📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [পাঁচ] হৃদয়-কোমলতা ও সংবেদনশীলতা

📄 [পাঁচ] হৃদয়-কোমলতা ও সংবেদনশীলতা


হয়তো অনেকেই ইমাদুদ্দিন জিনকির স্বভাবে এই গুণটির উপস্থিতিতে আশ্চর্য হবেন; চমকে উঠবেন ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করে একজন মুসলিম শাসকের গুণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়-শীর্ষক আমাদের এ আলোচনায় এই গুণটির উপস্থাপনে।
বিস্ময়ের কারণ হলো, সামরিক অঙ্গনে নেতৃত্বদানকারী শাসকগণ সাধারণত রূঢ়তা, রুক্ষতা, স্বভাবজাত কঠোরতা ইত্যাদি গুণে প্রসিদ্ধ হয়ে থাকেন। যেহেতু দায়িত্ব পালনের খাতিরে তাদের শরিয়তের বিভিন্ন দণ্ডবিধান কার্যকর করতে হয় এবং কখনো কখনো শাস্তিদানের বিভিন্ন মাধ্যম গ্রহণ করতে হয়, তাই তাদের কোমলতাবিবর্জিত চিত্রই সাধারণত আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।
আফসোসের বিষয়, স্বয়ং ইমাদুদ্দিন জিনকিকে নিয়ে রচিত কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে তাকে কঠোর, নির্দয় ও রুক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দয়ার্দ্রতা, হৃদয়-কোমলতা ইত্যাদি একজন মুসলিম শাসকের অত্যাবশ্যকীয় গুণ। স্বয়ং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সর্বোচ্চ স্তরের শাসক, সেনাপতি ও মুজাহিদ ছিলেন, ছিলেন মানবজগতের শ্রেষ্ঠতম কোমল-দয়ালু মানব। সৎ শাসকদের অপরিহার্য এই গুণটি ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর মাঝেও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু কর্মমুখর সংগ্রামী জীবন, আজীবন বিভিন্ন কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মব্যস্ততা, দখলদার ক্রুসেডারদের হাত থেকে ইসলামি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের অব্যাহত প্রচেষ্টা ইত্যাদি কারণে তার প্রকৃত স্বভাবের বিপরীত রুক্ষ ও কঠোর একটি চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
আমরা ইতিপূর্বে কৃষকদের প্রতি তার মহানুভবতা প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি কৃষকের ফসল, সম্পদ, ক্ষেত-খামার এমনকি তুচ্ছ খড়-কুটার বিষয়ে তার সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা। এমনটি একজন সহৃদয় ও অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ব্যক্তি ছাড়া কারও পক্ষেই করা সম্ভব নয়।
তিনি একবার ভুল করলেই কাউকে পাকড়াও করতেন না; বরং বারবার ক্ষমা করতেন, যথাসম্ভব শেষ সীমা পর্যন্ত ছাড় দিতেন। তিনি তার প্রশাসনের এমন কোনো দায়িত্বশীলকেই কেবল বরখাস্ত করতেন, যে বারবার ভুল করত বা ক্ষমার অযোগ্য বড় কোনো অন্যায় করত। এ কারণেই তিনি যাদেরকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই আমৃত্যু বা খোদ ইমাদুদ্দিন জিনকির মৃত্যু পর্যন্ত নিজ পদে বহাল ছিল। এর কারণ একটাই; ইমাদুদ্দিন সর্বদা যথাসম্ভব তাদের ভুলত্রুটি উপেক্ষা করে চলতেন।
প্রতি শুক্রবার প্রকাশ্যে একশ দিনার দান করা ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর স্বভাব-রীতি ছিল। দরিদ্র-অসহায়দের প্রতি দয়ার অনুভূতি থেকে তিনি এ দান করতেন। প্রকাশ্যে দান করতেন, যেন সমাজের ধনী ব্যক্তিরা তার অনুকরণে দান করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং দানের কল্যাণচর্চা ব্যাপকতর হয়। এর বাইরে তিনি প্রতিদিন গোপনে বড় অঙ্কের দান করতেন, যা তার উজির ছাড়া কেউ জানত না। এ সম্পর্কিত একটি চমকপ্রদ ঘটনা ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়।
