📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মসুলের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন

📄 মসুলের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন


ইমাদুদ্দিন জিনকি তার দায়িত্ব পালন শুরু করেন মসুলে পৌঁছার পূর্বেই! বাগদাদ থেকে মসুল অভিমুখে রওনা হওয়ার সময়ই তিনি জানতেন, আক সুনকুরের শিশুপুত্রের তত্ত্বাবধায়ক সেজে বসা জাওলি হয়তো মসুলের কর্তৃত্ব তার হাতে সমর্পণ করবেন না; বরং আগের বিভিন্ন নেতার মতো সেলজুক সুলতানের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে মসুলকে স্বাধীন রাজ্য ঘোষণা করবেন এবং নগরদ্বার বন্ধ রেখে ভেতরে আশ্রয় নেবেন। সেক্ষেত্রে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রয়োজন হবে এমন কোনো নিরাপদ ঘাঁটি, যেখানে আশ্রয় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে। এ কারণে তিনি বিকল্প পরিকল্পনাও গ্রহণ করেন এবং তার সঙ্গী সৈন্যদের নিয়ে বাওয়াজিয নগরী অভিমুখে রওনা হন। নগরীটির অবস্থান ছিল মসুলের দক্ষিণে তিকরিতের কাছে। ইমাদুদ্দিন জিনকি বাওয়াজিযে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নগরীটিকে তার সেনাঘাঁটি নির্বাচন করেন। এখন জাওলি যদি মসুলের নিয়ন্ত্রণ সমর্পণে অস্বীকৃতি জানান, তিনি বাওয়াজিয থেকে মসুলে অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করতে পারবেন। আর জাওলি যদি স্বেচ্ছায় মসুলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেন অথবা তিনি যদি শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে মসুলের কর্তৃত্ব লাভ করতে পারেন, তাহলে বাওয়াজিয সেনাঘাঁটি মসুলের দক্ষিণ সীমানার নিরাপত্তায় সহায়তা করবে।
বাওয়াজিযে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি যাত্রা অব্যাহত রেখে জাযিরা ইবনে উমরে পৌঁছে অঞ্চলটিকে তার কর্তৃত্বভুক্ত করে নেন। মসুল থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত জাযিরা ইবনে উমর অঞ্চল ছিল সামরিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ। মসুলের প্রয়াত প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকির জনৈক ক্রীতদাস সেখানে স্বাধীন শাসন পরিচালনা করছিল। আর তাই মসুলের নিরাপত্তার স্বার্থে অঞ্চলটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি ছিল। এরপর আমাদের বীরপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকি সরাসরি মসুলের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
জাওলি তখন নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করছিলেন। জনসমর্থন বা সেলজুক সালতানাতের স্বীকৃতি কিছুই তার পক্ষে নেই। তাই তিনি ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মসুলে প্রবেশে বাধা দিতে দ্বিধায় পড়ে যান। ইমাদুদ্দিন জিনকি জাওলির চিন্তার গতিপ্রকৃতি ধরতে পারছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, জাওলির মসুলে আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠার মতো যথেষ্ট শক্তি নেই। অবশ্য জাওলি চাইলে তাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে তার সময়, জনবল ও সম্পদের কিছু ক্ষতিসাধন করতে পারবেন। তাই তিনি জাওলিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করে শুরুতেই তার কাছে দূত প্রেরণ করেন এবং তার কর্তৃত্ব মেনে নিলে জাওলিকে রাহবা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জায়গির প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। (৩২৮) রাহবা ছিল শামের অন্যতম সম্পদশালী অঞ্চল। অঞ্চলটির অবস্থান ছিল ক্রুসেডারদের ঘাঁটিসমূহের কাছে। এর মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকি এক ঢিলে একাধিক পাখি শিকারের পরিকল্পনা করেন। জাওলি তার প্রস্তাব মেনে নিলে তিনি বিনা যুদ্ধে নিরাপদে মসুলে প্রবেশ করতে পারবেন এবং জাওলিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্বে কাজে লাগাতে পারবেন। অধিকন্তু জাওলি তার পক্ষের শক্তিতে পরিণত হবেন। শুধু তা-ই নয়; তিনি জাওলির সামরিক শক্তিকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবেন। এটিই ছিল ইমাদুদ্দিনের মূল লক্ষ্য। সবচেয়ে বড় কথা, ইমাদুদ্দিন জিনকির এই আচরণ তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন সবাইকে তার সঙ্গে কাজ করার এবং তার প্রতি আস্থা রাখার সাহস জোগাবে। সবাই প্রত্যক্ষ করবে যে, তিনি তার বিরোধীদের দমন করতে চান না; বরং তাদেরকে দান-অনুদান ধন্য করেন এবং তার প্রশাসনে মর্যাদাপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদান করেন। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে তিনি সকলের হৃদয় আকর্ষণ করতে সক্ষম হবেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির এই উদার প্রস্তাবে জাওলি নতুন করে তার ক্ষমতালিপ্সা পূরণের পথ খুঁজে পান। তিনি সহজেই এতে সম্মতি প্রকাশ করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতে মসুলে প্রবেশ করেন। তার সব সময়ের নীতি ছিল যথাসম্ভব রক্তপাত এড়িয়ে কৌশলে উদ্দেশ্য সাধন করা।
মসুলে প্রবেশ করেই ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীটির অভ্যন্তরীণ সংস্কার শুরু করেন। তিনি নাসিরুদ্দিন জাকারকে মসুলের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রদান করেন। (৩২৯) পদটিকে মসুলের গভর্নর পদ হিসেবে অভিহিত করা যায়। নাসিরুদ্দিন ছিলেন শক্তিশালী ও দৃঢ়সংকল্প একজন ব্যক্তি। মসুলের তৎকালীন পতনোন্মুখ নিরাপত্তা পরিস্থিতির সংস্কারের জন্য তিনি ছিলেন যথাযোগ্য ব্যক্তি। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেন। যেমন: মসুলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; দুর্গ, নগরপ্রাচীর ও পরিখাগুলো মজবুত করা; মসুলের জনপ্রতিনিধি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন গোত্রপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা; সচিবালয় ও দাফতরিক বিভিন্ন বিভাগের পুনঃবিন্যাস ইত্যাদি। ইমাদুদ্দিন জিনকি মন্ত্রণালয় ও দাফতরিক কর্মকাণ্ডের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট নির্ধারণ করেন। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে সহজ, গতিশীল ও বিন্যস্ত কর্মসম্পাদন নিশ্চিত হয়। তিনি দাফতরিক দায়িত্বশীলদের জনগণের সঙ্গে সদাচরণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ঐতিহাসিক আবু শামা ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনে দাফতরিক দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের সম্পর্কে বলেন, 'তাদের আচরণে মনে হতো, তারা যেন জনগণের পরিজন!' (৩৩০)
