📄 [সাত] দৃঢ় সংকল্প ও স্থির সিদ্ধান্ত
এটি একজন সচেতন শাসকের অতি আবশ্যকীয় গুণ। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এরও অন্যতম গুণ ছিল এটি। যুগে যুগে শাসক-প্রশাসকদের দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা মুসলমানদের কত সুযোগ নষ্ট করেছে! জাতি-জীবনে দুর্যোগ-বিপর্যয় ত্বরান্বিত করেছে! কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন প্রতিটি বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। কোনো কাজ প্রয়োজন ও উপকারী মনে করলে তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং দ্বিধাহীন চিত্তে বাস্তবায়ন শুরু করতেন।
শাসনামলের শুরুতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বে তার পক্ষে এখন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি তাদের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেন। সেই সময়কাল শেষ হতেই আমরা দেখেছি তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন এবং তা চালিয়ে গেছেন; ক্রুসেডারদের কোনো শান্তিপ্রস্তাবই আর গ্রহণ করেননি। প্রথমে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব, এরপর অনবরত লড়াই-উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সংকল্প ও সিদ্ধান্তগ্রহণে স্থির-দ্বিধাহীন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেক সময় তিনি শেষে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতেন, আবার কখনো পরিস্থিতি যুদ্ধের অনুকূল না হলে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিতেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি জিদ দেখিয়ে লড়াই করার জন্য গোয়ার্তুমি করতেন না; বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন এবং তৎক্ষণাৎ তার বাস্তবায়ন ঘটাতেন। তার এই স্থিরচিত্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে সঙ্গীরাও অপ্রয়োজনীয় কষ্টক্লেশ থেকে বেঁচে যেত।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাহীনতার দৃষ্টান্ত তার জীবনে অসংখ্য; বরং তার পুরো জীবনই ছিল এর দৃষ্টান্ত! ইতিহাসের পরবর্তী অংশের ধারাবিবরণীতে আমরা যখন তার প্রশাসনিক ও সামরিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব, তখন বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।
📄 [আট] সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বলেন, 'ইমাদুদ্দিন জিনকি মহান-প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ ছিলেন।'
ইবনে আকিল রহ.-এর ভাষ্য অনুযায়ী রাজনীতির সংজ্ঞা হলো—
যে নীতির বাস্তবায়ন প্রকৃত অর্থেই জনগণকে অন্যায় বিমুখ করে ন্যায়মুখী করে, তা-ই রাজনীতি; এমনকি তা আসমানি ওহির ভাষ্য না হলেও এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রণীত না হলেও।
ইবনুল কায়্যিম রহ. রাজনীতির এই সংজ্ঞাই গ্রহণ করেছেন। স্বভাবতই এর অর্থ এই নয় যে, ইবনে আকিল শরিয়ত পরিহারের নীতিকে রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন। বরং তার উদ্দেশ্য, সমাজ সংশোধন ও জনগণকে অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত রাখতে যুগ ও পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী উপযোগী উপায়-উপকরণ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন।
আধুনিক পরিভাষায় রাজনীতির সংজ্ঞা জানতে গেলে রবার্ট ডিকশনারি বলে, 'মানবসমাজ পরিচালনা সংক্রান্ত শাস্ত্রের নাম রাজনীতি।' অপরদিকে 'আল-মুজামুল কানুনি'র ভাষ্য অনুসারে রাজনীতি হলো, 'সামাজিক বিষয়াদি পরিচালনা সংক্রান্ত শাস্ত্র বা নীতিমালা।'
মৌলিক ইসলামি পরিভাষা হোক বা আধুনিক আইনশাস্ত্রীয় পরিভাষা— সর্ববিচারে ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন উচ্চমার্গীয় রাজনীতিবিদ।
ইমাদুদ্দিন জিনকি বেড়ে উঠেছিলেন দুর্যোগ ও ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত এক যুগে। তাকে চলতে হয়েছে বিভিন্ন মানসিকতার নেতা, আমির ও বিক্ষিপ্ত মানসের জনতাকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্ম সম্পাদন ও সম্পর্ক রক্ষায় তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও সু-প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী। তিনি কারও সুসম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছেন বা কোনো আমিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, এমন ঘটনা একেবারেই বিরল। তিনি আপন সুষম সুসংহত চিন্তা-পরিকল্পনার মাধ্যমে যেকোনো জটিল থেকে জটিলতর সমাজও সফলভাবে পরিচালনা করতেন।
তিনি শক্তি ও কর্তৃত্বের উৎস ও কেন্দ্রসমূহ সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তাও গভীর দৃষ্টিতে অনুমানে সচেষ্ট হতেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি শব্দের ধারে ও উপাধির ভারে প্রবঞ্চিত হওয়ার লোক ছিলেন না। শুরু থেকেই তিনি জানতেন, সেলজুক সুলতানগণ খলিফাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এ কারণেই তিনি সেলজুকদের প্রতি দৃশ্যমান আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন। অবশ্য তিনি খলিফাদের সঙ্গে সদাচরণ এবং তাদের নৈকট্য অর্জনেও উদাসীন ছিলেন না। কিন্তু যখন সুলতান-খলিফা বিরোধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে যেত, তখন তিনি তার সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সুলতানের পক্ষ অবলম্বন করতেন।