ইমাদুদ্দিন জিনকি একদিন ঘোড়ায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটি লাফিয়ে উঠলে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেন। এ সময় তিনি তার সঙ্গে থাকা জনৈক আমিরকে ডেকে বিষণ্ণ বা ক্রোধান্বিত স্বরে কিছু বললেন। লোকটি তার কথা বুঝতে পারল না; তবে এতটুকু অনুভব করতে পারল যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে আছেন। সে মনে করল, ইমাদুদ্দিন তার ওপরই রাগ করেছেন। কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকিকে প্রশ্ন করে অসন্তুষ্টির কারণ জিজ্ঞেস করার সাহস তার হলো না। লোকটি ত্রস্তপদে বাড়িতে ফিরে স্ত্রীকে নিজের ভয়ের কথা জানাল যে, তার হয়তো কোনো ভুল হয়ে গেছে। স্ত্রী তাকে বলল, 'আপনি ইমাদুদ্দিন জিনকির নায়েব (সহকারী) নাসিরুদ্দিন জাকারের সঙ্গে কথা বলুন; তিনি হয়তো আপনাকে কোনো সমাধান বাতলে দেবেন।' উক্ত আমির কালবিলম্ব না করে নাসিরুদ্দিনের কাছে গিয়ে ঘটনাটি জানাল। নাসিরুদ্দিন তাকে বললেন, 'তিনি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হননি; তিনি আসলে তোমার কাছে এই থলেটি চাচ্ছিলেন!' এ কথা বলে নাসিরুদ্দিন জাকার একটি থলে বের করে লোকটিকে দিলেন। লোকটি তা ইমাদুদ্দিন জিনকির কাছে নিয়ে গেলে তিনি খুশি মনে তা গ্রহণ করলেন। এরপর লোকটি পুনরায় নাসিরুদ্দিন জাকারের কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কী করে বুঝলেন যে, তিনি এই থলেটিই চাচ্ছিলেন?' নাসিরুদ্দিন উত্তর দিলেন, 'তিনি প্রতিদিন এই পরিমাণ সম্পদ দান করেন এবং রাতেই লোক পাঠিয়ে আমার কাছ থেকে তা নিয়ে নেন। আজ তিনি কাউকে পাঠাননি। এরই মধ্যে খবর পেলাম যে, ঘোড়া হঠাৎ লাফিয়ে ওঠায় তিনি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। এরপরই তিনি তোমাকে আমার কাছে পাঠালেন। বুঝতে পারলাম যে, তিনি তোমাকে দানের কথাই বলেছেন।'
ইমাদুদ্দিন জিনকি দানে বিলম্ব বা বিস্মৃতির সঙ্গে ঘোড়ার হোঁচট খাওয়ার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এটি তার তীব্র সংবেদনশীলতা, অনুভূতির কোমলতা এবং ঘটনা-দুর্ঘটনায় শিক্ষাগ্রহণে মনোযোগী হওয়ার দলিল। আর এ সবকিছু হৃদয় কোমল ও নমনীয় হলেই হয়ে থাকে। এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, তিনি অব্যাহত যুদ্ধ, যুদ্ধ-পরিকল্পনা ও একটি রাষ্ট্রের পূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যস্ততা সত্ত্বেও প্রতিদিন গরিব-অসহায়দের দান করতে ভুলতেন না।
নিঃসন্দেহে দয়া ও দানদক্ষিণা তার কৃত্রিম গুণ নয়; বরং হৃদয়ে প্রোথিত গুণ ছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির দয়ার্দ্রচিত্ততার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও তার প্রতি কারও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণের কথা ভুলে যেতেন না। নাজমুদ্দিন আইয়ুবের সঙ্গে তার এ সংক্রান্ত ঘটনা তো অতি প্রসিদ্ধ।
নাজমুদ্দিন আইয়ুব ৫২৬ হিজরি সনে (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকির একটি উপকার করেছিলেন। এ সময় ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে পরাজিত হলে নাজমুদ্দিন আইয়ুব তাকে তিকরিত দুর্গে আশ্রয় দেন। দীর্ঘ আট বছর পর ৫৩৪ হিজরি সনে (১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) বালাবাক্কু নগরী বিজয়ের পর ইমাদুদ্দিন নাজমুদ্দিনকে নগরীটির প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করে এই সদাচরণের প্রতিদান দেন। যে ব্যক্তি দীর্ঘ আট বছর পরও তার প্রতি কারও অনুগ্রহপূর্ণ আচরণের কথা স্মরণ রাখেন, তিনি যে একজন বিশ্বস্ত ও মহানুভব ব্যক্তি, তা কারও কাছে অস্পষ্ট থাকার কথা নয়।
ইমাদুদ্দিন জিনকি তার প্রতি মসুলের সাবেক প্রশাসক জাকারমিশের অনুগ্রহের কথাও ভুলেননি। জাকারমিশের সযত্ন তত্ত্বাবধানের প্রতিদানে তিনি এর পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় পর তার পুত্র নাসিরুদ্দিন কুরিকে একটি জায়গির-দায়িত্ব প্রদান করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত, মহানুভব ও কোমল হৃদয়-বিশিষ্ট মানুষ। তবে তার সারা জীবনের কর্মমুখর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সংগ্রামী পদচারণার কারণে অনেকেই ভুলবশত মনে করে যে, তিনি কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের মানুষ ছিলেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা সামনে তার যে গুণ-বৈশিষ্ট্যটি আলোচনা করব, তার মাধ্যমে কতিপয় ঐতিহাসিকের এই মতভিন্নতার কার্যকারণ আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়।

টিকাঃ
