📄 [পাঁচ] আলেপ্পো নগরী
বিভিন্ন কারণেই আলেপ্পো ছিল তৎকালীন সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী। সামরিক দিক থেকে নগরীটি ছিল অতি সুরক্ষিত। নগরীটির অবস্থান ছিল ইরাক ও শাম অঞ্চলের যোগাযোগপথের একেবারে সন্নিকটে। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের বিভিন্ন শক্তিশালী দুর্গও ছিল আলেপ্পোর অতি নিকটে। আলেপ্পোর উত্তরে ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসা আর পশ্চিমে ছিল আরেক ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক। অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। অধিকন্তু নগরীটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ। (৩১৩)
এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি বিশ্বাস করতেন, এ অঞ্চলে আলেপ্পোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তা ছাড়া আলেপ্পোবাসীর হৃদয়ে তখনও তাদের প্রয়াত শাসক ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের কল্যাণে ভরপুর স্মৃতি জাগ্রত ছিল। এই যোগসূত্র নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিনের জন্য এক ব্যাপক জনশক্তি ও গণসমর্থনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে এ বিষয়টিও বিবেচনাভুক্ত ছিল যে, আলেপ্পোর জনমানস ছিল মসুলবাসীর চিন্তাধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। তুতুশ বিন আলপ আরসালান ও তার পুত্র রিজওয়ানের আমলসহ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলেপ্পোর জনগণ ছিল অসৎ নেতৃত্ব, দুঃশাসন ও মন্দ পরিচর্যার শিকার। আলেপ্পোর জনসাধারণের মাঝে যদিও কল্যাণ-সম্ভাবনা অবশিষ্ট ছিল; কিন্তু পারিপার্শ্বিক বিচারে তারা ক্রুসেডবিরোধী আন্দোলনের বীজরূপে বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত ছিল না। অধিকন্তু আলেপ্পোর অবস্থান ছিল শক্তিশালী ক্রুসেড ঘাঁটিগুলোর নাগালে। তাই একে শাসনকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা ছিল অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তা ও পরিকল্পনায় আলেপ্পোর চেয়ে মসুলের গুরুত্ব বেশি ছিল। অবশ্য তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় উভয় নগরীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এ সময় আলেপ্পোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত। আক সুনকুর আল-বুরসুকির পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদ নিহত হওয়ার পর কুতলুগ আবেহ নামক জনৈক তুর্কমেন নেতা দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। শাসক হিসেবে যদিও সে রিজওয়ান বিন তুতুশের পুত্র ইবরাহিমকে মসনদে বসিয়েছিল; কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তার হাতেই। ইবরাহিম ছিল তার পিতার মতোই দুরাচারী আর কুতলুগ আবেহ ছিল তার চেয়েও বড় দুরাচারী। ফলে দুঃশাসন আর জুলুম-নিপীড়নেই কাটতে থাকে আলেপ্পোর দিনরাত। নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে থাকে। বিশেষ করে এডেসার শাসক জোসেলিন ও এন্টিয়কের অধিপতি ২য় বোহেমন্ডসহ বহিঃশত্রুদের লোলুপ দৃষ্টি এ সময় আলেপ্পোর প্রতি নিবদ্ধ ছিল। (৩১৪)
কুতলুগ আবেহের নিপীড়নে বিপর্যস্ত আলেপ্পোবাসী নিষ্কৃতি লাভের আশায় নতুন এক ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়। তিনি হলেন সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বার আল-উরতুকি। কিন্তু তিনি ছিলেন অতিশয় দুর্বল। ফলে একের পর এক চক্রান্ত ও ফিতনা ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্থিতিশীল হচ্ছিল না; অথচ ক্রুসেডাররা দাঁড়িয়ে আছে নগরদ্বারের সন্নিকটে! (৩১৫)
টিকাঃ
৩১৩. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ৭১।
৩১৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৪৩০-৪৩১।
৩১৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২১।
বিভিন্ন কারণেই আলেপ্পো ছিল তৎকালীন সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী। সামরিক দিক থেকে নগরীটি ছিল অতি সুরক্ষিত। নগরীটির অবস্থান ছিল ইরাক ও শাম অঞ্চলের যোগাযোগপথের একেবারে সন্নিকটে। তা ছাড়া ক্রুসেডারদের বিভিন্ন শক্তিশালী দুর্গও ছিল আলেপ্পোর অতি নিকটে। আলেপ্পোর উত্তরে ছিল ক্রুসেড রাজ্য এডেসা আর পশ্চিমে ছিল আরেক ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক। অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। অধিকন্তু নগরীটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ। (৩১৩)
এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকি বিশ্বাস করতেন, এ অঞ্চলে আলেপ্পোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তা ছাড়া আলেপ্পোবাসীর হৃদয়ে তখনও তাদের প্রয়াত শাসক ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের কল্যাণে ভরপুর স্মৃতি জাগ্রত ছিল। এই যোগসূত্র নিঃসন্দেহে ইমাদুদ্দিনের জন্য এক ব্যাপক জনশক্তি ও গণসমর্থনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে এ বিষয়টিও বিবেচনাভুক্ত ছিল যে, আলেপ্পোর জনমানস ছিল মসুলবাসীর চিন্তাধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। তুতুশ বিন আলপ আরসালান ও তার পুত্র রিজওয়ানের আমলসহ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলেপ্পোর জনগণ ছিল অসৎ নেতৃত্ব, দুঃশাসন ও মন্দ পরিচর্যার শিকার। আলেপ্পোর জনসাধারণের মাঝে যদিও কল্যাণ-সম্ভাবনা অবশিষ্ট ছিল; কিন্তু পারিপার্শ্বিক বিচারে তারা ক্রুসেডবিরোধী আন্দোলনের বীজরূপে বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত ছিল না। অধিকন্তু আলেপ্পোর অবস্থান ছিল শক্তিশালী ক্রুসেড ঘাঁটিগুলোর নাগালে। তাই একে শাসনকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা ছিল অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কারণে ইমাদুদ্দিন জিনকির চিন্তা ও পরিকল্পনায় আলেপ্পোর চেয়ে মসুলের গুরুত্ব বেশি ছিল। অবশ্য তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় উভয় নগরীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এ সময় আলেপ্পোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত। আক সুনকুর আল-বুরসুকির পুত্র ইযযুদ্দিন মাসউদ নিহত হওয়ার পর কুতলুগ আবেহ নামক জনৈক তুর্কমেন নেতা দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। শাসক হিসেবে যদিও সে রিজওয়ান বিন তুতুশের পুত্র ইবরাহিমকে মসনদে বসিয়েছিল; কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তার হাতেই। ইবরাহিম ছিল তার পিতার মতোই দুরাচারী আর কুতলুগ আবেহ ছিল তার চেয়েও বড় দুরাচারী। ফলে দুঃশাসন আর জুলুম-নিপীড়নেই কাটতে থাকে আলেপ্পোর দিনরাত। নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে থাকে। বিশেষ করে এডেসার শাসক জোসেলিন ও এন্টিয়কের অধিপতি ২য় বোহেমন্ডসহ বহিঃশত্রুদের লোলুপ দৃষ্টি এ সময় আলেপ্পোর প্রতি নিবদ্ধ ছিল। (৩১৪)
কুতলুগ আবেহের নিপীড়নে বিপর্যস্ত আলেপ্পোবাসী নিষ্কৃতি লাভের আশায় নতুন এক ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়। তিনি হলেন সুলায়মান বিন আবদুল জাব্বার আল-উরতুকি। কিন্তু তিনি ছিলেন অতিশয় দুর্বল। ফলে একের পর এক চক্রান্ত ও ফিতনা ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি কোনোভাবেই স্থিতিশীল হচ্ছিল না; অথচ ক্রুসেডাররা দাঁড়িয়ে আছে নগরদ্বারের সন্নিকটে! (৩১৫)
টিকাঃ
৩১৩. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ৭১।
৩১৪. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ১/৪৩০-৪৩১।
৩১৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২২১।
📄 [ছয়] জাওলি
তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ শক্তির তালিকায় সেনাপতি জাওলিও ছিলেন। তিনি এ সময় নিজেকে প্রয়াত প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকির শিশুপুত্রের অভিভাবক ঘোষণা করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে ছিলেন। আমরা পেছনে জেনেছি, তিনি তাকে দায়িত্ব প্রদানের জন্য সুলতান মাহমুদকে রাজি করাতে কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি ও সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানিকে সুলতানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। (৩১৬) কিন্তু বাতাস যে প্রবাহিত হয়েছিল লালসার জাহাজের প্রতিকূলে! শেষতক মসুলের প্রশাসনিক দায়িত্বভার অর্পিত হয়েছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির কাঁধে।
কিন্তু জাওলি তো তখনও মসুলেই অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে আছে প্রয়াত প্রশাসক ইযযুদ্দিন মাসউদের মসুল-বাহিনী। প্রশ্ন থেকে যায়— নতুন প্রশাসক ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন মসুলে প্রবেশ করবেন, কী হবে জাওলির ভূমিকা?