পরবর্তী সময়ে যখন সেলজুক সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজেই মুসলিম উম্মাহর প্রধান শক্তিতে পরিণত হন, তখনও তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা করার পরিবর্তে আলপ আরসালানের নামে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত সম্ভাব্য ফিতনা-বিশৃঙ্খলা ও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র থেকে আত্মরক্ষা করেছিলেন। অথচ ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে তুলনা করলে সুলতান আলপ আরসালানের কোনো ওজনই ছিল না। কিন্তু এরই নাম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা; এর মাধ্যমে তিনি সুলতান আলপ আরসালান ও তার সমর্থক সেলজুকশক্তিকে শান্ত রেখেছিলেন, শান্ত রেখেছিলেন আমজনতাকেও।
ইমাদুদ্দিন জিনকি আপন বুদ্ধিদীপ্ত নীতি-কৌশলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে সৃষ্ট শত্রুপক্ষের ঐক্য ও সমঝোতা বিচ্ছিন্ন করে দিতেন। ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন ঐক্য প্রচেষ্টা বিচ্ছিন্নকরণে তার গৃহীত নীতি এর অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একইভাবে তিনি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মুসলিম শক্তির মৈত্রীপ্রচেষ্টাকেও কৌশলে বিনষ্ট করে দেন। নিঃসন্দেহে তার এসব প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি-কৌশল রাজনীতির ছাত্রদের বৈষয়িক পাঠ্য হতে পারে।
যথাসম্ভব স্বল্পতম ত্যাগ শিকার করে যুদ্ধজয় সুনিশ্চিতকরণ, শত্রুদুর্গের পতন এবং অধিকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে তার কিছু নিজস্ব কৌশলী চিন্তাধারা ছিল। তার কিছু কিছু নীতি-অবস্থানকে অনেকে প্রতারণা বলে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার সেসব অবস্থান ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ নববি নীতি 'যুদ্ধ হলো কৌশলের নাম'-এর যথার্থ অনুসরণ। মূলত তিনি এর মাধ্যমে বৃহত্তর সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিকে কৌশলে এড়িয়ে যেতেন। সামনে তার বিস্তারিত ইতিহাস আলোচনার সময় আমরা তার গৃহীত এ জাতীয় কিছু নীতি-কৌশল এবং সেগুলো অবলম্বনের যৌক্তিকতা তুলে ধরব।
তিনি তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিকেও মূল্যায়ন করতেন এবং সে ধূর্ত ও অসৎ হলেও তার থেকে উপকৃত হতে চেষ্টা করতেন। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আক সুনকুর আল-বুরসুকির মৃত্যুর পর জাওলি নামক জনৈক মামলুক মসুলের ক্ষমতা হস্তগত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে ইমাদুদ্দিন জিনকি উক্ত পদ লাভ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি জাওলির সঙ্গে আচরণেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন এবং তাকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আলেপ্পোর রাহবা অঞ্চলের জায়গিরের দায়িত্ব প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে তাকে প্রশান্ত করে তার অনিষ্ট-আশঙ্কা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেন, অপরদিকে তার যোগ্যতা ও শক্তিকে কাজে লাগান।
দুবাইস বিন সাদাকার বিষয়ে তার গৃহীত নীতি তো আরও বিস্ময়কর। বনু মাজিদ গোত্রের নেতা দুবাইস বিন সাদাকা ছিল কট্টরপন্থী ইসনা আশারিয়া (দ্বাদশ ইমামবাদী) শিয়া মতাদর্শী। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, চরম সন্ত্রাসী দুবাইস বাগদাদে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল এবং খলিফাকে পদচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়েছিল। সে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও সহযোগিতা বিনিময় করত। সর্ববিচারেই সে ছিল একজন ঘৃণিত ও নিকৃষ্ট লোক। এতৎসত্ত্বেও ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে দামেশকের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন এবং তাকে খলিফার কাছে সমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি দুবাইসকে একটি জায়গিরের তত্ত্বাবধান-দায়িত্বও প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে বিশাল বনু মাজিদ গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি বিভিন্নজনের সঙ্গে বিদ্যমান দুবাইসের সম্পর্ক ও দুবাইসপ্রদত্ত বিভিন্ন তথ্য দ্বারাও উপকৃত হতেন। সেলজুক সুলতান মাসউদ একবার ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করলে দুবাইস তা ইমাদুদ্দিনকে জানিয়ে দেয়। সুলতান মাসউদ যখন জানতে পারেন যে, দুবাইস বিন সাদাকাই তার গোপন ষড়যন্ত্র প্রকাশ করে দিয়েছে, তখন তিনি দুবাইসকে হত্যার নির্দেশ দিলে তাকে হত্যা করা হয়। এ সংবাদ জানার পর ইমাদুদ্দিন জিনকি মন্তব্য করেন, ‘আমরা তাকে অর্থের বিনিময়ে (বন্দিদশা থেকে) মুক্ত করেছিলাম; আর সে প্রাণের বিনিময়ে আমাদের রক্ষা করল!’