২৬০, নবী-চরিত্রের অনুপম দয়া-অনুগ্রহ সম্পর্কে জানতে পাঠ করতে পারেন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিতব্য ড. রাগিব সারজানির 'আর-রাহমাহ ফি-হায়াতির রাসুল'।
২৬১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮১।
২৬২. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১০৫।
২৬০. নাজমুদ্দিন আইয়ুব বিন শাযি হলেন মহাবীর সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পিতা। তিনি নিজেও ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম মহান বীরযোদ্ধা। প্রথমে তিনি সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মালিকশাহর সেবক ছিলেন। তার সততা, বিশ্বস্ততা, বীরত্ব ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান মুহাম্মাদ তাকে তিকরিত দুর্গের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। নাজমুদ্দিন সেখানে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ই একদিন সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি এক যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে তিকরিতে আগমন করেন। নাজমুদ্দিন তাকে আশ্রয় দেন, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং তার=পূর্ণ সেবা-শুশ্রূষা করেন। পনেরো দিন তার কাছে অবস্থান করার পর ইমাদুদ্দিন মসুলে ফিরে যান। পরবর্তী সময়ে সেলজুক সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাসউদ বিন মুহাম্মাদ তাকে সরিয়ে ইরাকের পুলিশ বিভাগের প্রধান মুজাহিদুদ্দিন নাহরুযকে তিকরিত দুর্গের দায়িত্ব প্রদান করেন। নাজমুদ্দিনও তিকরিতেই বসবাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর কোনো কারণে নাহরুয নাজমুদ্দিনের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে দুর্গ থেকে বের করে দেন। তখন নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তার ভাই আসাদুদ্দিন শিরকুহ তিকরিত ছেড়ে মসুলে সুলতান ইমাদুদ্দিনের খেদমতে হাজির হন এবং নিজেদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জিনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। [সম্পাদক]
২৬৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৬৩।
২৬৫. প্রাগুক্ত, ১০/১৬
২৬৬, ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২২০।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [ছয়] গাম্ভীর্য ও রাশভারিত্ব

📄 [ছয়] গাম্ভীর্য ও রাশভারিত্ব


যে সময়ে, যে পরিস্থিতিতে ইমাদুদ্দিন জিনকির জন্ম ও বেড়ে ওঠা- সার্বিক বিচারে সে সময়টা ছিল সংগ্রামের। পরিস্থিতিই তাকে গম্ভীর ও রাশভারী করে তুলেছিল। তিনি জন্মগ্রহণ করেন চরম দুর্যোগপূর্ণ এক পরিস্থিতিতে। সে সময় মুসলিম নেতাদের পারস্পরিক বিরোধ ছিল একান্ত স্বাভাবিক বিষয়! তার পিতাও এমনই এক সংঘাতের নির্মম শিকার হয়ে নিহত হন। ফলে ইমাদুদ্দিন জিনকি বেড়ে ওঠেন পিতৃহীন-নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তার কোনো সহোদর ভাই ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর তিনি শৈশব-ভূমি আলেপ্পো থেকে মসুলে চলে যান। শৈশবের কচি বয়সেই তিনি বেছে নেন সৈনিকজীবন। শৈশবেই তিনি দেখেন, ক্রুসেডাররা একের পর এক ইসলামি ভূখণ্ড জবরদখল করে নিচ্ছে। ফলে সে বয়স থেকেই তিনি ক্রুসেড আগ্রাসনের গতিপ্রকৃতি ও প্রতিটি বাঁকের প্রতি তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে থাকেন। তিনি মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি যে, মসজিদুল আকসা ক্রুসেডারদের দখলে আছে; এন্টিয়ক, এডেসা, বৈরুত, আক্কা ও ত্রিপোলিসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন মুসলিম নগরী তাদের আগ্রাসনে রক্তাক্ত হয়েছে, রাতদিন মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে; অব্যাহত মুসলমানদের মানসম্মান ও ধনসম্পদ লুণ্ঠন করা হচ্ছে।
এ সকল পরিস্থিতি তাকে পুরোদস্তুর গম্ভীর ও সংগ্রামী করে তোলে। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিও যাকে গম্ভীর করতে পারে না; সে তো প্রকৃতপক্ষে মানবতাহীন, দ্বীন ও আকিদার চূড়ান্ত মিসকিন!
এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংগ্রামী মনোভাব তাকে কখনোই নিশ্চিন্ত হতে দেয়নি। এ কারণেই তিনি বিশ্রাম ও বিলাসী জীবন খুঁজতেন না। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি কখনো মৃদু হাসতেনও না। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন পৃথিবীর সর্বাধিক সহাস্য-বদন ছিলেন, তেমনই ছিলেন সবচেয়ে গম্ভীর মানুষ। নবীজি ছিলেন অধিক কৌতুক- হাস্যরস পরিহারকারী সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। নবীজীবনে যৎসামান্য যে নির্দোষ-নির্মল হাস্যরসের বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে মিথ্যা ও অতিরঞ্জনের লেশমাত্র ছিল না। ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবনাদর্শও এমনই ছিল। তিনি ছিলেন সদা-ভাবুক ও অতি নিশ্চুপ। তার মনমস্তিষ্ক সর্বদা উম্মাহর কল্যাণচিন্তা ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকত বলে তিনি মানুষের সঙ্গে কথা খুব কম বলতেন। এই সদা-চিন্তাই তার ব্যক্তিত্বকে সকলের সামনে রাশভারী করে তুলেছিল। ঠিক একই বিষয় ঘটেছিল ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর ক্ষেত্রেও। যেহেতু এই গাম্ভীর্যে কোনো জুলুম-অবিচার, অনাচার বা অহংকার নেই, তাই এটি মোটেও আপত্তিকর নয়।
মহান ব্যক্তিগণ সব সময় রাশভারী, গম্ভীর ও প্রভাবসম্পন্নই হয়ে থাকেন। নবীজীবনের এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, ধর্মীয় নীতিমালার আলোকে এ জাতীয় গাম্ভীর্য মোটেও অপছন্দনীয় কিছু নয়।
ইমাম ইবনে মাজা রহ. আবু মাসউদ রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবীজির দরবারে উপস্থিত হলে নবীজি তার সঙ্গে কথা বললেন। এ সময় (ভয়ে) লোকটির কাঁধের গোশত কাঁপছিল। নবীজি তাকে অভয় দিয়ে বললেন, 'শান্ত হও; আমি তো রাজা-বাদশা নই। আমি সাধারণ শুকনো গোশত আহার করে জীবন অতিবাহিত করা এক মায়ের সন্তান!
লক্ষ করুন! নবীজিকে দেখে লোকটি ভয়ে কাঁপছিল। যদিও নবীজি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল ও দয়ালু মানুষ; কিন্তু নবীজির ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য ও তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ লোকটিকে প্রকম্পিত করে তুলেছিল। আর তাই নবীজি তাকে স্বাভাবিক হতে বলে তার অন্তর প্রশান্ত করেন।
আমাদের মহানায়ক ইমাদুদ্দিন জিনকিও এমনই ছিলেন।
একদিন তিনি দুর্গ থেকে বের হলেন। এ সময় দুর্গের দ্বাররক্ষী ঘুমাচ্ছিল। ইমাদুদ্দিন জিনকির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ঘুম থেকে জাগাল। চোখ খুলেই ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দাঁড়ানো দেখে বেচারা ভয়ে ভূপাতিত হলো! তাকে ধরাধরি করে ওঠালে দেখা গেল, প্রচণ্ড ভয়ের কারণে সে তৎক্ষণাৎ মারা গেছে!
