📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [সাত] দামেশক ও অবশিষ্ট শাম অঞ্চল

📄 [সাত] দামেশক ও অবশিষ্ট শাম অঞ্চল


ক্রুসেড আগ্রাসনের শুরু সময় থেকে চলমান পরিস্থিতি পর্যন্ত পুরোটা সময় দামেশক চলমান জিহাদি আন্দোলনের পথে একটি জটিল সমস্যারূপে বিদ্যমান ছিল। অথচ দামেশক ছিল পুরো শাম অঞ্চলের কেন্দ্রীয় নগরী। এমনকি এ অঞ্চলের অধিবাসীরা 'শাম' বলে অনেক সময় কেবল দামেশককেই বোঝাত! কিন্তু দুঃখের বিষয়, পর্যাপ্ত জনশক্তি এবং অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সামর্থ্যের পাশাপাশি দীর্ঘ ইসলামি ইতিহাসের গৌরব থাকা সত্ত্বেও নগরীটি এ সময় কাঙ্ক্ষিত মানের ইসলামি নগরী ছিল না। বরং উল্টো দীর্ঘকাল ধরে নগরীটি জিহাদি আন্দোলনের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল!
আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, এ সমস্যার মূল কারণ হলো, নগরীটি দীর্ঘকাল দুরাচারী, অত্যাচারী ও ইসলামবিরোধী শাসকদের হাতে শাসিত হয়েছিল। এর ফলে ক্রমান্বয়ে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল, যারা ইলমের মর্যাদা অনুধাবন করতে পারত না, জিহাদ পছন্দ করত না এবং বাহ্যিক কিছু আচার-আচরণ ছাড়া দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানত না। বরং একসময় বিভিন্ন নিকৃষ্ট বিদআত-কর্ম তাদের কাছে মূল শরিয়তের মর্যাদা লাভ করেছিল!
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৫৮ হিজরি থেকে ৪৬৮ হিজরি সন (৯৬৮-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) (৩১৭) পর্যন্ত দামেশক শিয়া উবায়দি রাষ্ট্রের অধীনস্থ ছিল। (৩১৮) এই দীর্ঘ সময়ে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা-চেতনা ও জীবনাচারে বিরাট পরিবর্তন ঘটে। প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে যায় বিকৃতি ও ভারসাম্যহীনতা। নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ কার্যত বিনষ্ট হয়ে যায়। নগরীটির বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিরা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলে। এ কারণে জ্ঞানীগুণী আলিমসমাজ দামেশক ছেড়ে চলে যায়। দামেশক প্রবেশ করে এক নিকষকালো অন্ধকার যুগে!
উবায়দিদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পরও দামেশকের দুর্যোগ কাটেনি। এ সময় প্রথমে নগরীটি ছিল আতসিজ (Atsiz Ibn Uvak) নামক জনৈক সেলজুক সেনাপতির শাসনাধীন। (৩১৯) এরপর পর্যায়ক্রমে দামেশক শাসন করেন তুতুশ বিন আলপ আরসালান (৩২০), দাক্কাক বিন তুতুশ (৩২১) এবং সবশেষে তুগতেকিন তুর্কমানি(৩২২)।
আমাদের আলোচ্য যুগে দামেশকের শাসনক্ষমতা যদিও তুগতেকিনের হাতে ছিল; কিন্তু তিনি যে নির্ভেজাল জিহাদি ব্যক্তি ছিলেন, এমনটি বলার সুযোগ নেই। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির জিহাদি পরিকল্পনার সামনে আপাতদৃষ্টিতে তুগতেকিনও প্রতিবন্ধক বিবেচিত হচ্ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যটি যোগ করুন যে, বিশেষ করে দামেশক ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও দুর্গসহ পুরো শাম অঞ্চলে ছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর বাধাহীন প্রভাব। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিল। বাতিনিরা এ অঞ্চলে যেকোনো সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ওত পেতে থাকত। এ কারণে দামেশকের জনগণ সংস্কার ও সংশোধনের সম্ভাবনা সম্পর্কেও নিরাশ হয়ে পড়েছিল।
এ সবকিছু মিলে দামেশকের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। এটি কেবল শাসক-সংকট ছিল না; ছিল জনগণেরও সংকট। সুতরাং নিঃসন্দেহে সংকট বড় জটিল ও ভয়াবহ ছিল।
কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দামেশকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা দামেশকের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় ব্যতীত ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। একই কথা প্রযোজ্য আরেক ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলিতে পৌঁছার ক্ষেত্রেও। আর তাই ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের দফারফা করতে হলে তার পূর্বেই দামেশক-সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে বের করা ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য জরুরি ছিল।
দামেশক বাদে শাম অঞ্চলের অন্যান্য নগরীর অবস্থা ছিল আরও দুর্বল। কিন্তু নগরীগুলো পরস্পর সংযুক্ত থাকায় ক্রুসেডারবিরোধী যুদ্ধপরিকল্পনায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছিল।
হামা নগরী ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ। হামা থেকে আশেপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ওপর নজর রাখা যেত। তা ছাড়া হামার অবস্থান ছিল দুই ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক ও ত্রিপোলির কাছাকাছি।
হিমস তখন স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ছিল। এ সময় রাজ্যটির শাসক ছিলেন সামসামুদ্দৌলা খায়র খান বিন কুরাজা নামক জনৈক তুর্কি। তিনি ছিলেন জুলুম-অত্যাচারে প্রসিদ্ধ এক শাসক। অবশ্য এ অঞ্চলে তিনি একজন শক্তিমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন।
শাম অঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য শাইজার। রাজ্যটি ক্ষুদ্র, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে আরব আমির সুলতান বিন মুনকিয শাইজার রাজ্যটি শাসন করছিলেন। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, শাইজারের অবস্থান ছিল এন্টিয়কের একেবারে সন্নিকটে। (৩২৩)