টিকাঃ
৩১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫।
তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ শক্তির তালিকায় সেনাপতি জাওলিও ছিলেন। তিনি এ সময় নিজেকে প্রয়াত প্রশাসক আক সুনকুর আল-বুরসুকির শিশুপুত্রের অভিভাবক ঘোষণা করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে ছিলেন। আমরা পেছনে জেনেছি, তিনি তাকে দায়িত্ব প্রদানের জন্য সুলতান মাহমুদকে রাজি করাতে কাজি বাহাউদ্দিন শাহরাযুরি ও সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইয়াগিসিয়ানিকে সুলতানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। (৩১৬) কিন্তু বাতাস যে প্রবাহিত হয়েছিল লালসার জাহাজের প্রতিকূলে! শেষতক মসুলের প্রশাসনিক দায়িত্বভার অর্পিত হয়েছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির কাঁধে।
কিন্তু জাওলি তো তখনও মসুলেই অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে আছে প্রয়াত প্রশাসক ইযযুদ্দিন মাসউদের মসুল-বাহিনী। প্রশ্ন থেকে যায়— নতুন প্রশাসক ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন মসুলে প্রবেশ করবেন, কী হবে জাওলির ভূমিকা?
টিকাঃ
৩১৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫।
📄 [সাত] দামেশক ও অবশিষ্ট শাম অঞ্চল
ক্রুসেড আগ্রাসনের শুরু সময় থেকে চলমান পরিস্থিতি পর্যন্ত পুরোটা সময় দামেশক চলমান জিহাদি আন্দোলনের পথে একটি জটিল সমস্যারূপে বিদ্যমান ছিল। অথচ দামেশক ছিল পুরো শাম অঞ্চলের কেন্দ্রীয় নগরী। এমনকি এ অঞ্চলের অধিবাসীরা 'শাম' বলে অনেক সময় কেবল দামেশককেই বোঝাত! কিন্তু দুঃখের বিষয়, পর্যাপ্ত জনশক্তি এবং অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সামর্থ্যের পাশাপাশি দীর্ঘ ইসলামি ইতিহাসের গৌরব থাকা সত্ত্বেও নগরীটি এ সময় কাঙ্ক্ষিত মানের ইসলামি নগরী ছিল না। বরং উল্টো দীর্ঘকাল ধরে নগরীটি জিহাদি আন্দোলনের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল!
আমরা পূর্বেও উল্লেখ করেছি, এ সমস্যার মূল কারণ হলো, নগরীটি দীর্ঘকাল দুরাচারী, অত্যাচারী ও ইসলামবিরোধী শাসকদের হাতে শাসিত হয়েছিল। এর ফলে ক্রমান্বয়ে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল, যারা ইলমের মর্যাদা অনুধাবন করতে পারত না, জিহাদ পছন্দ করত না এবং বাহ্যিক কিছু আচার-আচরণ ছাড়া দ্বীন সম্পর্কে কিছুই জানত না। বরং একসময় বিভিন্ন নিকৃষ্ট বিদআত-কর্ম তাদের কাছে মূল শরিয়তের মর্যাদা লাভ করেছিল!
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৫৮ হিজরি থেকে ৪৬৮ হিজরি সন (৯৬৮-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) (৩১৭) পর্যন্ত দামেশক শিয়া উবায়দি রাষ্ট্রের অধীনস্থ ছিল। (৩১৮) এই দীর্ঘ সময়ে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা-চেতনা ও জীবনাচারে বিরাট পরিবর্তন ঘটে। প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে যায় বিকৃতি ও ভারসাম্যহীনতা। নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধ কার্যত বিনষ্ট হয়ে যায়। নগরীটির বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিরা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলে। এ কারণে জ্ঞানীগুণী আলিমসমাজ দামেশক ছেড়ে চলে যায়। দামেশক প্রবেশ করে এক নিকষকালো অন্ধকার যুগে!
উবায়দিদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পরও দামেশকের দুর্যোগ কাটেনি। এ সময় প্রথমে নগরীটি ছিল আতসিজ (Atsiz Ibn Uvak) নামক জনৈক সেলজুক সেনাপতির শাসনাধীন। (৩১৯) এরপর পর্যায়ক্রমে দামেশক শাসন করেন তুতুশ বিন আলপ আরসালান (৩২০), দাক্কাক বিন তুতুশ (৩২১) এবং সবশেষে তুগতেকিন তুর্কমানি(৩২২)।
আমাদের আলোচ্য যুগে দামেশকের শাসনক্ষমতা যদিও তুগতেকিনের হাতে ছিল; কিন্তু তিনি যে নির্ভেজাল জিহাদি ব্যক্তি ছিলেন, এমনটি বলার সুযোগ নেই। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির জিহাদি পরিকল্পনার সামনে আপাতদৃষ্টিতে তুগতেকিনও প্রতিবন্ধক বিবেচিত হচ্ছিলেন।
সঙ্গে এ তথ্যটি যোগ করুন যে, বিশেষ করে দামেশক ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও দুর্গসহ পুরো শাম অঞ্চলে ছিল শিয়া বাতিনি গোষ্ঠীর বাধাহীন প্রভাব। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিল। বাতিনিরা এ অঞ্চলে যেকোনো সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ওত পেতে থাকত। এ কারণে দামেশকের জনগণ সংস্কার ও সংশোধনের সম্ভাবনা সম্পর্কেও নিরাশ হয়ে পড়েছিল।
এ সবকিছু মিলে দামেশকের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। এটি কেবল শাসক-সংকট ছিল না; ছিল জনগণেরও সংকট। সুতরাং নিঃসন্দেহে সংকট বড় জটিল ও ভয়াবহ ছিল।
কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দামেশকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা দামেশকের সঙ্গে সহযোগিতা বিনিময় ব্যতীত ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। একই কথা প্রযোজ্য আরেক ক্রুসেড রাজ্য ত্রিপোলিতে পৌঁছার ক্ষেত্রেও। আর তাই ত্রিপোলি ও বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্রুসেডারদের দফারফা করতে হলে তার পূর্বেই দামেশক-সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে বের করা ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্য জরুরি ছিল।
দামেশক বাদে শাম অঞ্চলের অন্যান্য নগরীর অবস্থা ছিল আরও দুর্বল। কিন্তু নগরীগুলো পরস্পর সংযুক্ত থাকায় ক্রুসেডারবিরোধী যুদ্ধপরিকল্পনায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছিল।
হামা নগরী ছিল দামেশক রাজ্যের অধীনস্থ। হামা থেকে আশেপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ওপর নজর রাখা যেত। তা ছাড়া হামার অবস্থান ছিল দুই ক্রুসেড রাজ্য এন্টিয়ক ও ত্রিপোলির কাছাকাছি।
হিমস তখন স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ছিল। এ সময় রাজ্যটির শাসক ছিলেন সামসামুদ্দৌলা খায়র খান বিন কুরাজা নামক জনৈক তুর্কি। তিনি ছিলেন জুলুম-অত্যাচারে প্রসিদ্ধ এক শাসক। অবশ্য এ অঞ্চলে তিনি একজন শক্তিমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন।
শাম অঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য শাইজার। রাজ্যটি ক্ষুদ্র, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে আরব আমির সুলতান বিন মুনকিয শাইজার রাজ্যটি শাসন করছিলেন। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, শাইজারের অবস্থান ছিল এন্টিয়কের একেবারে সন্নিকটে। (৩২৩)
টিকাঃ
৩১৭. দেখুন: আল-মাকরিজি, ইত্তিআ'জুল হুনাফা বি-আখবারিল আইম্মাতিল ফাতিমিয়ীনাল খুলাফা, ১/১২০।
৩১৮. দেখুন: ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৪-১৭৬।
৩১৯. দেখুন: ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৭৪-১৭৬।
৩২০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৮২।
৩২১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২১৩।
৩২২. দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৭৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১৪৮-১৪৯।
৩২৩. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২২৭-২২৮ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৪৫-২৪৬।
📄 [আট] জাযিরা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ
এই অঞ্চলটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটির অবস্থান উত্তর দিক থেকে দজলা ও ফুরাত নদীর মাঝে। আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন অংশ মিলে ছিল তৎকালীন জাযিরা অঞ্চল। ক্রুসেড রাজ্য এডেসা এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এডেসা রাজ্যের অবস্থান ছিল মসুলের অতি নিকটে। বরং মসুলকে জাযিরা অঞ্চলের একটি নগরী হিসেবেই গণ্য করা হতো। আর তাই ইমাদুদ্দিন জিনকির সামগ্রিক চিন্তা-পরিকল্পনায় এ অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল।
অতি দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্রুসেড রাজ্য এডেসার নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও অঞ্চলটি বিভিন্ন আরব, তুর্কমেন ও উরতুকি শাসকের মাঝে বিভক্ত ছিল। এ কথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, এই সীমিত পরিসরের অঞ্চলটি তখন গোটা দশেক আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল। কেবল তা-ই নয়; রাজ্যবিস্তারের লালসায় তারা লিপ্ত ছিল পারস্পরিক হানাহানিতে। (৩২৪)
টিকাঃ
৩২৪. দেখুন: মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়া বিলাদিশ-শাম, পৃষ্ঠা: ৯৮-৯৯।