তিনি সামরিক বিভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানিকে। (৩০১) সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ সেই দূতদ্বয়ের একজন, জাওলি যাদেরকে ইতিপূর্বে সুলতান মাহমুদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার সঙ্গী অপর দূতের সঙ্গে পরামর্শ করে জাওলির প্রত্যাশার বিপরীতে সুলতান মাহমুদের কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির নাম প্রস্তাব করেছিলেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির চারিত্রিক প্রশংসা করতে গিয়ে যিনি নিজের পদ ও পদবি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, তিনি যে অত্যুচ্চ নিষ্ঠা ও নির্মোহ চেতনার অধিকারী, ইমাদুদ্দিন জিনকি তা যথার্থই অনুভব করেন। তদুপরি সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ছিলেন ঝানু সমরবিদ ও কুশলী যোদ্ধা।
ইমাদুদ্দিন জিনকি অপর দূত বাহাউদ্দিন শাহরাযুরিকেও তার প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান করেন। তিনি তাকে কাজি পদে অধিষ্ঠিত করে বিচারবিভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন। (৩০২) শাহরাযুরির পুরো পরিবার ব্যাপকভাবে অত্যুচ্চ জ্ঞান-যোগ্যতা এবং বিশেষভাবে আইন ও বিচার বিষয়ক যোগ্যতার কারণে প্রসিদ্ধ ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নিষ্ঠা ও নির্মোহতা সম্পর্কেও নিশ্চিন্ত থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই পদের জন্য অন্যদের বাদ দিয়ে তাকে নির্বাচন করেন। রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বাহাউদ্দিন শাহরাযুরির অধীনস্থ কাজিদের নির্বাচনেও ইমাদুদ্দিন তার মতামতের ওপরই নির্ভর করেন।
এভাবে জনপ্রশাসন, সামরিক বিভাগ ও ধর্মীয় বিভাগ-সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি বিভাগে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজ্যের মৌলিক কাঠামোর স্থিতিশীলতার বিষয়ে নির্ভার ও নিশ্চিন্ত হন।
এরপর তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে যোগ্য ও প্রাজ্ঞ আলিমদের আহ্বান করেন এবং তাদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেন। জনগণকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান, জিহাদি চেতনা ও জিহাদের সুমহান দায়িত্ববোধ তৈরিতে ব্যাপক পরিসরে আলোচনা, জনসাধারণকে মুসলমানদের অতীত বিজয়ের ইতিহাস শোনানো, আল্লাহ ও পরকালমুখী করা, নতুন প্রজন্মকে ত্যাগ ও সাধনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের কর্ম-উদ্দেশ্যকে আল্লাহমুখী করার দায়িত্ব আলিমসমাজের কাঁধে অর্পিত হয়। (300) এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নতুন রাজ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার এমন এক জাগরণের সূচনা করেন, যা অনেক রাষ্ট্রনায়কের কর্মনীতিতে উপেক্ষিতই থেকে যায়। তিনি এর মাধ্যমে জনসাধারণের স্বপ্ন ও লক্ষ্যের গতিপথ পরিবর্তন করে তার মূল পরিকল্পনা 'ইসলামি ভূখণ্ড থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়ন' অভিমুখে পরিচালিত করতে শুরু করেন।
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পুনঃবিন্যাস করেন এবং সুদৃঢ় ভিত্তিনির্ভর একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মসুলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকি এবার ক্রুসেডারদের সামনে ইস্পাতকঠিন প্রাচীরের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম বৃহৎ পরিসরের একক ইসলামি কাঠামো প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে মসুলের বাইরে দৃষ্টি দিতে শুরু করেন।
যেহেতু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন বাস্তববাদী; নিজের ও শত্রুর শক্তির মাত্রা তিনি অনুমান করতে পারতেন; তাই তিনি অনুধাবন করেন যে, এ মুহূর্তে তিনি নিকটস্থ ক্রুসেড রাজ্য এডেসার সঙ্গে লড়াই করতে সক্ষম নন। তা ছাড়া এ সময় তিনি মসুলের আশপাশের বিক্ষিপ্ত মুসলিম রাজ্যগুলোকে একীভূত করার জন্য অন্যান্য ব্যস্ততামুক্ত থাকতে চাচ্ছিলেন। সার্বিক বিবেচনায় তিনি দুই বছরের জন্য এডেসার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন। (৩০৪) এ বিষয়টি তার চিন্তা-চেতনায় একেবারেই সুস্পষ্ট ছিল যে, ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হবে সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। যে শত্রুপক্ষ মুসলমানদের ভূখণ্ড জবরদখল করে রেখেছে, তাদের সঙ্গে তিনি কোনো অবস্থাতেই স্থায়ী শান্তিচুক্তি করতে পারেন না। ইমাদুদ্দিন জিনকির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, তিনি যুগপৎ সামরিক প্রজ্ঞা ও ধর্মীয় প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। এ বিষয়টিই তাকে সমকালীন অন্যান্য শাসকের তুলনায় আলাদা করে দিয়েছিল।

টিকাঃ
৩২৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪২-২৪৩।
৩২৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫।
৩৩০. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/ ১৬৩।
৩০১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা : ২৫৮।
৩০২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
300. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১৩৩-১৩৪।
৩০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৪ ও Setton Op.cit 1, p. 429.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 জিনকি রাষ্ট্রে আলেপ্পোর অন্তর্ভুক্তি

📄 জিনকি রাষ্ট্রে আলেপ্পোর অন্তর্ভুক্তি


এডেসার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের পরই ইমাদুদ্দিন জিনকি বৃহৎ নগরী আলেপ্পোকে তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। আমরা পূর্বেও আলেপ্পোর সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও জনশক্তিগত গুরুত্বের বিষয়ে আলোচনা করেছি। তা ছাড়া ইতিপূর্বে আক সুনকুর আল-বুরসুকি যখন প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখনও আলেপ্পো সেলজুক সুলতান মাহমুদের অধীনে মসুলের সঙ্গে একীভূত ছিল। সুতরাং উভয় নগরীর একীভূতকরণ ছিল সম্পূর্ণই যৌক্তিক ও আইনসংগত। মসুলের সঙ্গে আলেপ্পোর সংযুক্তিতে সেখানে কোনো বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কাও ছিল না। অধিকন্তু আলেপ্পোতে ইমাদুদ্দিন জিনকির জনসমর্থনও ছিল শক্তিশালী। কারণ, আলেপ্পোবাসীর হৃদয়জগতে তখনও তাদের প্রয়াত ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক ও ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের স্মৃতি জাগ্রত ছিল; যিনি চৌত্রিশ বছর পূর্বে আলেপ্পোর প্রতিরক্ষা করতে গিয়ে তুতুশ বিন আলপ আরসালানের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