তিনি তার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী নেতাদের লালসা ও চাহিদা অনুমান করতে পারতেন এবং তাদেরকে তাদের প্রত্যাশিত বস্তু দিয়ে তুষ্ট রাখতেন। এর মাধ্যমে তিনি তাদের আনুগত্য ও বশ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতেন। যদিও অনেক সময়ই এসব সম্পর্ক হতো উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্বাভাবিক।
সৈন্যদের সঙ্গে তার আচরণনীতি ছিল কৌশলী ও ফলদায়ক। তিনি এক্ষেত্রে 'উদ্বুদ্ধকরণ-ভীতকরণমূলক যৌথ নীতি'র চমৎকার প্রয়োগ ঘটাতেন। যদিও তিনি তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিতেন, তাদের সঙ্গে কোমল ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করতেন; কিন্তু তার শাস্তিও ছিল কঠিন। তিনি কখনো দায়িত্ব পালনে অবহেলা মেনে নিতেন না। একবার তিনি জানতে পারেন যে, তার জনৈক সেনাপতি নারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছে। তিনি তখন সসৈন্য দূরের সফরে ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লোক পাঠিয়ে অভিযুক্ত সেনাপতিকে বরখাস্ত করেন এবং তার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। বরং এরপর যখন তিনি জানতে পারেন যে, বিষয়টি সরাসরি উত্ত্যক্ত করা পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তখন তিনি তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের নির্দেশ দেন। এরপর তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, 'দূর-দূরান্তের সফরে আমার সেনারা আমার সঙ্গে থাকে; খুব সামান্য সময় তারা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পায়। আমি যদি তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারের ওপর কারও অন্যায় হস্তক্ষেপে বাধা প্রদান না করি, তাহলে তো পরিবারগুলো শেষ হয়ে যাবে। এমন কঠোর শাস্তি দেখার পর ইমাদুদ্দিন জিনকির পুরো শাসনামলে আর কেউ নারীদের উত্ত্যক্ত করার দুঃসাহস দেখায়নি।
এ ঘটনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, একদিকে তিনি সৈন্যদের পরিবারের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ দরদ প্রকাশ করে এবং তাদের কল্যাণ বিবেচনায় একজন সেনাপতিকে বরখাস্ত করে সৈন্যদের মন জয় করে নিয়েছেন, অপরদিকে একই সঙ্গে যে তার নির্দেশ অমান্য করবে, শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করবে এবং অন্যায় কাজে জড়াবে, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের সতর্কবাণীও শুনিয়ে দিয়েছেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার নয়। পরিস্থিতি যত নাজুক ও জটিল হোক, আল্লাহ-প্রদত্ত তাওফিকে তিনি তার সর্বোত্তম সমাধান বের করে ফেলতেন। তর্কাতীতভাবেই তিনি ছিলেন উম্মাহর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, মহান ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ।
