📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [দশ] সমুন্নত প্রশাসনিক দক্ষতা

📄 [দশ] সমুন্নত প্রশাসনিক দক্ষতা


দক্ষ জনবল নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি এটিও একটি অপরিহার্য গুণ। একজন শাসক অনেক সময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবলে দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে শত্রুর মন জয় করে নেন এবং তাদের আনুগত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হন; কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের যথার্থ বিন্যাসে ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি যদি তার প্রশাসনিক দক্ষতাও থাকত, তাহলে তিনি এমন সুদৃঢ় প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হতেন, যা পরিস্থিতির সাময়িক জটিলতায় প্রভাবিত হতো না এবং সামান্য চেষ্টা ও স্বল্প ক্ষতির বিনিময়ে তার পক্ষে বৃহৎ কল্যাণ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন প্রথম স্তরের প্রশাসনিক ব্যক্তি। যদিও তিনি সিদ্ধান্ত ও শাসনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন; কিন্তু এ নীতি তিনি কেবল রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত জন-ভাগ্যনির্ধারক বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতেন। সাচিবিক, প্রাদেশিক ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি অধীনস্থ ও সহকারীদের ব্যাপক কর্মস্বাধীনতা প্রদান করতেন। তিনি তাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি তাদেরকে সমাজ ও জনমানুষের কল্যাণে উদ্ভাবনী চিন্তা-পরিকল্পনা করতেও আস্থা জোগাতেন। তিনি অধীনস্থদের যথাসম্ভব কম তিরস্কার করতেন। ফলে তারা দায়িত্ববোধে অনুপ্রাণিত হতো এবং অনুভব করত যে, এ রাষ্ট্র তাদের নিজেদের রাষ্ট্র। এ কারণেই তারা রাষ্ট্রের উন্নতির প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকত।
ইমাদুদ্দিন জিনকি পারতপক্ষে প্রশাসনে রদবদল ঘটাতেন না। ফলে সকলে নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগ চিত্তে কাজ করতে পারত; প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল থাকত।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তথ্য সংগ্রহে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি কেন্দ্রে এমনকি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও প্রতিনিধি ও গুপ্তচর নিয়োজিত থাকত। ফলে ছোট-বড় প্রতিটি তথ্য তার নখদর্পণে থাকত। আর তাই তিনি সময়-সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আকস্মিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, এমনটি খুব কমই ঘটেছে। বরং সব সময়ই তিনি কোনো বিষয় জটিল আকার ধারণ করার পূর্বেই তা সম্পর্কে অবগত হয়ে যেতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সূক্ষ্ম নজরদারি ও দক্ষ তথ্যসরবরাহ-ব্যবস্থার কারণে অন্য কোনো রাজ্যের আমির বা শাসকের পক্ষে তার অজ্ঞাতসারে তার রাজ্যসীমায় পা রাখা ছিল কার্যত অসম্ভব। অথচ সে যুগে বর্তমানের মতো রাজ্যসীমা সুস্পষ্ট নির্ধারিত থাকত না। তার অনুমতি ছাড়া কোনো দূত তার রাজ্য অতিক্রমের সাহস করত না। বহিঃরাষ্ট্রের কোনো দূত আগমন করলে সে জিনকি রাষ্ট্রে প্রবেশ করার পর থেকে প্রস্থান করা পর্যন্ত জিনকি প্রশাসনের একদল কর্মকর্তা তার সঙ্গে থাকত। ফলে দূতের পক্ষে স্বাধীনভাবে রাজ্যের অভ্যন্তরে ঘোরাফেরা করে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করার সুযোগ হতো না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নিজস্ব সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সকল সম্পদ নির্দিষ্ট একটি কেন্দ্রে রাখতেন না; বরং আলেপ্পো, মসুল ও সিনজার এই তিন স্থানে বিভক্ত করে রাখতেন। তিনি বলতেন, 'যদি তিন কেন্দ্রের কোনো একটিতে দুর্ঘটনা ঘটে বা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আমি ক্ষতিপূরণের জন্য অন্য দুটির সহায়তা গ্রহণ করতে পারব।