এর অর্থ এই নয় যে, ইমাদুদ্দিন জিনকি বদরাগী, কঠোর বা রুক্ষ স্বভাববিশিষ্ট ছিলেন। প্রজা ও সাধারণ জনতার সঙ্গে কখনোই কোনো বিষয়ে তাকে ক্রুদ্ধ হতে বা সীমালঙ্ঘন করতে দেখা যায়নি। কিন্তু তার স্বভাব-গাম্ভীর্যই জনমানুষের হৃদয়ে তার জন্য বিশেষ শ্রদ্ধাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে দিয়েছিল।
ইমাদুদ্দিন জিনকির জীবন ছিল লৌকিকতামুক্ত সংগ্রামমুখর জীবন। নিজেকে তিনি সংগ্রাম ও কর্মমুখর জীবনে জোর করে বাধ্য করেননি; বরং এ জীবন তিনি উপভোগ করতেন। এমনকি ইবনুল আছির তার সম্পর্কে বলেন, 'তার কাছে গায়িকার গানের চেয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেশি মধুময় মনে হতো। অন্যরা যেখানে গীত-সংগীতে মনের শান্তি খুঁজে বেড়াত, তিনি সেখানে মনের প্রশান্তি খুঁজে পেতেন রণাঙ্গনে বা অনুশীলনের ময়দানে যুদ্ধাস্ত্রের ঘর্ষণধ্বনিতে।
গাম্ভীর্য ও সংগ্রামী জীবন তার ব্যক্তিত্ব ও শখেও প্রভাব ফেলেছিল। মাঝেমধ্যে সুকঠিন ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি হ্রাস করতে তিনি যখন একটু প্রশান্তি খুঁজতেন, তখন তিনটি কাজের যেকোনো একটি বেছে নিতেন।
১. পাখি বা বন্য প্রাণী শিকারে বের হতেন। স্বভাবতই এর দ্বারা তির চালনা, আক্রমণ পরিচালনা ও নিজেকে আড়াল করার অনুশীলন হয়ে যেত। এর মাধ্যমে তিনি নিজের রণদক্ষতা আরও শানিত করতেন, যা রণাঙ্গনে কাজে লাগত। তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় উপহার ছিল শিকারকৃত প্রাণী। তিনি নিজেও শাসক ও রাজন্যবর্গকে চিতা, ইগলসহ নিজের শিকার করা বিভিন্ন প্রাণী উপহার পাঠাতেন।
২. অশ্বচালনার অনুশীলন করতেন এবং ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। তিনি নিজে একজন সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ অশ্বারোহী ছিলেন।
৩. নৌকায় চড়ে একাকী দজলার বুকে বিচরণ করতেন এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টি-রহস্য নিয়ে ভাবতেন; আসমান-জমিন ও সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করতেন কিংবা সমকালীন ঘটনা, দুর্যোগ ও বিপর্যয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন। নির্জনের এই চিন্তামগ্নতা তাকে দান করত বিভিন্ন চমৎকার চিন্তা ও পরিকল্পনা, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল, অন্তরের বিনম্রতা কিংবা দৈহিক প্রশান্তি।
হ্যাঁ, এই ছিলেন মহান মুজাহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর বিনোদন ও আমোদ-প্রমোদের বিবরণ!

টিকাঃ
২৬৭. আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস রাযি. বলেন, 'রাসুলের চেয়ে সহাস্যবদন কোনো মানুষ আমি দেখিনি।' ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৬৪১ ও ইমাম আহমাদ, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৭৭৪০। [অনুবাদক]
২৬৮. ইমাম ইবনে মাজা, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং ৩৩১২।
২৬৯. ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজুল কুরূব, ১/১০৫।
২৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ১৮।
২৭১. দেখুন: উসামা বিন মুনকিয, আল-ই'তিবার, পৃষ্ঠা: ১৯২-১৯৩।
২৭২. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৬৩।
২৭৩. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ১৮১।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [সাত] দৃঢ় সংকল্প ও স্থির সিদ্ধান্ত

📄 [সাত] দৃঢ় সংকল্প ও স্থির সিদ্ধান্ত


এটি একজন সচেতন শাসকের অতি আবশ্যকীয় গুণ। ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এরও অন্যতম গুণ ছিল এটি। যুগে যুগে শাসক-প্রশাসকদের দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা মুসলমানদের কত সুযোগ নষ্ট করেছে! জাতি-জীবনে দুর্যোগ-বিপর্যয় ত্বরান্বিত করেছে! কিন্তু ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন প্রতিটি বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। কোনো কাজ প্রয়োজন ও উপকারী মনে করলে তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং দ্বিধাহীন চিত্তে বাস্তবায়ন শুরু করতেন।