অবশ্য আলেপ্পোকে মসুলের সঙ্গে একীভূত করার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ইমাদুদ্দিন জিনকি সেদিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে দুটি মৌলিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন।
প্রথম পদক্ষেপ মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। ইতিপূর্বে তিনি বাওয়াজিজ ও জাযিরা ইবনে উমরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মসুলের দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করেছিলেন। এখন উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তিনি নিশ্চিন্তে পশ্চিমে আলেপ্পো অভিমুখে অগ্রসর হতে পারবেন।
মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে বিভিন্ন কুর্দি গোত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কুর্দি গোত্রগুলোর মধ্যে মসুলের তুলনামূলক নিকটবর্তী এলাকায় ছিল হামিদিয়া ও হাকারিয়া গোত্রের প্রতিপত্তি। তৎকালে গোত্রদুটি বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল তৈরি করে মসুলের উত্তর সীমান্তের বিভিন্ন গ্রাম ও ক্ষেত-খামারে হামলা চালাত। এর মাধ্যমে তারা স্থানীয় কৃষক ও মসুলের জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল। তাই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে সেদিকে রওনা হন। যদিও তার নিয়মিত বাহিনী এবং এসব বিচ্ছিন্ন কুর্দি গোত্রের শক্তির মাঝে যোজন যোজন তফাত ছিল; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকির সারা জীবনের নীতি ছিল, তিনি তার চারপাশের প্রতিটি শক্তি দ্বারা উপকৃত হতে চেষ্টা করতেন। ইতিপূর্বে যেমন তিনি জাওলিকে তার স্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন, এবার তিনি সম্ভব হলে কুর্দিদেরকেও তার নবগঠিত রাজ্যের কল্যাণে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এসব গোত্রের নেতিবাচক অতীত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তিনি এ কারণেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, তিনি সর্বদাই ছিলেন সংস্কার ও ঐক্যের পক্ষে সচেষ্ট।
ইমাদুদ্দিন জিনকি কুর্দি হামিদিয়া গোত্রের নেতা ঈসা হামিদির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি মসুল রাজ্যের আনুগত্য স্বীকারের বিনিময়ে ঈসা হামিদিকে কুর্দিদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং তার ক্ষমতা ও সম্পদ তার হাতেই ছেড়ে দেন। (৩৫) আনুগত্য স্বীকারের অনিবার্য দাবি এই ছিল যে, ভবিষ্যতে তার গোত্র আর মসুলে হামলা চালাবে না; বরং জটিলতর পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে। ঈসা হামিদি ইমাদুদ্দিন জিনকির শক্তি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। যদিও এসব গোত্র ছিল অনেকটা মিলিশিয়া বাহিনীর মতো; কিন্তু তারা অনুভব করতে পেরেছিল যে, অন্তত চলমান পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির ক্ষমতার সামনে নতি স্বীকার করে নেওয়াই তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। এভাবে হামিদিয়া কুর্দি গোত্রের শক্তিকে মসুলের সঙ্গে মিলিত করা হয় বা নিদেনপক্ষে নিরপেক্ষ করে ফেলা হয়।
হামিদিয়া গোত্রের সঙ্গে সফল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে ইমাদুদ্দিন জিনকি হাকারিয়া গোত্রের বিষয়ে মনোযোগী হন। তিনি গোত্রটির নেতা আবুল হাইজা আল-হাকারির সঙ্গে বৈঠক করে তার সঙ্গেও একই চুক্তি করেন। এর ফলে মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। (৩৩৬)
এভাবে ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মসুল ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হন। এখন তিনি নিশ্চিন্তে আলেপ্পোর বিষয়ে পরিকল্পনা করতে পারবেন।
মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির পশ্চিমে আলেপ্পো অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে বাস্তবায়িত প্রথম পদক্ষেপ।
তার এ সংক্রান্ত দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল 'আলেপ্পো গমন প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য সামরিক ও প্রচারণা প্রস্তুতি'। তার লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে সম্ভাব্য সংঘাত পরিস্থিতি ও প্রচুর মুসলমানের জান-মালের ক্ষতি পরিহার করা।
প্রচারণা প্রস্তুতি হিসেবে তিনি তার পক্ষ হতে কয়েকজন দূতকে আলেপ্পোতে প্রেরণ করেন। তারা চুপিসারে আলেপ্পোতে প্রবেশ করে এবং মসজিদ ও বিভিন্ন জনসমাগমের স্থানে উপস্থিত হয়ে জনসাধারণকে গুরুত্বপূর্ণ আলেপ্পো নগরীর শাসক পদে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে বোঝাতে থাকে। তারা জনগণের সামনে যেসব বিষয় যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে তা হলো—সমকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি সেলজুক সুলতান মাহমুদ ইমাদুদ্দিন জিনকিকেই তাদের শাসক হিসেবে পছন্দ করেছেন। তিনি একজন দৃঢ় চেতনাসম্পন্ন মুজাহিদ নেতা, যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারবেন। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ কুশলী শাসক, যিনি আলেপ্পোতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন এবং প্রত্যেকের হৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারবেন। তিনি সেই হাজিব আক সুনকুরের সুযোগ্য পুত্র, যার প্রতি আলেপ্পোবাসী উত্তরাধিকারসূত্রে হৃদ্যতা ও অনুরাগ পোষণ করে আসছে। (৩৩৭)
এই প্রচারণামূলক প্রস্তুতির পেছনে ইমাদুদ্দিন জিনকির লক্ষ্য ছিল, আলেপ্পোতে তার আগমন যেন গণদাবিতে পরিণত হয়। তিনি জানতেন, কুতলুগ আবেহ ও ইবরাহিম বিন রিজওয়ান দুজনই দুরাচারী আর সুলায়মান বিন আবুদল জাব্বার একেবারেই দুর্বল; আলেপ্পোবাসী তাদের কাউকেই নেতা হিসেবে পছন্দ করে না। বিকল্প হিসেবে যদি ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তিকে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, নিঃসন্দেহে তারা একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করবে।