টিকাঃ
২৭৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৪০।
২৭৫. ইবনুল কাইয়্যিম, বাদাইয়ুল ফাওয়াইদ, ৩/৬৭৩।
২৭৬. The Collins-Robert French Dictionary.
২৭৭. আল-মুজামুল কানুনি।
২৭৮. প্রয়াত সেলজুক সুলতান মাহমুদের পুত্র। সুলতান মাহমুদ তার যে দুই পুত্রের প্রতিপালনের দায়িত্ব ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দিয়েছিলেন, এই আলপ আরসালান তাদের একজন। [সম্পাদক]
২৭৯. ইবনুল আছির উল্লেখ করেন, ইমাদুদ্দিন জিনকি বার্তা প্রেরণ বা কোনো দূতের সঙ্গে কথা বলার সময় বলতেন, 'সুলতান এরূপ বলেছেন।' আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭১।
২৮০. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২২৭।
২৮১. দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২।
২৮২. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়াশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
২৮৩. যারা তাকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন, তাদের মাঝে ইবনুল আদিমও আছেন। দেখুন: যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৩।
২৮৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৪।
২৮৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৮-২৫৯।
২৮৬. ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাজাম, ১০/৫৩।
২৮৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫০।
২৮৮. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৬১।
২৮৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮৪।
📄 [নয়] ব্যক্তিত্ব নির্ণয় যোগ্যতা
যদিও ব্যক্তিত্ব নির্ণয় ও মানুষ চিনতে পারার যোগ্যতা একজন নেতা ও শাসকের জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় গুণ; কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, এটি অতি বিরল ও সর্বজনকাম্য একটি গুণ। এক্ষেত্রেও ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতা অনুমান করতে পারতেন; উত্তম গুণাবলি ও বিরল প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিদের চিনে নিয়ে তাদেরকে কাছে টেনে নিতেন এবং দুষ্টচিত্ত ও দুর্বল যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চিনে নিয়ে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। এর ফলে তার চারপাশে কিছু সৎ ও যোগ্য সঙ্গী সমবেত হয়েছিল এবং এর প্রভাবে তার রাজ্য ও প্রশাসন শক্তিশালী ও সুসংহত হয়েছিল।
তার ব্যক্তি চেনার উদাহরণ হিসেবে এটাই যথেষ্ট যে, তিনি তার প্রশাসনের জন্য বেছে নিয়েছিলেন জামালুদ্দিন ইস্পাহানি রহ.-এর মতো ব্যক্তিকে। তাকে তিনি নুসায়বিন অঞ্চলের জায়গির প্রদান করেন। জামালুদ্দিন ইস্পাহানি ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম আলিম। মহত্ত্ব ও অধিক দানশীলতার কারণে তার উপাধি হয়ে গিয়েছিল 'জাওয়াদ' (অতি বদান্য)। জনগণ যখন কোনো দুর্যোগের শিকার হতো, তখন তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এত বেশি খরচ করতেন যে, আল্লাহ তাআলা এর ওসিলায় সংকট দূর করে দিতেন। তিনি ছিলেন মহান কল্যাণকামী ও অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি। শুধু ইমাদুদ্দিন জিনকিই নয়; পরবর্তী সময়ে তিনি ইমাদুদ্দিনের পুত্রদের প্রশাসনেও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করেছেন। পিতার প্রতি আনুগত্যবোধ থেকে পুত্রদের সহযোগিতা করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি।
ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনের আরেক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র নাসিরুদ্দিন জাকার। নাসিরুদ্দিন জাকার ছিলেন গভীর কূটনীতিজ্ঞান ও সামরিক দক্ষতার অধিকারী। তিনি মসুলে ইমাদুদ্দিন জিনকির নায়েব ছিলেন।
প্রকৃত বিচারেই তিনি ছিলেন 'সঠিক পদে সঠিক ব্যক্তি'র উত্তম দৃষ্টান্ত। ইমাদুদ্দিন জিনকি যখন মসুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, মসুল তখন অব্যাহত ফিতনায় বিপর্যস্ত। নাসিরুদ্দিন কৌশলে পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরেন, অর্থনীতির চাকা সচল ও বিন্যস্ত করেন, শান্তি ফিরিয়ে আনেন এবং নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থা সুদৃঢ় করেন। তিনি ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত। বহুবার তিনি নিজেকে ঝুঁকির মুখে ফেলে ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। একবার সমকালীন আব্বাসি খলিফা মসুল অবরোধ করলে তিনি পূর্ণ তিন মাস ধৈর্যের সঙ্গে অটল থেকে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন এবং আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। অথচ এ সময় খলিফা মসুলের পতন ঘটাতে পারলে হত্যাই হতো নাসিরুদ্দিনের নিশ্চিত পরিণতি। বরং পরবর্তী সময়ে নাসিরুদ্দিন জাকার জীবন দিয়েই ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি তার বিশ্বস্ততার মূল্য পরিশোধ করেন। বিদ্রোহীরা ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করে এবং মসুলের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়। অবশ্য আল্লাহ তাআলা ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনক্ষমতা রক্ষার জন্য অন্যদের নিয়োজিত করে দেওয়ায় বিদ্রোহীদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
নাসিরুদ্দিন জাকারের জুলুম ও অন্যায় রক্তপাতের যেসব বিবরণ পাওয়া যায়, তা সম্পূর্ণই ভুল বিশ্লেষণ হতে উদ্ভূত। মসুলের তৎকালীন পরিস্থিতি এবং নাসিরুদ্দিন জাকারকে ঘিরে থাকা হাজারো বিপদের প্রতি লক্ষ না করেই এসব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে গৃহীত পদক্ষেপের নাম জুলুম নয়। অপরাধী ঘাতক বা ফিতনার উসকানিদাতাকে শাস্তি হিসেবে কিসাস প্রয়োগ করার নাম অন্যায় রক্তপাত নয়।
ইবনুল কালানিসি যায়লু তারীখি দিমাশক গ্রন্থে নাসিরুদ্দিন জাকার সম্পর্কে বলেন, 'তার সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের এবং জুলুম-অত্যাচার পরিহারের অনেক বর্ণনা রয়েছে। ইবনুল কালানিসি একই মর্মবাহী আরও অনেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে এই ফলাফলই বের হয়ে আসে যে, নাসিরুদ্দিন জাকারের গৃহীত নীতি ও পন্থা ছিল প্রশংসনীয় এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সরল ও সঠিক।
ইমাদুদ্দিন জিনকির আরেক উজির ছিলেন জিয়াউদ্দিন আবু সাঈদ ইবনুল কাফারতুসি। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য অনুসারে তিনি ছিলেন সদাচারী, প্রজ্ঞাবান, মহৎ ও অভিজাত এবং সন্তোষজনক রাজনৈতিক বিবেচনাবোধের অধিকারী। ব্যক্তি ও নেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বনামধন্য।
ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনের আরেক সমুজ্জ্বল ব্যক্তি ছিলেন যায়নুদ্দিন আলি কাজাক বিন বুকতেকিন। দেখুন ঐতিহাসিক ইবনুল আছির তার সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, 'যায়নুদ্দিন ছিলেন সৎ ও সদাচারী; রণদক্ষতা, বীরত্ব ও দুঃসাহসিকতায় খ্যাতিমান; দরিদ্র- অসহায়দের প্রতি দয়ার্দ্র এবং অসুস্থদের প্রতি সহানুভূতিশীল। অঙ্গীকার ও আমানত রক্ষায় তার প্রসিদ্ধি ছিল। কখনো প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা করতেন না।'
এভাবে কজনের নাম উল্লেখ করব! এগুলো অনেকজনের মাঝে কয়েকজনের উদাহরণমাত্র। ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসনের সকল নায়েব, সেনাপতি ও উজিরের আলোচনা করার মতো বিস্তৃত ক্ষেত্র এটি নয়। এমনই ছিল ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রশাসন! এরাই ছিলেন তার ঘনিষ্ঠজন এবং তার রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকর্তা!
তিনি কখনো সুযোগ হাতছাড়া করতেন না; বরং প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশলে যোগ্য ও উপযুক্ত লোকেদের সংগ্রহ করে নিতেন এবং সুনিপুণ দক্ষতায় তাদের সক্ষমতা কাজে লাগাতেন। তিনি একবার জানতে পারেন যে, দামেশকের জনৈক সেনাপতি পালিয়ে গেছে। দামেশক সব সময়ই ইমাদুদ্দিনের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুভাবাপন্ন ছিল। পলাতক সেই সেনাপতি ছিলেন সিওয়ার বিন আবতেকিন। ইমাদুদ্দিন তার যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা শুনেছিলেন। তিনি তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং আস্থাভাজন করে নেন। যদিও সিওয়ার বিন আবতেকিন তখন অসহায় অবস্থায় ছিলেন; কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি তার মর্যাদা হ্রাস করার পরিবর্তে তাকে সমুন্নত পদমর্যাদা প্রদান করেন। তিনি তাকে অনেকগুলো জায়গির প্রদান করেন; বরং আলেপ্পো ও তৎসংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সিওয়ার বিন আবতেকিনের ওপর আস্থা রাখতেন।