শাসনামলের শুরুতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বে তার পক্ষে এখন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি তাদের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেন। সেই সময়কাল শেষ হতেই আমরা দেখেছি তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন এবং তা চালিয়ে গেছেন; ক্রুসেডারদের কোনো শান্তিপ্রস্তাবই আর গ্রহণ করেননি। প্রথমে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব, এরপর অনবরত লড়াই-উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সংকল্প ও সিদ্ধান্তগ্রহণে স্থির-দ্বিধাহীন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনেক সময় তিনি শেষে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতেন, আবার কখনো পরিস্থিতি যুদ্ধের অনুকূল না হলে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিতেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি জিদ দেখিয়ে লড়াই করার জন্য গোয়ার্তুমি করতেন না; বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন এবং তৎক্ষণাৎ তার বাস্তবায়ন ঘটাতেন। তার এই স্থিরচিত্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে সঙ্গীরাও অপ্রয়োজনীয় কষ্টক্লেশ থেকে বেঁচে যেত।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাহীনতার দৃষ্টান্ত তার জীবনে অসংখ্য; বরং তার পুরো জীবনই ছিল এর দৃষ্টান্ত! ইতিহাসের পরবর্তী অংশের ধারাবিবরণীতে আমরা যখন তার প্রশাসনিক ও সামরিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব, তখন বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 [আট] সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

📄 [আট] সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা


ঐতিহাসিক ইবনুল আছির বলেন, 'ইমাদুদ্দিন জিনকি মহান-প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ ছিলেন।'
ইবনে আকিল রহ.-এর ভাষ্য অনুযায়ী রাজনীতির সংজ্ঞা হলো—
যে নীতির বাস্তবায়ন প্রকৃত অর্থেই জনগণকে অন্যায় বিমুখ করে ন্যায়মুখী করে, তা-ই রাজনীতি; এমনকি তা আসমানি ওহির ভাষ্য না হলেও এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রণীত না হলেও।
ইবনুল কায়্যিম রহ. রাজনীতির এই সংজ্ঞাই গ্রহণ করেছেন। স্বভাবতই এর অর্থ এই নয় যে, ইবনে আকিল শরিয়ত পরিহারের নীতিকে রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন। বরং তার উদ্দেশ্য, সমাজ সংশোধন ও জনগণকে অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত রাখতে যুগ ও পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী উপযোগী উপায়-উপকরণ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন।
আধুনিক পরিভাষায় রাজনীতির সংজ্ঞা জানতে গেলে রবার্ট ডিকশনারি বলে, 'মানবসমাজ পরিচালনা সংক্রান্ত শাস্ত্রের নাম রাজনীতি।' অপরদিকে 'আল-মুজামুল কানুনি'র ভাষ্য অনুসারে রাজনীতি হলো, 'সামাজিক বিষয়াদি পরিচালনা সংক্রান্ত শাস্ত্র বা নীতিমালা।'
মৌলিক ইসলামি পরিভাষা হোক বা আধুনিক আইনশাস্ত্রীয় পরিভাষা— সর্ববিচারে ইমাদুদ্দিন জিনকি ছিলেন একজন উচ্চমার্গীয় রাজনীতিবিদ।
ইমাদুদ্দিন জিনকি বেড়ে উঠেছিলেন দুর্যোগ ও ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত এক যুগে। তাকে চলতে হয়েছে বিভিন্ন মানসিকতার নেতা, আমির ও বিক্ষিপ্ত মানসের জনতাকে সঙ্গে নিয়ে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্ম সম্পাদন ও সম্পর্ক রক্ষায় তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও সু-প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী। তিনি কারও সুসম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছেন বা কোনো আমিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, এমন ঘটনা একেবারেই বিরল। তিনি আপন সুষম সুসংহত চিন্তা-পরিকল্পনার মাধ্যমে যেকোনো জটিল থেকে জটিলতর সমাজও সফলভাবে পরিচালনা করতেন।
তিনি শক্তি ও কর্তৃত্বের উৎস ও কেন্দ্রসমূহ সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তাও গভীর দৃষ্টিতে অনুমানে সচেষ্ট হতেন। ইমাদুদ্দিন জিনকি শব্দের ধারে ও উপাধির ভারে প্রবঞ্চিত হওয়ার লোক ছিলেন না। শুরু থেকেই তিনি জানতেন, সেলজুক সুলতানগণ খলিফাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এ কারণেই তিনি সেলজুকদের প্রতি দৃশ্যমান আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন। অবশ্য তিনি খলিফাদের সঙ্গে সদাচরণ এবং তাদের নৈকট্য অর্জনেও উদাসীন ছিলেন না। কিন্তু যখন সুলতান-খলিফা বিরোধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে যেত, তখন তিনি তার সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সুলতানের পক্ষ অবলম্বন করতেন।