তার এ উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হয়। দূত ও আহ্বায়কগণ জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে সবাইকে সচেতন করে তোলে। আলেপ্পোবাসী অধীর আগ্রহে সেই দিনটির প্রতীক্ষায় থাকে, যেদিন ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদের মাঝে আবির্ভূত হবেন।
অপরদিকে সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে তিনি তার সেনাপ্রধান সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানিকে প্রেরণ করেন। সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ আলেপ্পোর আশেপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং আলেপ্পোর উচ্চপদস্থ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে পত্রবিনিময় করে মহান নেতা ইমাদুদ্দিন জিনকির আগমন-উপযোগী পরিবেশ প্রস্তুত করেন। (৩৩৮)
অবশেষে ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন নিশ্চিন্ত হন যে, আলেপ্পোর পরিস্থিতি অনুকূল হয়ে গেছে, তখন তিনি তার বাহিনীর শক্তিশালী একটি রেজিমেন্ট নিয়ে পশ্চিমে আলেপ্পো অভিমুখে রওনা হন। যদি কোনো কারণে আলেপ্পোতে প্রবেশের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন প্রত্যাবর্তন পথ নিরাপদ রাখতে তিনি পথে আলেপ্পোর সরাসরি পূর্বে অবস্থিত মানবিজ ও বিজায়া (B'zaah / Bizeaa) নগরীকে তার রাজ্যভুক্ত করে নেন। এরপর তিনি আলেপ্পোর কাছাকাছি পৌঁছান। আর তখনই ঘটে এক আকস্মিক আনন্দঘন ঘটনা।
আলেপ্পোর জনসাধারণ ততক্ষণে নতুন নেতা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে উষ্ণ সংবর্ধনার মাধ্যমে বরণ করে নিতে এবং তার প্রতি নিজেদের নিঃশর্ত আনুগত্য ঘোষণা করতে নগরীর বাইরে চলে এসেছে! একদল দুষ্কর্মার দুঃশাসনে তারা সত্যিই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে জনতার এমন অভাবনীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের পর ইবরাহিম বিন রিজওয়ান ও সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বারের সামনে বিনা যুদ্ধে পলায়ন ব্যতীত ভিন্ন কোনো পথ খোলা ছিল না। অপরদিকে কুতলুগ আবেহকে বিক্ষুব্ধ জনগণ ধরে ফেলে এবং ক্ষমতার জোরে ইতিপূর্বে আমজনতার রক্ত প্রবাহিত করার যথার্থ শাস্তি হিসেবে সবাই মিলে তাকে মেরে ফেলে। (৩৩৯)
এভাবে সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতে, জনগণের উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরিত হয়ে ইমাদুদ্দিন আলেপ্পোতে প্রবেশ করেন। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুই নগরী মসুল ও আলেপ্পো একীভূত হয়। এর মাধ্যমে কেবল এ অঞ্চলে ইসলামি শক্তির শক্তিমত্তাই বৃদ্ধি পায়নি; বরং ক্রুসেড রাজ্য এডেসা শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের অন্যান্য ক্রুসেড রাজ্য থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। (৩৪০) নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি ভবিষ্যতে এডেসার শক্তি ও সামর্থ্যকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করবে। মসুলের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র নয় মাসের মাথায় ৫২২ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে (১১২৮ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে) ইমাদুদ্দিন জিনকি আলেপ্পোতে প্রবেশ করেন। (৩৪১) অর্থাৎ অভাবনীয় স্বল্পতম সময়ে তার এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকি আলেপ্পোতে প্রবেশ করেই এক অভিনব রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি আলেপ্পোর সাবেক শাসক রিজওয়ান বিন তুতুশের কন্যা খাতুনকে বিয়ে করেন। (৩৪২) এ বিয়ের পেছনে মূলত রাজনৈতিক চিন্তাধারা কার্যকর ছিল। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি রিজওয়ান-পরিবার ও রিজওয়ান-সংশ্লিষ্টদের ক্রোধ প্রশমিত করতে পারবেন। ভুলে গেলে চলবে না, রিজওয়ান ৪৮৭ হিজরি থেকে ৫০৭ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বছর আলেপ্পো শাসন করেছেন। আলেপ্পোতে তার পরিবারের যেমন মজবুত অবস্থান ছিল, তার সম্পর্কের পরিধিও ছিল অতি বিস্তৃত। পাশাপাশি এর মাধ্যমে রিজওয়ান-পুত্র ইবরাহিমকে শান্ত রাখা যাবে, যিনি কদিন আগেও আলেপ্পোর শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং ইমাদুদ্দিন জিনকির আগমনে ভীত হয়ে পালিয়ে নুসায়বিনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। (৩৪৩)
সে যুগে শাসক ও রাজন্যবর্গ নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করতে মিত্রদের সঙ্গে এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলত। এর ফলে মিত্রতা আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হতো কিংবা স্বাভাবিক শত্রুতা দূর হয়ে যেত। ইমাদুদ্দিন জিনকিও এই নীতি অবলম্বন করেন। তার এই পদক্ষেপ বেশ ভালো ফল বয়ে আনে। পরবর্তী সময়ে কখনো আলেপ্পোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি।

টিকাঃ
০০৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৪।
০০৬, প্রাগুক্ত ৯/২৭৫।
৩০৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৭, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/৪৩৭ ও সুহাইল যাক্কার, আল-হুরূবুস সালিবিয়্যাহ, ২/৬৭৮।
০০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৭।
৩৩৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৭।
৩৪০. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১০১।
৩৪১, ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৪২।
৩৪২. প্রাগুক্ত, ২/২৪৪।
৩৪৩. প্রাগুক্ত, ২/২৮০।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিনের কূটকৌশল!

📄 ইমাদুদ্দিনের কূটকৌশল!


ইমাদুদ্দিন জিনকির আলেপ্পো প্রবেশের সময়ই বা এর সামান্য পূর্বে ৫২২ হিজরি সনেই ইন্তেকাল করেন দামেশকের অধিপতি তুগতেকিন। ৪৯৭ হিজরি থেকে ৫২২ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর তিনি দামেশক শাসন করেন। তার অসিয়ত অনুযায়ী এরপর দামেশকের মসনদে আরোহণ করেন তার পুত্র বুরি বিন তুগতেকিন। (৩৪৪) আসুন, তুগতেকিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে আমরাও নতুন করে নজর বোলাই দামেশকের নথিপত্রে!