সিওয়ার বিন আবতেকিনের অত্যুচ্চ সামরিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল। সিওয়ার বিভিন্ন যুদ্ধে এবং আলেপ্পোর নিরাপত্তা রক্ষায় ইমাদুদ্দিন জিনকির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ৫২৪ হিজরি সনে দামেশক থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে ৫৪১ হিজরি সনে ইমাদুদ্দিন জিনকি নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সতেরো বছর সিওয়ার স্বপদে বহাল ছিলেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি যেমন মানুষ চিনতেন, তেমনই মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন করতেন এবং উপযুক্ত ভাতা নির্ধারণ করতেন। তিনি কামালুদ্দিন শাহরাযুরিকে বছরে দশ হাজার দিনারের বিরাট অঙ্কের ভাতা প্রদান করতেন। একবার তাকে বলা হলো, 'কামালুদ্দিনের বার্ষিক আয় দশ হাজার দিনারের ঊর্ধ্বে। অথচ অন্যরা তো পাঁচশ দিনারেই তুষ্ট থাকে।' তিনি উত্তর দিলেন, 'এই বুদ্ধি নিয়ে তোমরা আমার রাজ্য চালাও?! আরে! কামালুদ্দিনের জন্য তো এটিও অনেক কম আর অন্যদের জন্য পাঁচশ দিনারও বেশি। কামালুদ্দিনের সম্পাদিত একেকটি কাজ এক লক্ষ দিনার হতেও উত্তম। '
ইমাদুদ্দিন জিনকি কারও ব্যক্তিত্ব নির্ণয়ে দ্বিধান্বিত হলে তাকে পরীক্ষা করে দেখতেন, সে নেতৃত্ব ও আমানত রক্ষার যোগ্য কি না। এ সম্পর্কিত একটি চমকপ্রদ ঘটনা হলো, তিনি একবার তার পরিচ্ছদ-কর্মকর্তার বিশ্বস্ততা, কর্মস্বচ্ছতা ও কাজের প্রতি গুরুত্ব যাচাই করার মনস্থ করলেন। তিনি লোকটিকে পেস্তা ও বাদামের তৈরি একটি পিঠা দিয়ে বললেন, 'এটা যত্ন করে রাখবে; আমি যেকোনো সময় চাইতে পারি।' পূর্ণ এক বছর পর তিনি লোকটিকে ডেকে পাঠালেন এবং পিঠাটি চাইলেন। লোকটি তার সঙ্গে থাকা একটি রুমাল থেকে পিঠাটি বের করে দিল। সে বিশেষ এক পদ্ধতিতে এক বছর ধরে পিঠাটি সংরক্ষণ করেছিল। ইমাদুদ্দিন খুশি হয়ে তাকে মসুলের ‘কাওয়াশা’ দুর্গের দায়িত্ব প্রদান করলেন।
এভাবেই ইমাদুদ্দিন জিনকি তার রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা করতেন। নিঃসন্দেহে যোগ্যতা, দক্ষতা ও কৌশলগত সক্ষমতার এরূপ যুগপৎ সমাবেশ খুব কম লোকের মধ্যেই হয়।
টিকাঃ
২৯০. আরবি নাম نَصِيبين (নাসীবীন), ইংরেজি নাম Nusaybin (নুসায়বিন)। [সম্পাদক]
২৯১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৪৭১ ও ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আয়ান, ৫/১৪৩-১৪৫।
২৯২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮৪-৮৫।
২৯৩. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, ১/৩৬৪।
২৯৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭০।
২৯৫. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, ১/৩৬৫।
২৯৬. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৭৫।
২৮৭. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৭৪ ও ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫৪।
২৮৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৩৫।
২৯৯. ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ২৪০-২৪১।
৩০০. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২৪৬।
০০১. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৫৯-১৬০।
৩০২. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১০০।
📄 [দশ] সমুন্নত প্রশাসনিক দক্ষতা
দক্ষ জনবল নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি এটিও একটি অপরিহার্য গুণ। একজন শাসক অনেক সময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবলে দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে শত্রুর মন জয় করে নেন এবং তাদের আনুগত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হন; কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের যথার্থ বিন্যাসে ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি যদি তার প্রশাসনিক দক্ষতাও থাকত, তাহলে তিনি এমন সুদৃঢ় প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হতেন, যা পরিস্থিতির সাময়িক জটিলতায় প্রভাবিত হতো না এবং সামান্য চেষ্টা ও স্বল্প ক্ষতির বিনিময়ে তার পক্ষে বৃহৎ কল্যাণ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন প্রথম স্তরের প্রশাসনিক ব্যক্তি। যদিও তিনি সিদ্ধান্ত ও শাসনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন; কিন্তু এ নীতি তিনি কেবল রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত জন-ভাগ্যনির্ধারক বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতেন। সাচিবিক, প্রাদেশিক ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি অধীনস্থ ও সহকারীদের ব্যাপক কর্মস্বাধীনতা প্রদান করতেন। তিনি তাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি তাদেরকে সমাজ ও জনমানুষের কল্যাণে উদ্ভাবনী চিন্তা-পরিকল্পনা করতেও আস্থা জোগাতেন। তিনি অধীনস্থদের যথাসম্ভব কম তিরস্কার করতেন। ফলে তারা দায়িত্ববোধে অনুপ্রাণিত হতো এবং অনুভব করত যে, এ রাষ্ট্র তাদের নিজেদের রাষ্ট্র। এ কারণেই তারা রাষ্ট্রের উন্নতির প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকত।