তিনি যোগাযোগ ও ডাকব্যবস্থা সহজ ও নিরাপদ করায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি এ বিষয়টি পূর্ণ উপলব্ধি করতেন যে, দ্রুত তথ্য সরবরাহ অনেক সময় একটি রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে বা যুদ্ধে জয় এনে দিতে পারে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি পেশাগত বিশেষজ্ঞতার প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তিনি সামরিক দক্ষতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করতেন না; কোনো আলিমকে দিতেন না সামরিক পদ। বাইরে থেকে কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলে প্রথমে তিনি তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠাতেন। তারা উপযুক্ত পদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই লোকটিকে রাজ্য ও জনগণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানদান করত। উদাহরণস্বরূপ সে যোদ্ধা বা সামরিক বিশেষজ্ঞ হলে তাকে সৈন্যদের কাছে পাঠানো হতো এবং সে জিনকি রাজ্যে অনুসৃত সমরনীতি জেনে নিত। দাপ্তরিক দায়িত্বে উপযুক্ত ব্যক্তিকে পাঠানো হতো সচিবদের কাছে, আলিম হলে পাঠানো হতো কাজিদের কাছে। এভাবে একজন নব-আগন্তুক ব্যক্তিকে সব ধরনের সহায়তা করা হতো। ঐতিহাসিক আবু শামা এ সম্পর্কে বলেন, 'এর ফলে লোকটি যেন নগরবাসীদের একজন হয়ে যেত!' অর্থাৎ এভাবে গঠনমূলক প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের ফলে নব-আগন্তুক অপরিচিত ব্যক্তিও জ্ঞানে-অভিজ্ঞতায় এমন উপযুক্ত হয়ে উঠত, যেন সে এ নগরীরই অধিবাসী; বাইরের কেউ নয়। বলাবাহুল্য, লোকটি সামরিক-প্রশাসনিক বা জ্ঞান-শাস্ত্র যে অঙ্গনেই পারদর্শী হোক, তার কর্মসংস্থান অনেক বেশি সহজ ও লাভজনক হতো। বিশেষত এ তথ্যটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনামলে বেতন-ভাতা ছিল অনেক বেশি।
ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদা বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতেন। তিনি যেকোনো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মন্দ ফলাফলটি নির্ণয় করে তা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি মসুলের দায়িত্ব লাভের পর মসুলে প্রবেশের পূর্বে তিকরিত দুর্গের নিকটস্থ বাওয়াজিয় জনপদে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মসুলবাসী যদি কোনো ধরনের বিদ্রোহের প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে যেন তাৎক্ষণিক নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে। অথচ মসুলবাসীর বিদ্রোহের সম্ভাবনা ছিল সুদূরপরাহত!
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রশাসনিক স্তর ও ধারাক্রমের প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কেউ যদি নিজের এক ধাপ উপরস্থ কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ স্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করত, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতেন। এ নীতির উপকার ছিল বহুবিধ। এতে অধস্তন কর্মচারীদের ওপর উপরস্থ কর্মকর্তার প্রভাব বজায় থাকত এবং কাজের গতি ও সূক্ষ্মতা বজায় থাকত। কারণ, স্বভাবতই উপরস্থ কর্মকর্তা যেসব তথ্য জানেন, সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা তা পুরোপুরি জানেন না। এ নীতি অবলম্বনের কারণে সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে সব বিষয়ে মাথা ঘামাতে হতো না বলে তার সময়ও অনেক বেঁচে যেত। এই নীতির আরেকটি কল্যাণ হলো, এর ফলে নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হতো না; বরং সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতেও অন্যদের মাধ্যমে সহজে দ্রুত কর্ম সম্পাদনের নিশ্চয়তা থাকত।
এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা হলো, একদিন ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পেলেন তার বিশেষ নিরাপত্তাপ্রহরীদের একটি দল একত্র হয়ে এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন তিনি তাদেরকে দেখতে পান। তিনি বুঝতে পারলেন, তারা তার কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ জানাতে চায়। নিরাপত্তারক্ষীরা জানাল যে, নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও এখনো তাদের ভাতা প্রদান করা হয়নি। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা অর্থসচিবের কাছে অভিযোগ জানিয়েছ?' তারা বলল, 'না'। তিনি এবার প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে হাজিব (রাজকীয় নিরাপত্তাবাহিনীর প্রধান)-কে বিষয়টি জানিয়েছ?' তারা এবারও উত্তর দিল, 'না, তাকেও জানাইনি।' তখন তিনি বললেন, 'ছোট-বড় যাবতীয় বিষয় যদি আমাকেই দেখতে হয়, তাহলে অর্থসচিবকে কেন এক লক্ষ দিনার প্রদান করা হচ্ছে?! কেন হাজিবকে আরও বড় অঙ্কের ভাতা প্রদান করা হচ্ছে?! তোমাদের উচিত ছিল প্রথমে অর্থসচিবকে জানানো। তিনি গড়িমসি করলে তোমরা হাজিবকে জানাতে পারতে। হাজিবও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সবশেষে আমার কাছে আসতে। আমি তাদের অবহেলার যথোপযুক্ত শাস্তি দিতাম। কিন্তু এখন তো তোমরাই অপরাধী!' উপস্থিত জনৈক আমির তাদের জন্য সুপারিশ না করলে তিনি হয়তো প্রশাসনিক ধারাভঙ্গের কারণে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করতেন।
তবে প্রহরীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেও তিনি বিষয়টি এভাবেই ছেড়ে দেননি; বরং তৎক্ষণাৎ তিনি অর্থসচিব ও প্রধান প্রহরীকে ডেকে পাঠালেন এবং তাদেরকে বললেন, 'এসব প্রহরী সব সময় আমার সঙ্গে থাকে, সফরে আমার সফরসঙ্গী হয়, রাজ্যে অবস্থানকালেও আমার আশেপাশে থাকে। আর তারা সফরে থাকা অবস্থায় তাদের যে খোরপোষের প্রয়োজন হয়, তাও আপনারা জানেন। তাদের বেতন-ভাতা প্রদানে যদি আপনারা এরূপ অবহেলা করেন, তাহলে যারা আমার কাছে থাকে না, তাদের সঙ্গে আপনাদের আচরণ কেমন?!'
অর্থসচিব ও হাজিব পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করতে পারলেন। তখনও সরকারি কোষাগার থেকে প্রহরীদের বেতন-ভাতা তাদের কাছে পৌঁছেনি। তাই হাজিব নিজের সম্পদ থেকেই তাদের পাওনা পরিশোধ করে দিয়ে কোষাগার থেকে ভাতা আসার অপেক্ষায় থাকলেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. ইমাদুদ্দিন জিনকির এই চমৎকার ভূমিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'এর মাধ্যমে তিনি একদিকে সৈন্যদেরকে অর্থসচিবের আনুগত্যের বিষয়ে সংশোধন করেন, অপরদিকে অর্থসচিবকেও সৈন্যদের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখার বিষয়ে সংশোধন করেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিত্ব যে এ জাতীয় তুচ্ছ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতে ঊর্ধ্বে, এ বিষয়টিও তিনি সকলকে বুঝিয়ে দেন।
আল্লাহ তাআলা মহান আদর্শপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি রহম করুন। তিনি একাই এক সম্প্রদায়ের প্রতীক ছিলেন। উম্মাহর ইতিহাসের সেই যুগসন্ধিক্ষণে আল্লাহ তাআলা তাকে নির্বাচন করেছিলেন উম্মাহর হৃত গৌরব ও হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে; দ্বীনের পতাকা সমুন্নত করতে এবং জাতির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন ‘প্রজন্মপুরুষ’।
প্রিয় পাঠক, পরবর্তী জানার বিষয়-বিভক্ত জাতিকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে ঐক্যের শক্তি পুনরুদ্ধার করতে এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হতে কী ছিল তার কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি?
সামনের পরিচ্ছেদে আমরা এ বিষয়ে অবগত হব, ইনশাআল্লাহ!
* * *

টিকাঃ
০০০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৪।
০০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৮ ও আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নুরিয়া ওয়াস- সালাহিয়া, ১/১১১।
০০৫. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২০৯।
৩০৬. শাকির আহমাদ আবু যায়দ, আল-হুরূবুস সালিবিয়্যাহ ওয়াল উসরাতুয যিনকিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৬৭।
৩০৭. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৬৩।
৩০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
৩০৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00