নিঃসন্দেহে দামেশক পুরো শাম অঞ্চলের সর্ববৃহৎ নগরী এবং এ অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহে অন্যতম প্রভাবক শক্তি। আপন জনশক্তি, ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও সামরিক সামর্থ্যের কারণে নগরীটি মুসলমানদের যেকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের ভূমিকা রাখে। সার্বিক পরিস্থিতি শোধিত, সুন্দর ও শক্তিশালী থাকলে দামেশক চলমান সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক শক্তি বিবেচিত হয়; বিপরীতে দামেশক-পরিস্থিতি কলুষিত ও দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বিষয়টি আমরা মোটেও উপেক্ষা করতে পারি না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যেহেতু ক্রুসেডারদেরকে ইসলামি ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত করার ন্যায় একটি বৃহৎ ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা লালন করতেন, তাই স্বভাবতই দামেশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরী তার কর্মপরিকল্পনায় বিশাল স্থানজুড়েই ছিল। তা ছাড়া শামের মধ্যবিন্দুতে অবস্থানের কারণে দামেশক হতে পারত এন্টিয়ক, ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসে অভিযানে গমন ও প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত সামরিক ঘাঁটি।
আর তাই ক্রুসেডার বিতাড়ন পরিকল্পনা সফলভাবে আঞ্জাম দিতে হলে এই পুরো অঞ্চলের শক্তিকে একীভূত করার পদক্ষেপে দামেশককেও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি ছিল। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তায় ছিল; ছিল তার পরে একই দায়িত্ব পালনকারী নুরুদ্দিন মাহমুদ ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবির চিন্তাজগতে; বরং সালাহুদ্দিন-পরবর্তী সময়ে আইয়ুবি ও মামলুক সাম্রাজ্যের অন্যান্য শাসকের চিন্তাজগতেও। এমনকি আমরা মনে করি, আমাদের বর্তমান যুগ পর্যন্ত প্রতিযুগের শাসক-প্রশাসকদের কাছে দামেশকের গুরুত্ব ছিল-আছে-থাকবে। কারণ, দামেশক এমন গুরুত্বপূর্ণ ও উপযুক্ত একটি কেন্দ্র, যাকে উপেক্ষা করা মোটেই সম্ভব নয়।
কিন্তু অতি পরিতাপের বিষয়, এমন নানামাত্রিক গুরুত্ব ও প্রভাবের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও শাম ও ফিলিস্তিনে ক্রুসেডাররা চেপে বসার সেই যুগসন্ধিক্ষণে দামেশক যেকোনো ইসলামি ঐক্য পরিকল্পনার সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দায়িত্ব পালন করত!
এমন ঘনঘোর অমানিশাকালে দামেশকের জনগণের পশ্চাৎপদতার মৌলিক কার্যকারণগুলো আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। কেন তারা কোনো মৌলিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি, কেন কোনো সংহত ইসলামি জাগরণ তাদের দ্বারা সম্ভব হয়নি—তা-ও আমরা বলেছি। এর নেপথ্য কারণ ছিল এ অঞ্চলে শতাব্দীকালের অধিক সময় উবায়দিদের অপশাসন, তারপর জালিম তুতুশ ও তার পুত্র দাক্কাকের দুঃশাসন। দাক্কাকের পরবর্তী শাসক তুগতেকিন যদিও পূর্বসূরিদের তুলনায় ব্যতিক্রম ছিলেন, কিন্তু তিনিও ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে উম্মাহর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দানকারী মহৎপুরুষ ছিলেন না। এর অন্যতম প্রমাণ, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তিনি ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতেও দ্বিধা করেননি।
দামেশকের একটি বড় সমস্যা এই ছিল যে, যিনিই দামেশকের ক্ষমতা লাভ করতেন, তিনি নিজেকে স্বাধীন-স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবতেন। এর কারণ হলো, দামেশক ছিল বৃহৎ, বিস্তৃত, ঐতিহ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি নগরী। সবকিছু মিলে সেখানকার সামাজিক পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, দামেশকের শাসক অন্যের আনুগত্য বা বশ্যতা স্বীকারের চিন্তাও করতেন না। তিনি তো দামেশকের 'সম্রাট'! তিনি কীভাবে অন্যের অধীনস্থ রাজন্য হবেন; তা সেই 'অন্য' যে কেউ হন না কেন! এই চিন্তাগত দীনতা যেমন তুগてকিনের মধ্যে ছিল; ছিল পরবর্তী সময়ে তার পুত্রদের মধ্যেও।
সঙ্গে এ তথ্যটিও যুক্ত করুন যে, তুগতেকিন ছিলেন এ অঞ্চলের অন্যান্য বৃহৎ শাসকপরিবার হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক তুর্কি পরিবারের সদস্য। তিনি না সেলজুক ছিলেন, না আব্বাসি; আর না বনু উকায়ল, বনু মিরদাস, বনু মুনকিযের মতো এমন কোনো আরব পরিবারের সদস্য, যাদের এ অঞ্চলে দীর্ঘ শাসন-ইতিহাস আছে। ফলে তুগতেকিন কার্যত দামেশকের পরিসরেই সংকুচিত হয়ে থাকতেন। অন্য কোনো নগরীতে তার কোনো সহযোগী ছিল না। এটি ছিল তুগতেকিনের অন্যতম বৃহৎ সমস্যা। তিনি দামেশকের মতো শক্তিশালী নগরীর অধিকর্তা হয়েও অন্য কোনো নগরীকে আপন রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারতেন না; পারলেও নিতান্ত সাময়িক সময়ের জন্য। তাই তিনি কেবল দামেশক নিয়েই তুষ্ট ছিলেন। আমরা প্রত্যক্ষ করব, পরবর্তীকালে তার পুত্ররাও একই মানসিকতা লালন করবে। পিতার মতো তারাও দামেশকে নিজেদের শাসনক্ষমতা স্থায়ী করার মানসে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণচিন্তা মাথা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখবে! (৩৪৫)
ইমাদুদ্দিন জিনকি এ সবকিছুই জানতেন ও বুঝতেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের লক্ষ্যে যে কাঙ্ক্ষিত ঐক্য প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তাতে দামেশককেও যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। মসুল ও আলেপ্পোর সঙ্গে দামেশক যুক্ত হলে নিঃসন্দেহে সম্মিলিত এ শক্তিতে ভাঙন ধরানো সহজ হবে না।
একটানা পঁচিশ বছরের শাসন শেষে তুগতেকিনের মৃত্যুর পর দামেশক স্বভাবতই শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্য হারাতে বসেছিল। নতুন শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের দামেশকের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার মতো উপযুক্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। আর তাই দামেশককে আপন রাজ্য-পরিসরে যুক্ত করতে চাইলে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য কালবিলম্ব না করে তখনই চেষ্টা করা জরুরি ছিল।
এর সঙ্গে এ বিষয়টিও যুক্ত করা যেতে পারে যে, দামেশক তখন দুষ্ট বাতিনিদের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল। পুরোটা জীবন তুগতেকিন তাদেরকে সমীহ করে চলতেন। নিজের নিয়ন্ত্রণ-রশিও তিনি তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ফলে তাদের হিংস্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে; দিন-দিন বেড়েছে আতঙ্ক। এ পরিস্থিতি কেবল দামেশকে নয়; পুরো শাম অঞ্চলেই ছিল। এ বিষয়টি চিন্তা করলে বলতে হয়, অনতিবিলম্বে দামেশকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে হয়তো পুরো শাম অঞ্চলেই নিরাপত্তা ফিরে আসবে, মুসলমানদের চেষ্টা-সাধনা সংস্কারমুখী হবে এবং আলিম-উলামা ও নেতা-শাসকদের জন্য বাতিনি শিয়াদের খঞ্জর-তরবারির আশঙ্কামুক্ত হয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।
কিন্তু একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে ইমাদুদ্দিন জিনকি অনুভব করেন যে, দামেশক, আলেপ্পো ও মসুলের শান্তিপূর্ণ ঐক্য প্রচেষ্টা কার্যত অসম্ভব। তুগতেকিন নিজে ঐক্যের মনোভাব পোষণকারী ছিলেন না। তার পুত্রও নিঃসন্দেহে দামেশকের ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকবেন। আর তাই দামেশককে নতুন ইসলামি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হলে ইমাদুদ্দিন জিনকির সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল—কৌশল ও চাতুরির পথ কিংবা শক্তি প্রয়োগ ও রক্তপাতের পথ।
ইমাদুদ্দিন জিনকির নীতি ছিল, তিনি একান্ত নিরুপায় পরিস্থিতির শিকার না হলে রক্তপাত এড়িয়ে চলতেন। সারাজীবন তিনি সামরিক সংঘর্ষ পরিহার করে বিভিন্ন ইসলামি রাজ্য ও নগরী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই দামেশকের ক্ষেত্রে তিনি প্রথম পথটিই বেছে নেন এবং অসামরিক পন্থায় কৌশলে বুরি বিন তুগতেকিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দামেশককে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। উল্লেখ্য, ত্রিপোলির নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আরেক নগরী 'হামা'ও তখন দামেশকের অধীনে ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সেই কৌশলের বিবরণে যাওয়ার পূর্বে এ বিষয়টি জানা দরকার যে, এ অঞ্চলের আরেকটি স্বাধীন রাজ্য ছিল হিমস। এ সময় হিমসের ক্ষমতা ছিল সামসামুদ্দৌলা খায়র খান বিন কুরাজা নামক জনৈক অত্যাচারী শাসকের হাতে। সামসামুদ্দৌলা হিমসবাসীর ওপর প্রচুর জুলুম-নিপীড়ন চালাতেন। তা ছাড়া হিমসের জনগণও দামেশকের মতো একই পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় হুবহু একই মন-মানসিকতা লালন করত। হিমসও শতাব্দীকালের অধিক সময় উবায়দি শিয়াদের হাতে শাসিত ছিল। উবায়দিদের প্রস্থানের পর হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছিল পর্যায়ক্রমে তুতুশ বিন আলপ আরসালান ও তার পুত্র দাক্কাকের হাতে। এমনকি দাক্কাকের শাসনকালে দীর্ঘ সময় তুগতেকিন হিমসের গভর্নর ছিলেন।
আমরা যদি এ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান লক্ষ করি, তাহলে সুস্পষ্ট উপলব্ধি করব যে, দামেশকে পৌঁছতে হলে এর পূর্বেই আলেপ্পো ও দামেশকের মাঝপথে অবস্থিত হিমস ও হামা নগরীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প ছিল না।(৩৪৬)
এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। এই যখন পরিস্থিতি, তাহলে প্রথমে হিমস ও হামা নগরীর ওপর এবং তারপর দামেশকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কী হতে পারে ইমাদুদ্দিন জিনকির কর্মপন্থা?
ইমাদুদ্দিন জিনকি একটি রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে একটি বাহিনী গঠন করার ভাব প্রকাশ করেন, এরপর হিমসের আমির খায়র খান বিন কুরাজা ও দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিনের কাছে আসন্ন অভিযানে সহযোগিতা আহ্বান করেন। ইমাদুদ্দিনের পরিকল্পনা ছিল তারা দুজন তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আগমন করলে তিনি তাদেরকে বন্দি করে ফেলবেন। এতে নগরীদুটি শাসকহীন ও প্রতিরক্ষাশূন্য হয়ে পড়বে এবং তিনি সহজেই বিনা যুদ্ধে নগরীদুটিতে প্রবেশ করতে পারবেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনার প্রথমাংশ সফল হয়। খায়র খান বিন কুরাজা নিজ বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে আগমন করেন এবং ফাঁদে আটকা পড়েন। কিন্তু বুরি বিন তুগতেকিন নিজে না এসে তার পুত্র সোনজের নেতৃত্বে পাঁচশ সৈন্যের একটি প্রতীকী বাহিনী প্রেরণ করেন। সোনজ তখন হামা নগরীর আমির ছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি সঙ্গে সঙ্গে সোনজকে আটক করে দ্রুত হামায় প্রবেশ করেন। শাসক ও নিরাপত্তাবাহিনী না থাকায় নগরীটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তখন দুর্বল হয়ে আছে। ফলে বিনা রক্তপাতেই হামা নগরী ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজ্যভুক্ত হয়ে যায়। হামার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েই তিনি খায়র খান বিন কুরাজাকে আটক করে হিমসেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। কিন্তু হিমসে তখনও বিরাট সংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছিল। তারা নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দিতে অস্বীকৃতি জানালে ইমাদুদ্দিন ভেতরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। (৩৪১)
ইমাদুদ্দিন জিনকি পুত্রমুক্তির বিনিময়ে দামেশকের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার জন্য বুরি বিন তুগতেকিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু বুরি নতি স্বীকার না করায় দামেশক ইমাদুদ্দিনের একক ইসলামি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে যায়।
অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ইমাদুদ্দিন জিনকির এ কৌশল কেবল হামা নগরীতে সফল হয় আর হিমস ও দামেশকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। শুধু তা-ই নয়; নগরীদুটির সামনে ইমাদুদ্দিন জিনকির পরিকল্পনা প্রকাশ পেয়ে যায়। দামেশকের শাসক বুরি বিন তুগতেকিন ও হিমসের নতুন আমির (বন্দি আমির খায়র খানের পুত্র) কুরাইশ বিন খায়র খান জেনে যান যে, ভবিষ্যতে ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরীদুটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে সামরিক সমাধান গ্রহণেও দ্বিধা করবেন না।
অনেক ঐতিহাসিক ইমাদুদ্দিনের এমন কৌশল অবলম্বন; বুরি ও খায়র খানকে জিহাদের কথা বলে আহ্বান জানানো, এরপর প্রতারণা করে প্রথমজনের পুত্র ও দ্বিতীয়জনকে বন্দি করাকে সুস্পষ্ট প্রতারণা আখ্যা দিয়েছেন। আর গাদ্দারি ও প্রতারণা কোনো মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।

টিকাঃ
৩৪৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৮।
৩৪৫. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১৬।
৩৪৬. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা : ১১৯।
৩৪১. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ৩৬১-৩৬২।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ইমাদুদ্দিনের গৃহীত কৌশলের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণসমূহ

📄 ইমাদুদ্দিনের গৃহীত কৌশলের অনুপ্রাণিকা ও কার্যকারণসমূহ