ইমাদুদ্দিন জিনকি পারতপক্ষে প্রশাসনে রদবদল ঘটাতেন না। ফলে সকলে নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগ চিত্তে কাজ করতে পারত; প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল থাকত।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তথ্য সংগ্রহে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি কেন্দ্রে এমনকি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও প্রতিনিধি ও গুপ্তচর নিয়োজিত থাকত। ফলে ছোট-বড় প্রতিটি তথ্য তার নখদর্পণে থাকত। আর তাই তিনি সময়-সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আকস্মিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, এমনটি খুব কমই ঘটেছে। বরং সব সময়ই তিনি কোনো বিষয় জটিল আকার ধারণ করার পূর্বেই তা সম্পর্কে অবগত হয়ে যেতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির সূক্ষ্ম নজরদারি ও দক্ষ তথ্যসরবরাহ-ব্যবস্থার কারণে অন্য কোনো রাজ্যের আমির বা শাসকের পক্ষে তার অজ্ঞাতসারে তার রাজ্যসীমায় পা রাখা ছিল কার্যত অসম্ভব। অথচ সে যুগে বর্তমানের মতো রাজ্যসীমা সুস্পষ্ট নির্ধারিত থাকত না। তার অনুমতি ছাড়া কোনো দূত তার রাজ্য অতিক্রমের সাহস করত না। বহিঃরাষ্ট্রের কোনো দূত আগমন করলে সে জিনকি রাষ্ট্রে প্রবেশ করার পর থেকে প্রস্থান করা পর্যন্ত জিনকি প্রশাসনের একদল কর্মকর্তা তার সঙ্গে থাকত। ফলে দূতের পক্ষে স্বাধীনভাবে রাজ্যের অভ্যন্তরে ঘোরাফেরা করে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করার সুযোগ হতো না।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার নিজস্ব সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সকল সম্পদ নির্দিষ্ট একটি কেন্দ্রে রাখতেন না; বরং আলেপ্পো, মসুল ও সিনজার এই তিন স্থানে বিভক্ত করে রাখতেন। তিনি বলতেন, 'যদি তিন কেন্দ্রের কোনো একটিতে দুর্ঘটনা ঘটে বা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আমি ক্ষতিপূরণের জন্য অন্য দুটির সহায়তা গ্রহণ করতে পারব।
তিনি যোগাযোগ ও ডাকব্যবস্থা সহজ ও নিরাপদ করায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি এ বিষয়টি পূর্ণ উপলব্ধি করতেন যে, দ্রুত তথ্য সরবরাহ অনেক সময় একটি রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে বা যুদ্ধে জয় এনে দিতে পারে।
ইমাদুদ্দিন জিনকি পেশাগত বিশেষজ্ঞতার প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। তিনি সামরিক দক্ষতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করতেন না; কোনো আলিমকে দিতেন না সামরিক পদ। বাইরে থেকে কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হলে প্রথমে তিনি তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠাতেন। তারা উপযুক্ত পদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই লোকটিকে রাজ্য ও জনগণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানদান করত। উদাহরণস্বরূপ সে যোদ্ধা বা সামরিক বিশেষজ্ঞ হলে তাকে সৈন্যদের কাছে পাঠানো হতো এবং সে জিনকি রাজ্যে অনুসৃত সমরনীতি জেনে নিত। দাপ্তরিক দায়িত্বে উপযুক্ত ব্যক্তিকে পাঠানো হতো সচিবদের কাছে, আলিম হলে পাঠানো হতো কাজিদের কাছে। এভাবে একজন নব-আগন্তুক ব্যক্তিকে সব ধরনের সহায়তা করা হতো। ঐতিহাসিক আবু শামা এ সম্পর্কে বলেন, 'এর ফলে লোকটি যেন নগরবাসীদের একজন হয়ে যেত!' অর্থাৎ এভাবে গঠনমূলক প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের ফলে নব-আগন্তুক অপরিচিত ব্যক্তিও জ্ঞানে-অভিজ্ঞতায় এমন উপযুক্ত হয়ে উঠত, যেন সে এ নগরীরই অধিবাসী; বাইরের কেউ নয়। বলাবাহুল্য, লোকটি সামরিক-প্রশাসনিক বা জ্ঞান-শাস্ত্র যে অঙ্গনেই পারদর্শী হোক, তার কর্মসংস্থান অনেক বেশি সহজ ও লাভজনক হতো। বিশেষত এ তথ্যটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনামলে বেতন-ভাতা ছিল অনেক বেশি।
ইমাদুদ্দিন জিনকি সর্বদা বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতেন। তিনি যেকোনো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মন্দ ফলাফলটি নির্ণয় করে তা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি মসুলের দায়িত্ব লাভের পর মসুলে প্রবেশের পূর্বে তিকরিত দুর্গের নিকটস্থ বাওয়াজিয় জনপদে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মসুলবাসী যদি কোনো ধরনের বিদ্রোহের প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে যেন তাৎক্ষণিক নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে। অথচ মসুলবাসীর বিদ্রোহের সম্ভাবনা ছিল সুদূরপরাহত!