টিকাঃ
৩১৭. দেখুন: আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ১/১২০।
৩১৮. দেখুন: ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৪-১৭৬।
৩১৯. দেখুন: ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৪-১৭৬।
৩২০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৮২।
৩২১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২১৩।
৩২২. দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৪৮-১৪৯।
৩২৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৭-২২৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৪৫-২৪৬।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [আট] জাযিরা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ

📄 [আট] জাযিরা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ


এই অঞ্চলটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটির অবস্থান উত্তর দিক থেকে দজলা ও ফুরাত নদীর মাঝে। আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন অংশ মিলে ছিল তৎকালীন জাযিরা অঞ্চল। ক্রুসেড রাজ্য এডেসা এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল মসুলের অতি নিকটে। বরং মসুলকে জাযিরা অঞ্চলের একটি নগরী হিসেবেই গণ্য করা হতো। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির সামগ্রিক চিন্তা-পরিকল্পনায় এ অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল।
অতি দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্রুসেড রাজ্য এডেসার নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও অঞ্চলটি বিভিন্ন আরব, তুর্কমেন ও উরতুকি শাসকের মাঝে বিভক্ত ছিল। এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, এই সীমিত পরিসরের অঞ্চলটি তখন গোটা দশেক আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। কেবল তা-ই নয়; রাজ্যবিস্তারের লালসায় তারা লিপ্ত ছিল পারস্পরিক হানাহানিতে। (৩২৪)

টিকাঃ
৩২৪. দেখুন: মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ৯৮-৯৯।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [নয়] কুর্দি গোষ্ঠী

📄 [নয়] কুর্দি গোষ্ঠী


আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, কুর্দিরা ছিল এক মহান সুন্নি সম্প্রদায়। তারা মসুলের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করত। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে সেলজুকদের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এরই অনিবার্য পরিণতিতে অঞ্চলটিতে আলিমদের সংখ্যা কমে যায়; শান্তি-নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে, মূর্খতা ও অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে এবং অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগরীর জন্য দুশ্চিন্তা ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (৩২৫)
কুর্দিরা অনেকগুলো শাখাগোত্রে বিভক্ত ছিল আর প্রতিটি শাখাগোত্র ছিল পরস্পর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও স্বাধীন। আর তাই কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলটিকে 'কুর্দি রাজ্য' বলে আখ্যায়িত করার সুযোগ ছিল না। হামিদিয়া, হাকারিয়া, মিহরানিয়া ও বাশনাবিয়া ছিল তৎকালে এ অঞ্চলের কুর্দিদের প্রসিদ্ধ কয়েকটি শাখাগোত্র। (৩২৬)

টিকাঃ
৩২৫. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ১০১। (ঈষৎ পরিমার্জিত)
৩২৬. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১০৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দশ] ক্রুসেডার শক্তি

📄 [দশ] ক্রুসেডার শক্তি


এ অঞ্চলে বিদ্যমান উল্লিখিত জটিলতা ও সমস্যাসমূহের পাশাপাশি সবচেয়ে কঠিন সমস্যা ও দুশ্চিন্তা হিসেবে মুসলমানদের কাঁধে চেপে ছিল এডেসা, এন্টিয়ক, ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাস নামক চারটি ক্রুসেড রাজ্যের সম্মিলিত ক্রুসেড কাঠামো।
৫২০ হিজরি সনে (১১২৬ খ্রিষ্টাব্দে) আক সুনকুর আল-বুরসুকির মৃত্যুর পর মসুলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ গোলযোগ চলাকালে ক্রুসেড রাজ্যগুলো আরও সুসংহত ও দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। তারা এ সময় রাজ্যগুলোর পাশ দিয়ে পথ অতিক্রমকারী প্রতিটি মুসলিম কাফেলার ওপর হামলা চালাতে শুরু করে এবং নিকটবর্তী ইসলামি নগরীগুলোর ওপর কর আরোপ করতে থাকে। এর ফলে এ অঞ্চলের জনসাধারণের মাঝে এক ধরনের ভীতি-আতঙ্ক তৈরি হয়। এর অন্যতম কারণ এও ছিল যে, নগরীগুলোর দুর্বলচিত্ত মুসলিম শাসকদের মাঝে ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ বা কোনো ধরনের লড়াই প্রচেষ্টার আগ্রহ বা পরিকল্পনা ছিল না। (৩২৭)
বিপরীতে ক্রুসেডার নেতৃবৃন্দের অবস্থান ছিল অনেকটা স্থিতিশীল। এডেসায় জোসেলিন, এন্টিয়কে ২য় বোহেমন্ড, ত্রিপোলিতে বারট্রামের পুত্র পন্স আর বাইতুল মুকাদ্দাসে ২য় বল্ডউইন-প্রতিটি ক্রুসেড রাজ্যেই ছিল আলাদা আলাদা শক্তিশালী শাসক।
ইমাদুদ্দিন জিনকির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রুসেড রাজ্য ছিল মসুল ও আলেপ্পোর মাঝে গজালের মতো প্রোথিত এডেসা রাজ্য!
মোটামুটি এই ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির মনমস্তিষ্কে বিদ্যমান তৎকালীন পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র। নিঃসন্দেহে চিত্রটি ছিল অত্যন্ত জটিল; যাতে দু-চার-দশটি নয়; ছিল শত শত সমস্যা ও বিপত্তি। আর এই জটিল ও যৌগিক সংকট থেকে নিষ্কৃতির উপায় ছিল একটিই। প্রথমে মহান আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ বিশ্বাস; এরপর সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, দূরদর্শী পরিকল্পনা, কর্মনীতিতে অগ্রাধিকার নির্ণয়ে সুষ্ঠু বিন্যাস, নানা মত ও নানা পথের মানুষের সঙ্গে কৌশলী কূটনীতি প্রয়োগ এবং অন্যায় প্রতিরোধ ও অন্যায্যের সংস্কারে পূর্ণ প্রজ্ঞার ব্যবহার।

টিকাঃ
৩২৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩২-৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00