বাস্তবতা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকির এই অবস্থানটির বিশ্লেষণ অতি কঠিন। কারণ, বাস্তবেই প্রতারণা কোনো মুমিনের স্বভাব ও আচরণ হতে পারে না। তবে বিষয়টি এমন সাদাসিধা নয়। যারা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রতারক বলতে চান, তাদের উচিত ঘটনার সংঘটন-কালের পারিপার্শ্বিক সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া, সবগুলো পয়েন্ট ও যুক্তি-প্রমাণ পাশাপাশি সাজিয়ে রেখে ঘটনার আদ্যোপান্ত নির্মোহ বিশ্লেষণের চেষ্টা করা। এমনটি করা হলে শেষে ঘটনাটির একটি সঠিক চিত্র বের হয়ে আসবে। এমনটি না করে সরাসরি তার অবস্থানকে সুস্পষ্ট প্রতারণা আখ্যায়িত করা মোটেও উচিত হবে না।
যেহেতু এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে আছি, তাই এক্ষেত্রে আমাদের কিছু বিষয় জেনে রাখা উচিত।
১. ঘটনা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার আগে আমাদের ইমাদুদ্দিন জিনকির ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। তিনি সেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যারা দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখল করে রেখেছিল, অতীতের ত্রিশ বছরের মতো তখনও মুসলিম জনপদগুলোতে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে 'সময়' একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ বিবেচিত হচ্ছিল।
২. এসব নেতা ঐক্যপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছিল। সুস্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান না করলেও তাদের প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানই প্রকাশ পাচ্ছিল। স্বভাবতই এর ফলে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় একক শক্তিশালী প্লাটফর্মে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিতে বৃহৎ পরিসরের ঐক্য ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে জিহাদের ন্যায় মহান ওয়াজিব দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। আর শরিয়তের স্বতঃসিদ্ধ বিধান হলো, অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনে যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়, তা-ও ওয়াজিব ও আবশ্যক হয়ে যায়।
৩. এসব নেতা কেবল ঐক্যের বিরোধিতা ও জিহাদের পথে বাধা তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা ক্রুসেডারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বিনিময়ও করেছিল। তাদের অতীত ইতিহাসে যেমন এর দৃষ্টান্ত আছে, আছে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও। আর ভবিষ্যতেও আমরা প্রত্যক্ষ করব হিমস ও দামেশকের প্রতিরক্ষায় ইমাদুদ্দিন জিনকির বাহিনীর মোকাবিলায় ক্রুসেডার বাহিনীর সরব উপস্থিতি।
৪. এই প্রক্রিয়ার বিকল্প পদ্ধতি কী হতে পারত?!
বিকল্প হতে পারত শক্তিপ্রয়োগ করে দখল করে নেওয়া। অর্থাৎ ইমাদুদ্দিন জিনকি নগরদুটিকে সসৈন্য ঘেরাও করতে পারতেন। এরপর ভেতর-বাইরের দুই মুসলিম বাহিনীতে তুমুল লড়াই হতো। দু- পক্ষের মুসলিম সৈন্যদের লাশ পড়ত, ইসলামি দুর্গগুলো ধসে পড়ত; নগরপ্রাচীরগুলো বিধ্বস্ত হতো এবং পরিশেষে দু-পক্ষের বুকে দানা বেঁধে থাকত চরম ক্ষোভ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা।
এই বিকল্প যদিও বড় কঠিন ও তিক্ত; তবে ফকিহগণ হয়তো একে বৈধ বলে মেনে নিতেন। তবে স্বভাবতই তারা তা মেনে নিতেন একেবারে শেষ পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অন্যান্য সব পন্থার প্রয়োগ ও ব্যর্থতা নিশ্চিত হওয়ার পর। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অনেক মুজাহিদের জীবনে আমরা এভাবে কোনো ইসলামি নগরীকে নিজ রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সামরিক প্রচেষ্টা চালাতে দেখেছি। বিশেষ করে খিলাফতব্যবস্থা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন যেহেতু শতধা বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো সম্পর্কসূত্র ছিল না, তাই সে সময় এ জাতীয় প্রচেষ্টা বেশি দেখা গিয়েছিল।
আমরা যদি এই সামরিক বিকল্প ও তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলকে এক পাশে রাখি, আরেক পাশে রাখি এক ফোঁটা রক্তপাত ছাড়া হামা দখল করে নেওয়ার ঘটনাকে, তাহলে সহজেই এ বিষয়ে ইমাদুদ্দিন জিনকির গৃহীত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা অনুমান করতে পারব।
৫. বুরি বিন তুগতেকিন ও খায়র খান বিন কুরাজার কাছে ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রেরিত বার্তার ভাষ্য আমাদের সামনে নেই। আর তাই তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জিহাদের কথা বলেছিলেন, নাকি দ্ব্যর্থবোধক কোনো ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছিলেন, তা আমরা জানি না। এমনও হতে পারে, তিনি সুস্পষ্ট প্রতারণা এড়িয়ে আপন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একাধিক মর্মের সম্ভাবনা রাখে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
৬. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো কৌশল'। (৩৪৮) আর এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ, জিহাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে সুনিষ্ঠ মুজাহিদদের লড়াই। ইমাদুদ্দিন জিনকি একে এক ধরনের যুদ্ধকৌশল হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন। এটা ছিল ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগবেষণা, যা কখনো ঠিক হয়, কখনো ভুল।
তা ছাড়া তখন তিনি যুদ্ধপরিস্থিতিতে ছিলেন। আর যুদ্ধের এমন কিছু বিশেষ বিধিবিধান আছে, যা শান্তিকালীন পরিস্থিতির বিধিবিধানের তুলনায় একদমই ভিন্ন হয়ে থাকে।
৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাব বিন আশরাফকে হত্যার মনস্থ করেন, তখন মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. নবীজিকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি?' নবীজি সম্মতিসূচক উত্তর দিলে তিনি বলেছিলেন, 'তাহলে আমাকে তার সঙ্গে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন।' নবীজি তাকে অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, 'বলতে পারো। ' (৩৪৯)
এরপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা ও কাব বিন আশরাফের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়, যাতে মুহাম্মাদ বিন মাসলামার পক্ষ থেকে বড় ধরনের কৌশল ছিল। উভয়ের কথোপকথন শেষ হয় মুহাম্মাদ বিন মাসলামা কর্তৃক কাব বিন আশরাফকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
আমার এ বিষয়টি জানা আছে যে, এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কোনো মুসলমান নয়; বরং একজন কাফির ছিল। কিন্তু বিধান তো ব্যাপক। তা ছাড়া এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, এসব নগরীর নেতৃবৃন্দ কাফির ক্রুসেডারদের সঙ্গে সরাসরি ঘৃণ্য সহযোগিতা বিনিময়ে লিপ্ত ছিল।