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রশাসনিক স্তর ও ধারাক্রমের প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কেউ যদি নিজের এক ধাপ উপরস্থ কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ স্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করত, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতেন। এ নীতির উপকার ছিল বহুবিধ। এতে অধস্তন কর্মচারীদের ওপর উপরস্থ কর্মকর্তার প্রভাব বজায় থাকত এবং কাজের গতি ও সূক্ষ্মতা বজায় থাকত। কারণ, স্বভাবতই উপরস্থ কর্মকর্তা যেসব তথ্য জানেন, সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা তা পুরোপুরি জানেন না। এ নীতি অবলম্বনের কারণে সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে সব বিষয়ে মাথা ঘামাতে হতো না বলে তার সময়ও অনেক বেঁচে যেত। এই নীতির আরেকটি কল্যাণ হলো, এর ফলে নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হতো না; বরং সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতেও অন্যদের মাধ্যমে সহজে দ্রুত কর্ম সম্পাদনের নিশ্চয়তা থাকত।
এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা হলো, একদিন ইমাদুদ্দিন জিনকি দেখতে পেলেন তার বিশেষ নিরাপত্তাপ্রহরীদের একটি দল একত্র হয়ে এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন তিনি তাদেরকে দেখতে পান। তিনি বুঝতে পারলেন, তারা তার কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ জানাতে চায়। নিরাপত্তারক্ষীরা জানাল যে, নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও এখনো তাদের ভাতা প্রদান করা হয়নি। ইমাদুদ্দিন জিনকি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা অর্থসচিবের কাছে অভিযোগ জানিয়েছ?' তারা বলল, 'না'। তিনি এবার প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে হাজিব (রাজকীয় নিরাপত্তাবাহিনীর প্রধান)-কে বিষয়টি জানিয়েছ?' তারা এবারও উত্তর দিল, 'না, তাকেও জানাইনি।' তখন তিনি বললেন, 'ছোট-বড় যাবতীয় বিষয় যদি আমাকেই দেখতে হয়, তাহলে অর্থসচিবকে কেন এক লক্ষ দিনার প্রদান করা হচ্ছে?! কেন হাজিবকে আরও বড় অঙ্কের ভাতা প্রদান করা হচ্ছে?! তোমাদের উচিত ছিল প্রথমে অর্থসচিবকে জানানো। তিনি গড়িমসি করলে তোমরা হাজিবকে জানাতে পারতে। হাজিবও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সবশেষে আমার কাছে আসতে। আমি তাদের অবহেলার যথোপযুক্ত শাস্তি দিতাম। কিন্তু এখন তো তোমরাই অপরাধী!' উপস্থিত জনৈক আমির তাদের জন্য সুপারিশ না করলে তিনি হয়তো প্রশাসনিক ধারাভঙ্গের কারণে তাদেরকে শাস্তি প্রদান করতেন।
তবে প্রহরীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেও তিনি বিষয়টি এভাবেই ছেড়ে দেননি; বরং তৎক্ষণাৎ তিনি অর্থসচিব ও প্রধান প্রহরীকে ডেকে পাঠালেন এবং তাদেরকে বললেন, 'এসব প্রহরী সব সময় আমার সঙ্গে থাকে, সফরে আমার সফরসঙ্গী হয়, রাজ্যে অবস্থানকালেও আমার আশেপাশে থাকে। আর তারা সফরে থাকা অবস্থায় তাদের যে খোরপোষের প্রয়োজন হয়, তাও আপনারা জানেন। তাদের বেতন-ভাতা প্রদানে যদি আপনারা এরূপ অবহেলা করেন, তাহলে যারা আমার কাছে থাকে না, তাদের সঙ্গে আপনাদের আচরণ কেমন?!'
অর্থসচিব ও হাজিব পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করতে পারলেন। তখনও সরকারি কোষাগার থেকে প্রহরীদের বেতন-ভাতা তাদের কাছে পৌঁছেনি। তাই হাজিব নিজের সম্পদ থেকেই তাদের পাওনা পরিশোধ করে দিয়ে কোষাগার থেকে ভাতা আসার অপেক্ষায় থাকলেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. ইমাদুদ্দিন জিনকির এই চমৎকার ভূমিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'এর মাধ্যমে তিনি একদিকে সৈন্যদেরকে অর্থসচিবের আনুগত্যের বিষয়ে সংশোধন করেন, অপরদিকে অর্থসচিবকেও সৈন্যদের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখার বিষয়ে সংশোধন করেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিত্ব যে এ জাতীয় তুচ্ছ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতে ঊর্ধ্বে, এ বিষয়টিও তিনি সকলকে বুঝিয়ে দেন।
আল্লাহ তাআলা মহান আদর্শপুরুষ ইমাদুদ্দিন জিনকির প্রতি রহম করুন। তিনি একাই এক সম্প্রদায়ের প্রতীক ছিলেন। উম্মাহর ইতিহাসের সেই যুগসন্ধিক্ষণে আল্লাহ তাআলা তাকে নির্বাচন করেছিলেন উম্মাহর হৃত গৌরব ও হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে; দ্বীনের পতাকা সমুন্নত করতে এবং জাতির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন ‘প্রজন্মপুরুষ’।
প্রিয় পাঠক, পরবর্তী জানার বিষয়-বিভক্ত জাতিকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে ঐক্যের শক্তি পুনরুদ্ধার করতে এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হতে কী ছিল তার কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি?
সামনের পরিচ্ছেদে আমরা এ বিষয়ে অবগত হব, ইনশাআল্লাহ!
* * *
টিকাঃ
০০০. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৮৪।
০০৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭৮ ও আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নুরিয়া ওয়াস- সালাহিয়া, ১/১১১।
০০৫. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২০৯।
৩০৬. শাকির আহমাদ আবু যায়দ, আল-হুরূবুস সালিবিয়্যাহ ওয়াল উসরাতুয যিনকিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৬৭।
৩০৭. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৬৩।
৩০৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৪৩।
৩০৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮৩।