটান এবং তিন দিনকে বিশ দিন বানিয়ে দিয়ে কবুতরটি ছেড়ে দেন! তিনি আশা করছিলেন, এর ফলে নগরীটির প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনারা প্রতিরোধের বিষয়ে নিরাশ হয়ে পড়বে এবং শান্তি প্রত্যাশায় নগরদ্বার খুলে দেবে। বাস্তবেও তা-ই ঘটে। ইমাদুদ্দিন জিনকি অনায়াসে বিনা রক্তপাতে নগরটিকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। (°৫৯)
এ সংবাদ হুসামুদ্দিন তামারতাশের কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত উরতুক পরিবারের অন্যান্য নেতার সঙ্গে আলোচনা করে রুকনুদ্দৌলা দাউদ বিন সুকমানের নেতৃত্বে আবু মানসুর ইকলিদি ও দাউদের মিত্র অন্যান্য তুর্কমেন প্রশাসকসহ সহযোগী সবাইকে একত্র করেন। সম্মিলিত বাহিনী 'দারা' নগরীতে সমবেত হয়। বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে নিজ বাহিনীর চার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই তাদের মোকাবিলায় ছুটে যান। এই সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়েই তিনি অল্প সময়ের যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। বিজয়যাত্রা অব্যাহত রেখে তিনি দারা ও সারজা দুর্গসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দুর্গ অধিকার করেন। (°৬০)
মাত্র চার হাজার সৈন্যের জিনকি বাহিনীর কাছে উরতুকি বাহিনীর এমন শোচনীয় পরাজয় এ কথাই প্রমাণ করে যে, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য যেসব মৌলিক উপাদান থাকা জরুরি, তা মোটেও সমকালীন উরতুকি নেতৃবৃন্দের মাঝে ছিল না। তারা প্রত্যেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একেকটি ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের শাসক-রাজাধিরাজ জ্ঞান করত এবং উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে সম্ভাব্য অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করে দিত।
উরতুকিদের সঙ্গে ইমাদুদ্দিনের এই প্রথম সংঘাত অভাবনীয় ও দ্রুত সফলতা বয়ে আনে। এটি ছিল পুরো জাযিরা অঞ্চলকে ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত করার নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা। সামান্য প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসহ পুরো অঞ্চলই এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির পদানত হয়ে যেত, যদি না সেই মুহূর্তেই এন্টিয়ক থেকে উড়ে আসত এক আকস্মিক সংবাদ!
টিকাঃ
৩৫৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২৭।
৩৫৮. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
°৫৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৬-৩৭।
°৬০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৫।