৮. ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্বে সমকালীন বিশিষ্ট ফকিহগণের কাছে সে বিষয়ে শরীয়তের বিধান জিজ্ঞেস করে নিতেন। তৎকালীন ফকিহগণ সম্ভবত এই কৌশলটিকে ক্ষতিকর হিসেবে স্বীকার করলেও এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনাবশ্যক বিবেচনা করলেও চলমান বিশেষ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাতের চেয়ে কম ক্ষতিকর বিবেচনা করেছিলেন।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, কেবল অনুমাননির্ভর হয়ে তৎকালীন ফকিহগণের প্রতি অপবাদ দেওয়াও ন্যায় ও ইনসাফের দাবি নয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক তো সমকালীন ফকিহদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'এমন ফতোয়া দিয়েছে দ্বীনহীন কিছু লোক, যাদের শরিয়ত ও সামাজিকতা সম্বন্ধে সুষ্ঠু জ্ঞান নেই। তারা একটি অবৈধ বিষয়কে বৈধ ঘোষণা করেছিল।' (৩৫০)
বাস্তবতা হলো, এমনটি হতেই পারে না যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় চেতনাহীন আলিমের কাছ থেকে শরিয়তের সমাধান গ্রহণ করবেন। আর তার রাজ্যের আলিমগণও এমন ছিলেন যে, শরিয়তকে উপেক্ষা করে ইমাদুদ্দিন জিনকির চাহিদার অনুকূলে ফতোয়া দেবেন। বরং সমস্ত ঐতিহাসিকের সাক্ষ্যমতে তার রাজ্যের আলিমগণ ছিলেন সমসাময়িক শ্রেষ্ঠতম আলিম। তাদের ফতোয়া যদি ভুল হয়ে থাকে, সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যেতে পারে যে, তারা কল্যাণ ও সত্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই ইজতিহাদ করেছিলেন; কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।
৯. একজন ব্যক্তির অস্পষ্ট কর্মের ভালো-মন্দ বিবেচিত হয় তার জীবনাদর্শের আলোকে। ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনাদর্শ পর্যালোচনার পর আমরা কি এ কথা বলতে পারি যে, তিনি এমন একজন প্রতারক নেতা ছিলেন, যিনি শরিয়তের সিদ্ধান্তের প্রতি অবহেলা করতেন?! বরং আমরা তো এ ঘটনার আগে-পরে তার পুরো জীবনের কর্মবিবরণীতে দেখতে পাই, তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ চেষ্টায় লড়াই করেছেন এবং এ পথে নিজের চেষ্টা-সাধনা, সময় এমনকি পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তাই আমরা বলতেই পারি যে, তার এই পদক্ষেপ যদি এমন ভুলও হয়ে থাকে, যার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়; তথাপি তিনি এ কাজ ব্যক্তিস্বার্থে নয়: বরং কেবল মুসলমানদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের চিন্তা থেকেই করেছিলেন।
আমরা এ কথা এজন্য বলছি, যাতে কোনো ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ইমাদুদ্দিন জিনকির এ পদক্ষেপকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে যেকোনো স্বার্থে উম্মাহর ঐক্যের দোহাই দিয়ে কোনো ইসলামি অঞ্চলে অভিযান চালাতে না পারে। যারা এভাবে বিভিন্ন জনপদকে নিজের রাজ্যভুক্ত করতে চায়, তাদের জীবনাদর্শ দেখে নির্ণয় করতে হবে যে, তারা কি মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির মতো ব্যক্তি, না জালিম শাসক তুতুশ বিন আরসালান ও তার পুত্রদের মতো?!
১০. সর্বশেষ কথা হলো, ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ. ৫২১ হিজরি থেকে ৫৪১ হিজরি সন পর্যন্ত দীর্ঘ বিশ বছর মুসলমানদের শাসক ছিলেন। এই দীর্ঘ শাসকজীবনে তিনি কয়টি অন্যায় করেছেন?! যদি আমরা তার এ পদক্ষেপকে নিরেট ভুল হিসেবে মেনেও নিই; স্বীকার করে নিই যে, এমন অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ তার জন্য মোটেও ঠিক হয়নি; তারপরও আমরা দেখতে পাব যে, তার পুরো জীবনে এরূপ ঘটনার অস্তিত্ব বিরল। আর মানবজাতির মাঝে নিষ্পাপ নবীগণ ছাড়া কে এমন আছে, যার জীবনে কোনো ভুলত্রুটি নেই?!
একজন ব্যক্তির ভুলের সংখ্যা সীমিত হওয়া তার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। ভুলে গেলে চলবে না, সময়টা ছিল ভয়াবহ ফিতনার যুগ। খিলাফতব্যবস্থা ছিল দুর্বল; কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তদানের ক্ষমতা খলিফার ছিল না। আর তাই নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত ঐক্য প্রচেষ্টায় কিছু সংশয় ও জটিলতার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ, এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাউকে এ বিষয়ে সকল মুসলমানের দায়িত্ব দেওয়া হতো না। ফলে কেউ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রজ্ঞাসুলভ সিদ্ধান্তের বিপরীতও হতো।
এই বিশ্লেষণের পর আমরা ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মানবিক পরিসীমা থেকে বের করে দিচ্ছি না। আমরা বলছি না, তিনি ছিলেন অতিমানব, যার কোনো ভুল হতে পারে না! আমরা তার কোনো সুস্পষ্ট ভুল বা অন্যায়কর্মের সাফাইও গাচ্ছি না। আমরা বলতে চাচ্ছি, পরিস্থিতি কঠিন ও জটিল হলে এ জাতীয় বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সময় কঠিন হয়ে যায় এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সর্বাবস্থায় সুফলদায়ক হয় না।
এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, যিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি চলমান সুকঠিন ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি দেখেছেন, ক্রুসেডাররা মুসলমানদের ঘরেঘরে লুটপাট চালাচ্ছে; দেখেছেন, কিছু মুসলিম নেতা ও ক্রুসেডারদের মধ্যে ঘৃণ্য আঁতাঁত ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তার মতো পরিস্থিতির জলজ্যান্ত সাক্ষী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর ঘটনার শতাব্দীকাল বা কয়েক শতক পরে এসে নিজের কামরায় শান্ত-সুস্থির বসে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও আলোচনা-সমালোচনা করা, ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করা এবং নির্লিপ্তচিত্তে বলে দেওয়া যে, এটি বৈধ আর সেটি অবৈধ; দুয়ের মধ্যে যোজন যোজন তফাত!
কাজেই যিনি বিশ্লেষণ করতে চান, এসব প্রেক্ষাপট সামনে রেখে তারপর বিশ্লেষণ করুন। সঠিক বিশ্লেষণ তো তিনিই করতে পারবেন, মহান আল্লাহ যাকে তাওফিক দেবেন!

টিকাঃ
৩৪৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৮৬৬, ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৩৯, ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৬৭৫ ও ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ২৮৩৩।
৩৪৯. কাব বিন আশরাফের হত্যাঘটনার বিস্তারিত পড়ুন: ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৮১১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮০১।
৩৫০. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/৪২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00