পরবর্তী সময়ে যখন সেলজুক সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইমাদুদ্দিন জিনকি নিজেই মুসলিম উম্মাহর প্রধান শক্তিতে পরিণত হন, তখনও তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা করার পরিবর্তে আলপ আরসালানের নামে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত সম্ভাব্য ফিতনা-বিশৃঙ্খলা ও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র থেকে আত্মরক্ষা করেছিলেন। অথচ ইমাদুদ্দিন জিনকির সঙ্গে তুলনা করলে সুলতান আলপ আরসালানের কোনো ওজনই ছিল না। কিন্তু এরই নাম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা; এর মাধ্যমে তিনি সুলতান আলপ আরসালান ও তার সমর্থক সেলজুকশক্তিকে শান্ত রেখেছিলেন, শান্ত রেখেছিলেন আমজনতাকেও।
ইমাদুদ্দিন জিনকি আপন বুদ্ধিদীপ্ত নীতি-কৌশলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে সৃষ্ট শত্রুপক্ষের ঐক্য ও সমঝোতা বিচ্ছিন্ন করে দিতেন। ক্রুসেডার-বাইজান্টাইন ঐক্য প্রচেষ্টা বিচ্ছিন্নকরণে তার গৃহীত নীতি এর অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একইভাবে তিনি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মুসলিম শক্তির মৈত্রীপ্রচেষ্টাকেও কৌশলে বিনষ্ট করে দেন। নিঃসন্দেহে তার এসব প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি-কৌশল রাজনীতির ছাত্রদের বৈষয়িক পাঠ্য হতে পারে।
যথাসম্ভব স্বল্পতম ত্যাগ শিকার করে যুদ্ধজয় সুনিশ্চিতকরণ, শত্রুদুর্গের পতন এবং অধিকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে তার কিছু নিজস্ব কৌশলী চিন্তাধারা ছিল। তার কিছু কিছু নীতি-অবস্থানকে অনেকে প্রতারণা বলে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার সেসব অবস্থান ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ নববি নীতি 'যুদ্ধ হলো কৌশলের নাম'-এর যথার্থ অনুসরণ। মূলত তিনি এর মাধ্যমে বৃহত্তর সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিকে কৌশলে এড়িয়ে যেতেন। সামনে তার বিস্তারিত ইতিহাস আলোচনার সময় আমরা তার গৃহীত এ জাতীয় কিছু নীতি-কৌশল এবং সেগুলো অবলম্বনের যৌক্তিকতা তুলে ধরব।
তিনি তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিকেও মূল্যায়ন করতেন এবং সে ধূর্ত ও অসৎ হলেও তার থেকে উপকৃত হতে চেষ্টা করতেন। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আক সুনকুর আল-বুরসুকির মৃত্যুর পর জাওলি নামক জনৈক মামলুক মসুলের ক্ষমতা হস্তগত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে ইমাদুদ্দিন জিনকি উক্ত পদ লাভ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি জাওলির সঙ্গে আচরণেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন এবং তাকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আলেপ্পোর রাহবা অঞ্চলের জায়গিরের দায়িত্ব প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে তাকে প্রশান্ত করে তার অনিষ্ট-আশঙ্কা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেন, অপরদিকে তার যোগ্যতা ও শক্তিকে কাজে লাগান।
দুবাইস বিন সাদাকার বিষয়ে তার গৃহীত নীতি তো আরও বিস্ময়কর। বনু মাজিদ গোত্রের নেতা দুবাইস বিন সাদাকা ছিল কট্টরপন্থী ইসনা আশারিয়া (দ্বাদশ ইমামবাদী) শিয়া মতাদর্শী। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, চরম সন্ত্রাসী দুবাইস বাগদাদে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল এবং খলিফাকে পদচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়েছিল। সে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও সহযোগিতা বিনিময় করত। সর্ববিচারেই সে ছিল একজন ঘৃণিত ও নিকৃষ্ট লোক। এতৎসত্ত্বেও ইমাদুদ্দিন জিনকি তাকে দামেশকের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন এবং তাকে খলিফার কাছে সমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি দুবাইসকে একটি জায়গিরের তত্ত্বাবধান-দায়িত্বও প্রদান করেন। ইমাদুদ্দিন জিনকির লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে বিশাল বনু মাজিদ গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি বিভিন্নজনের সঙ্গে বিদ্যমান দুবাইসের সম্পর্ক ও দুবাইসপ্রদত্ত বিভিন্ন তথ্য দ্বারাও উপকৃত হতেন। সেলজুক সুলতান মাসউদ একবার ইমাদুদ্দিন জিনকির বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করলে দুবাইস তা ইমাদুদ্দিনকে জানিয়ে দেয়। সুলতান মাসউদ যখন জানতে পারেন যে, দুবাইস বিন সাদাকাই তার গোপন ষড়যন্ত্র প্রকাশ করে দিয়েছে, তখন তিনি দুবাইসকে হত্যার নির্দেশ দিলে তাকে হত্যা করা হয়। এ সংবাদ জানার পর ইমাদুদ্দিন জিনকি মন্তব্য করেন, ‘আমরা তাকে অর্থের বিনিময়ে (বন্দিদশা থেকে) মুক্ত করেছিলাম; আর সে প্রাণের বিনিময়ে আমাদের রক্ষা করল!’
তিনি তার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী নেতাদের লালসা ও চাহিদা অনুমান করতে পারতেন এবং তাদেরকে তাদের প্রত্যাশিত বস্তু দিয়ে তুষ্ট রাখতেন। এর মাধ্যমে তিনি তাদের আনুগত্য ও বশ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতেন। যদিও অনেক সময়ই এসব সম্পর্ক হতো উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্বাভাবিক।
সৈন্যদের সঙ্গে তার আচরণনীতি ছিল কৌশলী ও ফলদায়ক। তিনি এক্ষেত্রে 'উদ্বুদ্ধকরণ-ভীতকরণমূলক যৌথ নীতি'র চমৎকার প্রয়োগ ঘটাতেন। যদিও তিনি তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিতেন, তাদের সঙ্গে কোমল ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করতেন; কিন্তু তার শাস্তিও ছিল কঠিন। তিনি কখনো দায়িত্ব পালনে অবহেলা মেনে নিতেন না। একবার তিনি জানতে পারেন যে, তার জনৈক সেনাপতি নারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছে। তিনি তখন সসৈন্য দূরের সফরে ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লোক পাঠিয়ে অভিযুক্ত সেনাপতিকে বরখাস্ত করেন এবং তার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। বরং এরপর যখন তিনি জানতে পারেন যে, বিষয়টি সরাসরি উত্ত্যক্ত করা পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তখন তিনি তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের নির্দেশ দেন। এরপর তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, 'দূর-দূরান্তের সফরে আমার সেনারা আমার সঙ্গে থাকে; খুব সামান্য সময় তারা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পায়। আমি যদি তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের পরিবারের ওপর কারও অন্যায় হস্তক্ষেপে বাধা প্রদান না করি, তাহলে তো পরিবারগুলো শেষ হয়ে যাবে। এমন কঠোর শাস্তি দেখার পর ইমাদুদ্দিন জিনকির পুরো শাসনামলে আর কেউ নারীদের উত্ত্যক্ত করার দুঃসাহস দেখায়নি।
এ ঘটনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, একদিকে তিনি সৈন্যদের পরিবারের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ দরদ প্রকাশ করে এবং তাদের কল্যাণ বিবেচনায় একজন সেনাপতিকে বরখাস্ত করে সৈন্যদের মন জয় করে নিয়েছেন, অপরদিকে একই সঙ্গে যে তার নির্দেশ অমান্য করবে, শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করবে এবং অন্যায় কাজে জড়াবে, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের সতর্কবাণীও শুনিয়ে দিয়েছেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার নয়। পরিস্থিতি যত নাজুক ও জটিল হোক, আল্লাহ-প্রদত্ত তাওফিকে তিনি তার সর্বোত্তম সমাধান বের করে ফেলতেন। তর্কাতীতভাবেই তিনি ছিলেন উম্মাহর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, মহান ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ।

টিকাঃ
২৭৪, আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩৪০।
২৭৫. ইবনুল কাইয়্যিম, বাদাইয়ুল ফাওয়াইদ, ৩/৬৭৩।
২৭৬. The Collins-Robert French Dictionary.
২৭৭. আল-মুজামুল কানুনি।
২৭৮. প্রয়াত সেলজুক সুলতান মাহমুদের পুত্র। সুলতান মাহমুদ তার যে দুই পুত্রের প্রতিপালনের দায়িত্ব ইমাদুদ্দিন জিনকিকে দিয়েছিলেন, এই আলপ আরসালান তাদের একজন। [সম্পাদক]
২৭৯. ইবনুল আছির উল্লেখ করেন, ইমাদুদ্দিন জিনকি বার্তা প্রেরণ বা কোনো দূতের সঙ্গে কথা বলার সময় বলতেন, 'সুলতান এরূপ বলেছেন।' আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৭১।
২৮০. ইমাদুদ্দিন খলিল, ইমাদুদ্দিন জিনকি, পৃষ্ঠা: ২২৭।
২৮১. দেখুন: আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/৩০২।
২৮২. মুহাম্মাদ সুহাইল তাকৃশ, তারীখুয-যিনকিয়্যীন ফিল-মাওসিলি ওয়াশ-শাম, পৃষ্ঠা: ১১১।
২৮৩. যারা তাকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন, তাদের মাঝে ইবনুল আদিমও আছেন। দেখুন: যুবদাতুল হালাব, ২/২৭৩।
২৮৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৩৪।
২৮৫. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৯/২৫৮-২৫৯।
২৮৬. ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাজাম, ১০/৫৩।
২৮৭. ইবনুল আদিম, যুবদাতুল হালাব, ২/২৫০।
২৮৮. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া, ১/১৬১।
২৮৯. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-তারীখুল বাহির, পৃষ্ঠা: ৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00